জামাইষষ্ঠী

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

২৪ মে ২০১৫ ছিল জামাইষষ্ঠী। বাঙ্গালিদের একটা বিশেষ দিন জামাই বাবাজীদের দীর্ঘায়ু কামনা এবং কন্যার সংসারের মঙ্গল কামনা এটাই বোধ হয় এই পর্বের প্রধান উদ্দেশ্য। 

ষষ্ঠীপূজায় ব্রতীরা সকালে স্নান সেরে ষষ্ঠীর উপবাস করেন। নতুন পাখার ওপর আম্রপল্লব,আমসহ পাঁচফল আর ১০৮টি দুর্বা বাঁধা আঁটি দিয়ে পূজার উপকরণের সঙ্গে রাখেন। করমচাসহ পাঁচ-সাত বা নয় রকমের ফল কেটে কাঁঠাল পাতার ওপর সাজিয়ে পূজার সামনে রাখতে হয়। ধান এই পূজার সমৃদ্ধির প্রতীক, বহু সন্তানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং দুর্বা চিরসবুজ, চির সতেজ অসীমতার বেঁচে থাকার ক্ষমতার অর্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ দুর্বা হল দীর্ঘ জীবনের প্রতীক।

শাশুড়ি, মেয়ে-জামাতার দীর্ঘায়ু কামনা করে ধানদূর্বা দিয়ে উলুধ্বনিসহ ষাট ষাট বলে বরণ করেন। পাখার বাতাস দেন। প্রবাদে আছে, যম-জামাই ভাগনা-কেউ নয় আপনা। কারণ যম মানুষের মৃত্যু দূত। জামাই এবং ভাগনা অন্যের বাড়ির উত্তরাধিকারী। তাদের কখনও নিজের বলে দাবি করা যায় না। এদের খুশি করার জন্য মাঝে মাঝেই আদর আপ্যায়ন করে খাওয়াতে হয়। তাই মেয়ে যাতে সুখে-শান্তিতে তার দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারে এজন্য জ্যৈষ্ঠ মাসে নতুন জামাইকে আদর করে বাড়িতে ডেকে এনে আম-দুধ খাইয়ে পরিতৃপ্ত করেন। আশীর্বাদস্বরূপ উপহারসমাগ্রীও প্রদান করেন। এর প্রতিদানে জামাই বাবাজী তাঁর শাশুড়ি মাতাকে নতুন শাড়ী, স্ত্রী এবং শালিকে নতুন শাড়ী কিংবা পছন্দ অনুযায়ী ড্রেস মেটেরিয়াল কিংবা ড্রেস কিনে দেন। আমি ত তাই করে এসেছি। এ ছাড়া সিনেমা দেখান, হোটেলে খাওয়ান বেড়ান এই সব তো আছেই। বলতে গেলে ট্যাঁকের জোর না থাকলে ওই জামাইষষ্ঠী হবে না। গিভ এন্ড টেক। কিছু পেতে হলে বেশ কিছু দাও। 

জামাইষষ্ঠীতে জামাই আদর কার না ভালো লাগে। শাশুড়ি মাতার হাতের রান্না রকমারি ব্যঞ্জন, পাঁচ ফল,দই মিষ্টি। নতুন জামাই আদরটা বেশি হয় আবার পুরণ হলে একটু কমে যায়। আপনি যদি একমাত্র মেয়ের বর হন তো কথাই নেই। আদর যত্নর ত্রুটি হয় না। যদি ছোট শালি থাকে, সর্বনাশ পকেট গড়ের মাঠ নিশ্চিত। 

সেই পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা ষষ্ঠী পূজা করেন। ষষ্ঠী সন্তান সন্ততির অধিষ্ঠাত্রী দেবী। ওনাকে তুষ্ট করলে সন্তান সন্ততি সুখে শান্তিতে থাকেন এবং নীরোগ থাকেন।

আমার শশুর বাড়ি উত্তর কলকাতায়। ১৯৭৮ সাল থেকে ক্রমাগত শাশুড়ি মাতা বেঁচে থাকা পর্যন্ত জামাই আদর পেয়ে এসেছি। প্রথম জামাই ষষ্ঠীর দিন ট্যাক্সি থেকে নামছি হটাত রাস্তার ধারে একটা বাড়ির দেওয়ালে লেখা দেখে আশ্চর্য হলাম। লেখাটা এই রকম, “এখানে জামাই ভাড়া পাওয়া যায়”। লেখাটা পড়ে গিন্নীর দিকে তাকালাম। 

গিন্নীর বিরক্তি ভরা উত্তর চলত, ও পাড়ার চ্যাংড়া ছেলেদের কীর্তি। পড়াশুনো করে না ... ও দিকে তাকিও না চল। 

একটু পরে কিছু ডেঁপো ছেলেকে বলতে শুনি, “পরের বছর আমরাও জামাই হব। কি বল? শাশুড়ির আদর খাবো।”

আমার হাঁসি পায়। মনে হল শালা বাবুদের ড়েকে কিছু টাকা দি মিষ্টি খাওয়ার জন্য।

হটাত ছেলেগুলো আমার শালাকে আসতে দেখে দে দৌড়। খুবই বয়েসে ছোট ছেলে। এই সময়টা ওদের পড়ার বয়েস। তবে রসিকতাটা মন্দ না। আহা... ওদের ও ত সাধ হয় জামাই হওয়ার! তবে তার জন্য উপযুক্ত হওয়া চাই। তাই না?

লেখাটি কেমন লাগল, অনলাইনে মতামত লিখে জানান

৫০০০ শিশুর মুখের হাসি ফুটিয়ে 'শিশু দিবস' উদযাপন অপারেশন স্মাইল ইন্ডিয়ার

রক্তিম সাহা

১৪ নভেম্বর ২০১৪ পন্ডিত জহরলাল নেহেরুর ১২৫ তম জন্মদিন| সারা দেশে যা 'শিশু দিবস' হিসাবে পালিত হয়| কিন্তু এই দেশেই বহু সদ্যজাত শিশু অপুষ্টির অভাবে মারা যায়, অনেকেই জন্মায় শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে| এই অপুষ্টিজনিত একটি রোগ ক্লিফ্ট লিপ ও ক্লিফ্ট প্লেট| অর্থাত্ ঠোট ও নাক একসাথে জুড়ে থাকা| ছোট এই রোগেই শিশুটি হারায় সমাজে গ্রহনযোগ্যতা, কথা বলার ক্ষমতা| ভোগে মানসিক হিনমন্যতায়| মাত্র চল্লিশ মিনিটের একটি অপারেশন এই ছোট শিশুগুলোকে স্বভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে| তাই প্রমান করে দেখিয়েছে আপারেশন স্মাইল ইন্ডিয়া| ভারতের ১২টি রাজ্যের প্রায় ২২ হাজার শিশুদের মুখে বিনা খরচায় হাসি ফিরিয়ে দিয়েছে অপারেশন স্মাইল ইন্ডিয়া| পশ্চিমবঙ্গে ৫ হাজার শিশুর হাসি দিয়েই তাই শিশু দিবস উদযাপন করলো অপারেশন স্মাইল ইন্ডিয়া| সল্টলেকের ডি.পি.এস.সি বিল্ডিংয়ের কনফারেন্স হলে এদিন ছিল ক্লিফ্ট রোগ থেকে নিজের জীবন ফিরে পাওয়া একাধিক শিশু| ছিল আপারেশন স্মিল ইন্ডিয়ার ব্র‌্যান্ড অ্যাম্বসাডর নন্দনা সেন, ইন্ডিয়া পাওয়ারের চেয়ারম্যান হেমন্ত কানোরিয়া, অভিনেত্রী রূপা গাঙ্গুলি, লকেট চ্যাটার্জী সহ আরও অনেকে| অতিথিদের বরন করে নেওয়ার পরই যা ঘটলো তা এককথায় অনবদ্য| যে শিশুগুলোর মুখ থেকে খিছুদিন আগে পর‌্যন্ত একটাও শব্দ বেরোতো না তারাই সবার প্রানে ছুঁইয়ে দিয়ে গেল আগুনের পরশমনি| তাদের সাথে গলা মেলালো রূপা গাঙ্গয়লি আর নন্দনা সেন| একঝাক তারকার মাঝেও এদিন যেন উজ্জ্বল তারা দুই মুখ| রিক্তা ও ইরফাল মোল্লা| মুখের একটা ছো- হাসি কিভাবে বদলে দিলো রিক্তার জীবন তাই ফুটে উঠলো টিভির পর্দায়| ব‘ অফিসে হিট ছবির মতোই তালি পরলো সারা হলে| আর মে’ খোদ উপস্থিত নায়িকা রিক্তা| চোখে আনন্দের অশ্রু| অন্যদিকে হিরো তো আবার আরও ক্ষুদে| তবে তার ছবি টিভির পর্দায় নয় ; লেখা সাফল্যের তালিকায়| অপারেশনের পর সুুস্থ জীবন ফিরে পাইয়া ৫ হাজার তম শিশু ইরফান মোল্লা|

লকেট চ্যাটার্জীর হাত থেকে অপারেশন স্মাইল ইন্ডিয়ার মাইল স্টোনের বুকলেটের উদ্বোধন হলেও অপারেশন স্মাইল ইন্ডিয়ার প্রাক্তন চেয়ারম্যান রি‘ত বরঠাকুরের বেশ চিন্তিত পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে| অন্যান্য রাজ্য বিশেষ করে আসামে ইতিমধ্যেই স্থাপিত হয়েছে স্মাইল ইন্ডিয়ার এি‘লেন্স সেন্টার| এই কাজে হাত বাড়িয়েছে আসাম সরকার| কিন্তু পিছু হটেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার| রি‘ত ঠাকুরের মতে, পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়ের প্রায় দ্বিগুন| স্বাভাবতই এখানে ক্লিফট রোগাক্রান্ত শিশুর পরিমানও বেশী| কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার নির্বাক| বাংলায় থেকে গেছে প্রায় ৫০ হাজার ক্লেফট লিপ রোগারকন্ত শিশু| সরকারের সহায়তা মিললে এরাই হবে ক্লেফট ফ্রি| 

এদিনই আরও ২০ জন শিশুর চিকিত্সার জন্য সংস্থার হাতে ৬ লক্ষ ৪০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন আর্মেনিয়ান চার্চের ট্রাস্টি বোর্ড| এভাবেই একদিন সারা দেশকে ক্লেফট ফ্রি করার দৃঢ় সংকল্প অপারেশন স্মাইল ইন্ডিয়ার|

রবীন্দ্রনাথকে অন্য ভাবে তুলে ধরার প্রয়াস ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তীর

শর্মিলা চন্দ্র

রবীন্দ্রনাথ মানে আমরা বুঝি গান, কবিতা, প্রবন্ধ উপন্যাস। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে জানার বা বোঝার যে আরও একটি মাধ্যম হতে পারে সেটা বোধ হয় আমরা কোনওদিনই ভেবে দেখিনি। কিন্তু ড.বিবেকানন্দ চক্রবর্তী সেই মাধ্যমটিকে উন্মুক্ত করার প্রচেষ্টা শুরু করেছেন। তা হল রবীন্দ্র-বক্তৃতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন চিন্তাধারা, তাঁর সাহিত্য সবকিছুর সমন্বয় ঘটিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথকে সকলের সামনে নতুন ভাবে তুলে ধরাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। কলকাতার বিভিন্ন স্থানে তিনি বক্তৃতা সভার আয়োজন করেন। তাঁর আলোচনার ৩০টি পর্ব রয়েছে। 

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ড.বিবেকানন্দ চক্রবর্তীর এই ঐকান্তিক প্রয়াস এককথায় প্রশংসার দাবি রাখে। বাঙালি হয়েও আমরা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই ধরণের চিন্তভাবনা করতে পারি না। বেশ কিছুদিন যাবত্ রবীন্দ্রনাথের গান, গানের সুর নিয়ে অনেকেই কাঁটাছেড়া করেছেন। সেই নিয়ে বিতর্কও হয়েছে। কিন্তু ওই মানুষটির কার‌্যক্রম, চিন্তধারা যে অন্যভাবেও প্রকাশ করা যায় সেটা অনেকেই ভাবতে পারেন না। কিন্তু ভেবেছেন বিবেকানন্দ বাবু। মেদিনীপুর টাউন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। সোম থেকে শনি স্কুলের দায়িত্ব সামলে রবিবার করতে কলকাতায় আসেন রবীন্দ্রনাথকে তাঁর বক্তৃতার মাধ্যমে সকলের সামনে একটু অন্যভাবে প্রকাশ করার তাগিদে। বিবেকানন্দ বাবুর কার‌্যক্রম এখানেই সীমিত নয়। তিনি সাহিত্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত। সবথেকে আশ্চর‌্যের বিষয় ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী ইংরেজী সাহিত্যের মানুষ। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই ভাবে চর্চা করা অনবদ্য। এত কিছু করার রসদ পান কোথা থেকে? জানালেন, মনের তাগিদ থেকে। সাহিত্যের প্রতি টান থেকে। জানান, সকলেই রবীন্দ্রনাথের গান শোনে, কবিতা পড়ে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের লেখা তাঁর জীবনকে নানা ভাবে প্রভাবিত করেছে। আর সেই জায়গা থেকেই তিনি রবীন্দ্রনাথের জীবন দর্শনকে বক্তৃতার মাধ্যমে রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষের সামনে তুলে ধরার চিন্তাভাবনা নিয়েছেন।

৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ ও রাধাকৃষ্ণণ স্টাডি সেন্টারের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল শিক্ষক সন্মাননা ও আলোচনা সভা। আলোচনা সভার বিষয় ছিল  ও গান্ধীজীর দৃষ্টিতে শিক্ষা এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী। তিনি বলেন,  আর বিদ্যালাভ এক নয়। আমরা ভুল করে দুটোকে এক করে দেখি। পাশাপাশি তিনি আরও বলেন,  শুধু জ্ঞানের সাধনা নয়, অনুভতি, সৌন্দর‌্য বোধ, শিল্পবৃত্তি, কর্মশক্তি ও ইচ্ছাশক্তির সাধনা। আরও বলেন, বিদ্যাস্নাতক হলেই হবে না, হতে হবে ব্রত স্নাতক। গান্ধীজী যে পাঁচটি ব্রত পালনের কথা বলেছিলেন, সেগুলিও তিনি উল্লেখ করেন,  অহিংসা, ব্রহ্মচর‌্য, অস্তেও ও অসংগ্রহ।

এইদিন গান্ধীজীর শিক্ষাদর্শনের কথাও তাঁর বক্তব্যে প্রকাশিত হয়েছে,  শিক্ষাদর্শনের মূলকথা হল শিক্ষা হবে আদর্শায়িত জীবন গটনের সহায়ক। জাগতিক জয়-পরাজয়, সাফল্য-ব্যর্থতা একজন সত্যাগ্রহীর দৃষ্টিতে মূল্যহীন। একজন সত্যাগ্রহী হবেন আস্তিক। কোনও আস্তিক কখনও হতাশ বোধ করেন না। তাঁর বক্তৃতা উপস্থিত শিক্ষক ও ছাত্রমন্ডলীকে মুগ্ধ করেছে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শতবার্ষিকী ভবন প্রেক্ষাগৃহে পারুল শিক্ষা সন্মান ২০১৪ সন্মানে সন্মানিত হয়েছেন শিক্ষাব্রতী ও গবেষক ড. বিবেকানন্দ চক্রবর্তী। তাঁর হাতে পারুল পুরস্কার তুলে দেন কথা সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ। 

চারুলতা রয়েই যাবে...

সুুদীপ্ত বিশ্বাস

কলেজ ক্যান্টিনে আড্ডা বলতে তখন চা, হাতে সিগারেট এবং গিটারে ফসিলস, ক্যাকটাস| আজ থেকে বছর সাতেক আগের কথা| রোজ চিকেন স্যান্ডুইচ খাওয়ার মতো টাকা পকেটে থাকত না| পরিষ্কার মনে আছে, গান ছাড়াও তীর্থার আবৃত্তি শোনার জন্য সবাই কতটা ছটফট করত| শ্রীরামপুর কলেজে তীর্থা ইংলিশ অনার্সের ছাত্রী ছিল| আমি কমিউনিকেটিভ ইংলিশের| তীর্থাকে বোঝাতে গেলে এক কথায় বলতে হয় ট্যালেন্টেড| গান, আবৃত্তি, বক্তৃতা, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, সব কিছুর প্রতিভাই ছিল ওর মধ্যে | কলেজের কোনো কনফারেন্স অথবা সেমিনার| ডাক আসত তীর্থার| বক্তৃতা দিতে হবে| কিছুক্ষণ ভেবে নিয়েই গড়গড় করে বলে ফেলত| প্রফেসাররাও মাতামাতি করতেন ওকে নিয়ে| কালচারাল সেক্রেটারি, শেষ বছরে জেনারেল সক্রেটারিও হয়েছিল| আমরা বন্ধুরা তো আলোচনা করতাম, এই মেয়েটা একদিন কিছু করবেই| ওকে প্রশ্ন করলে উত্তর দিত, ‘আইএএস হব‘ আমি মনে মনে ভাবতাম, ‘হয়ে যেতে পারে| দম আছে|‘ 

কলেজ শেষ| যে যার মতো ব্যাস্ত| সাত বছর কেটে গিয়েছে| দু-এক জন ছাড়া বিশেষ কারো সঙ্গে যোগাযোগ নেই| তীর্থার সঙ্গেও ছিল না| ফেসবুকে ওকে দেখতে পাইনি| না হলে চ্যাট করা যেত| দিন পনেরো আগে হঠাত্ চন্দননগর স্টেশনে দেখা তীর্থার সঙ্গে| আমাকে চিনতে পেরে ডেকেছে| আমি চিনতে পারিনি| আগের থেকে চেহারা খারাপ হয়ে গিয়েছে| মাঝের এই বছর গুলোতে তীর্থার ছবিটা সেই একি ছিল| হঠাত্ দেখাতে তাই বুঝতে পারিনি| সামনে আসতে বুঝতে পারলাম বিয়ে হয়ে গিয়েছে| এসেই জিজ্ঞাসা করল, ‘কেমন আছিস? কত দিন দিন পর দেখা তোর সঙ্গে| কী খবর?‘ উত্তর দিতে একটু সময় লাগল| থেমে বললাম, ‘ভালো আছি| তোর কী খবর?‘ ওকএ দেখে আমার তো আনন্দ হোয়ার কথা| ওতটা হতেপারিনি| যে তীর্থাসকে আমি চিনতাম, সে কেমন যেন বদলে গিয়েছে| 

- কবে বিয়ে করলি? তুই তো কলেজের পর একেবারে বেপাত্তা হয়ে গেলি|

- হ্যাঁ, বিয়েটা হয়ে গেল| এখন ঘর সংসার করছি| একটু শ্রীরামপুরে গিয়েছিলাম| তোর খবর বল| তুই কী করছিস?

- সামনের চায়ের দোকানে চল| চা খেতে খেতে কথা বলব| চায়ের দোকানে যাওয়ার সময় থেকেই আমার মধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন এসেছে| দোকানে এসে বেঞ্চে বসার সঙ্গেই করে ফেললাম| 

- আচ্ছা, তীর্থা চাজরি করছিস না?

- হেসে বলল, না রে...... তা আর হল না| তুই চারুলতা দেখেছিস? 

আমার বুঝতে বেশি কিছু বাকি ছিল না| বিয়ে করার পর চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি থেকে সব প্রতিভাকেই নষ্ট করে ফেলেছে তীর্থা| ওর রবীন্দ্রনাথ প্রিয় ছিল| নষ্টনীড় যে পড়া, তা জানতাম| 

- হ্যাঁ, দেখেছি| এই প্রশ্ন করছিস?

- আমার জীবনটা চারুলতার মতোই কাটছে| সারা দিন বাড়িতেই থাকি| কোথাও যাই না| আমার হাসবেন্ডের শ্রীরামপুরে জামা-কাপড়ের দোকান| সারা দিন ব্যাবসা নিয়ে থাকে| আর আমি মাঝের মধ্যে জানলার ধারে বসে কলেজের কথাভাবি| আইএএস হোয়ার কথা ভাবি| মাঝের মধ্যে হেসে ফেলি| ছাড়...... তুই বিয়ে করেছিস? 

- না, এখনো দেরি আছে| আমার কথা বাদ দে| তোর হাসবেন্ডকে তোর স্বপ্নের কথা বলেছিলিস?

- হ্যাঁ, বিয়ের আগে| আপত্তি ছিল| বাড়ির বাইরে কাজ করা যাবে না| আমার বাড়ি থেকেও সায় দিয়েছিল| ব্যাস! আমার আর কিছু করা হয়ে ওঠেনি| তারপর থেকে বাড়িতেই দিন কাটে| 

- গান, আবৃত্তি?

- দূর, রবীন্দ্রনাথকে মনের ভিতরেই রেখে দিয়েছি| আসলে উনি মেয়েদের দুঃখের কথাই লিখেছেন|  দুঃখ কী ভাবে ঘুচবে, তা লেখেননি| রবি ঠাকুরের সময় মেয়েদের অবস্থা এক ছিল| সত্যজিত রায়ের সময় এক ছিল| চারুলতার ৫০ বছর পূর্ন হোয়ার পরেও এক আছে| সমাজ বদলায়নি| শুধু চিঠি থেকে ফেসবুক, টুট্যার হয়েছে| ও হলে কী হবে.... চারুলতায় মাধবী ছিল| এখন হাজার তীর্থা চার দেওয়ালের মধ্যে রয়েছে| 

চারুলতার পঞ্চাশ বছর| সত্যজিতরায়েক নিয়ে আলোচনা| ২৫ বৈশাখ| রবি ঠাকুরকে ঘিরে কত অনুষ্ঠান| ভাবলাম| বুঝলাম| বুযেও কিছু করার নেই| আমরা রবি ঠাকুরের সঠিক মূল্যায়ন করে উঠতে পারিনি| করতে পারলে তীর্থার হয়তো আইএএস হওয়া হত| চায়ের গ্লাস টেবলে রেখে বললাম,

- তা হলে এই ২৫ বৈশাখ কিছু করবি না তো? 

তীর্থাও হেঁসে উত্তর দিল, - কে বলল কিছু করব না? জানলার ধারে বসে মাইকে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনব| তবে একটা জিনিস বলতে পারি, হাসবেন্ডের কোনো বন্ধুর প্রেমে পড়ব না!

মে দিবস

সুপ্রভাত লাহিড়ী

প্রতি বছরই এই দিনটা ফিরে এলে মনে হয় এটা কী সেই শপথের দিন হতে পারে না যাতে শ্রমিকের স্বাস্থ, শিক্ষা, সুরক্ষা, দক্ষতা, আদর্শ জীবনযাপন এবং নিতান্তই প্রয়োজনভিত্তিক মজুরি নিশ্চিত হয়? এবং তাতে নিঃস্বার্থ সহযোগি হতে হবে বিভিন্ন নামী-দামী ইউনিয়ন গুলির। শ্রমিক এক একটি ইউনিয়নের কাছে সম্পদ, আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার নয়। শ্রমিকের স্বার্থে সময় এবং পরিস্থিতি ভিত্তিক আন্দোলনের প্রয়োজন। আন্দোলনের জন্যই আন্দোলন নয়। এতে সংগ্রামের অস্ত্রগুলো ভোঁতা হয়ে যায়। যথাযথ হারে নূনতম মজুরী এবং ঠিকা শ্রমিকদের স্থায়ীকরণের কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কোথায়? ‘দিতে হবে’, ‘করতে হবে’ এ স্লোগান ভোঁতা হয়ে গ্যাছে।  

ওদিকে বেড়েই চলেছে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগ। বেড়েই চলেছে চুক্তি ভিত্তিক, আউটসোর্সিং নামক সামাজিক দায়িত্ত এড়ানোর এক কৌশল। যখন তখন কর্মচ্যুতি, অনিয়মিত বেতন, যার বিন্যাস নিয়োগ কর্তার হাতে এবং শ্রমিক দের প্রতি দায়বদ্ধতাও যেখানে অনুপস্থিত।নেই তাদের জন্য সুরক্ষা, পরিবেশ, স্বাস্থ, দক্ষতা-উন্নয়নের যথাযথ সুব্যবস্থা করা। হোটেল, রেস্তোরা, শপিংমল, ছোটখাটো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে শোষণ এবং বঞ্চনা। তার ওপর আছে কমক্ষেত্রে হেনস্থা, বিশেষ করে মহিলা কর্মীদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটা একটা বিপজ্জনক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। শিশুশ্রমিকদের দুর্দশা দেখে আমরা ভাষণ প্রদান, দুঃখ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত দেই। অথচ এই নিয়োগ সম্পুর্ন বেআইনি। কিন্তু কে তা মানছে!

এ শুধু আট ঘন্টার কর্মদিবস বেঁধে দেবার দিন নয় যতদিন শোষণ থাকবে ততদিন  শ্রমিক দিবস-শ্রমিক আন্দোলন থাকবে। শ্রমিক দিবস শুধু মাত্র কলকারখানায় খেটে খাওয়া শ্রমিক দের জন্যই নয়। সাহিত্য, সংস্কৃতি চলচিত্র, ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার ইত্যাদি ক্ষেত্রের জীবিকাভুক্ত মানুষরাও এতে সম্পৃক্ত। শ্রমজীবী মানুষরা সমাজের মেরুদন্ড। অতএব তাকে সুদৃঢ় রাখার দায়িত্ত সরকারের, সমাজের বিশেষ করে যাদের পতাকা তলে তারা স্থান করে নিয়েছেন সংগ্রামের কাণ্ডারী মেনে।

পুরনো সংখ্যার লেখা
সংবাদ

কিরীটী সেনগুপ্তর বই প্রকাশ

সম্প্রতি মোমেন্টস পাবলিকেশন এবং আরসি এন্টারপ্রাইস প্রকাশ করল বেস্টসেলিং লেখক এবং কবি কিরীটী সেনগুপ্তর একটি অনবদ্য কবিতার বই 'হিলিং ওয়াটারস ফ্লোটিং ল্যাম্পস'| একটি আলোচনা সভার মাধ্যমে বইটি প্রকাশ করা হয়| এই আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন, বিখ্যাত লেখক এবং সমালোচক অনজুম কাত্যাল, কবি শর্মিলা রায়, লেখক সৈকত মজুমদার সহ অন্যান্যরা| বই প্রকাশের পর কবি কিরীটী সেনগুপ্ত জানান, কবিতা এমন একটি মাধ্যম, যার সাহায্যে শুধুমাত্র সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে পৌঁছান যায় তা নয়, আধ্যাত্মিকতাকেও ছোঁয়া যায়| বইতে লেখা কবিতাগুলিতে কবি তাঁর রোজকার জীবনের নানান অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন এবং সমাজের কিছু খারাপ দিকও তুলে ধরেছেন|

লিটল ম্যাগাজিন মেলায় হল প্রথম সাহিত্য উত্‍সব

গত ১১ জানুয়ারি থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত নন্দনে হয়ে গেল ১৬তম লিটল ম্যাগাজিন মেলা. এবছর মেলায় মোট ৪০১টি বুক স্টল বসেছিল| এবছরই প্রথম এই মেলায় সাহিত্য উতসবের আয়োজন করা হয়েছিল| এখানে পিনাকি ঠাকুর, শিবাজী মুখোপাধ্যায়, সুবীথ চক্রবর্তি উর্তি কবিরা কবিতা পাঠ করেছেন| পাশাপাশি স্মারক বক্তৃতা এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছিল. উপস্থিত ছিলেন জয় গোস্বামী, শ্রীজাত সহ অন্যান্য কবিরাও| এককথায় এই কদিন সাহিত্য-সংস্কৃতির এক মেল বন্ধন ঘটে গেল নন্দন চত্বরে| সাহিত্য প্রেমী মানুষদের কাছে লিটন ম্যাগাজিন মেলায় সাহিত্য উতসব বাড়তি পাওনা বলা যেতে পারে|

(ছবি : কিরনাংশু শেখর বাগ)

Copyright © 2013 Creative Media All Rights Reserved | Designed & Developed by Graphic World (9143382591)