যন্ত্রমানব@ভালবাসা.কম 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

শেষ পর্ব


সুদীপ্ত কাজে এত ব্যস্ত থাকতো যে মাঝে মাঝে সুদীপ্তা ওকে কাছে পেত না। এমনকি রাতে সুদীপ্ত অফিসে থাকতে আরম্ভ করে। রাতের পর রাত সুদীপ্তার অসহ্য লাগে। সুদীপ্তা ওর মা’কে ফোন করে বলে সব কথা। মা বলেন কাজের মানুষদের একটু সহ্য করতে হয় মা। আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছ কিন্তু ও তো কনজারভেটিভ ছেলে হয়তো ওর মা কিছু বারুণ করেছেন। তুমি একটু মানিয়ে নাও না।

না মা সেরকম নয়। ওর মা’র সঙ্গে ও অনেকদিন কথা বলেনি ফোনে। এমন কি আমার সঙ্গে দু -একটা কথা তাও অফিসের ছাড়া অন্য কথা নয়। এরা কিরকম পুরুষ মানুষ? এদের কি ইচ্ছে বলে কিছু নেই মা?

মাই চাইল্ড। ইউ হ্যাভ গ্রোন আপ। টেক ইওর ওন ডিসিশন। আই উইল টক টু ইওর ডেড ওকে। কুল বেবি কুল।

এর মধ্যে সুদীপ্তার, “অর্ণবের” সঙ্গে পরিচয় হয়। অর্ণব, প্ল্যান্টো  টেক্সাসে, ভাইস চেয়ারম্যান অফ দি বোর্ড ক্লাউড সিকিউরিটিতে কাজ করে। ও এখানকার গ্রিন কার্ড হোল্ডার। অর্ণবের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর সুদীপ্তা ওর সঙ্গে বেশি মেলামেশা করতে থাকে। শপিং মলে উইক ডে-তে শপিং করে। সুদীপ্ত কাজে ব্যস্ত। ও কোম্পানি চেঞ্জ করবে শুনছি।

সুদীপ্তা, অর্ণবের কথা মা’কে বলেছে। মা সেরকম সায় দেন নি। বলেছেন, “তোমার জীবন সঙ্গী  তুমি নিজে বেছে নাও যেরকম আমরা করেছি। তবে আমি এক জনকেই ভালো বেসেছিলাম তিনি তোমার বাবা।” নাও ইট ইস আপ টু ইউ! উই হ্যাভ গিভেন ইউ ফ্রিডম বাট ইউ মাস্ট নট টেক দ্যা এডভান্টেজ অফ ইট।

মামা আই লাভ সুদীপ্ত বাট হি নেগ্লেক্টস মি...মামা ! কাঁদতে কাঁদতে বলে। 

মে বি হি ইজ ওভার এম্বিসিয়াস। ওয়েট এন্ড সি। ডোন্ট ট্রাস্ট নেটিভ আমেরিকান মাই বেবি।

ওকে মামা। বাই।

বাই।

সুদীপ্ত রাত করে ফিরেছে। ওর মুখে ক্লান্তির ভাব । এসেই শুয়ে পড়ল। সুদীপ্তা বিছানায় কাছে টেনে কিস করতে চাইলো কিন্তু সুদীপ্ত বলল কালকে ললিপপ খাবো আজ শুয়ে পড় প্লিজ। আমি খুব টায়ার্ড।

কি ভাব তুমি আমাকে সু? আমার কোন ইচ্ছে নেই! কেন আমাকে তুমি অ্যাভয়েড করছ?

না না আমাকে ভুল বুঝো না। আমি সত্যি টায়ার্ড। আমাকেও বুঝতে চেষ্টা কর।

আমি...আমি... না থাক !

সুদীপ্ত শুয়ে পড়েছে। একটা বাচ্চা ছেলের মত লাগছে ওকে।

সুদীপ্তা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমতে চেষ্টা করলো।

সকালে ঘুম থেকে সুদীপ্ত এমনিতেই তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে কিন্তু  আজ ওর আগে সুদীপ্তাকে শুয়ে থাকতে না দেখে আশ্চর্য লাগলো। একটা ভাঁজ করা চিঠি  ড্রেসিং টেবিলের ওপর দেখে সুদীপ্তর ছ্যাঁক করে উঠলো ।

  

চিঠিটা এই রকমঃ

ডার্লিং না শুধু ‘সুদীপ্ত’, 

দীর্ঘদিন রইলাম তোমার হয়ে সুদীপ্ত। তোমায় ভালোবেসে, অভ্যাসে-অনভ্যাসে, সুখে দুঃখে। অথচ  দেখ, তোমায় ছেড়ে যেতে একটুও কষ্ট হচ্ছে না আমার। এত ভালোবাসলে আমায়, আমি কি একটুও বাসিনী তোমাকে? খুব বেসেছি। কিন্তু আমার ওপর তোমার অধিকারবোধ, তোমার মালিকানা, তোমার নিজস্ব পছন্দ অপছন্দগুলোকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া, আমার  আলাদা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্টাই মানতে না চাওয়াটা মনে মনে হাঁপিয়ে তুলত আমায়। ইনফ্যাক্ট হাঁপিয়ে তুলেছিল আমায়। আমি মুক্তি চাইছিলাম। চাইছিলাম একমুঠো আকাশ। একটু বাতাসের দমকা স্পর্শ। একটুকরো স্বাধীনতা। আর আজ যে তোমায়  শুধু সেই কারণেই সেভাবে ভালোবাসি-না। ভালোবাসতে  পারছি না। কারণ ভালোবাসার নাটকে আমি অভ্যস্ত নই। একথা তোমাকে জানাতে খুব খারাপ লাগছে! হয়ত হ্যাঁ, আবার, হয়ত না । ভাবছ তো তোমাকে বহুদিন ধরে প্রতারণা করেছি। কিন্তু মনের দিক দিয়ে ‘না’। সেইজন্য সত্যি বড় কষ্ট হয়েছে বুকের ভিতর! বারবার বলতে চেয়েছি তোমাকে। আমি আর এই  মিথ্যে সম্পর্কটাকে বিশ্বাসহীনতার চোরাবালির ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে পারছি না! অথচ যতবার এসব  বলতে গিয়ে তোমার মুখের দিকে তাকিয়েছি, ভেসে গিয়েছি তোমার ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে, মাদকতায়,সমর্পনে। আমার মনের  মানুষটিকে তোমার চেনার কথা নয়। তোমার চোখের আড়ালে ওর সাথে আমার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সেও তো কম দিন হল না। আমেরিকাতে আসার পর থেকে তুমি শুধু কাজ নিয়ে মাতলে। আমাকে অবজ্ঞা করেছ। হয়তো না জেনে কিন্তু তুমি তোমার ব্যক্তি স্বাধিনতাকে প্রাধান্য দিয়েছ। আমি অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে তোমাকে অন্ধের মত খুঁজেছি। পাইনি আমি সেই সুদীপ্তকে যে আমায় অকুন্ঠ ভালোবাসত। আজ আর এসব কথার কোন অর্থ নেই। দুই পরিবারের সম্মতিতেই আমরা বিয়ে  করে নিয়েছি সুদীপ্ত। আমি তোমাকে ঠকাই নি। আমি যা চাই তা পেলাম না তোমার কাছ থেকে তাই চাইছিলাম মুক্তি। তোমার অহমিকার কাছে আমি নিজেকে  বিলিয়ে দিতে পারলাম না।

 আমার  দ্বিতীয় স্বামী 'অর্ণব'  খুব ভালো ছেলে, ও আমার সব কথা শুনেই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। আমিও স্বাধীন। তুমিও স্বাধীন। ও খুব নরম মনের ভালো মানুষ। বিশ্বাস কর, খুব সুখে থাকব  আমি ওর সাথে। আমায় নিয়ে আর না ভেবে নিজের খেয়াল রেখো। ওটাই বাস্তব। একা থেক না আর। পারলে খুব তাড়াতাড়ি একটা সুন্দর দেখে মেয়ে বিয়ে করে নিও। সে যেন আমার চেয়ে তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে। আমি বুঝতে পারছিলাম তোমার মা আমাকে কখনও পছন্দ   করবেন না। তাই তুমি মুক্ত। আমি জানি তুমি তোমার মায়ের বাধ্য সন্তান, তাই আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম। তুমি আবার বিয়ে কর আমার চেয়ে বেশি সুন্দর দেখতে  এমন একটি  মেয়েকে যে তোমায় ভালোবাসবে আর তোমার অহংকারকে মেনে নেবে! হ্যাঁ আমি জানি তুমি  হয়তো আমার জন্য দুঃখ করবে তবে সেটা সাময়িক। পরে কাজের চাপে সব ভুলে যাবে। ভাল থেক। এটা লিখতে লিখতে আমার চোখ থেকে অবিরাম অশ্রু ধারা বয়ে চলেছে। আমি এই ডিসিশন নেওয়ার আগে অনেক বার আমার মনকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি। কাল সারা রাত আমি শুতে পারিনি আমিও তো মানুষ কিন্তু তোমার মত 'যন্ত্রমানুষ' নই। বাই বাই। ভালো থেক আমাকে ভুলতে চেষ্টা কর।

সুদীপ্ত চিঠিটা ধরে বাচ্চা ছেলের মত কাঁদতে লাগলো। ভুল তার, কিন্তু  জীবনে একটাই  মেয়ের সংস্পর্শে এসেছিল সে এরকম প্রতারনা করবে বুঝে উঠতে পারেনি। বাবা মা’য়ের কথা মনে পড়লো। হয়তো মা চাইছিলেন না। তাই এরকম হল তার জীবনে। সে ফিরে যাবে ইন্ডিয়াতে। নতুন করে জীবন শুরু করবে আবার। যন্ত্র মানুষ নয় শুধু মানুষ হয়ে। মাকে নিয়ে যাবে বেঙ্গালুরুতে। তিরুপতী দর্শন করাবে। ভাইকে আরও পড়াবে। সে যেন তার মত দুঃখ না পায় ।

ধারাবাহিকটি কেমন লাগছে, অনলাইনে মতামত লিখে জানান

যন্ত্রমানব@ভালবাসা.কম 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

অষ্টম পর্ব


বস না। আমি মেয়ে হয়ে বসেছি তুই কেন লজ্জা পাচ্ছিস? সত্যি তোরা দুই ভাই এক ক্যাটেগরির! ডিব্বা কোথাকার! বলে হাসে।

ওই ববির ডায়লগটা মনে রেখেছিস আর ওর অ্যাপ্লিকেশনটাও তোর জানা।

তা কি করবো? তোরা যদি চুপ করে থাকিস কিছু না বলে আমরা মেয়েরা  কথা বলতে বাধ্য হই।

প্রসঙ্গ বদলাতে চেষ্টা করলো সুশান্ত। তুই কখন পড়াশোনা করিস? আমার সেমিস্টারের পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশন করতে হবে। চল যাই। মা চিন্তা করবেন।

ওরে মাতৃভক্ত ছেলেরে। সত্যি তোদের মত ছেলে পাওয়া মুস্কিল। গুড গুড বয়। ওরে আমার ‘ভোলা রে’। বলে একটু আলত থাপ্পড় দিল পেছনে।

তুই কিন্তু আমার ‘কোকা কোলা’ হতে পারবি না।

কেন? আই আই টি তে পেলাম না বলে বলছিস।

না তা কেন?

তবে?

তবে আবার কি! তুই নিজেই ভেবে দেখ। আমি এবার চলি। বাই।

বাই। আবার কবে আসবি?

দেখি। ফাজলামি না করে পড়াশুনোর দিকে মন দে ।

আমাকে একটু পায়ের ধুলো দিবি ? তোর মত ভালো ছেলে আমাদের কলেজে একটাও দেখিনি! শালা মেয়ে দেখলে জিব দিয়ে জল পড়ে আর মাষ্টার গুলো আরও হারামি। খালি ছুঁক ছুঁক করে।

মেয়েদের মুখে শালা শব্দটা খুব খারাপ লাগে শুনতে। তুই ওটা না বললেই পারিস। পায়ের ধুলোর দাম আছে। দিতে পারবি ?

হ্যাঁ। দিতে পারবো।

তবে বি.টেক-এ  ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে দেখা।

আই একসেপ্ট ইট মাই লাভ। কিন্তু তোকেও তাই হতে হবে। তারপর কিন্তু আমি যা বলবো তোকে মানতে হব ।

চেষ্টা করবো। তারপর  ঠাকুরের ইচ্ছা। মায়ের আশীর্বাদ থাকলে নিশ্চয় হবে।

দু-জনে দু -দিকে চলে গেল। 

সুদীপ্ত, সুদীপ্তা দুজনেই  প্রজেক্টের কাজে খুব ব্যস্ত থাকে। নতুন প্রজেক্ট আর ক্লায়েন্ট নিয়ে ওরা নিজেদের কাজে এতো মশগুল থাকে যে ভাল করে কথা বলার সময় পায় না। এদিকে সুদীপ্তর মা অন্য কথা ভাবেন। ছেলের ফোনের জন্যে বসে থাকেন ভোরে। অনেকদিন ফোন না পেয়ে সুশান্ত কে দাদার খোঁজ নিতে বলেন। সুশান্ত পরের সেমিস্টারের জন্য প্রস্তুতি চালায়। টপ রাঙ্কের জন্য রাত দিন পড়াশুনো করতে থাকে। ওদিকে শ্রাবন্তি আর ফোন করে না। ও নিশ্চয় ভালো করে প্রিপারেশন করছে।

একদিন মা  দুই ছেলের খোঁজ নেওয়ার জন্য মামাকে বলেন, দাদা একটু ফোন করবি ছেলে দুটোকে।  অনেক দিন কোন খবর পাই না। কি করছে দু-জনে কে জানে ?

নাম্বার আছে?

মা, সুশান্তর নাম্বারটা রেখেছিলেন , বললেন এই নে ।

মামা সুশান্তকে ফোন করাতে ফোন সুইচ অফ দেখল।

মামা বিব্রত হলেন পরে বুঝলেন নিশ্চয় ক্লাসে অথবা পড়াতে ব্যস্ত । বোনকে বললেন ব্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই ওরা দুজনে নিজেদের কাজে ব্যস্ত। তুই যা আমি পরে খবর নিয়ে বলব তোকে ।

আচ্ছা । বলে মা চলে গেলেন ঠাকুর ঘরে ।

নিউইয়র্ক শহর-

আলো ঝলমলে রাস্তায় হারিয়ে গিয়েছে সুদীপ্ত আর সুদীপ্তা। গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে ঘুরতে। আজ শনিবার ওদের ছুটি। বলা বাহুল্য সুদীপ্ত এখানকার ড্রাইভিং ট্রেনিং পাস করে লাইসেন্স পেয়েছে। সুদীপ্তাও জানে তবে এসউভি চালাতেই ও ভালোবাসে। এখানকার রাস্তাতে গাড়ী চালানোর মেজাজই আলাদা। লঙ ড্রাইভে যেতে মজা লাগে। সারা শহরের শপিং মল ওদের মুখস্থ। কোথায় ইন্ডিয়ান ডিশ পাওয়া জায় সেখান থেকে কিনে আনে। সুদীপ্তা ইন্টারনেট দেখে রান্না শেখে। ওরা ওই খায়। দুধটা ভালো আর ফোর সিরিয়ালের আটা দিয়ে রুটি বানায়। তবে রুটিও কিনতে পাওয়া যায়। কাল পার্টি আছে। সুদীপ্ত এখানে প্রজেক্ট ম্যানেজার হল তাই। এতো তাড়াতাড়ি পি.এম. হওয়া আর নতুন প্রজেক্টের দায়িত্ব  নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ওর প্রজেক্টের কাজের জন্য একজন সিনিয়ার প্রজেক্ট ম্যানেজার (SPM ) ওকে গাইড  করবেন।

আজ শনিবার ওহিও তে পার্টি দিচ্ছে সুদীপ্ত এবং সুদীপ্তা দুজনে। প্রায় জনা ১৬ র মত নিমন্ত্রিত ছিলেন। সুদীপ্তার মা বাবা ইন্ডিয়া থেকে ফোনে  উইশ করলেন ওদের দুজনকে। সুদীপ্ত অনেক দিন পর মা’কে প্রণাম জানালো । নতুন প্রমোশনের কথা জানালো। মা খুশি হয়ে আশীর্বাদ করলেন, মামা, মামি সকলেই খুব খুশি হলেন এই সংবাদে। সুশান্তকে ফোনে পেল না সুদীপ্ত। মনটা একটু খারাপ হল। পার্টি রাত প্রায় ১০ টা অবধি চলল। এখন সুদীপ্ত-সুদীপ্তা দুজনেই ওহিও তে থাকবে।

যন্ত্রমানব@ভালবাসা.কম 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

সপ্তম পর্ব


অনেক দিন পর দুপুরের খাওয়াটা  জগা ননা ভালই বানিয়েছিল। ইলিশ মাছের ঝাল, মোচার ঘণ্ট, ফুল কপির তরকারি,পাঁপড় ভাজা, টমাটোর চাটনি, পায়েস, মিষ্টি,দই ইত্যাদি। সব আইটেমই ভালোই বানিয়েছিল। ভাতটা আমি এমনিতেই কম খাই। এই বয়েসে মোটা হলে আর দেখতে হবে না। বন্ধুরা টিটকিরি মারবে।

খেয়ে বিকেলে পার্কে বেরলাম। রাস্তায় 'শ্রাবন্তির' সঙ্গে দেখা। ও পার্কে যাচ্ছিল। আমাকে ফোনে আগে থেকেই বলেছিল পার্কে যাওয়ার জন্য। আমার সঙ্গে পা মেলাল। শ্রাবন্তি আমার সঙ্গে স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত পড়েছে।  একই কলেজে একই  ক্লাসে পড়েছি  ১২ক্লাস অবধি। আমার সঙ্গে আই আই টি এন্ট্রান্সও দিয়েছিল। বেচারি পায়নি। খুব ভেঙ্গে পড়েছিল। জয়েন্টের রেজাল্ট ভালো ছিল। এখন শিবপুরে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ভালই পড়ে তবে বড্ড পাকা মেয়ে।

 কিন্তু মেয়েটা ভালো। আমাকে খুব ভালবাসে। মিথ্যে কথা বলব না আমিও ওকে ভালবাসি।  

কিরে কবে এলি? 

আজকে।

কতদিন থাকবি?

পরশু চলে যাবো।

কেন ওখানে কেউ নতুন বন্ধু হয়েছে বুঝি ?

তোদের মেয়েদের ওই এক কথা! এত জেলাস কেন বলতো তোরা ?

বাবা! বিবেকানন্দ হলি নাকি? আমি কি জিজ্ঞেস করছি তুই কি ভাবছিস! আমি বলছি তোর নতুন কোন ছেলে বন্ধুর কথা।

কেন তার সঙ্গে লাইন মারবি?

দেখেছিস কে জেলাস্!

ছাড়। তোর সেমিস্টার শেষ হয়েছে?

হ্যাঁ,  তোর ?

সে জন্যই  তো আসতে পেরেছি। 

তাই বল। হ্যাঁরে মাসিমা কেমন আছেন ? না না ‘মা’ বলি কি বল?

ভালো। তবে ‘মা’ বলতে পারিস আমার মা’কে। 

তোদের বাড়ি নিয়ে যাবি?

রক্ষে কর আর কেল করিস না! মা’ যা রেগে আছেন দাদার ব্যাপারে!

কেন তোর বৌদি ত তোর দাদার প্রজেক্টে আছেন না ? কি মজা দুজনে খুব এনঞ্জয় করছে বল। তোর ইচ্ছে করে না স্টেস্ এ যেতে বি.টেক এর পর ?

না দাদা যে ভুল করেছে আমি তা করব না।

তোর দাদা বৌদির ফটো দেখাবি।

কি হবে দেখে ?

ইন্সপায়ার্ড হব! আমারাও যাবো।

মানে?

ওরে ভোঁদাই, বিবেকানন্দ! এই আমায় কিস্ করবি?

তুই খুব ফাজিল হয়ে গেছিস। আমি যাচ্ছি। বাই।

...ওরে ওরে থাম থাম। যাসনি। বাবা কি মেজাজ!    

কেন আমার পেছনে লেগে আছিস? দু দিনের জন্য এসেছি তাও তুই আমাকে সিডিউস্ করছিস? কেন ? কলেজে ফোন ত করিস। হস্টেলে ছেলেরা আমাকে বলে তোর গার্লফ্রেন্ড!

আমি কি বলি বল?

কেন তুই বলবি হ্যাঁ। আমার হবু বৌ। দেখবি ওরা চুপসে যাবে। ঠিক কি না।

সুশান্ত চুপ করে যায়। ওর মা’র কথা বলে। ওর মা কত কষ্ট পাচ্ছে দাদা ওই কান্ড করাতে।

দেখ ‘সু’ আমাকে আর বোঝাস না ! তোর দাদা যা করেছেন ঠিক করেছেন। অমন সুন্দর দেখতে বৌ আবার সেম প্রফেশনে আছেন ওনারা। তোর বৌদির বাবা মা  আই .এ.এস অফিসার। আর কি চাইতিস তোরা?

ওইটাই তো মায়ের অসুবিধে। মা ঘরোয়া মেয়ে...

রাখ রাখ ওই গেঁয়ো...

এটা খুব অব্জেক্সনেবল কথা বলেছিস কিন্তু। আমি এটা পছন্দ করি না কিংবা আশা করি না তোর কাছ থেকে অন্তত।

এই! আমি তোর মা’কে মানে মাসিমাকে বলেছি নাকি? আমি কথাটা শেষ করিনি...

ঝগড়া করতে আমি ভালো বাসি না। তুই তোর কলেজের কথা বল না।

সে তো জানি বিবেকানন্দ! মাই সুইট হার্ট। আই লাভ ইউ। কিরে কিছু বলছিস না যে। তুই কি ঋতুপর্ণ ঘোষ নাকি রে? এতো দিন পর এলি বন্ধুরা কি বলবে তোকে ভোঁদাই! বলে হাসে।

দেখ বাড়াবাড়ি হচ্ছে কিন্তু। ঋতুপর্ণ ঘোষের কথা বলছিস! ওনার মতন আর একটা নির্দেশক দেখা তো বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে।

কেন গৌতম ঘোষ, কৌশিক গাঙ্গুলী কি খারাপ নির্দেশক?

না খারাপ না। আমি বলিনি সে কথা।

হ্যাঁরে চুপ করে আছিস কেন? তোর পাশে একটা মেয়ে, তোর গার্লফ্রেন্ড বসে তোকে কিস করতে বলছে আর দেখ এখন সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছে। পাসে তুই আর আমি। কি  রোমান্টিক না। আমি মেয়ে হয়ে তোকে বলছি কিস করতে। কিরে তুই...?  

ফাজলামি করিস না। আমি এ সব পছন্দ করি না। আমি যাচ্ছি। বাই।

যন্ত্রমানব@ভালবাসা.কম 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

ষষ্ঠ পর্ব


সুদীপ্তর মা সল্টলেকে মামার বাড়িতে থাকেন এ.জে ব্লকে। মামার সিটি সেন্টারে দুটো দোকান। একটা গার্মেন্টস আরেকটা ইলেক্ট্রনিক্সের শোরুম। প্রচুর বিক্রি হয়। মামার ইচ্ছে ছিল সুদীপ্তকে এম.বি.এ পড়ানোর। ওনার ছেলে নেই তাই সুদীপ্ত,সুশান্ত দুজনকেই নিজের ছেলের মতন দেখেন। মা’র ঘর ঠাকুর ঘরে। মা পূজো আচ্ছা নিয়ে বেশির ভাগ সময় কাটান। প্রত্যেক মঙ্গলবার, শনিবার দক্ষিণেশ্বর কালি বাড়ি গিয়ে পূজো দেন দুই ছেলের নামে। মামা  গাড়ি দিতে চাইলে, মা গররাজি হন বলেন “অত আড়ম্বরে পূজো দিলে ঠাকুর গ্রহণ করেন  না”। মহিলাদের মাথায় কে যে এই সব ঢোকায় জানি না। নিজেদের কষ্ট দিতে এদের জুড়ি নেই। অবশ্য সবাই সেরকম নয়। সুশান্ত কিছুদিনের জন্য খড়গপুর থেকে  মায়ের কাছে এলো দেখা করতে। মা আনন্দে আটখানা ছেলেকে পেয়ে। আনন্দাশ্রু দুচোখ বেয়ে গড়াতে লাগলো। সুশান্ত ধীর স্থির খুব শান্ত মেজাজের ছেলে। বাবার দেহান্তর পর আর ও যেন শান্ত। দাদা চলে যাওয়ার পর ওর দায়িত্ব বেড়েছে মায়ের প্রতি। প্রায় দিন ফোনে মা'’র খবর নেয়। ঘরে ঢুকে মাকে প্রণাম সেরে হাত পা ধুতে যায়। মা তোয়ালে দিতে দিতে বলেন, “রাস্তায় কষ্ট হয় নি তো বাবা”।

কষ্ট কিসের মা !  তোমাকে ছে ড়ে থাকার কষ্ট বলছ ! না অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। না না ট্রেন জার্নি করে এলি তো তাই বলছি। ও অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। এইটুকু তো পথ। তুমি জান অনেকে ডেলি প্যাসেঞ্জারই করেন কলকাতা থেকে খড়গপুর। অফিস টাইমে লোকাল ট্রেনে উঠতে পারবে না। হ্যাঁ তা জানি। স্নানটা সেরে নে আমি খাবার বাড়ছি।  এই সময় মামি এলেন এক থালা জলখাবার নিয়ে। লুচি ফুলকপির তরকারি, বেগুন ভাজা, পায়েস আর মিষ্টি। সুশান্ত ধপাস করে প্রণাম করে মামিকে। কেমন আছো মামি? 

ভালো। তুই কেমন আছিস বাবা ? এতো রোগা হয়ে গেছিস কেন রে? হস্টেলে কি খেতে দেয় না? মা কাছে নেই বলে খাস না ভালো করে ? 

কি যে বল মামি। তোমরা মায়েরা শুধু আমাদের রোগা হতে দেখ।  বন্ধুরা বলে মোটা হয়ে যাচ্ছিস খেয়াল রাখিস। জিম-এ যা নয়তো ভুগবি। কোন বন্ধু , ছেলে না মেয়ে ? মা বলেন।

খুব অপ্রস্তুত মনে হল সুশান্তকে। আমি দাদা নয় মা যে হুট করে... থাক থাক। আর বলতে হবে না। উনি যাওয়ার এক বছর না হতেই  ছেলে ... চোখের জল পুঁছতে পুঁছতে মা ... আহা কান্নার কি আছে মা আমি ত আছি ! হ্যাঁ সেই আসায় বসে আছি। তোরা মানুষ হলে আমি কি তোদের বিয়ে দিতাম না । আমার কত সখ ছিল...।

ঠিক আছে ঠিক আছে । দাদা তো আমাকে হাজার পঞ্চাশ ডলার পাঠিয়েছে। তা কি বেশি করেছে শুনি। ছোট ভাইয়ের জন্য উনি করেননি। সারা জন্ম ভাই বোনকে দেখলেন তারা এখন মুখ ঘুরিয়ে থাকে। আমার কপালে যত কষ্ট! ঠাকুরঝি তুমি খেয়ে নাও। “ও সব কথা থাক” মামি বলেন। রান্না ঘরে গেলেন রান্নার ঠাকুর জগা ননাকে ফরমাজ করতে দুপুরের রান্নার জন্য। জগা ননাকে অনেক দিন থেকে দেখি মামার বাড়িতে রান্না করতে। জগা ননার গ্রাম উড়িষ্যার ভদ্রকে। মাছ মাংস দারুণ করে। খুব রগ রগে ঝাল দিয়ে রান্না করে কিন্তু খাসা লাগে খেতে। এমনিতে উড়িয়া ঠাকুররা ভালো রান্না করে। সুশান্ত জলখাবার খেয়ে নেটে বসলো। এফ.বি খুলে বন্ধুদের সঙ্গে একটু চ্যাট করে দাদার প্রোফাইল খুলে কিছু ফটো দেখল। দাদা তো ওর ফ্রেন্ড লিস্টে। দাদা সুদীপ্তা বৌদি স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, নিউ ইয়র্কের আরও কিছু যায়গা, বিভিন্ন শপিং মল এর ফটো, হোয়াইট হাউসের কিছু  ফটোর ব্যাক গ্রাউন্ডে ওদের ফটো পোষ্ট গুলো দেখল। ভালোই হয়েছে ফটোগুলো। পিকাসাতে আপলোড করে এ্যালবাম বানাল "দাদা বৌদি এট স্টেটস"।

দাদাকে ফটো পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে ওর কিছু কলেজের তোলা ছবি আপলোড করে পাঠাল। বৌদি কে হায় জানালো।

যন্ত্রমানব@ভালবাসা.কম 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

পঞ্চম পর্ব


যাওয়ার আগের দিন পার্টিতে ওরা দুজনে বন্ধুদের থেকে বিদায় নিল। এয়ারপোর্টে সব বন্ধুরা সি অফ করলো। চেক ইন সেরে, লাগেজ কনভেয়রে পাঠিয়ে দুজনে বন্ধুদের থেকে বিদায় নিল। আর ওদের দেখা গেল না। এর র সিকিউরিটি চেকআপ সেরে ফাইনালি রান ওয়েতে বাস এয়ারক্রাফট্ পর্যন্ত নিয়ে যায়। মোবাইল সুইচ অফ্ করে দুজনের নির্ধারিত সিটে চলে যায়। 

বেঙ্গালুরু থেকে মুম্বাই হয়ে দুবাইতে ঘন্টা খানেক থেকে পাড়ি দেয় ফ্রাঙ্কফুট্। ভারতীয় সময় রাত ১২ টায় এয়ারক্রাফট্ ছাড়ে ফ্রাঙ্কফুট্। তারপর আটলান্টিক্ মহাসাগর সারারাত। সকালে নিউউয়র্কের  জন্ এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে পৌঁছায়। এয়ারপোর্ট টারমিনালে অপেক্ষারত দুই বন্ধুকে আলিঙ্গন করে। ওয়েল কাম টু আমেরিকা দুজনে দুই বন্ধু জানায়। থ্যাঙ্ক ইউ প্রতিউত্তরে বলে সুদীপ্ত।

সুদীপ্তর এতদিনে আশা চরিতার্থ হল। গেস্ট্ হাউসে পাশাপাশি রুমে দুজনে যেন কাছে থেকেও দূরে! মাইনাস ২৫ টেম্পারেচার। এই ঠান্ডায় সুদীপ্তা, সুদীপ্তর বাহু বন্ধনে আবধ্য হতে চাইছিল ।কিন্তু সুদীপ্ত কি সায় দেবে? না ওর মাথায় একটাই চিন্তা প্রোজেক্ট আর প্রোজেক্ট! দূর কাল থেকে আবার নতুন কাজে জয়েন করতে হবে দুজনকে। এক প্রজেক্ট থাকাতে কাছেই থাকবে। কিন্তু লাভ কি ও'তো কথাই বলবে না সুদীপ্তার সঙ্গে।

শনিবার রবিবার ওদের ছুটি। নিউজার্সি থেকে নিউইয়র্ক কাছেই। তাই বেড়াতে বেড়োয়। সুদীপ্তর পিস্তোতো ভাই এবং বউদি এখানে মস্ত ডাক্তার। ওঁরা ১৯৬২ থেকে আমেরিকাতে ম্যানহাটেন স্ট্রীটে অনেক দিন আছেন। বাড়ির নাম দাদার মায়ের নামে “শান্তি নিলয়”। ওরা দেখা করে চলে আসে। সঙ্গে সুদীপ্তা ছিল তাই লজ্জায় বেশিক্ষন থাকেনি । 

হঠাৎ নোট্ প্যাডে মেল্ এলার্টঃ- ছোটভাইয়ের ই মেল্, “SEND IF U CAN, 50K INR BY 15th ”Sushanta .সুদীপ্ত অপ্রস্তুত মনে করে ফিরতে চাইল। আজকেই ফান্ড্ ট্রান্সফার করতে হবে এইচ.ডি.এফ.সি ব্যাঙ্ক থেকে সুশান্তর অ্যাকাউন্টে। সুদীপ্ত কোম্পানী থেকে $20,000 আসার সময় পেয়েছিল। ওর কাছে  এখন $17680 আছে। তার থেকে $1000ডলার অনায়াশে পাঠাতে পারে। ডলারের ভ্যা্লু পড়ে গিয়েছে। এখন  $1= Rs 49.50P (গল্পটা যখন লেখা তখন ওই ভ্যালু ছিল) আছে। যদি আজকের দাম থাকে তাহলে টা ৪৯,৫০০হয়ে যাবে। সুশান্ত সেটা তিনদিনের মধ্যে পেয়ে যাবে। নিশ্চয় ওর অ্যাডমিশনের জন্য প্রয়োজন। ফান্ড ট্রান্সফার করেই মেল করবে ভাইকে। মনে মনে ভাবলো।

সুদীপ্তা বাবা মার সঙ্গে কথা বলেই যাচ্ছে। ও টের পায়নি সুশান্তর মেল্ এর ব্যাপারে। সুদীপ্ত খুবই বিব্রত ছিল ওর ভাইকে টাকা পাঠানোর জন্য। ওর  বৌদির সঙ্গে সুদীপ্তাকে কথা বলতে দেখে সুদীপ্ত,  দাদার সঙ্গে কম্পিউটারের কাছে গেল। ওর ছোট ভাইয়ের খড়গপুরের এইচ.ডি.এফ.সি ব্যাঙ্কের অ্যাউকাউন্টে ওর দাদার বাড়ির কম্পিউটার থেকেই $1050 ফান্ড ট্রান্সফার করে পাঠিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত হল। 

ওর দাদা খুশি হয়ে বললেন, ছোট ভাইকে টাকা পাঠালি ? বাহ্ এটা মনে রাখবি। এটা বিশেষ দরকার। ছোট ভাইয়ের কথা সব সময় খেয়াল রাখবি। দেখবি বাবা মায়ের আশীর্বাদ পাবি ।

ওর কাছে এখন $16,630 অবশিষ্ট থাকলো। ওই টাকায় বাড়ি ভাড়া, খাওয়ার খরচ, গাড়ির পেট্রল কত গেলন লাগবে তার আন্দাজ নেই। তবুও মোটামুটি সব হয়ে যাবে মনে হচ্ছে। সুদীপ্তার কি চিন্তা ! টাকা লাগে দেবে গৌরিসেন। সুদীপ্তা হঠাৎ বলে উঠলো, “বাড়ি যাবে না ?”   হ্যাঁ চল । বলে ভাইকে মেল করে দিল “$1050 transferred to ur acct .Pl check after 3 days and confirm me” Dada. দুজনে ফিরে এলো ।

রাত ৯ টার সময় ইন্ডিয়া থেকে ফোন এলো সুদীপ্তার। নিশ্চই ওর বাবা মা কল করছেন ! সুদীপ্তার চোখে মুখে খুসির চেহারা সুদীপ্তর চোখ এড়ালোনা। ও অন্যখানে চলে গেল। সুদীপ্তা, “এই ! তোমাকে মা ডাকছেন।”

কেন ?

জানি না। শোন।

আচ্ছা যাচ্ছি ।

মোবাইলটা নিয়ে কল রিসিভ করে, “হ্যালো!” বলাতে ওপার থেকে উত্তর এল “ কেমন আছো?”

ভালো

যন্ত্রমানব@ভালবাসা.কম 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

চতুর্থ পর্ব


সুদীপ্তা একটা সুইমিং পুলের ধারে বসে জলে নানা রঙের  মাছ দেখছিল। নানা রঙের মাছ মনকে শান্ত করে। বেঙ্গালুরুর ইনফোসিসের ভেতরটা এতো সুন্দর পরিবেশ আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মনে হয় না ওটা ভারতবর্ষের মধ্যে অবস্থিত বলে। মনে হয় যেন আমেরিকাতে আছি। একটা কাগজের টুকর কোথাও কেউ খুঁজে পাবে না। ক্যাম্পাসের ভেতর গাড়ি চালানো নিষেধ। সাইকেলে যেতে হয় এক যায়গা থেকে আরেক যায়গায়।  ধূমপান নিষেধ। “স্মোকিং স্ট্রিকলি প্রোহিবিটেড” বলে চারিদিকে লেখা। মাঝে মধ্যে ছোট ছোট গার্ডেন, লন, সুন্দর ডেকোরেটিভ অর্কিডস। একটা পরিচ্ছন্ন ইকো-ফ্রেন্ডলি মন মুগ্ধকর পরিবেশ। না দেখলে বোঝা যায় না।

যাওয়ার আগে ওরা দুজনে তীরুপতি তীরুমালা ভেঙ্কেটেশ্বরম্ মন্দির দর্শনে যায়। বেঙ্গালুরু থেকে রাত ৯ টার সময় অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিস্টের লাক্সারী ভল্ভো এ.সি. বাস ছাড়ে, পৌঁছোয় রাত ৩ টের সময় তীরুপতিতে। ওখানেই গেস্ট হাউসের ব্যবস্থা থাকে গরম জলে স্নানের জন্য। স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে  তীরুমালা পাহাড়ের ওপর যাত্রা । তীরুপতি থেকে তীরুমালা ২২ কিলোমিটার অন্য বাসে যেতে হয়। ভোরবেলার দর্শন ভি.আই.পিদের জন্য খুব কম সময় লাগে এবং লাইনও ছোট থাকে।  বেশ ঠাণ্ডা লাগে ওই সময় তীরুমালা পাহাড়ের ওপরটা। প্রায় এক ঘণ্টা লাগে লাইনে আস্তে আস্তে আঁকা বাঁকা পথে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। তারপর বালাজীর দর্শন অপূর্ব। চাপ চাপ সোনা । কষ্টি পাথরের মূর্তি । সোনার মুকুট, সোনার হার ইত্যাদি। ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে দর্শন সারতে হয় নাহলে, “গোবিন্দা গোবিন্দা” বলে ঠ্যালা মারবে পেছন থেকে টেম্পল পুলিশ। এরপর তীরুপতির  বিখ্যাত আসল ঘিয়ের লাড্ডু জনা পিছু দুটো মন্দির প্রশাসন দেয়। কেউ ইচ্ছে করলে আরও লাড্ডু কিনতে পারেন কাউন্টার থেকে । এরপর পদ্মাবতীর দর্শন । পদ্মাবতী স্বয়ং মা লক্ষ্মী ঠাকুর। অপূর্ব লাগে ওখানে দর্শনের সময় । তীরুপতি বালাজীর  সারা মন্দির সোনাতে মোড়া। মন্দিরের চূড়া, গাত্র, থাম ইত্যাদি । দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের ভাস্কর্য সুন্দর।চূড়াতে তিনটে সোনার কলস থাকে এবং ওপরটা ফ্লাট একটা ট্রেপিজিয়ামের মত।

দর্শন সেরে  সুদীপ্তা ফিরে আসে বেঙ্গালুরুতে। সুদীপ্ত যায় মা আর ছোট ভাইকে দেখতে মামার বাড়ি । বাবার দেহান্তের পর মা’কে মামার বাড়িতে থাকতে হয় । মা, যা টাকা পেয়েছিলেন তার ফিক্সড  ডিপোজিটের শুধেতেই মা চলেন । সুদীপ্ত ভাইয়ের সমস্ত পড়ার খরচ দেয় হস্টেলে থাকার জন্য । যাওয়ার আগে মামা মামির আশীর্বাদ তা ছাড়া দক্ষিণেশ্বরে মা কালীর দর্শন, বেলুড়ে  রামকৃষ্ণ  পরমহংস ,স্বামীজীর দর্শন সেরে সারদা আশ্রমে মায়ের সঙ্গে যায় সারদা মায়ের আশীর্বাদের জন্য । সব দুদিনের মধ্যে সেরে মায়ের আশীর্বাদ  নিয়ে ফিরে আসে বেঙ্গালুরু। ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হল না  সুদীপ্তর।  বড় আফসোস থেকে গেল।  ভাই ফোনে উইশ করল। বাড়ি থেকে যাওয়ার সময়  মায়ের চোখ ছল ছল করে। মাকে সুদীপ্তার কথা বলে, কিন্তু মা কিছুই বলেন না। সেটাই সুদীপ্তর মনে ধাক্কা লাগে। বোঝে মা খুশি হন নি এতে। সুদীপ্ত ভারাক্রান্ত মনে শুধু বাবাকে মনে করে। আজ বাবা থাকলে হয়ত খুশি হতেন তার ছেলে আমেরিকা যাচ্ছে কোম্পানির প্রজেক্টের কাজে। তিন বছরের জন্য ভিসা পায় সুদীপ্ত-সুদীপ্তা। সুদীপ্তা এর আগে মা বাবার সঙ্গে পাটেয়া গিয়েছে। ওর কিছুটা অভিজ্ঞতা আছে কিন্তু সুদীপ্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ওর জন্য সব নতুন। মনটাও ভালো নেই দেশ ছেড়ে যেতে।

ফিরে কাজে জয়েন করে প্রজেক্টের সব কাজ বুঝে নেয় পি.এম. এর কাছ থেকে। ওখানে গিয়ে কারা রিসিভ করবে কোথায় থাকবে ইত্যাদি... সুদীপ্তার এক্সাইডমেন্টের সীমা নেই। ফোনে বাবা মাকে তীরুপতি বালাজীর দর্শনের গল্প, ভিসা ইন্টারভিউয়ের গল্প...ইত্যাদি...ইত্যাদি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করে ।

যন্ত্রমানব@ভালবাসা.কম 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

তৃতীয় পর্ব

সুদীপ্তকে আজ যেন খুব চার্মিং লাগছিল ঠিক সুদীপ্তাকে ও তাই । ওরা নিজেদের মধ্যে কিছু বলছিল যার দিকে কারুর নজর ছিলনা । সকলে মসগুল নিজেদের পার্টনার কে নিয়ে।

এরমধ্যে সুদীপ্তর  হটাত কি হল কে যানে  ,  সুদীপ্তার উদ্দেশ্যে বলে ঃ

 আমি এটা ঠিক করলাম না !  আমার মা জানলে খুব  দুঃখ পাবেন। ঝোঁকের মাথায়  তোমাকে কিস্ কোরতে গিয়ে সব গণ্ডগোল হয়ে গেল । আমি কি জবাব দেব মা’কে, ভাইকে? ওরা আমাকে খুব ভরসা  করে । এটা মোটেই ঠিক হলনা   অনুশোচনায় ভেঙ্গে পডে সুদীপ্ত । আই মাস্ট লিভ দিস প্লেস । দিস ইজ নট ফর মি !!!

সুদীপ্তাঃ- তুমি একা নও সুদীপ্ত । তোমার ভাই , আমার ও ভাই । তুমি কি করে ভুলে গেলে আমি কিছু না বুঝে আমার ডিসিশন নিয়েছি বলে ? আমি সব জানি ম্যান । কিছু ভেবনা  । আমি বাবা মাকে ডিটেল সব কথা বলেছি। বাবা আমাকে অনেক স্বাধীনতা দিয়েছেন । মা বাবা নিজেরাই মুসুরিতে আই.এ.এস ট্রেনিং ইন্সটিট্যুটে গলা জড়া জড়ি করে প্রেম করেন ।  তার পর বিয়ে সেরে ফেলেন । ওনাদের  বাবা মা’কে না জানিয়ে ।  পরে অবশ্য দু পক্ষ রাজি হয়ে বিয়ের আয়োজন করেন। তুমি জানো , আমার মা বাবা জাত ফাত মানেন না ,এমনকি ধর্ম ফর্ম ও মানেন না। ওঁরা একটাই জাত জানেন ‘মানুষ’ !  ওনারা আই এ এস অফিসার  ! ওটাই ওঁদের গীতা,বাইবেল,গুরু-গ্রন্থ আর কোরান সব এক  !!  দুজনে দু জায়গায় সাব কালেক্টার ছিলেন । দেখা করার জন্য  শনিবার রাতে পালাতেন হেড কোয়ার্টার ছেডে । অবশ্য ওনাদের কালেক্টার জানতেন সে কথা। বাবা আমাকে সব বলেছেন। খুব মজার দিন সব ওনাদের কেটেছে । ঠিক আছে তুমি তোমার মা’কে জিজ্ঞাসা কর।  আমার কোন আপত্তি নেই। আমি কনফিডেন্ট্ উনি মত দেবেন। আমিত কিছু ভুল করিনি । পারলে না হয় পা জডিয়ে বলবো, “মা, মাগো আপনার কচি ছেলেটাকে নুন লঙ্কা মাখিয়ে খাবো” বলে হেঁসে ফেললো  ।

সুদিপ্ত ঃ- কি বলছো যা’ তা !  তোমার কি মাথা খারাপ হল?  মা কে আমি চিনি । মা রাজি হবেন না । আমার ভাই কি ভাববে বলত ? এতো তাড়া কিসের ? একটু সবুর কর । আমি তো পালাচ্ছিনা !

সুদীপ্তা ঃ- পালাতে কে দিচ্ছে মসাই । তবে আমার তাড়া আছে । আমার পেছনে শকুনের চোখ আছে । তুমি বুঝবেনা সে কথা । বলার ও প্রয়োজন মনে করি না ।

সুদিপ্ত ঃ- সে আবার কি কথা ?  যদি বলতে না চাও বোলনা । আই ডোন্ট মাইন্ড্ ।  

সুদীপ্তা ঃ- তুমি আমাদের পি .এম্.কে দেখেছো ! উনি কিরকম ছুঁক ছুঁক করেন  আমাকে দেখে ! যেন গিলে খাবেন !! বিচ্ছিরি !!! ইরেসিসস্টিবিল ।

সুদিপ্ত ঃ- ওটা তোমার ভুল ধারনা । নাও হতে পারে । 

ঊনি তোমাকে তাড়া  হুড়ো  করে ইউ.এস .এ যাওয়ার রেকমেন্ড করেছেন আমার থেকে তোমাকে দুরে সরানোর জন্য । তুমি জান কিছু ! মাথায় ঢ়ুকলো  কিছু !!

সুদিপ্ত ঃ- মোটেই নয় । ওটা তোমার ভুল ধারনা । আমি প্রজেক্ট্ এর জন্য বেশি সময় দি । সকলে যানে  পি.এম. , এস. পি.এম. এবং অন্য সকলে । সেই কারনে আমাকে পাঠাচ্ছেন ওনারা । এতে আশ্চর্য  হওয়ার কি আছে ?

সুদীপ্তাঃ- আমি অস্বিকার করছিনা তবে আমার কথাটা সত্যি কিনা,  প্রিয়ঙ্কা বলবে তোমাকে । ওই আমাকে বলে সে সব কথা ।

সুদীপ্তঃ- দেখ এ সব বাজে মেয়েলি কথাতে আমি মোটেই  ইন্তারেস্টেড নই । বকবাস্ । জাস্ট্ গসিপ্ ।

সুদীপ্তাঃ- ও কে । কাল ভিসার জন্য রেডি হও । আমাদের দুজনকে নিউ জার্শি তে পাঠাচ্ছে ইনফি । ইন ফেক্ট্ আমি বাপিকে আসতে  বলেছি সঙ্গে মা থাকছেন । তোমাকে ওনারা দেখতে আসছেন কাল। মানা কোরনা কিন্তু !!

মন্ত্র মুগ্ধের মতন সুদীপ্ত বলে ফেললো আচ্ছা।

প্রমিস্

প্রমিস্


সুদীপ্তাঃ- দ্যাটস্ লাইক এ গুড বয় , মাই ডার্লিং বলে  হাগ্ করে সুদীপ্তর গলা জডিয়ে কিস্ করে।

সুদীপ্ত চোখ বন্দ করে নারীর সান্নিধ্য উপভোগ করছিল । স্বয়ং ভগবান ও বোধহয় এর থেকে নিস্তার পান নি। সুদীপ্ত তো ছেলে মানুষ । কিন্তু আবার মাথাতে চাড়া  দেয় মা এবং ভাইয়ের প্রতি দায়িত্ববোধ , নিজের কেরিয়ার , ইত্যাদি ভেবে সুদীপ্তার কাছথেকে ছাড়াপেতে চায়। ক্ষনিকের আবেগে নিজেকে এরকম ভাবে বিলিয়ে দিতে পারেনা। বিবেক দংশনে নিজেকে সামলানোর চেস্টা করে।  পরক্ষনে বলে আজ আমাকে যেতে হবে , বাই ...।

সুদীপ্তা কিছু বোঝার আগেই সুদীপ্ত হাঁটা দেয় ইনফোসিটির হেরিটেজ্ বিল্ডিং এ ।  ওখানে ইনফীর  চেয়ারম্যান নারায়ানাস্বামী, নন্দন নীল্কার্নী ,পাই  ইত্যাদী টপ্ বস্ রা বসেন । তবে এঁদেরকাছ থেকে  একটা বড় জিনিস সেখার আছে এঁনারা কেউ নিজেদের বস্ বলে  বলেন না বরং কলিগ্ বলেন। সুদীপ্ত ওখান হয়ে  বিল্ডিং নাম্বার ৪২ তে নিজের অফিসে চলে যায়।

যন্ত্রমানব@ভালবাসা.কম 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

দ্বিতীয় পর্ব


সুদীপ্তা :  “এটা কিরকম কথা হল ?” আমি তো সে কথা বলিনি যে, তুমি তোমার মা'কে দুঃখ দাও ! আবার এটাও ঠিক নয়  বান্ধবীর জন্মদিনের পার্টিতে না খেয়ে গিফট দিয়ে চলে যাওয়া । এটা কিরকম ভদ্রতা ?

সুদীপ্ত : আমি দুঃখিত কিন্তু নিরুপায়। আমি এখন শয়নে স্বপনে একটাই কথা ভাবি; কি করে অনসাইটে যাব? সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমার টাকার প্রয়োজন তাও সৎ উপায়ে উপার্জন করে। আমাকে ভুল বুঝ না।

সুদীপ্তা : সে তো আমিও ভাবি, তুমি একা নও। আমার কি ইচ্ছে করে না প্রোজেক্টের কাজে ইউ.এস.এ যাই! আমরা হয়তো একসঙ্গেই যেতে পারি। পি.এম. একা তোমাকে নয় আমাকেও রেকমেন্ড করেছেন। সে খেয়াল রাখো মিস্টার সুদীপ্ত রায় !

সুদীপ্ত : আমি জানি। কংগ্র্যাচুলেসন মিস সুদীপ্তা বোস। হেঁসে ফেলে দুজনে ।

সুদীপ্তা : আমি কিন্তু বাবা মাকে তোমার কথা বলেছি ।  

সুদীপ্ত : মানে !! কি কথা ?  

সুদীপ্তা : মানে আবার কি? আমি তোমাকে পছন্দ করি এর বেশি কিছু নয়। বুঝলে !  

সুদীপ্ত : কিন্তু তুমি আমার মতামত নাও নি ! আমার মা, আমার ভাই এদের ছেড়ে আমি কিছুই করতে পারি না, আমরা একই সুতোয় বাঁধা। ওদের অমতে আমি ....... অসম্ভব !!!

সুদীপ্তা : এই তো তোমার মতামত  নিলাম, আজকে,এখন ! আমি তোমাকে প্রপোস্ করছি! যেটা কিনা ছেলেরা করে সেটা আমি করছি বেহায়ার মত !!  ইয়েস্ আই এডমায়ার ইউ। কেঁদে ফেললো সুদীপ্তা। তুমি ভালো ছেলে বলে তোমার খুব গর্ব না ? কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি ...আই! আই লাভ্ ইউ !! ফর হেভেন সেক্ ডোন্ট্ লিভ মি। তুমি আমাকে অনেক অপমান করেছ! আর না !! এই বলে সুদীপ্তা  কেঁদে ফেলল ।

সুদীপ্তার মাথায় হাত দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে সুদীপ্ত । কুল ডাউন বেবি কুল ডাউন। এতো কনফিডেন্স ভালো না। আমার মা' কে না জিজ্ঞাসা করে আমি এ বিষয় কিছুই বলতে পারব না। আমার এখন কেরিয়ার আছে। কিছুই হতে পারলাম না। বাবার অনেক আশা ছিল আমি ডক্টরেট করি। বাবা গত হয়েছেন মোটে এক বছর, তার ধকল এখনও মা সামলে  উঠতে পারেননি। তুমি যান আমার ভাই এখন সবে ঢুকল বি.টেক্.এ। ও আই.আই.টি., খড়গপুরে অ্যাডিমশন নিল। আরও ভালো রেসাল্ট্ করতে পারতো। আমি ওকে ভালো  করে গাইড করতে পারিনি । জানি না কি করবে ভবিষ্যতে! ওর পড়াশুনোর জন্য আমাকে ফিনান্স্ করতে হবে। আমার ওপর সারা সংসারের সব দায়িত্ব। আমার এখন প্রেম করা সাজে না। আমাকে বুঝতে চেষ্টা কর।

   

সুদীপ্তা : আমি সব জেনেই তোমাকে ভালবেসেছি। এখন তো বলছি না! আর কি বললে তুমি!, “বেবি!” আমি “বেবি!!” তুমি নিজেকে কি মনে কর ? এ্যাঁ !! দেখাচ্ছি তোমার মজা। এই বলে চট করে জড়িয়ে ধরে চকাস করে চুমু খায় সুদীপ্তর ঠোঁটে। আমি তোমার কাছ থেকে এইটুকু কি আশা করি না, “আই লাভ্ ইউ টু সুদীপ্তা” শুনতে!! ছেলেদের চোখ দেখলেই মেয়েরা বুঝতে পারে মোসাই। তুমি জতোই আমাকে শুরু থেকে এভোয়েড্ কর আমি জানি তুমি আমাকেই মনে মনে পছন্দ কর। আই এম মাচ কনফিডেন্ট্ অ্যাবাউট দ্যাট্। তাই আজ সারপ্রাইজ্ দিলাম। কিরম লাগলো ?বলবে না ?

 

সুদীপ্ত :  এতো কনফিডেন্স ভালো না । তবে হ্যাঁ,  যদি কোন দিন বিয়ে করি তবে আই প্রমিস্ , “I Sudipto Ray do herby testify, and give public notice of the covenant of marriage which we have entered into with each other in the presence of God and witnesses: based solely on the authority of God as found in His Holy word, The Bible  in the name of GOD accept Mis Sudipta Bose as my wife" এই বলে সুদীপ্ত, সুদীপ্তাকে জড়িয়ে ধরে  গভির ভাবে চুমু খায়। সকলের হাত তালিতে ওদের ঘোর ভাঙ্গে ।

সুদীপ্তা লজ্জায় মাথা নিচু করে। অাদিত্য,সুকন্যা,প্রিয়াঙ্কা, গুলশন,আবীর,ভেঙ্কাটেশ্ সকলে খুশিতে গান গাইতে আরম্ভ করে। ৫ পএন্ট্ স্পিকার লাগিয়ে ডিজিটাল হোম থিয়েটারে গান বাজিয়ে নাচ শুরু হয় অডিটোরিয়ামে ওদের মাঝখানে রেখে। এরপর সুদীপ্ত-সুদীপ্তা দুজনেই নাচতে শুরু করে গানের তালে তালে। আদিত্য-সুকন্যা সালসা ড্যান্স্ আরম্ভ করে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরে প্রিয়ঙ্কা-গুলশন ব্রাজিলিয়ান সাম্বা ড্যান্স্ দেখায়। সকলে সারাক্ষণ এনজয় করে ।

সেদিন ছিল খৃষ্টমাস, তাই পার্টি হয় রাত ৯.০০ টা তে শেষ হয় ১২ টাতে। আজ সুদীপ্ত-সুদীপ্তা দুজনে হোষ্ট আর প্রজেক্টের সব কোলিগ্রা খোশ্ মেজাজে মুর্গা মসাল্লাম্,কোপ্তা,বাটার তন্দুর,প্রন্ পকোড়া,বাটার স্কচ্ আইস্ ক্রিম্ পরে কিছু হট্ ড্রিঙ্ক নিয়ে একটু বেসামাল হয়। ওটা আই.টি. প্রফেসেন চলে। কিছু বলার নেই।  মেনে নিতেই হয় ।

ক্রমশ

“আমার দোসর যে জন ওগো তারে কে জানে

একতারা তার দেয় কি সাড়া আমার গানে কে জানে..."

এই আর্তির মধ্যেই ব্যক্তি জীবনের পথ চলা! স্বপ্ন সাধ সাধনায়, ভাব ভাবনা ভালোবাসাকে বিশেষ একজনের সাথে মিলিয়ে নিতে! কারণ কালের মন্দিরায় জীবনের বোল ফোটাতে পরস্পরের সঙ্গ লাগে! তখন সেই সঙ্গতে মন বলে "সব পথ এসে মিলে গেল শেষে তোমারই দুখানি নয়নে-" এই যে পরস্পরের মধ্যে জীবনের পথ খুঁজে পাওয়া,পরস্পরের মধ্যে বেঁচে ওঠা, পরস্পরের মধ্যে সত্য হওয়া; এখানেই প্রেমের সার্থকতা! এখানেই মানুষ চলেছে তার দোসরের খোঁজে, "কবে আমি বাহির হলেম তোমারই গান গেয়ে"! আসলে দোসর খুঁজে পাওয়ার সাধনায় দোসর হয়ে উঠতে পারার শক্তিটাই গুরুত্বপূর্ণ! সেখানেই মুক্তি!”

যন্ত্রমানব@ভালবাসা.কম 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

আমার গল্পের নায়ক এক  মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে “সুদীপ্ত”। মেধাবী ছাত্র। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। নায়িকা “সুদীপ্তা” সে’ও কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এবং মেধাবী, বাবা মা আই.এ.এস অফিসার। অভাব কি জানে না। দুজনেই ইনফোসিস, বেঙ্গালুরুতে চাকরীতে সবে ঢুকেছে। এরপর...

 

সুদীপ্ত বি.টেক. (কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং) এরপর ইনফোসিস্, বেঙ্গালুরুতে সফট্ওয়ের ইঞ্জিনিয়ার এর চাকরিতে জয়েন করে। এখানে বলে রাখা ভালো সুদীপ্ত, আই.আই.টি ,মুম্বাই থেকে ফার্স্ট ক্লাস ৯০% মার্কস পেয়ে  পাস করার পর চাকরীতে জয়েন করতে বাধ্য হয়। অন্য কোম্পানিতে ভালো চাকরি পেয়েছিল কিন্তু জয়েন করেনি। ওর বাবা অনেক কম বয়েসে  হার্ট অ্যাটাকে হটাত মারা যান। ছোটভাইয়ের পড়ার দায়িত্ব  সামলানোর জন্য ও বাধ্য হয় চাকরি করতে। বাড়ীতে মা এবং ছোটভাই ছাড়া আর কেউ নেই । অনেক ইচ্ছে ছিল এম.টেক্. এর পর ডক্টরেট করবে বলে, কারণ ওর টিচিং জব পছন্দ। সে ইচ্ছেটা ওকে সর্বদা পড়াশোনার দিকে টানত। আড্ডা দিতে মোটেই ভালোবাসে না সুদীপ্ত। ওর প্রজেক্টের প্রোজেক্ট্ ম্যানেজার (পি.এম.)ওকে খুব স্নেহ করেন । ওর বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার সঙ্গে ও কাজও খুব নিখুঁত ভাবে করে । সুদীপ্তা ওই একি প্রোজেক্টে, ওর সঙ্গে জয়েন করে একই দিনে। মাইসুরে তিন মাসের ট্রেনিং সেরে দুজনে বেঙ্গালুরুতে জয়েন করে । তাই সুদীপ্তার সঙ্গে আলাপ প্রায় তিন  মাসের ওপর । সুদীপ্তর চেহারার আকর্ষণের সঙ্গে ওর প্রখর বুদ্ধি সহজেই নারীর মন আকর্ষণ করে। এটাই স্বাভাবিক। সুদীপ্তা এন.আই.টি., রাউরকেল্লা থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে  বি.টেক্.ফার্স্ট ক্লাস  কাজেই ও খুব ফেলনা নয়। দেখতে খুব সুন্দরী। বাবা মা দুজনেই আই.এ.এস অফিসার তাই টাকার অভাব নেই। তবে আই.আই.টি. পাস আউটদের ইনফোসিসে বেশি টাকা মাইনে দেয় । বেঙ্গালুরুর ইনফোসিসের নিয়ম অনুযায়ী মেয়েরা সন্ধ্যে ছটার পর অফিসে  থাকা মানা ছিল। এসব আমি ২০০৫ সালের কথা  বলছি ।

সুদীপ্ত কাজের মধ্যে মসগুল থেকে এক রকমের যন্ত্রমানবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। অফিস আর কাজ ছাড়া কিছুই জানত না। প্রায় দিন বেলা ১.৩০ টার সময় সুদীপ্তা ক্যান্টিনে লাঞ্চ খেত সুদীপ্তর সঙ্গে দেখা করে। সুদীপ্তার ওখানে গল্প করার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই কারণ সুদীপ্ত  বিশেষ পাত্তা দিত না  ওসব ব্যাপারে। সর্বদা কাজে মসগুল থাকতো  কি করে অন্ সাইটে যাবে। তারই  চিন্তায় থাকত। একদিনের কথা, সুদীপ্তা ওর নিজের  জন্মদিন সেলিব্রেট্ করার জন্য সব বন্ধু-বান্ধবদের ডেকেছিল পার্টিতে। সুদীপ্তকেও ডেকেছিল। 

কিন্তু ফর্মালিটির জন্য পার্টিতে গিয়ে সুদীপ্ত, সুদীপ্তাকে  গিফট দিয়ে চলে যায়। এটা সুদীপ্তার  মনে লাগে । এমনিতেই  সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা পার্টি, আড্ডা, শুক্রবার রাতে এবং শনিবারদিন সাধারনতঃ করে থাকে। ওদের মতে স্যাটারডে নাইট মাস্ট বি ডিলাইট। সুদীপ্তা মনে দুঃখ পেলেও প্রকাশ করেনি কারণ ও সুদীপ্তকে মনে মনে ভালবাসত কিন্তু কখনো প্রকাশ করেনি।

এই অপ্রকাশিত প্রেম এবং বলতে গেলে এক তরফা প্রেম যেন অসহ্য লাগে সুদীপ্তার ।

একদিন সুদীপ্তকে বলে বসে, “তুমি আমাকে অ্যাভয়েড করছ কেন ? আমি লাঞ্চের সময় ডাকলে তুমি এসে খেয়ে বিল মিটিয়ে চলে যাও। কোনও কথা কি তোমার মুখে আসে না? আমি তোমার প্রজেক্টে কাজ করছি ! তোমার সঙ্গে একসঙ্গে ট্রেনিং নিলাম ।  অন্য কলিগরা ত এরকম নয় ! তুমি এরকম ডিফারেন্ট এটিচ্যুড দেখাও কেন?” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে সুদীপ্তর  দিকে তাকাল উত্তরের অপেক্ষায় ।  

সুদীপ্ত বলে, “আমাকে ভুল বুঝো না । আমার মাথায় অনেক চিন্তা । আমার মা বিধবা, ভাইয়ের পড়া আমার ওপর নির্ভর করছে । এই পরিপ্রেক্ষিতে আমার ওপর সংসারের সব দায়িত্ব  ও তুমি বুঝবে না !” তুমি মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মেছ। তুমি কি করে জানবে নিম্নমধ্যবিত্তের জ্বালা যন্ত্রণা ? তোমার বাবা মা দুজনেই  আই এ এস অফিসার ! কি অভাব দেখেছ জীবনে? বাবা অসময়ে চলে গেলেন । মা আমার ওপর ভরসা  করে আছেন । আমি আমার ছোটভাইয়ের দায়িত্ব নেব বলে। আমি আমার মা'কে প্রতারণা করতে পারি না । তিনি এমনিতেই দুঃখ পেয়েছেন আর নতুন করে দুঃখ দিতে পারি না।

ক্রমশ 

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

শেষ পর্ব


প্রতিদিনের মত আজও বেরোনোর সময় দুমিনিটের টানাটানি হয়ে গেল নন্দিতার। গেট থেকে বেরিয়ে, লাফিয়ে উঠে বসল রিক্সায়। রিক্সাওলা বাঙ্গালী। ওর পুজো কেমন কেটেছে, পরিবারের লোকজন কেমন আছে, সেসব খবর নিতে নিতেই পৌঁছে গেল বাসস্টপে। কাল রাতে ভাল করে ঘুম হয় নি নন্দিতার। দুশ্চিন্তা ছিল যদি ভোরবেলা ঘুম না ভাঙ্গে। কদিনেই অভ্যাস বিগড়ে গিয়েছে। যে কদিন বোলপুরে ছিল, যখন তখন ঘুমিয়েছে। মা বলেছে, ‘বিশ্বাস করা মুশকিল যে তুই চাকরি করিস বা ঘর সংসার করিস।’ 

কলেজের বাসে উঠে একটু গুছিয়ে বসল নন্দিতা। ঘুম না হবার রেশ লেগে আছে চোখের পাতায়। হাল্কা হিমেল হাওয়া এসে যেন ভেতরটা জুড়িয়ে দিল। রাস্তার বিভাজিকার মাঝখানের গাছগুলো দেখতে দেখতে ভাবল, আমাদের ওখানকার রাস্তাগুলো কবে এমন সুন্দর হয়ে উঠবে! সেবারে মা এসে রাস্তার মাঝে ফুলের টব দেখে বলেছিল, ‘বোলপুর হলে ফুলগুলো তো থাকতই না। টবগুলো পর্যন্ত ছিঁচকে চোরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিত।’ 

সব মিলিয়ে সাত দিন। এই ছিল নন্দিতার দেবীপক্ষ। যেতে আর আসতেই কেটে গেল তিন দিন। বাকি চার দিন মিলন উৎসব। দারুন গতিময় সেই বৈচিত্রময় মিলন। বাবা মা, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব নিয়ে জীবনের যে রাস্তাটুকু পেরিয়ে এসেছে তার যতটা পেরেছে ছুঁয়ে এসেছে নন্দিতা। 

একটা বয়স পর্যন্ত নন্দিতা আর কথাকলি ছিল অভিন্নহৃদয় বন্ধু। তারপর দুজনের জীবনের গতিপথ দুটো আলাদা খাতে বয়েছে। কথাকলির যখন বিয়ে হল, তখন নন্দিতা কলেজে। কথাকলির যখন মেয়ে হল নন্দিতা তখন উচ্চ শিক্ষার কথা ভাবছে। কলির মেয়ে যখন স্কুল যেতে শুরু করল নন্দিতা তখন গবেষণায়। ততদিনে নন্দিতার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে রেশমির সঙ্গে। নন্দিতার রুমমেট। দুজনের খুব মিল, কথাবার্তায়, চিন্তাভাবনায়, পছন্দে রুচিতে। তারপর একসময় ওরা দুজন হয়ে গেল ‘হরিহর আত্মা’। রেশমি এখন কলকাতায়। কলকাতার এত কাছে এসে রেশমির কাছে যাবে না, নন্দিতা ভাবতেই পারে না। ফেরার আগেরদিন রাতটুকু রেশমির কাছে ছিল নন্দিতা। 

চব্বিশ নম্বর জাতীয় সড়ক থেকে বাস বাঁক নিল জিটি রোডে। লালকুয়া পেরোতেই একটার পর একটা গ্রাম। ছাপড়োলা, বাদলপুর, ধুম-মানিকপুর, দাদরি পেরিয়ে চিটেরা। চিটেরাতে রাস্তায় জট পাকিয়ে আছে। এদিকে ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে। পাতলা কুয়াশার চাদর চারদিকে। বাস দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার বাম দিকে পর পর কয়েকঘর নতুন সংসার। সপ্তাহ খানেক আগে ছিল কি এরা! নন্দিতা মনে করতে পারল না। রাস্তার ধারে এরকম হঠাৎ এসে পড়া সংসার ছোটবেলায় নিজের গ্রামেও দেখছে। হতদরিদ্র মানুষগুলো আসত, তাবু ফেলত। ছেলেরা পাখি মারত, মেয়েরা হাবু গাইত। চাল, ডাল, পয়সা যা পেত তাতেই চলত ওদের জীবন। বাচ্চা জন্মাত আর বুড়োমানুষ মরত। সবই ওই ছোট্ট তাবুর ভেতরে। এদের সেই হতশ্রী ভাবটা নেই। চারদিকে চারটে ধাতব খুঁটি পুঁতে তার উপর ছাউনি ফেলেছে। ভেতরে চারপাই। 

একটা পরিবারে চোখ আটকে গেল নন্দিতার। বছর চারেকের একটি মেয়ে ধুলো নিয়ে খেলছে। সামনে পাশাপাশি দুটো উনুনে মোটামোটা ঘুঁটে গুঁজে দিচ্ছে ওই মেয়েটার মা। কোলে একটি ছোট শিশু। এক বোতল দুধ ভরে ওই ধুলো ঘাঁটা মেয়েটার কোলে বাচ্চাটাকে ধরিয়ে দিল। খুব বিরক্তির সঙ্গে বাচ্চা কোলে মেয়েটি একটি চারপায়ে গিয়ে বসল। বৌটি স্বামীকে ঘটি বাড়িয়ে দিল। বোধ হয় গরম জল। মুখ ধুয়ে টুলে বসল লোকটা। গায়ে আলোয়ান। পাশে রাখা গড়গড়াতে গুড়ুক গুড়ুক টান দিতে শুরু করল। চা ছাঁকল বৌটি। মেয়েটি বাচ্চাটাকে শুইয়ে দিয়ে চায়ের গেলাস তুলে নিল। নিল ওই লোকটাও। সামনের জ্যামটা কেটে গিয়েছে কখন। নন্দিতার খেয়াল ছিল না। মানসচক্ষে ও পরপর দৃশ্যগুলো দেখতে পাচ্ছিল। এরপর বৌটা হাপর টানতে শুরু করবে। বরটা লোহা পিটিয়ে পিটিয়ে ক্লান্ত হয়ে রুটি আর আঁচার খেয়ে টানা ঘুম লাগাবে। শিশুটি তার দরকার মত ঘুমোয় আবার সময় হলেই উঠে পড়ে। বৌটার আর বিশ্রাম নেওয়া হয় না। ওর কি বিশ্রাম বলে কিছু আছে? আজকের বানানো ছুরি, কাটারি, তাওয়া বিকেল বেলার হাটে ওকে বিক্রি করতে যেতে হবে। তারপর একটা একটা করে পয়সা জমিয়ে রাখবে। সামনেই দীপাবলি। উৎসব। 

বাস একটা ঝাঁকুনি দিয়ে কলেজের গেটে ঢুকল। নন্দিতার ঘোর কেটে গেল। এতক্ষণ ওই বৌটার মুখই বা ভাবছিল কেন! ওরা কেউ কি এসবের থেকে আলাদা? দৃশ্যগুলো আলাদা হলেও আসলে যেন সব এক। জীবনে উৎসবগুলো আছে বলেই হয়ত বাকি দিনগুলোর সংগ্রামের রসদ পাওয়া যায়! উৎসবের স্মৃতির জাবর কাটতে কাটতে কেটে যায় কয়েকটা মাস। তারপর বাকি কমাস কাটে আগামী উৎসবের প্রস্তুতি নিতে। 

নন্দিতা টাইম টেবিল দেখল। থার্ড পিরিয়ডে ক্লাস। ‘স্বর্গ সুখের শেষে আবার জাগতিক কাজ!’ একথা ভেবে নন্দিতার ভেতরে যে হতাশা জেগেছিল তা যেন হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল। ধীরে ধীরে ওর ‘আদুরে মেয়ে, আদুরে মেয়ে’ ভাবটাও মিলিয়ে গেল ওর নিজের ভেতরেই। 

ল্যাপটপ খুলে প্রেজেন্টেশনটায় চোখ বুলিয়ে নিল একবার। সব মনে পড়ে গেল। ছাত্রীবেলায় যেমন পরীক্ষার আগে মনে হত কিছু পারব না, কিন্তু লিখতে গিয়ে সব মনে পড়ে যেত। অনেকটা সেই রকম। ফাইলটা কপি করল পেনড্রাইভে। তারপর পেনড্রাইভ আর অ্যাটেন্ডেন্স রেজিস্টার হাতে নিয়ে উঠে পড়ল নন্দিতা। 

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-১৫

‘‘করবী ভবন, মেনকা সদন’ বাড়ির দুটো নাম কেন দিয়েছ জেঠু?’ রমেন জেঠুর দরজার সামনে উপর দিকে তাকিয়ে বাড়ির নামটা পড়ে নন্দিতা জিজ্ঞেস করল।

রমেন জ্যাঠার বৌমা ঝুমা এক থালা ভর্তি নাড়ু এনে নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘করবী হলেন, ছোট ঠাকুমা। ওনার নিজের ছেলেমেয়ে ছিল না, তাই তোমার জ্যাঠাকে খুব ভালবাসতেন। ছোটঠাকুমার ভাবনা ছিল উনি মারা যেতে আর কেউ ওনাকে মনে রাখবে না। তাই বাবা বাড়ি করেই ওনার নামে নাম দিয়েছে।’

‘আর মেনকা সদন?’

জেঠিমা বললেন, ‘ছোট জায়ের প্রতি আবার আমার শাশুড়ির খুব হিংসা ছিল। উনি কেমন গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ফুলটুসি হয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন আর আমার শাশুড়ি সেখানে আট আটটা ছেলেমেয়েকে নিয়ে সারাজীবন ল্যাজেগোবরে হলেন। এদিকে বড় ছেলে আবার কাকিমা ঘেঁষা। তাই আমি তোর জ্যাঠাকে বল্লাম, সগ্যে বসে এসব তোমার মা দেখলে আর রক্ষে নেই। কাকিমা মরেও শান্তি পাবে না। তাই এই ব্যবস্থা।’

বাস থেকে নেমে নন্দিতা রাস্তার দুপাশে শুভেচ্ছা বিলোতে বিলোতে এগোচ্ছিল। ‘কবে এলি?’ ‘কেমন আছিস?’ ‘কোথায় আছিস?’ এসব প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছিল একে একে। রমেন জ্যাঠা দেখতে পেয়ে টেনে নিয়ে গিয়ে তাঁর বাড়িতেই তুললেন নন্দিতাকে। ওনার নাতি এবারে উচ্চমাধ্যমিক দেবে। এরপর নাতির কি পড়া উচিৎ সে নিয়ে তক্ষুনি নন্দিতার সঙ্গে আলোচনা করতে চান উনি। এদিকে বাস থেকে নেমেই আরও এক সেট মাসি, দাদা, দিদি পেয়ে দুষ্টু এই ফাঁকে উধাও। উধাও অশোকবাবুও। 

নন্দিতা বলল, ‘পাড়াটাকে তো আর চেনাই যায় না। মাটির বাড়ি প্রায় নেই বললেই চলে। সবার পাকা বাড়ি হয়েছে। গ্রামের তাহলে অনেক উন্নতি হয়েছে, বল জেঠু?’ 

জেঠিমা মুখ বেঁকিয়ে বললেন, ‘উন্নতি না ছাই, পয়সা ফেললেও আর কাজের লোক পাওয়া যায় না।’

রমেন জেঠুর নাতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে করতে নন্দিতা ঘড়ি দেখছিল বারে বারে। বাইরে গমগমে গলার আওয়াজ শুনে রমেন জ্যাঠা বললেন, ‘যা, বড়কাকু এবার হাঁক পাড়বেন।’ নন্দিতা গলাটা চিনতে পারল। দাদুর গলা এখনও একই রকম গমগমে। 

বিজয়ার প্রণাম পর্ব শেষ করেই নন্দিতা চটপট দুটো ফোন করল। মল্লিকা আর কথাকলি। দুজনই ওর ক্লাস ওয়ানের বন্ধু। মল্লিকার গ্রামেই বিয়ে হয়েছে। প্রথম ফোনটা ওকেই করল। জানতে পারল ওর মেয়ের হঠাৎ শরীর খারাপ। ডাক্তারের কাছে গিয়েছে ওরা। নন্দিতা শুনতে পেল ফোনের ওপারে মল্লিকার মেয়ে বলছে, ‘নন্দিতামাসি এসেছে? মা তাহলে বাড়ি চল, ডাক্তারের কাছে নাহয় আরেকদিন আসবো।’ 

পরের ফোনটা কথাকলিকে। কালনায় শ্বশুরবাড়ি, তবে প্রতিবার পুজোর সময় বাপেরবাড়ি আসে। বাড়ি ঢোকার আগেই নন্দিতা খবর পেয়ে গিয়েছিল যে কলি এসেছে। তাই আর দেরি না করে দুষ্টুকে নিয়ে ও কথাকলিদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল। 

অশোকবাবু বললেন, ‘হয়ে গেল। দাদু ঠাকুমা, কাকু কাকিমা সবাইকে প্রণাম করেছিস? বন্ধু পেলেই হল। এ মেয়ের আর কিছু মনে থাকবে না।’ 

কথাকলি আর নন্দিতা যে একসময় অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিল তা বাড়ির কারোর অজানা নয়। বাবার বকুনিতে নন্দিতার মুখটা শুকিয়ে গেল। তাই দেখে অমলকাকা বললেন, ‘যা, আমি গিয়ে নিয়ে আসব।’ 

খিড়কির দরজায় গিয়ে আগের মত টোকা মারতেই নতুনবৌদি দরজা খুলে দিল। যেমন বরাবর দিত। বৌদির চেহারা দেখে চমকে উঠল নন্দিতা। ওর মনে ছিল না। বছর খানেক আগে সুমন্তদা মারা গিয়েছে। ফোনে জানিয়েছিল কলি। সুমন্তদার যখন বিয়ে হল নন্দিতারা তখন ক্লাস নাইন। বিয়েতে ওরা খুব হৈচৈ করেছিল। সুমন্তদার বৌ হয়ে গিয়েছিল ওদের সকলের নতুনবৌদি। 

কথাকলিদের বৈঠকখানার লাল মেঝেতে পা মেলে বসেছে নন্দিতা। একপাশে মামনি অন্যপাশে ছোটমনি। নন্দিতার গায়ে সেই ছোটবেলার মত হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন মামনি। নন্দিতা বসে বসে এই আদরটুকু উপভোগ করছিল। ছোটমনি দুষ্টুকে একটা চুমু দিতেই দুষ্টু পকেট থেকে রুমাল বের করে নিজের গালটা মুছেই দৌড়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তা দেখে সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল।

নতুনবৌদি বিশাল আকারের একটা প্লেট আর জলের গ্লাস নামিয়ে দিয়ে বসে পড়ল মামনির পাশে।

‘রাতে একটু ডালভাত আমাদের বাড়িতেই খেয়ে যাস। সেই আগের মত।’ বললেন মামনি। 

বোলপুরে পাকাপাকি ভাবে চলে যাবার পর যতবার গ্রামে যেত নন্দিতা একবেলা না খাইয়ে ওরা কিছুতেই ছাড়েন নি। আর যে পদই থাকুক না কেন, নতুনবৌদির হাতের সর্ষেতেল, কাঁচালঙ্কা, কাঁচাপেঁয়াজ দেওয়া পোস্তবাটা আর তেঁতুল দিয়ে মাছের টক অবশ্যই থাকত। আহা, কি স্বাদ! যেন অমৃত। নন্দিতা আজও ভোলে নি। টক দিয়ে ভাত খাওয়া শেষ হলেও ওদের মেয়েলি আড্ডা শেষ হত না। এঁটো হাত শুকিয়ে খরখর করত যখন তিন প্রজন্মের সেই আড্ডা ভাঙত। আড্ডায় থাকত ছোটমনি, মামনি, বৌদি, কথাকলি ও নন্দিতা। পরে যোগ দিয়েছিল বৌদির মেয়ে মুন্নি। 

বৌদি শুধোল, ‘কি করে সব ম্যানেজ কর নন্দিতা? ছেলেকে কে দেখে? কে পড়ায়? কে খাওয়ায়?’ 

দুষ্টু এরই মধ্যে ঘুরে দেখে এসেছে কথাকলিদের এককালীন প্রাসাদোপম বাড়ি। অন্দরমহল, বারমহল, ঠাকুরবাড়ি। সুমন্তদার তৈরি করা সাম্রাজ্য। তেলকল, চালকল, মুড়ির মেশিন, মুদি দোকান আর তার সঙ্গে আধুনিকতম সংযোজন সাইবারক্যাফে। এতবড় বাড়ি দেখে দুষ্টুর অসংখ্য প্রশ্ন। ওর মনে হয়েছে বইয়ে পড়া প্যালেসের মত বাড়ি। এরকম ছোটবেলায় নন্দিতারও মনে হত। তাই কলিদের বাড়ি গিয়েই কিরকম সিঁটিয়ে যেত মল্লিকা আর নন্দিতা দুজনেই। 

‘কথাকলি কোথায়?’ একথা জিজ্ঞেস করার সুযোগ পায় নি নন্দিতা। হঠাৎ দেখল সেই স্কুলবেলার রোগা, পাতলা, ভিতু, মিষ্টি কলি এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। মুহূর্তেই ভুল ভাঙল পেছনে ভারি চেহারার আসল কলিকে দেখে। 

নন্দিতা হাঁ হয়ে গেল, ‘মানে, তোর মেয়ে? এত বড়? হ্যাঁরে, মামনি এতক্ষণ গায়ে হাত বুলচ্ছিলেন আর আমার নিজেকে বেশ খুকি খুকি লাগছিল। তোর মেয়েকে দেখে যে মনে হচ্ছে আমরা বুড়িয়ে গেলাম।’

‘তা যা বলেছিস! দেখ না, কতগুলো চুল পেকে গিয়েছে। নন্দিতা, তোর কতগুলো চুল পেকেছে রে?’ ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে কথাকলি জিজ্ঞাসা করল।

নন্দিতা বলল, ‘একটাও না।’ 

‘মিথ্যে কথা।’ 

‘তুই বুড়িয়ে গিয়েছিস।’ নন্দিতা সুযোগ বুঝে কলির পিছনে লাগল।  

‘সেকথা ঠিক, তুই এখনও ইয়াং। ছেলে নার্সারিতে পড়ে আর আমার মেয়ে পরেরবার মাধ্যমিক দেবে।’ 

এই একটুখানি খুনসুটিতে সবাই মজা পেল যেন। যদিও ওদের দুই বন্ধুর মুখোমুখি বসে গল্প করা কবে শেষ হয়ে গিয়েছে ওরাও ভুলে গিয়েছে। আজ এতদিন পরে সবাই মিলে খুনসুটি করতে করতে সময় কোথা দিয়ে চলে গেল টের পেল না। অমলকাকার হাঁকডাক কানে এলো। ঘড়ি দেখে চমকে উঠল। দশটা বেজে গিয়েছে। 

‘দুষ্টু এরপর রাতের খাবার খেলে হয়!’ তড়িঘড়ি উঠে পড়ল নন্দিতা। বাড়ি ফেরার সময় সারারাস্তা ওর বুকের ভেতরে কুলকুল করে ভালো লাগার স্রোত বয়ে গেল। নন্দিতা ভুলে গেল সম্পর্কের আসল সুতোটা কোথায়? শুধু বন্ধু নয়, কলির পুরো পরিবারের সঙ্গেই যে ওর বাঁধন সেটা বুঝে ওর ভেতরটা এক অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে উঠল।

(চলবে)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-১৪

মামনি বললেন, ‘এক কেজি ময়দাতে অন্তত তিন কাপ ঘি দে কলি। তবেই না নিমকিগুলো কুড়মুড়ে হবে।’ 

ছোটমনির বলা মাপ মত মুগডালের গুঁড়ো আর চিনির গুঁড়ো মিশিয়ে নিয়েছে নতুনবৌদি। ঘিয়ের পরিমাণও ছোটমনি বলে দিয়েছেন।

নাড়ু পাকানোর মত হাতের জোর মামনি বা ছোটমনি কারোর নেই। তাই নমিতাপিসিকে ডাকা হয়েছে। কলি ডেকেছে বলেই বোধ হয় অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভারি শরীরটা নিয়ে হাজির হয়েছে নমিতাপিসি। কলি আর নমিতাপিসি নাড়ুগুলো পাকাচ্ছে। নতুনবৌদি লেচিগুলো বেলে খুন্তি দিয়ে কাটতেই টুকরোগুলো হরতন আকারের কুচো নিমকিতে পরিণত হচ্ছে। ছোটমনি একটা বেঁটে টুলে বসে ভাজছেন নিমকিগুলো। 

নাড়ু পাকাতে পাকাতে নমিতাপিসি বলল, ‘এখনকার দিনে এসব এত খেটে এসব ক্যানে করছিস কলি? লাড়ু বল, খই বল, মুড়কি বল লোকে এখন দোকান থেকে কিনেই মেনেজ করে।’ 

‘ঠিক কথা, কিন্তু ছোট জামাইয়ের পছন্দের খাবার দোকান থেকে আনালে হবে?’ গম্ভীর গলায় বললেন মামনি। প্রায় রানীর মতই কাটিয়ে এসেছেন সারাজীবন। প্রতিদিন সকালে নমিতার মত পাঁচজনকে হুকুম করে এসেছেন। আজ নমিতা এসে পরামর্শ দিচ্ছে। ‘কলি কাল চলে যাবে। এগুলো ওর সঙ্গে দিয়ে দেব, অসীম ভালোবাসে।’ 

‘তাছাড়া মুগের নাড়ু, গাঁয়ের লোকে এর নামই শোনে নি, তাহলে তুমি পাবে কোথায় বল?’ একটু অহংকারী গলায় বললেন ছোটমনি, কলির মা।

‘সে এক সময় ছিল ছোট, তোর মনে পড়ে? দশমীর দিন সন্ধ্যেবেলা থেকে লাইন লেগে যেত বিজয়ার পেন্নামের। মোড়ল পাড়া, ঘোষ পাড়া, পাল পাড়া, দখিন পাড়া থেকে সব পালে পালে আসত। এই মোটা মোটা নাড়ু, মোয়া জোগান দিয়ে শেষ করা যেত না।’ মামনি স্মৃতিচারন করতে লাগলেন।

‘তখন তো তোমাদের ওটোনে ভিয়েন বসত। লোকের খাটারও খ্যামতা ছিল তখন।’ উত্তর দিল নমিতা। 

‘লোকের ভক্তিছেদ্দাও ছিল। এখন আর আছে নাকি? হাঁড়ি, বায়েনগুলোর পকেটে দু পয়সা আসতেই সব ধরাকে সরা জ্ঞান করে। না ডাকলে ওরা আর কারোর বাড়িতে পাত পাড়ে না। পেনামটেনাম তো সব উঠেই গেল দেশ থেকে।’ আক্ষেপ করলেন মামনি।

কথাকলিদের বাড়িটা এই গ্রামের জমিদার বাড়ি। গ্রামের মধ্যে সব চেয়ে বড় তিনতলা বাড়িটা গোটা গ্রামের পরিচয় বহন করত এক সময়। সদর দরজা দিয়ে পাশাপাশি দুটো ট্রাক ঢুকে যেতে পারে। তারপর উঠোন। সে উঠোন পার হলে আবার একটা দরজা। মাথার উপর প্রমাণ আকারের গণেশের মূর্তি। সেটা পেরিয়ে গেলে একদিকে রান্না ঘর। যেখানে অনায়াসে পাশাপাশি দুটো আধুনিক দুবেডরুমের ফ্ল্যাট হয়ে যাবে। উল্টোদিকে ওদের বসত বাড়ি। জমিদারি ছিল না, কিন্তু সেই ঠাটবাট অনেকদিন পর্যন্ত বজায় ছিল। কথাকলি যখন স্কুলে পড়ত, তখন ওর চৌধুরী পদবীতেই সবাই কেমন সম্ভ্রম প্রকাশ করত। ও যে চৌধুরী বাড়ির মেয়ে তা ওর গায়ের রং বা চেহারাতেও ফুটে বেরোত। শৌখিন মানুষ ছিলেন কলির মেজজেঠু। মেজজেঠু আর নেই। জেঠিমাকে ওরা মামনি বলে ডাকে। মামনিই ছিলেন সংসারের কর্ত্রী। কলিরা তখন ছোট। বাড়ির সদস্যের থেকে কাজের লোক বেশি। মুড়ি ভাজার লোক, রান্নার লোক, মশলা বাটার লোক, বাজার করার লোক, কাপড় কাচার লোক। সব কাজের জন্যেই আলাদা আলাদা লোক। ততদিনে সুমন্তদা ব্যবসা বাড়াতে শুরু করেছে। একটা একটা করে মেশিন বসছে আর কাজের লোক বাড়ছে। কর্মচারিরা সবাই সকালে আসে, সন্ধ্যেবেলা যায়। দুপুরে খাওয়া মালিকের বাড়িতেই। তাই রোজই যেন যজ্ঞিবাড়ির রান্না হত এ বাড়িতে। নমিতাপিসি তখন মশলা বাঁটত। এখন আর গ্রামে কাজের লোক পাওয়া যায় না। কলিদের এত বড় বাড়ি, পরিষ্কার করার লোক নেই। মেয়েগুলোর বিয়ে হয়ে যাবার পর বাড়িটা আরও খালি হয়ে গিয়েছে। বাড়ির পুজোও বন্ধ হয়ে গিয়েছে কয়েক বছর হল। এই বাড়ি টিকিয়ে রাখাই এখন মুশকিল। বছর বছর সংস্কার করাতেই প্রচুর টাকা বেরিয়ে যায়। 

কলির বিয়েটা হয়েছিল হঠাৎ করেই। পাশের বাড়ির সুমিতাদির বিয়েতে বাসর ঘরে কলির গলায় গান শুনে অসীম পছন্দ করেছিল। অসীম সুমিতাদির বরের বন্ধু। বয়সে অনেকটা বড়। এত বড় এবং অভিজাত পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করার মত যোগ্যতা কি ছিল অসীমের মধ্যে? মনের মধ্যে দোটানা নিয়েই সাহস করে বন্ধুর মারফৎ প্রস্তাব পাঠিয়েছিল অসীম। ছেলে ইংরাজিতে এম এ, স্কুলে পড়ায়। সুযোগ পেলে বড়জোর কলেজে পড়াবে। মেজজেঠু নীমরাজি ছিলেন কিন্তু মেয়ের মায়ের জেদের কাছে হেরে গিয়েছিলেন। শুধু বয়সটা নিয়ে একটু খুঁতখুঁতানি ছিল কলির। কলি তখন মাত্র কুড়ি। বয়সে বারো বছরের ছোট বৌকে তুলোয় মুড়ে রাখত অসীম। পারলে এখনও রাখে। প্রতিবার পুজোয় ইন্দাসে আসাটাও ওর আব্দার মেটাতেই। এবারে ইচ্ছা ছিল না। মেয়েটা ক্লাস নাইন। এদিক ওদিক করলে ওর পড়ার ক্ষতি। কলিকে বোঝানো যায় নি। অসীম তাই এসে থেকেই একটু গম্ভীর। একই কারনে কলিও ব্যস্ত, অসীমের রাগ কিভাবে দূর করা যায় সে নিয়ে ওর চিন্তার শেষ নেই। সুতরাং সেই চিরাচরিত প্রথা, পেট থেকে মন। 

হই হই করতে করতে একদল ছেলে ঢুকে পড়ল সোজা রান্না ঘরে। একজন বলল, ‘এই তো কলিদি। দাও দুশ টাকা চাঁদা।’

‘পুজো পার করে চাঁদা কিসের রে?’

‘এটো বিসর্জনের চাঁদা। পুজোর চাঁদাতো ভোলা জ্যাঠারা বিসর্জনে দেয় না, শুধু টেরাক ভাড়াটো দেয়।’

‘বিসর্জন করতে ট্রাক ছাড়া আর কি লাগে?’

কান চুলকোতে চুলকোতে একজন বলল, ‘ওই যে বাজনা, তারপর সিদ্ধি...’ কিছু মনে পড়ে গেছে এমন ভাব করে ছেলেটা বলল, ‘ও কলিদি, নন্দিতাদি নামল জান বাস থেকে। সঙ্গে একটো ছেলে ছিল। ওর বেটা বটে মনে হয়। ওর কাছে তো হাজার টাকার কমে লোবই না। তুমি তো দেবে জামাইবাবুর তরফ থেকে আর নন্দিতাদি চাকরি করে বলে কথা।’ 

কথাটা শুনেই কলির মুখে এক রাশি আনন্দ ছড়িয়ে গেল। আর তর্কবিতর্কে গেল না কলি। নাড়ু বানানো মুলতুবি রেখে উঠে গেল। দু’শ টাকা দিয়ে ছেলেগুলোকে বিদায় করল। তারপর গুণগুণ করে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে এ ঘর ও ঘর ঘুরতে লাগল। 

নতুন বৌদি বলল, ‘হয়ে গেল। নমিতাপিসি, বাকিটা তোমাকেই শেষ করতে হবে।’

(চলবে)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-১৩

পুজো আসবে আসবে এই আনন্দে দিনের পর দিন এমন কি মাসের পর মাস কেটে যায়। ঠিকমত বোঝার আগেই যেন পুজোটা হুড়মুড় করে এসে আবার হুড়মুড় করে চলেও যায়। নন্দিতা এসেছিল পুজোর প্রায় মাঝখানে। পুজো শেষ। তাই মনটা একটু ভারভার। সেই কবে থেকে দিন গোনা শুরু হয়েছিল! দুমাস আগে যেদিন টিকিট কাটা হয়েছে সেদিন থেকেই। এবারে পুজোটা বৃষ্টিতে বৃষ্টিতেই কেটে গেল। পুজোর মাঝে ঘ্যান ঘ্যান করে এত বৃষ্টিতে সবাই নাজেহাল। একমাত্র বৃষ্টির জলে স্নান করা গাছগুলো দেখলেই যা একটু ভালো লাগছে। প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানোর উন্মাদনা নেই নন্দিতার মধ্যে। ভিড়ভাট্টাও খুব একটা সহ্য হয় না ওর। তবুও পুজোর সময় বাড়ি না আসলে ভাল লাগে না। বাইরে থাকলে কেবলই ছোটবেলার গ্রামের দিনগুলো মনে পড়ে। মনে পড়ে, নতুন জামার গন্ধ। স্কুল থেকে ফিরেই দেখতে যাওয়া, মূর্তি গড়া কতদূর এগুলো। শেষে পুজোর দিনগুলোয় সকালবিকেল ঠাকুরতলায় পড়ে থাকা। 

অশোকবাবুদের পাড়ার পুজোটা নতুন। বলতে গেলে ওদের এই পাড়াটাই নতুন। নন্দিতা তখন হোস্টেলে থাকত। চন্দনের বিয়ের আগে অশোকবাবু ভাড়াবাড়ি ছেড়ে বাড়ি করে উঠে এসেছিলেন। এদিকটা তখন খালিখালি। নিচু জমি। বর্ষাকালে খালি জায়গাগুলো জল জমত। ব্যাঙ ডাকত গ্যাঙর গ্যাঙ। পরে কয়েক বছরের মধ্যে বোলপুর-দুর্গাপুর কানেক্টিং রাস্তা হয়ে যেতেই এই পাড়াটা জমজমাট হয়ে গেল। একটা জায়গাও আর খালি থাকল না। খালি জমিগুলোর দাম বেড়ে গেল হু হু করে। রাস্তার ধারে ধারে দোকান গজিয়ে উঠল। আর তারপর একদিন এই পাড়াতে দুর্গাপুজো শুরু হল। এই নিয়ে পুজো চার বছরে পড়ল। নন্দিতা এল প্রথমবার। সেভাবে এ পাড়ার কাউকে ও চেনে না। যা চেনা তা ওই প্রতিমাদেবীর মাধ্যমেই। পুজোতে পাড়ার সকলের সহযোগিতার কথা শুনল বাবার মুখে। শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল। পাশের বাড়ির সেনকাকিমা ভোরবেলা থেকেই হাত লাগান পুজোর জোগাড় করতে। নিজের বাগানে যত ফুল ফুটেছে নিজেরাই তুলে দিয়ে আসেন প্রায় সকলে। অনাথবাবুর ছেলের চাকরি হয়েছে বলে মূর্তির খরচটা এবারে উনি দিয়েছেন। পাড়ার মেয়ে-বৌরা কাজে হাত লাগিয়ে আবার বাড়ি গিয়ে রান্নাবান্না করলে আনন্দ করার সুযোগ পাবে না। তাই চারদিন পুজোমন্ডপে রান্নার ব্যবস্থা হয়েছে। তুমুল বৃষ্টিতে রান্নাবান্না ও খাওয়া নিয়ে যখন বিস্তর ঝামেলা তখন প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টারমশাই খুলে দিয়েছেন স্কুল। বের করে দিয়েছেন মিড-ডে মিলের বাসনপত্রও। 

নবমীর দিন সন্ধ্যেবেলা প্রতিমাদেবী নন্দিতাকে টেনে বের করেছিলেন ঘর থেকে। মন্ডপে গিয়ে কত  চেনামুখের দেখা পেয়ে গিয়েছিল। বহুবছর পর ওর দুজন স্কুলের বন্ধুর সঙ্গে দেখা। দেখা তো হল, কিন্তু সহজে কেউ কাউকে চিনতে পারে না। পারার কথাও নয়। সতের বছরে উভয়েরই অনেক পরিবর্তন হয়েছে! নন্দিতা দেখল অনেক বয়স্ক মানুষ এসে খবর নিচ্ছেন। অনেকেই ওর অচেনা। বুঝতে পারল এসবই আসলে বাবা মা’র জন্যে। নন্দিতা অভিভূত হল মানুষের আন্তরিকতায়। মনে মনে আফসোস হল নিজের যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনের কথা ভেবে। কোথা দিয়ে যে রোজকার দিনগুলো পেরিয়ে যায় নিজেই টের পায় না। 

আজ একাদশী। কাল ঠাকুর বিসর্জন হয়ে গিয়েছে। অশোকবাবু জানালেন মন্ডপের দিকে যেতে ওনার কান্না পাচ্ছে। প্রতিমাদেবীর রান্নার তাড়া নেই আজও। সাহাবাবুর নাতনির অন্নপ্রাশনে নেমতন্ন আছে গোটা পাড়া। বৃষ্টি থেমে গেলেও শনশন করে হাওয়া বইছে। আবহাওয়াটাও মন খারাপ করা। গতকাল উড়িষ্যার বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে এক বিধ্বংসী ঝড় বয়ে গিয়েছে। আগে থেকে সতর্কবার্তা থাকায় বিশেষ প্রাণহানি হয় নি। অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশের রতনগড় নামে এক যায়গায় দশেরা উপলক্ষে পুজো দিতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে একশ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বলাই বাহুল্য যে তাদের বেশির ভাগই মহিলা আর শিশু। 

‘মানুষ সতর্ক হলে, পাইলিনের মত ঝড়ের হাত থেকে বাঁচতে পারে, অথচ দেবতার দরজায় প্রাণ রক্ষা করতে পারে না।’ খবরের কাগজ পড়তে পড়তে নন্দিতা বলল অশোকবাবুকে। 

অশোকবাবুর তাপউত্তাপ দেখা গেল না। উনি অন্য প্রসঙ্গে ঢুকলেন, ‘পরশু তো তোর ফেরার ট্রেন। কাল একবার দাদুঠাকুমার সঙ্গে দেখা করে আয়। এসেছিলি জানলে ওদের খারাপ লাগবে।’

নন্দিতা বলল, ‘কালই এখান থেকে বেরোতে হবে। কাল কলকাতায় থেকে পরশু ওখান থেকেই ট্রেন ধরব।’

‘কলকাতায় কার বাড়িতে থাকবি?’ জিজ্ঞেস করলেন অশোকবাবু।

উত্তর দেওয়ার আগেই প্রতিমাদেবী ঝাঁঝের সঙ্গে নন্দিতাকে শুধলেন, ‘রেশমি এখন কলকাতায় না? তোর আর বন্ধু বন্ধু গেল না। তিনদিনের জন্যে বাড়ি এসেও মন বসে না। মায়ের সঙ্গে পর্যন্ত দুটো সুখ দুঃখের কথা নেই।’

‘বাঃ রে। মন বসল না? শুনলাম তো তোমাদের অনেক সুখ দুঃখের কথা। তোমার আর বাবার ঝগড়া শুনলাম। ভাব হতে দেখলাম। দুঃখ এবং সুখ, কোনটাই বা বাদ দিলে?’ বলেই নন্দিতা হি হি করে হাসল। অশোকবাবুর গোঁফের ফাঁকে মুচকি হাসি।

প্রতিমাদেবী আক্ষেপ করলেন, ‘কোথায় আর মন বসল? ভালো করে পুজো দেখলি? সিঁদুর খেললি না, বিসর্জনে গেলি না। শুধু ঘুম।’ 

‘আরে, এখন তো ঘুমটাই আমার সেলিব্রেশন। ইচ্ছে করলেই কি এখন আর পড়ে পড়ে ঘুমোতে পারি? দুষ্টু ঘুমোলে তবেই আমি ঘুমাতে যাই। আমার ঘুম পেয়েছে বলে ঘুমোব, সেটা হয় আর?’ নন্দিতা বলল। 

‘সব মাকেই তা করতে হয়, তুমি আলাদা কিছু করছ না।’ নন্দিতার মাতৃত্বের উপর প্রতিমাদেবী যেন এক পোঁচ কালি লেপে দিলেন।

নন্দিতা কিছু বলল না। ঘরে বাইরে সবাই ‘আগেকার মা’ আর ‘আজকের মা’ এই নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা পছন্দ করে। এসব সহজে থামানো যাবে না। তাই নিজে থেমে যাওয়া ভাল। আসলে মা হওয়াটাই অপরাধ নাকি  মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় নন্দিতার। ছোটছেলেকে অন্যের হাতে ছেড়ে চাকরি করতে যাওয়া সব সময়ই মায়ের দোষ। সময়ের মধ্যে সব কাজ সেরে বসের আগে যে মা বেরিয়ে বেরিয়ে যায় তার যে কত দোষ! ‘বিবাহিত মহিলা বা ছোট বাচ্চা কোলে মহিলাকে আর নেওয়া হবে না এরপর থেকে। ওরা কেবল বাড়ি যাবার জন্যে ছটফট করে।’ কতবার যে নিজের জন্যে বা অন্য সহকর্মীদের জন্যে নন্দিতা শুনেছে তার হিসেব নেই। ওদিকে কোনোদিন কাজে আটকে গিয়ে ফিরতে দেরি হলে আবার ঘুরে ফিরে সেই মায়েরই দোষ, ‘কি দরকার এমন চাকরি করার!’ ছেলেকে সব রকম সম্ভাব্য পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর পরও যদি ছেলের ওজন কম হয়, তখন পাড়ার লোকে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, ‘আহা ছেলেটা মায়ের যত্ন পায় না!’ নন্দিতা নিজের ভাবনা চিন্তায় লাগাম পড়ায়।

‘বাবা, তাহলে আজই চল। রাতে থেকে যাব ইন্দাসে। কাল সকালে চলে আসব, দুপুরে শান্তিনিকেতন ধরব। আর মা, এখন প্লিজ আমাকে কারোর বাড়িতে প্রণাম করতে পাঠিও না। আমি ব্যাগ গুছিয়ে রাখি। দুপুরে সাহাকাকুদের বাড়িতে খেতে যাব যখন, তুমি ইশারা করে দিও। আমি বিজয়ার প্রণামগুলো ওখানেই সেরে নেব।’ মুহূর্তেই নন্দিতা পরিকল্পনা ছকে নিয়ে উঠে গেল ব্যাগ গোছাতে।

(চলবে)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-১২

রিন্টু ওর মা’র সঙ্গে মামার বাড়ি গিয়েছে। পিসির সঙ্গে দেখা হবে বলেই ওদের যেতে দেরি হয়ে গেল। টুম্পা যায় নি। দুষ্টুই যেতে দেয় নি। প্রতিমাদেবী রিন্টু আর জয়িতার যাওয়ার ব্যাপারে বেঁকে বসছিলেন। নন্দিতা যখন বলল, ‘দেবীপক্ষের কনসেপ্টই হল, মেয়েরা বাপেরবাড়ি যাবে।’ তখন আর প্রতিমাদেবী কথা বাড়ান নি। রাতে দুষ্টু আর টুম্পা প্রতিমাদেবীর কাছে শুয়ে পড়েছে। নন্দিতা মা’কে বলেছিল নিজে থেকে যখন ঘুম ভাঙবে উঠে আসবে তার আগে ওকে যেন কেউ না ডাকে। 

অনেক বছর পর নন্দিতা একা নিজের পুরনো ঘরে শুয়েছে। একতলার এই ছোট ঘরটা ওর খুব প্রিয়। নিজের একটা পড়ার ঘরের বায়না করত নন্দিতা। তখন ও অনেক ছোট। বাড়ি করার সময় অশোকবাবু এই ঘরটা নন্দিতার পড়ার ঘর হিসেবে বানিয়েছিলেন। যদিও নন্দিতা তখন আর থাকত না এখানে। হোস্টেল থেকে ছুটিছাটায় বাড়ি আসলে এ ঘরেই ও থাকত সারাদিন। ওর গল্পের বইগুলো এখনও এঘরে যত্নে রাখা। বইগুলো অশোকবাবুরও প্রিয়। নন্দিতা ভাবল আজ রাতে একটু গল্পের বই পড়বে, সেই আগের মত। পড়তে পড়তে রাত শেষ হয়ে যেত তখন। এখন সেরকম করে আর পড়া হয় না। একটা পড়া বই বের করল নন্দিতা। পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে পড়ল, টের পেল না।

বাবা ও মা’র কথাকাটাকাটির শব্দে নন্দিতার ঘুম ভেঙ্গে গেল। প্রতিমাদেবী ভোর থাকতে উঠে পড়েন। নন্দিতা ভাবল বাবা হাঁটতে যাবেন তাই মাও উঠে পড়েছেন। ঘুমচোখে মোবাইলে দেখল রাত আড়াইটা। ঘর থেকে বেরিয়ে এল নন্দিতা। প্রশ্ন, ‘কি ব্যাপার?’

‘তোর বাবাকে নিয়ে আর পারা যায় না, এই বয়সে ভীমরতি।’ বললেন প্রতিমাদেবী। 

অশোকবাবু বললেন, ‘কার ভীমরতি, আমার না তোমার? এই ছিঁচকেগুলো এই নিয়ে কতবার ঘুরে গেল হিসেব আছে? আজ শুধু তোমার জন্যেই হাতের কাছে পেয়ে ছেড়ে দিতে হল!’

নন্দিতা শুধল ‘চোর এসেছিল নাকি?’

প্রতিমাদেবী বললেন, ‘উঠোনে পায়ের শব্দ পেয়ে তোর বাবা উঠে এসেছে। পটাপট এইঘর ওইঘরের আলোগুলো জ্বেলে দিয়ে বাবু বাথরুমে গেলেন।’ 

নন্দিতা বলল, ‘কেন, অন্ধকারে চোরের অসুবিধা হবে বলে?’

অশোকবাবুর একটু দুঃখ হল। উনি গম্ভীর হয়ে গেলেন। মেয়েটা যেন আর নিজের নেই। কে বলবে এই মেয়ে মা-বাবার ঝগড়ায় চিরকাল বাবার পক্ষ নিয়ে এসেছে! 

প্রতিমাদেবী বললেন, ‘আলো দেখে চোর বসে থাকবে?’

‘তারপর?’ নন্দিতা জিজ্ঞেস করল।

‘বাথরুম থেকে বেরিয়ে চাবির গোছা নিয়ে তোর বাবা এগিয়ে চলল দরজা খুলতে। উঠোনে গিয়ে চোর ধরবে। আমি বলছি তুমি কি পাগল এই রাতে তুমি দরজা খুলে দেবে? কে জানে ওরা ক’জন। ওদের কাছে অস্ত্রসস্ত্র আছে কিনা তার ঠিক নেই। দলবল নিয়ে যদি ভেতরে ঢোকে! কে শোনে কার কথা! তাই আমি পেছন থেকে তোর বাবাকে চেপে ধরে চাবিটা কেড়ে নিলাম।’ 

দৃশ্যটা কল্পনা করে নন্দিতা হেসে ফেলল। অশোকবাবুর আবার একটু দুঃখ হল। মেয়েটা একদম মার মত হয়ে যাচ্ছে দিনেদিনে। 

অশোকবাবু রাগিরাগি গলায় স্ত্রীকে বললেন, ‘হাতের সামনে পেয়েও লোকটাকে ছেড়ে দিতে হল শুধু তোমার জন্যে। প্রথম যখন এ বাড়িতে এলাম, চারদিকের জমিগুলো তখন সব ফাঁকা। লম্বা আঁকশি ভরে দিয়ে আমার জামা বের করে নিয়েছিল। পঁয়ষট্টিটাকা ছিল পকেটে। টাকাটা নিয়ে নিয়েছিল। মনে আছে?’ সেই পঁয়ষট্টি টাকার শোক যেন আজও একবার উথলে উঠল অশোকবাবুর গলায়।

ফিচেল হেসে নন্দিতা বলল, ‘চোরটা কত অনেস্ট একবার ভেবে দেখ বাবা। টাকাটা নিয়েছিল কিন্তু তোমার জামাটা নেয় নি।’

‘কিন্তু তুমি আমাকে আটকালে কেন?’ অশোকবাবু ঘুরে ফিরে আবার সেই মূলপ্রসঙ্গে ফিরে এলেন।

প্রতিমাদেবী ধমক দিয়ে বললেন, ‘এখন ঘুমোও গিয়ে। সকালে উঠে তোমাকে যা বলার বলবো।’ 

পরদিন সকাল ন’টা নাগাদ নন্দিতাকে ঠেলে তুললেন প্রতিমাদেবী। এরকম অলক্ষুণে ঘুম নন্দিতা আগে কখনও ঘুমোত না। ‘বিয়ে হয়ে মেয়েটা উচ্ছন্নে গিয়েছে।’ গজগজ করতে করতে কিছুক্ষণ আগে মন্তব্য করেছেন অশোকবাবু। 

সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে। এখন নন্দিতার সামনে গরম চা। আরাম করে চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর নতুন কেনা স্মার্ট ফোনটা নিয়ে খুটখুট করছে নন্দিতা। প্রতিমাদেবী তৈরি হয়েই আছেন। বৃষ্টিটা একটু ধরলেই উনি বেরোবেন। একটু পর পর নন্দিতাকে চান করার জন্যে তাড়া দিচ্ছেন। নন্দিতা পাত্তা দিচ্ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। 

প্রতিমাদেবী বললেন, ‘পুজোর দিন, একটা শাড়ি পরবি। আমি শাড়ি বের করে রেখেছি। তারপর এই গলার চেন, আর বালাদুটোও পরিস। এমন অসভ্য মেয়ে যে হাতে শাঁখা নেই, লোহা নেই। আমার কাছে বাড়তি শাঁখা, লোহাও তো নেই যে তোকে দেব। বালাদুটো তোকে পরতেই হবে। নাহলে লোকে বলবে এর যেন কিছুই নেই।’

নন্দিতা বলল, ‘তা বলুক, আমার তাতে কোনও অসুবিধা নেই।’

প্রতিমাদেবী মুখঝামটা দেন, ‘তা কেন থাকবে? স্বাধীন হয়েছ, আধুনিক হয়েছ।’ 

নন্দিতা ফিক করে হেসে ফেলেই গম্ভীর হয়ে বলে, ‘পরাধীন বা প্রাচীন নই বলে তো মা হিসেবে তোমার খুশী হওয়া উচিৎ।’ 

‘যা খুশী কর। তোর সঙ্গে আমি কথায় পারব না। কালকে সিঁদুর খেলতে যেতে হবে কিন্তু। মাকে বরণ করবি। সধবা মানুষকে এসব করতে হয়। তারপর ঘট বিসর্জনে যাব সবাই মিলে। তোর বন্ধুরাও যায়। কাকলি, মৌ এরা তো তোর সঙ্গেই পড়ত। ওরাও যায়।’ একটানা বলে চলেন প্রতিমাদেবী।

অশোকবাবু ছাতা বন্ধ করতে করতে ঘরে ঢুকলেন। প্রতিমাদেবীকে বললেন, ‘বৃষ্টি কমেছে। তুমি যাও।’ 

অশোকবাবুর আগমনকে নন্দিতা বেশ কায়দা করে কাজে লাগাল। বলল, ‘বাবা, শুনেছ কাল বাইকে চেপে দুটো ছেলে এই পাড়ায় একজনের গলা থেকে চেন ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছে? আর দেখো এইসব গয়না এখন আমাকে মা পরতে বলছে।’ 

মা আর মেয়ের মতের অমিল দেখে অশোকবাবু খুশি। ওনার নন্দিতা এখন যেন সেই আগের, ছোট্ট নন্দিতা। বাবা যা বলে তার বাইরে আর কিছু হতেই পারে না। গলায় তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে অশোকবাবু বললেন, ‘তোর মা’র কথা বাদ দে, একটা পাগল।’ 

অপমান আর অভিমানে প্রতিমাদেবীর মুখটা কালো হয়ে গেল। গয়নাগুলো আলমারিতে তুলে রেখে দিলেন। শাড়িটা অবহেলায় পড়ে থাকল খাটের উপরে। প্রতিমাদেবী বেরিয়ে যাবার পর বৃষ্টির বেগ গেল বেড়ে। নন্দিতার মনে প্রচণ্ড আলস্য চেপে বসল। আর মন্ডপে যাওয়া হল না। কাল রাতের শেষ না হওয়া গল্পটা নিয়ে আবার বিছানায় গড়িয়ে পড়ল ও।

(চলবে)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-১১

‘বাঃ, চা’টা দারুণ হয়েছে কাকিমা। আপনারা কেউ খাবেন না?’ বলেই একটা বড় চুমুক দিল নন্দিতা। সামনে কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে বসে আছে সুস্মিতা। অনেকক্ষণ নন্দিতার কথা শুনছিল ও। নন্দিতা বেরিয়েছিল মায়ের সঙ্গে সন্ধিপুজোয় মন্ডপে যাবে বলে। যেতে যেতে মাঝখানে আটকে দিলেন মন্দিরা কাকিমা। পুজোমণ্ডপ আর নন্দিতাদের বাড়ির ঠিক মাঝামাঝি যায়গায় মন্দিরাকাকিমাদের বাড়ি। মন্দিরাকাকিমার স্বামী সুশান্তকাকু নন্দিতার বাবার সহকর্মী। কিছু মানুষ থাকেন যারা আত্মীয় না হয়েও অনেক সময় আত্মীয়ের থেকে বেশি হয়ে যান। এই কাকু-কাকিমা অনেকটা সেরকম। সুশান্তবাবু দরকারে, অদরকারে, ভালো অথবা খারাপ সবসময় অশোকবাবুর পাশে থাকেন।

মন্দিরাকাকিমা বললেন, ‘অনেকদিন পর এসেছিস। দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বললে হবে না। ভেতরে আয়, গল্প করি।’ গল্পের গন্ধ পেলে নন্দিতাকে আটকায় কে? নন্দিতা ঢুকে পড়েছিল। প্রতিমাদেবী চলে গিয়েছিলেন মন্ডপে। সুস্মিতাকে দেখে নন্দিতা অবাক। মিষ্টি মত লাজুক লাজুক মেয়েটা ক’বছর আগে নন্দিতার বাবার কাছে পড়তে যেত। নন্দিতা বলল, ‘আরে এত বড় হয়ে গিয়েছিস? এখন কোন ক্লাস?’ 

সুস্মিতার গর্বিত ভঙ্গী। বিশ্বভারতীতে বিএসসি সেকেন্ড ইয়ার। 

‘বয়ফ্রেন্ড হয়েছে?’ নন্দিতা জিজ্ঞেস করতেই সুস্মিতা চকিতে তাকাল মন্দিরার দিকে। সুস্মিতার চোখমুখ দেখে নন্দিতা স্থির বিশ্বাসে পৌঁছে গেল নির্ঘাত প্রেম করছে এই মেয়ে। মার সামনে বলবে না। 

কথা ঘোরাতে সুস্মিতা বলল, ‘দিদি তুমি যে এত আড্ডাবাজ জানতাম না। নন্দিতাদি মানেই তো সিরিয়াস ছাত্রী। বাবা কেবল বলে নন্দিতাদির মত পড়াশুনো কর। নিজের পায়ে দাঁড়া।’

নন্দিতা বলল, ‘দূর, বেশি পড়লে বেশি কষ্ট। ইনফ্যাক্ট, ডবল কষ্ট। পড়লে চাকরি করতে হবে। চাকরি করলে, চাকরিও করতে হবে ঘরও সামলাতে হবে। চাকরি না থাকলে একদিক দিয়ে অন্তত ফ্রি।’ 

‘কিন্তু তোরা তো স্বাধীন।’ বললেন মন্দিরা কাকিমা।

‘ডবল পরাধীন বলুন কাকিমা। বাড়িতে নিজের কাছেই নিজে বাঁধা। এই ছেলের পড়াশুনো, ছেলের খাওয়া দাওয়া, বরের আরাম। এগুলোর মধ্যে কোনটা ঠিক মত করতে না পারলে নিজের ভেতরেই খচখচ করে। ওদিকে অফিসে যাও, বসের লালচোখ। স্বাধীনতাটা কোথায়?’ 

নন্দিতার প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে মন্দিরাকাকিমা উঠে গেলেন চা বানাতে।

নন্দিতা বলল, ‘সুস্মিতা তোর বয়ফ্রেন্ডের কথা বল।’

‘মানে? আমার বয়ফ্রেন্ড? নেই তো কি বলব!’

‘ঢপ দিস না। তোর মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছি। এই বয়েসে শালবীথি, বকুলবীথি, ছাতিমতলা চড়ে বেড়াচ্ছিস। একা একা? মানতে হবে? আর ওই যে তোর বন্ধু কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। তোর সঙ্গে বাবার কাছে পড়তে যেত। কাল রাস্তায় আসতে আসতে দেখলাম একটা বেশ হ্যান্ডু ছেলের সঙ্গে যাচ্ছিল।’ 

‘ও সুনন্দা। ওর তো সেই ইলেভেন থেকেই আছে। আমার কিছু নেই গো দিদি, বিশ্বাস কর।’

হেসে ফেলল নন্দিতা। ‘ঠিক আছে, আমাকে বলতে চাইছিস না আলাদা কথা, তবে বললে তোর লাভই হবে। দরকারে কাকুকে আমরা রাজি করাবো। কাকু এসব ব্যাপার খুব ভাল বোঝেন জানিস তো?’ 

‘কি রকম?’

নন্দিতা বলল, ‘আমার বিয়ের সময়। শেখরকে বাবার পছন্দ ছিল না। বক্তব্য তুই একটা বাচ্চা মেয়ে। নিশ্চয় কোনও চালাক ছেলে তোকে ফুসলিয়েছে। এদিকে মার আবার শেখরকে খুব পছন্দ। সঙ্গে আমার জেদ। বয়সের ধর্ম আর কি! বাবার আর আমার মধ্যে জেদের লড়াই শুরু হল। তারপর অশান্তি, কান্নাকাটি। তখন কাকুই তো বাবাকে ‘হ্যান্ডেল’ করেছিলেন। তুই তখন পুঁচকে। তোর জানার কথা না।’ 

চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে মন্দিরাকাকিমা বসে পড়েছেন।

নন্দিতা বলল, ‘আমার বিয়ের গল্প হচ্ছিল। কত কান্ড হয়েছিল বলছিলাম। আপনার মনে আছে বাবার রাগের কথা? সম্প্রদান করার ইচ্ছে পর্যন্ত নেই। সম্প্রদানের আগে ঘুমিয়েই গেলেন।’

‘তা নয়। কত খাটনি গেছে ওই কদিন! তোর বিয়ের লগ্ন ছিল অনেক রাতে, ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন।’ 

‘সে নাহয় আপনি আমি বুঝছি। কিন্তু শেখর আমাকে এখনও এ নিয়ে কথা শোনায়। কি বলে জানেন, এরকম কন্যাদায় গ্রস্থ পিতা ও আগে দেখে নি, যে মেয়ের সম্প্রদানের আগেই বাবা ঘুমিয়ে পড়ে। ’ 

মন্দিরাকাকিমা হাসতে লাগলেন। ‘তুই বললেই পারিস, তাহলে বোঝো তোমার উপর আমার বাবার কত ভরসা যে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।’ 

একটা যুতসই জবাব পেয়ে নন্দিতার মুখ খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠল। কিছু বলতে যাবে এমন সময় ওদের দরজায় কড়া নড়ে উঠল। টুম্পা ডাকছে, ‘মনি, মনি’ করে। 

ছোটতে নন্দিতাকে ‘পিসিমনি’ বলে ডাকার চেষ্টা করত টুম্পা। পুরোটা বলতে পারত না বলে পিসি উধাও, পিসির ল্যাজটুকু পড়ে আছে ‘মনি’ হিসেবে। ওর কোলে দুষ্টু। চুপচাপ, দুগালে চোখের জল আর ধুলোর মিলিত দাগ। নন্দিতা জিজ্ঞেস করল, ‘কি হয়েছে রে?’ 

দুষ্টুকে ঢিপ করে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে টুম্পা বলল, ‘আগুনে পা দিয়েছে।’ 

‘কি ভয়ানক ব্যাপার!’ নন্দিতার তুলনায় সুস্মিতা ও মন্দিরাকাকিমাকে বেশি বিচলিত দেখাল। ওরা দুজনেই উঠে এল দুষ্টুর কাছে। পায়ের নীচে একটা জায়গা লাল হয়ে আছে। মন্দিরাকাকিমা জিজ্ঞেস করল, ‘কি করে হল?’

‘ফুলঝুরি জ্বালাতে গিয়ে।’ টুম্পা বলল।  

নন্দিতা টুম্পাকে বলল ‘আমার কাছে আনলি কেন যার সঙ্গে খেলছিল তার কাছেই নিয়ে যা। সামলাতে না পেরে এবার আমি?’ 

টুম্পা বলল, ‘আমাদের কারোর দোষ নেই। কার সঙ্গে খেলছিল জানো? দাদুভাই’।  

নন্দিতা দুষ্টুকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‘তোমাকে মানা করেছি না আগুন নিয়ে খেলতে। এটা যে করলে তোমার বাবা শুনলে কি বলবে? আর কখনও তোমাকে আর আমাকে একা ছাড়বে?’ 

দুষ্টু উত্তর দিল, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম তিনজনে মিলে চল।’ 

‘হ্যাঁ তুমি সব জান! তিনজনে আসলে, এসব অঘটন হত না তাই তো? চল দেখি তোমার দাদুভাইকে। এত করে বল্লাম এই সব বারুদ, আগুন সামলে রেখো। শুনলে তো! সবাই অবাধ্য।’  

দরজা থেকে প্রতিমাদেবী হাঁক দিলেন, ‘মামনি বাড়ি চল। এত বকবকও করতে পারিস। পুজোর দিনে একবার মায়ের মুখ দেখতেও ইচ্ছে হল না তোর? আড্ডা মেরেই কাটালি সারা সন্ধ্যে।’ 

‘এসে থেকেই তো তোমার মুখ দেখছি। তাতেও যদি অসুবিধা থাকে চল, বাড়ি গিয়ে ভাল করে দেখি।’ ভেতর থেকেই নন্দিতা মায়ের কথার উত্তর দিল।

‘সবেতেই ইয়ার্কি। নিজের ছেলেকেও ধর্মের নামে ছেড়ে দিয়েছিস। কার কাছে থাকছে, কি খাচ্ছে খোঁজ নেই। এমন মা আমি কখনও দেখি নি।’ দরজার বাইরে থেকেই বলে যাচ্ছেন প্রতিমাদেবী। 

‘সরি মা, ক্ষমা করে দাও। চল তো দেখি ব্যাটা কোথায় গেল?’ নন্দিতার বেরিয়ে এল, সঙ্গে দুষ্টু। প্রতিমাদেবী হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন দুষ্টুকে নন্দিতার সঙ্গে দেখে।

চলবে

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-১০

অশোকবাবু ও প্রতিমাদেবীর বাড়িতে যেন এক মহামাননীয় অতিথির আবির্ভাব ঘটেছে। তিনি শ্রীমান দুষ্টু। প্রতিমাদেবী বরণডালা সাজিয়েই রেখেছিলেন। সেই ডালায় ফর্সা ভাঁজ করা তোয়ালে, নতুন পোশাক, শ্যাম্পু, সাবান ও তেল। কুয়োর পারে এক বালতি গরম জলও আছে। টুম্পার সঙ্গে খুব ভাব দুষ্টুর। চটপট দুষ্টুর জামা ও জুতো খুলে দিল টুম্পা। জয়িতা শরবতের গ্লাস ধরে দাঁড়িয়ে আছে, দুষ্টুর নাকের ডগায়। ওর সিংহাসন অর্থাৎ অশোকবাবুর কোলটা বেদখল হয়ে গিয়েছে ভেবে, জুলজুল করে করুণ দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে আছে নন্দিতার ভাইপো রিন্টু। নন্দিতা ব্যাগ খুলে একটা বড়সড় প্যাকেট হাতে দিয়ে ওর টোপাটোপা গালগুলো টিপে দিয়ে বলল, ‘দাদুর কোলের জন্যে ওভাবে তাকিয়ে থাকিস না। আমি চান করে এসে তোকে কোলে নেব।’ নিজের শরবতটুকু শেষ হবার আগেই নন্দিতা দেখল দুষ্টু নতুন জামাকাপড় পরে, গৃহপরিদর্শন করে বেড়াচ্ছে। পেছন পেছন ভাতের থালা হাতে জয়িতা। ‘আগে খেয়ে নাও, আগে খেয়ে নাও’ করে সঙ্গে ঘুরছে টুম্পা। সেসবে দুষ্টুর ভ্রুক্ষেপ নেই। আপাতত ও সবকটা ঘর ঘুরবে। আগেরবার কিরকম দেখে গিয়েছিল সব মনে আছে ওর। তাই প্রশ্নের পর প্রশ্ন চলবে এখন। কদিনের জন্য দুষ্টুর প্রশ্ন থেকে নন্দিতার মুক্তি। অশোকবাবুর শোবার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে দুষ্টু বলল ‘দেখি তো এই মিউজিয়ামে কি আছে?’ 

নন্দিতাকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে টুম্পা বলল, ‘মিউজিয়াম মানে শোকেস। তোমার গল্পের বই, মার শৌখিন বাসন, ঠাকুমার মশলার কৌটো সবই এখন মিউজিয়ামে।’ 

নন্দিতার সঙ্গে অশোকবাবুর ফোনে বিশেষ কথাবার্তা হয় না। অশোকবাবু গল্পবাজ মানুষ হলেও ফোনে গল্প করা ওনার খুব অপছন্দ। ওনার মতে ফোন একটা প্রয়োজনের জিনিস। তাই প্রতিমাদেবীর সঙ্গেই বেশি কথা হয় নন্দিতার। অশোকবাবুর নিয়মিত কুশল সংবাদ পেলেই হল। কিন্তু বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে অশোকবাবু এমন কথা বলতে শুরু করেন যে, নন্দিতা ঘাড় ঘোরাবার সময় পায় না। 

প্রতিমাদেবী বললেন, ‘এবার ওকে চান করতে দাও। আগে কিছু মুখে দিক।’ প্রতিমাদেবীর আবির্ভাবের ফাঁকে নন্দিতা দেখল জয়িতা কোনরকমে ধরেবেঁধে দুষ্টুর মুখে একটা গ্রাস চালান করে দিল। সেদিকে বিন্দুমাত্র মনযোগ না দিয়ে দুষ্টু খটাস করে রিন্টুর সিন্ধুকটা খুলে ফেলল। সিন্ধুকের পাল্লা খুলে যেতেই দুষ্টুর চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠল। ওখানেই রিন্টুর যাবতীয় সম্পত্তি। বইপত্র, রং, পেন্সিল, খেলনা সব। দুষ্টু ঘেঁটে দেবার আগেই রিন্টু ছুটে এসে বের করে দিল ওর স্কুলের ম্যাগাজিনটা। নন্দিতার মজা লাগল রিন্টুর বুদ্ধি দেখে। রিন্টু দুষ্টুকে ওর সিন্ধুকের কাছ থেকে যথাসম্ভব দূরে টেনে নিয়ে গেল। দুষ্টু ম্যাগাজিনের শেষ পাতার ছবিটা দেখছিল মন দিয়ে। রিন্টু বলল ‘এটা আমাদের স্কুল। বইয়ের পাতা সাবধানে উল্টোবে কিন্তু! নাহলে ছিঁড়ে যাবে।’ 

দুষ্টু বলল, ‘জানি, আমার মাও বলে। তোমার স্কুলটা সুন্দর। স্কুলে গিয়ে পড়াশুনো করো তো মন দিয়ে?’ 

হাসি চেপে নন্দিতা বাবাকে বলল, ‘আসলে ওকেও এভাবেই বলা হয় তো!’ 

অশোকবাবু মেয়ের কাছ থেকে উঠে গিয়ে রিন্টু আর দুষ্টুর মাঝখানে বসে পড়লেন। চলে গেলেন ম্যাগাজিনের আগের পাতায়। তারপর রিন্টুর ক্লাসের গ্রুপ ফটোটায় দুষ্টুর মনোযোগ আকর্ষণ করলেন। এই সুযোগে নন্দিতা উঠে গেল চান করতে। 

বেরিয়ে এসে দেখল, প্রতিমাদেবী আর টুম্পা ‘দুষ্টু, দুষ্টু’ করে এদিক ওদিক খুঁজে বেড়াচ্ছে। 

‘কি হল?’ জিজ্ঞেস করতে প্রতিমাদেবী বিভ্রান্ত গলায় বললেন, ‘তোর ছেলেটা! এখানেই তো ছিল! খেতে খেতে কোথায় ঢুকে গেল! আমরা এতগুলো মানুষ খুঁজে পাচ্ছি না।’ 

নন্দিতা মাকে আরেকটু ঘাবড়ে দিতে বলল, ‘মানে? একটা পুঁচকে ছেলেকে তোমরা চারপাঁচজন মিলে সামলাতে পারলে না? চারিদিকে দরজাগুলো তো হাট করে খোলা। এইজন্যই তোমাদের বাড়ি আসতে আমার ভয় লাগে। দরজা খুলে পালায় নি তো? উপরে দেখেছ?’

প্রতিমাদেবী জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, দেখে আসা হয়েছে। উপরে নেই।’ 

নন্দিতা মাথা থেকে ভেজা তোয়ালে খুলে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে অশোকবাবুর শোবার ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিল। আর দরজার কোনা থেকে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠল দুষ্টু। 

প্রতিমাদেবী দুষ্টুকে কিছু না বলে নন্দিতাকেই ধমক দিলেন, ‘তোর বুকের পাটা আছে মামনি, নাহলে এই গুন্ডাকে নিয়ে তুই দিল্লি থেকে একা একা চলে আসিস!’

নন্দিতা বলল, ‘ঠিক আছে, আর আসবো না। মেয়ে মানুষের এত বুকের পাটা ভাল নয়। তাই বলতে চাইছ তো?’

‘কি কথার কি মানে!’ গজগজ করতে করতে নন্দিতাকে খেতে দেবার ব্যবস্থা করতে লাগলেন প্রতিমাদেবী।

চলবে

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-৯

‘কিছু খেয়েছ?’ 

‘না, সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি।’ 

‘তুমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই গাড়ি কেন চালাও? আজ তোমার কিছু হয়ে গেলে তোমার ঘরে কি করে  হাঁড়ি চড়বে?’ নন্দিতা জিজ্ঞেস করল রামুকে। 

গাড়ি চলেছে নন্দিতার গন্তব্যের দিকে। দুষ্টু আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। শ্বশুরবাড়ির দোরগোঁড়ায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে পার্থকে। বাকি দুজন নেমে গিয়েছে জামবনিতে। অখিল যাবে লাঙ্গলহাটা আর সন্তোষ কীর্ণাহার। সন্তোষ গাড়ির নম্বরটা টুকে নিয়েছে। জেনে নিয়েছে মালিকের নাম, সোমনাথ কেশ। নাম শুনে নন্দিতা বলেছে, লোকটার সবকটা কেশ একটা একটা করে উৎপাটন করা উচিৎ। ওরা ওরা সবাই ভাড়ার টাকা অখিলের হাতে দিয়েছিল। অখিল পুরোটা দিয়ে দিয়েছে রামুকে। রামু একশ কুড়িটাকা গুণে গুণে ফেরত দিচ্ছিল। টাকাটা আবার অখিল ফিরিয়ে দিয়েছে। বলেছে ওই টাকাটা পুজোর দিনে অখিলের উপহার। টাকাটার কথা রামু যেন মালিককে না বলে।

‘আর চালাব না। আজই শেষ।’ উত্তর দিল রামু। 

‘তোমার বাড়িতে কে কে আছে?’

‘বৌ, এক মেয়ে আর এক ছেলে।’ 

‘ছেলে কতবড়?’ 

‘এবারে ইঞ্জিনিয়ার পাশ করল।’

‘কোথা থেকে?’ 

‘দুর্গাপুর এনআইটি থেকে।’

‘কোন সাবজেক্ট বলতে পারবে?’

‘মেকানিক।’ 

রামু সব প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছে। নন্দিতা বলল, ‘পাশ করেছে বলছ, তো ছেলে চাকরি পায় নি?’

রামু বলল, ‘হ্যাঁ, চাকরি পেয়েছে, টাটাদের কোম্পানিতে। তা চাকরি করবে না, বলচে আমিরিকা যাব।’

‘টাটা কন্সাল্ট্যান্সি সার্ভিস!’ মনে মনে বললেও জিজ্ঞেস করল, ‘তো তুমি কি বললে?’

‘আমার আপুত্তি নাই, ছেলে যা ভালো বোজে! ওর জন্যে তো আমি কোনও দিন কিচু করতে পারি নাই। শুদুমুদু বারন করব? আমার ভাবনা মেয়েকে লিয়ে, ওর ভালো বিয়ে ...’ 

ছেলেমেয়ের কথা শুরু করে আর থামার লক্ষণ নেই রামুর। নন্দিতা বুঝতে পারল এসব কথা বলতে ওর খুব ভালো লাগছে। ছেলের কথা বলতে নন্দিতারও ভাল লাগে। শুধু দুষ্টু কেমন করে দৌড়েছে, কেমন করে পাকা পাকা কথা বলেছে সেকথাই ও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কতজনের কাছে বলে। তাতেই যদি এত সুখ থাকে তাহলে রামুরও নিশ্চয় অনেক সুখের কথা আছে। তাছাড়া আমি যে জীবন কাটালাম তার চেয়ে অনেক অনেকগুণ ভালো জীবন আমার ছেলে কাটাবে, একথা ভাবতে কার না ভালো লাগে? রামুর বাকি কথাগুলো নন্দিতার কানে ঢোকে না। ও ভাবে, সন্তানের জন্যে সব বাবা মায়ের বুকের ভেতরটা বোধ হয় একই রকম হয়। নিজেকে ধিক্কার দিল নন্দিতা। জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল না, হাত পা কাঁপছে দেখে ওরা কত রঙ্গরসিকতা করেছে রামুকে নিয়ে। মাতাল ভেবেছে। তারপর হেলাফেলায় মেনে নিয়েছে। ওদের সকলের আচরনেই সেই উপেক্ষা বড্ড প্রকট ছিল। 

নন্দিতার গন্তব্য এসে গিয়েছে। ও দেখতে পেল বাবা দাঁড়িয়ে আছেন রাস্তার পাশে। গাড়ি থামাতে বলে দরজা খুলে নেমে এল। রামুও নামল সামনের দরজা খুলে, স্যুটকেসটা বের করে দেবে। নন্দিতা দেখল রামুর হাতগুলো কাঁপছে। ওকে থামিয়ে দিয়ে নিজেই টেনে নিল স্যুটকেসটা। অশোকবাবু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। দুষ্টু ঘুমঘুম চোখে দাদুর দিকে দুটো হাত বাড়িয়ে দিল। 

দুষ্টুকে কোলে তুলতে তুলতে অশোকবাবু বললেন, ‘দাদুভাই, তুমি তো অনেক বড় হয়ে গেলে।’

দুষ্টু বলল, ‘এখন এখন তো আমি ফোর প্লাস, তাই।’

দুষ্টুর কথা শুনে বাবা হাসছেন। নন্দিতার চোখ পড়ল বাবার দিকে। এই উৎসবের দিনেও বাবা দাড়ি কামান নি। কাঁচাপাকা দাড়ি খোঁচাখোঁচা হয়ে আছে। রামুরও তাই, তবে রামুর গালে পুরোটাই সাদা খোঁচাখোঁচা দাড়ি। নন্দিতা ভাবল রামু কি তাহলে বাবার চেয়ে বয়সে বড়? এক মুহূর্তের জন্যে নন্দিতার সামনে রামুর মুখ আর বাবার মুখ একাকার হয়ে গেল। কুর্তার পকেটে হাত দিল ও। যা উঠে এল সব মিলিয়েমিশিয়ে বড়োজোর শ’খানেক হবে। 

‘তুমি আগে কিছু খেয়ে নিও তারপর যেও। আর সাবধানে যেও। সোজা গেলেই তুমি দুর্গাপুরের রাস্তা পেয়ে যাবে।’ টাকাটা বাড়িয়ে দিতে নন্দিতার লজ্জা করল। মনে হল অনেকটা জুতো মেরে গরুদানের মত হয়ে গেল। সবাই মিলে যখন কলা ভাগাভাগি করে খেল ওরা, তখন কোথায় ছিল এই মানবিকতা! কিন্তু এই মুহূর্তে এছাড়া আর কি করতে পারে ও ভেবে পেল না।  

টাকাটা নিয়ে রামু বলল, ‘আমার আজই গাড়ি চালানো শেষ। আপনি যদি কখনও দুর্গাপুরে আসেন, টেশেনে বলবেন ‘রামুর বাড়ি যাবো’, ওরা দেখিয়ে দেবে। টেশেনের সবাই আমাকে চেনে।’ 

নন্দিতা বলল, ‘ঠিক আছে। যাবো।’

অশোকবাবু তাড়া দিলেন, ‘চল, চারটে পেরিয়ে গেল যে!’ 

দুষ্টুকে কোলে নিয়ে উনি হাঁটতে লাগলেন বাড়ির দিকে। হাঁটতে হাঁটতে আবার দাঁড়িয়ে পড়লেন, চোখ মেয়ের দিকে। ও যেন কোনও প্রিয় অতিথিকে বিদায় জানাতে এসে বিহ্বল হয়ে পড়েছে। লোকটা বসে পড়েছে চালকের আসনে তবুও মেয়ে তাকিয়ে আছে সেই দিকে। গাড়ি চলতে শুরু করল। একরাশ কালো ধোঁয়ায় মাঝখান বেরিয়ে এসে ছুটে বাবাকে ধরে ফেলল নন্দিতা।

চলবে

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-৮

কাল রাতে চন্দন আর জয়িতার কথা কেউ শুনতে পায়নি। এমনিতে ওদের কথা কেউ শুনতে পায়ও না। চন্দন বাড়ির ব্যতিক্রমী ছেলে। মা, বাবা বা বোন সবাই যতক্ষণ জেগে থাকে, বক বক করে। সেখানে ওর মুখে প্রয়োজনের বাইরে একটাও কথা নেই। বউটাও হয়েছে সে রকম। ওদের মেয়ে টুম্পা আবার দাদু ঠাকুমার মত। চন্দনের মা বলে, পুরো পিসির ধারা পেয়েছে মেয়েটা। সারাদিন ওর কলকাকলিতেই বাড়িটা ভরে থাকে। হয় ভাইয়ের সঙ্গে খেলছে, নাহলে দাদুভাইয়ের সঙ্গে গল্প করছে আর নাহলে ঠাকুমার সঙ্গে খুনসুটি করছে। আর কারোর সঙ্গে কথা না বললে একা একাই গলা ছেড়ে গান করছে। 

জয়িতাকে নন্দিতা প্রথম প্রথম বলত, ‘আমি গুনেছি বউ’দি আজ সারাদিনে তুমি মোট কুড়িটা বাক্য বলেছ।’ শুনে বাবা অশোকবাবু হাসতেন। 

নন্দিতা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করত, ‘আচ্ছা বৌদি, তোমরা ঝগড়া না করে কি করে থাক গো?’ 

জয়িতা উত্তর দিত না। প্রতিমাদেবী বলতেন, ‘এ আবার কি রকম অলক্ষুনে কথা। ঝগড়া করবে কেন?’ যেন স্বামীস্ত্রীর ঝগড়া হওয়ার মত অস্বাভাবিক ঘটনা কিছু নেই এই দুনিয়ায়। 

‘বাব্বা, তুমি আর বল না। ঝগড়া করবে কেন? তোমাদের একদিন ঝগড়া না করলে খাবার হজম হয়?’ ননদের কথা শুনে আর শ্বশুর-শাশুড়ির নিয়মিত ঝগড়া করার দৃশ্যগুলো ভেবে জয়িতা মজা পেত। 

প্রকাশ্যে জয়িতা-চন্দনকে কেউ ঝগড়া করতে দেখে নি। নন্দিতার মতে, ঝগড়া না হলে দাম্পত্যজীবন কেমন যেন অস্বাভাবিক। গতকাল রাতে সেই স্বাভাবিক ঘটনাটা যদি নন্দিতার সামনেই ঘটত ও কতটা খুশি হত কে জানে! 

চন্দন চায় না এবারে পুজোয় জয়িতা বাপেরবাড়ি যাক। বোনটা বছরে একবার কি দুবার আসে। বাচ্চা হবার পর থেকে আসা আরও কমে গিয়েছে। ছোট ভাগ্নেটা আসছে, এমন সময় বাড়িতে জয়িতা না থাকলে খারাপ দেখাবে না?

জয়িতার বক্তব্য, ‘আমারও বাবা মা আছে। তাদেরও ইচ্ছে করে তাদের একমাত্র মেয়ে পুজোর সময় তাদের কাছে থাকুক।’

‘তোমার আর বুনির ব্যাপার দুটো এক হল?’ জানতে চেয়েছিল চন্দন।

তাতেই জয়িতা রাগে, অভিমানে, কান্নায় ফেটে পড়েছিল। ‘কেন এক হবে না? তোমার বোন চাকরি করে বলে? ওর জন্যে কোনও নিয়ম নেই? যত নিয়ম সব আমাকে মানতে হবে? আমি ছেলের অন্নপ্রাশনের পরের দিন বেরোতে পারব না। আমি একা একা যেতে পারব না। অমাবস্যা-পূর্ণিমা, লক্ষণ-অলক্ষণ সব আমার জন্যে? আবার নিয়মগুলো সব তোমাদের সুবিধামত। তোমার বোন আসবে আর আমি কোথাও যেতে পারব না। আমাকে বুঝিয়ে বল, কেন দুজনেরটা এক হবে না?’

‘এত হিংসা কিসের তোমার?’ হিসহিসিয়ে উঠল চন্দনের গলা। 

 ‘হিংসা?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল জয়িতা।

জয়িতার কথার উত্তর না দিয়ে চন্দন বিরক্তি প্রকাশ করেছিল, ‘তুমি যাবে যাও। আমি যেতে পারব না।’

‘যেতে হবে না তোমাকে। তোমার বোন একা আসতে পারে আর আমি পারি না? আমি ছেলেমেয়েদের নিয়ে দিব্যি চলে যেতে পারব। তারপর তোমরা যত খুশি ন্যাকামো কর তোমার বোনকে নিয়ে।’ 

চন্দন ক্লান্ত হয়ে এলিয়ে পড়েছিল বিছানায়। এরকম সময় ওর নিজেকে খুব অসহায় লাগে। এসব কথা কোথা থেকে উঠে আসে ও ভেবে পায় না। চন্দন বলতে চেয়েছিল, জয়িতার তো কাছেই বাপেরবাড়ি। ইচ্ছে করলেই ও যেকোনও সময় যেতে পারে। বুনির অত দূর থেকে আসা হাজার ঝক্কি। কিন্তু জয়িতা কি বুঝবে সে কথা! কেনই বা বুঝবে না! চন্দন নিজেই বা কেন ওরকম রেগে গিয়ে উল্টোপাল্টা বলতে শুরু করে দিল কে জানে! 

বউকে ছেড়ে চন্দন থাকতে পারে না। সেকথা ভালো ভাবেই জানে জয়িতা। তাই একা একা জয়িতার কখনও বাপেরবাড়ি যাওয়া হয় না। চন্দন সঙ্গে করে নিয়ে যায় আবার সঙ্গে করে নিয়ে আসে। প্রতিমাদেবী এই নিয়ে প্রথমদিকে একটু কটাক্ষ করেছিলেন, ছেলেটা না আবার ঘরজামাই হয়ে যায়! তবে এখন ব্যাপারটা সবার কাছেই গা সওয়া হয়ে গিয়েছে।

চন্দন ভাবল জয়িতাকে একবার বলে, ‘তুমি না থাকলে আমার ভাল লাগে না।’ পরক্ষনেই মনে হল, সেটা বেশি নাটকীয় হয়ে যাবে। ওদিকে জয়িতা চুপ করে আছে, মুখটা পাথরের মূর্তির মত। রেগে রগে জামা কাপড় গোছাচ্ছে। নিজের, ছেলের আর মেয়ের। স্পষ্ট ইঙ্গিত, ‘তুমি অনুমতি দিলে কিনা, সঙ্গে গেলে কিনা তাতে কোনও পরোয়া নেই, আমি যাবই।’ 

‘সত্যি কি ছেলেমেয়েদের নিয়ে জয়িতা চলে যাবে একা একা?’ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল চন্দন।

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-৭

‘রাস্তার দুপাশে কেমন জঙ্গল জঙ্গল! কেন?’ আপনমনে প্রশ্ন করল ভিনদেশী, পার্থ।

‘জায়গাটার নাম দেখলে? বসুধা।’ অখিলকে বলল সন্তোষ।

অখিল পেছন দিকে ঘাড় কাত করে নন্দিতাকে বলল, ‘দিদি অনেকক্ষণ থেকে চুপ করে আছেন। কিছু বলছেন না যে! আপনি আমাদের যত প্রশ্ন করেছেন, আমরা তার উত্তর দিয়েছি। এবার আমাদের প্রশ্নগুলোর আপনাকে উত্তর দিতে হবে। সবার আগে আপনার ছেলের প্রশ্নটার উত্তর দিন। গরুর গাড়িতে ব্রেক নেই, তাহলে গাড়ি কি করে থামে?’

‘এই প্রশ্নটার উত্তর আমার হয়ে তুমিই দিয়ে দাও। তবে যাই বল সন্তোষ, জায়গার নামগুলো কিন্তু বেশ সুন্দর। বসুধা ছাড়াও আশেপাশে আছে বনকাঠি, বনসংখ্যা। ইলামবাজার পেরোলে বনের পুকুর, বনভিলা।’

পার্থ নন্দিতার দিকে ঘুরে বলল, ‘আর জঙ্গলের ব্যাপারটা?’

নন্দিতা বলল, ‘এই যে দেখলেন বাঁদিকে কিছুক্ষণ আগে গরুর গাড়িটা নেমে গেল। আরও এগিয়ে গেলে জঙ্গল ঘন হবে। বড় বড় গাছ দেখতে পাবেন। জঙ্গলটার নাম গড়জঙ্গল। স্কুলের বইয়ে পড়া গৌরবঙ্গের ইতিহাস মনে আছে? মনে আছে পালবংশ বা সেন বংশের কথা? ওই সময় এদিকটা গোপভূমি বলে পরিচিত ছিল। গোপ কথাটার মানে হল গোয়ালা। ওই গোয়ালাদেরই একজন ছিল খুব সাহসী আর উচ্চাকাঙ্ক্ষী। নাম ইছাই ঘোষ। আসল নাম ঈশ্বর ঘোষ। সে খাজনা দিতে অস্বীকার করে নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা করে এবং একজন স্থানীয় রাজা কর্ণ সেনকে পরাজিত করে এই অঞ্চলের একছত্র অধিপতি হয়।’

অখিল ও সন্তোষ দুজনেই ঘুরে বসেছে। অখিল জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর?’

মনযোগী শ্রোতা পেয়ে নন্দিতার উৎসাহ দ্বিগুণ হল, ‘কর্ণ সেনের ছেলে বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন ইছাই ঘোষকে খুন করে। অজয় নদীর ধারে ওই জায়গাটাকে তাই লোকে বলত, কাঁদুনে ডাঙা। জায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর। একটাদিক ঘন সবুজ আর অন্যদিকে অজয়ের ক্ষীণ ধারা। এই বালি, এই জল। ওখানেই বানানো আছে পাতলা ইট দিয়ে তৈরি এক ওয়াচ টাওয়ার। টেরাকোটার কাজ করা। অনুমান ন’শ বছর আগের তৈরি। কে বানিয়েছিল সে নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু ওটা পরিচিত ‘ইছাই ঘোষের দেউল’ নামে।’

পার্থ জিজ্ঞেস করল ‘দিদি, আপনি কি ইতিহাস পড়ান?’ 

এই প্রথম ওরা জিজ্ঞেস করল নন্দিতা পড়ায় কিনা? নন্দিতা যখন সবার খবর নিচ্ছিল, ওরা জানতে চেয়েছিল ওর বর কি করে। নন্দিতা এসবে অভ্যস্ত। কলেজের চাকরিতে প্রথমদিকে ছাত্রছাত্রীরা ওকে টিচার বলে বুঝতে পারত না। কলেজের গেটকিপার ছাত্রী ভেবে ভুল করত। বাসে টিকিটের পয়সা দিলে কন্ডাকটর জিজ্ঞেস করত কোথায় নামবে। কলেজের নাম বলতেই সে তিন ভাগের একভাগ ভাড়া নিয়ে পয়সা ফেরত দিত। নন্দিতা ফিরিয়ে দিয়ে গেলে বলত, ‘না না কার্ড দেখানোর দরকার নেই আমরা স্টুডেন্টদের কনশেসন দিই।’ পরের দিকে নন্দিতা চাকরি করে শুনে অনেকেই জিজ্ঞেস করত, ‘কি চাকরি?’ উত্তর দেবার আগে তারাই বলত, ‘স্কুলে? কি বিষয়?’ তাই নন্দিতা বুঝতে পেরেছে এই চেহারা নিয়ে বড়জোর স্কুলের দিদিমনি পর্যন্ত হওয়া যায়। তাই চট করে নিজের পেশা নিয়ে ও কিছু বলে না। যারা প্রশ্ন করে তারা নিজেরাই খুশি মত উত্তর বেছে নেয়। কখনও কোনও নাছোড়বান্দার পাল্লায় পড়ে যখন বলতেই হয়, ‘কলেজে পড়াই’, নন্দিতার নিজেকেই তখন কেমন অপরাধী বলে মনে হয়। বরং পাঁচজনের মাঝে নিজের চেহারাটা মিশে গেলে ও খুব স্বস্তি পায়। 

নন্দিতা বলল, ‘না ভাই ইতিহাস পড়াই না। তবে সুযোগ পেলে পড়ি। আরও শুনবে?’

নন্দিতার কোল থেকে দুষ্টু বলল, ‘মা পড়ায় তো! মাই মাদার ইজ এ টিচার।’

নন্দিতা একটু জোরে চেপে ধরল দুষ্টুকে। দুষ্টুর কথায় ওরা কান না দিয়ে বলল, ‘শুনি দিদি, বলুন।’

নন্দিতা শুরু করল, ‘এই জায়গাটা আরও একটা কারনে বিখ্যাত। অনুমান এক হাজার বছর আগে, সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেন গৌড়ের রাজধানী থেকে বিতাড়িত হয়ে এই জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখানে একটা পুরনো দূর্গামন্দির আছে। সম্ভবত বাংলাদেশের প্রাচীনতম দূর্গামন্দিরগুলোর একটা। নাম শ্যামারূপা। পুরনো মন্দির অবশ্য অনেক আগেই ভেঙে গিয়েছে। পরে বর্ধমানের রাজপরিবার থেকে নতুন মন্দির তৈরি করে দেওয়া হয়। দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় হেতমপুরের রাজপরিবারকে। ওখানে এখনও দূর্গাপুজো হয়, মেলা বসে।’

‘ইছাই ঘোষের দেউল নাকি আর্কিওলিজাক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সংরক্ষিত মনুমেন্ট!’ সন্তোষ বলল।

নন্দিতা বলল, ‘ঠিকই জান। একবার ভাব। আমরা কুতুবমিনার দেখতে যাই, চারমিনার দেখতে যাই। কত দূর দূর যাই বেড়াতে! আর বাড়ির কাছের জিনিসের খোঁজ রাখি না।’

অখিল বলল, ‘আমার তো এখনই ওখানে যেতে ইচ্ছে করছে। গাড়িটা যদি ঠিকঠাক হত তাহলে একটা চান্স নেওয়া যেত। আপনি গিয়েছেন কখনও?’

নন্দিতা উত্তর দিল, ‘গিয়েছি বছর কয়েক আগে। যায়গাটা বর্ধমানজেলা বলে সে কি দুঃখ আমার!’

সন্তোষ বলল, ‘কেন? নদীর ওপারে হলে কি আপনাদের সম্পত্তি হয়ে যেত?’

সন্তোষের প্রশ্ন শুনে নন্দিতাসহ সবাই হেসে উঠল। ট্যাক্সি উঠে পড়ল অজয় নদীর উপরে সংকীর্ণ সেতুতে। দুষ্টু টেনে নন্দিতার ঘাড়টা ঘুরিয়ে দিল জানলার দিকে। শুধোল, ‘এটা কি মা?’

নন্দিতা বলতে শুরু করল, ‘আমাদের ছোটনদী চলে বাঁকে বাঁকে... ।’ নন্দিতার কবিতা পাঠ শেষ হতে এবং ছেলেকে তার মানে বোঝাতে বোঝাতে ওরা ইলামবাজার পেরিয়ে গেল। সেই ফাঁকে চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে প্যাকেট ভর্তি চিপস আর কোল্ডড্রিঙ্কস নিয়ে এসে চলন্ত গাড়িতেই চাপল সন্তোষ।

দুষ্টু দেখেশুনে বলল, ‘আঙ্কেল, আমরা কি জঙ্গলে পিকনিক করতে যাচ্ছি?’

নন্দিতা বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ সন্তোষ। প্যানিককে পিকনিকে পরিণত করার জন্যে।’

পার্থ বলল, ‘আপনি তো বেশ ইন্টারেস্টিং মানুষ।’

এর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ। এই বীথিপথের শোভা উপভোগ করার সুযোগ পেল না ওরা। ওদের সামনে লাইন ধরে তখন গরুর শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে।

পার্থ বলল, ‘এত গরু আবার কোথা থেকে এল?’

অখিল বলল, ‘সুখবাজারের হাট থেকে।’

নন্দিতা বলল, ‘এরকম এক হাট থেকে গরু কেনার বর্ণনা পাই তারাশঙ্করের ‘কালাপাহাড়’ গল্পে। না না দাঁড়াও কালাপাহাড়ের চেয়েও ‘চিনু মন্ডলের কালাচাঁদ’ গল্পটার সঙ্গে বেশি ফিট করে জায়গাটা। সেখানে সুখবাজারের হাটের কথা আছে, এই জঙ্গলটার কথাও আছে। তোমাদের কারোর মনে আছে কি?’

সন্তোষ বলল, ‘ইতিহাস হল, কবিতা হল, এবারে গল্প। দিদি, সময় পেলে আপনি আর কি কি পড়েন?’ নন্দিতা বলল, ‘খবরের কাগজ পড়ি। বাংলা পত্রিকা পড়ি। গল্পের বই পড়ি। বুঝতে পারলে না, ওই খবরের কাগজ আর গল্পের বই পড়া বিদ্যে দিয়ে আমি তোমাদের এতক্ষণ রক্ষা করলাম।’

‘রক্ষা!’ পার্থ, সন্তোষ ও অখিল একসঙ্গে বিস্ময় প্রকাশ করল।

‘দেখেছ? তোমরা ভুলেই গিয়েছ যে এখন তোমরা এমন একটা গাড়িতে, যার ব্রেক পর্যন্ত ঠিক নেই।’

ওরা সকলে একসঙ্গে হেসে উঠল। পার্থ বলল, ‘এই গরুগুলোকে এত সন্মান নিশ্চয় এর আগে কেউ দেয় নি। দেখুন আমাদের গাড়ি কেমন ওদের আগে যাবার জন্যে রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে। এরও একটা ভাল দিক আছে। গাড়ি এই গতিতে চললে উল্টে গেলেও কোনও দুর্ঘটনা ঘটবে না।’

‘আর কিছু হবে না। হলে এতক্ষণ হয়ে যেত। বোলপুর আর বেশি দূর নয়। দিদি খুব জমাতে পারেন আপনি। নাহয় কালাপাহাড় গল্পটাই বলুন। শুনতে শুনতে যাই।’ সন্তোষ বলল।

‘তোমরা কেউ গান জান না? একটা গান ধর না!’ নন্দিতা বলল। কে বলবে ক’ঘন্টা আগে ওরা কেউ কাউকে চিনত না। পেছন থেকে পার্থ শুরু করল, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়...’

‘ভগবান! এখন এই গানটা মাথায় এল? পথ শেষ হবার আশাতেই তো সেই কখন থেকে প্রাণ হাতে করে বসে আছি।’ বলেই নন্দিতা গলা মেলাল পার্থর সঙ্গে। একে একে অখিল আর সন্তোষও গাইতে শুরু করল। সুরে-বেসুরে মুখরিত হয়ে উঠল ওই ভাঙ্গাচোরা ট্যাক্সি।

(চলবে)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-৬

দোকানের সাইনবোর্ড দেখে বোঝা গেল জায়গাটা মুচিপাড়া। সন্তোষ আবার ফিসফিস করছে অখিলের কানের কাছে, ‘দেখেশুনে কি ট্যাক্সি এনেছ বুঝতে পারছ? এখনও আমরা দুর্গাপুর থেকেই বেরোতে পারলাম না।’

নন্দিতা আগ বাড়িয়ে বলল, ‘দুর্গাপুর থেকে বোলপুর আর কতটুকুই বা রাস্তা! বাস হলে থেমে থেমে যেত। এ তো দুর্গাপুর প্রায় শেষ এবার দেখ গড়গড়িয়ে চলবে।’

দুষ্টু কোল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আঙ্কেল, আমরা কি বোলপুর এসে গেছি?’

নন্দিতা বলল, ‘এখনও আসি নি। তবে আর একটুখানি অপেক্ষা কর। বোলপুর পৌঁছে যাব।’

পেছনের সিটে পার্থ উঠে থেকেই ঘুমের ধান্দা করছে। নন্দিতা শুধোল, ‘কোথা থেকে আসছেন?’

‘গুরগাঁও।’ বলেই চোখ বন্ধ করল পার্থ।

অখিল ও সন্তোষ ড্রাইভারের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করল, ‘এবার রাস্তা খালি, স্পীড বাড়াও।’ 

ড্রাইভার কোনও সাড়াশব্দ দিল না। ওদের কথাগুলো লোকটা শুনতে পাচ্ছে কিনা সেটাও বোঝা গেল না।

‘একটা চিমটি কেটে দেখ তো ড্রাইভারবাবু জেগে আছেন কিনা!’ বলতে বলতে নন্দিতা কলার প্যাকেট খুলে সবাইকে বিলিয়ে দিল। শুধু তাপউত্তাপহীন ড্রাইভার আর ঘুমন্ত পার্থকে দেবার কথা ওর মাথায় এল না।

টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। মেঘলা মেঘলা হাওয়া আসছে জানলা দিয়ে। একদল মানুষ চুপচাপ যাবে এতটা রাস্তা! নন্দিতা মানতে পারল না। দুষ্টুর খাওয়া শেষ হতেই নন্দিতা কয়েকটা প্রশ্ন শানিয়ে নিল। তারপর এক এক করে সামনে ছুঁড়তে লাগল প্রশ্নগুলো, ‘তোমরা কি কাজ কর? কোথায় থাক? ওখানে কতবছর আছ? বিয়ে হয়েছে? তোমাদের দুজনেরই কি বোলপুরেই বাড়ি? বোলপুর থেকে কোন দিকে যাবে তাহলে?’ 

অখিল আর সন্তোষ একে একে সব প্রশ্নের উত্তর দিল। মিলিটারি, আর্মি, প্যারামিলিটারি এসব যে আলাদা নন্দিতা এই প্রথম জানল। ওদের পরস্পরের কি তফাৎ তাও জানল। সেসব জেনে ওর আনন্দ দেখে অখিল আর সন্তোষ অবাক। 

সন্তোষ জানতে চাইল নন্দিতা কোথা থেকে আসছে।

নয়ডা বলায়, অখিল দুষ্টুকে দেখিয়ে নন্দিতাকে শুধোল, ‘ওর বাবা নয়ডায় কিসের চাকরি করেন?’ 

নন্দিতার উত্তর দেওয়া হল না। তীরের ফলার মত বৃষ্টির ফোঁটা ঢুকতে শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে। চারিদিক সাদা করে মুশলধারে বৃষ্টি নেমেছে।

‘এখন কি করে এগোবে? এখনও যে পানাগড় পেরোতে পারলে না।’ বিরক্ত সন্তোষ ড্রাইভারকে বলল। পার্থ নিজের দিকে কাচটা তুলে দিয়ে আবার চোখ বন্ধ করল। কাচ তুলতে গিয়ে নন্দিতা বলল, ‘তোমরা একটু দেখবে, এই কাচটা উঠছে না।’ দুষ্টু আনন্দে নাচতে শুরু করেছে। বৃষ্টি দেখে ওর চনমনে ভাবটা ফিরে এসেছে। কেবল হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে বাইরে। অখিল ধাক্কাধুক্কি দিয়ে অর্ধেকের উপর তুলল নন্দিতার পাশের কাঁচটাকে। বাকিটা আর উঠল না। সন্তোষ নিজের বাঁপাশের কাঁচটা যেই তুলতে যাবে এমন সময় ওরা প্রথমবার গম্ভীর ড্রাইভারের গলার স্বর শুনতে পেল। ‘পেচনের কাঁচ এর বেশি উঠবে না। আর সামনেরটা চেষ্টা করে লাভ নাই,  ভাঙ্গা। শুধু ওই একটাই জানলা আস্ত।’

‘ঠিক আছে জানলা ভাঙ্গা না হয় মেনে নিলাম। গাড়িটা একটু জোরে চালাতে পারছ না?’ সুযোগ বুঝে বলল অখিল।

ড্রাইভার বলল, ‘জোরে চালাব? এখন গাড়ি চলবে কি করে তারই ঠিক নাই। দেকচেন না জলে ভাসচে সামনের কাঁচ। গাড়িতে ওয়াইপার নাই তো।’

‘তার মানে?’ সন্তোষ চিৎকার করল। পার্থ চোখ খুলে টানটান হয়ে বসল।

যেন কিছুই হয় নি এমন ভাবে ড্রাইভার বলল, ‘আসলে বাবু, এই গাড়ি চালানোর অবস্থায় নাই। বেপদ তোমাদের একার লয়, আমারও সমান বেপদ। আজ যদি আমি না আসতাম তাইলে আমার ঘরে হাঁড়ি চড়ত না। তাই আমি জেনেশুনেই এই বেপদ ঘাড়ে লিইচি।’

সকলে হতবাক। নন্দিতা বলল, ‘বিপদ! আমরা কোথায় বিপদে ছিলাম। তোমরা চিটিংবাজ। জেনেশুনে এরকম গাড়িতে চাপালে। শুধু কটা টাকার জন্যে? এখন কিছু হলে তার দায়িত্ব কে নেবে, তুমি?’

লোকটা কি বুঝল কে জানে! বলল, ‘গাড়ি কি আমার গো দিদিমনি? যে আপনাদিকে গাড়িতে তুলেচে, সেই তো মালিক। আমাকে তো ওই ডাকলে। আমি সকাল থেকে কাজ পাই নাই, তাই চলে এলাম।’

সামনের কাচ জলে ভাসছে, মোছার উপায় নেই। লোকটার নিরীহ নিষ্পাপ স্বীকারোক্তিতে ওরা রাগ করতে ভুলে গেল। গম্ভীর পরিবেশকে হাল্কা করতে পার্থ বলে উঠল, ‘এখন অষ্টমীর মহালগ্ন। সবাই প্রানের দায়িত্ব বরং মাকেই দাও। ভুল যখন হয়েই গিয়েছে, ভেবে কি হবে?’ তারপর ড্রাইভারকে বলল, ‘তোমার নাম কি? আমরা সবাই যখন এক নৌকায়, নামটা জেনে রাখি!’

নন্দিতা পার্থর সঙ্গে মজা করল, ‘সম্ভবত ড্রাইভারবাবুর নাম পার্থসারথি। স্বয়ং আপনি যেখানে যাত্রী।’

সামনে থেকে লোকটা জানাল তার নাম রামু।

সন্তোষ ফুট কাটল, ‘ওই হল। যে রামু, সেই কেষ্টা।’

মিনিট পনের একটা দমবন্ধ করা নীরবতায় কাটল ওদের। তারপর বৃষ্টি থামতেই রামু নেমে গামছা দিয়ে কাচটা মুছে দিল। বনেট খুলে জল ঢালল। নিজে খাবে বলে জলের খোঁজ করতে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল টলমল পায়ে। অখিল আটকাল ওর মিনারেল ওয়াটারের বোতলটা এগিয়ে দিয়ে।

দ্বিতীয় দফার যাত্রা শুরু হল ওদের। পার্থ আর ঘুমোনর চেষ্টা করছে না। নন্দিতা ওকে একগুচ্ছ প্রশ্ন করে ফেলেছে। পার্থর বাড়ি শিলিগুড়িতে। বোলপুরে শ্বশুরবাড়ি। বছর খানেক আগে বিয়ে হয়েছে। বউকে এবারে নিয়ে যাবে। বৌ শান্তিনিকেতনে বিএড করছিল তাই বোলপুরেই ছিল এতদিন। গুড়গাঁওয়ে পনের হাজারে একটা এককামরার ঘর নিয়েছে পার্থ। পার্থর কথা শুনতে শুনতে আবার রামুর সরল, নিষ্পাপ বানী ভেসে এল, ‘গাড়ির তো আসলে বেরেক নাই ...।’  

‘মানে?’ কিছুক্ষণ আগে বিতরণ করা জ্ঞান নিজেই ভুলে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আর্তনাদ করে উঠল পার্থ।

নন্দিতা দুষ্টুকে বুকে চেপে তোতলাতে শুরু করল, ‘কি কি কি হ হ হবে তাহলে?’

অখিল পেছনে ঘুরে বলল, ‘দূর্গানাম জপ করুন ম্যাডাম। যা করবেন মা দূর্গা।’

রাস্তার ধারে তখন দেখা যাচ্ছে একটা ছাউনি। লেখা আছে ‘প্রতিক্ষালয়’। 

দূরে কোনও পুজো প্যান্ডেল থেকে ভেসে আসছে গান, ‘এবার আমার উমা এলে, আর উমা পাঠাব না।’ 

একটা গরুর গাড়ি ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ করে পিচ রাস্তা থেকে পাশের লাল মোরামের রাস্তায় নেমে গেল। দুষ্টু জিজ্ঞেস করল, ‘মা, গরুর গাড়িতে তো ব্রেক নেই, স্টিয়ারিং নেই। তাহলে গাড়ি ব্যাক করে কি করে? কি করে থামে?’

(চলবে)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-৫

আজকের দিনটাই কি রকম গোলমেলে ভাবে শুরু হয়েছিল রামুর। ছেলেটা বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতা গিয়েছে, পুজোটা ওখানেই কাটবে। পুজোর বাজার করতে এসে মেয়েটাকে ওর মাসি নিয়ে গেল। এসব রামুর বাড়িতে খুব স্বাভাবিক ঘটনা। পুজো বলে আলাদা কোনও আনন্দ ওর বাড়িতে কোনদিন ছিল কিনা রামুরই আর মনে পড়ে না। সংসারটা তো ঠিক সংসারের মত করে করা হল না কোনওদিন। ও নিজেই পারে নি। বৌ, ছেলে, মেয়ে যে যার নিজের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে নিজের নিজের ঘাড়ে। বাধ্য হয়েই নিয়েছে। তবুও পুরুষমানুষ হিসেবে, স্বামী হিসেবে, বাবা হিসেবে রামু নিজের দায়িত্বকে অস্বীকার করে কি করে! পুজোর দিনে শুকনো মুখে ঘরে বসে থাকার চেয়ে ওরা নিজেদের মত আনন্দ করবে সেই ভাল। 

সেই কবে বাঁকুড়ার গণ্ডগ্রাম ছেড়ে চলে এসেছিল বাবা। তারপর একদিন মাকে আর ওকে ছেড়ে দিয়ে অন্য মহিলাকে নিয়ে ঘর বেঁধেছিল। কাজের খোঁজে এদিক ওদিক করা শুরু হয়েছিল তখনই। তারপর মা মারা যেতে রামুর জীবনের আর কোনও নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না। দরকারে রোজগার করত, নাহলে করত না। এরকম একজন দামড়া ছোঁড়া ঘুরে বেড়ায় দেখে পাড়ার মধুদা ওর শালিকে রামুর গলায় ঝোলাবার চেষ্টা করল। মধুদার শালিকে দেখে অবশ্য মাথা থেকে ‘ঝোলানো’ কথাটা বেরিয়ে যায় ওর। পূর্ণিমাকে ওর খুব ভালো লেগে গিয়েছিল। মধুদার ঘরে বসে মনে হয়েছিল এরকম একটা শ্রীছাঁদ ওয়ালা সংসার ওর নিজেরও হতে পারে। সেই থেকে কাজকর্ম নিয়ে ভাবতে শুরু করা। মধুদাই তখন ওর চেনা কন্ট্রাক্টরকে ধরে রঙের কাজ জুটিয়ে দিয়েছিল। সেই কাজ অনিশ্চিত বলে তার সঙ্গে ড্রাইভিং শেখার বুদ্ধিটাও মধুদার। 

মন্দ চলছিল না। ট্যাক্সি চালানোটা তখন রামুর বাঁধাধরা পেশা। আর রঙের টিন হাতে বেরিয়ে পড়াটা উপরি। রামু ততদিনে এক ছেলে আর এক মেয়ের বাবা। বৌ-বাচ্চাদের ভালো রাখার জন্যে বাড়তি পরিশ্রমে ওর কোনও আপত্তি নেই। পূর্ণিমা আর ও মিলে স্বপ্ন দেখছে আর একটু পয়সা জমলেই নিজের গাড়ি কিনবে। রং করার কাজটা ছেড়ে দেবে তখন। ওতে অনেক ঝুঁকি। 

শেষ পর্যন্ত সেই ঝুঁকির হাত থেকে রামু রেহাই পেল না। ট্যাক্সি কেনার স্বপ্ন যখন প্রায় সফলতার কাছাকাছি, বিপদ ঘটল তখনই। তিনতলা বাড়িটার প্যারাপিটে রং করতে গিয়ে পড়ে গেল। তিনমাস পরে হাসপাতাল থেকে যখন ছাড়া পেল, তখন গায়ের জোর বা মনের জোর তলানিতে। কট্রাকটারের কাছ থেকে যা টাকা আদায় হল তা হাসপাতাল আর ওষুধের খরচ মেটাতেই শেষ। শেষ ওর ট্যাক্সি কেনার জন্য জমানো টাকাও। সংসার কি করে চলবে সেটা বুঝে ওঠার আগেই দেখল পূর্ণিমা বাড়ি বাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজ নিয়েছে। বাবা চলে যাবার পর মাও লোকের বাড়িতে কাজ করত। মা’র এই বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করা ভাল লাগত না ওর। নিজের বৌকেও শেষপর্যন্ত সেই পথেই পাঠাল! বুকে মোচড় দিলেও রামুর কিছু করার ছিল না। দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসারটা চালাতে হবে তো! একটু সুস্থ হতেই রামু কেশবাবুকে ধরেছিল। কেশবাবু জানিয়েছিলেন ওর এই শারীরিক অবস্থায় ওকে গাড়ি চালানোর কাজ দেওয়া যাবে না। তবে বিয়ে বা অনুষ্ঠানের সিজন থাকলে দেখা যাবে। তাই অনিশ্চিতভাবে হঠাৎ হঠাৎ দুএক পয়সা সংসারে জোগান দিত তখন। আসল দায়িত্ব পুরোটাই পূর্ণিমার। লোকের বাড়ি বাসন মেজে, কাপড় কেচে আর ঘর মুছে কার্তিক আর রুমিকে বড় করে ফেলল পূর্ণিমা। কার্তিক নিজের বুদ্ধিতে কলেজে পড়া প্রায় শেষ করে এনেছে। ছেলে পড়িয়ে, বৃত্তি পেয়ে লেখাপড়া করেছে ও। ছেলেকে নিয়ে আর কোনও চিন্তা নেই। ছেলে এখন নিজেই সংসার খরচ দেয়। পূর্ণিমাকে লোকের বাড়িতে কাজ করতে যেতে দেয় না কার্তিক। 

ছেলেটা কলকাতা যাবার আগে পূর্ণিমাকে টাকা দিতে ভুলে গিয়েছে হয়ত। সকালবেলা উঠে পূর্ণিমা জানাল বাড়িতে চাল নেই। আলু, পেঁয়াজ কিছুই নেই। টাকাও নেই। সকাল থেকে নিজের ভাগ্যকে দুষছে পূর্ণিমা। এক কাপ চা খাবার ইচ্ছে ছিল রামুর। এদিকে খাবারের জোগান নেই দেখে মরে যেতে ইচ্ছে হল ওর। ঘর থেকে টুকটুক করে বেরিয়ে পড়ল ও। উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গিয়েছিল অনেকটা দূরে। জীবনদার দোকানে ধোঁয়া উঠছে দেখে ওখানেই বসে পড়েছিল। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়ে নি। তার উপর এতটা হাঁটার ফলে পা, কোমর সব টনটনিয়ে উঠছে।  

দোচালা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে রামু দেখল রাস্তার উল্টোদিকের পেট্রোলপাম্প থেকে হাত ইশারা করে ডাকছেন কেশবাবু। এক চুমুকে বাকি চা টুকু গলায় ঢেলে দিয়ে খুরিটা ভাঙ্গা টিনে ফেলে দিল রামু। দোকানের ভেতর উঁকি দিয়ে বলল, ‘পরে আসব।’ জীবনকে চায়ের দামটা দেওয়া হল না। রামু পা টেনে টেনে রাস্তা পেরিয়ে এল। 

কেশবাবু আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন ‘এই গাড়িটা বোলপুরে যাবে। প্যাসেঞ্জাররা যে রকম বলবে সেরকম পৌঁছে দিবি। তেল ভরার টাকা ওরা দিয়ে দিয়েছে। ওদের কাছ থেকে তিনশ আশি টাকা গুনে নিবি।’ 

গাড়িটা রামুর চেনা। অনেকবার চালিয়েছে ও। রামুকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কেশবাবু বললেন, ‘দু’শটাকা দেব তোকে। আজকাল তেলের দাম কত জানিসই তো। তাড়াতাড়ি ঠিক কর যাবি কিনা।’ কেশবাবুর বড়দাদার কাছে আগে কাজ করত রামু। সেখান থেকে বাতিল হয়ে যাবার পর কেশবাবুকেই ধরেছিল। বয়েসে ছোট হলেও রামুকে তুই বলে ডাকে অনেকগুলো ট্যাক্সির মালিক সোমনাথ কেশ। সে ডাকুক গে। রামুর কিছু মনে হয় না। দু’শটাকা মানে শুধু আজ নয়, পরপর ক’দিন চলে যাবে ওতে। রামু দ্বিতীয়বার ভাবল না। রাজি হয়ে গেল কেশবাবুর প্রস্তাবে।

(চলবে)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-৪

পিঠে ব্যাকপ্যাক, একহাতে স্যুটকেস, অন্যহাতে দুষ্টুকে নিয়ে অদ্ভুত কায়দায় ব্যালেন্স করতে করতে প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে এল নন্দিতা। সামনে একজনকে পেয়ে জিজ্ঞেস করল ‘বোলপুরের বাস কোথায় পাবো বলতে পারেন?’ লোকটা আঙ্গুল দিয়ে দিক নির্দেশ করল।

‘ও দাদা, বোলপুরের বাস কখন পাবো?’  আরও একটু এগিয়ে গিয়ে নন্দিতা পানগুমটির জটলাকে লক্ষ্য করে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল।

ওই জটলার মাঝখান থেকে একজন চেঁচিয়ে জানাল, ‘সকাল আটটায় একটা বোলপুরের বাস বেরিয়ে গিয়েছে দিদি। অপেক্ষা করে দেখুন আবার কখন আসে!’

‘কোথায় সকাল আটটা আর কোথায় বেলা বারোটা!’ নন্দিতার পরের কথাগুলো আর কেউ শুনল না। গলার জোর থাকলেও ওর চেহারা অতি সাধারণ। বহিঃরঙ্গে চোখে পড়ার মত কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। তার উপর কাল সকাল থেকে রাস্তায় হরেক ধকল চলছে। পরনের জামাকাপড় কুঁচকে দলা পাকিয়ে গিয়েছে। চুলটাও আঁচড়ানো হয় নি। একজন ভদ্রমহিলা ছোট ছেলেকে নিয়ে বিপদে পড়েছে একথা কারোর মনে হল না। তবুও কিছুক্ষণের মধ্যেই নন্দিতার চারিপাশে ক’জন বোলপুরের যাত্রী জড়ো হয়ে গেল। সবাই রাজধানী এক্সপ্রেস থেকে নেমেছে। নন্দিতার ধারনা তারা ওরই কণ্ঠস্বরে আকৃষ্ট হয়ে জুটেছে। ‘বোলপুর’ বা ‘বোলপুরের বাস’ শব্দ সহযোগে ও প্রশ্ন ছুঁড়েছিল আর ওর সঙ্গে তাল মিলিয়ে লোকজনও জোরে জোরে উত্তর দিয়েছে। তাই যে কারোর মনে হতেই পারে বোলপুরের বাস এখান থেকেই ছাড়বে। আধঘন্টার মধ্যে ভ্রাম্যমান চা’ওলা, ফলের দোকানদার, পান বিড়ির দোকানের মালিক, রোগাপটকা ছেলে কোলে ভিখারিনী মা ও কিছু ভবঘুরে সব্বাই জেনে গেল যে ওরা বোলপুর যাবে।

ওদের সামনে একটা সাদা রঙের নতুন ম্যাটাডোর দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ। তেল চকচকে মাথা ও পরিপাটী পোশাকের একজন লোক হাতের সিগারেট শেষ করে সেটার অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফেলে জুতো দিয়ে চেপে নিভিয়ে দিল। তারপর এসে উঠল চালকের আসনে। লোকটার সঙ্গীসাথীরা চিৎকার করল, ‘এই হরে, কোথায় যাচ্ছিস?’ হরে নামের লোকটি খুব আত্মবিশ্বাস অথচ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, ‘তোরা যাবি? অনেকক্ষণ থেকে দাঁড়িয়ে আছি, ভাবছি বোলপুর থেকেই ঘুরে আসি!’

লোকটা যে টোপটা ওদের লক্ষ্য করেই ফেলেছে সেটা নন্দিতা খেয়াল করল না। একলাফে লোকটার কাছে গিয়ে বলল, ‘যাবেন আপনি, প্লিজ!’ তারপর বাকি বোলপুর যাত্রীদের ইশারা করে ডাকল। নিমেষেই ও আত্মবিশ্বাসী লিডার। ঠিক ওই ছেলেগুলোকে রাজী করিয়ে নেবে ম্যাটাডোরে ওঠার জন্যে। ও মেয়ে হয়ে একটা ছোট ছেলে বগলে যদি এই দুঃসাহস দেখাতে পারে তো এরা পারবে না? ওদের মধ্যে দুজনের সুঠাম, লম্বা চেহারা আর ছোটছোট চুলের ছাঁটেই নন্দিতা বুঝতে পেরেছে যে ওরা মিলিটারি। ওদেরও একজনের কাছে ব্যাগবোঁচকার সঙ্গে একটা আপেলের পেটি। নির্ঘাত কাশ্মীরে থাকে। কে কোত্থেকে আসছে সেসব যেতে যেতে জেনে নিলেই হবে কিন্তু আগে লোকটাকে রাজী করানো দরকার ভেবে জিজ্ঞেস করল, ‘কত নেবেন বোলপুর?’

‘ছ’শ’ বলতে বলতে হরে স্টার্ট দিল। এক রাশ কাল ধোঁয়া ছড়িয়ে গেল নন্দিতার নাকের ডগায়। নাকের সামনে হাত নাড়িয়ে ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে চটপট গুনে নিল কজন ওরা। নিজেকে নিয়ে ছয়জন। বাঃ, এর থেকে ভালো আর কি হয়! লিডারের ভূমিকা বজায় রেখে নন্দিতা যাত্রীদের নির্দেশ দিল, ‘চলুন, একশ করে দিলেই হবে। আপনারা আমার ব্যাগগুলো একটু দেখুন আমি চট করে আমার ছেলের জন্যে কলা কিনে আনি।’

একডজন কলা কিনে ফিরে এসে ও দেখে লোকগুলো দাঁড়িয়েই আছে। হরে আবার নিজের সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে পানগুমটির সামনে। জানতে পারে ড্রাইভার মত বদলেছে। একবছর আগে উনি বোলপুরে গিয়েছিলেন আটশ টাকায়। তাই আজ ওনাকে অন্তত হাজার টাকা দিতে হবে। যাত্রীদের প্রত্যেকের মত, ‘যেখানে একশ’তে কাজ হচ্ছিল, সেখানে প্রায় দু’শ। কেন দেব?’

ম্যাটাডোর অভিযান ভেস্তে গেল ওদের। হরে বন্ধুদের নিয়ে চলে গেল প্যান্ডেল দেখতে। ধীরেধীরে নন্দিতার পাশের ভিড়টা পাতলা হতে শুরু করল। দেখা গেল প্রায় প্রত্যেকের এক বা একাধিক আত্মীয় আছে দুর্গাপুরে। শুধু ওই লম্বা ছেলেদুটো নন্দিতার মত বাড়ি ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছে না। ওরা তখন থেকে দাঁড়িয়েই আছে। নন্দিতা বসে পড়েছে পানের দোকানের সামনে তিনপেয়ে টুলটায়। আর দুষ্টু ওর গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নন্দিতার লিডার লিডার ভাবটা কমতে শুরু করেছে। দুষ্টু একটানা প্রশ্ন করে চলেছে। অনেকক্ষণ থেকে সেসবের উত্তর দিয়ে ও এখন বিরক্তিতে চুপ। ওই দুজনের একজনকে নন্দিতা অনুরোধ করল, ‘ভাই, তুমি একটু চেষ্টা করবে? ষ্টেশনের বাইরেই হলুদ ট্যাক্সি দেখতে পাবে, যা নেয় নেবে। ধরে আন একটা।’

ছেলেটির নাম অখিল। বলল, ‘আপনি আমার লাগেজগুলো দেখুন। ট্যাক্সিই নিয়ে আসি বরং।’ অন্যজন সন্তোষ। অখিল টাক্সি খুঁজতে যেতেই ও হেলেদুলে ঘুরে বেড়াতে লাগল। একটু পর তিনপেয়ে টুলে বসেবসে নন্দিতা দেখতে পেল একটা ট্যাক্সির জানলা দিয়ে অখিল হাত বাড়িয়ে ইশারা করছে। এতক্ষণে নন্দিতার মনে হল, ম্যাটাডোরের থেকে ট্যাক্সিই ভাল। মেঘ মেঘ করছে যেতে যেতে যদি বৃষ্টি নামে!

এখন ওরা তিনজন। নিজের মালপত্র কাঁধে তুলতে তুলতে অখিল সন্তোষকে বলল, ‘তিনশ করে দিলেই হবে। ও আটশআশি টাকায় যেতে রাজী হয়েছে।’

সন্তোষ বলল, ‘তাই ভালো, চল।’

এমন সময় সন্তোষের সামনে একজন যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হল। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘কোথায়?’ ‘বোলপুর।’ শুনেই সে বলে, ‘আমিও বোলপুর।’ নন্দিতা বলল, ‘তবে আর কি? আপনিও উঠে পড়ুন আমাদের সঙ্গে।’ ওদের খরচ একশো থেকে তিনশোর কাছে উঠে আবার দুশোর কাছে নেমে এল। চারজনে মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ল ট্যাক্সির উপর। সব মিলিয়ে এত মালপত্র যে ডিকিতে কুলোবে না। ট্যাক্সিওলা বলল, ‘ট্যাক্সিতো মানুষের জন্যে, এত মালপত্র জানলে...’

‘জানলে কি?’ ধমক দিল নন্দিতা। ট্যাক্সি পেতেই ওর একটু আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে।

ছেলেগুলো ড্রাইভারকে পাত্তা দিল না। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে মালপত্র তুলে দিল ঠেলেঠুলে। সবার আগে নন্দিতাকে বসতে বলল। নন্দিতা রানীর মত পেছনের সিটে বসে পড়ল। এক ফাঁকে নতুন আগন্তুকের নামটাও জেনে নিল ও, পার্থ। নন্দিতার কোলে দুষ্টু। ডিকিতে স্যুটকেসের জায়গা হয় নি। তাই ওটা ওর ডানপাশে। তার ডানপাশে পার্থ। সামনে ড্রাইভারের পাশে সন্তোষ ও অখিল। এসবের মধ্যেও নন্দিতার কৌতূহল, ‘তোমরা কি আত্মীয়? একই রকম চেহারা, আবার একসঙ্গেই কাজ কর।’ ওরা জানাল, ওদের আলাপ ওই বাসস্টপে দাঁড়িয়েই। অখিল থাকে বারমেরে আর সন্তোষ শ্রীনগরে।

গুছিয়ে বসতেই বাইরের সব কিছু কি সুন্দর লাগে! রাস্তার ধারে ঝোপঝাড়, দোকানপাট, পুজোপ্যান্ডেল সবকিছুর ভেতরে অসীম সৌন্দর্য। সেসব নন্দিতা নিজে দেখছে আর দুষ্টুকেও দেখাচ্ছে। একটু আগে ছেলের প্রশ্নের চোটে যে বিরক্ত হয়েছিল তাকে পুষিয়ে দিচ্ছে। থেকে থেকে গুণগুণ করছে, ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’। বাপেরবাড়ি যাবার আনন্দে ও বুঝি আর চুপ করে থাকতেই পারবে না।

ক্ষণিকের জন্যে থেমে নন্দিতা ভাবতে শুরু করল, ‘আহা, অখিল আর সন্তোষ কত ভদ্র! পেছনের পুরো সিটটা ছেড়ে দিল! ড্রাইভারের পাশে দুজনে গুঁতোগুঁতি করে বসে আছে!’ ওর ভাবনা ডালপালা মেলতে শুরু করল। এই বিশ্বায়নের যুগে দেশের রাজধানী শহরে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে গোটা দেশ উত্তাল হল কমাস আগে। দিনেদুপুরেও দিল্লীর আশপাশের অঞ্চলে বাসে চড়তে মেয়েরা ভয় পায়। বাসের মধ্যেও কি অনাচার কম! অথচ অখিল, সন্তোষ, এরা যেন ঠিক ঘরের ছেলের মতই! তা যদি না হত তাহলে নন্দিতাও কি ভাবত, চেনা নেই জানা নেই ওদের সঙ্গে একগাড়িতে উঠে যাবে।

নন্দিতার চিন্তাসূত্র ছিন্ন হল। ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। সামনেই পেট্রলপাম্প। তেল ভরে ড্রাইভার হাত পাতল টাকার জন্যে। স্টিয়ারিং ধরতে উঠে এল অন্য একজন অচেনা মানুষ। নতুন ড্রাইভারকে দেখে সন্তোষ অখিলের কাছে ফিসফিস করল, ‘এ চালাবে গাড়ি? সকালবেলাতেই মদ গিলে এসেছে!’ আগের ড্রাইভার জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে অখিলকে বলল, ‘গাড়ি যদি থেমে যায়, দুজন নেমে একটু ঠেলে দেবেন তাহলেই আবার চলতে লাগবে।’ সন্তোষের ভ্রুতে ভাঁজ পড়ল। ওকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে লোকটা একটা দাঁড়িয়ে থাকা বাইকে উঠে হুশ করে বেরিয়ে গেল। 

(চলবে)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-৩

চোখ খুলেই প্রায় দশভুজার মতই সাংসারিক কর্মযজ্ঞে ঝাঁপ দিয়েছে নন্দিতা। গ্যাসওভেনের একদিকে ভাত আর একদিকে ডালের কুকার। তরকারি কেটে রেখেছিল কাল রাতে। ইন্ডাকশন ওভেনে বসিয়ে দিল। শেখর ও দুষ্টু দুপুরে খাওয়ার ব্যাপারে ষোলআনা বাঙ্গালী। কালকের ফোটানো দুধের কড়াই থেকে তিনটে গ্লাসে দুধ ঢেলে সেগুলো একসঙ্গে মাইক্রোওভেনে ঢুকিয়ে দিল। ঠিক খাবার আগে সুইচ অন করে নেবে, তিরিশ সেকেন্ডের জন্যে। 

বিকেলে ট্রেন, কিন্তু এখনও ব্যাগ গোছানো হয়নি। পুজোর আনন্দে অনেক কেনাকাটা করা হয়েছে। উপহারগুলো তাড়াহুড়োয় ভুলে গেলে চলবে না। গেস্টরুমের খাট জুরে স্যুটকেস, ব্যাগ এবং বিচিত্র সব জিনিসপত্র ছড়ানো। প্যাকিংটা আগেই সেরে ফেলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু প্রোজেক্ট প্রোপোজাল শেষ করতে গিয়ে কাল দেরি হয়ে গেল। ঘরে এসে আগে ছেলের হোমওয়ার্ক করাতে হল। পুজোর পর ফিরেই দুষ্টুর স্কুল। ওর ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ সবকিছু গুছিয়ে না রাখলে এসে আবার খুঁজতে হবে। তাই সেসব মেশিনে দিয়ে, শুকিয়ে ইস্ত্রি করে রাখা হয়েছে কাল রাতেই। 

ঘুম থেকে উঠে ঘর ভর্তি জিনিসের সামনে নন্দিতাকে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শেখর বলল, ‘কি ভাবছ? আজ কলেজ যাবে না?’ 

‘ঘন্টা দুয়েকের জন্যে যেতে হবে। লোকটা কিছুতেই আজ ছুটি দিল না। একটা কাজ দিয়েই এমন চাপ দিতে শুরু করে! যত বড় বড় কথা, ‘আমার নীতি হল, ‘ডু ইট নাউ’।’ নন্দিতার গলায় ব্যঙ্গ।   

‘পোড়া গন্ধ! গ্যাসে কি চাপানো ছিল?’ শেখরের কথা শেষ হবার আগেই নন্দিতা ছুটে রান্না ঘরে ঢুকল। পেছনে পেছনে শেখর। বলল, ‘সরে এসো, আমি ফ্যানটা ঝরিয়ে দিই। আমার মনে হয় তুমি ঠিকমত বুঝিয়ে বল নি, দু-ঘন্টার জন্যে এতটা রাস্তা যাবে আবার আসবে। সেভাবে বললে ভদ্রলোক ঠিকই বুঝতেন।’ 

নন্দিতা বলল, ‘দুঘন্টার জন্য মুখ দেখালেই ওর শান্তি, বুঝতে পারছ না?’ 

নিজের টিফিন বক্সে ভাত নিতে নিতে শেখর বলল, ‘বলার মত করে বলতে হবে তো। এত ফালতু দৌড় ঝাঁপ, তুমিই পার! এত বছর চাকরি করছ একটু ডিপ্লোম্যাসি শিখলে না।’

নন্দিতা কড়াইয়ে খুন্তি নাড়তে নাড়তে বলল, ‘কে বলেছে শিখি নি? প্রোপোজালের ফাইল আমি কালই শেষ করে এসেছি, ও জানে না। আজ এমন লাস্ট মোমেন্টে ফাইলটা দেব যে ওর মনে হবে ‘বাঃ, একে বেশ ল্যাজেগোবরে করে ছেড়েছি।’ ওর ইগো স্যাটিসফায়েড হবে। আমারও একটু দেখানো হবে যে বাড়ি যাচ্ছি বটে কিন্তু কাজ শেষ করে তবেই। যাকে বলে, ‘নো হাউ অ্যান্ড শো হাউ’ বুঝলে?’ 

শেখরের দিক থেকে সাড়াশব্দ না পেয়ে নন্দিতা পেছন ঘুরে দেখল সে ধারেপাশে নেই। নন্দিতা গলা চড়াল, ‘কাজের কথা শোন। আমি যেন ফিরে না দেখি ঘরে চুরি বা আগুন লাগার মত অঘটন ঘটেছে।’ 

শেখর গাল ভর্তি ফেনা আর হাতে রেজার নিয়ে বেরিয়ে এল, ‘যত বাজে কথা। আমি কি ছোট ছেলে?’

‘কেন, পরশুর কথা ভুলে গেলে? দরজার ল্যাচ না টেনেই তালা বন্ধ করেছিলে। এদিকে দরজা খোলা আর চাবিটা এমন লুকিয়ে রেখেছ যে আমাকে আধঘন্টা খুঁজতে হল। ভাগ্য ভাল যে ওটা বেডরুম। সদর দরজা হলেই হয়েছিল।’ 

শেখর উত্তর না দিয়ে চলে গেল। নন্দিতাকে ভরসা নেই। কোথা থেকে এখন কি রেফারেন্স বের করবে ঠিক নেই। শেষে কাজের কথাগুলো মাথা থেকে বেরিয়ে যাবে। আর নন্দিতার লিস্টে শেখরের আরও একটা ভুলের নমুনা ঢুকে পড়বে।

নন্দিতা রান্না শেষ করে, ব্যাগ গুছিয়ে স্নানে গিয়েছিল। সেই ফাঁকে শেখর চা বানিয়েছে। চুলে ক্লিপ লাগাতে লাগাতে চায়ের টেবিলে এসে বসল নন্দিতা। তিনজনের মধ্যে ওই সবার আগে বের হয়। শেষবারের মত শেখরকে কিছু নির্দেশ দিয়ে বললল ‘আজ আবার মহারানীর কি হল? এখনও দেখা নেই। সিঙ্ক ভর্তি বাসন, ডুব মারল নাকি?’

‘তোমার মহারানীর আজ ডুব মারার প্রবল সম্ভবনা। বাইরে তাকিয়ে দেখ কেমন মেঘ।’ শেখর বলল। 

জানলার পর্দা সরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে নন্দিতা উদ্বিগ্ন হল, ‘যাঃ, ফাইলটা কাল দিয়ে এলেই হত। ডিপ্লোম্যাসি করতে বল, দেখ তার ফল। সব ছলচাতুরীরই একটা আফটার ইফেক্ট থাকে।’ 

দুষ্টুকে ঘুম থেকে তুলে, কাজের মাসিকে দরজা খুলে দিয়ে নন্দিতা যখন ঘর থেকে বের হল তখন টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। বেশিদূর যেতে হল না ওকে। এমন ঝমঝমিয়ে নামল যে সে বৃষ্টি ছাতায় আটকায় না। নন্দিতা ভিজে গেল। শরতের মেঘের কি অদ্ভুত খেলা! নন্দিতা দেখল কোথাও শুকনো, কোথাও ভেজা। রাস্তায় ওকে দুবার বাহন বদল করতে হয়। অতএব ঘণ্টাখানেক বৃষ্টির সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে খেলতে অবশেষে কলেজে পৌঁছল ও। বৃষ্টি হয় নি, এদিকটা শুকনো।  

এসে থেকেই আজ কম্পিউটারে মুখ গুঁজে আছে। কোনও ক্লাস নেই। ইমেইল চেক করল। ছুটির পর যেদিন কলেজ আসবে সেদিনের টাইমটেবিল দেখল। চোখ বুলিয়ে নিল পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনটায়। ফিরেই ক্লাস নিতে হবে, আগে থেকে তৈরি থাকাই ভাল। ফাইল হ্যান্ডওভার করার সেই বিশেষ লগ্ন এখনও আসে নি। রিমাইন্ডার দেওয়া আছে। বাজলেই নন্দিতা ফাইল দিয়ে দেবে। এমন সময় পিওন এল চা নিয়ে। নন্দিতার কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলল, ‘বাব্বা কি বৃষ্টি!’ 

বৃষ্টির কথায় নন্দিতার রাগ হয়ে গেল। ছেলেটাকে মনে হল মূর্তিমান অসুর। যেন এই কথাটা বলার জন্যেই এসেছে। চায়ের মত জিনিসেও নন্দিতা বিরক্ত হল। বলল, ‘খাব না, নিয়ে যাও।’ তারপর নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল জানলার ধারে। 

পেছনে আবার পিয়ন, ‘অনেকক্ষণ শুরু হয়েছে, আপনি দেখেন নি?’ 

নন্দিতা ঘুরে দেখল, ওর কাপ থেকে চা টা নিজের কাপে ঢেলে নিয়ে চুমুক দিচ্ছে ছেলেটা। বলল, ‘দেখি নি, তুমি এখান থেকে যাও।’ 

মেজাজ দেখিয়ে পিয়নকে বিদায় করলেও নন্দিতার টেনশন বাড়ছে। ও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে জানলার ধারে। বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণ নেই। ঠিক সময়ে ফাইল চলে গেল প্রিন্সিপ্যালের হাতে। এবার না বের হতে পারলে ট্রেনটা মিস হবে। নন্দিতাকে উদ্বিগ্ন দেখে ওর এক সহকর্মী রাজেশ বলল, ‘আমি আপনাকে এগিয়ে দিতে পারি, যদি আপনি কলকাতার রসগোল্লা খাওয়ান।’ 

নন্দিতা বলল, ‘শুধু রসগোল্লা কেন? রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ সব খাওয়াবো।’ 

রাজেশ গাড়ির দরজা খুলে দিল। কৃতজ্ঞ নন্দিতা দুশ্চিন্তা চেপে বসে পড়ল চালকের পাশের আসনে।

(চলবে)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-২

দিন সাতেক আগের কথা। শেখর নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু নন্দিতা জেদ ধরে বসে আছে। এবার দুর্গাপুজোয় ও বাপেরবাড়ি যাবেই। ‘এত ছুটি কোথায়? তার চেয়ে তিন দিন চার রাতের প্যাকেজে দেরাদুন, মুসৌরিটা ঘুরে আসি চল। একা একা তোমাকে বোলপুর যেতে হবে না।’ শেখর বলল। 

‘অসম্ভব। এখানে আসার পর থেকে তিনটে দুর্গাপুজো পেরিয়ে গিয়েছে। আমার যাওয়া হয় নি। এবারে টিকিট আছে তাই আর কিছু ভাবছি না। পুজোর সময় সব মেয়েরা বাপেরবাড়ি যায়। আমিও যাব।’ 

পুজোর সময় দিল্লি-কলকাতা টিকিট পাওয়া মুশকিল। ছুটি পাবে কি পাবে না সেকথা না ভেবে শেখর আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেছিল। যাওয়া নাহলে ক্যান্সেল করতে আর কতক্ষণ! 

কদিন ধরেই নন্দিতার মুখে ‘বাপেরবাড়ি’  শব্দটা শুনছে শেখর। অবাক হলেও প্রকাশ করে নি। এবার শেখর কৌতূহলটা প্রকাশ করেই ফেলল, ‘হঠাৎ ‘বাপেরবাড়ি’, ‘বাপেরবাড়ি’ করছ! কি ব্যাপার বল তো!’

চায়ের ট্রে টেবিলে রেখে গুছিয়ে বসল নন্দিতা। আজ শনিবার। দুজনেরই ছুটি। কাল মহালয়া ছিল তাই নন্দিতা একবেলা ছুটি নিয়ে অনেক বাজার করেছে। সেই থেকেই খুশিতে টগবগ করছে। বলল, ‘ঠিকই বলেছ। ‘বাপেরবাড়ি’, ‘শ্বশুরবাড়ি’ এইসব শব্দ নিয়ে আপত্তি ছিল একটা সময়। এখন নেই।’ 

‘তাই তো ভাবছি। হঠাৎ হল কি তোমার?’

‘তখন জানতাম মেয়েদের কখনও নিজের বাড়ি হয় না, হয় ‘বাপেরবাড়ি’ নয় ‘শ্বশুরবাড়ি’। কিন্তু সেবারে অনিমেষদার সঙ্গে কি তর্ক এই নিয়ে! তারপর অনিমেষদা বলল, ‘ছেলেদের জন্যে এই শব্দগুলো ব্যবহার হয় না, কিন্তু এটাও ঠিক যে দুঃখ-কষ্টের সময় আশ্রয় হিসেবে ‘বাপেরবাড়ি’র মত কোনও জায়গাও নেই আমাদের।’ ছেলেদের এই ‘বাপেরবাড়ি’ না থাকার শূন্যতাটা তখনই আমাকে ভাবিয়েছিল।’ 

শেখর মন দিয়ে সবটা শুনে বলল, ‘তাই বল। আমি ভাবছি তোমার আবার শরীর ঠিক আছে তো? হঠাৎ নারীবাদী রূপ ছেড়ে...। অনিমেষদাকে একটা ফোন করে অভিনন্দন জানাতে হবে।’

‘ইয়ার্কি মের না। অনিমেষদার কথা শুনে মনে হল, সত্যিই যার স্ত্রী গাঁজা-ভাং খায়, সংসারে মতিগতি নেই তার কি হবে!’ নন্দিতা যেন খুব গভীর চিন্তায়।

শেখর বলল, ‘তাছাড়া মেয়েদের কি নিজের বাড়ি হয় না? এই তো তোমার পারমিতাদি। ডক্টরেট করতে করতে বিয়ে করল। বর হায়দ্রাবাদে, তাই ওখানে বরের বাড়ি। কলকাতায় একা থাকে, তাই ওখানে নিজের বাড়ি। খড়গপুরে বাপেরবাড়ি আর কালনায় শ্বশুরবাড়ি। পারমিতাদির নিজের বাড়ি হলেও অনিমেষদার কি কোনদিন বাপেরবাড়ি হবে?’

শেখরের দেওয়া উদাহরণটা নন্দিতার ভালই লাগল। তবে সে নিয়ে কিছু না বলে একটা ঘোর লাগা গলায় ও বলল, ‘তাছাড়া, চারিদিকে পুজো পুজো গন্ধ। কলেজের পেছনে তাকালেই দেখি দূর পর্যন্ত কাশ ফুলে সাদা হয়ে আছে। নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা মেঘ। কেবলই মনে হচ্ছে, ‘মা আসছেন।’ তাই এই সময় ‘বাপেরবাড়ি’ যাচ্ছি কথাটা ভাবতে বেশ লাগছে।’ । 

‘তাই বল। তোমার নির্ঘাত কাব্যি কিম্বা পুরাণ রোগ কিছু একটা হয়েছে। পুজোসংখ্যাগুলো রাত জেগে জেগে গুলে খেয়েছ। হিমালয়ে চল, তোমার ভালোই লাগবে। স্বয়ং দুগগা মায়ের বাপেরবাড়ি।’ 

‘অসম্ভব। দেরাদুন-মুসৌরির প্যাকেজটা মাথা থেকে বের করে দাও তুমি। গণেশকে ট্যাঁকে গুঁজে আমি একাই যাব বোলপুর। তুমি কদিন মুক্তবিহঙ্গের জীবন কাটাও।’

‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু গণেশ ব্যাপারটা ঠিক মাথায় ঢুকল না।’ 

‘কেন? গনেশ হল দুষ্টু। তোমার এবং আমার পুত্তুর। ঘটনাচক্রে প্রথম, তাই ও গনেশ।’ 

‘তাহলে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্ত্তিক এরাও আসবে ভবিষ্যতে?’ শেখর রসিকতা করল। 

‘সে গুড়ে বালি! দুষ্টুকে গনেশ ভাবলে নিজেকে বেশ দশভুজা মনে হচ্ছে। আবার মনে হচ্ছে নিজে যেন বঙ্গ সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাচ্ছি।’ বলতে বলতে নন্দিতা খালি কাপদুটো ট্রেতে তুলে নিল।

‘তাহলে তোমার বাঙ্গালীরোগ হবারও একটা সম্ভবনা আছে।’

‘শুধু দুষ্টুই যে গণেশ তা না। তুমি হলে শিবঠাকুর। তোমাকে শিবঠাকুর ভাবা দুষ্টুকে গণেশ ভাবার চেয়েও সহজ।’ নন্দিতার কথা শেষ হল আর দরজায় বেল বাজল। দরজা খুলে খবরের কাগজ এনে টেবিলে রেখে নন্দিতা আবার বসে পড়ল শেখরের পাশে।

শেখর বলল, ‘আমি শিবঠাকুর কেন?’

‘দেখ, নামে তুমি অলরেডি শিবঠাকুর হয়েই আছ, শ্রীমান চন্দ্রশেখর। আর স্বভাবে ভোলানাথ। কোথায় কি রাখছ দিনরাত ভুলে যাচ্ছ। বিয়ের আগে প্রেমিকাকে দেখা করার কথা দিয়ে ভুলে যেতে। বর্তমানে নিজের বিয়ের তারিখ ভুলে যাও। লোকের নাম ভুলে যাও, এটিএমের পিন নম্বর ভুলে যাও। এসব বহু ঘটনার সঙ্গে কিছু ক্ষোভ ও দুঃখের স্মৃতি আছে তাই ওসব কথায় সকালবেলা মুডটা নষ্ট করব না।’ 

বিপদ বুঝে শেখর সাড়াশব্দ দিল না। বাম হাতে টেনে নিল খবরের কাগজটা। হয়ত ও রণে ভঙ্গ দিল।

শেখরের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে ভাঁজ করে রাখল নন্দিতা। বলল, ‘তবে মাদূর্গার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে আমার যাত্রা উল্টোপথে।’ 

কাগজের দিকে তাকিয়ে শেখর অন্যমনস্কভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘উল্টোপথ মানে?’

‘মা’র আগমন হয় স্বর্গ থেকে মর্ত্যে। আর আমি যাব একগাদা দায়িত্ব আর ক্লান্তির জাগতিক কষ্ট ভুলে কিছুটা স্বর্গসুখের খোঁজে। পথটা উল্টো নয়?’ 

শেখর বুঝল নন্দিতাকে আটকানো যাবে না। বলল, ‘কলেজে বলেছ ছুটির কথা?’   

‘বলেছি। এমনিতে দশেরায় চারটে ছুটি আছে। সঙ্গে আর তিনটে জুড়ে নিলেই হবে। ছুটির পর ছুটি নেব শুনেই লোকটার চোখ মুখ থমথমে হয়ে গেল। শেষে বলে, যাবার আগে একটা প্রোজেক্ট প্রোপোজাল লিখে দিয়ে যান। ফান্ড আনাটা খুব জরুরি।’ শেষটায় প্রিন্সিপ্যালের গলা নকল করল নন্দিতা।

আবার বেল বাজল দরজায়। এবার কাজের মাসি। ছুটির দিন নন্দিতাকে ওর পেছনেও দিদিমনিগিরি করতে হয়। বাকি কদিন ও ‘নমঃ নমঃ’ করে কাজ সেরে যায়। নন্দিতা উঠে গেল রান্নাঘরে। শেখর খবরের কাগজ নিয়ে ঘুমন্ত ছেলের পাশে শুয়ে পড়ল। কাজকর্ম মিটলে নন্দিতা নিজেই ডাকবে দ্বিতীয় রাউন্ডের চা খেতে।

(ক্রমশ)

দেবীপক্ষ

নীতা মণ্ডল

পর্ব-১

‘দুষ্টু নেমে আয়, আমাদের সিট নিচে।’ 

‘না, আমি উপরেই শোব। এখানে বেশি মজা।’

‘নেমে আয় বলছি, এই নিয়ে পাঁচবার বললাম। সকালবেলা উঠতে না পারলে আমি কিন্তু ডাকব না। তুই ট্রেনে থেকে যাবি।’ 

‘সকালে আমি নিজে নিজে উঠে পড়ব।’

‘তুই কি নামবি? আমি পাঁচ পর্যন্ত গুনছি। এরপর যদি না নামিস দেখ কি হয়! এক, দুই ...।’

রাতে শোবার আগে নন্দিতা আর দুষ্টুর মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। নন্দিতা দুহাত বাড়িয়ে গম্ভীর গলায় কথা বলছে। দুষ্টু ইরফানের সঙ্গে উপরের বার্থে শুয়ে শুয়ে গেম খেলছে। নন্দিতা আর দুষ্টু যাবে বোলপুর, দূর্গাপুজো উপলক্ষে। ট্রেনের সহযাত্রীদের সঙ্গে নন্দিতা বা দুষ্টুর বেশ ভাব হয়ে গিয়েছে। ইরফান দুষ্টুরই বয়েসি। সঙ্গে ওর বাবা-মা আর বছর দুয়েকের পুঁচকে বোন শবনম। ইরফানের বাবা দিল্লী আইআইটিতে পি এইচডি করছেন। সঙ্গে আরও একজন আছেন, ইরফানের মামা। উনি আইআইটির মাস্টারমশাই। ওনারা ঈদ উপলক্ষে যাবেন বর্ধমান। ইরফানের মামার বাড়ি। এবারে ঈদ আর দূর্গাপুজো এক সঙ্গে। 

নন্দিতা গুনতে শুরু করার পর দুষ্টু জেদ থেকে বায়নার রাস্তা ধরল। ‘প্লিজ মা, তুমি নিচে শোও না।’ 

নন্দিতার পাঁচ পর্যন্ত গোনা শেষ হল না। দুষ্টু সুর বদলেছে। নন্দিতাও সুর নরম করল, ‘দেখ, তোমার বা ইরফানের নিজের সিট নেই। তাই তোমাদেরকে শেয়ার করতে হবে। এখন ঘুমিয়ে পড়বে এস। সকালবেলা উঠে খেল।’ 

‘শেয়ার করছি তো। আমি ইরফানের সঙ্গে শেয়ার করছি। ইরফানের বোন ওর মার সঙ্গে। তাহলে তুমি আঙ্কেলের সঙ্গে নিচের বার্থ শেয়ার করে নাও।’ 

দুষ্টু সবার জায়গার বিলিব্যবস্থা করে দিল। গম্ভীর মুখে ইরফানের বাবা সরে গেলেন। নন্দিতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাতদুটো উপর দিকে করেই দাঁড়িয়ে থাকল। ইরফানের মা নাজনিন মুচকি হাসলেন, ‘আজকালকার বাচ্চাদের সঙ্গে পারা মুশকিল।’

ট্রেনে উঠার পর থেকে ছেলে দুটোর দাপাদাপির হাত থেকে রেহাই পেতেই এই ব্যবস্থা। মাস্টারমশাই ল্যাপটপে কাজ করতে শুরু করেছিলেন কিন্তু তার আদরের ভাগ্নে কিছুতেই কাজ করতে দেবে না। ওর দাবি ওকে গেম খেলতে দিতে হবে। উনি ভাগ্নেকে নিরস্ত করতে হাতে একখানি ট্যাব গুঁজে দিয়েছেন। সেই ট্যাব নিয়েই দুষ্টু আর ইরফান মগ্ন। তাই দুষ্টু ইরফানকে ছেড়ে মার কাছে শুতে আসবে না। 

এবার দুদিকে গাল ভর্তি বীরাপ্পানের মত মোটা গোঁফওয়ালা এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন ওদের কাছে। বললেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই আসছি। যে যে ঘুমোবে না তাদের বড় বড় কালো থলের মধ্যে মুখবন্ধ করে নিয়ে যাবো।’ হুমকিতে কাজ হল। ইরফান ট্যাবলেটটা ফিরিয়ে দিল মামাকে। তারপর দুষ্টু আর ইরফান পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করল। একটু পরে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে ফিরে এলেন ইরফানের বাবা। ওরা ঘুমিয়ে পড়তে নন্দিতা দুষ্টুকে নিজের কাছে নিল। 

পরদিন সকালবেলা উঠে নন্দিতা ভাবল পৌনে আটটায় দুর্গাপুর পৌঁছে যাবার কথা তাহলে দশটার মধ্যে বোলপুর। ওদিকে মায়ের ঘুম ভাঙতেই দুষ্টুরও ঘুম ভেঙ্গে গেল। স্প্রিং দেওয়া পুতুলের মত উঠেই জানলার ধারে বসে পড়ল দুষ্টু। নন্দিতাকে বলল, ‘মা দেখ, পাহাড়।’ 

নন্দিতা দুটো সিটের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে ব্যাগটাকে ঠেলে দিল সিটের তলায়। দুষ্টুর ব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে বলল, ‘এখন পাহাড়টাহার না সোনা। আমরা তো একটু পরই পৌঁছে যাব।’ 

করিডোর দিয়ে যেতে যেতে একজন নন্দিতা আর দুষ্টুর কথার মাঝখানে বলল, ‘ট্রেন লেট আছে।’ 

ব্রাশ হাতে নন্দিতা বসে পড়ল দুষ্টুর পাশে। জানলা দিয়ে দেখল, পাহাড়, নদী, জঙ্গল, টানেল অনেক কিছুই পেরোচ্ছে ওদের ট্রেন। ঝিকঝিক করে একটা প্ল্যাটফর্ম পেরোতেই নন্দিতা আবিস্কার করল ‘সাসারাম’। ট্রেনের জার্নির সঙ্গে যে লেট হওয়ার সম্ভবনাও থাকে তা যেন ভুলে গিয়েছিল নন্দিতা। একরাশ বিরক্তি এল মনের মধ্যে। হঠাৎ ওর শেখরের জন্য মন খারাপ করতে শুরু করল। সঙ্গে থাকলে এই বিলম্বিত যাত্রার দুঃখ ঘুচিয়ে দিত। এমনিতে মানুষটা জীবনসঙ্গী হিসেবে কেমন তা এখনও নন্দিতা বুঝে উঠতে পারে নি, তবে ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে অসাধারন। ভ্রমণকালে সঙ্গে ম্যাপ, ইতিহাস বা ভূগোল বই সঙ্গে থাকাও বিচিত্র নয়। যাওয়ার পথে প্রতিটি নুড়িপাথরকে উল্টেপালটে না দেখলে শেখরের মন ভরে না। আগেরবারই সাসারামে ট্রেন থামতেই প্রশ্ন, ‘বলতো, কার বাবা সাসারামের জায়গীরদার ছিলেন?’ উত্তরটা শেখরই বলে দিয়েছিল কিন্তু এখন আর সাসারামের জায়গীরদারের নাম মনে পড়ল না নন্দিতার। এইমাত্র যে নদীটা পেরোল তারই বা কি নাম! শেখর থাকলে ঠিক বলে দিত। 

ফোনের আওয়াজে ঘোর কাটল নন্দিতার। এতক্ষণ যার কথা ভাবছিল সেই। শেখর গড়গড় করে বলছে, ‘ট্রেন চার ঘন্টা লেট, এখনও গয়া পেরোয় নি। দুর্গাপুরে পৌঁছতে অন্তত বারোটা বাজবে। ওখানে নেমে আগে কিছু খেয়ে নেবে তোমরা। তারপর বোলপুরের বাস ধরবে।’ 

ফোন রেখে নন্দিতা খোঁজ নিতে গেল কি জন্যে দেরি। খবর নিয়ে এসে জমিয়ে বসে, ইঞ্জিন বিগড়ে যাবার খবরের সঙ্গে নিজের মতামত মিশিয়ে একটা ছোট্ট বক্তৃতা দিল নন্দিতা। ওর বক্তৃতা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় চা এল। নন্দিতার উল্টোদিকের উপরের বার্থে আরও একজন যাত্রী ছিলেন। কাল বিকেলে সেই যে নিজের বার্থে উঠেছেন, আর নামেন নি। ভদ্রলোক চাওয়ালাকেই ধরে এক হাত নিলেন। ভদ্রলোকের মিলিটারি মেজাজ। কাজ করেন আর্মিতে। কাশ্মীর থেকে আসছিলেন। সঙ্গে একটা মস্ত আপেলের পেটি। পেটিটাও কাল থেকে লোকটার সঙ্গে আপার বার্থে শোভা পাচ্ছে। 

বেশ কিছু বাংলা, ইংরাজি ও হিন্দি গালাগাল দেবার পরও যখন ছেলেটার বিকার দেখা গেল না তখন আর্মিম্যান বললেন, ‘ব্রেকফাস্ট আনার সময় ফিডব্যাক ফর্ম নিয়ে এস তো, দেখাচ্ছি মজা।’ 

ছেলেটি উত্তর দিল, ‘এখন ফিডব্যাক ফর্ম মাসে একবার আসে।’ 

আইআইটির মাস্টারমশাই গম্ভীর গলায় বল্লেন, ‘বাঃ, এখানেও বায়াসড স্যামপ্লিং?’ 

প্রত্যেকের হাতেহাতে ছোট ছোট লাল ট্রে, মেরি বিস্কুট, টি-কিট আর গরম জল ধরিয়ে দিয়ে ছেলেটা চলে গেল। যেন লেট করার সব দায় স্বীকার করে নিয়ে ও পালিয়ে বাঁচল। যাত্রীদের সঙ্গে তাদের অপরিহার্য যন্ত্রগুলিও জেগে উঠল ধীরে ধীরে। বিচিত্র রিংটোনের কনসার্টে পরিণত হল ট্রেনের কামরা। প্রায় সকলেরই অষ্টমীর অঞ্জলি আর তারপর ভোগ খাওয়ার প্ল্যান মাঠে মারা গেল। 

বেশ কিছুটা দেরি করে এল ব্রেকফাস্ট। পাউরুটি, মাখন, জ্যাম আর দুটো ডিম সেদ্ধ। ডিম খেতে গিয়ে দুষ্টু বিষম খেল। নন্দিতা ‘ষাট ষাট’, বলতে বলতে দুষ্টুর পিঠে হাল্কা হাতে চাপড় দিল। কিন্তু সেই টোটকাতে কোনও কাজ হল না। তাই দায়িত্ব নিলেন নাজনিন। দুষ্টুর বুকে হাত বুলতে বুলতে গুণগুণ করছেন, ‘চন্দা হে তু, মেরা সুরজ হে তু...’

‘না না। ‘ছেলে ঘুমোল, পাড়া জুড়ল’টা বল’ কাশতে কাশতেই বলল দুষ্টু। নাজনিনের শুশ্রূষায় ওর কাশির দমক একটু কমে এসেছে। আবার ঘুম পাচ্ছে ওর। নন্দিতার খাওয়া শেষ হবার আগেই দুষ্টু ঘুমিয়ে পড়ল। কোথাও যেন একটু স্বস্তি পেল নন্দিতা। গুছিয়ে বসতেই মনে পড়ে গেল, ‘ডিমটা খেয়ে ফেল্লাম, আজ অষ্টমী! মা যে বারন করেছিল।’ ঠিক তক্ষুনি নন্দিতার ফোনটা বেজে উঠল। নন্দিতার মা। বক্তব্য, আজ অষ্টমী, তাই বাসের গণ্ডগোল। নন্দিতা চাইলে সোজা কলকাতা চলে যেতে পারে। 

কিন্তু মা যাই বলুন, আগে নন্দিতা বাপেরবাড়িই যাবে। ওর মনে পড়ে গেল এই বাপেরবাড়ি আসা নিয়েই কত বাধা। কলেজে ছুটির ঝামেলা। ছেলেকে নিয়ে এত রাস্তা একা যাবে তাই শেখরের অমত। কাল সকাল থেকে এমন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত আশা প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিল নন্দিতা। নন্দিতা ভাবল, ‘কলকাতা তো যাবোই, কিন্তু যার জন্যে এত যুদ্ধ, সেখানে আগে না গেলে হয়!’ 

(ক্রমশ)

শিকস্তি

সুপ্রভাত লাহিড়ী

শেষ পর্ব

রজতশুভ্র ইমরান সাহেবকে চলুন চলুন বললেও পা যেন আর ওর চলে না। এক একটার ওজন ১০-১২ কিলো বেড়ে গেছে। টেনে নিয়ে যাওয়াই দুষ্কর। তবুও পা দুটোকে ঘস্টাতে ঘ্স্টাতে কম্পার্টমেন্ট থেকে নেমে এল ও। ওদের কামরার সামনে বেশ ভীড় আর  রয়েছে পুলিশ, মহিলা পুলিশও রয়েছে। রজতশুভ্রর আবার হৃদকম্প শুরু হল। অস্থিরতার চুড়ান্ত। নিজেকে কিছুতেই ঠিক রাখতে পারছেন না। দর দর করে ঘেমে চলেছেন। এরই মধ্যে কানের কাছে একটা কথা ভেসে এল, ‘আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?’ অসম্ভব চমকে উঠে ডানদিকে তাকিয়ে দেখেন ইমরান সাহেব ওর গা ঘেঁষে উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখাচুখি হতেই আবার সেই একই প্রশ্ন, ‘আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? আজ যা গরম! ওদিকটায় চলুন, শেডের তলায় ফ্যান রয়েছে। হাওয়া লাগলে ভালো লাগবে। চোখে-মুখে একটু জলও দিয়ে নিন। রজতশুভ্র কোন রকমে নিজেকে সামলে ধরা গলায় বলেন, না না আমি ঠিকই আছি।’ ইমরান সাহেব ওর পিঠে হাত দিয়ে প্ল্যাটফর্মের শেডের দিকে এগিয়ে চলেন। রজতশুভ্র এবার স্থির নিশ্চিত হন যে এবার ওর স্থান হবে স্টেশন মাস্টার-এর ঘর লাগোয়া পুলিশ ক্যাম্পে। দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসে, সেটা মুছে নেবার কোন তাগিদই সে অনুভব করে না। ছেলে-কোলে বিনীতার মুখটা ভেসে ভেসে আসে আর চোখ চলকে চলকে বেরিয়ে আসতে থাকে। ওরা এখন কি করছে? ভাবতে ভাবতে ফুঁপিয়ে ওঠার মুখেই ইমরান সাহেব ঘুরে দাঁড়ালেন আর তক্ষুনি রজতশুভ্র মুখে রুমাল চাপা দিলেন। ইমরান সাহেব তখন কোমরে হাত দাঁড়িয়ে পড়েছেন। রজতশুভ্রও দাঁড়িয়ে পড়লেন। ইমরান সাহেব ওর দিকে এগিয়ে আসলেন, তিনি কিন্তু তার জায়গায় স্থির নিশ্চল। ইমরান সাহেব যখন রজতশুভ্রের একদম মুখোমুখি এসে দু-হাত প্রসারিত করে ওর দু-কাঁধে হাত রাখলেন তখন ভীষণ চমকে উঠে  সরাসরি ওনার ওপরই পড়ে যাচ্ছিলেন, ইমরান সাহেব ওনাকে ধরে ফেলে বুকে নিয়ে নেন ক্ষণিকের জন্যে, তারপর শক্ত হাতে দাঁড় করিয়ে চোখে চোখ রেখে কেটে কেটে বলেন, ‘আজ এ লাইনে স্পেশাল চেকিং, দু-তিন জন বড় সাহেব ডিউটিতে আছেন। স্যার, আপনি এসব কেন লিখে দিয়েছেন, এর প্রায় সবই তো আপনাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, আমাকে ফারুক আপনাদের সম্বন্ধে সব বলেছে, আমাদের নসীবই খারাপ নইলে আপনাদের হারাই! যাক্ এখন এই ফর্মটায় আবার নতুন করে লিখে দিন, যতটুকু না লিখলেই নয়।’ রজতশুভ্র হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে তিনি তাড়া লাগান, ‘আর দেরি করবেন না, হাত চালান, আমার সহকর্মীরা এক্ষুনি এসে পড়লে বিপদ হবে।’ ইমরান সাহেবের কথা শেষ হওয়া মাত্রই রজতশুভ্র ফর্মটা নিয়ে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে পড়েন, লেখাও শুরু হয়ে যায়। ইমরান সাহেবও ওর পাশে বসে দেখতে থাকেন সঙ্গে পরামর্শ, নির্দেশ। মিনিট পাঁচ-সাতেকের মধ্যেই কাজ শেষ। রজতশুভ্রের হাত থেকে ফর্মটা নিয়ে ইমরান সাহেব ওকে একবার জড়িয়ে ধরেই তাড়া লাগালেন, আর দেরী করা যাবে না আপনি আপনার কামরায় চলে যান, মেমসাহেব নিশ্চয় খুব চিন্তা করছেন, ওনাকে আমার আদাব জানাবেন। আর সময়ও বেশি নেই।’ রজতশুভ্র ইমরান সাহেবের কাঁধে হাত শক্ত করে চেপে ধরে শুধু বলতে পারলো, ‘চলি।’ তিনি তাও বলতে পারলেন না, ওর দিকে একটু চেয়েই পিছন ফিরে হাঁটা লাগালেন। রজতশুভ্র স্পষ্ট ওর চোখের কোলে জল দেখতে পেলেন।

রজতশুভ্র কামরার দিকে ধাবমান হতেই নজরে এল ট্রেনের সহযাত্রী ওর দিকে ছুটতে ছুটতে আসছে। তিনি তাকে হাত দেখিয়ে থামতে বলে নিজের গতি বাড়িয়ে ওনাকে ধরে ফেললেন। ভদ্রলোকটি খুবই উত্তেজিত, ‘দেখুন দেখি কি কান্ড! চেকার সাহেব আপনাকে ডেকে নিয়ে সেই যে গেল আর আপনার পাত্তাই নেই! বৌদি আঁচলে মুখ ঢেকে কেঁদেই চলেছেন, আর আমি ওনাকে একা রেখে আসি কি করে? তাহলে তো দুই পরিবারই পুরুষ শূন্য হয়ে পড়বে! রজতশুভ্র আর কথা না বাড়িয়ে ওনাকে নিয়ে নিজেদের কামরামুখি হলেন। তারই মধ্যে ভদ্রলোকের সহাস্য উক্তি, ‘মাঝের থেকে আমার মালপত্তরই চেকিং হল না, দাদা, ওরা আমাদের আপনার পরিবারভুক্ত ভেবে নিয়েছে। সবই কপাল, নইলে এমন দাদা পাই!

নিজের কামরায় উঠে বিনীতার মুখোমুখি হতেই ও উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়াতে যেতেই পুঁচকে শুভ্রাঙ্গশু প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, সহযাত্রীগিন্নি ওকে কোলে নিয়ে নিলেন। আর তক্ষুনি ট্রেন দুলে উঠল, সারা ট্রেন মুহূর্মুহূ শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল এই ট্রেনটা যেন এখন এক সদ্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতার প্রতীক।পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরছে, কাঁদছে, হাসছে, হইচৈ কান্ড। এরই মধ্যে ট্রেনের গতি বেড়েছে আর ট্রেনের সেই ভদ্রলোক শুভ্রাঙ্গশুকে কোলে তুলে নাচাতে নাচাতে বলতে থাকেন, ‘আমাদের পয়া সোনা, আমাদের পয়া সোনা...।’ ও তখন নাকি ফিক ফিক করে হাসছিল।

শিকস্তি

সুপ্রভাত লাহিড়ী

পর্ব-৬

রজতশুভ্রের বাড়িয়ে দেওয়া হাত তখন এতই কম্পমান যে, যে কোন মূহুর্তে সে হাত খসে ফর্মটি নীচে পড়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল। সেই সম্ভাবনা যে কোন সময় বাস্তবায়িত হতে পারে এটা সম্যক উপলব্ধি করে ইমরান সাহেব ফর্মসুদ্ধ রজতশুভ্রের ডান হাতটা চেপে ধরলেন। তারপর ধীরে ধীরে তাঁকে তাঁর আসনে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ কোনগুলো আপনার জিনিসপত্র যদি দেখিয়ে দেন....’ ইমরান সাহেবর কথা শেষ হতে না হতেই রজতশুভ্র উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। ইমরানসাহেব ওনার কাঁধে হাত রেখে আবার তাঁকে তাঁর সিটে বসিয়ে দিয়ে বলেন, 'আপনি বসে বসেই দেখিয়ে দিন, আপনাকে উঠতে হবে না।' মাথা নেড়ে উনি তখন কাঁপা কাঁপা হাতে দেখিয়ে দিতে লাগলেন তার হোল্ডল, বাক্স, প্যাঁটরা, চটের বস্তাগুলো, যার মধ্যে কয়েকটা ইতিমধ্যেই কিছুটা উলঙ্গ।

ইমরান সাহেব রজতশুভ্রের নির্দেশিত মালপত্তর দেখতে লাগলেন আর তিনি তাঁর আসনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড ঘামতে লাগলেন। আর সব চাইতে আশ্চর্যের ব্যাপারটা হ’ল এই যে, সেই, সেই সহযাত্রী ভদ্রলোক ইমরান সাহেব তার দলবল নিয়ে ওদের কামরায় ঢোকা ইস্তক রজতশুভ্রের সঙ্গেই লেপ্টেই আছেন। আর ওকে যেমন নিধারিত ফর্ম দেওয়াও হয়নি তেমনি তিনিও আগ বাড়িয়ে সেটা চেয়েও নেন নি। সেই মুহূর্ত পর্যন্ত চেকারদের বোধহয় এটাই মনে হয়েছে যে তিনি রজতশুভ্রের পরিবারভুক্ত এবং সেটা ভেবে নেওয়ার কারণ জন্মাতে যথেষ্টই সাহায্য করেছেন তিনিও।

রজতশুভ্রের দেখানো ওঁর সমস্ত জিনিসপত্তর অবলোকন করে ইমরান সাহেব তাঁর পিঠে হাত দিয়ে ইশারায় কামরার বাইরে আসতে বললেন। আর তাতেই রজতশুভ্রের ভেঙে পড়ার যতটুকু বাকি ছিল তা পূর্ণ হয়ে গেল। কাঁপতে কাঁপতে তিনি ইমরান সাহেবকে অনুসরণ করতে দু-পা এগুতেই সিটের তলায় খাঁচা বন্দী ময়নাটা বন্দীদশা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিঃশব্দে গৃহস্বামীর পিছু নিয়েছে। আর তারই মধ্যে বিনীতার দিকে আড়চোখের চাউনিতে অভয়দানও হয়ে গেছে। একটা কিছু আন্দাজ করে ইমরান সাহেব পিছন ফিরতেই তার নজরে আসে ময়নাটি। তিনি অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন রাখেন, ‘আরে বাঃ, এ পাখিটি কার? ভারী সুন্দর তো!’ শুখনো মুখে রজতশুভ্র উত্তর দেন, ‘আমাদের দেশের বাড়ির’। আর রজতশুভ্রর কথা শেষ হতে না হতেই ময়নাটি মিষ্টি করে বলে ওঠে, ‘আমি পাখি না, আমি লক্ষ্মী।’ ইমরান সাহেব হো হো করে হেসে ওঠেন, হেসে ওঠে সারা কামরার যাত্রীরা। মূহুর্তে বহুক্ষনের নিস্তব্ধতা দূর হয়ে যায়। কিন্তু রজতশুভ্র স্বাভাবিক হতে পারেন না। কেবলই মনে হয়, আর রক্ষে নেই। ইমরান সাহেব যখন কামরা ছেড়ে ওনার সঙ্গে যেতে বলছেন তখন কপালে কি নাচছে কে জানে। এরই মাঝে ইমরান সাহেব আবার তাড়া লাগান, ‘কই আসুন, হাতে আর বেশি সময় নেই।’ তাই শুনে রজতশুভ্রও ব্যস্ত হয়ে ওনাকে অনুসরণ করতে করতে মৃদুস্বরে বলতে থাকেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ চলুন চলুন...।

(চলবে)

শিকস্তি

সুপ্রভাত লাহিড়ী

পর্ব-৫

সমস্ত  কামরা জুড়ে শ্মশানের নিরবতা। নিরবতারও কিছু  বক্তব্য থাকে, যা চুপিসারে তাত্ক্ষনিক সম্রাজ্য  বিস্তার করে সমস্ত পরিস্থিতি, পরিবেশের ওপর এবং পারস্পরিক ভাবে সচেতন এবং অসচেতন ভাবে উপস্থিত সবাইকে। আবার কোন কোন সময় অন্যান্য প্রাণীরাও বোবা বনে যায়। জড় পদার্থও আরো জড় হয়ে পড়ে। পরিস্থিতির শিকার হলে, কান পেতে রইলে সে বক্তব্য হৃদয়ঙ্গম হয়। আর এখন তো এই নিরবতার কারণ জলেরই মতন পরিষ্কার। শিয়রে সমন। এখন শুধু ঈশ্বরের নাম জপা ছাড়া আর কোনই উপায় নেই। বস্তুতঃ সব সহযাত্রীর সঙ্গেই শেষ পারাণীর কড়ি বলতে কিছু না কিছু তো আছেই। আর এই ভীতির তো ভিত্তি রয়েইছে। এই দর্শনা স্টেশনের চেকিং-এর নামে নিষ্ঠুরতার কাহিনী বসতবাটি, জমি, পুকুর সর্বস্ব হারানো মানুষগুলো ইতিমধ্যেই যথেষ্টই ওয়াকিবহাল, পরিস্থিতির শিকার হওয়া বহু মানুষের কাছ থেকে। সে যেন এক বিভীষিকা! আর এ যাত্রায় বিনীতা তার আভাষ এখনো পর্যন্ত পায়নি সেটাই রক্ষে। কারণ কিছুক্ষণ গার্ড থেকে ইঞ্জিন আর ইঞ্জিন থেকে গার্ড করতে করতে রজতশুভ্র দেখেছে চেকিং-এর নামে কামরায় কামরায় মাত্রাছাড়া নিষ্ঠুরতা। বুকফাটা কান্নার রোল হৃদপিন্ডকে তিষ্ঠতে দেয় না এক মুহূর্ত। প্রায় প্রতিটি কামরার সামনেই ডাঁই করা রয়েছে বাজেয়াপ্ত করা জিনিষপত্র, পুলিশ প্রহরায়। যতটুকু ঝটিতি নজরে এসেছে তা হল দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি, যেমন, কাঁসার থালা, গ্লাস, ঘটি, বাটি, পিলসুজ, ঠাকুরের তামার বাসন-পত্তর আর ভাঙ্গা বাক্স-পেটরা। চেকিং-এর অমানবিক পরাকাষ্ঠা! টাকা-পয়সা, সোনা-দানা যা যত্‍সামান্য মিলেছে তার সিংহভাগই চেকার নামক অদ্ভুত ভাবলেশহীন যান্ত্রিক মানুষদের পকেটস্থ হয়েছে। আবার কিছু টাকা-কড়ি, শখের সোনার পকেট ঘড়িটা, বোতাম, আংটির বিনিময়ে কিছু সৌভাগ্যবান যাত্রীর চেকিং-এ ছাড়ও মিলেছে। মোটকথা, সবটুকুই আইনরক্ষাকারিদের সৌজন্যে।

রজতশুভ্রের ঘোর কাটিয়ে দিল এক মিষ্টি সম্ভাষণ, ‘হাই মিস্টার।’ চমকে উঠে নজরে আসে এক সহাস্য প্রসারিত হাত, ইমরান সাহেব! ধরমড়িয়ে নিজের আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান রজতশুভ্র, এগিয়ে দেন নিজের হাত। হাত ধরা অবস্থাতেই ইমরান সাহেব চেয়ে বসেন তার দেওয়া ফর্মটি। রজতশুভ্র বাঁ হাতটি জামার পকেটে ঢুকিয়ে বের করে আনেন সেটি। ইমরান সাহেব ‘বাঃ কমপ্লিট’ বলে সেটায় চোখ বোলাতে লাগলেন। ইতিমধ্যে ইমরান সাহেবের সংগের আর দুজন কামরার অন্যান্যদের ফর্ম ধরাতে শুরু করে দিয়েছে।

(চলবে)

শিকস্তি

সুপ্রভাত লাহিড়ী

পর্ব-৪

রজতশুভ্র আশা-নিরাশার দোলায় দুলতে দুলতে নিজের আসনের দিকে এগিয়ে গেলেন। পিছু পিছু ট্রেনের সেই সহযাত্রী। হটাত্‍ করে দেখলে বা কমপার্টমেণ্টের বাকী যাত্রীরাও ধরেই নিয়েছে যে ভদ্রলোক রজতশুভ্রর পরিবারভুক্ত। 

এদিকে বিনীতা বেশ বিচলিত হয়ে পড়েছিল। কর্তাটির সেই কখন থেকে পাত্তাই নেই। সেই যে ‘আমি একটু আসছি’ বলে ট্রেন থেকে নেমে গেলেন আর জানলার বাইরে থেকে হাত নাড়া, তারপর থেকে তো বেশ খানিকটা সময়-ই কেটে গেছে। তিনি কেন এত দেরী করছেন? আর সেই ভদ্রলোক ওঁর পিছন পিছনই নিস্ক্রান্ত হলেন, তারও তো দেখা নেই। বিনীতার এই চঞ্চলতা অন্যান্য সহযাত্রীদেরও নজরে আসে। তারা ওকে আশ্বস্তও করে, বলে ট্রেন এখানে বহুক্ষন দাঁড়াবে। অনেকক্ষণ ধরে তল্লাশি চলবে তারপর ছাড়া পাওয়া যাবে। এরপরই না ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। ওহ্ বাবা, কী শান্তি কী শান্তি। এখন তল্লাশির পালা চুকলে বাঁচা যায়। কিন্তু এত বিস্তৃতিতেও তো বিনীতার চিন্তার ভার লঘু হয় না। ওই তল্লাশি কথাটাই তো ওর মাথার মধ্যে ভোঁ ভোঁ আওয়াজ করে চলেছে। ওদের জিনিষপত্র খানাতল্লাশি করে যদি আটকে দেওয়া হয়? এরই মধ্যে তো টানাহ্যাঁচড়া করে ওঠানো নামানো, ট্রেনে তোলা আবার নামানো এই করতে করতেই বিভিন্ন বস্তা, ঝোলা মায় হোল্ডল থেকে সব উঁকি ঝুঁকি মারছে। এবার কী হবে? এটা তো একটা শিশুরও নজর এড়াবে না, আর এরা তো সব পাকা, ধুরন্ধর লোক। এদের হাত থেকে পার পাওয়া অসম্ভব। তার ওপর নিজের সঙ্গের মূল্যবান সামগ্রী গুলো? এসব নজরে আসার পর তল্লাশি তো আরও জোরদার হবে। তখন তো ওকে নিয়েও টানাটানি হবে। সংগে তো মহিলা পুলিশও আছে, সবাই বলছে। কী লজ্জা।কী লজ্জা! বিনীতা কুলকুল করে ঘামছে। একবার আঁচল দিয়ে মুখ মুছছে আবার পরক্ষনেই ঘুমন্ত শুভ্রর মুখটা পরিষ্কার করছে। একটা অদ্ভুত অস্থিরতা যা ভাগ করে নেওয়া যাচ্ছে না সংগের মানুষটার অনুপস্থিতিতে।

রজতশুভ্র নিজের আসনে ফিরে আসতে আসতে বিনীতার কথা খুব একটা ভাববার অবকাশ পায় নি। এখন কামরায় ঢুকে নিজের আসনের সামনে এসেই ও সম্যক উপলব্ধি করে বিনীতার মানসিক অবস্থাটা। বিনীতা একদমই ভেঙে পড়েছে। ওকে দেখেই মুখে আঁচল চাপা দেয়। ও দ্রুত বিনিতার পাশে বসে স্থান, কাল পাত্র ভুলে ওর পিঠে হাতটা রাখতেই ফোঁপানির শব্দ ভেসে আসে। রজতশুভ্র একেবারে অপ্রস্তুত। ও বিনীতার পিঠে হাতের চাপটা একটু বাড়িয়ে সেই মূহুর্তে ওর অপ্রস্তুত অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করে। ও সফল হয়। বিনীতা তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নেয়। ও তখন বিনীতার কানের কাছে মুখ নিয়ে সবিস্তারে পরিবর্তিত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে। ফারুক সাহেবের বদলি ইমরান হাশমির সঙ্গে যে কথা হয়েছে সেটা শুনে বিনীতা কতখানি আশ্বস্ত হয় তা ওর মুখ দেখে বোঝা যায় না। আশ্বস্ত যে রজতশুভ্রও নয় তা ওকে দেখে পরিষ্কার বোঝা যায়। আর ও ইতিমধ্যেই স্থির করে ফেলেছে যে ওর কাছে যা কিছু জিনিসপত্র আছে তা সবিস্তারে ইমরান সাহেবের দেওয়া ফর্মে লিখে জানাবে। এতগুলো লোকের সামনে বেইজ্জতি হতে ও একদম রাজী নয়। বিনীতাও ওর এই সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছে। যে হারে সব ফুঁড়ে বেরচ্ছে তাতে করে আর কোনো আগলিই নেই। তার ওপর ফারুক সাহেব নেই। ওর বদলির মুখে যতই অভয় বাণী নিসৃত হোক তার ওপর ভরসা করে এতবড় ঝুঁকি নেওয়া মোটেই ঠিক নয়। 

তাই কিছুক্ষণ আগে নেওয়া সিদ্ধান্ত মোতাবেক রজতশুভ্র হাতে ধরা সেই ফর্মে নিজেদের সঙ্গে থাকা সমস্ত কিছুই লিখে শেষ করা মাত্রই ওদের কামরায় ইমরান সাহেবের প্রবেশ।

চলবে...

শিকস্তি

সুপ্রভাত লাহিড়ী

পর্ব-৩

দর্শনা স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ট্রেন। আর ট্রেনের ভিতরে অসাড় অবস্থায় বসে আছেন রজতশুভ্র। যুগপত্‍ সামনে উপবিষ্ট সেই সহযাত্রীর কণ্ঠ এবং বিনীতার কনুইয়ের ঠেলা রজতশুভ্রকে চমকে সম্বিত ফিরিয়ে দিল। তিনি ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আবার বসেও পড়লেন। পরক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে বিনীতাকে সংগের জিনিষপত্র সম্বন্ধে সতর্ক করে দিয়েই কম্পার্টমেন্ট থেকে প্ল্যাটফর্মে নামবার উদ্যোগ নিলেন। তখনই ট্রেনের সেই সহযাত্রী বেশ উচ্বকন্ঠে বলে ওঠেন, 'দাদা আপনি নিশ্চিন্তে যান, আমি এদিকটা দেখছি।' তারপরই কাঁচুমাঁচু হয়ে কাতর প্রার্থনা, ‘দাদা গো, আমারটা একটু দেখবেন। রজতশুভ্র ম্লান হেসে ওনার দিকে হাত তুলে প্ল্যাটফর্মে নেমে যান।

প্ল্যাটফর্মে নেমেই জনস্রোতের মধ্যে পড়ে গেলেন রজতশুভ্র। প্রথমে একটু হতবম্ব হয়ে গেলেও পরক্ষনেই একটু ধাতস্থ হয়ে ছোট মাসির সেই ফারুক সাহেবের খোঁজে লেগে গেলেন। উফ্ এতো খড়ের গাঁদায় সূঁচ খোঁজার মতন অবস্থা! অথচ ইতিমধ্যে অন্যান্য কামরায় চেকিং শুরু হয়ে গেছে, সেটা আগে পিছের কম্পার্টমেণ্টের যাত্রীদের দেখেই বেশ মালুম হচ্ছে। এরই মধ্যে রজতশুভ্র দু-দুবার ট্রেনের গার্ড থেকে ইঞ্জিন অবধি ছোটাছুটি করে ফেলেছেন। দেখেছেন প্রতিটি কামরার গেটের সামনেই পুলিশ দাঁড়িয়ে, ভিতরে চেকিং প্রক্রিয়া চলছে। কামরার বাইরের এবং ভিতরের উত্তেজনার আঁচ রজতশুভ্রকে প্রভাবিত করে ফেলেছে। উনি তখন রীতিমত নার্ভাস। হটাত্‍ ছুটতে ছুটতে সামনে এসে হাজির ট্রেনের সেই সহযাত্রী। ‘দাদা, শিগগির করে আসুন, ওরা দলবল নিয়ে আমাদের কামরায় উঠে পড়েছে!’ রজতশুভ্রও পা চালান।

রীতিমতন ছুটে নিজের কামরার সামনে এসে তিনি দেখেন কামরার সামনে পুলিশ মোতায়েন হয়ে গেছে। ওঁকে কামরায় ঢুকতেই দেবে না। পিছু পিছু আসছিলেন কামরার সেই ভদ্রলোক। তিনি ব্যাপারটায় ঢুকে পড়লেন। বাংলা-হিন্দী-ইংরাজী ভাষা মিলিয়ে পুলিস কর্মীদের বোঝালেন ওনারা এই কামরারই প্যাসেন্জার। একটা জরুরী কাজে প্ল্যাটফর্মে নেমে আসতে হয়েছিল। রক্ষীরা সেটা মেনে নিয়ে রজতশুভ্র এবং তাঁর সহযাত্রী কে কামরায় প্রবেশ করতে দেয়।

কামরায় উঠে বাঁদিক বরাবর এগিয়ে যেতেই রজতশুভ্রর নজর পড়ে দু-জন ভদ্রলোক যাত্রীদের মালপত্তর একটা কাগজ দেখে মিলিয়ে নিচ্ছেন। ওই দুই ভদ্রলোকের মধ্যে একজন নজরকাড়া সুপুরুষ আর তাকেই ছোটমাসির সেই ফারুক সাহেব বলে মনে হয় রজতশুভ্রর। তাই নিজের জায়গায় না গিয়ে তিনি সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর ধীর পায়ে তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কী ফারুক সাহেব? ভদ্রলোক কাগজ থেকে মুখ তুলে রজতশুভ্রর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়েই পালটা প্রশ্ন রাখলেন, ‘আপনি কি মিস্টার রজতশুভ্র রায়চৌধুরী?’ হ্যাঁ, হ্যাঁ, কেন বলুন তো?’ রজতশুভ্র ব্যগ্র হয়ে পড়লেন। ভদ্রলোক তখন হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে ওঠেন, ‘আমি ইমরান হাশমি? ফারুক হঠাত্ইদ অসুস্থ হয়ে পড়ায় ডিউটিতে আসতে পারেনি। ও আপনার কথা আমাকে বলেছে। আপনি আপনার জায়গায় গিয়ে ঠান্ডা হয়ে বসুন, আমি আসছি। আর হ্যাঁ, আপনার সংগে কি কি জিনিসপত্র যাচ্ছে সে সব এই ফর্মে লিখে ফেলুন, কেমন?’ রজতশুভ্র কাঁপা কাঁপা হাতে সেই ফর্মটা নিয়ে নিজের আসনের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললেন।

শিকস্তি

সুপ্রভাত লাহিড়ী

পর্ব-২

দর্শনা! পূর্ব পাকিস্তান, পূর্ব বঙ্গ, অধুনা বাংলাদেশের প্রান্তিক রেল স্টেশন। বাংলাদেশের খুলনা ডিভিশনের দামুরহুরা উপজিলায় অবস্থিত। ভারত পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশ- ভারতের সীমান্ত রেল স্টেশন, চেকিং পোস্ট। এদিকে এপার বাংলায়, নদীয়া জেলার অন্তর্গত ‘গেদে’ হচ্ছে শেষ রেল স্টেশন এবং চেকিং পয়েন্ট বাংলাদেশের প্রবেশ পথে। অবিভক্ত বাংলায় ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়েজ এর অন্তর্গত ‘গেদে’ ছিল এক অন্যতম রেলওয়ে স্টেশন- শিয়ালদহ-গোয়ালন্দ গতিপথে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনে এটা হয়ে পড়ে এক প্রান্তিক শহর। তখন শিয়ালদহ থেকে পূর্ব পাকিস্থানে চলত তিনটে ট্রেন। ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস, ইস্ট বেঙ্গল মেল এবং বরিশাল এক্সপ্রেস। কিন্তু ১৯৬৫র ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের পরই বন্ধ হয়ে যায় এই ট্রেনগুলি। ১৯৭২ এ নতুন রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ এর জন্মের পর অনিয়মিত ভাবে শুধু পণ্যবাহী ট্রেন চলত পেট্রাপোল বেনাপোল পর্যন্ত। ১৯৯০ সালে দুই দেশের মধ্যে পরিবহন চুক্তির মাধ্যমে এই ব্যবস্থা পাকাপাকি ভাব লাগু হয়েছে। ইতিমধ্যে  ২০০৮ সালের ১৪ই এপ্রিল থেকে চালু হয়েছে ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস। শনিবার ও রবিবার সপ্তাহে দুদিন, যাত্রাপথ-কলকাতা-ঢাকা। বর্ডার-চেকিং পয়েন্ট সেই গেদে এবং দর্শনা।

সেই দর্শনা! সেই সময় এই নামটার মধ্যেই পরতে পরতে জড়িয়ে থাকতো অজানিত শঙ্কা, ভয়, রোমাঞ্চ, শিহরণ ও আরও অনেক কিছু যা ভুক্তভুগী যাত্রী সাধারণরাই সঠিকভাবে ব্যক্ত করতে পারবেন। উল্লিখিত মিশ্র প্রতিক্রিয়া বলতে এটাই যে, ভিটে-মাটি তো সবই বিসর্জন দিয়ে আসতে হচ্ছে কিন্তু ভবিষ্যতে পেট চলবে কি ভাবে? কিভাবে আর কবেই বা আসবে সেই অন্যসংস্থানের সুযোগ? এদেশে সংবত্সরর দুবেলা দুমুঠো ভাত আর সবজির যোগান দেবার মতন ছিল এক ফালি জমি। দু-টুকরো মাছ জুটেই যেত নিজস্ব ছোট-খাটো পুকুর, খাল, বিল নদী থেকে। কিন্তু এর পর? আর এই প্রশ্নটাই তখন দিন-রাত কুরে কুরে খেত সেই সব সর্বহারাদের। তাই ভবিষ্যতের কিছুদিনের দিন গুজরান করবার জন্যে প্রায় সবারই মরিয়া প্রয়াস ছিল জমান এবং কিছু অস্থাবর সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে বেচে প্রাপ্ত অর্থ আর গয়নাগাটি সঙ্গে করে(অবশ্যই লুকিয়ে) আনা। আর তার জন্যেই এত শঙ্কা, ভয়, বুক ধরফরানি। সেই সব শঙ্কা, ভয়, উদ্বেগ সব তুমুল আনন্দ, শঙ্খধ্বনিতে রূপান্তরিত হয় দর্শনা রেল স্টেশন পার হলেই। তাত্ক্ষনণিক আনন্দে ভেসে যায় সে সব সর্বহারার দল। পিছনে ফেলে আসা জন্মভূমি, সামনের অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ছাপিয়েও তাদের এই অভিব্যক্তি। এটা শুধুমাত্র এদের দ্বারাই সম্ভব!

ইতিমধ্যে ট্রেনের গতি আরো মন্থর হয়ে এসেছে। আর রজতশুভ্রের অস্থিরতাও একটু বেড়েছে। তবে সেই সঙ্গে একটু স্বস্তির ও আভাস মনে মনে খেলে যাচ্ছে, ওই যে ছোটমাসির রেফারেন্স, ফারুক সাহেব। আর সত্যি সত্যিই সেই ভরসায় তিনি বেহিসাবী দুঃসাহসী হয়েছেন। এই সব ভাবতে ভাবতেই রজতশুভ্রের সামনের সিটে উপবিষ্ট এক দম্পতির কর্তা তাঁকে ট্রেনের দরজার দিকে আসবার ইঙ্গিত করে তিনি সেই দিকেই এগিয়ে গেলেন। রজতশুভ্র একটু অবাক হয়ে বিনীতাকে ‘একটু আসছি’ বলে ওনাকে অনুসরন করলেন। দরজার কাছে যেতেই সেই ভদ্রলোক রজতশুভ্রের হাত চেপে ধরে বলে ওঠেন, ‘আপনি কিছু মনে করলেন না তো? আমার না ভীষণ ভয় করছে। সঙ্গে বেশ কিছু জিনিসপত্র যাচ্ছে কি না!’ রজতশুভ্র তখন নিজের টেনশন ভুলে তাকেই আশ্বস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি তখন অকপট ভাবে বলে চলেছেন, ‘আরে আমিও তো সঙ্গে অনেক কিছু নিয়ে যাচ্ছি। একটু ভয় ভয় যে করছে না তা বলছিনা। তবে একটা ভরসা আছে। রেলের একজন চেনজানা বেরিয়েছে-দেখাই যাক্ না। আমি রক্ষা পেলে আপনিও পাবেন।’ কি অদ্ভুত মানসিকতা! অচেনা সহযাত্রীর প্রতি কী সহমর্মিতা! এ কি সেই মাটির, জলবায়ুর গুণ? রজতশুভ্রর কথা শেষ হয়ে গেলেও সেই ভদ্রলোকটি তাঁর হাত ছাড়েন নি। এরপর তাঁরা হাত ধরাধরি করে কামরায় ফিরে যে যার যায়গায় বসে পড়েন। আর তখনই বেশ হ্যাঁচকা দিয়ে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে যায়। একটু হুমড়ি খেতে খেতে সামলে নিতে গিয়ে রজতশুভ্রের নজর যায় সামনের বাঙ্কের ওপর। চমকে যায়। দেখে বাঙ্কে রাখা হোল্ডল ফুঁড়ে বেরিয়ে পড়েছে ওঁর বাবার স্মৃতিচিহ্ন, রূপো বাঁধনো ছড়ি-লাঠিটি! ট্রেন তখন দর্শনা স্টেশনে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে।

শিকস্তি

সুপ্রভাত লাহিড়ী

পর্ব-১

এ সবই শোনা কথা শুভ্রাংশুর। কিছুটা নিজের মাযের মুখ থেকে আর বেশীরভাগটাই বাবা রজতশুভ্রর মুখ থেকে, তবে সরাসরি নয়। যখনই কোন আত্মীয়-পরিজন, পরিবারের পুরানো বন্ধুবান্ধব ওদের বাড়িতে এসেছেন রজতশুভ্র সবিস্তারে সেই কাহিনীর বর্ণনা দিয়েছেন। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতন সেসব শুনেছেন। কাউকে কাউকে হয়ত একাধিক বার শুনতে হয়েছে। কিন্তু না, তারা কখনোই সেটা ব্যক্ত করেন নি। মনযোগ দিয়ে প্রতিটি ঘটনা শুনেছেন এবং রোমাঞ্চিত হয়েছেন। কারণ রজতশুভ্রর বাচনভঙ্গি, বিস্তার, প্রক্ষেপণ শ্রোতাদের সবাই কে ঘটনাস্থলে নিয়ে হাজির করাতো। সব কিছু যেন তাঁর চোখের সামনে এখনো ভাসছে আর সে সব বলে বলে হালকা হয়েছেন। হয়ত সেই সংগে স্মৃতি রোমন্থনও করেছেন। এতে কষ্টও পেয়েছেন তবে সেই সব স্মৃতি-কাহিনীর উপজীব্য বিষয়বস্তু তাঁর আত্মতৃপ্তির কারণও হয়েছে। ভয়ংকর প্রতিকুল অবস্থা থেকে কি ভাবে বেরিয়ে আসা! ঘটনার পর ঘটনা! ঘটনার ঘনঘটা! রজতশুভ্র বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। সামনে শুভ্রাংশুর মা বিনীতা থাকলে তাঁকে একটু সাক্ষী মেনেই নিজেই কথা চালাতে থাকতেন।

মায়ের কোলে শুভ্রাংশু। পাঁচ ছ মাস বয়স তখন। যে মানুষটা কোনদিন হাটবাজার করেন নি, করেন নি কোন ভারী কায়িক পরিশ্রম, তিনি কিনা মালপত্তর টামটোপলা নিয়ে চলে আসছেন এ বঙ্গে! বুক ভরা বেদনা নিয়ে। দেশ ভাগের পর পরই স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিলো। শুভ্রর ওপরের দুই দাদা ও দুই দিদিকে আগেই কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দিদিরা ছিল ছোট মাসির কাছে আর দাদারা রিপন হোস্টেলে।যদিও, বুক বেঁধে ভিটেমাটি, সম্পত্তি আগলে পড়েছিলেন কিন্তু ভিতরে ভিতরে বেশ বুঝতে পারছিলেন যে চোরা ক্ষয় শুরু হয়ে গ্যাছে। তার আভাস মাঝে মাঝেই জানান দিছিল। সাম্প্রতিক ঘটনাটা রজতশুভ্রকে নাড়িয়ে বিশ্বাসের ভিত একদম আলগা করে দিয়েছিলো। হঠাত্ই্ সক্কাল সক্কাল সদর থানার দারোগাসাহেব বাড়িতে এসে হাজির এক পরোয়ানা নিয়ে। লাইসেন্স প্রাপ্ত দুটি বন্দুকই থানায় জমা করে দিতে হবে, গৃহস্বামীর পরিবারেরই নিরাপত্তার খাতিরে। কি হাস্যকর প্রতিবেদন! নাঃ আর নয়। রজতশুভ্র তখনই ঠিক করে ফেলেন আর এদেশে থাকা নয়। তক্ষুনি কলকাতায় ছোটমাসিকে আর দাদাদের হোস্টেলে নির্দেশ চলে গেল, ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ঠিক কর। আর এদেশে থাকা নয়।’ ‘বাড়ি ঠিক হয়েছে’ এই পাকা খবর পাওয়ার পরই দেশ ছাড়ার এই উদ্যোগ-সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি শুভ্রর এক মামার হেফাজতে রেখে।

তখনকার রেলগাড়ির ফার্স্টক্লাস কমপার্টমেন্টে রজতশুভ্র, বিনীতা(কোলে অবশ্যই শুভ্র) আর জনাকয়েক যাত্রী ছিলো, তাই রক্ষে। নতুবা ওই সমস্ত মালপত্তর সেই ট্রেনের মাথায় চাপিয়েই আনতে হতো। তার ওপর চেকিং এর ঝুটঝামেলা, আইন-কানুন তো আছেই। যদিও একটা আশ্বাস মিলেছিল। ছোটমাসির এক দেওরের বন্ধু, মুসলমান, নাম ফারুক,পূর্ববঙ্গের রেলের এক অফিসার। তাকে রজতশুভ্রদের পারিবারিক পরিচিতি, চলে আসার দিনক্ষণ, ট্রেন সব বিস্তারিত ভাবে জানান আছে। ফারুক সাহেব নাকি এক অতিসজ্জন রেলের অফিসার এবং তিনি নিজে দর্শনায় থাকবেন। তবুও শুভ্রর বাবা ভিতরে ভিতরে যারপরনাই বেশ নার্ভাস। মাঝে মাঝেই গিন্নির কাছ থেকে পান চেয়ে খাচ্ছেন। ঘর্মাক্ত কলেবর। পাঞ্জাবীর দু-পকেটে রাখা দুটো রুমালও তা সামাল দিতে পারছে না। শুভ্রর মা ততখানি নার্ভাস নন। হয়ত সেই সময়কার গৃহবধূরা নার্ভাস বলে কিছু জানতই না। শুধু স্বামী-পুত্র-সন্তানদের ভালো, মন্দ, শুভকামনা নিয়ে চিন্তা-দুঃশ্চিন্তাই ছিল তাঁদের নিত্যসঙ্গী। ঘরের বাইরের কোন উদ্ভূত সমস্যা বা সংকট নিয়ে চিন্তা করবার জন্য তারা নন। ও সব দেখার জন্য সংগের মানুষটা তো রয়েইছেন। তবে হ্যাঁ, একটা বড়সড় অস্বোয়াস্তি তো নিজেই বয়ে নিয়ে চলেছেন। তাঁর ভিতরের জমার মধ্যে আগামী বেশ কিছু দিনের গ্রাসাচ্ছাদন ও অন্যান্য খরচ মেটানোর জন্যে রসদ, টাকায় এবং গয়নায় অনেকটা জায়গা করে নিয়েছে। তবুও সব শঙ্কা, অস্বোয়াস্তি কে আড়াল করে ওনার চিন্তা শুধুই শুভ্রর বাবাকে নিয়ে। ওদিকে অতটুকু দুধের শিশু শুভ্র নাকি তখন ছিল একদম চুপচাপ, যেন উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে সে সম্যক ওয়াকিবহাল। মাঝে মাঝে মাযের শাড়ির আড়ালে ওর দাবী মিটিয়ে নিচ্ছে আর  জুল জুল করে এদিক ওদিক চাইছে।ওর মুখে নাকি সেই সময়  একটা চাপা আলো খেলা করছিলো। সব মিলিয়ে প্রথম দর্শনেই যে কোন আগন্তুকের নজর  কেড়ে নেবে ও। যদিও বেশ ধ্যাবড়া করে নজর টিকা ওর কপাল ও কানের লতিতে জাজ্বল্যমান।–পাছে নজর লেগে যায়!

এই সব শঙ্কা, আশঙ্কায় দুলতে দুলতে গাড়ির গতি কমে আসতে লাগলো। শুভ্রর বাবা এবং কামরার অন্যান্য সহযাত্রীরা জানলা-দরজা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি মেলে সমস্বরে বলে ওঠেন, ‘দর্শনা!...দর্শনা! দর্শনা আসছে।’

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

শেষ পর্ব

স্বামীজি বলেছিলেন, “এ জন্মে ভাল-মন্দ কাজের ফল এ জন্মেই ভোগ করে যেতে হবে।”

কথাটা যে কতবড় সত্যি তা দীপ্ত আর আপানের জীবনের ইতিহাস পড়লেই জানা যাবে।

জীবন চলে তার নিজের সীমারেখায়-কিন্তু সেই জীবনকে চালনা করার কাজ কিন্তু যার জীবন তার। মাঝিও নৌকার হাল শক্ত করে ধরে থাকে, যাতে হাত থেকে হাল সরে না যায়। কত ঝড়-ঝাপটা মাথায় নিয়ে সেই মাঝি নদী পার হয়। নদীর পারে গিয়ে খুব খুশি হয়-একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। ঠিক তেমনি মানুষের জীবন। 

আজ দীপ্ত-র জীবনের পরীক্ষার ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যাবে... সে ভালভাবে উর্ত্তীর্ণ হয়েছে। সে জয়ী হয়েছে কালজয়ী পরীক্ষায়।

ছেলে ব্রীত -এর প্রমোশন আর তার সাথে আপানের পছন্দমত মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে জীবনটাকে ঘুরিয়ে দিল দীপ্ত-র। পাঞ্জাবী মেয়ের সাথে বনিবনা না হওয়াতে আগে থেকেই সাবধান হয়ে গেছিল ব্রীত। পাঞ্জাবী মেয়ের স্বভাব অনেকটা নিজের মা পরমার মতন সেটা উপলব্ধি করেছিল নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। আর সেটা জানত শুধু আপান। কারণ আপানকে ব্রীত অনুরোধ করেছিল ওর জন্য কোন মেয়ে যাকে নাকি আপান খুব ভাল করে চেনে। আপান তার দেশে থাকা এক সুন্দরী ইঞ্জিনীয়ার ভাইঝির সাথে ব্রীত এর আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। সব কিছুই ঘটেছিল কিন্তু দীপ্ত-র অন্তরালে। 

যখন ব্রীত মন ঠিক করে ফেলে যে আপান এর ভাইঝি-কেই বিয়ে করবে তখন সে আনন্দে ড্যাড-কে জড়িয়ে ধরে সেদিন রাতে এসে। আপানের কাছে যে প্রশ্ন রেখেছিল সেদিন দীপ্ত আজ তার উত্তর পেলো আপানের মুখেই।

আপানই জানায় দীপ্ত-কে যে, ব্রীত এর বিয়েতে দেশে যেতে হবে তার ড্যাড-কে। ঋতুও জানত ...কিন্তু সব কিছু ঘটেছে খুব আশ্চর্য্যভাবে। খুউব সন্তর্পণে। শুধুমাত্র তাদের ড্যাডের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য। আর এই সব পরিকল্পনা ছিল আপানের। আপানের জীবনের ব্রত-ই ছিল মানুষকে নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী আনন্দ দেওয়া-দুঃখ দেওয়া না। দুঃখ তো সবাই দিতে পারে কিন্তু আনন্দ কজন দিতে পারে? তাই সে দাদাদের সংসারে কাছে থাকা কালিন এমন কোন কাজ করে নি যা দাদাদের দুঃখের কারণ হতে পারে। সেও অনেক সু্যোগ পেয়েছিল খারাপ হবার কিন্তু করে নি শুধু ভবিষ্যতের কথা ভেবে আর নিজের শিক্ষার বিচার বুদ্ধিকে সঙ্গে করে।

ঋতুও যেন কত বদলে গেছে। এ যেন রাতে রাতে সব সাজানো হয়ে গেছে আপানের দক্ষতায়। ঋতু আজকাল সব কিছু আলোচনা করে ড্যাডের সাথে। গ্র্যাজুয়েট হবার পর সে কি করবে, না করবে? আজকাল ড্যাডের কাছেই থাকে। আপানের কাছ থেকে কিছু কিছু রান্না ও সেলাই শেখে লং উইকেন্ডে। পূজো ও আজকাল করে আপানের দেখাদেখি। আপান ওকে জানিয়েছিল যে, পূজো করলে মন অনেক পরিস্কার হয়ে যায়। সব ময়লা ধুয়ে যায়। তাই আপানের স্বপ্ন-ও আজ পূর্ণ হতে চলেছে। 

ফিরিয়ে দিয়েছে দীপ্ত-র কাছে তার ছেলে মেয়েকে। কথা রেখেছে সেই চিরদুঃখী শাশুড়িমার। স্কাইপে জানাতে গিয়ে দেখেছে তাঁর চোখের আনন্দাশ্রু। প্রাণভরা আশীর্বাদ পেয়েছে আপান। খালি বলছেনঃ “আমি আর হারি নি রে অপুমা। তুই তো আমার মেয়ে তাই মায়ের দুঃখ-টাকে এত সরল করে দিলি।” হয়ত সে তার কেরিয়ার এর ভবিষ্যত দেখতে পায় নি কিন্তু তার এই “দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়” -এর সমাপ্ত লিখে যে অনাবিল আনন্দ পেয়েছে মানসিকভাবে তা তার কেরিয়ারের ভবিষ্যতের চেয়ে অনেক বেশি দামী। পরমা হয়ত নিজের থেকে বয়সে ছোট একটা মানুষকে বিয়ে করে সমাজকে জানাতে চেয়েছে... “মানুষের মনটাই আসল-সেই মন যা চায় তাই মেনে চললে জীবনে সুখি হওয়া যায়। তাই কি-? মন যে কি চায় মন না জানলেও নিজেদের জানবার চেষ্টা করতে হয়।তার জন্য উপযুক্ত শিক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। সুস্থ বন্ধুমহল ও পরিবেশে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে হয়। সমাজ তো মেনে নেবে মেয়েদের-আর না মানলেও পরে সমাজকে বুঝিয়ে দেওয়া যেতেই পারে যে, একটা মেয়ে সংসার ছেড়ে বেড়িয়ে আসে তখনই যখন স্বামীর অত্যাচারকে সহ্য করতে পারে না। বা স্বামী গুপ্ত প্রেমের অংশীদার ছিলেন। আর নিজের দোষটাকে একটা মিথ্যের চাদরে মুড়ে রাখে। ঠুলি পরা সমাজ নির্বিবাদে মেনে নেয় সেই তথ্য। আপান নিজেই মেয়েবিরোধিদের বিপক্ষে কিন্তু অন্যায় বিপক্ষের সমর্থনের সে ঘোর বিবাদী। সে বিশ্বাস করে ... সমাজ-এর ওপরেও আরো একজন আছে সে হল নিজস্ব বিবেক। বিবেকের কাছে কি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করলে চলে -- সত্যি কি তাই? না...মোটেই না। বয়সের সাথে সাথে বিবেক দংশায় -আর সেই দংশন সহ্য করার মতন ক্ষমতা তখন লোপ পায়। পরমা আজ সেই বিবেকের দংশনে জর্জরিতা-ক্ষমা চেয়ে ই-মেইল করে দীপ্ত-র কাছে। হয়ত ভেবেছে এই ক্ষমাই তাকে নিয়ে যাবে জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। দীপ্ত তো ক্ষমা করতে পারে না বরং করুণা করে তাকে এগিয়ে দিয়েছিল তার প্রেমিকের কাছে।

আজ সে সব হারিয়েছে শুধু প্রেমের জোয়ারে ভেসে পুরানো বন্ধুমহল এখনও আড়ালে আবডালে তাকে নিয়ে পরিহাস করে। তাই সে ত্যাগ করেছিল পুরানো বন্ধুমহল। নতুনেরাও কি মেনে নিয়েছে তার ব্যভিচার? -সে কি ভুলে গেছিল,... না, চ্যালেঞ্জ করেছিল বিবেক-কে?-জানা নেই। তবে সে যে ভুলে গেছিল পরম সত্যকে যা হল “যৌবন, অর্থ আর মিথ্যে”- বেশিদিন থাকে না। মিথ্যে প্রকাশ হবেই। কিছু লোকের সহানভূতি নিয়ে জীবনে বাস করা যায় না। জীবনের হিসেব নিকেশ এর খাতায় আঁকিবুঁকি কাটলে তা পড়া যায় না। চোখে থাকে তখন 'ক্যাটারাক'-এর বসবাস। আপান আজ এই “দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়”-লেখার মাঝপথে থেমে গেলে কিছু উৎস্যুক মনের কথায় শেষ তুলির টানে সে বোঝায় জীবন-কে ছেলেখেলা ভাবলে বংশবৃদ্ধির দিকে না তাকালেই ভাল। কারণ, সেই বংশদ্ভূত -রা বড় হয় অযাতিতভাবে। উৎশৃঙ্খল হয়ে ওঠে তারা। 

সন্তানসহ বিয়ে করা স্বামীকে ত্যাগ করার আগে ভবিষ্যত-এর দিকে একটু তাকাতেই হয়। কারণ সেই ত্যাগ করা স্ত্রীর পরিচয় কি থাকবে তার বংশধরদের কাছে? সে কি পূজ্যা হব্ না, তার পরিচয় হবে নিজের প্রেমের জোরে একজন অল্পবয়সীর প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে নিজের স্বামীর ঘরছাড়া এক উৎশৃঙ্খল মা। অবশ্য এটা নির্ভর করে মানুষের স্বভাবের পরিপ্রেক্ষিতে। কথায় আছেঃ “স্বভাব যায় না মলে।” 

দীপ্ত এসে ঋতুর সামনেই আপানের কাছে এসে নতজানু হয়ে স্যালুট জানালো। বললঃ আপান তুমি এদেশে বহুবছর থাকলেও তোমার মধ্যে যে বাঙ্গালী নারীর হৃদয় আছে সেটা এদেশে বসবাসকারী বিনা দোষে স্বামীকে ত্যাগ করা বাঙ্গালী নারীদের হৃদয়ে একটুকু থাকলে সবাই সুখি হত। বাচ্চারা সুস্থ পরিবেশে বেরে উঠত। 

-সেই ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত যে আবেগ জারিত হয়েছে উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতায়... তা শুধু কাজে লাগাতে পেরে আজ আমি সত্যি নিজেকে খুব ধন্য মনে করছি, দীপ্ত। আধুনিক জীবনের আত্মসর্বস্ব্তা, পরশ্রীকাতরতা, অলীক স্বপ্নের পিছনে না ছুটে... তার সাথে সামাজিক মূল্যবোধের দ্রুত পরিবর্তনের হাওয়ায় নিজেকে ভাসতে দি নি। হয়ত নিজের হৃদয়ের স্পন্দনকে পাত্তা না দিয়ে একটা কঠোর ব্রতে নিজেকে উজ্জীবিত করেছিলাম। তা যখন এইভাবে সাড়া দিল তখন আমরা সব মেয়েরাই তো নিজেদের সংসারে নিজেদেরকে প্রতিমা করে গড়ে তুলতে পারি। 

-দীপ্ত-র চোখে জল। হাত দিয়ে সেই জল মুছে বলল- “পুরুষ অপেক্ষা নারীরা কোনও কাজে কৃ্তিত্ব দেখালে আমরা সবাই চিরদিনই বেশি আনন্দ পাই। আমার বিফল স্বপ্ন তাই সার্থকতা পেল আজ তোমার অপরিসীম দক্ষতায়।”

-তোমার কথায় শুরু করেছিলাম “দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়” -আজ তা লিখে শেষ করতে পারা আমার জীবনের প্রথম সুখ...... আমার এই লেখা যদি একজন পাঠকের হৃদয়েও স্পর্শ করতে পারে তাহলে আমার এই পরিশ্রম সার্থক।

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

পর্ব-১৬

আজ ছুটির দিন। তাই আজ একটু শপিং এও যেতে হবে আপানদের। ব্রীত চলে যাবার পর ওরা দুজনেও বেড়িয়ে পড়ল। বাইরে উদিপি রেস্টোরান্টে মসালা দোসা খেয়ে শপিং শেষে বাড়ি ফিরে এলো। দুজনেই চুপচাপ। দীপ্ত আপানকে জিগেস করল “ হঠাত ব্রীত আমাকে আজ হাগ(HUG) করল কেন কে জানে?”

-হয়ত আস্তে আস্তে ওদের মনে তোমার প্রতি একটা ভালবাসা জন্মাচ্ছে। সব কিছু সময় মাফিক চলে। তাড়াহুড়ো করলে চলে না। জানো তো- টাইম ইজ আ গ্রেট টীচার? 

- আজ ব্রীত আমাকে বললঃ ওর মা নাকি হস্পিটালাইজড হয়েছিল তাই ও একটু চিন্তায় ছিল কারণ ওর মায়ের তো কোন ইন্স্যুরেন্স নেই। কাজেই ওর কাছেই ডলার চেয়ে বসেছিল ওর মা। তা প্রায় ২০ হাজার মতন। আমাকেও জানাতে বলেছিল কিন্তু ছেলে জানায় নি। মেয়ে তো রেগে টং-বলেছিল নাকি মা-কে যে, “হোয়াই ইউ ইগ্নোরড ড্যাড-ড্যাড ডিডন'ট ডু এনিথিং। নাও ইউ ইউল আন্ডারস্ট্যান্ড। যাই হোক-এইবার পস্তাবে।।কত ধানে কত কত চাল বুঝবে। আরো বলছিল যেঃ ওর মায়ের পুরানো বন্ধাবীরা নাকি আর কথা বলে না । তাই অল্প বয়সী যারা তুষারের বন্ধু ছিল আগে।, তাদের সাথে মিশছে। ঋতু নাকি মায়ের কাছে একেবারেই যায় না। মা ওকে বলেছে ঋতুকে বোঝাতে। 

-কখন বলল? আমি কোথায় ছিলাম? 

-তুমি বোধহয় বাইরে যাবার জন্য রেডি হচ্ছিলে? যাই হোক। ছেলে মেয়ে এখন বড় হয়ে গেছে। তাদের মিথ্যে বলে তো আর পার পাবে না । ব্রীত আসতে আসতে বুঝতে পারছে। 

-ব্রীত আমাকে বলছিল সে নাকি ওর আগের ভিয়েতনামীজ ফিয়ান্সে কে ছেড়েছে কারণ সে ওর এবসেন্সে অন্য একটা ছেলের সাথে ঘোরাঘুরি করেছিল। সব কিছুতেই ওরা এখন মা -কে টার্গেট করছে।

-এইবার দীপ্ত এগিয়ে এল আপানের কাছে। বললঃ আমি জিতবই দেখো তোমার মতন লক্ষ্মী মেয়ে পেয়েছি আমার জিত হবেই। ঠাকুর দুর্বলকে পরীক্ষা করেন -আজ আমি আর দুর্বল নই। শুধু ছেলে মেয়েদুটো আমার কাছে ফিরে আসুক। আমি আর কিছু চাই না। আর তারা আসবেই -আসতে হবেই যে ওদের। মেয়েটাকে নিয়ে একটু চিন্তা হয়। ছেলে সে তো দাঁড়িয়ে গেছে। কিন্তু মেয়েটা কি করবে কে জানে?

-চিন্তা কো্রো না। সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। তবে সময় সাপেক্ষ।

-তুমি কি করে এত ভেবে রেখেছো আপান- বলে আপানের কাছে এগিইয়ে যেতেই আপান ফোঁস করে উঠলঃ এ্যাই আবার শুরু হল। আমার ডিউটি তোমার ছেলে মেয়েকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া...বুঝলে মশাই। দীপ্ত মুখ টিপে হেসে বাইরের জামা -কাপড় ছাড়বার জন্য ভেতরে গেল। গিয়ে দোতলার অর্ধ গোলাকৃ্তি বারান্দার দোলনায় বসে কমলা আকাশকে দেখতে লাগল। আপান একটা ডীপ ব্লু সিল্কের রোব গায়ে দিয়ে ওর পাশে গা ঘেঁষে বসল। 

-আপান দেখো কি সুন্দর লাগছে আকাশটা। তোমার মুখের রঙ্-এর মতন। আপানের মাথার কোঁচকানো চুলের গভীরে হাত বোলাতে বোলাতে দীপ্ত বললঃ জানো আপান! আমি এখন মেন্টালি খুব খুশী । ব্রীত আমাকে বুঝতে পেরেছে সেটা সম্ভব হয়েছে শুধু তোমার জন্য। এখন ঋতুর পালা। সেও বুঝতে পারবে।

-একটা আচমকা ধাক্কা মানুষকে শিক্ষা দেয়। এইবার আপান দীপ্তর হাত নিজের হাতে নিয়ে বললঃ তুমি যদি আজ এই শহর ছেড়ে অন্য শহরে চলে যেতে। তাহলে দেখতে অনেক আগেই তোমার ছেলে মেয়েরা ড্যাডির কাছে ফিরে আসত। কিন্তু তুমি চাকরির অজুহাত দিয়ে এখানে থেকে গেলে। অবশ্য এত কষ্ট করে বাড়ি করেছো সেটাও একটা কারণ। দীপ্ত হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দুহাত দিয়ে আপানকে জড়িয়ে ধরল। 

-আমি কিছু একটা ভাল কাজ করেছি নয়ত তোমার মতন মেয়ে কেন পাবো। এটা ঠাকুরের কাছে পাওয়া আমার শ্রেষ্ঠ উপহার। আমি জ্ঞানতঃ কারুর ক্ষতি করি নি বা কাউকে দুঃখ দি নি-কাজেই আমার পরীক্ষার ফল ভালো হতেই হবে। কত কষ্ট করে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছিলাম, ডিভোর্সে সেই সব টাকা দিয়ে দিতে হল কারণ, আমি বেশি প্রব্লেম নিতে পারছিলাম না।

-হবে তো হবে। ঠিক হবে। ঠাকুর আর মা-এর আশির্বাদ আছে দেখো। সব হবে। আপন কর্মের ফলভোগী মানুষকে হতেই হবে। পাপের শাস্তি, পুণ্যের পুরস্কার মাথা পেতে গ্রহণ করতেই হবে তাকে। কিন্তু সজ্ঞানে হোক আর নিরজ্ঞানেই হোক, আপন স্বভাবের কোন একটি বিশেষ ত্রুটি বা দুর্বলতাকে আশ্রয় করে নিয়তি যখন মানুষের মর্মমূলে বাসা বঁেধে বসে তখন তার অসহায়তা করুণারই উদ্রেক করে। সংসারে অনেক সময়ই লঘু অপ্রাধেও গুরুদন্ড হ্যে থাকে-আমি বিশ্বাস করি। যাই হোক, ওরা তো যাওয়া আসা করছে। ঋতু বাড়ি যায় না কিন্তু এখানে তো আসে, তাই না? এইবার তো গ্র্যাজুয়েট-ও হয়ে যাচ্ছে তবে আর চিন্তা কিসের? চলো ওকে একটু ফোন করি। 

-ঠিক বলেছো। ফোন দিল দীপ্ত-র হাতে। দীপ্ত ফোন করল মেয়েকে। আশ্চর্য একবার রিং -এই ফোন ধরল মেয়ে। মনে হয় বেশ খুশী খুশী মেয়ে। ড্যাডের কথায় নিজেই বললঃ “ড্যাড ডোন্ট ওরি, আই উইল কাম ডে আফটার টু-মরো। মাই এগজামস আর ওভার সো... উইল কাম টু মীট ইউ বোথ।

আপান আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল সন্ধ্যে নেমে এসেছে আর আকাশে বিশাল এক পূর্ণিমার চাঁদ যেন খিল খিল করে হেসে উঠল। সারা ব্যালকনিতে সেই হাসি ছড়িয়ে ছিটিয়ে একাকার। 

দীপ্ত-র মুখে তৃপ্তির হাসি । ফোন রেখে পূর্নিমার চাদর ঢাকা আপানকে এবার জড়িয়ে একটা কিস করল দীপ্ত। আপান বাধা দিল না। চোখ বুজে সেই সুন্দর অনুভবে ডুবে গেল সে।

আই প্যাডে মৃদু লয়ে গান বেজে চলেছেঃ

“হৃদয়ে হৃদয়ে আধো পরিচয়

আধো খানি কথা সাঙ্গ নাহি হয়

লাজে ভয়ে ত্রাসে আধ বিশ্বাসে

শুধু আধোখানি ভালবাসা...”

ক্রমশ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

পর্ব-১৫

আজ আবার শনিবার। আপান দীপ্তকে ব্রীত আর ঋতুকে ফোন করতে বলল। দীপ্ত ফোন করতে না করতেই দরজায় কলিং বেলের টুং টাং আওয়াজ। দীপ্ত উঠে দরজা খুলতেই ব্রীত ঘরে ঢুকল। ঘরে ঢুকে সোফা সেট- এ বসে পড়ল। আপান ওকে বললঃ “কোথায় খাবে আজ ব্রীত? 

-এপেল বী ...

আবার চুপ হয়ে গেল। 

-চলো আমরা রেডি হয়েই আছি। ড্যাডি দুবার ঋতুকে কল করেছিল কিন্তু মেসেজ করা যাচ্ছে না। তুমি একটু ট্রাই করবে ব্রীত।

-নোপ...শী ইস লাইক দ্যাট। 

এবার আপান নিজেই ফোন ধরে ঋতুকে কল করল। মেয়ে ফোন ধরে একটু বিরক্তির সুরে বললঃ

-আই এ্যাম কাইন্ড আ বিজি।

আপান আর ঘাটালো না...টেক কেয়ার বলে রেখে দিল ফোন।

এবার ওরা তিনজনে “এপেল বী” রেস্টোরান্টে খেতে গেল। ছেলে মেয়ে তো বাড়ির খাবার খায় না। খেতে খেতে হালকা এদিক ওদিক কথা হল।

খাওয়ার শেষে ওরা বাড়ি ফিরে এল। আপান তাকে তাকেই ছিল ব্রীতের হাতে ফোন দিয়ে বললঃ

“প্লীজ তোমার ঠাকুমাকে একবার ফোন করো। শী ইউল বী হ্যাপি টু হিয়ার ইয়োর ভয়েস। মন্ত্রবাক্যের মতন কোন কিছু উচ্চবাচ্য না করে ঠাকুমার সাথে কথা হল। বললঃ “আমি নিজের বাড়ি কিনছি। তুমি আসবে?” ঠাকুমা কি বলল বোঝা গেল না।

আপান বললঃ মাঝে মাঝে এট লিস্ট ১০ মিনিটের জন্য ঠাম্মার সাথে কথা বোলো। শী ইউল বী হ্যাপি। 

- আমি  টাইম পাই না। এভরি ডে আই এ্যাম সো বিজি।

বোঝা গেল যে, যাদের হাতে সব সময় সেল ফোন তারা ৫ মিনিটের জন্য ওকি নিজের ভালবাসার মানুষকে একটু ভালবাসা দিতে পারে না? ঠাকুমার সাথে কথা বলার সময় জানতে পারল আপান আর দীপ্ত যে, ব্রীত বাড়ি কিনছে। বাড়ি কেনার ব্যাপারে ওরা তো কিছুই জানে না। আপান নিজের থেকেই বললঃ “কনগ্র্যাটস ব্রীত।” এই অল্প বয়সে নিজের বাড়ি হচ্ছে, রিয়ালি প্রাউড অফ ইউ। দেখতে দেখতে দুবার গাড়ি পালটানো হয়ে গেছে। ওরা ওদের জ়ীবন ওদের মতন করে সামলাচ্ছে-

মনে মনে ভাবছে...একবারের জন্যও বলে নি যে সে বাড়ী কিনছে বা জানার পরেও বলছে না যে, তোমাদের নিয়ে যাব...

আবার বেশী আশা করছে বোধহয় আপান। ওরা এইভাবেই মানুষ হয়েছে। আসা যাওয়া করছে এটাই তো বড় কথা। 

আবার সেলফোন বেজে উঠল- ঋতুর। দীপ্ত ফোন ধরতেই ড্যাডির সাথে বোধহয় এমন কিছু কথা হচ্ছিল -তা যে বেশ সিরিয়াস তা দীপ্তর মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল। ফোনটা রেখে খালি বললঃ “ কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা একটু বেশী শাসন করতে ভালবাসে। কখনও কখনও তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। অনেকেই নিজেদের ভেতরের অশান্তি, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ফেলেন ছোটদের উপর নির্যাতন করে। প্রয়োজনে শাসন করা ভাল কিন্তু তা যেন এমন না হয় যা একটা টিনেজ মায়ের  মনটাই নষ্ট করে দেয়। শাসন অনেকভাবেই করা যায়। ভালো কথা বলে “শাসন” করাটাই প্রকৃত পন্থা।”

-উফস! আবার কী হল? আপান মনে মনে ভাবল-এইভাবেই বোধহয় ওর বাকি জীবনটা কাটাতে হবে। ওই যে কথায় আছে না-মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী।

ব্রীত তো তার আই-ফোনের দিকে এত বেশি মনো্যোগী যে কিছুই বুঝছে না। 

খুব মুস্কিলে পড়া গেছে, ভেবেছিলাম ওরা ওদের মা-য়ের কাছে আছে ঠিকভাবে নিজেদের তৈ্রী করতে পারবে।

ঘরের আবহাওয়া ভারী হয়ে যাচ্ছিল।

আপান চুপচাপ উঠে পড়ল-ওর আজকাল কেন জানি মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে পালিয়ে যাবে। বড্ড একঘেয়েমিতে ভরে গেছে। ব্রীত এবার 'বাই' বলে উঠে পড়ল। দরজা অবধি গিয়ে আমি ২১ দিনের জন্য ইন্ডিয়া যাচ্ছি আমার কাজের সেমিনারের জন্য। 

আপান চট করে বলে উঠল-কলকাতায় একটিবারের জন্য তোমার ঠাম্মাকে দেখে এসো।

-উইল ট্রাই। বোঝা গেল না হঠাত ড্যাডিকে হাগ করল। 

“শুধু নব দুরাশায় আগে চলে যায়

পিছে ফেলে যায় মিছে আশা”।

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

পর্ব ১৪

জীবনটা একটা ধারাপাত বলে আমি মনে করি। সেই ছোটবেলা থেকে আজ পর্য্যন্ত কত নামতা পড়লাম-সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে-সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

“অবগুণ্ঠন যায় যে উড়ে

দুঃখের শিখর চড়ে

ঝরণারে কে দিল বাধা-

নিষ্ঠুর পাষাণে বাঁধা।

আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন

মনকে   সুদূর শূন্যে ধাওয়ায়--”

আজ ব্রীতের ফোন-টা আমাকে কেন যে এত ভাবাচ্ছে বুঝতে পারছি না। ফোন করে কেমন যেন চুপ হয়ে গেল ছেলেটা। যাই হোক, ওকে আসতে বলেছি-আমার ডিউটি আমি করে যাচ্ছি। ওদের তোমার কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই দীপু। সেদিন মায়ের সাথে কথা বলার সময় মনে হল মা ব্রীত  আর ঋতুর গলার আওয়াজ শুনতে চায়। 

-আমাকেও ফোন করেছিল অথচ কিছুই বলল না। বেশ কয়েকবার করেছিল আমার অফিসের ফোনে, আর সেল ফোনে। কি ব্যাপার বুঝলাম না। আসলেও তো দেখেছো আগের মতন ছটফট করে না। মা যখন তোমাকে বলেছেন তার মানে মায়ের মন খারাপ হয় ওদের জন্য। 

-স্বাভাবিক সেটা, হাজার হোক রক্তের সম্পর্ক তো। নিজের নাতি-নাতনি। তবে আশ্চর্য্য লাগে ওরা একবারও জিগ্যেস করে না, ঠাকুমা কেমন আছেন। এই দেখো, আবার আমি গার্জে্নগিরি শুরু করেছি। কাল তো দুর্গাপূজা-অথচ দুই ভাই বোনের কারোর ফোন নেই। ঋতু আসবে না -সেটা ভালভাবেই জানা গেছে। আর জোর করে  করি  এই বয়সে পূজা-পার্বণ বা ভারতীয় সংস্কৃতি শেখানো যায়? তুমি এত লেখালিখি করতে বা এখনও করো বাংলায় অথচ ছেলে মেয়েদের কিছুই শেখাও নি। দোষ-টা শুধু ছেলে মেয়েদের দিলে চলে না দীপু-দোষ তোমারও। তাদের মা যখন চাইছিল না ছেলে মেয়ে বাংলা বলুক বা বাংলা আদবকায়দা শিখুক তখন তোমাকে এগিয়ে আসতে হত -অন্ততঃ বাংলাটা বলতে পারত। এখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। তাও দেখছি ভাঙ্গা ভাঙ্গা বলছে তো। আমি তো ওদের সাথে মোটেই ইংলিশে কথা বলি না, কাজেই বাধ্য হয়ে বলতেই হয় ওদের। হয়ত বিরক্ত হয়-তা হোক গে।

-যাই হোক, ওরা যখনই আসবে ওদের মায়ের সাথে কথা বলিয়ে নিও।

-চেষ্টা করব নিশ্চয়ই।

তাও শনিবারের সকালবেলা আপান ফোন করলঃ ব্রীত ও ঋতু দুজনের একজনের সাথেও কথা হল না। অগত্যা ওদের দুজনকেই যেতে হল পূজায়।

সারাদিন -রাত পূজো প্যান্ডেলে কাটিয়ে ওরা ফিরে এলো মধ্য রাতে।

পরের দিন রবিবার। বেশ একটু বেলাতেই উঠল দুজনে। আপান তো ঘুমিয়েই ছিল দীপ্ত চা আর বিস্কুট এনে আপানকে ডাকলোঃ “মেমসাব বেড টী আনা হ্যায়।”

আপান অঘোরে ঘুমাচ্ছিল—দীপু অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল আপানের দিকে আর মনে মনে ভাবলো, “মেয়েটা যেন সরলতা আর করূণার প্রতিমূর্তি। এই মেয়েকে কী ভাবে দুঃখ দিয়েছিল সেই অচেনা মানুষটা। কোনদিন দেখা হলে জিগ্যেস করতাম, “আপনি কি মানসিক ভারসাম্যহীণ-কারণ এইরকম মেয়েকে কি কেউ কষ্ট দেয়?” নিজের অজান্তে কখন ওর মাথায় হাত চলে গেছিল কে জানে। ধড়ফড় করে উঠেই দীপুর হাতে চায়ের কাপ দেখে বলেঃ “ইশ! কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছো। আমি এত ঘুমাচ্ছিলাম যে, কিছুই জানি না। কাল আসলে বড্ড টায়ার্ড হয়ে গেছিলাম। এতদূর গাড়ি চালিয়েছিলাম তো। অভ্যেস নেই।

-না না, তাতে কি হয়েছে, চা টা খেয়ে আবার শুয়ে রেস্ট নাও। তাড়া নেই তো।

-না আর শোব না। শপিং এ যেতে হবে না? বেলা দশটা বেজে গেছে দেখছি। চা খেতে খেতে মায়ের সাথে কথা বলে নি, নয়ত মা চিন্তা করবেন আবার। ওই মানুষটাকে যদি একটু মানসিক শান্তি দিতে পারতাম, নিজেকে ধন্য মনে করতাম। 

-শান্তি তো তুমি দিয়েছো। আগে আমি ১০ বছর দেশে যাই নি কারণ, পরমা নিজের মায়ের কাছে থাকতে চাইত আর আমার মা চাইত মায়ের কাছে থাকুক তার নাতি-নাতনি। একবার গিয়ে চরম অশান্তি হয়েছিল পরমার সাথে, সে কিছুতেই থাকতে চাইত না। এই দোটানায় আমি যেতাম না দেশে। পরমা ছেলে মেয়ে নিয়ে যেত আর আমাদের মায়ের কাছে শুধু একদিন গিয়ে থেকে আসত। মা কিছু না বললেও আমি বুঝতাম মায়ের মনের দুঃখের কথা। কিন্তু আমার কোন কথাই সে শুনতে চাইত না। যাক যা হবার তা হয়ে গেছে। আমি ওসব মনেও আনতে চাই না। She is lost forever. 

-শোনো কথায় কথায় বেলা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু। কাল আবার তোমার অফিস।

- ধ্যুস! দুজন মাত্র লোক তো। স্যান্ডুইচ খেয়ে নেবো না হয়।

-শোনো আমাকে উঠতে দাও তো। খালি বাজে বাজে সময় নষ্ট করা। ছাড়ো তো! আমি এবার উঠি।

-আচ্ছা ঘুম ভাঙ্গলেই কি দৌড়তে হবে? আজ তো ছুটি  রেস্ট নাও না। একা হাতে এত বড় বাড়ি পরিস্কার -পরিচ্ছন্ন করা, রান্না করা, আবার আমাকেও তো সামলাতে হ্য় বলে কি হাসি দীপ্ত-র।... অফিসের কলিগরা কি বলে জানো, বলে “আপান ইজ এ পারফেক্ট ওয়াইফ ফর ইউ দীপ”—জানো তো তখন আমার বুকটা গর্বে ভরে যায়... বলেই আপানকে জড়িয়ে ধরল দীপ্ত।

-সত্যি তুমি না পারো বটে, রসিক কবি! কোনরকমে নিজেকে বাহুবন্ধন থেকে ছাড়িয়ে এক ছুট্টে বেডরুমের লাগোয়া বাথরুমে ঢুকে গেল আপান।

শাওয়ার খুলে গেয়ে উঠল...

“কোন সুদূর সেই স্বপ্নপুর মোর মন যে গায়

ঘরে ফেরার সুর...”

দীপ্ত আসতে আসতে নিজের স্নান সেরে আপানের আগেই কিচেনে গিয়ে ফ্লোরেন্টাইন, ভেজিটেবল স্যুপ আর গ্রেপ ফ্রুট দিয়ে ডাইনিং টেবল সাজিয়ে ফেলল...আপান স্নান আর পূজা সেরে এসে দেখে টেবল সাজিয়ে বসে আছে দীপ্ত। না হেসে আর পারল না...আপান।

-এটা আবার কি? দারুন দেখতে হয়েছে তো! প্রিপারেশন প্রসেস কি?

-কোনটা? ফ্লোরেণ্টাইন?

-ইয়েস সার!

-ভেরি সিম্পল রেসিপি, ম্যাডাম। 

দুজন দুজনকে সিরিয়াস ব্যাপারে স্যার আর ম্যাডাম বলে উল্লেখ করে।

-পালং শাক, গ্রেট করা চিজ, দুধ , মাখন, আর ময়দা।

শাক মাখন দিয়ে নেড়ে নুন দিতে হয়। তারপর ডিম পোচ করে নিতে হয়। গ্রেভিটা করিঃ একটা সসপ্যানে প্রথমে মাখন+ময়দা+দুধ দিয়ে ঘন করে গ্রেট করা চিজটা দিতে হয়। তারপর শাক, ডিম আর গ্রেভি দিয়ে ১০ মিনিট মাইক্রোওভেনে দিলেই ব্যাস! হয়ে গেল ফ্লোরেন্টাইন! 

জানি ম্যাডাম আমিও কিছু কিছু জানি রান্না-বলে হেসে উঠল। এবার খেয়ে দেখো টেস্ট কেমন হয়েছে। ভেরি হেলদি ফুড।

-সুপার্ব -সিম্পলি সুপার্ব! এবার খেতে খেতে দীপ্ত -কে বললঃ “একবার ফোন করো ব্রীত আর ঋতুকে” -দ্যাটস ইওর ডিউটি, দীপ।” 

দীপ্ত ফোন করলঃ ব্রীত-এর ম্যাসেজ বক্সে চলে যাচ্ছে আর ঋতু বোধহয় ঘুমের ঘোরে ছিল। স্পীকার ফোন অন করা ছিল তাই বুঝতে পারল আপান। দীপ্তঃ “-হুম- দে টার্ণ আ ব্লাইন্ড আই ফ্রম দেয়ার প্যারেন্টস সিচুয়েশন-” বলে রেখে দিল ফোন। 

আপান বললঃ “ ওরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে”-- জানোই তো শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব, নগ্ন স্যাডিজম(Sadizm). কাজেই আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। দেখাই যাক না শেষ কোথায় হয়। 

ক্রমশ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

পর্ব ১৩

দুদিনের ঘোরা শেষে ফিরে এল ওরা এবার নিজেদের ডেরায়। মেয়ে চলে গেল তার ডর্মে। আবার গতানুগতিক জীবন। দীপ্ত কাজে চলে গেলে সাথে শুধু সেই একাকীত্ব। পাখিদের দেখে অবাক হয়ে যায় আপান। সারাদিন কত ব্যস্ত থাকে ওরা। মনে মনে ভাবে-বাড়ি থেকে বললেও এই বয়সে আর বিয়ে না করলেই পারত। একটা নিয়মিত ছিল জীবনের। অফিস, সেলাই আর তার সাথে বড় ভাইঝির জোরাজুরিতে একটু আধটু লেখা নিয়ে থাকা। সবার মাঝে বেশ কাটছিল দিনগুলো। কোনদিনই বাইরের লোকের বা বন্ধু বান্ধবদের সাথে খুব বেশি কথা বলা বা আড্ডা দেওয়া তো অভ্যেস ছিল না। নিজেকে নিয়েই থাকতে ভালবাসত। 

আর আজ এক্কেবারে একা। প্রথম এসে অতটা খারাপ লাগে নি-কারণ শাশুড়িমা ছিলেন। কিন্তু এখন যেন দিন কাটতেই চায় না। পাখীগুলোও এক এক সময় নিখোঁজ হয়ে যায় তাদের দৈনন্দিন কাজের তাড়ায়। 

সকাল পেড়িয়ে দুপুর এসে গেল। ১২টার সময় রোজ ফোন করে তাকে খাবার কথা মনে করিয়ে দেয় দীপ্ত। নয়ত আপান খাবারও খায় না মাঝে মাঝে।

যেমন আজ-সকালের জলখাবার ও খায় নি-দীপ্ত বলল “এইবার খেয়ে নাও। শরীর খারাপ হয়ে যাবে তো। আপান! এক কাজ করো! তুমি তো লিখতে, তাই না? লেখো না। আবার নতুন করে লেখা শুরু করো। এখন তো অফুরন্ত সময়। দেখবে কোথা থেকে সময় পালিয়ে যাচ্ছে।

লিখে ফ্যালো। যা মনে আসছে তাই লেখো। লেগে পড়ো। প্রথমে আমাদের জীবন নিয়েই লেখা শুরু করো আপান। তুমি পারবে আমার বিশ্বাস, ইউ উইল সাকসেস। তুমি এত সুন্দর কথা বলো-দেখবে একদিন তুমি অনেক নাম করবে। সব কাগজে তোমার লেখা প্রকাশ পাবে।

-এ্যাই, শোনো! নিজে লেখো বলে কি আর সবাই লিখতে পারে? 

-হ্যাঁ পারে। আলবাত পারে। কে পারে আমি জানি না, তবে আমার মন বলছে তুমি পারবে। এখন খেয়ে নিয়ে লিখে ফেলো। সব গল্পই তো করেছি। তোমার জীবন নিয়েও লিখে ফেলো। জানো তো একটা লেখা সম্পূর্ণ হয় যখন লেখার মধ্যে ভূত, বর্তমান আর ভবিষ্যত স্পষ্ট করে লেখা থাকে।

মনে হচ্ছে গান শুনছো?

-এই গানটাই সব সময় আজকাল মনের মধ্যে গুণ গুন করে ওঠে...

শুধু যাওয়া আসা শুধু স্রোতে ভাসা,

শুধু আলো-আঁধারে কাঁদা-হাসা!

-ওসব ছাড়ো তো। ব্রীত আজ ফোন করেছিল আমাকে -কিছু বলল না অবশ্য। তোমাকে করবে বলেছে।

ওকে টক উইথ ইউ লেটার।

-অফিসের লোক এসেছে নিশ্চয়ই নয়ত ইংলিশে আমার সাথে কথা বলে না তো, দীপ্ত। উঠি এবার। সত্যি এবার ক্ষিদে নামক অদেখা শব্দটা পেটে ডন বৈঠক মারছে। 

একটু স্যালাড নিয়ে খেয়ে সত্যি কমপিউটারের সামনে বসে পড়ল আপান...কিছুক্ষণ ইউনিকোডের অভ্র-র দিকে তাকিয়ে রইলঃ এসে থেকে আর লেখার সাথে যোগাযোগ নেই। যেন একটা স্টেজ এ সিরিয়াল দেখছে। সত্যি একেবারে ধ্রুব সত্যি! একটা রেগুলার সিরিয়ালের সাথে কোন প্রভেদ নেই। সব যেন চোখের সামনে ভাসছে-আর ভবিষ্যত তো দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। আপনা আপনি আঙ্গুলগুলো কী-বোর্ডে চলতে আরম্ভ করল তড়তড় করে। 

নাম টা নিজের অজ্ঞাতেই লিখে ফেলেছে, 

দীপ্ত'র চতুর্থ অধ্যায় !

একমনে লিখতে লিখতে হঠাত ফোন। দেখে ব্রীতের ফোন। 

-হাই! কেমন আছো ব্রীত? বেশ অনেকদিন আসো নি তো। সব ঠিকঠাক আছে তো।

-ইয়েপ। 

আবার চুপচাপ।

-কিছু বলবে?

-অপরদিক থেকে কোন আওয়াজই নেই।

-হ্যালো! ব্রীত! ওকে কাম টু ভিজিট আস। 

-সিওর! লাইন কেটে দিল।

কী আশ্চর্য্য! ফোন -ই বা করেছিল কেন? কিছুই তো বলল না। এরকম পরিবেশে সত্যি নিজেকে বড বেমানান লাগে। কিন্তু কী আর করবে...

দেখতে দেখতে বিকেল চলে গেল হেলতে দুলতে। কিরকম যেন আজকাল সময়কেও আপান দেখতে পায়।

দীপ্ত বাড়ি এসে সারাদিনের ক্লান্তি ধোবার জন্য গেছে নিজের স্নানঘরে। 

হঠাত আপান লক্ষ্য করে শুক্লপক্ষের রাত্রি। মাথার ওপর রূপোলী আলোর ঝকঝকে আকাশ। সেই আকাশে হাসিমুখ চাঁদ।

ব্রীতের স্বভাবটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আপান নিজের মনেই বলে উঠলঃ নারীসুলভ বোধশক্তি দিয়ে নারী পুরুষকে চেনে পুরুষের চেয়ে বেশী।

হঠাত দীপ্ত এসে দেখে আপান আকাশের দিকে তাকিয়ে কী বিড়বিড় করছে। পেছনে এসে ওর কাঁধে যেই হাত রেখেছে- আপান চমকে উঠেছে।

-একমনে, কী এত ভাবছিলে শুনি?

-ভাবছিলাম, মানুষের মন এক অভাবনীয় বস্তু। অনেক বড় ঘটনা যেমন বিস্মৃতির অতলজলে হারিয়ে যায়, তেমনি আবার সামান্য কোন ঘটনা স্মৃ্তিপটে চিরকালের জন্য লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে। তেমনই একটা ছোট ঘটনা আজ চোখ বুজলে আমি যেন স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।

ক্রমশ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

পর্ব ১২

সকালের সুন্দর রোদের আলো ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিল তিনজনের। ফ্রেশ হয়ে নীচে থেকে ব্রেকফাস্ট খেয়ে নিল। তারপর রেডি হয়ে বেড়িয়ে পড়ল টার্নার ফলস দেখতে। সত্যি খুব সুন্দর ফলসটা। আনাচে কানাচে শরীর মন ঝিম ঝিম করা ঠান্ডা জল। ইউনিক Nature! চারপাশের আবহাওয়া মানসিক দুঃখ কষ্ট-কে ভুলিয়ে দেবার জন্য মাতাল হয়ে আছে। আসতে আসতে লোকে নামতে শুরু করে দিয়েছে জলের মধ্যে। আপান কিছুক্ষণের জন্য যেন হারিয়ে গেছিল জলের ছোট ছোট ঢেউগুলোর সাথে। গাছগুলোও সবার গলা জড়াবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আপান নিজের মনেই হেসে ফেলেছে। ঋতু একটু এগিয়ে গিয়ে একটা ছেলের সাথে কথা বলছে- দেখল আপান। হঠাৎ দীপ্তর-র হাত ওর হাতের মধ্যে দেখে চমকে উঠল... 

-কি হচ্ছে কী? এইসব দেখে বলে আজকালকার ছেলে মেয়েরা এত খারাপ হয়ে যায়।

-ওরে বাবারে! এ তো এক্কেরে আমার গার্জেন হয়ে উঠেছে আজকাল। এ সব দেখে আর ওদের খারাপ হতে হবে না, বুঝলেন ম্যাডাম। ওরাই আমাদের শিখিয়ে দেবে 'এইসব'। দেখছো না 'Don't care' মেয়ে আমাদের সামনেই ছেলেটার সাথে কত অন্তরঙ্গভাবে কথা বলছে। কিছু বলতে গেলেই এক্কেরে রুদ্রমূর্তি ধারণ করবে। তার চেয়ে ভাল “চরে খা” মেন্টালিটি-তাকে ফলো করাই বেস্ট। কি দরকার বেশি শাসনের।

-ক্ল্যাপ ক্ল্যাপ! ড্যাডি-ক্ল্যাপ! এই নাহলে আমেরিকায় থাকা ড্যাডি।

-নাঃ তুমি কী করতে বলছ, তাহলে?

-কিছু না। মেয়ে আসছে …...

ঋতু ফিরে আসলে কাছাকাছি “টাকো খাবানা” নামে মেক্সিক্যান রেস্টোরান্টে ওরা খেয়ে নিল লাঞ্চ। তারপর এদিক ওদিক ঘুরে আবার নিজেদের হোটেলের ব্যালকনিতে তিনজনে তিনটে চেয়ার নিয়ে বসে পড়ল। ধুমধাম করে যেন সন্ধ্যে নেমে এল।

এই ফাঁকে আপান বলে নিল ঋতু কে যে, নেক্সট ফ্রাইডে ইভনিং আর সাটারডে হোল ডে তুমি আমাদের সাথে থাকবে। বেংগলি মেইন ফেস্টিভ্যাল “দুর্গাপূজা” আছে। 

মেয়ের তো চোখ কুঁচকে গেছে...'দুর্গাপূজা' -আমি জানি বাট আমি আসতে পারব না ।

-কেন? 

-আমি লাইক করি না, ভালো লাগে না। কিডস থাকতে যেতাম। বাট তারপর আর যাই নি। প্লীজ আমাকে যেতে রিকোয়েস্ট কোরো না। I feel bored over there. 

কথাটায় বুঝি শুধু স্তুতি নয়, গোপন অনু্যোগও আছে। `সঙ্গে একটা অব্যক্ত অনুরোধ। 

-সে কি? লাইক করো না?

-আস্ক করো ড্যাডিকে ...

-মুখে হাসি টেনে রেখে আপান বলল-ঠিক আছে তখন যেতে না, কিন্তু এখন যাবে। আমাদের সাথে যাবে। আমাদের খুউউউব ভাল লাগবে।

-কিন্তু মাম তো আসবে সেখানে।

তার মানে মেয়ে জানে মাম যেখানে সেখানে ড্যাডি যাবে না।

-না আমরা অন্যটায় যাব। যেটা বাড়ির কাছে হয়। তোমার মাম আসে না সেখানে।

-একচুয়ালি আমি যেতে চা-ইই না। ব্রীত কে নিয়ে যেয়ো। আমি ফ্রেন্ডস-দের সাথে মুভি যাব। এন্ড ওয়ান্ট টু স্টেই উইথ দেম। আই হোপ ব্রীতও লাইক করে না। ব্রীত অল টাইম says - “ ব্ল্যাডি ইন্ডিয়ান, হোপলেস কালচার!” 

-Why does he say so. This is bad Don't forget that your original root is Bengali. Americans ever say like that.. “Bloody Merican”?. No Never. তোমাদের ফ্রেন্ডস সার্কলের মধ্যে কেউ কি নিজের অরিজিনাল root কে এইভাবে ইন্সাল্ট করে, বেবি? 

-Dunno. Why r you arguing with me..I didn't say that! Breet Said.

-Any way, leave it. 

দীপ্ত এক্কেবারে চুপচাপ...চোখ চলে গেছে তার দূরে পাহাড়ের গায়...মনে হচ্ছে সে কিছুই কানে নিচ্ছে না।আপান মনে মনে ভাবছে, এরাই কী ভবিষ্যতের বাঙ্গালী হবে ? না তারা কোনদিকেই যাবে না? প্রশ্নের পর প্রশ্ন এসে চাবুক মারতে লাগল আপানকে।

তাও মুখে হাসি এনে ঋতুকে বল্লঃ “ঋতু তুমি আমদের সাথে পূজায় আসলে আমাদের খুব ভাল লাগবে।” 

-Sorry! Please don't force me, I don't like to argue with you. 

এই একটি কথায় আপানের মুখ এক্কেবারে বন্ধ করে দিল। কিছু বলার মত আর খুঁজে পেল না । মনে হল নিজেকে নিজেই থাপ্পড় মারল। 

-নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছিল নিজের ওপরচালাকি দেখানোর জন্য। বড্ড বেশি নিজেকে আইডিয়াল ভাবতে বসে গেছে সে। যেন তার নিজের রক্তের সন্তান। 

হঠাত কোথা থেকে কালো মেঘ এসে সারা আকাশটাকে ঘিরে ফেলল। বৃষ্টি শুরু হল ঝিরঝির করে। ক্যালেন্ডারের হিসেবে এখন পূর্ণ শরৎ, আশ্বিন পড়ে গেছে। তবে আকাশ দেখে তা বোঝা কঠিন। নীলের গায় সাদা মেঘের ভেলার দেখা প্রায় মেলেই না আজকাল। রোজ ই রাশি রাশী কালো মেঘ, রোজ বর্ষণ। আজ তো সকাল থেকেই বেশ ঝকঝকে রৌদ্র আবার হঠাত করে মেঘে ঢেকে দিল চারিধার। ঠান্ডা লাগার ভয়ে ওরা উঠে ভেতরে চলে গেল।

ডিনার টাইম বলে নীচে ক্যাফেটেরিয়ায় খেয়ে নিল। ঠিক রাত ৭টায় ক্যাফেটেরিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

ঋতু নিজের ঘরে ঢুকে নাইট ড্রেস “ একটা বেবি পিঙ্ক পাজামা আর টি শার্ট” পরে নিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। গুরুজনরা বসে আছে সেদিকে খেয়াল নেই। ওদের দিকেই পা করে শুয়ে কাকে Text Massage করতে শুরু করল।

আপান আর কিছু না বলে, “Good Night Baby” বলে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

দীপ্ত মনে মনে বললঃ “ এ কি আমি কেন বোবা হয়ে আছি। সেও “Good Night Dear”! বলে উঠে পড়ল।

দীপ্ত আর আপানকে চলে যেতে দেখে সে তখন কানে Hearing cable লাগিয়ে শুনতে শুরু করল মাথা নেড়ে নেড়েঃ

“I need you babe babe

Annyeongiranmareun hajimara

I want you babe babe

Wae irisarangi himeungeoji heo jebal

Stop stop breaking my Heart.....”

ক্রমশ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

পর্ব ১১

আপান নিজের থেকেই বললঃ কী সুন্দর করেছ এনফ্রাডো ...সুপার্ব! ঋতুর মুখের দিকে তাকিয়ে আপান আবার বললঃ “খুব ভাল করেছ তো? কি ভাবে করেছ এই এনফ্রাডো?”

খুশী হল- মনে হল মেয়েটা। কিন্তু মুখ নীচু করেই আছে, কি যেন ভাবছে একটা। ওদিকে দীপ্তও চুপচাপ। আপান দেখল এইভাবে তো চলে না...মাথায় একটা বুদ্ধি এল।

-আজ চলো না কোথাও যাই? কি বলো ঋতু? 

-কোথায় যাবে? চট করে বলে উঠল মেয়ে।

-তুমি যেখানে নিয়ে যাবে সেখানেই যাব । আমি ত কিছুই দেখি নি আশেপাশের। 

-দেখে লাগল মনটা খুশি হল, হাজার হোক বাচ্চা মেয়ের মন তো।

-তাহলে চলো না আমরা ওকলাহোমা যাই। ওখানে টার্নার ফলস আছে। তবে আজকের নাইট স্টে করলেই ভাল। মরনিং সিনারি খুব এ্যট্রাক্টিভ।

এক পশলা বৃষ্টি হওয়ার পর পরই গুমোট ভাবটা পুরোপুরি কেটে গেল।

-কত দূর? বাড়ি থেকে ঋতু? 

-থ্রী আওয়ারস ড্রাইভিং। তবে আমি ড্রাইভ করব কিন্তু, ড্যাডি নয়।

এই সেরেছে, এখুনি ড্যাডি ফোঁস করে উঠবে। আবার একটা ঝড় উঠবে, আবহাওয়া তাই তো বলছে।

ড্যাডি বলল- “নো প্রবলেম।” হাওয়া অন্যদিকে মোড় নিল-স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আপান।

ড্যাডি রাজি হয়েছে দেখে এবার ঋতুর মুখে হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে ভাবছে বোধহয় মেয়েটা যাই হোক একটাতে তার জয় হল। ঋতু আর একটিও শব্দ উচ্চারণ করে নি। কিন্তু দীপ্ত একবার মেয়ের দুগালে চোখের জলের শুকনো দাগ দেখতে পেল। একেবারে স্পষ্ট। কোনও ধ্বংসের আগে, প্রবল বৃষ্টিপাতের আগে পৃ্থিবীর মুখ যেমন থমথমে হয়ে যায়, তেমনই লাগছিল ঋতুর লাবণ্য আনন। 

তিনজনেই তৈ্রী হয়ে নিল...আকাশ নির্মেঘ । ভাদ্রের গুমোট কম আজ। থেকে থেকে হাওয়া বইছে। সকাল ১০টা নাগাদ বেড়িয়ে পড়ল ড্যাডির BMW গাড়ি। চালিকা আর কেউ নয় মেয়ে ঋতু। ড্যাডি আর মেয়ে সামনের সিটে আর পেছনে বসে আপান। মাঝে মাঝে গাড়ির জানলা খুলে দিলেই ফুরফুর ঢুকছে বাতাস, স্নেহের পরশ বোলাচ্ছে আপানের মুখে চোখে। আমেজ আসছে, বেশ আমেজ আসছে। সেই আমেজের মধ্যেই সে দেখল দুটো খুদে খুদে ঝর্না বুঝি বা প্রাণের সারা এনে দিল ওদের জীবনে। হঠাত ব্রেক কষায় আমেজটা নষ্ট হয়ে গেল। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল, ঋতু একমনে গাড়ি চালাচ্ছে কিন্তু পাশে বসা ড্যাডি তখন গভীর ঘুমে অচেতন। তার নাক ডাকাই বুঝিয়ে দিচ্ছে, ঘুমের গতি কোনদিকে। 

মেয়ে এবার ম্যাকডোনাল্ডের সামনে গাড়ি দাঁড় করালো। গাড়ি লক করে তিনজনেই ভেতরে গেল-হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর খাবার অর্ডার দিতে গেল ঋতু নিজেই। সেই ফাঁকে দীপ্ত আপানকে জিগেস করল,

-চুপ করে আছো কেন? এত ঝামেলা তোমাকে পোহাতে হবে তুমি ভাবো নি, তাই তো। আসলে তোমরা মেয়েরা একটুকু প্র্যাক্টিকাল নও। দীপ্ত হাসছে, সাদা সত্যির দিকেও তোমরা চোখ তুলে তাকাতে চাও না।

-এ বিষয়ে আমার কথা না বলাই ভাল, নয় কি? মনোগত ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েও নিষ্পৃহ স্বরে বলল আপান। 

ঋতু খাবার নিয়ে আসাতে দুজনেই নর্মাল হয়ে গেল। খাওয়া সেরে আবার তিনজনেই গাড়িতে বসে রওনা দিল। পৌঁছে গেল দেখতে দেখতে ওকলাহোমা স্যুইটে। অদ্ভুত সুন্দর যায়গা। সাড়ি সাড়ি গাড়ি দাঁড়িয়ে।

বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ। কদিন ধরেই বর্ষার আর তেমন তেজ নেই। বিদায়বেলা বুঝি ঘনিয়ে এল, তবু নিয়ম রক্ষের মতো একবার অন্তত নামে রোজ। তিনজনেই ক্লান্ত ছিল, তাই পাশাপাশি দুটো রুমের একটাতে ঋতু ড্রেস চেঞ্জ করে দুধ সাদা বিছানায় এলিয়ে দিল শরীরটা। আপান আর দীপ্ত ওর ঘরেই বসে খানিক এদিক ওদিক গল্প করতে করতেই ঋতু ঘন ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। এই হোটেলের ফ্যামিলি রুমগুলোর একটাই বাইরের দিকে দরজা, মাঝখান দিয়ে প্যাসেজ় করিডোর। তাই ওর ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে দুজনে নিজেদের ঘরে এল। আলো আঁধারীতে খুব রোমান্টিকভাবে সেজেছে ঘরটা। ঢুকেই রুমের লাগোয়া বারান্দায় গ্রিলের বাইরে দু' হাত ছড়িয়ে দিল আপান। জলের ফোঁটা ছুঁচ্ছে। ভাবনার লাগাম পরাতে চাইছে আপান। পারছে না। ছিঁড়ে  যাচ্ছে বারে বারে সেই ভাবনার তার।

ড্রেস চেঞ্জ করে নিল দীপ্তও। ভেতর থেকে দীপ্ত চাপা গলায় আপানকে ডাকল- “ ঘরে এসো-অসময়ের বৃষ্টির হাওয়ায় শরীর খারাপ হয়, জানোতো। আপানের সাড়া না পেয়ে দীপ্ত বিছানা ছেড়ে ধীর পায়ে ব্যাল্কনিতে এল।

আপানের পিঠে একটা হাত রাখল আলতো ভাবে। থুঁতনিটা ওর কাঁধে রেখে বললঃ “ ভাবছো এ কি গর্তের মধ্যে পড়ে গেলে তাই না, আপান। এইরকম হবে আমি ভাবি নি, বিলিভ মী। ভেবেছিলাম ওরা আর আসবে না আমার কাছে। কিন্তু তুমি আমার জীবনের গল্পটা ঘুরিয়ে দিলে। আই লাভ ইউ সো মাচ , আপান, আই লাভ ইউ।” ওর গলাটা জড়িয়ে ওর ভেজা ঠোঁট-এ নিজের  ঠোঁট রাখল। আপান নির্জীব স্থির চোখে দীপ্তর দিকে তাকাল। জমাট বাষ্প অশ্রু হয়ে নামছে দু গাল বেয়ে। মুছে ফেলার চেষ্টা করল আপান।

-মোছে না।

ভেজা হাতে কি জল মোছা যায়?

আপান দীপ্ত-র দুই হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বললঃ জানো তো! আমি বিশ্বাস করি না, স্বামী-স্ত্রীর জীবন এমন একটা জিনিস যা একবার সেলাই করে দিলে সাতজন্মে আর খুলবে না, ছিঁড়বে না। বা তার সুতো কোথাও খুলবে না? অসম্ভব দীপ-অসম্ভব! সংসারে এমন কিছু আছে নাকি যা ভাঙে না , মচকায় না। আবার আলগা হয়ে যায় না। যদি থাকে তবে সেটা হয় মিথ্যে, নয় নিয়মের বাইরে।

হয়েছে বাবা হয়েছে । এবার চলো তো -বিছানায়। ঘুম আসছে।

কী ঘুম আসছে তোমার? সারা রাস্তা তো দিব্যি ঘুমিয়ে এলে।

-ধ্যাৎ!আমি ঘুমোই না ---

-ক্যামেরাটায় ফোকাস করতে পারলে বেশ হত—প্রমাণ থাকত।

-এই চলো সকালে ঋতু উঠে পড়বে আর দেরী হলে আবার মেয়ের মুখ নীচু হয়ে যাবে।

-বাপকা বেটি হ্যায় না...! কুছ না হোগা তো হোগা থোরা থোরা... করে ওর স্বভাব সুলভ হাসি মিশে গেল রাতের বিদ্যুতের ঝলকানিতে।

-আবার! জ়োর করে আপানের কোমর ধরে ঘরে নিয়ে এল......

বিছানায় শুতেই আপান গাড় ঘুমে নেতিয়ে পড়ল দীপ্ত্-র হাতে মাথা রেখে।

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

১০ম পর্ব

এ যেন একটা ছবি...তফাত শুধু তিন ঘন্টার যায়গায় বেশ কিছু দিনের। এ ছবি দেখে যেতে হ্য় অনুভবে বুঝে নিতে হয়। আজ কেউ একজন কে ভালবাসছে । কাল তাকে ছেড়ে আরেকজন কে ভালবাসছে। সে ছেলে-করলে কিছু যায় আসে না হয়ত। আপান চলে গেলো ছোট বেলায়-যখন ছোট দাদার খেলা সেরে আসতে সন্ধ্যে হয়ে যেত। এসে বলত ম্যাচ ছিল বলে দেরি হয়েছে। তাও মা বলতেন যে, এবার থেকে সন্ধ্যের আগেই বাড়ি আসার চেষ্টা করতে। নয়ত বাবার কাছে বকুনি  খেলে মা কিন্তু কিছু জানেন না। আর আমায় বলতেন বাড়ীর ছাদে খেলা করতে। যেই বলত আপান যে মা “ ছোটদা তো বাইরে খেলতে যায়, আমি কেন যাব না?” মা কেন যে বলেছিলেন সেই কথাটা- এখন সেই কথাটার মর্ম বুঝতে তার একটুও অসুবিধা হ্য় না। তিনি বলেছি্লেন, “ ছেলেরা একবার চান করলেই শুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েরা হয় না, সোনা।” 

তখন হয়ত এই কথাটার গুরুত্ব বুঝি নি...কিন্তু আজ বুঝতে অসুবিধা হ্য় না। কী সুন্দর ভাবে একটি ৮ বছরের মেয়েকে শিক্ষা দিয়েছিলেন তার মা।” 

কিন্তু এই যুগের মেয়েরা? মাঝে মাঝে ভাবে তার বাড়িতেও তো ছোট ছোট ভাইপো ভাইঝিরা আছে, তারা তো এরকম না? আর এই মেয়ে তো এখানে আসলেই কথা বলার চেয়ে তার চোখ সব সময় I-phone এ থাকে। তার যে হাত পা বাঁধা...এক এক সময় ভাবে কী তার করণীয়?

আপান একবার ভাবলো ব্রীত কে বোঝায় যে, জীবনক্ষু্ধা বড্ড সাঙ্ঘাতিক জিনিস... একে উপলব্ধি করতে শেখো। একে ছেলেখেলা ভেবো না। এখন ছোট আছো। ভাবছো এই খেলায় সবাই জিতে যায়। শুধু তোমার মাম আর ড্যাডি ছাড়া। কিন্তু না। একেবারেই না। অনেকে আপ ডাউন আসে জীবনে। Life is like a boat. The boat cross lots of ups and down. কিন্তু বলতে পারল না। যদি বলে বসে যে, “ What abou You?”

এই what about you? -প্রশ্নটা মাঝে মাঝে বড্ড ভাবায় আপানকে। কি তার উত্তর হবে, জানা নেই।

নিরবতাকেই বেছে নিল। 

ব্রীত এর আবার প্রশ্ন- ডিড ইউ লাইক হার?

-ইয়েস, অফকোর্স! হোয়াই নট? She is pretty and qualified.

এখানেই তো ব্যবধান ঘটে নিজের আর পরের সন্তানের? সব সময় মনে হয়...কি করলে এরা সুস্থ জীবন যাপন করবে, কিন্তু তার হাত পা বাঁধা একেবারে, তবুও আপান ছাড়বার পাত্রী নয়----

খেয়ে দেয়ে ব্রীত চলে গেল...আর ঋতু ড্যাডির সাথে একটু খুনশুটি করে নিজের শোয়ারঘরে চলে গেল।

পরের দিন আপান ঘুম থেকে উঠে দেখে ঋতু রেডি হয়ে ওদের জন্যে কফি আর এগ এলফ্রাডো বানিয়ে কফি টেবিলে বসে আছে অন্যমনস্ক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে। 

ছুটির দিন আপান ঘুম থেকে উঠে পূজো সেরে আসতে আসতে রোজই প্রায় ৭টা বেজে যায়। কিন্তু কাল রাতে ব্রীত -এর ব্যাপারে আলোচনা করতে করতে কখন যে দুজনে ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল করতে পারে নি। তাই নীচে নেমে হঠাৎ ঋতুকে দেখে একটু অবাক হয়ে গেল...কারণ এত ভোরে সে তো সাধারণতঃ ওঠে না। ডেকে ডেকে তাকে ওঠাতে হয় প্রায় ১১টা নাগাদ। আর আজ?

-good morning Ritu! What happened? You dressed up so early in the morning?

-No ! Actualy I have to go to meet my friend.

-কিছু কাজ আছে নাকি?

-Nope. Just discuss about home work and planning for the sleepover.

সেইসময় দীপ্ত ও নেমে আসছিল চান সেরে, সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মেয়ের কথা শুনতে পেয়ে বলে উঠলঃ 

-My dear! what are you talking about?

মেয়ে তো চুপ হয়ে গেছে। আপানের দিকে চোখ মেরে মেয়ে বলে উঠলঃ

-we have some discussion, so....

-So what? সারা দিন Discuss করো কিন্তু রাতে sleeover করতে হবে কেন? কার বাড়ীতে sleepover করবে তুমি?

-আমার এক বন্ধুর বাড়ী তুমি চেনো না।।

-You tell me the name of your friends..I know all of them since they were born.

-Kelly's hosue..

-কি? কি বলছো তুমি? ওর বড় ভাই আছে আর স্টেপ ড্যাড আছে...

-So what? I stayed before....why not now..mam and uncle , they don't bother me.

-They don't bother? But I do bother. ..দীপ্ত-র গলা এবার উঠছে...আপানের দিকে তাকাতেই আপান ইশারায় তাকে নরম হতে বলল।

-Please be kind, be honest and be tactful my sweet honey. মেয়ে এবার রাগে ফুঁসছে দেখে আপান মেয়ে আর ড্যাডির মধ্যে এলো না । সরে যেতেই দীপ্তও ওকে ইশারায় ঋতুর পাশে বসতে বলল।

আপান এসে ঋতুর পিঠে হাত দিয়ে চুপ করে দাঁড়ালোঃ

দীপ্ত মনে সাহস পেয়ে এবার মেয়ের পাশে এসে বসে ওর হাতটা নিজের হাতে রমধ্যে নিয়ে আবার মেয়েকে বোঝাতে শুরু করলোঃ

“My dear, please think yourself, but respect the rules. Be generous with kind words and affectionate gestures, but respect yourself and family values always”.

মেয়ের মুখে কথা নেই...বুঝলো কি বুঝলো না। বোঝা গেল না...

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

৯ম পর্ব

আজকে মেমোরিয়াল ডে'র ছুটির দিনের বিকেলের আকাশটা আবার কেমন যেন থম মেরে আছে।

কফি আর স্ন্যাক্স খেয়ে দীপু নিজের অফিস ঘরের কম্পিউটারে নিজের মেইল চেক করতে করতে উদবিগ্ন হয়ে উঠল। অস্থির গলায় ডাকলো আপানকে...

-শোনো আপান! 

আপান বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাখীদের বাসায় ফেরার ছটফতানি দেখছিল একমনে। ছুটে এল দীপুর ঘরে।

ডাকছিলে?

-হ্যাঁ! দেখোতো এটা কার মেল? প্লীজ পড়ে শোনাও; 

আপান সাধারণত্যঃ দীপুর অফিসিয়ালি কাজগুলো ম্যানেজ করে। 

-ওহ! এতো পরমা! লিখেছে $৪০, ০০০ ডলার ঋতুর নাম-এ পাঠাতে যাতে ও মেডিক্যাল পড়তে পারে। কারন, ঋতু এবার স্কুল গ্রাজুয়েট হচ্ছে। 

-$৪০, ০০০? কিন্তু...

- চিন্তা কোরো না। আগে ঋতুকে বি এস করতে হবে একটা সায়েন্স সাবজেক্ট নিয়ে। তারপর ওকে এম ক্যাট পরীক্ষায় বসতে হবে--কাজেই... থাক! আমি আর কিছু বলবো না,এই ব্যাপারে...হাজার হোক আমি তো ওর নিজের মা নই বলে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

তবে আমার মনে হয় ...এইভাবে ছেলে মেয়েগুলোকে স্পয়েল করার কোন মানে হয় না।

দীপু সব শুনে বললঃ “তুমি জানো সব? মেডিক্যাল পড়তে গেলে কি কি লাগে?”

-হ্যাঁ। কারণ আমিও ওই পথে গেছিলাম। অনেক টাকার ব্যাপার। সাধারণতঃ সবাই লোন নিয়ে পড়ে।আর যদি পাশ ভালভাবে না করতে পারে, সব টাকা জলে যাওয়া। আমার দুই ভাইপো ভাইঝি লোন নিয়েই পড়েছে। 

তাহলে এসব করার মানে টা কি, পরমার?

-চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার মনে হয় ওর টাকার দরকার হয়ে পড়েছে কারণ দুজনেই ত বেশী পড়াশুনা করে নি, তুমি বলেছো। তাই না? টাকা ছাড়া তো প্রেম কাজ করে না।

-তো আমি কী কোরবো, বলতে পারো আপান। এইভাবে সব সময় যদি ডিস্টার্ব করে।

-জানো দীপু! তোমাকে তো বলা হয় নি-আজকাল প্রাইভেট নং থেকে ফোন কল আসে। হ্যালো বললে অপরদিক সাইলেন্ট থাকে। প্রায় ১০ মিনিট ব্রেকে ফোন করে ...হয়ত আমাকেও ডিস্টার্ব করার ধান্দায় আছে। তুমি কি বলো?

দীপু অনেকক্ষণ ধরেই দেখছিল আপানকে যখন থেকে সে মেলের লেখা পড়ছিল। এবার উত্তরের আশায় যেই তাকিয়েছে দীপুর দিকে...লজ্জা পেয়ে যায় দীপুর চোখের দিকে তাকিয়ে। দেখে দীপু একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। আসলে দীপু ওর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলঃ “কি দিয়ে তৈ্রী এই মেয়েটা? কিছুটি চায় নি আজ পর্যন্ত্য। নিজের একটা সন্তান তো চাইতে পারত-যা সব মেয়েদের আকাঙ্ক্ষা থাকে...যেন সংসারে থেকেও এক যোগিনী।”

হঠাৎ করে উঠে দুহাত দিয়ে আপানের গলাটা জড়িয়ে নিজের মুখ নামিয়ে আনল আপানের মুখের কাছে...

-অ্যাই! ধ্যাৎ! কি হচ্ছে কি? সময় নেই -অসময় নেই...এক্কেবারে । কি যে করে না...

-“ভালবাসা”!

-হুন বাবা! ভালবাসা জিনিসটা একরকম ফাঁদ, ভাল লাগিয়ে, ভালবাসিয়ে, প্রেমে পড়িয়ে-পুরুষেরা অন্যরকম এক দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধে মেয়েদের আষ্টেপৃষ্ঠে।

যথারীতি পরের ফ্রাইডে নাইট ঋতু এলো- “ ওর মায়ের হুবহু কথাগুলো উগড়ে দিল তার ড্যাডির কাছে।

দীপু ইঙ্গিতে আপানকে ভিড়িয়ে দিল ঋতুর সাথে। 

নিরুপায় আপান ঋতুকে কাছে ডেকে বললঃ “ দেখো আগে তোমাকে আন্ডারগ্রাডুয়েট পাশ করতে হবে। তারপর এম ক্যাট পরীক্ষা দিতে হবে। খুব কম্পিটিটিভ পরীক্ষা। কাজেই আগে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট করো খুব খেটেখুটে। খুব হাই স্কোর কোরতে হবে কিন্তু মেডিক্যাল পড়ার জন্য। আগে ঠিক করো কোন বিষয় নিয়ে পড়বে, কোন বিষয় তোমার ভালো লাগে। আর তোমার হাইস্কুল গ্রেড কিরকম হয়েছে, ইচ্ছে থাকলে আমাকে দেখাতে পারো। এখানে থাকলে আমি গাইডও করতে পারি তোমাকে। As you like Ritu, আমি কোনো কিছুতেই ফোর্স করা ভালোবাসি না। যদি সত্যি মেডিক্যাল স্কুলে যেতে চাও, “ইউ হ্যাভ টু ডু দি হার্ড ওয়ার্ক।”

যাই হোক। আবহাওয়া আর গরম হল না। মেয়ে বুঝল মনে হল। মায়ের শেখানো বুলি আর কতক্ষণ বলবে, বেচারী। আর বুঝেও গেল যে, আপানের এখানকার ডিগ্রী আছে, তার মায়ের মতন না। হাজার হোক ওরা তো এখনো প্যাঁচালো জগতে ঢোকে নি। 

আবার এইভাবে দিন যাচ্ছে, ঋতু কলেজ স্টুডেন্ট এখন। ব্রীত Computer নিয়ে পড়ছে। গ্রাজুয়েট হয়ে গেছে, মাস্টার্স করছে একটা ভালো ইউনিভার্সিটি-তে। 

আপান কিছুতেই ওদের মনে ড্যাডির প্রতি ভালবাসা জন্মাতে পারছে না। এটাই হয় বোধহয়। ওরা ওদের মা বাবাকে কিছুতেই সাপোর্ট করতে পারছে না। কিসের একটা গ্যাপ থেকেই যাচ্ছে ড্যাডি আর ছেলে মেয়ের সঙ্গে। আসছে কথাবার্তাও হচ্ছে... কিন্তু কিসের একটা মস্ত গ্যাপ। সেদিন বাড়িতে একজন বান্ধবী এসে বলছিল...তাদের ডিভোর্স হয় নি । তবে ছেলেরা আসে না। তারা নাকি সবসময় বিজি থাকে।

আজকাল ব্রীত আসাও অনেক কমিয়ে দিয়েছে। একদিন আপান ওর গার্ল-ফ্রেন্ড বিন-এর কথা জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলঃ

“ওর সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। She is too much.”

আজকে এসেছে। এসেই বলছে তাড়াতাড়ি চলে যাবে । ওভার নাইট স্টেই করবে না। 

-আপান ওর কানে কানে বললঃ “Something wrong or what?”

ব্রীত দুদিকে মাথা নাড়ল। 

-কি ব্যাপার?

তাতেও মাথা নাড়ল।

-কিছু তো একটা সিক্রেট মনে হচ্ছে, ব্রীত...প্লিজ.! ..ড্যাডি তো এখানে নেই। ঋতুর চেকবুকে কি প্রবলেম তাই দেখছে নিজের অফিস ঘরে।

আপান ছাড়বার পাত্রী নয়। বরাবরই ছোট ছোট ভাইপো-ভাইঝিদের নিয়ে থাকত তো। তাই ওর খুব কাছের জন এই ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলো। ওরাও ওদের সুখ দুঃখের ঝাঁপি খুলত এই সবার ছোট্ট পিসির কাছে।

-আজকে ডেট আছে ।

-তাই? কার সাথে ব্রীত?

-হেসে উত্তর দিলঃ “ Its লাভলি।”

-লাভলি? কে সে? কি করে? 

-লাভলি সিং কাউর। Physical Theraphist. 

বাহ! লাভলি মানে নিশ্চয়ই ফুটফুটে একটা মেয়ে যার মাচিং শুধু আমাদের হ্যান্ডসাম ব্রীতের সঙ্গে তাই তো? আমাকে ওর ফটো দেখাও প্লিজ...বলে ওর ঝাঁকড়া কোঁকড়ানো চুলটা অগোছালো করে দিল।

-”সিওর!” বলে প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বার করে দুজনের একসাথে বেশ রোমান্টিকভাবে তোলা ছবি দেখালো।

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

৮ম পর্ব

আজ রবিবার। সকাল থেকেই মুখ ভার করে আছে আকাশ। শীতের কোনও সিন নেই। এই ঠ্যাঁটা অলস মেঘ থেকে উত্তর কেন, দক্ষিণ, পূর্ব বা পশ্চিমেরও কোন ঠান্ডা হাওয়ার সাধ্য নেই যে, মাথা গলায় এই মেক্সিকো ঘেঁষা টেক্সাসে। আপান একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। 

ঋতু আর তার ড্যাডি নিচে নেমে আসার সাথে সাথে আপান নিজেকে সামলিয়ে নিল। তারপর পিৎজা এসে যাওয়াতে অনেকটা ধাতস্থ হল... মনে হল সবাই। পিৎজার পিছন পিছন হঠাত করে ব্রীতও এসে হাজির। গল্পের জোয়ারে কিছুক্ষণ আগের গুমড়ানি্টা ভাসতে ভাসতে জানলা দিয়ে যেন আরামসে বেড়িয়ে গেল। খাবার টেবিলে ঋতু বাবার কাঁধে মাথা রেখে বললঃ “ জানো? আমি না ছোটবেলায় ড্যাডির সাথে খুব খুনশুটি করতাম। ড্যাডি কটা পিস পিৎজা খেল সব খেয়াল রাখতাম। তাই আমি আগে ভাগেই আমার ইক্যুযাল পিস সেপারেট করে রাখতাম।” বলেই খিল খিল করে হেসে উঠল। ঠিক যেন মেঘ আর রৌদ্রের খেলা দেখছে আপান। ঋতু তো বলেই চলেছেঃ “মামি রেগে যেত...বলতঃ “স্টুপিড!” আমি ড্যাডিকে ছেড়ে যেতে চাই নি...একটুও...... জিগেস করো, ব্রীতকে। কিন্তু আমি তো কিডস ছিলাম, তাই মামির সাথে যেতে হয়েছিল। আমি ওখানে ড্যাডিকে রোজ মিস করতাম। মামিকে বলতাম যে, তুমি কেন ড্যাডিকে একলা রেখে এই অ্যাঙ্কল-এর বাড়িতে আমাদের নিয়ে এসেছো? আই ডোন্ট লাইক দিস হাউস।” 

ব্রীত বলেঃ “নো। নেভার। আমি কখনও ড্যাডিকে অমনি জেলাস করি নি। ড্যাডি টট মী...হাউ টু ইনস্টল দি কার'স পার্টস, অ্যান্ড হাও টু ট্রাবলশুট(troubleshoot) দি কার'স প্রব্লেম...আমি খুউব  মিস করি ড্যাডিকে, স্টিল নাও...। আমিও ড্যাডির কাছে স্টেই করতে চেয়েছিলাম- আফটার অল আই ওয়াজ টিনেজার ড্যাটস টাইম টু। ঋতু কোর্টে বলে সে আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না, সো আই হ্যাড টু স্টেই উইথ মাম এ্যান্ড ঋতু।”

ঋতু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলঃ “নো! মামি টট মী টু সে দ্যাট-আই ডোন্ট নো হোয়াটস টু সে দ্যাট টাইম।সো ড্যাড, প্লিজ এক্সকিউজ মী।”

-ইটস ওকে ডিয়ার! হোয়াট বাই গান! বী বাই গান। কিন্তু এখন কেন মিস করছো? তোমরা তো বড় হয়ে গেছো...কারুর কথা শুনবে কেন? তোমাদের যদি ভালো লাগে ড্যাডিকে...। ইউ শ্যুড স্টেই হিয়ার। নো বডি উইল ডিস্টার্ব ইউ। দিস ইজ ইয়োরস হাউস, ইজন'ট ইট? সো... অ্যান্ড- ড্যাডি উইল অলসো বি হ্যাপি টু। ইউ হ্যাভ টু টেক কেয়ার মামি এ্যান্ড ড্যাডি টু। After all they are your respected Parents.

-হোয়াট বাউট ইউ? 

-“আই ওয়ান্ট বোথ অফ ইউ টু স্টেই হিয়ার”... আপানের কথায় ভালবাসা ঝরে পড়ল।

-আমরা তো ডর্মে থাকি...কলেজ ক্যাম্পাসের কাছেই। আমাদের ইজি হয় তাতে। এখানে কেউ বাড়ী থেকে পড়াশুনা করে না।

-কে বলেছে? আমি তো LSU -তে পড়েছি। বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতাম। আমার নেফিউ-নীস-রাও তোমাদের মতন এখানে Born and bough up...তারা তো বাড়ী থেকেই পড়াশুনা করেছে বা স্টিল তারা পড়াশুনা করছে। তাতে মেন্টাল সাটিস্ফ্যাকশন থাকে, আই বিলিভ। 

একজন এনভাইরণমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে মাস্টার্স করেছে আর দুজন মেডিক্যাল ডক্টর। সো থিঙ্ক ডীপলি, হাইলি কোয়ালিফায়েড হয়েছে তারা উইথ দেয়ার মেন্টাল পীস। 

তোমরাও বাড়ি থেকে পড়াশুনা করো। পড়াশুনার সাথে সাথে অনেক কিছু করতে পারবে দেখো।

আপান যতটা পারে ওদের সাথে বাংলায় কথা বলার চেষ্টা চালিয়ে যায়। ওরাও কিন্তু বোঝার চেষ্টা করে।

রাত বেড়ে চলেছিল... তাই, ওরা তো গুডনাইট বলে যে যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

আপান দীপুকে বেশ খুসি খুসি দেখল। এবার নীচের কাজ সেরে দুজনে ওপরে গিয়ে দুই ছেলেমেয়ের ঘরে গিয়ে ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে নিজেদের ঘরে চলে গেল।

বিছানায় শুয়ে দীপু আপানের দিকে ফিরে ওর মাথার কোঁচকানো চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললঃ “ আপান! আমাদের এই বিয়েটা আগে হলে …”

আপান ওর দিকে ফিরে বললঃ “ হয়ত অন্য কোন ইকোয়েশনে চলত আমাদের এই জীবনের অংক... সেই অংক কতটা সমাধান করতে পারতাম সেটা বলা যায় না, তাই না?”

-আমার মনে হয় সেই অংক খুব ভালভাবেই আমরা দুজনে সমাধান করতে পারতাম। যে অংকের সমাধানের চেষ্টার জন্য আমরা নিজেদের তৈ্রী রাখতাম ঠিক এমনিভাবে।

-ছেড়ে দাও ওসব কথা। এখন এই জটিল ভুল অংক-এর সমাধান কি ভাবে করা যায়, তার চিন্তা করো অথবা কোন সল্যুশনের মিডিয়া আমাদের ফলো আপ করতে হবে।

গল্প করতে করতে কখন দুজনে ঘুমিয়ে পড়েছিল, জানে না। সকালে দরজায় টোকা শুনে দুজনে হুড়মুড় করে উঠে পড়ল।

আবার একটা রবিবার চলে গেল। সোমবার ওদের চলে যেতে দেখে আপান ভাবলঃ ঋতু অনেক কিছু বলতে চায়, হাজার হোক মেয়ে তো। বাবার প্রতি একটা দুর্বলতা থাকেই মেয়েদের। ছেলেদেরও থাকে তবে প্রকাশ করে না ...কিন্তু মনে হল- ব্রীত আসাতে ওর দমটা হঠাত চুপসে গেছিল।

সোমবার ড্যাডির সাথে ব্রেকফাস্ট খাবার পর তিনজনের তিনটে গাড়ি পরপর বেড়িয়ে যেতে দেখল আপান গ্যারেজ থেকে। অনেকদূর গেল ওর দুই চোখ ওদের সাথে।

আবার দিন যায়-রাত আসে। আপান জীবনখাতায় লিখে রাখে সব গল্প হুবহু যেমনটি ঘটছে।

এদিকে পরমা কিন্তু হাল ছাড়ে নি। দীপুকে আবার একটা উকিলের চিঠি পাঠিয়েছে। দীপু যেন আরো কিছু ডলার দিয়ে পরমা আর ওর দুই ছেলেমেয়েকে সাহায্য করে। দীপু তো মেল নিয়ে গম্ভীর হয়ে ঘরে ঢুকলো...

সোফা সেট এ ধপাস করে বসেই ...আপা্নকে বললঃ “ পেয়েছেটা কী? ভাবছে উকিলের চিঠি দিলেই ও যা চাইছে দিয়ে দেব? এটা যে ফলস নোটিস, তা বেশ ভালভাবেই বোঝা যাচ্ছে। তখন ডিভোর্সের আগে আমি অত ঝামেলায় যেতে চাই নি বলে কি এখন ৫ বছর পরেও যা চাইবে তাই দিয়ে দেবো? ডিজগাস্টিঙ! ডিভোর্সের পরেও শান্তিতে থাকতে দেবে না, দেখছি। কি ভেবেছে কি? আগাও খাবো ডগাও খাবো? দেখো এবার কত ধানে কত চাল!... সুখে থাকতে ভূতে কিলোলে যা হয় আর কি!

আপান কিছু বলে নি... খালি ভাবছে পরমা কি ভাবে একটা মানুষকে হেনস্থা করতে হয়, তা বেশ ভালভাবেই রপ্ত করেছে। 

এইভাবে কাটছে আবার সময়... ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ড...

আপান মনে মনে গেয়ে ওঠে...

“আমার বেলা যে যায় সাঁঝ-বেলাতে

তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে

আমার বেলা যে যায়...”

ক্রমশ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

৭ম পর্ব

দিন যাচ্ছে, রাত আসছে। আবার দিন রাত। ব্রীত আর ঋতুকে এখন আর তাদের মা দিতে আসে না। ব্রীত ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে গেছে। এখানে ১৮ বছর বয়সেই ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে যায়। সেই ছোট বোনকে নিয়ে আসে। বাড়ীতে এসেই হৈ হট্টগোলে ভরিয়ে তোলে বাড়ী। আপান দেখে ঋতু কিন্তু আর আগের মতন সেই ছটপটে নেই। এসেই মোবিলে কি যে করে কে জানে। কিছু বলতেও পারে না আপান। আসে থাকে আবার চলে যায়...

এইরকম একদিন ফ্রাইডেতে একা এল ঋতু, নিজেই গাড়ী চালিয়ে। ... বেশ রাগ রাগ ভাব...

আপান যেমন করে তেমনি করে ঋতুকে একা দেখতে পেয়ে জিগেস করলো ব্রীত আসে নি? কেন?

-আই ডোন্ট নো। আমি ড্যাডির সাথে আরজেন্ট কথা বলতে চাই। আপান দেখে নিজের হ্যান্ড পার্সে কি যেন খুঁজছে। খুঁজে পেল বোধহয় কিছু কাগজের বান্ডিল। ইনফর্মাল খাবার টেবিলে রাখল সাজিয়ে। আপান লক্ষ্য করতে করতে দেখলঃ কিছু ডেন্টিস্ট আর অন্য ডক্টর ভিজিট এর রসিদগুলো বার করে রাখল। 

দীপু এল চান করে ফ্রেস হয়ে...

-এই যে আমার মামণি...কেমন আছিস রে? গাড়ী কেমন হয়েছে? 

-ড্যাডি! ইতশ ওকেই। প্লিজ চেক দিস... 

এত ডলারের চেক দেখে দীপুর তো মাথা গরম হয়ে গেল...বল্লঃ

-মা-এর তো কিছু দায়িত্ব আছে নাকি? আর এক মাসে এত বার কেন ডক্টর আর ডেন্টিস্ট -এর কাছে গেছিলে? সিরিয়াস কিছু হয়েছিল কি? আমাকে জানাও নি কেন? এগুলো তো দেখছি পুরানো কিছু রসিদ। আমি কোথায় পাবো এতো টাকা?

-ওর ওপর রাগ করছো কেন? ও কি জানে? তাই না ঋতু?

-ইয়েস। মাম গেভ মি সো ...আই ব্রট অল দোজ। মাম গট এ্যংগরী... 

মাম গট এ্যংগরী...ফর হোয়াট? আই ডোন্ট কেয়ায়র ইয়র মামি।

দীপু কোন কথা না বলে সোজা দোতলায় চলে গেল... 

হঠাৎ ঋতু চিৎকার করে আপানকে বলতে আরম্ভ করলঃ ইউ ডোন্ট নো--হি ইজ লাইক দ্যাট কাইন্ড অফ শর্ট টেম্পার্ড... হি হ্যাজ লট অফ মানি। 

আপান ঋতুর পিঠে হাত দিয়ে বললঃ “ছিঃ! ড্যাডির সাথে এইভাবে কথা বলতে নেই। ড্যাডির হয়ত কোন অসুবিধা আছে। কত দিতে হবে আমাকে বলো... “

-হোয়াই ইউ? হি উইল গিভ। হ্যাজ টু...

আপান টেবিল থেকে রসিদগুলো নিয়ে দেখে...ওর মা নিজেও যে ডাক্তার ভিজিটে গেছিল...সেই রসিদও ওদের রসিদের সাথে দিয়ে দিয়েছে তাই অ্যামাউন্ট-টা এত বেশি। 

মেয়ে তো কাঁদছে... আপান চেক বই এনে আম্যাউন্ট লিখে ঋতুকে দিল...

আর আপান বল্লঃ 

-ড্যাডির কাছে যাও। গিয়ে বলো... “সরি” । ড্যাডি তোমাদের খুব ভালোবাসে তাই তো তোমাদের পড়ার আর তোমাদের দুজনের সব খরচা দেয়। জানো কি সেটা? তোমাদের দুজনকে গাড়ী কিনে দিয়েছে। কত ভালবাসে তোমাদের। তাই না? ড্যাডি এত কষ্ট করে কাদের জন্য?

মেয়ে এক্কেবারে চুপ...মনে হল আফশোস করছে। আবার আপান ওকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললঃ 

-ঠিক আছে, আজ যা করেছ তার জন্য ড্যাডিকে 'সরি' বলে এসো...যাও...ড্যাডি খুব খুশি হবে।

মেয়ে তো মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে তারপর আসতে আসতে দোতলার দিকে পা বাড়াল...একটু পরে আপানও ওর পিছন পিছন উপরে উঠল---

আপান সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ভাবছেঃ “আহারে! বাচ্চা মেয়ে। মা যা শিখিয়ে দিয়েছে তাই বলেছে...কি করবে সে? এই বয়সে কি আর প্যাঁচালো বুদ্ধি আসে?

এইভাবে বাচ্চারা খারাপ দিকে চলে যায়...এখন এদের জীবনকে দেখার সময়, শেখার সময়...ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের তৈ্রী করার সময়, সবার চেয়েও বড় সবচেয়ে মূল্যবান সময়-আনন্দকে উপভোগ করার সময়... ওরা কেন এত সাফারার হচ্ছে?” 

মেয়ে বাবার ঘরে ঢুকে আসতে করে 'সরি' বলল...

দীপুর অফিস ঘরটার বসার চেয়ারের পেছনে একটা বড় কাঁচের জানলা আছে। সেটা দিয়ে পেছনের বাগান, লোহার গেট, গেটের দুপাশের চুড়ো করা স্তম্ভদুটো দেখা যায়। একটা স্তম্ভের চূড়ার মাথায় একটা রেড রবিন পাখী আনমনে বসে ছিল। সেদিকেই তাকিয়ে ছিল দীপু...

...হঠাত করে জানলা দিয়ে কিছু উত্তরে হাওয়া এসে  ঘরটাকে ঠান্ডা করে দিল। দীপু থমকালেও যেন কিছু হয় নি এমন মুখ করে হাসল। “আয়! আয়!” এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বললঃ “তুই আমার কাছে থাক ঋতু...তুই যে নিজের থেকে আজ আমার কাছে এসেছিস। আমি খুব খুশি। তোকে তো অনেক বড় হতে হবে। এই দুনিয়ার সাথে পায়ে পায়ে হাঁটতে হবে। প্রথমে ম্যানার্স শিখতে হবে, তারপর এডুকেশন...তোদের ভালো বললে আমার আর আপান-মার খুব ভাল লাগবে...”

আপান এই প্রথম দীপুর মুখে 'আপান-মা' শুনলো। ওর চোখে জল এসে গেল।

আবার পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে ফোনে পিজ্জার অর্ডার দিয়ে দিল... কাউকে নামতে না দেখে চিন্তার খনিতে নিজের মনের সাথেই একটু আলাপপর্ব সেরে নিল...এইভাবে...ধকধক করে...

“এইরকমই কিছু আমি যেন চাই, এমন কিছু যা কখনও পাইনি, অথবা না পেয়েও হয়তো হা-হুতাশ করেছি, কবে কীভাবে জানি না......”

কখনও কারুর দোষ দেখে না আপান এমনকি আগের বিয়ের সেই মানুষটা যে তাকে বিনা দোষে দোষারোপ করার পরে নিজের ভুল স্বী্কার করেছিল। তার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। তাকে আবার পেতে চেয়েছিল। কিন্তু আপান আর সেই জীবনে যেতে চায় নি। যেখানে বিশ্বাস নেই আছে শুধু প্রতারণা, আছে শুধু অন্যায় দেনা পাওনা ...সেই ভুল পথে আর পা বাড়ায় নি। বাড়ালে আবার হয়ত তারও এরকম ছেলেমেয়েরা উদ্ধত হত। ভগবান এতখানি অন্যায় তার সাথে করেন নি...মনে মনে বলেই তার গুরুর চরণে প্রণাম জানাল। 

পুরানো কথা ভাবলেই যেন সারা শরীরে একটা আগুনের হলকা লাগে, যে হলকায় ওর মন প্রাণ সব জ্বলে যায়। কত ভাবে সব ভুলে যাবে...কিন্তু মন মানে না। মাঝে মাঝে বেকায়দায় এসে আচমকা উঁকি মেরে যায়...

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

৬ষ্ঠ পর্ব

আপান আর মা মিলে দেশে যাবার সব আয়োজন শুরু করে দিল। দীপ্ত কাজ- এ বেড়িয়ে গেলেই দুজনে জলখাবার আর পূজোর কাজ সেরেই বেড়িয়ে পরে বাজার করার জন্যে। আজ এই মল তো কাল আউটলেট। ছোটজায়ের চাহিদামত কোরেল্ড (Corning ware) চৌকো প্লেট, কাপ সব কেনা হচ্ছে, জায়ের ১২ বছরের মেয়ের আবদারে এখানকার সুপার জিন্স, টপ, ম্যাচিং জুয়েলারি। দেওর-এর জন্য ব্লাড প্রেশার মাপার মেশিন, জায়ের ছেলের জন্য কফি খাবার বাহারি কাপ, জ্যাকেট, ঘষা জিন্স। মেজ দেওর-এর ছেলে মেয়ে, মেজ জা আর মেজদেওর বলে দি্যেছে ডলার পেলেই তারা খুশী হবে। তারপর আছে মাসী আর মামা শ্বশুরের দল। বিদেশে ভাল চাকরি করা দীপুর বৌ হয়েছে, তারা আবদার তো করতেই পারে। কাজেই এইরকম রোজই বেড়াতে হচ্ছে। মা যাচ্ছেন দীপ্ত-র নিউ জার্সিতে থাকা সেজমামার সাথে...দুটোর বেশী স্যুটকেস নি্তে পারবেন না। বয়স হয়েছে কাজেই হ্যান্ডব্যাগ এ খালি ওষুধ নিয়ে... মা এবার যাত্রা করলেন পৃ্থিবীর আরেক প্রান্তে।

অনেক চোখের জলের বিনিময়ে মা প্লেনের দিকে রওনা হলেন।

দুজনে নীরব দাঁড়িয়ে -প্লেন ছেড়ে দিল নিউ জার্সির দিকে। যতদূর দেখা যায় আপান তাকিয়ে রইল।এয়ারপোর্ট খালি হয়ে গেছে। একজন আমেরিকান ভদ্রমহিলা আপানের কাছে এসে পিঠে হাত দিয়ে বললেনঃ “মা চলে গেলেন বুঝি?” আপান শুধুমাত্র ঘাড় নাড়ল। দীপু আপানের কাছে এসে বললঃ “চলো এবার যাওয়া যাক...মন খারাপ লাগছে জানি। মাকে আবার গিয়ে নিয়ে  আসব, কেমন? মা আসোলে ছোট্টু কে ছেড়ে থাকতে পারেন না, ও জন্মাবার আগেই তো মা বাবাকে হারিয়েছিলেন। মা তখন ছয় মাস প্রেগন্যান্ট। কিন্তু তাও এতদিন আমার কাছে ছিলেন। অনেক বছর পরে মায়ের হাসিমুখ দেখেছি আমি, জানো?”

আপান কোন কথা না বলে চোখের জল মুছে দীপুর সাথে পা মেলাতে লাগল। দুজনেই চুপচাপ গাড়ীতে এসে বসল। গাড়ী এসে পৌঁছালো তখন সকাল দশটা। আপানের মুখে কোন কথা নেই। শুধু মাথা নীচু করে এসে বসে পড়ল ইনফর্মাল রুমে। মনে মনে ভাবলো আবার আরেকটা অধ্যায় শুরু হলঃ 

মায়ের মনে হয়ত এখন এই গানের কলিটা বাজছে...

“তোমার হল শুরু

আমার হল সারা...” 

ঠিক এইরকম সে আর আগের বিয়ের মানুষটি যখন বিয়ের ৬ মাস পর মুম্বাইতে নতুন সংসার করতে গেছিল...তার মনে যে ভয় করছিল...সেই ভয় আবার পেয়ে বসেছে। ভুল বোঝাবুঝি হলে সেটাকে ঠিক পথে নিয়ে যাবার আর কেউ রইল না। এইসব ভাবছে আর দীপু এসে বসল সোফাসেটে ওর পাশে... একেবারে গা ঘেঁষে... “জানি মন খারাপ লাগছে। বিয়ের আগে ছিলে সবার মধ্যে আবার এখানে এসেও মা কে পেয়েছিলে...কিন্তু দেখো কি করা যায়? মা তো আমার একার নয়, তাই না? মাকে জোর করে রেখে দিলে অন্যায় করা হত”...আপান কিন্তু কোন কথার উত্তর দিল না। 

এবার উঠে গিয়ে জামা কাপড় বদলে এল... কিছুই যেন ভাল লাগছে না --চারদিক কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। যদিও মা খুব ঠান্ডা প্রকৃ্তির। এই এক বছর ছিলেন তো --আশ্চর্য এক ভদ্রমহিলা। অনেক কিছু শেখার আছে মায়ের কাছ থেকে। তেমনি অসাধারণ স্মৃ্তিশক্তি-'লক্ষ্মীর পাঁচালি' লিখে দিয়ে গেছেন নিজের হাতে। সত্যি শ্রদ্ধায় মাথা আপনি নুয়ে আসে। সব কথা মনে আসছিল আপানের। মাকে হারিয়ে যেন সে নিজের মায়ের স্থানে বসিয়ে ফেলেছে দীপুর মাকে। 

দেখতে দেখতে ফোন এলো যে, মা আর সেজমামা রওনা দিয়েছেন দেশের দিকে। অনেক দিন দেশে যায় নি আপান। এইবার যাবে দীপ্তর সাথে, মা বারে বারে বলে দিয়েছেন পূজোতে যাবার জন্য। 

দুজনে ঝুলবারান্দায় বসলে মায়ের সম্বন্ধে অনেক কিছু জানলো দীপ্তর কাছ থেকে। তারপর ওরা বিছানায় গেল ...আপান ঘুমিয়ে পরলে-দীপ্ত ভাবলো “ এই সাদাসরল মেয়েটাকে কি বিয়ে করা ঠিক হয়েছে?” ও খুব ঘর সাজাতে ভালবাসে বলে মায়ের আদেশে দীপ্ত ক্যানোপি খাট কিনেছে। সেই খাটকেও কি সুন্দর ভাবে সাজিয়েছে। জানলা দিয়ে চাঁদের হাসি এসে আপানের মুখটাকে আরো মিস্টি করে দিল। “আহারে”-নিজেই বলে ফেলল...আমি কি আপানকে সুখে রাখতে পারবো? কোন কিছুই তো বলে না সে, সব কিছুই কি সুন্দর সাজিয়ে গুজিয়ে রেখেছে। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেই ফেললঃ “ইশ একে আগে পেলে ভালো হত। অবশ্য পাবেই বা কি করে? ও তো আর কলকাতার মেয়ে নয়।” কত ছেলের মাথা ঘুরিয়েছে এই অসম্ভব সরলতা ভরা মিস্টি মুখ নিয়ে...

এইসব ভাবছে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেছে আপানের। 

- কি ব্যাপার? ঘুমোও নি? ঘুম আসছে না?

-না, ঘুম আসছে না। আমি কি আর তোমার মতন সুখী নাকি- যে শুলেই ঘুমিয়ে পড়ব? 

-দেখো সুখ নিজের মনে-তুমিও সুখী মনে করে ঘুমিয়ে পড়ো। এইবার দীপ্ত আপানকে জড়িয়ে ধরলো। বলল এইভাবে এইবার ঘুমাই। তাহলে ঘুম আসবে। বাধা দিও না প্লিজ।

-হুম। মা ছিলেন...যেন ভেজা মাছ ওল্টাতেও জানে না এইরকম মুখচোখ। 

-ভেজা মাছ ওলটাতে জানি না বলেই না...... তোমাকে পেলাম। 

দীপুর চুলে নিজের আঙ্গুল দিয়ে বিলি কেটে দিতেই পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল দীপ্ত...আপান ওর দিকে তাকিয়ে ভাবলঃ “আহারে কত কষ্ট দিয়েছে এই সোজা সরল মানুষটাকে। নাঃ! এটাও সত্যি যে, মেয়েরা সাংঘাতিক হয়। হলেও বা সে নিজে একটা মেয়ে। মেয়ে বলেই সে মেয়েদের বেশী ভাল করে চিনতে পারে।”

দীপ্ত কাজে চলে গেলে যেহেতু হাতে ফুরন্ত সময়, মনের এককোণে সাত রংএ সেজে থাকে খেয়ালি ক্ষণস্থায়ী রামধনু। ইচ্ছে করে সেই মেয়েবেলা ফিরে পেতে, শিশুর মতো হঠাৎ একদিন ভোরের সেই সুন্দর রংটাকে দেখতে বড্ড ইচ্ছে হয় আজকাল। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে গেলে ভালো হতো কিন্তু তা তো হবার নয়। পুনর্জন্ম! ধ্যুস সে তো গল্পকথা। জেনেসিসও তো কেউ জানে না। তবু কেন জানি অজানিত সেই ধূ ধূ করা ময়দানে মনটা আপনখেয়ালে ডানা মেলে।

তাই, সে এখানকার পাখিদের জন্য খাবার আর দোলনা কিনে এনেছে। তাদের ছুটোছুটি দেখতে বড় ভালবাসে আপান। ওর স্কুল কলেজ লাইফে বাড়ীতে টিয়াপখি পুষেছিল সে। কাঁচের ঘর থেকে দেখে তাদের আর ভাবে? পাখিরাও বোধহ্য় এইরকম একজনের ঘর করতে পারে না, ওদের তো সবসময় কেমন যেন হুইমসিক্যাল(Whimsical) লাগে ওর। হঠাত শোনেঃ একটা পাখি ওর বারান্দার রেলিং এ বসে ডাকছে... পাশে বসা অন্যপাখিটাকে বোধহয়ঃ “ কিটিকু  কিটিকু” করে আবার কিছু বলছেও। ও পড়েছিল সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী এই ডাকে নিজেদের সঙ্গী বা সাথী খোঁজে। এই খোঁজাটা বিশেষভাবে করে ওরা এই মার্চ -এপ্রিল এই মাসদুটোতে। তারমানে বসন্ত ওদের মনেও নাড়া দেয়। নিজেই ফিক করে হেসে ফেলল, এই কথাটা ভেবে। 

কারণ, এখুনি দেখল পাখিটা বাড়ীর ফো্টোনিয়া গাছের ডালে বসে কিছুক্ষণ আপন সুর করে ডেকে গেল, অন্য ফিয়ান্সে পাখির কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে হুশ করে আবার উড়ে গেল। ও পাখিটাকে লক্ষ্য করতে লাগলঃ “ ও মাঃ! দেখে পেছনের পিয়ার্স গাছে বসবার আগে রাগে বাঁই বাঁই করে ঘুরপাক খাচ্ছে । না বসল না তো...বসলে বেশ দেখা যেত...আবার উড়ে গেল চোখের আড়ালে...

কিছু কিছু পাখি আবার জমিয়ে সংসার করছে দেখছে কারণ, খাবার দিলে ওদেরই দেখে, মাঝে মাঝে বাচ্চাকে নিয়ে কি সুন্দর ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে খাবার খাওয়ায়। 

হঠাৎ মনে হল নিজে হল কোকিলের জাত। কোকিল হল শিল্পী--চিরকাল ঘরছাড়া...এমাঃ, এসব কি ভাবছে আবোলতাবোল। নাঃ এবার রান্নাটা সেরে ফেলি। নিজের মনেই বলছে, “কি করে একা একা কাটাবে সারাদিন... দীপু তো আসবে সেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হবার মুখে। অবশ্য তার জন্য দীপু রেগুলার ৮ ঘন্টার যায়গায় ৯ ঘন্টা কাজ করছে। সত্যি মানুষটা মানসিকভাবে একটু বেশী ভালর দিকে।

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

৫ম পর্ব

আমাদের এ কাহিনী সূর্যের কাহিনী। কিন্তু নয় সাধারণ কথা তবু, সাধারণ মানুষের কথা নয় কোন মতে।

আমরা ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখি। ঘুম ভাঙলে স্বপ্ন রেখে দি বিছানায়। পিছনে রেখে আসি অতীত হওয়া ঘুমের স্বপ্ন। যেমন দিনের পর দিন রেখে আসি, ঠিক তেমনি রাত্রি বেলা ঘুমকেও রাখতে হয়। তার মধ্যে বয়ে চলে কাহিনী অস্ফুট। দোমড়ানো কাগজে পুরানো কোন স্কেচের মতন হাতের পাতার যত্ন দিয়ে বারবার সমান করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া ছাড়া এ কাহিনী আর কিছুই নয়।

আপান এখনও কোন চাকরীতে এ্যপ্লাই করে নি। আবভাবে বুঝে গিয়েছিল দীপ্ত বা তার মা-এর একদম ই ইচ্ছে নয় যে আপান বাইরে কাজ করুক। এদেশে এসে সে পড়াশুনা চালিয়ে গেছে --তার জন্য তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। এত ঝড় ঝাপ্টা সামলে একটা সাধারণ মেয়ে আবার সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে গেলে যে মানসিক শক্তির দরকার হয়-তা বোঝে শুধু আঘাত খাওয়া মেয়েরাই। 

এদিকে মা আর দীপ্ত একদিন খোশমেজাজে আলাপ করছিলেন দুজনে। ভাসা ভাসা কিছু কথা কানে এসেছিল আপানের যে, শাশুড়িমা বলছিলেন- “আপান তো পরমার চেয়ে ঢের গুণে সুন্দরী --আবার যদি...না! না দীপ্ত আর না... “ন্যাড়া একবার ই বেলতলায় যায়।” তবে আপান অনেক শিক্ষিতা-সেটাও একবার ভেবে দেখ। ও নিজে থেকে কিছু না বললে তোকে আগ বাড়িয়ে কিছু না বলাই ভাল। আর যদি নেহাত ই চাকরী করতে চায়-তবে তোর কম্পানীতে চেষ্টা করে ঢুকিয়ে দিস। আমি চলে গেলে কি বা করবে সারাদিন? ছেলেমেয়ে দুটো এখানে থাকলে অনেক কিছু শিখতে পারত আপানের কাছে।

-মা! পরমা কাজ করত ওয়্যারহাউসে যেখানে এডুকেটেড লোকেরা কেনবার জন্য যায় কাজ করার জন্য না। আমি একটুও চাইতাম না যে, সে সেখানে কাজ করুক। পড়াশুনা করতে বলেছিলাম তাকে । আর আমার অপছন্দটাকে সে মাটিতে পাপোষ করে রেখেছিল সেটা তো আমি বুঝতে পারি নি মা। পাসের বাড়ির মাইক কে বলে সে কাজে ঢুকল। কিছু বললেই বলতঃ যে “ I am not your maid-servent”। আর নয় অহেতুক চিৎকার করত—সেটা তো তুমি দেখেই গেছো। 

ওকে বারণ করাতে বলেছিলঃ “ আমি এখন দুই সন্তানের মা-আমি সব সময় তোমার কথায় উঠব আর বসব তা তুমি ভাবলে কি ভাবে? সারা জীবন মেড সার্ভেন্ট করে রেখে দিতে অভ্যস্ত তোমরা পুরুষেরা …তা তোমরা পৃ্থিবীর যতই স্বপ্নের দেশে থাকো না কেন! তবে আমি সে মেয়ে নই। তোমার হাতের পুতুল হয়ে থাকবো? সে ভয় কেটে গেছে এখন আমার। 

তোমাকে যা দিয়েছি আর তার বদলে তুমি আমাকে যা দিয়েছ তাই-ই নিয়ে গিয়ে অন্যকে দিতে পারি আমি ! যা দিয়েছ, যা শিখিয়েছ, উজাড় করে দিতে বা গ্রহণ করতে শিখিয়েছ। শরীর শিখিয়েছ আর, আমি জানি, যে কোনও পুরুষকেই আমি সুখে রাখতে পারব। যে কেউ-ই যখন সঙ্গী হবে আমার ---তৃপ্ত থাকবে, আজীবন আমার দিকে মুখ করে থাকবে – যদি না...!

“যদি না...!” প্রশ্ন করেছিলাম আমি।

-যদি না কালকের পর থেকে আর কখনও চিনতে পার তুমি আমাকে!

আমি মুখ ঢেকেছিলাম হাতের পাতায় ঘৃণায় আর অপমানে। ও বলেছিল, “ শোনো হঠাৎ দেখা হয়ে যায় যদি আমাদের , চোখেও যেন পরিচয় ঝলসে না ওঠে। মনের যে অংশে তোমার আমি আছি আজ, এই মুহূর্তে মৃত্যু হোক সেটুকুর। আমরা এই বন্ধন থেকে মুক্তি দিয়ে যাই নিজেদের সাধ্যমত।'

-এত কথা বলত কিভাবে সে? বাবা নেই বলেই মা-এর তীব্র চেষ্টায় তার বিয়েতে রাজী হয়েছিলাম আমরা। 

-যাই বল দীপু! তোর আস্কারাতেই কিন্তু ও এরকম হয়ে গিয়েছিল-সেটা তোকে মানতেই হবে। এখানে তো তোর মামীরা সবাই য়াছে কিন্তু নিজেদের বদলায় নি, আর বদলায় নি তোর মামাদের জন্য। মামারা ঘুড়ির সূতো একেবারে ছেড়ে দেয় নি। ছেড়ে দিলে তাদেরও তোর মত অবস্থা হত-অবশ্য প্রত্যেক মেয়েই নিজের মত করে গড়ে নিজেকে। ছেড়ে দে । পুরানো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। যা গেছে--এখন আর চিন্তা না করে নূতন করে সংসার শুরু কর। ছেলেমেয়েগুলো যাতে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে সেদিকে নজর রাখতে হবে।

আপান এসব শুনে আবার ফিরে গেল রান্নাঘরে-বানাল ভেজিটেবল প্যাটিস সবার জন্য। শাশুড়িমা দেশে ফিরে যাবেন শোনা অবধি... মনের ভেতর একটা মন খারাপের গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে। এইরকম একাই তো ওরা প্রথম মুম্বাইতে গেছিল বিয়ের পরে। তখন তো সে একেবারে ১৯ বছরের একটা মেয়ে। কত কেঁদেছিল যাতে সাথে করে সেই স্বামীর মা -বাবা যান। কিন্তু নাঃ ওনারা বলেছিলেন...প্রথম সংসার করতে যাচ্ছো-সেখানে তৃ্তীয় জনের থাকা ঠিক নয়। কিছুই বোঝে না মানে মানুষের চরিত্রের সাথে ওয়াকিবহাল ছিল না সে কোনদিন। আর তার জন্য দায়ী ছিল তার বাড়ির দাদা-দিদিরা। সবার  ছোট বলে সবাই শাসন বা অত্যধিক কড়া শাসনে রাখত। তাদের বক্তব্য ছিল-মা বাবা হারা বোনকে যেন কেউ ঘুণাক্ষরেও খারাপ না বলতে পারে। বর্তমান যুগের সাথে তাঁরা পরিচিত ছিলেন না, না হতে চাইতেন না?

মেয়েদের স্কুল... তারপর, মেয়েদের কলেজ। -স্কুলবাস বা কলেজ যাওয়া-আসা বাসে সে যাতায়াত করত। কিছু ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল -তারাও তো তারই মতন মানুষ হয়েছে। 

নাঃ থাক...আর পুরোনো কথা মনে না রাখাই ভাল। পুরানো কথায় শুধু মনটা ভারী হয়-কাজের কাজ কিছুই হয় না। সে তাড়াতাড়ি কফি আর প্যাটিস নিয়ে হাজির হল ব্যালকনিতে যেখানে শাশুড়িমা আর দীপু বসে গল্প করছিল...

-মা , তোমার না গেলেই নয় দেশে? আমাদের সাথেই না হয় যেও। আমার একলা সংসারে বড় ভয় মা-আস্তে আস্তে বল্ল আপান। 

মা বল্লেনঃ “ ভয় কিসের? তুমি অনেক সাহসী মেয়ে নাহলে এই দূরদেশে কি করে পড়াশুনা চালিয়ে চাকরি বাকরি করতে আপান? মনে রেখো জীবনটা একটা কর্মক্ষেত্র-আমাদের কাজের তালিকা করাই আছে। আমরা শুধু সেই তালিকা অনু্যায়ী কাজ করে যাই”। 

আমি তো আবার আসব, মা আপান। -তবে সেখানটাও তো একবার দেখতে হবে, তাই না? আমি তো আর তিন টুকরো হতে পারি না? বলেই হেসে উঠলেন। 

আপান ভাবলঃ সত্যি কত কিছু শেখার আছে, এই বালবিধবা মা-এর কাছে। জীবনে-শেখার কি কোন শেষ আছে?

দীপ্ত প্যাটিস খেতে খেতে আপানকে বলল, “ এক্কেবারে দোকানের কেনা তো! তুমি কি রান্না শিখেছিলে আপান? যাই রান্না করছো-তাই যেন অসাধারণ হচ্ছে।” দীপ্তর মুখে সুখ্যাতি শুনে আপানে্র গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। মা আপানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন- “ অরির সব কথাই কেমন মিলে গেছে দেখছিস? আমার অপুমা -কে দেখাতেই হবে দেশের সবাইকে। আমি আজ সত্যি বড্ড অহংকারি হয়ে উঠেছি রে দীপু বলেই আপানকে বললেন- “ যাও মা, সন্ধ্যেটা দেখিয়ে এসো-কি তাড়াতাড়ি অন্ধকার হয়ে এলো-ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামবে মনে হয়।”

অপু খাবার প্লেট আর কাপ নিয়ে চলে গেলে- মা আবার শুরু করলেনঃ “কি করে এই মেয়েকে ওর আগের শ্বশুরবাড়ি ভুল বুঝেছিল রে-সেটা আমার মাথায় কিছুতেই আসছে না। ওকে কোনদিন কষ্ট দিস না দীপু। বড্ড মায়া মাখানো মুখখানা আমার অপু-মার। আহা! ছোট্টবেলায় মা-বাবা হারা মেয়ে। দাদা-দিদিদের কাছে মানুষ হলেও-কোথাও যেন ওর মনে একটা দুঃখ আছে, প্রকাশ করে না। আমি মা তো!-বুঝতে পারি, এ মেয়ে কখনই খারাপ হতে পারে না বা খারাপ কাজ করতে পারে না।

দিন এইভাবে কেটে যাচ্ছে...বসন্ত, বর্ষা, শীত... আবার এই ভাবে ...সেই ভাবে..। 

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

৪র্থ পর্ব

দীপ্ত-র সংসারে সূর্যাস্ত আজ বহুদিন অতীত হয়েছে। এই সব কিছুই হচ্ছে ভাঙা ভাঙা গল্প হয়ে। যেমন চিন্তার কোনও স্পষ্ট গল্প নেই। ভাঙা ভাঙা-ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েকটা চিন্তার মধ্যে বড় বড় খাদ ব্যবধান।

তাও মানুষ সচেতন। এই সচেতন চেষ্টা শুধু কাঠের মজবুত বা পলকা পাটাতন ফেলে তার মধ্যে যোগাযোগ রাখা। এই পাটাতন যদি না থাকত, তাহলে প্রতিটি চিন্তাই হত সঙ্গীহীন, বন্ধু ছেড়ে যাওয়া, ভাঙা চোরা। 

এ গল্প অনেকটা ভোরে দেখা স্বপ্নের মত। খানিকটা স্পষ্ট আবার খানিকটা ভাসা সবুজ শেওলার মত। এই সবুজ শেওলার নীচে দেখা যায় আবছা জলজ উদ্ভিদ । আর সেই উদ্ভিদ-রাই হচ্ছে স্বপ্নের রসি...

এইবার মা মানসী দেবী আপানকে বললেন, “এবার তোমার কাছে সব দায়িত্ব দিয়ে আমি নিশ্চিন্তিভাবে দেশে যাই। জানি না ওখানকার আবার কি ব্যাপার -স্যাপার। মা তো! সবদিকই সামলাতে হয় মা-কে। আবার এদিকে তুমি নতুন-সেও আরেক চিন্তা। যদিও ভুল বোঝাবুঝির মেয়ে তুমি নও। তাও একবার সাবধান করে দি মা তোমাকে, “ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়, তাই বলে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যেতে নেই। আমরা যতই আধুনিক হই না কেন- আমাদের রক্তে আছে পূর্ব-পুরুষদের রক্ত-যে রক্তে আমাদের মা, মাসী, পিসী, ঠাকুমা, দিদিমারা মানুষ হয়েছেন। অরির মুখে শুনেছিলাম, তু্মি নাকি অনেক ঠাকুরের বই পড়েছিলে। কাজেই তোমাকে কিছু শিক্ষা দেওয়া মানে নিজেকে নিজের কাছে নীচু করা। তাও জীবনে যখন কেউ কোন দায়িত্বপূর্ণ কাজ দেয়-সেটাকে হাজার ঝড়ঝাপ্টার মধ্যে যারা টেনে নিয়ে যেতে পারে জীবনের শেষ দিন অবধি। তারাই আদর্শ নারী। বিয়ে করে আর সন্তানের জন্ম দিলেই তাকে 'আদর্শ নারী' বা 'মা' বলতে আমি রাজি নই। 

-আরো একটা অনুরোধ, ব্রীত আর ঋতুকে নিজের সন্তানের মত দেখো-। ওরা যেন জানতে বা বুঝতে না ভুল করে যে, মা -এর ভালবাসা নারী মাত্রেই জন্মগত, যেটার উদাহরণ দেখাবার জন্য তুমি থাকবে। 

-মা! আমার মা নেই , মা কে হারিয়েছিলাম সেই ছোট্ট বেলায়। মা-এর কথা আমার মনে নেই। আবছা ভাবে মা আমার সামনে আসে। কিন্তু তোমাকে যখন মা বলে একবার ডেকেছি। তখন জেনো এই মেয়ে তোমার আদর্শ-কে অসম্মান করবে না। আমার সন্তানরা হবে ব্রীত আর ঋতু-যতই ওদের মা ওদের কুশিক্ষা দিক...আমি পড়েছিলাম মনে আছে এইটুকুঃ

“ কুপুত্র যদি বা হয়-

কুমাতা কদাপি নয়...” আমি হয়ত সুমাতা হতে পারব না...তবে খারাপ শিক্ষা দেওয়ার পক্ষপাতিত্ব আমি নই। আজ যদি ওদের মা বিবাহিতা না হত, আমি বোঝাবার চেষ্টা করতাম আর ভাবতাম জীবনে হয়ত ভুলেও একটা ভাল কাজ করলাম। কিন্তু সে আশাও আজ আমার কাছে ব্যর্থ। 

আমি চেষ্টা করব আপ্রাণ যাতে ওরা নিজের পায়ের খুঁটি শক্ত করতে পারে আর জীবনে ভুল পথে না যায়।

যদিও আমার এই চেষ্টা বাতুলতা হবে হয়ত কারণ, ওরা এখনকার যুগের খেয়ালে যথেষ্ট পরিণত বয়সের হয়ে গেছে । এখনকার যুগে এই বয়সের ছেলেমেয়েরা নিজেরা নিজেদের সংসার করে ফেলে।

এইবার মা মানসী দেবী অশ্রুভরা চোখে জড়িয়ে ধরলেন আপানকে। বললেন, আমার খুব মেয়ের সখ ছিল, জানিস। ঠাকুর আজ তোকে পাঠিয়ে আমার সেই সখও পূরণ করে দিলেন। আমি সত্যি খুব কৃতজ্ঞ ঠাকুরের কাছে। দেশে গিয়ে সবাইকে বলব যে, রেখে এলাম এক শিক্ষিতা, সরল-সহজ মেয়েকে আমার ছেলের কাছে। আমি যেখানে ঠাকুর পূজো করতাম লুকিয়ে, সেখানে আজ কি সুন্দর ঠাকুর ঘরে বসে আমি পুজো করেছি বিদেশের মাটিতে বসে। আমি সত্যি ভাবতে পারছি না...যে। অরির সব কথাগুলো এইভাবে সত্যি হবে।

আপান শাশুরিমা-এর কাঁধে মাথা রেখে জলভরা চোখে শুধু গুনগুন করে উঠল...

“আর আমি যে, কিছু চাহি নে

জননী বলে-শুধু ডাকিব...

তুমি না রাখিলে স্নেহ আজ 

পাইব কোথায়? 

খুঁজে খুঁজে কোথা বেড়াব...”

ভাগ্যিস দীপু তখন অফিসে ছিল। নয়ত মা আর আপানের এই কান্না হাসির সিনেমা দেখে কি যে করত কে জানে। হয়ত বলত- “মাগো এখন বর্ষাকাল নয় আর এই বিদেশে বর্ষাকাল হয় না। এখন বসন্তকাল যেটা নাকি অনন্ত।”

মা বললেনঃ “জানিস আপান! ছেলেটা আমার ছোটবেলা থেকেই বড্ড অভিমানী, কাউকে জ্ঞ্যানতঃ কখনও কষ্ট দেয় নি। আমি না আসলে হয়ত ওর চোখ দুটোই একেবারে খারাপ হয়ে যেত কেঁদে কেঁদে। আমি আসার পর ও রোজ কাঁদত কোন কথা বলতে গিয়ে। আর কাঁদত কাদের জন্য জানিস? কেঁদেছিল শুধু ব্রীত আর ঋতুর জন্য। আমাকে বলতঃ “মা, আমি হয়ত ওদের খুব ভালবাসা দিতে পারি নি...ওদের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিই নি বলে আমাকে হয়ত ওরা পরে ঘৃ্ণা করবে”...মায়ের চোখে আবার জল। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছিল তো...তাই তার ছেলেরাও বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হবে --সেটা ও ভাবতে পারছিল না রে আপান।

আপান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মা-এর চোখের জল মুছিয়ে দিল। বল্লঃ “ব্যাস আর না। অনেক কান্নাকাটি হয়েছে এবার শুধু হাসির পালা। কি বলো মা!”

মা হেসে ফেল্লেন। তাই যেন হয় আপান। আর দুঃখ সহ্য করতে পারছি না রে। অরি তোর কথা বলে যাওয়ার পর কিছুতেই ছেলে রাজি হয় না...অনেক বুঝিয়েছিলাম যে, পৃ্থিবীটা আলো আর কালো দিয়ে গড়া। 

ও কি বলেছিল জানিসঃ বলেছিলঃ “মা ! অমর্ত্য সেন এর দুটো বিয়ে । আমা্রও তাহলে দুটো বিয়ে করতে হবে নাকি নবেল পাবার জন্য---সেইদিন ওকে খুব হাসতে দেখেছিলাম রে। বেশ কিছু প্রাইজ পেয়েছে আমার দীপু। ছোট বেলায় ওকে সবাই বলত যে, “দেখিস তুই নবেল পাবি।” পেতেও পারে তাই বল, আপান! হয়ত অরির মুখে সব কথা শুনে তোকে মনে মনে ভালবেসে ফেলেছিল...বলে মা আপানকে কাছে টেনে নিলেন। আমার দীপুর কাছে জেনে নিস তো আবছা কথাবার্তায় বলে মা মুখ টিপে হেসে ফেললেন... 

-মা তুমি সত্যি আদর্শ মা...বলেই মা কে প্রণামটা সেরে ফেল্ল আপান। দীপ্ত অফিস চলে যাবার সাথে সাথেই দুজনের সুখ দুঃখের ঝাঁপি খুলে যায়।

-এবার তোরা দুটিতে সুখে সংসার কর...আর আমি দেশ থেকে ঘুরে আসি। তোরা পূজোয় আয়। দীপু অনেকদিন দেশে যায় নি। প্রায় ধর ২০ বছর। এবার তুই সাথে করে নিয়ে আয়...। আমি গর্ব করে সবাইকে দেখাই... আর বলিঃ কে বল্ল যে, আমেরিকায় মানুষ হওয়া মেয়েরা ভাল হয় না? আমি দেখাতে চাই রে আপান... বলে আপানের থুঁতনি-তে হাত দিয়ে আদর করলেন। দুজনে চা খেতে খেতে টুকটাক গল্পগাছা সেরে ফেললেন।

What should life be if we had no continue to attemp anything? 

ক্রমশ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায় - শেষ পর্ব

সপ্তাহের চারটে দিন কাটার পরেই ব্রীত ও ঋতু আসে এখন বাবার কাছে প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যেবেলা। থেকে যায় কিছুদিন। যদিও মা তাদের বলেছিল যে, কোন খাবার যেন তারা না খায় অপুর দেওয়া। হায় রে! বিধি! সব শুনে-ও সব জেনেও তারা খুব খুশী তাদের অপুমা-কে পেয়ে। তাদের সুখ দুঃখের কথা ভাগাভাগি করে তাদের অপু-মার সাথে। অপুর ইচ্ছেপাখিটা ভাবে ওরা তো ডর্মে না থেকে এই বাড়িতে থাকতে পারে? 

বলেও ফেলল একদিনঃ তোমরা তো এই বাড়িতে থাকতে পারো। তোমাদের ঘর আমি কি সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছি।।

ওরা একটু চিন্তা করে বললঃ “নো অপু-মাম! উই কান্ট, বিকজ উই লেফট মামা'স হাউস টু স্টেই ইন্ডেপেন্ডেন্টলি-আদার ওয়াইজ......” বলে কেমন যেন চুপ করে গেল। তখন আকাশে অনেক মেঘ জমে থম মেরে আছে--বৃষ্টি কিন্তু হচ্ছে না। তখন একমাত্র মেঘ ফাটিয়ে বৃষ্টি নামাতে পারে কিছু- কিছু বিজ্ঞানী আবার বৃষ্টি থামাতেও পারে।।”

ব্রীত আজ ২২ বছরের টাটকা যুবক-আজও ওরা বাইরে খেতে যাবে। খেতে গিয়ে আপান ওদের সাথে ইয়ার্কি শুরু করল। 

-ব্রীত তোমার কি গার্ল ফ্রেন্ড হয়েছে নাকি? তোমাকে বেশ ম্যাচিউরড লাগে আজকাল...

-হোয়াই দিস কোয়েশ্চেন?

-নো , জাস্ট আস্কড ইউ, ডোন্ট মাইন্ড।

ব্রীত কিছু না বলে আপানকে ওর ভিয়েতনামীজ গার্ল ফ্রেন্ডের ছবি দেখালো। 

-দিস ইজ... বিন গুয়েন। 

আপান কিছু বলল না। দীপু আগ বাড়িয়ে ছেলেকে বললঃ “তোমার মা কিছু বলে নি? তোমার গার্লফ্রেন্ড হয়েছে ?”

ছেলের জবাবঃ “মাআম? হোয়াটস মাম সেইড?” -বলে একটা চোখ মেরে দিল আপানকে। চোখ কুঁচকে টিপ ধরে তিরটা ছুঁড়ল ঋতু “মাম, কান্ট সে এনিথিং...হোয়াট সি হ্যাড ডান?” 

একটা নিঃস্তব্ধতা গ্রাস করল পরিবেশকে। মনে হল আকাশ ভর্তি কাক-এ ছেয়ে গেল-তাদের স

আপান বুঝে গেল ওরা ওদের মায়ের কাছে থাকলেও ... মা তার নিজের রেস্পেক্ট হারিয়ে ফেলেছে ছেলেমেয়ের কাছে। মা ওদের থেকে অনেক দূরে এখন ...রেস্পেক্ট ছাড়া বাস করে।

আবার পরিবেশকে আয়ত্ত্বে এনে ফেলল নিমেষে আপান। 

বলল- “ব্রীত! গার্লফ্রেন্ড ভাল তবে, নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে এসব করা ঠিক না। আই ওয়ান্ট ইওর গুড। দ্যাটস হোয়াই আই এ্যাম টেলিং ইউ এবাউট দিস। প্লিজ ডোন্ট টেক ইট আদার সেন্স।”

-নো, ইটস ওকে ! আই ওয়াজ সো ডিপ্রেসড -অল দ্য টাইম। থিঙ্কিং এ্যবাউট মাম এ্যন্ড ড্যাড হোয়েন আই সি মাই ফ্রেন্ড'স হ্যাপি প্যারেন্টস। বিন'স প্যারেন্টস লাভ মি। আই লাভ দেম টু।

-ওর উত্তর শুনে আপানের দুই চোখ জলে ভরে গেল। কিছু কি করার আছে তার?

সব কথা বলে অপুকে তারা। সরলতায় ভরা অপু যে সবাইকে আপন করার এক ফাঁদ পাততে জানে। তাই তো সে শ্বশুরবাড়ির সবার প্রিয়, সবার আদরের।

দীপ্ত আজ এত দূর নৌকা বেয়ে ক্লান্ত-তার জীবনে আচমকা যে অন্ধকার নেমে এসেছিল, আজ এতদিন পরে আবা্র যেন তার হৃদয়ের উঠোন আলোকিত হয়ে উঠেছে। প্রিয় ঝুল বারন্দায় উঠে দীপ্ত লম্বা শ্বাসে বুক ভরে বাতাস টেনে নিল-পাশের দোলনায় মা আর আপানের আলাপপর্ব দেখতে দেখতে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে দীপ্ত। বিমুগ্ধ নয়নযুগলের সামনে সদ্যসমাপ্ত দৃশ্যাবলি ভাসছে। হেমন্তের হিমেল বাতাস হৃদয়ের অন্তঃস্থল স্পর্শ করল। আনন্দের রেণুগুলো যেন শিউলির সুবাসের মতো চারপাশ ছেয়ে ফেলছে ক্রমশ...

এন আর আই পরমা দূর থেকে দেখে অপুর সাজানো বাড়ি আর শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে! তার খুশি আজ এখন অনেক স্তিমিত। তার 'সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেম' এখন কোন দিকে...... কেউ জানে না। যতটা পারে নিজেকে সুখী দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টায় সে তার তরীর খেয়া বেয়েই চলেছে এ কূল থেকে ও কূল। মাঝ দরিয়ায় শুধু বিদগ্ধ দুই সন্তান। প্রথম জীবনের প্রথম স্বামী, প্রথম বাসর বড্ড টানে আজকাল পরমাকে। লোকের সাথে ঠিকই সে মিশছে কিন্তু আড়ালে কোন মানুষই তাকে ক্ষমা করে নি, করতে পারে না--তাকে আড়ালে সবাই অবজ্ঞার চোখে দেখে। তার নামে বলে আপানের কাছে যে, “ কি সেন্সে পরমা এত সাজগোজ করে? ...”

পরমার হেলা ফেলা অগোছালো বাড়ি আজ কত সুন্দর সাজে সেজেছে। যেন শিল্পীর হাতে নির্মিত ছোট্ট একটা প্রাসাদ। প্রাসাদের বাইরে এতো সুন্দর হলে ভেতরটা না জানি কত সুন্দর! 

তাহলে কি এটাই সত্যিকারের প্রেম! যে প্রেম মানুষকে অমর করে, দীপ্ত কি সেই প্রেমের সন্ধান পেয়েছে? যখন পরমার মনে এসব চিন্তা খেলে যায়, তখন অতীতের কথা মনে পড়ে। তাকেও তো কোন অসুবিধায় রাখে নি দীপ্ত। তবে......সে কিসের নেশায় তার সাজানো সংসার ভেঙ্গে তছনছ করে দিল।

‘উনিশ’ বছরের ভালো-মন্দের হিসাব চোখের সামনে ভেসে উঠে। পরমার কাছে কেন যেন মনে হচ্ছে, সে হেরে গেছে দীপ্ত-র কাছে। সেদিন দীপ্ত তাকে বিদায় দেয়নি... তাকে করুণা করেছিল। এরপরও সে বুঝতে পারেনি-সত্যিকারের ভালোবাসা কি! 

মাঝে মাঝে একা এসে দূরে গাড়ি দাঁড় করিয়ে জানলার কাঁচ নামিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে ...আর বিড় বিড় করে বলে, “ স্বপ্নের পুরুষ স্বপ্নেই থেকে যাওয়াটা বোধহয় ভাল ছিল। নিত্যদিনের সংসার যাপনে স্বপ্নকে এনে ধুলো না লাগালেই ভাল হত। ভেবেছিলাম জীবনভোর স্বপ্নের ঘুড়ি ওড়াবো আকাশে, কোনওদিন সেই ঘুড়ি ভোঁ কাট্টা হবে না। এ আমি কী করলাম হঠাত করে... নিজেকে ধূলো কাদায় মাখিয়েছি। ছেলে মেয়ে বড় হলে তাদের প্রশ্নের উত্তর কি দেবো? নিজের বিবেকের কাছে কি জবাবডিহি করব জীবনের শেষদরিয়ায় গিয়ে। 

“এক যুগ আতে হ্যায় ...এক যুগ যায়ে...এ। ছোটি ছোটি বাতোকো ভুল নেহি পায়ে...” গানটা কত সত্যি।

ছেলেমেয়েগুলোর কথা কেন একবারও ভাবলাম না? আজ কেন দীপ্ত বারে বারে এসে মনকে নাড়া দিচ্ছে। তাহলে কি আমি দীপ্ত-কে খুউউব ভালবাসতাম? 

আর তুষার? মনে মনে Italian ProverTa বলে উঠলঃ

“Love rules without rules . (Amore regge senza legge)”

এইভাবেই ভাঙ্গা -গড়ার মধ্যে দিয়ে আমাদের জীবন-নদী বয়ে চলে। এইরকম পর্বের পর পর্ব থেকে যায় আমাদের নৌকায়। সবাই বলবেঃ এ আর কি-দুজনেই তো দুজনকে পেয়ে নতুন সংসার শুরু করলো......

তাই কি? নাঃ তা মোটেই নয় – এ তো শুধু জীবনকে টেনে নিয়ে যাওয়া...নৌকার হাল বওয়ার জিম্মেদারী যে সন্তানরা তারা ভেসে যায়...শুধু ভেসে যায়......

'পরকীয়া' শুধু মা বা বাবার স্বার্থের ব্যাপার নয়-সন্তানদের মনের দ্বন্দ্ব-সেটা কতজন বোঝে? সমাজের চোখে তারা হয় উপেক্ষিত, বঞ্চিত, ধরতে পারে না তারা কোন কূল-জন্মদাত্রী মায়ের না জন্মদাতা বাবার? আর মা বা বাবা যদি পরস্পরের প্রতি বিরূপতার শিক্ষা দেয়-তাহলে? সেইক্ষেত্রে সন্তানরা ভালবাসাতে-ও পরস্পরের কাছ থেকে বঞ্চিত হয়।

অনেক মা বাবা নিজেদের স্বার্থের দোষত্রুটি ঢাকবার জন্য সন্তানদের কুশিক্ষা দেয় একে অন্যের প্রতি। বঞ্চিত করে অপত্য স্নেহ- ভালবাসা থেকে অহেতুক। বাবা কি শুধুই সন্তান পালনের জন্য পয়সার জিম্মেদারী আর কিছু না? না-মা শুধুই জন্মদাত্রী... অনেক অনেক প্রশ্ন –যার শেষ থেকে শুরু নেই...

মানুষ যখন জীবনতরী আর বাইতে পারে না, তখন হিসেব-নিকেশ করতে বসে বুঝতে পারে তার ভুলটা...তখন অজান্তিকে বলে দেয় তাদেরঃ

“ আজ কেন হাহাকার করো

মিছে কেন অনুতাপে মরো...

কি সুখ জলাঞ্জলি দিয়েছো

যে তু...মি......”

সত্যি......একদম সত্যি।

“Life, we learn too late, is in the living, in the tissue of every day and hour.”

সমাপ্ত

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

চতুর্থ অধ্যায় - অপরাজিতা (৩য় পর্ব)

মা বাড়ি এসে যেন নতুন উদ্দমে বাড়িকে সাজাতে আরম্ভ করলেন। অফিস থেকে দীপু আসলেই মা আজ এটা বানাচ্ছেন তো কাল ওটা বানাচ্ছেন। শুক্রবার সন্ধ্যাবেলা দুই নাতিনাতনিকে নামিয়ে দিয়ে গেল তাদের মা। তারা ভেতরে এসেই আবার চিৎকার- এ বাড়ি মাথায় করে দিল...

ওরা আসলে ঠাকুমা শিখিয়ে দিলেন ওদের বলতে যে, “ড্যাডি কে বলো-আজ আমরা বাইরে খাবো।” ওরা তো তাই চায়। বাঙ্গালী রান্না তো মা খেতে শেখায়নি কোনদিন। তাই ঠাকুমার হঠাত এই শেখানোতে তারা ড্যাডি নীচে নামলে আবদার জানালো। ড্যাডি তো হুম বলে চুপ করে গেল। যাই হোক, গাড়ী এসে থামলো বাচ্ছাদের পছন্দ মত দোকান “আপেল বী”-তে। ওদের মা তো ওদের বীফ খাওয়ার অভ্যাস করিয়েছে কাজেই ওরা ওদের পছন্দমত সব খাবার নিল। নানা রকম গল্প হচ্ছিল। 

হঠাত ঠাকুমা বললেন- “ আমি না থাকলে ড্যাডিকে কে দেখবে?” দুজনেই চুপচাপ। “কাজেই ড্যাডিকে দেখার জন্য একজন নতুন মামের দরকার- তাই না?” ওরা তো কিছুই বোঝে না- না -না বোঝার ভাণ করছে যেখানে ব্রীত ১৮ বছরের আর ঋতু ১৬ বছরের। টুকটুক করে ঘাড় নাড়লো এ ওর দিকে তাকিয়ে।

ঠাকুমাই উত্তর দিয়ে দিলেন নিজের প্রশ্নের । “তোমাদের নতুন মাম আসছে আর কয়েকদিনের মধ্যে। তোমরা তৈরী থাকো তাকে ওয়েল্কাম করবে বলে। আর আমি ফ্রী হয়ে যাবো ড্যাডির চিন্তা থেকে।।

কি তোমরা রাজি আছো তো?” 

ওরা একসঙ্গে বলে উঠলঃ “ইয়েস-হোয়াই নট?”

বাড়ির সবার সাক্ষীতে বিয়ে হয়ে যায় সব রেজিস্ট্রি করে। সবাই অপু-কে যে ভালবাসে- তাই তাকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করার জন্য এ ওর কাছে শুনে অ-নিমন্ত্রিতরাও এসেছিলেন হোটেল ম্যারিয়টে। সেখান থেকে আপানের অজ্ঞাতে সবাই আসে মন্দিরে-যেখানে সিঁদুর দানের সব ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছিলেন বড়রা। আপান এসব কিছুই জানে না। তবে সে সেই মেয়ে নয় যে-অহেতুক অশান্তিতে ভরিয়ে দেবে পরিবেশ। 

বিয়ের পর দুই দাদা, ভাইঝিদের আর দিদির সাথে আপান এল নতুন ঠিকানায়। আর দীপ্তর জীবনে আরেক অধ্যায়ের সূচনা শুরু হল। 

বাড়িতে সব রকম ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন মা। ভাল ভাবে হয়ে গেল সব নিয়ম কানুন আপান আর দীপ্ত-র নিকট আত্মীয়দের সামনে। 

রাতে যখন সবাই শুয়ে পরল-আপান মাস্টার্স রুমের লাগোয়া হাফ সার্কেল ব্যালকনিতে রাখা দোলনায় বেডরুম থেকে একটা গালিচা এনে পেতে বসে পড়ল। দীপুও ওর পাশে এসে বসল- আপান রাতের আকাশের জ্বলন্ত চাঁদকে দেখে বলল আসতে আসতে---- “আজ থেকে এই চাঁদের আলো আমাদের জীবন সুন্দর করে দেবে... আমরা কখনও লুকিয়ে কোন কাজ করব না। যা কিছু হবে -সরাসরি দুজনে ফয়সলা করব। থার্ড পার্টি কেউ নাক গলাবে না। আমরা বাকি জীবন প্রিয়বন্ধু হয়ে কাটাবো। সুখে দুঃখে একে অপরকে ছেড়ে যাব না।”

-হ্যাঁ! 

ভয়ে ভয়ে দীপু ওর হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল- “প্রমিস করলাম। তুমি আমার সম্বন্ধে কিছু জানো কি না জানি না, তবে আমি তোমার সম্বন্ধে সব শুনেছি। দীপু এই ফাঁকে বলে নিল তার দুই ছেলে মেয়ের কথা। আপান শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আপান কোন আর্গুমেন্টে না গিয়ে ছলছল চোখে দৃঢ়তার সঙ্গে বলল – “নো প্রবলেম! ঠিক আছে । এই বয়সে সন্তান থাকাই তো স্বাভাবিক। যাই হোক, তুমি লুকালে না-ভালো লাগল খুব। এই আবোধ শিশু দুজন তো আর পেছনের অন্ধকার পথ নয়। ওরা তো উজ্জ্বল আলোয় ভরা সুন্দর ভবিষ্যতের প্রতীক।”

-না আপান। আর অন্ধকার নয়, আলোর পথই হবে আমাদের চলার পথ।

ব্যাল্কনির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাগ্নোলিয়া ফুলের গন্ধ তখন দুজনকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধবার  জন্য সুবাস ছড়াতে শুরু করেছে।

“Love is the act of faith and whoever is of little faith of little love.” 

মায়ের আজ মনে শান্তি, সব ফুলের মধ্যে অপরাজিতার জিত না হলেও মানুষ অপরাজিতা হারতে জানে না। সে আজ পনেরো বছর ঘর করছে তার দীপুর সাথে।

আজ পরম শান্তি দীপুর মায়ের। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ঠাকুরঘরের দিকে যেতে-যেতে উপলব্ধি করলেন, ঈশ্বর এই কারণেই তাঁকে বোধহয় বাঁচিয়ে রেখেছেন, না হলে এত সুখ দেখে যাওয়া হত না। এত প্রাপ্তি তাঁর জন্য অপেক্ষা করে ছিল। 

দেখেন তার দীপু আজ খুব খুশী, খালি বলে তার বান্ধবী মা-কে, “আমি যা চেয়েছিলাম, তাই পেলাম মা আজ, ত...বে বড্ড দেরিতে। ভারী বুদ্ধিমতী মেয়ে আপান। সুন্দরভাবে সব সামাল দিয়ে আমাদের জীবনের হাল ধরেছে। দুটো নদী এল-গেল, আর এই মনের মত জীবন-নদী এল এত পরে?” 

এই সব দেখে শুনে তিনি খালি বলেন সবাইকে, “এই বিয়ে আগে হল না কেন?” 

অগোছালো ছত্রাকার একজনের সংসারকে আজ নিজের মনের মত করে সাজিয়ে তৈরি করেছে তার সুখের বাসা। অজানা লোক দেখে বলে, “এই বিশাল বাড়ি- ছেলেমেয়ে সংসার ছেড়ে কেন পরমা চলে গেল? প্রেম -ই সর্বশ্রেষ্ঠ ভেবে? না, পরকীয়ার দুর্বার আকর্ষণ ভেবে? এটাও কি একটা মানসিক অসুখ নাকি?” 

ক্রমশ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

চতুর্থ অধ্যায় - অপরাজিতা (২য় পর্ব)

“why not” is a slogan for an interesting life.

গল্পের উপসংহার যেমন নাটকীয় তেমনি চমকপ্রদ। আপন কর্মের ফলভোগী মানুষকে হতেই হবে। পাপের শাস্তি, পুণ্যের পুরস্কার মাথা পেতে গ্রহণ করতেই হবে তাকে। কিন্তু সজ্ঞানে হোক আর নির্জ্ঞানেই হোক, আপন স্বভাবের কোন একটা বিশেষ ত্রুটি বা দুর্বলতাকে আশ্রয় করে নিয়তি যখন মানুষের মর্মমূলে বাসা বেঁধে বসে তখন তার অসহায়তা করূণারই উদ্রেক করে।

না! আপান কোনদিন করূণাকে নিয়ে বর্তমানের সাথে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায় নি। সে এগিয়ে গেছে শুধু নিজের  সত্ত্বাকে বাঁচিয়ে রাখবে বলে। আপান এখন বিশ্বাস -অবিশ্বাস কোনটাকেই ধরে রাখতে পারে না। গুরুজনদের অবজ্ঞা করতে কোনদিনই সে শেখে নি। 

দীপ্তরা চলে যাবার পর আপান বাড়ির সবাইকে শুধু বললঃ “ আমি কি আমার শরীরের রক্তকণা ঝরিয়ে বারবার প্রমাণ দেবো যে, এই বাড়ির প্রতিটি পাথরের কাছে কৃ্তজ্ঞ?”

মেজদি তাকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেনঃ- আপান, আমি কিছু শুনতে চাই না। শুধু তোর মুখ থেকে শুনতে চাই 'হ্যাঁ বা না'- ব্যাস আর কিছু না। 

-সেটাই তো বড় কঠিন প্রশ্ন- একদিকে অসহায় মায়ের আকুতি আর একদিকে মাতৃসমা দিদির কর্তব্য। 

কোনটাকে অবহেলা করি? জীবনখাতার প্রতিটি পাতায় হিসাব রেখে চলেছি কিন্তু আজকের হিসাব আমার কাছে বড্ড টাফ !! - এ হিসাব বড্ড ভাবাচ্ছে আমাকে। আমার নিজের জীবনক্ষু্ধা অনেকদিন আগেই ধ্বংস করে ফেলেছি। কাজেই এই চরম পরীক্ষার্থি হয়ে আজ আমি কম্পলিট আনেন্ডিউরেবল(unendurable).

-এর উত্তর খুব সোজা। শুধু মেনে নে দীপ্তকে। তুই ফুল মার্ক্স পাবি যা তোর জীবনের হিসাবের খাতায় গ্রীণ অক্ষরের বেস্ট আওয়ার্ড। আপানঃ Life is painting a picture , not doing a sum। ভালো মানুষের অভাব কখনো হয়নি, রে। সে জন্যই পৃ্থিবীটা মোটের ওপর ভালোই চলছে। 

একটু চিন্তান্বিত দেখালো আপানকে। মুখ নীচু করে চলে গেল নিজের ঘরে। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে- দুই হাতে মুখ চেপে এই প্রথম কেঁদে উঠল এই বলে যে- “হেরে গেলাম জীবনে।” 

পরের দিন কাজ থেকে আসার পর মেজদি আবার ধরলেন- “দীপ্ত-র মা আজ ফোন করেছিলেন-তোর কি মতামত জানবার জন্য। একটু বলে দিস কি উত্তর দেবো।”

-হ্যাঁ- বলে এক ছুট্টে নিজের ঘর থেকে জামা কাপড় চেঞ্জ করার জন্য বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার খুলে খুব কাঁদলো । সাদা জলের সাথে মিশে গেল তার লবণাক্ত জল। ফ্রেস করে নিল নিজেকে তার স্বভাব মত। অফিসে আজ লাঞ্চও করেনি শুধু ভেবেছে -কি তার কর্তব্য। মা বাবা থাকলে হয়ত একলা থাকাটাকেই বেছে নিতে পারত-কিন্তু দিদির আর বাড়ীর সবার অনুরোধকে তার কি উপেক্ষা করা উচিত। সে সত্যি আর সব সিঙ্গল থাকা মেয়েদের মতন নয়- Yes or No-চিন্তাটা ওকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছিল সারা অফিস টাইম। দাদা বৌ্দিরা কিছু না বললেও হয়ত আড়ালে আমাকে নিয়ে আলোচনা করেন। এইভাবে সারা জীবন আলোচনার পাত্রী হয়ে বেঁচে থাকার মানে হয়না। আগে সে ভাবে নি এই নিয়ে। কিন্তু আজকাল যেন মনে হয়-সবাই ওকে করুণার চোখে দেখছে।

তারপর মেজদির গা ঘেঁষে বসে শুধু বলল- “আজ আমার হার হওয়া সত্ত্বেও শুধু তোমার কথা ভেবে আমি আজ রাজি হলাম দিদি। তোমাকে তো সারা জীবন কিছুই দি নি। তাই আজ এই কথাটা মেনে নিলাম। তুমি খুশী তো ! তবে আমি হেরে গেলাম গো মেজদি।

মেজদি চোখভরা জল নিয়ে ছোট্ট বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় একটা স্নেহের চুমা দিয়ে বললেন, - “তুই হারিস নি, একটু ও হারিস নি--তুই জিতেছিস আর সেই জেতার পুরস্কার হল দীপ্ত। দেখিস! আমার কথা মিথ্যে হবে না। আমি আজ সত্যি খুব খুশি রে আপান সোনা।- খুব খুশি হলাম। তুই খুব সুখী হবি।”

-তবে দিদি, আমার একটা অনুরোধ রাখবে?

-অনুরোধ কেন বলছিস? বল না-নিশ্চয়-ই রাখবো। 

--আমি সিঁদুর পড়ব না। শুধু রেজিস্টার ম্যারেজ করব। আমাকে জোর কোরো না, প্লিজ। এই সিঁদুর-এ আমি বড় ভয় পাই আজও।

-কিন্তু সিঁদুর না পড়লে যে, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবরা কি চোখে দেখবে? সেটা ভেবেছিস? 

-হুঁ! যখন আমি নির্দোষ থেকেও কিছু কিছু মানুষজনদের সন্দেহের বশবর্তী থাকতে পেরেছি এত বছর তখন এই লোকদেখানো সিঁদুরকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারব না। 

-মেজদি একটু চিন্তা করে পেছনে দাঁড়ানো বৌ্দিদের সাথে চোখ চাওয়াচাওয়ি করে বললেনঃ “ আচ্ছা বাবা! তাই হবে । আমাদের যা ইচ্ছেপাখিটা বলবে, তাই হবে। আমরা আর জোর করব না- হলো।”- বলে বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটা শান্তির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বৌ্দিরা তাড়াতাড়ি আপানকে মিস্টিমুখ করালেন। 

আপানের বাড়ির লোকজনেরা সম্পূর্ণ চেপে গেলেন যে, দীপ্ত-র দুই টিন এজ ছেলে মেয়ে আছে। তাহলে হয়ত আপান বেঁকে বসবে কারণ সে এই ধরণের আলোচনা হলেই বলত -যাদের ছেলে মেয়ে আছে তাদের দ্বিতীয়বার বিয়ে করাটাকে সে সাপোর্ট করে না। মা বাবা বিয়ে করলেও ছেলে মেয়েরা মানসিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর সে সেই মা বাবাকে ঘৃণার চোখে দেখে। যারা ছেলে মেয়ে জন্ম দেয় অথচ নিজেদের সুখটাকে বড় করে দেখে তাদের সমাজ কালপিট ভাবতেও দ্বিধা করে না, বা মেন্টালি টর্চার এর ও সংজ্ঞা দেয় তাদের। আর সন্তানরাও সৎ মা বা সৎ বাবাকে সহ্য করতে না পারার জন্য চরম বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে দিন কাটায়। সামাজিক হীনমন্যতাও কাজ করে সেই সব শিশুদের মধ্যে।

তাই সবাই ব্যাপারটাকে চেপে গেলেন। ওনারা জানতেন যে, পরে আপান জানতে পারলেও কোনরকম আর্গু-র মধ্যে দিয়ে সে যাবে না বা আবার দাগ লাগা একটা সংসারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না তার জীবন থাকতে। 

এদিকে দীপ্ত-ও এক কঠিন পরীক্ষার জন্য নিজেকে তৈ্রী রাখলো। মা -কে বলল যে, ব্রীত আর ঝতুকে কি ভাবে বলবে যে, সে আবার বিয়ে করছে-!! ডুকরে কেঁদে উঠল মায়ের হাত ধরেঃ

-এ যে ভীষণ লজ্জাকর ব্যাপার মা। 

- এতে চিন্তার কিছু নেই। আজকাল ঘরে ঘরে এরকম হচ্ছে। আমি মা হয়ে তোকে বলছি -তুই কোন অন্যায় করছিস না। উইকেন্ডে আসলে আমিই ওদের বুঝিয়ে দেবো, তোকে মাথা ঘামাতে হবে না । চল এখন খেয়ে নি রাত হল।

দীপ্ত মায়ের সাথে যেতে যেতে বলে উঠলঃ

“কিছুতে মনের মাঝে শান্তি নাহি পাই,

কিছুই না পাইলাম যাহা কিছু চাই।”

-মা হেসে বললেনঃ এইবার তুমি পাবে যাহা তুমি চাও। ঠাকুরের পরীক্ষার দিন এবার শেষ হল রে দীপু। ছোট্টবেলায় মা -বাবাহারা মেয়েটাকে দেখে কেমন যেন মায়ায় পড়ে গেলাম। এটাই বোধহয় উচ্চশিক্ষিত-এর উদাহরণ।

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

চতুর্থ অধ্যায় - অপরাজিতা (১ম পর্ব)

সব ভাইবোনের অতি আদরের ছোট বোন। ছোট বেলায় মা বাবাকে হারিয়ে সেই মেয়ে যেন কেমন উদাসীনা। ছোট্ট মেয়েরা কত কিছু করে, সাজতে ভালবাসে। কিন্তু আপান ছোট বেলা থেকেই কেমন যেন চুপচাপ থাকে, নিজের মনে পুতুল খেলত আর বকবক করত। পুতুলকে বলত, “তোকে ছেড়ে আমি কোত্থাও যাব না রে পুতুল, দেখিস”।-মেজদি শুনতেন বসে বসে ছোট্ট বোনের হাহাকার।

কারুর মা বাবাকে দেখলে তার চোখ ছলছল করে ওঠে। মেজদি তখন বিয়ে না করে সেই ছোট্ট বোনকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন-আর মায়ের স্নেহে মানুষ করেছিলেন। আগলে রাখতেন ছোট্ট আপানকে। দাদা্রা  বৌদিরাওতটস্থ ছোট বোনের কোন কষ্ট না হয়। সব দিক দিয়ে তাকে সুন্দর এক্ পরিপূর্ণ নারী করে তুলবে এই ছিল বাড়ির সব দাদা দিদিদের আশা। সেই ছোট্ট বোন যেন মা-বাবার অভাব কোনমতেই বুঝতে না পারে। যে দেখে সেই বলে - “আপান কি বড় হবে না?” -শুনে মেজদি আর দাদারা বৌদিরাও মুখ টিপে  হাসতেন। কিন্তু আপান আপান-ই... থাকে সরল সোজামাটা মেয়ে হয়ে|

জীবনে এই সরলতার জন্য অনেক ঠকেছে আপান। সবাই সতর্ক করলেও বলে- “ কি করব কিছু যে লুকিয়ে রাখতে পারি না, বলে ফেলি।” ওপরের ছোট দাদা যখন বন্ধুদের কাছ থেকে বই এনে দিত আপানকে। আপান দেখে -তাতে প্রেমপত্র। কিছু  বলে না সেদিন কিন্তু--গল্পের ছলে বলে ফেলে পরের দিন। বাড়িতে বৌ্দিদের... নিজের, খুড়তুতো- জাঠতুতো দাদা ও ভাই-রা আসলে কিন্তু আপান কে ত্রিসীমায় দেখতে পাওয়া যাবে না। লজ্জায় কোথাও মুখ ঢুকিয়েছে। দাদার বন্ধুরা, বা আত্মীয়স্বজনদের সামনে আপান? ভাবা যায় না...

বৌদিদের ভাইরা -দিদিদের দেওরেরা তাদের বলত- “ ধ্যুস আজকালকার দিনে আবার এরকম মেয়ে দেখা যায় নাকি? তোমরাই ওকে স্পয়েল করছ কিন্তু-আতু আতু করে। পরে ভুগতে না হয়। মিশতে দাও সবার সাথে। তবে তো জ়ীবন কী জানতে পারবে।”

অলক্ষ্যে হেসেছিলেন ভগবান- আর মনে মনে ঠিক করেছিলেন এই মেয়েকে  উপযুক্ত শিক্ষা দিতেই হবে। নয়ত পৃ্থিবী জানবে কি ভাবে যে, সরলতার দিন লুপ্তপ্রায়। 

দেখতে সুন্দর-পড়াশুনায় চৌখোশ, সুশিক্ষিত বাড়ি। কাজেই বিয়ে তো হবেই দারুন একটা ছেলের সাথে এ তো সবাই জানে। তাই আপানকে তড়িঘড়ি ঘোড়ারেসে জিতে নিল প্রথম উপহার হিসেবে কলকাতার সেরা  বাড়ীর  সেরা ছেলে। সেই বাড়ি যাদের পূর্ব পুরুষের নামে রাস্তা, ইস্কুল, কলেজ, বাজার-হাট আছে। অতর্কিতে তাকে দেখেই লুফে নিল সেই বনেদি বাড়ির মানুষজন। তারপরেই ঘনিয়ে আসে সেই মহাকাল যা আপানকে শিখিয়ে দিল-সরলতার দিন শেষ। মিথ্যে বদনাম সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ল বাড়ির  আদরের ছোট বোন। তারপরে ছোট জামাইবাবু ব্যাপারটাকে আঁচ করতে পেরে শালাদের জানায়ঃ আপান-কে ইমিডিয়েট নিয়ে যাবার জন্য। নয়ত আপানকে দেখতে হবে রোগশয্যায়। তড়িঘড়ি দাদারা এসে নিয়ে যায় ছোট্ট বোনকে নানান অজুহাত দেখিয়ে। আপান-ও জানে না কেন যাচ্ছে সে দাদাদের সাথে।

তারপরে দাদারা আর জামাইবাবু মিলে ডিভোর্স-ও করিয়ে দেয় টাকা পয়সার জোরে যদিও আপানের স্বামী রাজী ছিল না এই ডিভোর্সে। কিন্তু ঠিক সেই সময়-ই ঘটে এক অদ্ভুত ব্যাপার। আপানের একমাত্র ননদাই মারা যায় ছাদ থেকে পড়ে-কেস হয় মার্ডার। বেঁচে গেছিল সেদিনের আদরের মাবাবা হারা সরল একটা  মেয়ে। 

তারপর কেটে যায় দিন। আবার ব্যস্ততা পড়াশুনা আর নানারকম কাজে। তবে একটা আতঙ্ক বাসা বাঁধে আপানের মনে-বাইরের কোন পুরুষমানুষকে সে সহ্য করতে পারে না। মেন্টালি সিক্ হয়ে পড়ে, অচেনা পুরুষের সামনে!

বিয়ের কথা বললে-তার একটাই উত্তর-”এবার আমি আর বাঁচবো না-তোমরা কি তাই দেখতে চাও?”

তাই কিছুদিন সবাই চুপচাপ থাকে। 

অরিজিতের ফোন পাবার পর ছলেবলে কৌশলে অপরাজিতাকে তার দাদা-বৌ্দিরা বোঝায়- বলে, “সারা জীবন আমরা থাকব না, কে দেখবে তোকে? অরিজিতের এক বন্ধু খুব ভাল ছেলে - তাকে বিয়ে করে একটু শান্তিতে থাকবি তাই তো আমরা চাই...একটা মানুষের উপকার কর। পৃ্থিবীতে এখনও ভাল মানুষ আছে, সব পুরুষেরা খারাপ নয় রে আপান। তোর দাদারা- জামাইবাবুরা কি খারাপ? তুই তো সেরকম মেয়ে নস যে, 'একা' থাকতে পারবি, এরপর ভাইপো-ভাইঝিদের বিয়ে হবে। তারা তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তুই সারা জীবন একা থাকবি কি করে? আমরা  নিশ্চিন্ত হতে পারি অপু। অরির বন্ধু যদি আসে-একবার দেখ। যদি ভালো না লাগে না হয় করিস না। তবে শুনেছি খুব ট্যালেন্টেড ছেলে নাকি। আমরা তোকে কেউ জোর করবো না।” 

-তোমরা জানো না তাই বলছো- যে একা, অন্যের সঙ্গে তার কখনো সংঘাত হয় না। -সে কারও উপদ্রব ঘটায় না। কারও উপদ্রবতাকে সহ্য করতে হয় না। কেন তোমরা আমাকে আবার ভুলপথে যেতে বলছো? আমি তো তোমাদের কোন ক্ষতি করছি না।

-না, তা না। তবে আমাদেরও তো একটা দায়িত্ব আছে, তাই না? আর তোর ফুলদা যখন বলছে-ছেলেটা ভাল। দেখতে দোষ নেই তো। ফুলদা তো এতদিন বলেনি--বলেছে কি? সেও তোকে দেখুক। দুজনে  রাজি থাকলে তবেই বিয়ে হবে নতুবা নয়।

-জানো না শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন- “ আমি ও আমার ত্যাগ করো। আপান নিজেই নিজেকে বললঃ অন্যায় নত হয় ন্যায়ের সামনে। যারা এইরকম অভ্যাস গড়ে তোলে তারা মূল উৎস থেকে বিচ্যুত হয় না।সেজন্য তারা অপরাজেয়। তাই আমি অপরাজিতা। 

জানলার কোল বেয়ে আকাশের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে শুকতারা ধকধক করে জ্বলছিল। উত্তর -দক্ষিণ কোণে ওই তারার সাথে যেন অপরাজিতার প্রতি্যোগিতা চলছিল।

অপরাজিতাকে দেখেই তার হাত ধরে মা মৃদুলা দেবি হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন, বললেনঃ “হ্যাঁরে, আমার দীপুকে একটু শান্তি দিবি না, মা? ও তোকে একেবারে কষ্ট দেবে না, দেখিস। আগে তোকে কেন পাই নি রে আমার ঘরে। যাবি মা, আমার দীপুর ঘরে?” ...বলে, উনি হঠাৎ করে ওর আঙ্গুলে হীরের আংটি পরিয়ে দিলেন। দীপ্ত ও বাড়ির লোকেরা সবাই অবাক। দীপ্ত ভাবল মা কখন এই হীরের আংটি করি্যেছিল-সে জানত না তো। যাই হোক, অপরাজিতাকে সময় দিলেন না ভাববার। বললেনঃ “আজ থেকে তুমি আমার পুত্রবধূ। জানি হয়ত তোমার রূচিতে বাঁধছে কিন্তু জানো - তুমি যদি আজ একজনের সাথে বাকি জীবন কাটিয়ে দাও দেখবে সেই জীবন কত সুন্দর-কত অজানা ভাষা তুমি জানতে পারবে। আর এটাও জানো কিনা জানি না - "গৃহস্থের শক্তিতেই কিন্তু সমাজ গতিশীল, আর সে কারণেই গৃহস্থাশ্রম -আশ্রম চতুষ্ঠয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।”

নির্বাক অপরাজিতা ছলছল চোখে দাদা বৌ্দি-র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অসহায় ভাবে। ওর মনে পড়ল স্বামীজির লেখা- “ এক আউন্স পরিমাণ আনন্দ - এক পাউন্ড পরিমাণ যন্ত্রণার কারণ। একই শক্তি এক এক সময় আনন্দরূপে, আবার অন্য সময় বেদনার আকারে প্রতীয়মান হয়?”

গোধূলি নেমে এসেছে। চাঁদের আলো তখন ঘন হয়ে উঠেছে। এক দমকা বাতাস এল জোরে। সেই বাতাসে পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে সে পরিস্কার দেখতে পেল। ঠিক এসময় পাঁচমেশালি কোলাহল যেন চারপাশ থেকে ভেসে এল। একটা মিস্টি গন্ধ এসে তাকে নরম পেলব মাখিয়ে দিল।

দীপুকে আর আপানকে একটু নিরালায় রেখে বাড়ির সবাই আড়ালে গেলেন। আপান উঠতে গেলে মেজদি এক ধমক দিয়ে বসিয়ে রেখে দরজা টেনে দিলেন। এক বন্ধ খাঁচার মধ্যে দুই মনাঘাত পাওয়া পাখী।

দুজনেরই মুখে কথা নেই—যেন এক নিঃস্তব্দ পরিবেশ। দুজনেই বোধহয় তখন দুজনের মনের হৃতপিন্ডের কাঁপার শব্দ গুনছিল। দীপ্ত-ই নিস্তব্দতা কাটিয়ে বলে উঠলঃ- “বিশ্বাস করো! আমি কিন্তু নিজে থেকে আসি নি। তোমার যেমন মা নেই তাই মা তোমার মনের ভাষা পড়তে পারছেন না কারণ তিনি ইহলোকে নেই। আর আমার মা আমার মনের ভাষা পড়ে দিনের পর দিন চোখের জল ফেলছেন তা কি করে সহ্য করতে পারে কোন সন্তান। তুমি বলো?”

আপান-এর দুই চোখে তখন জলধারা যা দীপ্ত-র চোখ এড়াতে পারল না। আর মুখ তার তেমনি নীচুই রইল কোন কথা এলনা তার গলায়। 

চোখে জল দেখে দীপ্ত আবার বলে উঠল “তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি যেতে চাই না অপরাজিতা, আমি সেটা পছন্দও করি না। তবে আমি এটুকু ভরসা দি্তে পারি- তোমার কোন অযত্ন হবে না। তুমি এখানে যেমন আছো ঠিক তেমনি থাকবে। মনে করো তোমার মা -ই তোমাকে আজ জোর করে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে চাইছেন। তোমার যা ইচ্ছে তাই করবে। চাকরি বা আরো পড়াশুনাতেও আমার কোন আপত্তি থাকবে না।

শুধু আমাকে বলো -তুমি রাজি? মায়ের মনে একটু আনন্দ দিতে পারবে না অপরাজিতা?

-এইবার আপান চোখ ভরা জল নিয়ে মুখ তুলল যখন দীপ্ত দেখে তার সুন্দর সরলতা ভরা চোখে জলের ফোঁটা যা আপানকে আরো সুন্দর করে তুলেছে। 

-কিছু বলো প্লিজ আপানঃ এইবার দুটো ঠোঁট একটু আলগা করে খুব আসতে বললঃ “ It's a man's world.”-একটা নিঃশ্বাস ফেলল এবার আপান।

-আপান! Something that tells us about who we are and where we come from. My world has turned upside down. দীপ্ত-র গলা ধরে আসে। আপান আর দীপ্ত একে অপরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কয়েক মুহুর্ত চিন্তা করে আপান। তারপর আবার দুই চোখ মেলে তাকায় দীপ্ত-র সরল উজ্জ্বল চোখের দিকে । সে চোখে দীপ্ত দেখতে পায় ইতিবাচক শব্দদের। তাই বলে ওঠে নিজের অজান্তেঃ আপান, “ আজ বুঝলাম তুমি সুন্দর তোমাতে আছে থামি-আমাতে সে হল ভালবাসা-” বলেই ঘেমে টেমে একসা। যাকে বলল এই কথাগুলো সে কিন্তু নির্বাক-শুধু মাথা নীচু করে দুই হাতের দুই বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে হাতের রেখাগুলোকে টিপ টিপ করছিল। 

“They sicken of the calm who know the storm.”

ক্রমশ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

তৃ্তীয় অধ্যায়-অষ্টম পর্ব

দীপ্ত ঢুকল হাতে ট্রে নিয়ে আবার। স্পাইসি চিকেন উইংগস আর আইসি রুট বীয়ার নিয়ে ঢুকেই দেখে মা-র চোখে জল। মনে মনে ভাবল -মার মন খারপ হলে মার প্রেশার-টা বেড়ে যাবে। তাই পরিবেশটাকে হাসি ঠাট্টায় ভরিয়ে তুলল। সারাদিন টিপ টিপ বৃষ্টির শেষে একটু ফাঁক নিয়েছে সবে, ঠিক সেই সময় কাঁচের দরজার গা বেয়ে আকাশে মেঘের ফাটল থেকে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে দু'একটি তারা। সেই তারাদের দেখে দীপ্ত গেয়ে উঠল “ চারিদিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারী, ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি...” অরিজিত অবাক ওর সহ্যশক্তি দেখে। ভাবে ঘটনা পরম্পরায় একটা রিয়্যালিস্টিক ট্রিটমেন্ট দীপ্ত-র মাথায় কেন এল না। দীপ্ত দেখল... নাঃ মা এর আবার মন খারাপ হবে তাই ব্যাপারটাকে চেপে যেতে চাইল এইভাবে- “কি হল? অরিজিত চুপ কেন রে? তোর খবরাখবর বল, কিছু শুনি-কি বলো মা?” 

- ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কিছুই তো করতে পারলাম না রে। মাসীমা আমি একটা কথা বলব? কিছু মনে করবেন না তো? দীপ্ত-র একটা বিয়ে দিয়ে দিন, এখানে একা থাকা খুব মুশকিল। এই বিশাল বাড়িতে কতদিন একা একা থাকবে বলুন তো...আর যখন সে বিয়ে করে ফেলেছে এর মধ্যে, তবে দীপ্ত কেন সারাজীবন একা থাকবে? বয়স হলে কে দেখবে ওকে? আজকাল ছেলেমেয়েরাও তো বাবা মা-কে দেখে না। দীপ্ত-কে আমি সেই কলেজ লাইফ থেকে দেখছি তো। বুক ফাটবে তবু মুখ ফুটবে না ওর। এক নিঃশ্বাসের জ়োরে কথাগুলো বলে ফেলল অরিজিত। একেই কি বন্ধুত্ব বলে? আত্মীয়তা? কমিউনিয়ন বলে। হোলি কমিউনিয়নঃ গির্জার ভাষায় ঈশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগের নাম।

দীপ্ত ধড়ফড় করে বলে উঠল- “এই অরি”- কি সব যা তা বলছিস? কি বলছিস জানিস?” 

বাঁদিকে বড় বড় গাছের মধ্যে সরসর আওয়াজ হচ্ছে। মাথা নাড়ছে ওরাও, অন্য জগতের মানুষের উপস্থিতিকে বড় ভালো লাগছে ওদের।

-উই আর ডুইং আওয়ার বেস্ট। ঠিক বলছি আমি, মাসীমা। তোর সাথে তো কথা বলছি না রে ডকি। তবে জেনে রাখিসঃ

“যাক চলে যাক সে -যাক চলে যা...ক-”

আছে আরো অনেক ভালো মেয়ে 

খুঁজলেই পাবি হাজার সব...

আমি ভাবতাম যারা বুদ্ধিমান, তারা বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের জীবনকে আরও সহজ করে নেয়। জীবন কি আর থমকে থাকে রে? তোর তো দেখছি সবই উলটো। 

পুরো গুরুগম্ভীর আবহাওয়া বদলে শুরু  হল স্বাভাবিক একটা সুন্দর আবহাওয়ার পলিশ। 

মা শাড়ির আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখের জল মুছে নিলেন। উতসাহিত হয়ে কথার মাঝেই বলে উঠলেনঃ

-কিন্তু কোথায় পাবো মেয়ে? আর কোথায়-বা খুঁজবো? তোমার চেনা জানা থাকে যদি দেখো না বাবা আমার দীপ্ত-র জন্য।।

-মাসীমা, ভাবছি-দীপ্ত কী ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যেই না পড়েছিল। আপনাদের এখানে না এলে এর বিন্দুবিসর্গও জানতে পারতাম না, আপনাকে হয়তো বলত না। আপনি আসাতে ও তবু একটু নিশ্চিন্ত হতে পেরেছে। তবে মাসীমা ও কেন ওর বাকি জীবন এইভাবে কাটাবে? তাই না? মেয়েরা একটা সংসার ভেঙ্গে দেবে আর তার মাসুল বইবে ছেলেরা? কেন-তা? সব মেয়েরাই কি আর ধোয়া তুলসী-পাতা? কি বলেন মাসীমা? বলেই হো হো করে হেসে উঠল। 

কিছু যদি মনে না করেন-আমারই হাতে খুব ভাল মেয়ে আছে। আমাদের সব চেয়ে ছোট বোন অপরাজিতা । মাত্র উনিশ বছর বয়সে ওর বিয়ে হয়েছিল আমারই কলেজের খুব অবস্থাপন্ন বন্ধুর সাথে যারা কলকাতায় খুবই উপর মহলের। যাদের নামে রাস্তাঘাট, স্কুল, বাজার আছে। নিজের মুখে বলব না, সাধারণ বাঙ্গালী মেয়েদের চেয়ে দেখতে বেশ ভাল আমার বোন। পড়াশুনায়-ও খুব ভাল মেয়ে ছিল। একবার ওকে দেখেই সে পাগল, তারপরেই আমাকে জোরাজুরি । সেও আমার বন্ধু ছিল। নামকরা ফ্যামিলি কাজেই বিয়ে দিতে বাধা কোথায়? ছেলেও তো হীরের টুকরো। যেমন তাকে দেখতে তেমনি চৌখোশ পড়াশুনায়, গানে। কাজেই এই পাত্র মোটেই ফেলনা নয়। আইডিয়াল পাত্র হাতছাড়া করা মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়... এই সল্যুশনেই বিয়ে হয়ে যায় টুক করে। 

সুন্দরী হবার জন্যে সন্দেহের শিকার হতে হয়েছিল তাকে, যেটা ওর শ্বশুরবাড়ির মানসিক রোগ বলতে পারেন। ওর নিজের একমাত্র ননদ তার স্বামীকে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছিল সন্দেহের বশে। শেষ হয়ে গেছিল কলিকাতা ইউনিভার্সিটির গোল্ড মেডাল পাওয়া তার ননদাই। 

আমরা এইসব জেনে আর আমাদের আদরের ছোট্ট বোনকে তার সংসার-এ ফেরত পাঠাই নি। জোর করে ছাড়াছাড়ি করিয়ে দিয়েছিলাম পয়সার জোরে। নয়ত চিরতরে ছোট বোনকেও হারাতে হত আমাদের একদিন। 

*

ডঃ পি. শর্মার “ইনসেন জেলাসি” পড়েছিস, দীপ্ত? না পড়ে থাকলে পড়ে দেখিস। অদ্ভুত এক অসুখ। এ অসুখের কোন মেডিসিন নেই।

উত্তেজিত হয়ে মা মাঝখানে বলে উঠলেনঃ

-তারপর? কি হল অরি তোমার বোনের? এখন সে ভালো আছে তো?

-তারপর আর বিয়ের কথা বললেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ত, মাসীমা। অনেক ভাল ভাল সম্বন্ধ-ও এসেছিল। কিন্তু আমরা আর ওর অমতে যাই নি। ও পড়াশুনা, গীটার, সেলাই আর তার সাথে ছোট ছোট ভাইপো-ভাইঝি দের নিয়েই বেশ সুন্দর একটা নিজের জগতে বাস করে। যদি ওকে বিয়ের কথা বলা হয়-বলেঃ 

"আমি বেশ আছি আমাদের ঘরে । জানি আমাকে নিয়ে বাইরের জগতের মানুষের কত চিন্তা,কত আগ্রহ । অথচ আমার এইভাবে থাকা নিয়ে আমার নিজের তো কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই । কারণ আমি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করি না। এতগুলো বছর যখন নির্বিঘ্নে কেটে গেছে বাকি বছরগুলো-ও ঠিক সেইভাবে কেটে যাবে -এই বিশ্বাসে চলি।”

কি বলবেন এই মেয়েকে মাসীমা? তাই আমরা আর ওর বিয়ের ব্যাপারে চিন্তা করি নি।

-এখন কি করে তোমার বোন অরিজিত? সে কি আমার দীপু-কে বিয়ে করবে?

-জানি না, মাসিমা। তবে আর একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি। ও এখানে পড়াশুনা করে একটা নামকরা কম্পানীতে সাইন্টিস্ট হিসেবে কাজ করে। দাদা বৌ্দির কাছে থাকে। খুব ভাল রান্না করে, গীটার বাজায়, হাতের কাজ? থাক আর বলব না, কত বলব? জানেন, ওকে দেখে সবাই কি বলে? “- অতি বড় ঘরনী না পায় ঘর, অতি বড় সুন্দরী না পায় বর।” বর সে পেয়েছিল ঠিক-ই তবে ঘর সে পায় নি।

হ্যাঁ মাসীমা, নিজের বোন বলে বলব না, ওকে ঠাকুর সব দিয়ে তৈ্রী করেছেন, শুধু, একটা মিস্টি সংসার থেকে বঞ্চিত করে। বড় দুঃখী লাগে ওকে দেখলে। সবার ছোট বোন তো। বড় আদরের আমাদের ছোট বোন। 

কিন্তু, ওকে দেখে বুঝতে পারবেন না মাসীমা, সব সময় হাসি দিয়ে ভুলিয়ে রাখে নিজেকে। 

কি রে দীপ্ত যাবি আমাদের বাড়ি? তোকে নিশ্চয়-ই অফিসেও বিরক্ত করছে, তাই না রে? আমি কিন্তু তোকে জোর করছি না। তবে এইদেশে একা থাকাটা সমীচিন নয়-এটা বলতে পারি। 

-যদি আমার মত জিগ্যেস করিস, তবে বলব-আর না অনেক হয়েছে...বাকি জীবনটা মা -কে নিয়েই  কাটিয়ে দেবো। 

মা এবার দীপ্ত-এর কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেনঃ - “মা -কি আর সারাজীবন থাকবে রে? তোর একটা ব্যবস্থা করে গেলে মা-এর মত সুখী আর কেউ হবে না। আর অরিজিত যখন বলছে ওর বোনের কথা...একবার গিয়ে দেখে আসি চল না? তুই না করিস না দীপু। 

-মায়ের মনে আঘাত  দিতে ইচ্ছে হল না দীপ্ত-র...ভাবল-”মা আর কতদিন -ই বা-” সত্যি আজ ৪ বছর হয়ে গেল-কেউ ত বলে নি এইভাবে? আর তাতে মা যদি সন্তুষ্ট হয় তাহলে একবার গিয়ে দেখে আসতে ক্ষতি কি? এ্যাটলিস্ট মায়ের সাটিস্ফ্যাকশন। 

পরমুহূর্তেই মনে পড়ল...পরমার বাড়ি খালি করে তাকে নিঃস্ব করে চলে যাওয়ার কথা। আজ এতবছর যা কষ্ট করে নিজেদের দাঁড় করিয়েছিল তার অর্ধেক সে আদায় করে নিয়ে গেছে। আজ সে মনের কাছে একটুও সাপোর্ট পাচ্ছে না। 

নীরবতারও ভাষা আছে, যা কথার চেয়ে তীব্র, তীক্ষ্ণ -সে ভাষা অগ্রাহ্যের। সংশয়াচ্ছন্ন হয়ে ওঠে মন। তাই বন্ধু জেনে বা মেনে নিল-দীপ্ত-কে কোনমতে ওখানে নিয়ে গিয়ে ফেললে - সবার পার্স্যুয়েশন-এ রাজি হলে হতেও পারে। কারণ, দীপ্তকে দেখে মনে হচ্ছে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাসীমাকে আমি ইনস্টিগেট করছি।

আর সেও আমার সামনে তার মা-কে নিজের হিডিন রূপ-টাকে দেখাতে পারছে না। হয়ত ভাবছে-আমি না এলেই ভালো হত। কিন্তু অরিজিত চায় বন্ধুর সুস্থ জীবন-এরপর হয়ত দীপ্ত কোন কঠিন অসুখে পরে যাবে। বন্ধু হয়ে যদি এইটুকু সাহায্য না করতে পারে-তাহলে এতদিনের বন্ধুত্বের ডেফিনিশন -টা ভুল হয়ে যাবে।

অরিজিতের সেমিনার শেষে বাড়ি ফিরে দেখে দীপ্ত গালে হাত দিয়ে বসে কি যেন ভাবছে? মাসীমার হাসিমুখ আর নিজের হাতের তৈ্রি পায়েস দেখে পরিবেশটাকে হালকা করে দিলাম। 

পরের দিন সকাল সকাল দীপ্ত-র গাড়িতেই সবাই মিলে রওনা দিল আবার নতুন পথের সন্ধানে। -- একেবারে আকস্মিক ভাবেই বলা যায়। শুধু SMS এ দাদা-বৌ্দিকে জানিয়ে রাখল। এও বলে সতর্ক করে রাখল যাতে ছোট বোন আপান কোনমতেই জানতে না পারে। ওরা যেন ব্যাপারটাকে ক্যাজুয়ালি ট্রিট করে।

মানুষ ভাবে এক আর আরেকদিকে শুধু গুজবের গঙ্গা বক্ষে বয়ে যায় একটি অচর্চিত অধ্যায়।

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

তৃ্তীয় অধ্যায়-সপ্তম পর্ব

হঠাৎ করে দীপ্ত-র কলকাতার বি ই কলেজের বন্ধু অরিজিত আসে - নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে একটা কনফারেন্সে। রবিবার বিকেলে সোজা এসে ওঠে দীপ্ত-র বাড়িতে। কনফারেন্সে এলে আগেও ওর বাড়ীতে এসেই উঠত । কলিং বেল দিয়েই হাঁকডাক শুরু করে দেয়। খুব জমজমাটিয়া ছেলে। যেখানে যখনই থাকুক না কেন-সেই পরিবেশকে কি ভাবে আয়ত্ত্বে আনতে হয় তার ট্যাকটিক্স জানে। 

বাড়ি শুনশান দেখে অবাক। চারিদিকে যেন ছৈ-ছিত্তির অবস্থা। দীপ্ত-র দিকে অবাক চোখে তাকাতেই দীপ্ত বলে ওঠেঃ “ নসিব রে অরি- নসিব।” আগে বস- একটু রেস্ট নে সব শুনিস তখন বলেই মা -মা করে হাঁক ডাক শুরু করে দিল। 

-মাসিমা কবে এলেন রে? জানাস নি তো? আর ফোনের তো ধারে পাশে আগেও যেতিস না এখনও। এখন তো কতো অ্যাডভান্স রে-SMS -তাও দেবাদেবি বকুল ফুলের দল। মৌলিক কথাটা হল, আমরা যতই বড় বড় কথা বলি না কেন, আমরা সবাই নিজেকে নিয়ে মশগুল বলেই দীপ্ত-র পিঠে এক বন্ধুত্বের হালকা ঘুঁষি। নয় ত দেখ আমরা কেউ কারুর খবর রাখি না। পরস্পরকে জানার চেষ্টাও করি না। করি কি? একই দেশে থেকেও আমরা যেন ভারত ও পাকিস্তানের মতো দু-দিকের বর্ডারে দুটো প্রাচীর গড়ে তুলেছি। তুই তো আবার লেখক মানুষ। এসব বললেও খুব যে একটা লাভ হবে তা মনে হয় না। সেই কলেজ লাইফ থেকে প্রিয় বন্ধু হয়েও আমরা কেমন দু-দিকের গেটটা বন্ধ রাখতে পারলেই বাঁচি। মনের আস্থার একটু পরিবর্তন হলে কিন্তু আমরা আমাদের সুহৃদয় গেটটা খোলা রাখতে পারতাম-পারতাম কি না বল--? এতে অনেক সমস্যার সমাধান -ও আমরা করে নিতে  পারি। একতরফা খালি সিগন্যাল দিলে কি আর হয় -?

অরিজিতের অনর্গল কথার মাঝেই মা নেমে এলেন নীচে। অরিজিত পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম সারতেই মা-এর হাত তার মাথায়- -“সুখী হও বাবা! আজকাল এই জিনিসটার বড্ড আকাল চলছে।”

তারপরেই মা চলে গেলেন আর হাতে করে ফিরে এলেন ট্রে ভরতি এক প্লেট রেডিমেড সামোসা, পিস করা ফ্রুট কেক আর সুদৃশ্য রুপোর কাপে ক্যাপুচিনো কফি। গ্লাসে গ্লাসে চিয়ার্স করার পর একচুমুকে প্রায় অর্ধেক কাপ করে ফেলল অরিজিত। ক্ষিদের মুখে এইগুলো অমৃত লাগছিল। অরিজিত দীপ্ত-র মাকে বসতে বলল। তিনজনে মিলে খেতে খেতে নানান গল্প হচ্ছিল কফি টেবিলে। অরিজিত নিজেই তুলল কথাটা আবার। “এই দীপ্ত তর সইছে না রে। প্লিজ বল না ...শুনি।”

অরিজিত কফির গরম কাপের সাথে সাথে অপ্রত্যাশিত সব গল্প শোনে বন্ধুর মুখে। সন্ধ্যার নির্ভেজাল ভাসা যুবতি চাঁদের মোহিনী মায়া মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে বারান্দায়।

অরিজিত অবাক হয়ে বলেঃ 

~ ওহ! সে মুক্তি চাইল আর তুই খাঁচা খুলে দিলি? তাই তো? এ তো সেই অপর্ণা সেনের মুভি “পরমা”-র মতন রে...। তবে মুভির 'পরমা' ছিল ঘরে বন্দী- পরাধীন...তাই, বাইরের মুক্তির স্বাদ সে পেয়েছিল। আর এ 'পরমা' ছিল স্বাধীন, বাইরের স্বাদ তো সে নিজের খেয়াল খুশি মতই অনুভব করত। জীবনে তো খালি লেখা নিয়েই থাকলি তা আর জানবি কোথা থেকে। 

তোকে ভালমানুষ পেয়ে এত ঠকালো আর তুই কিনা সব গুছিয়ে তাকে বাড়ি থেকে যেতে বললি? আমি হলে আগে দু ঘা কষাতাম, তারপর একেবারে এক কাপড়ে গলা ধাক্কা দিয়ে বার করে দিতাম। তুই কি রে? আচ্ছা মাসিমা! দীপ্ত কি দিয়ে তৈরী, হ্যাঁ? 

হঠাৎ করে সেই বা বদলে গেল কি ভাবে? কিছুই তো বুঝতে পারছি না একেবারে। 

না না, এটা কিন্তু ঘোরতর অন্যায়। 

পরমাকে দেওয়া স্বাধীনতা দেখে আমার বাড়ির প্রেসিডেন্ট তো সব সময় উদাহরণ দিত তোদের ভালাবাসাকে। আমি কেন তাকে সেই ভালবাসা দিতে পারি না তার জন্য উঠতে বসতে শোনাত আমাকে...... কিন্তু, এ যে বিশ্বাস করা যায়না রে। 

তাহলে ঘোর অমাবস্যা কি ভুল করে তোর ঘরে ঢুকে পড়েছিল? না তুই তোর ঘরের দরজা উন্মুক্ত রেখেছিলি ভুল করে?

-একদম সত্যি! বিশ্বাস করা যায় না। মুক্তির কোনও বাঁধাধরা -কী বলব -কোন ডেফিনিট মানে করা যায় না-বা বলতে পারিস মানে নেই কোন। ওটা কোন বাঁধা নিয়মের মধ্যে পড়ে না। ধর... আমার বাড়িতে একটা পাখি আছে। খুব সুখি কিন্তু সে খাঁচায় আছে। তুই এসে বললি-আহারে! পাখিটা মুক্তি পেলে ভালো হত। অনেকদিন তো খাঁচায় আটকে রেখেছিস? কী কষ্টে আছে তা তুই জানিস না। মুক্তি দিয়ে দে। দিলাম মুক্তি। সে উড়ে গেল..দূ-ঊ-রে...বহু-দূরে....তারপর? গলা ধরে গেল দীপ্ত-র। হঠাত করে উঠে চলে গেল... 

দীপ্ত-র মা সব শুনে বল্লেন,

- খাঁচায় একবার ঢুকে পড়লে আর মুক্তি নেই রে। আর আমি মনে করি না, মুক্তি বল বা স্বাধীনতা......স্বাধীনতার বাঁধা কোনও মানে আছে কি? এক এক সময় সেটা সত্যি, হাজারবার সত্যি। আবার অন্য সময় একেবারেই সত্যি নয়। তখন সেই স্বাধীনতাই ক্লান্তিকর বৃথা অর্থহীণ হয়ে পড়ে। 

পরমা এইভাবে বদলে যাবে আমি একটু আঁচ করেছিলাম এখানে থাকাকালিন। বাড়িতে পার্টি হলে আমাকে উপরের ঘরে থাকতে বলতো। নাতি আর নাতনি দুজনে মিলে খাবার নিয়ে আমার কাছে আসত ওপরের তলায়। তাদের ছোট্টমাথায় খেয়াল থাকত যে ঠামা এখনও খায় নি। সে আমাকে তার বন্ধু-বান্ধবদের সামনে পরিচয় দিতে লজ্জা পেত, যা আমি গল্পের বই, আর সিনেমাতেই জেনেছিলাম। 

নিজের জীবনেও যে ঘটবে তা ভাবি নি।

তখন তো আর এখনকার মতন মুঠো ফোন ছিল না? কাজেই আমার ভাইদের-এর বৌ-রা নিউ জার্সি থেকে আমাকে ফোন করে দেশে যে, পরমা তাদের ফোন ব্যবহার করাতে অনেক ফোন বিল এসেছে। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছিল, তখন বিশ্বাস করি নি। তাদের বৌ-দের নীচ মনটাকেই বেছে নিয়েছিলাম। ওদেরকেই দোষী সাবস্ত করেছিলাম। 

একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাসীমা  আবার শুরু করলেনঃ

-জানো তো? লুকিয়ে লুকিয়ে ঠাকুর পূজো করতাম পাছে সে আমাকে বকে। ঠাকুর দেবতা আবার কি?... এই ছিল তার কথার কথা। দীপ্ত আর আমি মিলেই তো রান্নার বা বাড়ির কাজ করতাম কারণ সে সব সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখত বাইরের কাজে। ছেলেমেয়ে দুটোকে দেখে বড় দুঃখ পেতাম, ভাবতাম কি শিখছে ওরা? ওদের ভবিষ্যৎ কিরকম হবে? 

এইরকম ছোটখাট অনেক দুঃখ আমাকে দিত, তাই আমি দেশে যাবার নাম করে চলে গেছিলাম অন্য ছেলেদের কাছে। দীপ্তকে বলিনি পাছে সে মনে দুঃখ পায়। আমার গ্রীন কার্ড থাকা সত্ত্বেও আমি আর আসতে চাই নি এখানে ভয়ে হোক বা ঘৃণায় হোক। কাউকে বলি নি পাছে তারা খারাপ বলে পরমাকে। আমার আদরের দীপুর সংসার ভেঙ্গে যাক আমি যে একটু...ও চাই নি, এ-ক-টু-ও...না-আ”-.........বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মাসীমা।

ক্রমশ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

তৃ্তীয় অধ্যায়-ষষ্ঠ পর্ব

একদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এসে দীপ্ত দেখে- নিজের সব জিনিস গুছিয়ে নিয়ে পরমা চলে গেছে। রেখে গেছে শুধু এক অগোছালো স্মৃ্তি আর বেদনার আঁকিবুকি। 

দুই ছেলেমেয়েকে বোঝায় ড্যাডি, “তোমাদের মা-এর কাছেই থাকা উচিত, কাজে তোমরাও মায়ের কাছে গিয়ে থাকো। তোমাদের ঠিক করে দেখাশুনা করতে পারব না, প্রায়ই বাইরে যেতে হয় কাজে। তোমরা একা থাকবে কি করে?” 

তাছাড়া দীপ্ত জানত মা-এর কাছে ছেলে মেয়ে ঠিক মানুষ হয় যেমন তার বাবা না থাকাকালিন অবস্থায়ও তার মা তাদের তিন ভাইকে মানুষের মতন মানুষ করতে পেরেছেন। তাই সে দুই আদরের ছেলেমেয়েকে মায়ের কাছে গিয়ে থাকতে বলে। নিজের মা-কে নিজের কাছে এনে রাখার কথা তখন তার কাছে অজানা ছিল। 

মা কি সহ্য করতে পারবে এই দৃশ্য? মা কি বিশ্বাস করবে -যাকে কত আদর করে নিজের দীপুর বৌ করেছিল আর বলেছিলঃ “তোমরা দুটিতে সুখে থেকো। হাজার ঝড়-ঝাপ্টা আসলেও হাল ধরে থেকো শক্ত করে।”

ছেলেমেয়েরা তাদের সুবিধা মতন সব জিনিস নিয়ে মায়ের আর তুষারকাকুর কাছে থাকতে শুরু করে। ভেঙ্গে গেল তিল তিল করে কষ্টে গড়া পাখির বাসা। ৬ মাস পরে নিজের সব কিছু আদায় করে নিল কোর্টের মারফত। দীপত টুঁ শব্দ করে নি। কড়ায় গণ্ডায় পরমার সব চাহিদা মিটিয়ে দিয়েছে। পরমার বুক একবারও কাঁপে নি নিশ্চয়-ই -যে কত কষ্ট করে দীপ্ত আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে আর সে সব নিয়ে নিইয়ে যাচ্ছে শুধু দু বছরের আলাপের এক প্রেমপূজারী-র জন্য। আর তুষার? সাজানো সংসার পেয়ে গেল কষ্ট না করেই।

ছাড়াছাড়ি করে নিল পরমা আইনের মারফত। এবার বিয়ে করল তার প্রেমের পাত্রকে ঠিক ৬ মাস পার হতে না হতেই। কারণ তুষারের ডিপোর্ট হবার দিন এসে গেছিল। বাঙ্গালী সমাজ কয়েকদিন এই নাটকের খেলা কে উপভোগ করল তারপর চূড়ান্ত হার-জিতের ফলাফল-কে নিয়ে নিজেদের মধ্যে একটা সরগম তুলে আবার সব চুপচাপ হয়ে গেল- পরমা তা  জানত বলেই এত দুঃসাহসিক একটা কাজ করতে পেছপা হয় নি।

একটি একটি করে স্বপ্ন আর আশা নিয়ে যে কপোত-কপোতীর বাসা তৈরী হয়েছিল -আর সেই বাসার নাম রেখেছিল, “শান্তিনীড়”।

বহমান নদী ধাক্কা খেল আরেক ভালবাসার তীড়ে।

আজ এই বাড়িতে সে আর তার বাল্যকালের বান্ধবী মা। চারিদিক খাঁ খাঁ করছে-যেদিকেই তাকাচ্ছে দেখছে দুই ছেলে-মেয়ের হুটোপাটি-খুনসুটির ছবি। 

পরমা চলে যাবার পরেই মা-কে এনে রেখেছিল সে। পরমাহীণা বাড়িতে সে কি করে একা থাকবে? ভেঙ্গে পড়ে নি সে, খালি ভাবত সমুদ্রও তো একা। অনেক নদী এসে মেশে সেখানে আবার তারা সুবিধামত চলে যায় এদিক ওদিক। সব কিছুই শূন্য শূন্য লাগে। যেন আকাশ আর অন্ধকার ছাড়া আর কোথাও নেই কিছু। 

মাঝে মাঝে বিশাল আকাশের নীচে একলা দাঁড়িয়ে থাকে-ইচ্ছে হয় চিৎকার করে কাঁদে, কিন্তু কাঁদতে পারে না। এসব মার নজরে ঠিকই পড়ে। 

-“আচ্ছা খুউব হয়েছে, তাহলে বান্ধবী যা বলবে শুনবি তো? এবার একটা বিয়ে কর দীপু? কতদিন একা একা থাকবি, বল তো? তোকে এরকম দেখতে যে আর ভাল লাগছে না। মা তো আর চিরদিন থাকবে না-রে? কে দেখবে সারা জীবন? বয়স হলে একজন মনের কথা বলার লোকও লাগে, বুঝলি? ভেঙ্গে পড়িস না, আজকাল তো আকছাড় শোনা যায় এই ছাড়াছাড়ির কথা। কাজেই আমার কথার খেলাপ করিস না দীপু।

আমি শান্তিতে তোর বাবার কাছে যেতে পারব, বলব সব হিসাব মিলিয়ে এসেছি তোমার কাছে।” 

দীপু উত্তর দেবার জন্য মায়ের মুখের দিকে তাকাতেই দেখে মায়ের অসহায় চোখে জল চিকচিক করছে। বড্ড করুণ সেই চোখ, সেই মুখ।

আজকে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল মা -এর এবার বয়স হয়েছে। কত ঝড়-ঝাপটা পেড়িয়ে এসেছে তার এই সদাহাস্যময়ী মা, আর যেন টানতে পারছে না দড়ি। বড় অসহায় লাগছে মা-কে এবার।

-মা, একবার শান্তি চলে গেলে সেই বাড়িতে কি আর শান্তি ফিরে আসে? জানি না। এই তো বেশ আছি। জানো মা, আমি হয়ত ঠিক মত ভালবাসা দিতে পারি নি পরমা -কে। তাই সে সব ছেড়ে ছুড়ে চলে যেতে পারল। আমার হয়ত কোথাও কোন ঘাটতি ছিল, বুঝতে পারি নি একটুও। নয়ত কেন চলে যাবে, বলো? কত স্ত্রী-রা অনেক দুঃখ -কষ্টের মধ্যেও তো কি সুন্দর সাজিয়ে গুছিয়ে সংসার করছে, তাই না?

-এত করেও যদি বলিস তোর ভালবাসায় ঘাটতি ছিল। তাহলে, আমার মনে যে ভালবাসার সংজ্ঞা লেখা আছে, সেটা ভুল। জানি না বাপু। ভালবাসা আবার কাকে বলে?

আমরা তো অল্পতেই খুশী থাকতাম খুব। অবশ্য আমাদের যুগে মেয়েদের চাহিদা কম ছিল। তাই সংসার-ও ভেঙ্গে যেত না চটপট করে। বিয়ে হলে বয়ঃজ্যেষ্ঠরাই শিখিয়ে দিতেন সংসারের নিয়ম কানুন। আমরা সেই নিয়মেই চলাফেরা করতাম।

স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া-ঝাঁটি যে হত না, তা বলছি না, কিন্তু এইভাবে সব ফেলেফুলে অন্য পুরুষের সাথে চলে যাওয়ার হিরিক কম ছিল...কারণ তখনকার যুগের মেয়েরা বাপের বাড়ি থেকেই জেনে আসত-বিয়ে করলে যে সংসার হয় -তার শান্তি রক্ষার রশি-টা শক্ত হাতে ধরতে হয় মেয়েদের-ই। আমি একটুও বলছি না- অত্যাচার সহ্য করেও স্বামীর ঘর করতে হবে। তবে যেখানে অত্যাচারের লেশমাত্র থাকে না-সেখানে কি নিজেকে একটু মানিয়ে নেওয়া যায় না? 

-দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপ্ত তারপর আবার বলে ...জানো তো মা! জানলা দিয়ে মাঝে মাঝে দেখি আর ভাবি-জানলার ওপাশে আকাশ আর সেই আকাশে মেঘ আর পাখীরা কি সুন্দর ভাবে উড়ে যাচ্ছে। -কোন ঠিকানায় যাচ্ছে বোঝা যায় না। ঠিকানাবিহীণ না- ওদেরও ঠিকানা থাকে মনের মধ্যে, প্রকাশ করে না।

আচ্ছা মা! সত্যি কি সময়ের বহমানতায় গিলে নেয় উচ্ছিষ্ট সময়? জীবন যেন যন্ত্র। বিরাম নেই চলার। স্রোতের মতো নিরবধি, আগুনের মতো ধিকিধিকি... চলতেই থাকে... জ্বলতেই থাকে।

ক্রমশঃ

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

তৃ্তীয় অধ্যায়-পঞ্চম পর্ব

পরমা চুপচাপ, স্থির করেছে সে চলে যাবে তার ভালবাসার জনের কাছে। তার মনের শূন্য কাপ আজ ভরে দিয়েছে তুষার। দীপ্ত-র কোন দোষ সে দেখে নি কিন্তু ভালবাসা? নাঃ, দীপ্ত-র ভালবাসা তার কাছে আজকাল আর টানে না। সে তার কামনাকে কিছুতেই বশ করতে পারছে না। এ যে এক প্রখরে-মধুরে ভালবাসা তাদের! তাই সে যতই মধুর কন্ঠে মধুর হেসে তুষারের কথা বলে দীপ্ত-র মনে একটা আলোড়ন তুলতে চাইছে, কিন্তু সত্যিকার কোনও কাজ হয় না। তাই বাধ্য হয়ে সোজাসুজি তাকে জানাতে হল তার উনিশ বছরের বিবাহিত জীবনের সময়কে-গুডবাই। 

উপেক্ষা করল সব শর্ত। সে জানতঃ তাকে নিয়ে হট্টগোল কিছুদিনের তারপর মানুষ সব ভুলে যাবে। আকস্মিক উত্তেজনা একদিন থিতিয়ে যাবে। সে দীপুর ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দিতে পারবে পরে। সমাজ তো মেয়েদের-ই প্রাধান্য দেয়, সে সেটা মনে মনে ভেবেই তৈরী হয়েছিল। কিন্তু যাকে একবার নিজের শরীর- মন দিয়েছে, তাকে কি করে সে ফিরিয়ে দেবে? সে তো তার তুষারকে আর কারুর কাছে বিকিয়েও দিতে পারবে না। আর তুষার যদি তাদের গোপন প্রেমের কথা বাঙ্গালী সমাজে প্রকাশ করে দেয়, তাহলে? 

না নাঃ! সে তা করতে দেবে না। তুষার আরো কারও হোক সে তা মোটেই চায় না। সে তাহলে তো নিশ্চিহ্ণ হয়ে যাবে। বিয়ের আগে তো সে এরকম ভালবাসার সুযোগ-ই পায় নি, একেবারে সোজা দীপ্ত-র সাথে তার বিয়ে। তাই নিজের 'ভালবাসাকে' প্রাধান্য সে দেবেই। তার মনে পড়ল অমর প্রেম -এ রাজেশ খান্নার গানঃ “ কুছ তো লোগ কহেঙ্গে...লোগো কা কাম হ্যায় কহনা...” একদম ঠিক-লোকেরা কিছু না করলেও অনেক সময় বাজে কথা রটায়, আর সেই কথা বিশ্বাস করে কিছু মজাদার লোক। কাজেই সে আর কোন চিন্তার ধার ধারে না এখন। সে নিজেকে পুরোপুরি তৈরী করে নিয়েছে।

দীপ্ত -র প্রশ্নের কোনই উত্তর না দিয়ে বালিশ নিয়ে সে নীচের ফ্লোরে নেমে গেল। টিভি চালিয়ে এক তলার সোফা সেটে শুয়ে পরল পরমা। ...আ র – ? আর দীপ্ত এক অসহায় নেকড়ে বাঘের মতন সারা ঘর পায়চারি করতে লাগল। সূর্যের আলো যখন এসে জানলার চিকের গায়ে আটকে গেল, তখন এক দুঃস্ব্প্ন -এ ডুবে গেল সে। 

দেখল কখন অফিসের সময় পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। বাইরে ভোর ফুটে উঠছিল। সাদা হয়ে আসছিল চতুর্দিক, কাচের মতন স্বচ্ছ ফরসা ভাব ক্রমশঃ আরও ধবধবে হয়ে এল। পেছনের ফোটোনিয়া গাছে পাখিরা তাদের নিত্য সংসারের কাজে লেগে পড়ল। শুধু তার সংসারে আজ কোন কাজ নেই...

সে আর অফিসে গেল না। পরমা দুই ছেলেমেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে হয়ত নিজেও কাজে চলে যাবে। দীপু না পারল কাঁদতে না  পারল নিজের মনকে বোঝাতে। সারা রাতের ক্লান্তিতে সে শোবার ঘরের পাওয়ার রিক্লাইনার- এ ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম যখন ভাঙ্গল, জানল ছেলেমেয়েরা যে যার ঘরে আছে, তারাও আর তাদের ড্যাডি-কে ডেকে তোলে নি, না তারাও দুঃস্বপ্ন দেখেছিল? 

যথারীতি বেশ রাতে বাড়ি এল পরমা। মুখ কালো মেঘের মতন থমথমে।

আবার রাতে না খেয়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরের সোফা সেটে গিয়ে টিভি দেখতে দেখতে শুয়ে পড়ল। একলা বিছানায় প্রহর-এর পর প্রহর গুণতে লাগল দীপ্ত। বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়। ক্রৌঞ্চমিথুনের যায়গায় সত্যিকারের দুটো রাতজাগা পাখী। এ যেন এক রিয়্যালিস্টিক স্টেজ। স্টেজের মধ্যে বাস্তব জগতের অভিনয় চলছে যেন। 

এই হাসি-কান্নার সময় বোঝা যায় 'নানা ভাবের নানা সুর আছে'। 

এমনি ভাবে এক মাস কেটে গেল। কোন সমঝোতা নেই দুজনের, দীপ্ত অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেছে, বাঙ্গালী কম্যুনিটির সুধীজন-দের ডেকে মীমাংসা করতে চেয়েছে, কিন্তু ...না! ভবি ভোলার নয়...

পরমা কাউকেই তোয়াক্কা করে না আজ, তার বক্তব্য, “তার নিজের খেয়াল খুশি অন্যের হাতে থাকবে কেন? যাকে ভাল লাগবে তার কাছে যেতে বাধা কোথায়? এই অভিবাসী দেশের মানুষেরাও তো একজন স্বামীর সাথে বেশিদিন বাস করে না স্ত্রী। তাহলে সে কেন পারবে না? তার বেলা বাধা কেন... বাঙ্গালী  বলে?” 

সমাজ-সংসার সব কিছুর ঊর্ধ্বে যে মানুষের প্রেমময় মন, তার নাগাল যে পরমা পেয়েছে সেটা সে বুঝিয়ে দিল মধ্য চল্লিশে এসেও।

আবার সম্বিতে ফিরে এল দীপ্ত, “মা! করো না, কি জিগ্যেস করবে? কি এত ভাবো, তুমি? তোমার ছেলে... কাজেই যা মন চায় অনায়াসে জিগ্যেস করবে...কোন কি-ন্তু কিন্তু নয়। হ্যাঁ গো মা, তুমিই তো আমার একমাত্র সত্যিকারের বান্ধবী। চিরকালের থেকে যেও তোমার দীপুর কাছে। কোনদিন আমাকে ছেড়ে যেও না , মা। আমি তাহলে বড্ড অসহায় হয়ে পড়ব।” 

মা মুখ নীচু করে বিড়বিড় করতে করতে তাঁর আদরের দীপুর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন। দীপ্ত বিড়বিড়ের কাছে কান পেতে শুনতে চেষ্টা করলে- মায়ের চোখের গরম জল এসে পড়ে ওর কপালে। 

দীপ্তর মনে হল একটা পাথর কেউ ছুঁড়ে দিল ওর বুকে। একটা যন্ত্রণা বুক বেয়ে কন্ঠদেশ বেয়ে চোখে উঠে এল। 

বাইরে ঝড়ের তান্ডবলীলা দেখেছে দীপ্ত। ছুটে গিয়ে জানলা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ঘরের চার দেওয়ালের তান্ডবলীলা বন্ধ করার জন্য কি করবে? কি করা উচিত-সে তা ভেবে ভেবেও পারছে না। উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হবার দরুণ অফিসের প্রচন্ড কাজের চাপের চিন্তা করবে- না- বাড়ির ঝড় সামলাবে? যে দেখে তার তিল তিল করে গড়ে তোলা কষ্টের বাড়ি “শান্তিনীড়” সেই বলে- “এমন সপ্রতিভ সৌ্খিন মানুষ খুব একটা চোখে পড়ে না।”

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

চতুর্থ পর্ব : তৃ্তীয় অধ্যায়  (আগের সপ্তাহের পর)

এবার বাড়ি ফেরার পালা। ওরা বেরিয়ে এল। পেছন পেছন পরমা আর তুষার। দীপ্ত ব্রীত কে নিয়ে, পরমা ঋতু-কে নিয়ে আর ঠিক ওদের পেছন পেছন তুষারও এল ওদের বাড়ি। সেদিন আবার বাইরে ঝির ঝিরে বরফের আচ্ছাদনে ঢেকে গেছে রাস্তাঘাট।

দীপ্ত বাড়ীর দরজার চাবি খুলে ভেতরে ঢুকল। সাথে সাথে দুই ছেলেমেয়েও। দীপ্ত অবাক হয়ে ভাবলঃ তুষার বাড়ী না গিয়ে এখানে এল কেন-এত রাতে?

আশ্চর্য! সামনে ঝাঁকড়া পাইন গাছটার আড়ালে ওরা এতক্ষণ কি করছে? 

ঋতু ও ব্রীত ড্যাডিকে ডেকে জিগ্যেস করল “ড্যাডি, ওয়াট মামি ইজ ডুইং আউট সাইড? ওয়েদার ইস ভেরি লাউজি। ইটস স্নোইং, ড্যাড!”

শুধু গাছের পাতাগুলোর কাঁপুনই বুঝিয়ে দিচ্ছে এ প্লাস বি এর সহজ ক্যালকুলেশন, যেটা শুধু ছেলে মেয়েদের ড্যাড বুঝতে পারল। ছেলেমেয়ের বোঝার বয়স তখনও হয় নি।

অদ্ভুত! দীপ্ত মনে মনে খালি ভাবল, বড় করে ডুব না দিলে যেমন পুকুরের মাটি ছোঁয়া যায় না, সেই রকম একজন মানুষকে জানতে হলে -তার মনের অঙ্ক পড়তে হলে -অনেক তলায় নামতে হয়, অনেক ইকোয়েশন জানতে হয়। মানুষের জীবন সিনেমার দু ঘণ্টার গল্প নয় যে, হেলানো চেয়ারে বসে ঝালমুড়ি খেতে খেতে তা দেখে ফেলা যায়।

দীপ্ত তো খালি সময় গুনছে... কখন আসবে পরমা বাড়ির ভেতর। তাও ডাকার সাহস তার হল না। সে যে তার স্ত্রী পরমাকে অবিশ্বাস করে না। সংসার ভেঙ্গে যাক সে তো তা চায় না। তাই কিছু কিছু বুঝতে পারলেও প্রকাশ করতে চাইছে না। অবশেষে বাড়ির ভেতর এল পরমা আর তুষার ফিরে গেল তার নিজের ডেরায়।।

রাত্রে শোবার ঘরে পরমা এলে, দীপু একটু কড়া গলায় জিগেস করল, “এত কি কথা ছিল যে, এই ঠাণ্ডায় গাছের আড়ালে দুজনে কথা বলছিলে? ঘরে এসে কথা বলতে পারতে তো?”

পরমা এবার নিজ মূর্তি ধরে বললঃ, “দীপু! আমি তুষার-কে ভালবাসি তুমি যদি মেনে নাও তাহলে -ইটস ওকে- আর যদি না মেনে নাও তাহলে আমাকে তুষারের কাছে চলে যেতে হবে। আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না। সত্যি বলছি...তোমাকে আমার আর ভাল লাগছে না। আমি মুক্তি চাই। আমি একটা নতুন জীবন চাই আর আমি কিছুই চাই না। তুমি যদি এটাকে প্রেম বলো। তবে আমি বলবঃ আমি বিশ্বাস করি প্রেমই সর্বশ্রেষ্ঠ। এতে রাগারাগির কিছু নেই। 

তুমি যদি প্রশ্ন করো-এই বয়সে প্রেম করেছো। আমার উত্তর হবে 'YES” কারণ প্রেম করা কোনও দোষের ব্যাপার নয়, বুঝলে? প্রেমে মানুষ যে কোনও বয়সেই পড়তে পারে। 

কলকাতার বাংলা স্কুলে-কলেজে পড়াশুনা কাজেই বাংলার একটু দখল থাকা স্বাভাবিক, পরমার।

শোনো দীপ! আমাদের একটিই জীবন, এটিকে কেউ হেলায় ফেলায় নস্ট করে। কেউ বা এটিকে দুর্বিসহ বলে মনে করে। আবার কারো কাছে জীবন বড় অমূল্য সম্পদ। এই জীবন এক আমার কাছেই ভিন্ন নয় আমার কাছে এটি খুব সুন্দর। আজ আমি এই বর্তমান জীবনের রূপ, রস, গন্ধ-- বিভোর হয়ে আঁকড়ে ধরতে চলেছি যাতে পালিয়ে না যায়। 

আই ফীল হ্যাপিয়ার, আই সেড, আই ফীল মাচ হ্যাপিয়ার এ্যাণ্ড আই হ্যাভ গট হিম , নাও হোয়াট-এভার হ্যাপেন্ড-আই ডোন্ট কেয়ার ফর দ্যাট!!”

এমন দুর্জয় সাহসীর কথা ভাবা যায় না, একেবারেই না। কেউ বললে বিশ্বাস-ও করা যায় না।

পাশের বাড়ির মাইক পরমার সাথে একই যায়গায় কাজ করত। একদিন সে বলল দীপ্ত-কে যে, তুষার মেয়ে পেয়ে গেছে বলেছে- ওয়ারহাউসের সবাই-কে। দীপ্ত তখনও জানত না যে, সেই মেয়ে আর কেউ না...... তারই চল্লিশোর্ধ স্ত্রী পরমা! আর আজ সেই মাইকের কথাই সত্যি হতে চলেছে।

দীপ্ত-র সামনে সমস্ত পৃ্থিবীটা যেন দুলে উঠল। স্তব্ধ চরাচর জুড়ে কেবল জল পড়ার টুপটুপ শব্দ, কোথাও কেউ নেই। অসহ্য নির্জন চারিদিক। চিৎকার করে “মা” বলে কেঁদে উঠতে চাইছে তার মন।

এ কি শুনছে সে, যাকে সে অনেক স্বাধীনতা দিয়েছিল তার পরিণাম কি তাকে এইভাবে পেতে হবে? তাহলে নারী-স্বাধীনতার কি কোন -ই মূল্য নেই? সেইজন্যই স্বামীজী হয়ত বলেছিলেনঃ “নারী স্বাধীনতা ভাল- অত্যধিক স্বাধীনতা কিন্তু ভাল না। রসি ধরে থাকতে হয়, আলগা হতে দিতে নেই।”

সে রাগ সংবরণ করে ঠান্ডা মাথায় বললঃ, “পরমা! আমাদের যে দুটো ছেলেমেয়ে আছে, তাদের কথা চিন্তা করেছো? সমাজ-এর কথা চিন্তা করেছো? আমার ভালবাসার কথা চিন্তা করেছো? আমার ভালবাসায় তো কোন ঘাটতি ঘটে নি? তবে কেন......? 

এত কষ্ট করে এই বিশাল বাড়ি বানালাম কাদের জন্য, বলতে পারো তুমি? কি আমার দোষ? কিসের জন্য তুমি আমাদের এত সুন্দর একটা সংসার ভেঙ্গে তছনছ করতে চাইছো? প্লিজ ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করো। তুমি তো সেলফিশ নও, তুমি কি হাইপার -সেন্সিটিভ না ইনফেরিয়র কম্পলেক্সে ভুগছো? প্লিজ, চুপ করে থেকো না, আমার কাছে খুলে বলো। আজ আমাদের যদি সন্তান না থাকতো, তোমার সুখে আমি সুখী হতাম...কিন্তু ব্রীত, ঋতু? ওদের কথা ভাবছো না কেন?

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

চতুর্থ পর্ব : তৃ্তীয় অধ্যায়  (আগের সপ্তাহের পর)

দীপ্ত-র একনাগাড়ে কাজ থেকে একটু আরাম দরকার। ঠিক করল সবাই মিলে কোথাও বেড়িয়ে আসবে। পরমা সারপ্রাইজড পেতে খুব ভালবাসে। তাই সারপ্রাইজড দেবে বলে টিকিট কাটল প্লেনের। -ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ওয়াশিংটন ঘুরে নিউ ইর্কের স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখবে। আর সেই ফাঁকে দীপ্ত-র নিউ জার্সিতে মামাদের সাথে দেখা করে ফিরে আসবে। 

সব ব্যবস্থা করার পর পরমাকে বলাতে ভেবেছিল দীপ্ত যে, সে আনন্দে লাফিয়ে উঠবে আর তাকে আদরে আদরে ভরিয়ে তুলবে। সে তো পরমার ভালবাসা চায় শুধু। তা না করে পরমা কেমন যেন মনে হল একটু চিন্তান্বিতা। নিরালায় যে অন্যের জন্য প্রেমসাধনা করছে তার পরমা, তা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারল না সে। 

তাও মুখে অ্স্বাভাবিক হাসি খেলিয়ে বলল, “বাহ! বেশ তো! তবে আজকাল কাজের যা চাপ, এতদিন বাইরে থাকাটা কি ঠিক হবে?”

দীপ্ত বললঃ, “ধ্যুস! আমরা তো কোথাও যাই না, ছেলেমেয়েগুলোর-ও একটু ভাল লাগবে তাই না? এখন তো আমাদের ওদেরও দেখা উচিত, কি বলো? আর আমার তো পার্মানেন্ট কাজ। তোমার অত কষ্ট না করলেও চলবে। আর শোনো এবার এসে এই ওয়ারহাউসের কাজটা ছেড়ে দিও, প্লিজ। আমার না একদম ভাও লাগে না তুমি ওসব যায়গায় কাজ করো- বুঝলে?”

ওরা বেড়িয়ে পড়ল সবাই। তবে পরমা সেই আগের মতন সব কিছু জানার চেষ্টা থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলল যেন।

এই বেড়াতে যাবার সময় হঠাৎ একদিন পরমার গল্পের বই দেখতে দেখতে দীপ্ত একটা চিরকুট পায়, তাতে লেখা, 

“আমি খুব চিন্তায় দিন কাটাচ্ছি। তুমি যদি আমাকে বিয়ে না করো, তাহলে আমি আটলান্টার মেয়েটাকেই বিয়ে করব। তাড়াতাড়ি তোমাকে ডিসিশন নিতে হবে, কারণ আমার এই দেশ থেকে ডিপোর্ট-এর সময় এসে যাচ্ছে। আমার সময় খুব অল্প। যত তাড়াতাড়ি পারো আমাকে জানাও।

..ইতি তোমার (-) ড্যাস...”

চিরকুটের নীচে কারুর নাম নেই। নিজে নিজেই বিড়বিড় করল দীপ্ত। অন্য কারুর চিঠি হয়ত রাখা আছে।

সে আবার চিরকুট-টাকে সেই যায়গায় রেখে দিয়ে একটু গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। শ্বাস বন্ধ করে বসে থাকল কয়েক মুহূর্ত্ত। আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস ফেলল। আবার শ্বাস বন্ধ করল আবার ফেলল। পরমাকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দিল না সে।

এ চিঠি পরমার গল্পের বইতে কেন? কে হতে পারে? আর কাকেই বা লিখেছে? 

ধুস! এই বই বোধহয় অন্য কাউকে দিয়েছিল পরমা।তাই বোধহয়... ওর মনে পড়ল সেই “সাড়ে চুয়াত্তর” সিনেমার গল্প-টা। নিজের মনেই হেসে উঠল... সব আবার সুন্দর হয়ে উঠল দীপ্ত-র কাছে। 

ক্যালিফোর্ণিয়া ঘোরার পর পরমা কেমন যেন মনমরা হয়ে পড়ল, দীপ্তকে বলল যেঃ

''শোনো! এইবার আমরা ফিরে যাই। আমার কিছুই ভাল লাগছে না, জানি না কাজের ওখানে কি ব্যাপার? আমার আর কোথাও যাবার ইচ্ছে নেই।” 

ছেলেমেয়ে বলে উঠল, 'হোয়াট মামি, উই উইল গো, দ্যাটস ইট। ইউ মে গো ব্যাক।' 

কিন্তু কি আর করা- অত টাকার টিকিট নস্ট হবে, তাও ওদের যেতেই হল আর সব যায়গায়। এইবার ফিরে আসার পালা, আবার পরমার চোখমুখে খুশির হিরিক। আবার যেই কা সেই দীপ্ত-র কাজ আর কাজ। আর পরমার তুষারের কাছে 'ওভারটাইম'।

ও হেসে জবাব দিয়েছিল... গুড! দি গাই ইজ ডিপ্রেসেড ফ্রম লাস্ট ইয়ার এ্যান্ড নাও হি উইল বি রিল্যাক্সড।

বেড়িয়ে আসার ঠিক পরে পরেই এক অল্পবয়সী বিবাহিতের বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল দীপ্ত-দের সাথে তুষারের -ও। পরমা দীপ্তকে বললঃ

''তুমি ঋতু আর ব্রীত-কে নিয়ে আগে এগিয়ে যাও। আমার অফিসে একটা দরকারি কাগজ নিয়ে আসছি।'' 

দীপ্ত এগিয়ে গেল এবং আগেই পৌঁছে গেল, বেশ খানিক পরে পরমা আর তার প্রায় সাথে সাথেই তুষার হাজির তার গোবেচারা চেহারা 

দীপ্ত হঠাৎ লক্ষ্য করল তুষার পরমা-কে “তুমি” করে ডাকছে। বরাবর-ই 'পরমাদি' আর 'আপনি'-ই শুনে এসেছে। খাওয়া-দাওয়ার পর সবার অনুরোধে দীপ্ত আর পরমা একের পর এক গান গেয়ে চলে...

পরমাও ভাল গান গাইতে পারত...তাই সবার আবদারে সেই প্রথম দুলে দুলে গান শুরু করল...

“সখী, ভাবনা কাহারে বলে। সখী, যাতনা কাহারে বলে।

তোমরা যে বলো দিবস-রজনী 'ভালোবাসা ' ' ভালোবাসা'-

সখী, ভালোবাসা কারে কয়! সে কি কেবলই যাতনাময়...”

তাই একটু খটকা লাগল দীপ্ত-র—আবার নিজের মনকে শাসালঃ “কি হয়েছে কি তার, খালি খালি এইসব ভাবছে- তাহলে একেই কি বলে 'সন্দেহ'? আর সে জানে এই সন্দেহ পুরো সংসার ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়।”

(ক্রমশ)

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

চতুর্থ পর্ব : তৃ্তীয় অধ্যায়  (আগের সপ্তাহের পর)

ছেলেমেয়ে  স্কুলে আর দীপ্ত-কে তো আজ এখান কাল ওখান কাজের তাগিদে বিভিন্ন শহরে যেতে হয়। সে যে পরমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে। যেখানে গভীর ভালবাসা সেখানে অবিশ্বাস বাসা বাঁধতে পারে না, এই মটোতে চলত দীপ্ত। 

তবে দীপ্ত লক্ষ্য করছে পরমাকে ভাল কথা বললেও তার কথা ইদানিং পাত্তা দেয় না। সাজ পোশাকও যেন অস্বাভাবিক করে করছে আজকাল। সংসার ছাড়া শরীর সম্পর্কেও কেমন যেন বড্ড বেশি সচেতন। 

অফিস থেকে ফিরে রান্না করে পরমার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফেরে সে, জিগ্যেস করলে বলে-

~ওয়ারহাউস-এ “-ওভারটাইম”-করতে হয় আজকাল। কাজেই বাড়ী ফিরতে দেরী হলে চিন্তা কোরো না, প্লিজ। 

বাড়িতে যে দুটো টিনেজ ছেলেমেয়ে আছে সে চিন্তা তখন মায়ের কাছে নগন্য ছিল। যদি তাকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার সপাট উত্তরঃ 

-ছেলে-মেয়ে শুধু আমার না, তোমার -ও। আর এটা আমেরিকা। তুমি যা বলবে আমি মাথা পেতে সেটা মেনে নেব -তা চলবে না। বুঝলে? 

কোনদিন দীপ্ত সিনেমা দেখে নি, তাই মানুষের হাবভাব সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিল না? না, নিজেই সে-ই কম্পোজিশনে যেতে চাইত না? অথবা সত্যিই সে তার নিজের বোধবুদ্ধি চেতনাকে একটা গন্ডির বাইরে নিয়ে যেতে পারেনি? যাদের টিনেজার ছেলেমেয়ে ঘরে সেইক্ষেত্রে মা পরমা খারাপ কাজ করতে পারে না, এই সরল কেমিস্ট্রি-তে সে চলত। 

ভবিষ্যৎ কেহ দেখতে পারে না। আজ, এই মুহূর্তে যা ঘটছে, পরমুহূর্তে তার কি রিয়াকশন কেউ বলতে পারে না। দার্শনিকেরা বলেছেন, জীবন অনিত্য। সকলেই সেটা জানে। কিন্তু  ভুলে থাকে। জীবনের অনিত্যতার বিরূদ্ধেই জীবনের সংগ্রাম। নিশ্চিত সত্যের বিরূদ্ধে সংগ্রাম চলতে পারে, কিন্তু সত্য যে অপরিবর্তনীয়। কে তা লঙ্ঘন করবে? 

পরমার এই “ওভারটাইম”-এর বহর দীপ্তর মনে সন্দেহ বাসা বাঁধলেও, সে সেই জালে আটকে পড়তে চাইল না। নিজের মনকে খালি বোঝাত, এ হতে পারে না, তার আদরের পরমাকে সে সব স্বাধীনতা দিয়েছে, তাকে সুন্দর জীবন দিয়েছে, সে বেইমানি করবে আজ এই মধ্য চল্লিশ বছরে এসে? নাঃ নাঃ --ছিঃ ছিঃ! সে কি সব ভাবছে আবোলতাবোল। দীপ্ত কি জানত না যে, চল্লিশে- ই চালশে হয় মানুষের। 

একদিন ছোট মেয়ে ঋতু-কে সাঁতার ক্লাশ থেকে আনবার জন্য জোর করেই পরমা বেড়িয়ে গেল ঠিক সন্ধ্যের মুখে। রাত্রি সাড়ে নয়টার সময় ঋতু তার ড্যাডি-কে ফোন করে যে, মামি এখনো আসে নি তাকে নিতে। উৎকন্ঠিত ড্যাড তখনই বড় ছেলে ব্রীত-কে নিয়ে স্যুইমিং ক্লাবে হাজির হয় ঋতু-কে বাড়ি আনার জন্য। তখন মনে একবারও উঁকি মারে নি যে, কেন পরমা দেরী করলো ঋতু-কে পিক আপ করতে। দীপ্ত যখন সাঁতার স্কুলের কাছে- হঠাৎ দেখে পরমা স্কুলের কাছের এ্যপার্টমেন্ট থেকে বেরুচ্ছে। মায়ের খেয়াল-ই নেই যে, সাঁতার শেষে সবাই বাড়ি চলে গেলে একা একা তার ছোট্ট মেয়ে কি করবে? কোন বিপদ আপদে আটকে যেতে পারে।

সে তখন তার তুষারের সাথে “ওভারটাইম” করছে নিঃস্তব্দ রাতের মায়াময় ঘরে। হয়ত, দুজনে মিলেমিশে একাকার হয়েছিল অন্ধকার ঘরে যেখানে বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না। অন্ধকার তাদের সহায়তা করেছিল। জানলায় ফাঁক করা পর্দার মাঝ থেকে হাওয়ায় দোলা দুটো গাছের ছায়া এসে পড়েছিল শুধু তাদের শরীরে, সেই ছায়ারা সরে গেলে পরমার হুঁশ ফিরে আসে। মনে পড়ে একলা হয়ে যাওয়া নিজের মেয়ের কথা। মনে পড়ে সময়ের কথা। মনে পড়ে ক্ষণিক আমোদ-এর কথা। 

ভালবাসার মদিরা ছেড়ে যদিও তার যেতে মন চাইছিল না, তবুও তাকে যেতে হল। যেখানে যৌন আকর্ষণ সেখানে স্বামী, সংসার, ছেলে-মেয়ে সব ঠুনকো। বয়স হয়ত তখন কোন বাধা সৃষ্টি করে না।

ব্রীত আর ড্যাডি খালি জানল পরমা কারুর বাড়িতে গেছিল। কিন্তু দুজনেই চুপচাপ। ঋতু -কে পিক আপ করে বাড়ী এনে ডিনার সারে তারা। তারপর, রাতে দীপ্ত বিছানায় পরমা এলে চাপা গলায় জিগ্যেস করল -

-তুমি কোথায় ছিলে আজকে? ঋতু তোমাকে ফোন করেও পায় নি তখন ভয় পেয়ে আমাকে ফোন করেছিল। তাই আমি ওকে পিক আপ করতে গেছিলাম। আর ভাগ্যিস গেছিলাম , তাই...ই...তো ...আর বলতে পারল না বাকী কথাগুলো। নিজের আকছে নিজেকেই কেমন যেন মলিন করতে চাইল না। তোমার দেরি হলে আমাকে তো জানাতে পারতে? সবাই বাড়ি চলে গেছিল। একলা মেয়ে ...নাঃ আর ভাবতে পারছি ন। যদি কিছু অঘটন ঘটত......

পরমা দেখল এইবার এই লুকোচুরি আর চলবে না, তাও সাহস এনে বলল, 

আমি আমার কাজের এক মেয়ে বন্ধুর বাড়ি গেছিলাম, গো। কাজের কথা আলোচনা করতে করতে দেরি হয়েছিল। মাঝে মাঝেই হয়ত এরকম দেরি হবে তার জন্য চিন্তা কোরো না- প্লিজ!মাই সুইট হার্ট। আই অ্যাম রিয়্যালি রিয়্যালি ভেরি সরি সোনা...বলে দীপুর সারা শরীর ভালবাসায় ভরিয়ে দিল। 

-আমাকে ভুল বুঝো না প্লীজ।

ঝামেলাহীণ দীপ্ত পরম শান্তিতে পরমার আদরে তার বুকে মুখ রেখে ঘুমিয়ে পড়ল অনায়াসে। 

কিন্তু দোটানায় পরা পরমার চোখে ঘুম নেই। খালি তার মনে কিসের যেন একটা শিহরণ খেলতে লাগল। স্বামীর ভালবাসা তার কাছে করলার মত তেতো লাগে আজকাল। শুয়ে শুয়ে চোখ খুলে মনে মনে গেয়ে ওঠে...

“কাছে তার যাই যদি কত যেন পায় নিধি

তবু হরষের হাসি ফুটে ফুটে ফুটে না...”

মনে পড়ল কোথায় যেন পড়েছিল...প্রয়াত স্টীভ জোবস তাঁর এক ভাষণে বলেছিলেন, 

“ স্টে হাঙরি, স্টে ফুলিশ।”

এই নির্বোধ ও ক্ষুধার্ত থাকার নিহিতার্থ বড় গভীর। বোকা থাকা মানে নিজেকে সবজান্তা না ভাবা। আর জীবনক্ষু্ধার অর্থ - নূতন নূতন ভাবে জীবনকে গড়ে তোলা, জীবনকে উজ্জিবিত করা।

বইয়ের পাতা থেকে নেমে আসুক না বাস্তব জীবনে। তাহলে শুধু বই-তেই বা লেখা কেন?

দীপ্ত-কে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে জানলার কাছে গিয়ে দূরে পাইন গাছটার দিকে চেয়ে বিড় বিড় করে বলে উঠলঃ

-এতগুলো শীতের ঋতু কেটে গেল এই বিছানায়। এখনও আমি সেই একজনের বধূ, দুই সন্তানের মা, আর ...আর...

জানি এসব-ই আমার এক নিরাকার ভাবনা। ভালভাবেই জানি এটা যে, আমি আছি সোনার খাঁচায়। যে খাঁচার খিড়কি নেই, দুয়ার নেই। তবু আমি উড়ে যেতে পারছি না। কিন্তু কেন? এই এতদিনের একঘেয়েমি সংসারের সব কর্ম, পুষ্টি, তুষ্টি দ্রবীভূত হয়ে একফোঁটা গরম জলের আকার নিয়েছে কদিনের চেনা বেহালাতে সেই কাহারবার নিনাদ।

তবুও নাটক করতে হয়। দু নৌকোয় পা দিয়ে যে চলা যায় না, পরমা সেটা জানত ভালোভাবেই। তাই দোটানায় পড়ে সে হিমশিম খাচ্ছে।

এইভাবে লুকোচুরি খেলা চলতে লাগল। আর দীপ্ত তার নিজের কাজের মধ্যে ডুবে রইল পরমার ওপরে সব ভার দিয়ে।

(ক্রমশ)

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

চতুর্থ পর্ব : তৃ্তীয় অধ্যায়  (আগের সপ্তাহের পর)

ব্রীত ও ঋতু দুই ছেলেমেয়ে তুষার কাকুকে পেয়ে খুব খুশি, বিশেষ করে ঋতু। উইক-এন্ডে না আসলে মা-কে বিরক্ত করে ঋতু। ড্যাডি যেইটা না বলে মেয়ের ভাল-র জন্য, তুষার কাকু সেইটাই লুকিয়ে এনে দেয় ঋতু-কে। ব্রীত তখন ষোল বছরের টিনেজার, কাজেই সে অত পাত্তা দেয় না তুষারকাকুকে। সে একটু ড্যাডি ভক্ত। নিজেকে নিয়েই থাকতে ভালবাসে তার ড্যাডির মতন। 

প্রবাদ আছে, মেয়েরা বাবা ভক্ত হয়, ঋতুও সেই ফর্মূলা থেকে বাদ যায় না, কিন্তু... ড্যাডি টিন এজের ঔদ্ধত্য-কে অপছন্দ করে, সেটা ঋতু আর তার মায়ের কাছে লাগে অনধিকার চর্চা। তুষার কাকুর সমর্থন-কে সে দিব্যজ্ঞানে ভালবাসে মায়েরই আস্কারাতে।

দেশ থেকে এইচ ওয়ান ভিসা(টেম্পোরারী) নিয়ে আসা সেই পঁয়ত্রিশ বছরের যুবার কাজের মেয়াদ যখন প্রায় শেষের দিকে... তখন, সে মরিয়া হয়ে উঠল। আমেরিকার আবহাওয়া-কে ছেড়ে সে দেশে ফিরে যেতে চাইল না। এখানকার বাঙ্গালী ও ভারতীয় সমাজের সদ্য কিংবা স্বল্পদিন বিবাহিতাদের ঘরের কোণে উঁকি ঝুঁকি দিতে শুরু করে- তার ভালমানুষি চেহারা নিয়ে। কেউ কেউ তার ট্র্যাপে পড়লেও বাড়ির কর্তার কড়া সাবধানবাণীতে তার প্রচেষ্টা 'দ' মেরে যায়। 

সেইসব যায়গা থেকে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে-- সে সব গল্প করল পরমার কাছে, কি ভাবে পার্মানেণ্ট বসবাসের ছাড়পত্র পাওয়া যায়। পরমা তুষার-কে বোঝায় এইভাবেঃ যদি সে আমেরিকার কোন সিটিজেন মেয়েকে বিয়ে করে, তাহলে সে পার্মানেণ্ট একটা বসবাসের ছাড়পত্র পেতে পারে। তুষার খোঁজ করতে শুরু করল। 

অফিসের সাদা মেয়েদের -ও বাদ দিল না সে। কিন্তু কেন যে সাদা মেয়েরা ওর ভালোমানুষি চেহারাকে পাত্তা দিল না, তা জানা গেল না।

এদিকে তুষার কাকু ঋতু আর তার মা-কে নিয়ে যায়- যেখানে তারা যেতে ভালবাসে। দীপ্ত এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত তুষার আসাতে। সে তার লেখা আর কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারে। পরমা আর তাকে বিরক্ত করে না আগের মত। উইকেন্ড মানেই তো এর বাড়ি ওর বাড়ি কোনো না কোনো ব্যাপারে পার্টি, নেহাত মল-এ ঘোরা। 

ছলে বলে কৌশলে প্রায়ই আসে তুষার এই বাড়িতে। মা তখন দেশে কাজেই পরমা ও তুষার আস্তে আস্তে পরস্পরের কাছাকাছি কি এসে গেছিল দীপ্ত-এর অজ্ঞাতে? 

ঘনিষ্ঠতার বাড়াবাড়িটা   দীপ্ত পরে আঁচ করেছিল একদিন অসময়ে অফিস থেকে এসে পড়ায়... 

চারিদিকে মেঘলা আবহাওয়া..ঝিমিঝিমি বৃষ্টি ... ঘরের মধ্যে কি রকম গুমোট....শুধু বাতাস চারিদিকে কেমন মধুময়। জানলার বন্ধ মিনি ব্লাইন্ড ও পর্দাগুলো ঘরকে যেন একটু বেশি কোজি(Cozy) করে রেখেছে। ঘরে সাইড ল্যাম্পের মৃদু আলোছায়ার নাচ যেন দীপ্ত-র জীবনকে পরিহাস করছিল। তখনও গান বেজে চলেছিল স্টিরিও-তে...

কে প্রথম কাছে এসেছি/কে প্রথম চেয়ে দেখেছি...

পরমা আর তুষার ডাইনিং রুমের টেবিলে-সামনাসামনি বসে … ঘরে কে ঢুকলো সে দিকে তাদের খেয়াল নেই...তারা আত্মহারা ...আআ? 

তারপর বড় দ্রুত সব কিছু পালটে যেতে থাকে। আকাশে ঘন মেঘ জমে। দীপ্ত চুপচাপ মিডিয়া রুমের জানলায় কাছে এসে দাঁড়ায়। 

নিজেকে প্রশ্ন করে...'সন্দেহ”?...না ...না...এ হতে পারে না...তুষার অনেক ছোট পরমার চেয়ে। কোথায় যেন পড়েছিল...”পরকীয়া”! মনে হয় তুষার এই অল্প দিনে তার সব কিছু দখল করে নিয়েছে। সে তো কোনদিন ও আজকের সত্যিটা কি জানতে পারবে?

হঠাত পরমা দেখে দোতলার সিঁড়িতে আলো জ্বলছে...তুষার-কে জিগেস করলো “ কে এলো- বলতো? ঋতু আর ব্রীত এলে তো আমার কাছে আগে আসে...তাহলে? দেখো! আমরা এত মশগুল গল্পে যে, কে ঢুকলো খেয়াল-ই করি নি। দাঁড়াও দেখে আসি.......

সিঁড়ি দিয়ে দুজনেই ওপরে উঠে দেখে মিডিয়া রুমে জানলার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দীপ্ত...

-একি ? কখন এলে? আজ যে বড় তাড়াতাড়ি এলে? পরমার প্রশ্ন।

-অনেকক্ষণ এসেছি...খেয়াল করো নি। দেখলাম তোমরা দুজনে কোন গুরুতর আলোচনায় ব্যস্ত ছিলে...

পেছনে নিঃশব্দ পায়ে এসে দাঁড়ালো তুষার। 

~ আমি আপনার কাছে অযথা ক্ষমা চাইবো না। কারণ, ক্ষমা হচ্ছে এমন একটা শব্দ যা উচ্চারণ করে পৃ্থিবীর খুব ছোট ছোট অন্যায়ের সমাধান হয়।

দীপ্ত কথা বললো না। ঘাড়ও ঘোরালো না। গলায় কেমন একটা কষ্টের বাষ্প ঠেলে ঠেলে উঠতে চায়।শিশুর মতো চোখ ফেটে জল গড়িয়ে নামছে গালে। সেই দৃশ্য পরমা আর তুষারকে দেখাতে চায় না সে। তাই পাথরের মতো জানলার কাঁচে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল। 

তুষার তখন নরম গলায় বললঃ

-দাদা! আমি বাড়ি চলে যাবার আগে একটিবারের জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিন।

_ না না ...ঠিক আছে। ক্ষমার কথা বলছো কেন? পরমার সাথে কাজ করো কাজেই অনেক কথা থাকতেই পারে। এসো। ওয়েদার আজ ভালো না। সাবধানে যেও। আবার এসো। 

নিজেকে সামলে নিয়ে...পরমাকে বললঃ

-চা করো। খাই সবাই মিলে। সাথে সাথে তুষার বললঃ

-না দাদা। আজ থাক। আমি না হয় আবার একদিন এসে খেয়ে যাবো আপনাদের সাথে।

তুষার হনহন করে বেরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।

পরমা তখন দীপ্তকে বললোঃ 

-ছিঃ! সত্যি তুমি কি করলে আজ? হ্যাঁ-কি ভাবলো বলো তো তুষার। 

-আচ্ছা, আমার অন্যায় হয়ে গেছে । চা করো। আমি খুব টায়ার্ড আজ। তাই হয়ত না জেনেশুনে এইরকম ব্যবহার করে ফেলেছি। হেসে উঠল দীপ্ত, ...হা হা হা...। জানো তো তোমাকে ক্ষেপাতে না অনেক মজা লাগে। যারা অল্পেতে ক্ষেপে যায়, তাদের ক্ষেপাতে মজা লাগারই কথা। 

আসলে আমি একটা মজা করতে গেছিলাম।

-আর কোনদিন আসবে ভাবছো এই বাড়িতে? এই ভিনদেশে আমাদের নিজের দাদা-দিদির মতো দেখে বলেই না আসে। শোনো, পৃথিবীতে দুই টাইপের মানুষ আছে। এক টাইপ হচ্ছে নেচারেল। আরেকটা টাইপ হচ্ছে সারাক্ষণ ভাব ধরে থাকে। যেমন তুমি। খামোখা ! একটা কবি কবি ভাব। রেগো না আবার। যাই হোক, আমি চা করতে যাচ্ছি। ড্রেস চেঞ্জ করে কুইক এসো। ওই দেখো ঋতু আর ব্রীত ও এসে গেল স্কুল থেকে। চলো সবাই এক সাথে আজ কফি আর ফ্রায়েড ফেটুসিনি খাই।

খাবার টেবিলে ঋতু আর ব্রীত একটু নিজেদের মধ্যে খুনশুটি করে যে যার ঘরে চলে গেল। তখন গলা নামিয়ে পরমা দীপ্ত-র চোখে চোখ রেখে জিগ্যেস করলোঃ 

-তোমার চোখে জল দেখেছিলাম আমি, কারণ টা কি? বলবে?

- “সে কি কেবলই চোখের জল? সে কি কেবলই দুখের শ্বাস?

লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ।”

থাক আর গান গাইতে হবে না তোমায়। বড্ড বেশী সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাচ্ছো আজকাল। দীপ্ত এদিক ওদিক তাকিয়ে খপ করে পরমাকে কাছে টেনে নিল একে্বারে বুকের মাঝে...

-আমাকে ছেড়ে যাবে না তো কোনোদিন? রুমু, অনন্তে অধর রাখো, দাও... চুমু দাও। বদলে... কিছু  নাও।

-এই শোনো! ওসব বাজে কথা রাখো। সন্ধ্যে হয়ে গেল। স্নান সেরে নাও।

এইভাবে আবার দিন চলতে শুরু হল।

(ক্রমশ)

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

চতুর্থ পর্ব : তৃ্তীয় অধ্যায় : পরমা (আগের সপ্তাহের পর)

সোনালি দিনগুলো শীতের পাখির মতো বিদায় নিতে শুরু করল। খালি কাজ আর কাজ। সংসারের হাল শক্ত করে ধরতে বলল পরমাকে। বড় ছেলে এখন ১৪ বছরে পা দিয়েছে সে তার নিজের জগতে থাকে আর ঋতু থাকে তার জগতে। 

পরমা নিজের চাকুরিক্ষেত্রে ইলেকট্রিক সাপ্লাই ওয়ারহাউসের কাজে ব্যস্ত। একদিন সেখানে আলাপ হয় এক ৩৫ বছরের বাঙ্গালী যুবকের সাথে। একদিন পরমাদির পেছন পেছন এসে হাজির হল তার বাড়িতে। পরমাই তাকে নিয়ে আসে, দীপ্ত-র সাথে আলাপ করাতে। সদ্য এসেছে দেশ থেকে। তাই তুষারও খুব খুশী কারণ এই অভিবাসে বাঙ্গালীর সাথে আলাপ মানে তো অনেকখানি।

-দীপ্ত! এ হল তুষার ,আমাদের অফিসে নতুন কাজ-এ জয়েন করেছে। সদ্য দেশ থেকে এসেছে।

তুষারের পায়ে হা্ত দিয়ে প্রণাম করতে গেলে দীপ্ত-র আপন করা স্বভাব মতই তুষারকে বুকে জড়িয়ে ধরল।

-পরমাদি আপনি তো খুব লাকি এইরকম হ্যাজবেন্ড পেয়েছেন। পরমাদির কাছেই শুনেছি আপনি অনেক পড়েন- লেখেন, অনেক সম্মান-ও পেয়েছেন। সত্যি আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করছি আপনাদের সাথে আলাপ হয়ে।

-তার মানে আমাকে পছন্দ হয়নি, তাই না তুষার?-পরমার প্রশ্ন।

-কি মনে হয় আপনার? পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের দেখামাত্র একটা ম্যাজিক মোমেন্ট তৈ্রী হয়। সেই হলেন আপনি, দাদা, আর কিডস-রা।

-আচ্ছা, আমাদের প্রসঙ্গ তোলা থাক। আপনার কথা বলুন।

-'আপনি' না, দাদা। আমাকে ছোট ভাই-এর মতন মনে করুন। আমি আপনাদের চেয়ে অনেক ছোট। 

তাড়াতাড়ি পরমা বলে উঠল-

-হ্য্যাঁ হ্যাঁ! ওকে 'তুমি' বলো । তুষার আমার চেয়ে দশ বছরের ছোট, জানো তো?

-ওহ! তাই নাকি? তাহলে তো বেশ ছোট।

বয়সে পরমার চেয়ে দশ বছরের ছোট তুষার-কে ভাই জ্ঞানে মেনে নিল সহজ সরল দীপ্ত। তাকে তার বাড়িতে অবাধ যাতায়াতের কথা জানিয়ে দিল। এই অভিবাসী দেশে তারাও একটা অবলম্বন পেল সেই যুবকের সাথে।

-লাঞ্চ ব্রেকে গল্প হয় দুজনের। পরমার আদেশে তুষারের 'আপনি' -'তুমি' তে এসে গেছে। তুষার বলে পরমাকেঃ

-জানো তো? এতদিন বইয়ের পাতায় পড়েছি। কখনো কখনো দুজন মানুষের মধ্যে দেখা হলেই মনের মধ্যে ক্লিক করে যায়। বিজ্ঞানে এর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। কারো কারো বেলায় এটা হয়। 

-সেদিন যেন কি বুকিশ বলছিলে? সেই বুকিশ কথাটা কার ক্ষেত্রে বাস্তব হয়েছে-তুষার? আমাকে বলবে না? বিয়ের ব্যাপার স্যাপারে কি?

-বলব, নিশ্চয়-ই বলব। আমার কথা যদি স্পষ্ট করে বলি তাহলে এটাই বলতে হবে মানুষে মা্নুষে সম্পর্কের ব্যাপারে আমার একদম আস্থা ছিল না। এই ধরো গতকাল পর্য্যন্ত। বলে একটু তাকাল পরমার দিকে। 

একটা ডিস্টার্বড ফ্যামিলিতে বড় হয়েছি তো। ডিস্টার্বড ফ্যামিলিতে বড় হলে কি হয়। বাবা-মার মধ্যে মিল দেখতে পাওয়া যায় না। দেখা যায় শুধু হৈ চৈ ঝগড়া। সেইসব আনহ্যাপি ফ্যামিলির ছেলেমেয়েরা নার্ভাস হয়, ডিপ্রেসেড হয়। 

পরমা কেমন যেন নিজের সঙ্গে মিলিয়ে নিল তুষারের কথাগুলো। আজকাল দীপ্ত-র কিছু যেন ভাল লাগে না। বড্ড তাড়াতাড়ি যেন বুড়িয়ে যাচ্ছে। কিছু বললেই বলে-বয়স তো কম হল না।

তাড়াতাড়ি মনটাকে ঠিক করে বল্লঃ

-ম্যান অ্যান্ড উইমেন রিলেশনশিপটা তখন তাদের কাছে ফালতু মনে হয়, এই তো।

-একদম ঠিক আমার মনের কথা বলে দিলে, পরমাদি। তখন বিয়ে -টিয়ের ব্যাপার তো আরো দূরের কথা। আমার বেলাতেও তাই হয়েছিল। 

হঠাত দেখে পরমা কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল...

-পরমাদি, কি হল? তুমি হ্যাপি না? দাদাতো খুব ভাল মনে হল।

-তুষার! কি পেয়েছি আর কি পেলাম না তার হিসেব কষতে বসলে বুঝি বা জীবনের অনেকগুলো দিন এগিয়ে আসবে। তবে হ্যাঁ! শাপে বর হয়েছে। প্রথম জীবনের 'আমরা' - খুব এনজয় করেছি। আমি তো সত্যি কোনদিন ভাবি ই নি যে, এই আমেরিকায় স্থায়ী বাসিন্দা হতে পারব। তার জন্য তোমার দাদাকে এপ্রিসিয়েট না করা পাপ হবে। আমাদের এই মধ্য বয়সে সে এখন নিজের কেরিয়ার আর কিডস-দের দেখভাল ছাড়া আর কিছু জানে না। আর আমি চাই এখানকার মানুষদের মতন, ফ্রী লাইফ, ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেছে এখন, তারা তাদের মতন করে থাক না, আমরা এনজয় করি লাইফ। তা তোমার দাদা শুনবে কি?

তুষার কি বলবে-উত্তর খুঁজে পেল না। খালি বল্লঃ 

-পরমাদি! তোমরা তো তোমাদের মতই আছো...তাও একথা বলছো কেন?

পরমা হাতের পার্স খুলে মেক আপ বক্স বার করে ছোট্ট আয়নায় মুখটা একটু দেখে নিল তারপর কপালের সামনে পড়া খুচরো চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দিলো।

(এরপর পরের সপ্তাহের)

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

চতুর্থ পর্ব : তৃ্তীয় অধ্যায় : পরমা

মা -এর চেষ্টায় এবার তার জীবনে যোগ হলো আরেক জীবন। বহতা নদীর মতন কুলুকুলু করে বয়ে চলল সেই নদী। এই নদীর নাম পরমা।

সল্টলেকের মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে 'পরমা'- তেইশ বছর বয়সে তার বাবাকে হারায়। কলেজের গন্ডি পেরিয়ে গান -টান করে সময় কাটায়। মা চিন্তা করলেন এবার মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলে ভাল হ্য় কারণ, বাবা নেই। তাঁর অবর্তমানে দাদাদের সংসারে সেই মেয়ের কি অবস্থা হবে? মেয়ে তাঁর সুন্দরীও নয় বা পড়াশুনায় ডাকাবুকো-ও নয় যে, বাড়ি থেকে কেউ সেধে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। তাই তিনি উঠে পড়ে লেগে পড়লেন মেয়ের বিয়ের জন্য। অনেক যায়গায় পাত্রের খোঁজ চলতে থাকল। কিছুদিন পরে আশ্চর্য্যভাবে পেয়েও গেলেন হাতের কাছে উপযুক্ত জামাই -ঘটকালি করেন হবু পাত্রের দাদু। 

প্রথম দিকে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বেশ বড় মাপের, কারণ দীপ্ত-ই ছিল বড় নাতি। বেশ কিছু মেয়েও দেখতে গেলেন সদলবলে। কিন্তু সুন্দরী মেয়ে(দীপ্ত-র পছন্দ ফর্সা মেয়ে) আর পাওয়া গেল না।

মায়ের বিদেশে থাকা আদরের দীপু-কে দেখাশুনা করবে পরমা। আর দীপ্ততো কাউকে কষ্ট দিতে জানে না, কাজেই পরমাও ভাল থাকবে এই সল্যুশনে বিয়ে স্থির হয়েছিল। মায়ের শান্তি দুটিতে ভালই থাকবে। 

গতস্য শোচনানাস্তি- করলেন মা মৃদুলা দেবি। এগিয়ে চলল জীবন। জীবন তো থেমে থাকে না। দীপ্ত ভেবেছিল বন্যার প্লাবনে দ্রুত অপসারিত হয়ে যাচ্ছে তার সব আশা, ভালবাসা, স্বপ্ন।

বিদেশ থেকে এসে গুরুজনদের পছন্দ করা মেয়েকেই বিনা দ্বি্ধায় বরণ করে নিল দীপ্ত। তাকে তার সাধারণ জীবন থেকে সুন্দর একটা মধুময় জীবন দিল । দীপ্ত ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে মা-এর দুঃসহ ব্যথার জীবন। তাই, সে কোন মেয়েকেই কষ্ট দিতে চায় না। সেই ছোটখাটো মেয়েকে নিয়ে সে আবার নতুন করে স্বপ্নের জাল বুনল।

বিয়ে করে মায়ের কাছে রেখে তাড়াতাড়ি আমেরিকায় চলে আসতে বাধ্য হল-দীপ্ত- পরমার সেখানে পাকাপাকি আসার ব্যবস্থা করতে। হয়েও গেল খুব তাড়াতাড়ি কারণ, সে ছিল গ্রীনকার্ড হোল্ডার। হুশ করে একদিন এসে পড়ল সেই মেয়ে পনের দিনের মাথায়... সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করে এই সুদূর মার্কিণে। শুরু হল মধুচন্দ্রিকা, শুরু হল বাতাসে ভর করে চলার। আনন্দে ভেসে বেড়াতে লাগল দুজনে। যেন দুই মুক্ত প্রজাপতি। দিন কেটে বছর আসে- তারা টের পায় না। ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে সাজিয়ে ফেলল তারা সুখের এক একটা আমেজ।

আস্তে আস্তে তাদের জীবনে আরও দুজন অতিথি-র আগমন হল নিঃশব্দে। ফুটফুটে ব্রীত আর মিস্টি মেয়ে ঋতু।

দুজনের মা-রাই এসে ঘুরে গেলেন। দেখে গেলেন তাদের সুখের সংসার। 

বেশ ভালভাবেই আনন্দে হৈ-হুল্লোর করে কেটে যাচ্ছে চারজনের সংসার। নতুন দো-তলা বাড়িতে উঠে এল তারা, মনের মতন করে সাজালো সেই বাড়ি। নাম রাখলো “শান্তিনিকেতন”। কয়েকজন বাঙ্গালীর সাথে আলাপ হল। 

দীপ্ত নিজের লেখা আর কাজের ব্যস্ততা নিয়ে ক্রমশঃ নাজেহাল হয়ে পড়ল। সংসারের হাল ধরতে হল পরমা-কে। সে আরো পাঁচটা মায়েদের মতন ছেলে মেয়ের পড়াশুনা এইসবেতে নিজেকে ব্যস্ত করে রাখল। গাড়ি চালানোটাও শিখে নিল দীপ্ত-র তত্ত্বাবধানে। কারণ, এই ভিনদেশে সবাই বলে গাড়ি চালাতে না পারলে, খোঁড়া হয়ে থাকতে হয়। 

ছেলে মেয়ে স্কুলে যাওয়ার সাথে সাথেই সাদাসিধে পরমা এখানকার পশ্চিমী আবহাওয়ায় নিজেকে বদলে ফেলল খুব তাড়াতাড়ি।

দেশের পারিবারিক গন্ডির মধ্যে থাকা সেই সাধারণ মেয়ে একেবারে উন্মুক্ত স্বর্গের ঠিকানা খুঁজে পেল। তার মধ্যবিত্ত জীবনের আদব- কায়দা ও কালচারকে সে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল অল্পদিন পরেই। মিশে গেল বিদেশী পাঁচমেশালি আবহাওয়ায়। তুড়ি মেরে বাংলাকে শিকেয় তুলে দিল, ইংলিশ কে মেনে নিল তার মাতৃভাষা, তার সংস্কার। 

আলাপ হল বেশ কিছু চাকুরীরতা মহিলাদের সাথে, তখন সে ভাবল, সেই বা কেন এই ঘর সংসারের মধ্যে নিজেকে বন্দী রাখবে? সেও তো সোনার হরিণের খোঁজ করতে পারে। একটু এদিক ওদিক চাকরীর ব্যবস্থা করলে তো সংসারের -ও বাড়তি পয়সা হয়। যেই ভাবা সেই কাজ। জুটিয়ে ফেলল একটা কাজ ইলিক্ট্রিক সাপ্লাই ওয়ারহাউসে- যেখানে দীপ্ত-র ছিল ঘোরতর আপত্তি। 

কিন্তু পরমা তখন পশ্চিমী আবহাওয়ায় নিজেকে খানিকটা গুছিয়ে নিয়েছে। দীপ্তকে বোঝালোঃ “ ছেলেমেয়েকে স্কুলে দিয়ে আমি না হয় কাজে যাব, প্লিজ না কোরো না। বাড়িতে তো সারাদিন বোর ফিল করি।”

আজকাল সে তার কথায় বাংলার চেয়ে ইংলিশ ব্যবহার পছন্দ করে।

তাও দীপ্ত বললঃ কি দরকার এসব জায়গায় কাজ করে? বরঞ্চ পড়াশুনা করে একটা ভাল জায়গায় কাজ করো...আমার আপত্তি নেই। আর তোমার তো বি এ ডিগ্রী আছে, কাজেই আরো কিছু ক্রেডিট নিয়ে নিলে একটা সফিসটিকেটেড জব পেয়ে যাবে। তাই করো প্লিজ।

-না, আমি আর পড়তে চাই না। সংসার সামলে কি আর পড়াশুনা হয়? তা ছাড়া অনেকদিন হল পড়াশুনার সাথে টাচ-ও নেই।

-কি বলছ? তাহলে এখানে যে সব মহিলারা বাচ্চা সামলে, সংসার সামলে হাইয়ার স্টাডিজ করছে? তারা কি ভাবে করছে?

-তারা যেভাবেই করুক, আমার দ্বা্রা হবে না। আমি আবারও বলছি, আমি আর পড়তে চাই না।

-কথায় বলে, কেউ যদি মন-প্রাণ এক করে কিছু আরাধনা করে তাতে সে সিদ্ধি পাবেই। কাজেই তুমিও পাবে দেখো। আমার কথা একটু ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখো না, এরকম অবুঝ হোয়ো না লক্ষীটি।

-আমি চিন্তা করেই বলছি। মাথা আমার খুব ঠান্ডা, বুঝলে। এনি ওয়ে, তোমার সাথে আমি আর্গিউ করতে চাই না।

জীবনে পোড়খাওয়া দীপ্ত সত্যিই খুব ব্যালান্সড পার্সোনালিটি নিয়ে তৈ্রি হয়েছে। তাই পরমাকে তার নিজের জেদেই থাকতে দিল, যাতে এই আর্গিউমেন্ট অন্য মোড় না নেয়...

“রাখিতে তাহার মন, প্রতিক্ষণে সযতন

হাসে হাসি কাঁদে কাঁদি-মন রেখে যাই

মরমে মরমে ঢাকি তাহারি সম্মান রাখি,

নিজের নিজস্ব ভুলে তারেই ধেয়াই......”

(এরপর পরের সপ্তাহে)

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

তৃতীয় পর্ব দ্বিতীয় অধ্যায় : রূপসা

কিন্তু কোথায় যেন একটা খুঁত হয়ে গেল। বেশ তো চলছিল শান্তির জীবনযাপন, মায়ের পছন্দ করা মেয়েকেই তো সে বিয়ে করেছিল। বিয়ের আগে এদেশে আসার ঠিক সেই মূহুর্তে আরেকজন এসেছিল তার জীবনে। রূপে গুণে আর কালচারেতে সেই মেয়ে ছিল শিখাময়ী। রূপসা তার নাম।

প্রথম যখন দেখল দাদার বন্ধু দীপু কে-তার মনে একটা নাকি শিহরণ খেলেছিল, পরে দীপু ওর লেখা চিঠিতে জানতে পারে। 

আমার মনের দীপঃ

মা বাবার কথায় তোমাকে লিখছি। নিজেরও যে লেখার ইচ্ছে হচ্ছিল না, তা বলতে পারি না। আমাকে মনে আছে তো? কি লিখি বলো তো? জানোই তো, আমি একটু লাজুক, যেদিন দাদা তোমার আর আমার কথা বাবা মা -দের বলছিলেন, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে শুনে ফেলেছিলাম। সেদিন জানি না কেন আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছিল। বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ শব্দও শুনতে পাচ্ছিলাম। কেমন যেন একটা শিরশিরানি ভাব-বোঝাতে পারব না তোমাকে। জানি না কবে তুমি আসবে? অনেক লিখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু নাঃ, যদি বিদেশে গিয়ে আমার কথা তোমার মনে না থাকে? তাই তোমার চিঠি পাওয়ার পরে আবার লিখব। পড়াশুনা তাড়াতাড়ি শেষ করে নাও, প্লিজ। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। তোমার পথ চেয়ে বসে আছি, যদি আমার কথা তোমার মনের কোঠরে এখনও থাকে তবে বুঝতে পারবে আমার মনের কথা।

আমি আর বেশি লিখে তোমার সময় নষ্ট করতে চাই না। শুধু মনে রেখো …

তোমার রূসা

সেদিন দীপ্ত ছিল খুব ক্লান্ত। পরপর দুটো পরীক্ষা দিয়ে যখন নিজের ডর্মে আসছে তখন লেটার বক্স চেক করে। দেখে মেয়েলি হাতের লেখায় ভারত থেকে চিঠি। সে আশা করে নি যে, “তার” চিঠি আসতে পারে। সেখানে দাঁড়িয়েই পরে ফেলে সেই চিঠি। আনন্দে প্রায়- লাফিয়েই ওঠে। অন্যান্য বিদেশি ছেলেরা ওর মুখ দেখে ওকে জিগেস করে, “ হেই, গার্ল ফ্রেন্ড-এর চিঠি নাকি?” সে হেসে বলে... “ইয়েস , অফকোর্স!”

নিজের রুমে এসেই লিখে ফেলে তাকে, তখন তো আর ইন্টারনেট ছিল না...কাজেই হাতে লেখা চিঠি-ই সম্বল।


২ 

আমার -হ্যাঁ শুধু আমার তুমি, আমার প্রাণের সাধনাঃ

আমাকে ছাড়া কেমন আছো, লেখো নি কেন? আসবার দিন যখন দেখা করতে গেছিলাম তোমাদের বাড়ি, তখন তোমার ছোট বোন বললঃ, “ তুমি নাকি খাও নি দু দিন ধরে”। কি করি বলো তো? এখনও তিনটে সেমিস্টার বাকি আছে...মনে হচ্ছে দিন-রাত্রি-ঘন্টা-মিনিট-সেকেন্ড যেন বড্ড দেরিতে কাটছে। আর তো তর সয় না। জানো তো একটা কথা মনে পরে ভিষণ হাসি পাচ্ছে। তোমার মনে আছে কি না জানি না, যেদিন প্রথম তোমাদের বিশাল বাড়িতে গেলাম তোমার দাদার সাথে, তোমরা সবাই এসে দাঁড়ালে। আর... আমি? প্রণাম শুরু করলাম কারুর মুখের দিকে না তাকিয়ে। হা হা হা! খুব হাসি পাচ্ছে কেন জানি না। তোমাকেও করে ফেলেছিলাম, মনে আছে? হঠাৎ সবার হাসিতে আমার সম্বিত ফিরেছিল। তোমার কি মনে হয়েছিল তখন? “-ছেলেটা নির্ঘাত ক্যাবলা”। হা -হা হা-! আমার ভাবলেই খুব লজ্জা লাগছে।

তোমাকে বড্ড দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে এই মূহুর্তে। আর কটা দিন ব্যাস, তারপরেই তোমাকে গিয়ে নিয়ে আসব একেবারে আমার করে। অনেক স্বপ্ন দেখি তোমাকে নিয়ে যখন একেবারে আমি একা হয়ে যাই। পড়াশুনারাও কিছুক্ষণের জন্য আমার কাছ থেকে পালায়।

তোমাকে দু চোখ ভরে দেখব সারা রাত। তুমি এত সুন্দর - আমার জন্য তাই না? আমার -ই থেকো সারা জীবন। আমার বাবা থাকলে তোমাকে বিয়ে করেই মায়ের কাছে রেখে আসতাম।

কিন্তু...। যেখানে ছোট মামার -ই বিয়ে হয় নি, সেখানে তোমাকে কি করে বিয়ে করি, তাই না? যাই হোক, আমার জন্য অপেক্ষা করো পি-লি---জ! তোমার বাড়ীর সবাই তো আমাকে ভালবাসে, কাজেই সে দিক থেকে তুমি মোটেই চিন্তা কোরো না। হলেই বা আমি অ-ব্রাহ্মণ। আমি ছেলে হিসেবে তো খারাপ না। আর যখন মিয়া বিবি রাজি। কি বলো? আমার চিঠি পেয়ে তাড়াতাড়ি লিখো কিন্তু। চুপি চুপি বলি, আমি আর পারছি না তোমাকে ছেড়ে থাকতে...অসভ্য! বেশ তাই। তোমার কাছে আমি অসভ্য হতেই চাই। তো্মার সাথে দুষ্টুমি করব না তো কার সাথে করব? এখানে যখন এদের ঘনিষ্ঠতা দেখি, তোমার কথা বড্ড মনে পড়ে। তাই যত তাড়াতাড়ি পারি তোমাকে নিয়ে আসব আমার কাছে। তোমাকেই আমি চাই। লুকিয়ে লুকিয়ে পোড়ো কিন্তু এ চিঠি। তোমার দাদা যেন জানতে না পারে...তাহলে আমাকে নাজেহাল করে ছাড়বে। অ-নে-ক 'সেই' জিনিসটা' দিলাম সারা চিঠি জুড়ে, আসবার সময় আড়ালে তোমাকে যেটা দিয়েছিলাম......লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলে তুমি, আমার ওপর রা-গ করো নি তো? চিঠি না পেলে ভাবতাম রোজ, হয়ত আমার ওপর রাগ করেছো। এসেই তোমাকে লিখতাম, কিন্তু নতুন দেশে এসে নিজেকে খাপখাওয়াতে বেশ সময় লেগেছিল।

আমার মন-প্রাণ সব এই চিঠিতে পুরে পাঠালাম। তোমার মনে রেখে দিও সযত্নে। মা কে লিখলা্ম, তোমার খবরাখবর নিতে। মা-ই তো আমার প্রিয় বান্ধবী, জানো সেটা। আরো কদিন থাকলে তোমাকে নিয়ে একটু বেড়ানো যেতো, একেবারে আসবার মুহূর্তে তোমার দেখা পেলাম...নাঃ আর পারছি না...দিন রাত পড়ছি, সময় পেলে একটু এদিক ওদিক অড জব করি। জানোই তো মাত্র ৫ ডলার নিয়ে এসেছিলাম। বিয়ে করে তোমাকে এনে মনের মত করে ঘর সাজাব কেমন। সময় পেলেই কত স্বপ্ন দেখি তোমাকে নিয়ে।

অনেক ভালবাসা তোমার সব খানেতে...রেখে দিও যত্নে। পরে কিন্তু আমাকে শোধ দিতে হবে কড়ায় গন্ডায়। আর এখানে তো তুমি -আমি ছাড়া আর কেউ থাকবে না। কাজেই বুঝতেই পারছো। আমাকে খারাপ ভাবছো না তো আবার। আরে বাবা, বিয়ে হলে তো আমার সাথেই হবে। আমি চিঠি বলে তোমাকে লিখতে পারছি, সামনে দেখেছো তো আমিও কেমন লাজুক। 

ভালো থেকো লক্ষ্মী সোনা আমার। 

তোমার শুধু তোমার একমাত্র দীপ!!!


শেষ চিঠি ছিল রুপসার...

আমার কেবল তুমিঃ

আমার বাতাস তোমার...

আমার আকাশ তোমার...

আমার সবই তো-মা-র, শুধু তোমার!!”

তাই ত আমার এই অনুসন্ধানঃ

“নয়ন সম্মুখে তুমি নাই

নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই”

তোমার আমি।

উভয়পক্ষ-ই সম্মত ছিল দুজনের জোড়কে কিন্তু বাদ সাধলেন মা, কোথায় এনে রাখবেন তিনি তার আদরের ছেলের বৌকে, নিজের অস্তিত্ব যেখানে সঙ্কির্ণ, সেখানে তিনি কিভাবে আরেকজনকে স্থান দেবেন? 

ছেলে দীপু তো এখনও নিজের পায় দাঁড়ায় নি, আমেরিকা থেকে এসে না হয় সেই মিস্টি মেয়েটাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে, সেই রকম কথা হয়ে রইল। এখনও তো তার দীপুর সে রকম বয়সও হয় নি, মাত্র ২২ বছর। চিঠি লেখালিখি চলেছিল বেশ কয়েকদিন-তাতে। তারপর সব চুপচাপ, বিদেশের মাটিকে আঁকড়ে ধরতে বেশ কিছু সময় লেগে গিয়েছিল দীপ্ত-এর। 


৪ 

একটু নিজেকে সামলে উঠেই দেশে গিয়ে শোনে তার মনের কোল খালি করে চলে গেছে 'সে' অন্যের ঘরে, বাবার আকস্মিক মৃত্যু তার জন্য দায়ী। আরো বোন ছিল - কাজেই তার বিয়ে না হলে -তাদের বিয়ে দেওয়া চলত না। 

তিলে তিলে গড়ে ওঠা তার স্বপ্ন, পরিশ্রম ভেঙ্গে চূরমার হয়ে গেল। জীবনে হারতে শেখেনি সে কিন্তু আজ জীবনের প্রথম একটা চরম পরীক্ষায় তার হার হল। তার মনে হল বন্যার প্রবাহে ভেসে গেল তার স্বস্থা, তার ভালবাসার শান্তি। সে অনুতাপ, অনুশোচনা বা গ্লানি আর অপরাধবোধকে ক্ষমা করতে পারছিল না।

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

দ্বিতীয় পর্ব : প্রথম অধ্যায় : মা মৃদুলা দেবী

স্মৃতিচারণের সময় -ছোট ছোট ছবিগুলো হয় আশ্চর্য্য রকমের ঘরোয়া। তাই প্রাণের গভীরে লুকিয়ে থাকা দুঃখের ফল্গুধারা হঠাৎ এক আঘাতে নিজেকে হারিয়ে বাঁধভাঙা বন্যার মত নেমে আসে দুকূল ছাপিয়ে। 

শিশুবেলায় বাবাকে হারিয়ে দাদুর হাত ধরে এসে উঠেছিল দাদু-দিদিমার বাড়িতে। বাবা অফিস থেকে এসে হঠাৎ চা খাবার সময় বুকে ব্যথা পান আর তার মা-কে ডেকে কাছে আসতে বলেন...তার...পর, তারপর মায়ের হাত ধরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তার বাবা। দীপ্ত তখন বাইরে খেলছিল তারই সমবয়সী বন্ধুদের সাথে, পিট্টুর বল তখন সবে লাফাতে লাফাতে ছুটছে কোর্টের বাইরে। 

মায়ের চিৎকার কানে আসে “বা...বাই, বাবাইই? শীগ্গির আয়...দেখে যা বাবাকে।” 

পাঁচ বছরের ছোট্ট দীপ্ত ছুটে এসে তখন বাবার গলা জড়িয়ে কান্না ভরা চোখে ডেকেছিল “বাবা, ও বা-বা আ আ ! চোখ খোলো-ও। আমি বাবাই বা-আ-বা, বাবা-আ-আ-!” 

বাবা সেই ডাকে আর সাড়া দেন নি। যখন হঠাৎ হারানোর হাহাকার রূপ পেতে চলেছে মা-মৃদুলা দেবীর প্রাণে , তিল তিল করে জমে ওঠা বুকভাঙ্গা বেদনার তো কোন রূপ নেই। 

সুখ-দুঃখ আর হাসি-কান্নার টানাপোড়েনের সূতোয় বোনা যেন মা-য়ের সার্থক ছবি।

ঠাকুমা আর কাকারা মা-কে বলেছিলেন “অলুক্ষণে”। তার ছোট্ট জীবনের কথা মনে আছে এখনও, মা তখন তাকে আর তার মেজ ভাইকে জড়িয়ে চুপ করে কেঁদেছিলেন।

দাদু তখন-ই তাদের নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অভিমানী মা মৃদুলা দেবী যেতে চান নি স্বামীর ভিটে ছেড়ে। আঁকড়ে ধরেছিলেন ভিটের মাটি। কতই বা বয়স ছিল তখন মা-এর? মাত্র বাইশ বছর। দাদু দিদিমা ফিরে গিয়েছিলেন শূন্য হাতে চোখের জল ভরে। 

অত্যাচারের সীমা যখন তুঙ্গে পাড়ার লোকেদের কাছে দাদু খবর পেয়ে সেখানে হাজির হন। ছোটনাতিদের অভুক্ত করুণ মুখ আর আহ্লাদি বড় মেয়ের দৈন্যদশা বাবার চোখ এড়ায় নি। পরে মেয়ের মুখে শুনলেন যে, বাজার করে বাড়ির দালানে রেখে যখন পেছন ফিরে দরজার শিকল খুলছিলেন। ঠিক তখন তার মেজ দেওর এসে সেই বাজার তুলে নিয়ে যান। মা পেছন ফিরে আর দেখতে পান নি বাজার করে আনা জিনিসপত্র।

শান্ত ছেলেরা ক্ষিদেয় যখন ছটপট করছে মা তাদের পিঠে দুই ঘা দিয়ে তাদের ক্ষিদে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এইভাবেই চলছিল দিনের পর দিন, যদিও বা খাবার জুটছিল তা ছিল শুধুই ভাতে ভাত। মুখ বুজে সহ্য করে চলেছিলেন মৃদুলা দেবী, ভাবতেন কি ভাবে মানুষ করবেন সন্তানদের। কিন্তু... ঠাকুর আছেন তার সহায়। 

পাড়া প্রতিবেশী চুপি চুপি খবর দিয়ে দেন তার বাবাকে। বাবাকে হঠাৎ আসতে দেখে তিনি অবাক হয়ে যান। বাবা তাদের নিয়ে যাবার প্রস্তাব আনলে, তিনি সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি যেতে রাজি হন না। কিন্তু রাশভারি বাবার মুখের ওপর কিছু বলতে পারেন না। গুটি গুটি পায়ে তারপর-ই পাঁচ বছর আর তিন বছর দুই ছেলে আর ছয়মাস অন্তঃস্বত্ত্বা ছোট্ট খাট্টো মা মৃদুলা দেবী কাঁদতে কাঁদতে এক কাপড়ে এসে উঠেছিলেন নিজের বাবা -মা এর কাছে। পাঁচ মামা আর চার মাসীদের সাথে তারাও যোগ হয়েছিল।

ডাক্তার দাদুর ছিল একার রোজগার। মা দাদুর বাড়িতে আসার পর মা- এর ওপর রান্নাঘরের সব দায়িত্ব দিয়ে দিলেন দাদু আর দিদিমা। অন্য মাসিমারা যখন নিজেদের জীবন নিয়ে সসব্যস্ত, মৃদুলা দেবী তখন দাদুর সংসার সামালাতে ব্যস্ত।

সেই ছোট্ট ফুটফুটে বিধবা মেয়েটির জীবন কাটতে শুরু করেছিল রান্নাঘরের অন্ধকূপে। নিজের সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে শুধু দিনের পর দিন হাড়-ভাঙ্গা খাটুনিতেই রাত এসে যেত। খুব হিসেব করে চালাতে হত দাদুর বিশাল সংসার। মা রান্নাঘরে গান গেয়ে নিজের মনকে নিজেই সান্ত্বনা দিতেন। কিন্তু সেই গান যারা একবার শুনেছে, তারা যখন সবার সামনে মা-কে গাইবার জন্য অনুরোধ করত । 

মা তখন আর সুর খুঁজে পেতেন না।। দীপ্ত খালি বুঝত মা-য়ের অন্তরের চাপা আর্তনাদ। মাকে মাঝে মাঝে জিগেস করত, সবাই রঙ্গীন শাড়ি আর কপালে টিপ পরত মা কেন পরত না। মা গল্পের ছলে ছেলেকে বুঝিয়ে দিতেন না বোঝার ভাণ করতেন দীপ্ত আজও তা মনে করতে পারে না। মায়ের আশ্চর্য্য ছেলেমানুষী মনের সাথে পরিবারের আর কারো মতের অমিল বা মনের অমিল কখনো হয়নি। সময় পেলেই খালি ঠাকুরকে বলতেন, “ছেলেগুলো যেন মানুষ হয়, আর কিছু চাই না, ঠাকুর।” 

ঠাকুর কথা শুনেছেন। তিন ছেলেই আজ মায়ের রত্ন, যেমন মামারা ঠিক তেমনি তারা তিন ভাই-ও। একরকম ভাবে মানুষ করেছেন দাদু তাদের। সবাই বলে ইঞ্জিনীয়ার বাড়ি।

আজ সে নিজের চেষ্টায় পৃ্থিবীর সব চেয়ে ধনী দেশের নাগরীক। সব স্ব্প্নই সফল আজ তার। লেখার জগতে এই বিদেশের মাটিতেও সে একটা শক্ত খুঁটি গড়ে তুলেছে। মার্কিন মুলুক থেকে শুরু করে তাবড় তাবড় দেশের লোকেরাও তার লেখাকে প্রকৃ্ত সম্মান জানায়, ছোটবেলা থেকেই সে লিখতে ভালবাসে, তার ছোটবেলার সেই সেজমাসিমার দেওয়া পেন আজ-ও সে যত্ন করে রেখেছে... যা দিয়ে সে নাকি তার স্কুল এবং কলেজের গন্ডি পেরিয়েছিল। আর নাম রেখেছিল একেবারে ওপরদিকের সারিতে। ছোট্ট বেলা থেকেই লিখে চলেছিল দেশের নামকরা সংবাদ পত্র , ও ম্যাগাজিন -এ।

ঠিক মত পুস্টিকর খাবারের অভাবে শরীর ছিল শীর্ণকায়। হয়ত সেই রকম খাবার আর পরিবেশ পেলে সে আরো অনেক উপরে উঠতে পারত। আজ বিভিন্ন ভাষায় তার লেখা দেশ- বিদেশের ছাত্র ছাত্রীদের পড়ানো হয়। নানা গুণের সমারোহে যেন সত্যি সে ধীর, মহীরথি।

(চলবে)

প্রথম পর্ব

দীপ্ত-র চতুর্থ অধ্যায়