দুর্বার ভাবনা

যৌনকর্মীদের অনেকেই বাঁকা চোখে দেখে। তারা সমাজের মূলস্ত্রোতের থেকে অনেকটাই দূরে। বলা ভাল সমাজই তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই সমাজে ব্যতিক্রমী মানুষও রয়েছেন। যেমন ড. স্মরজিত জানা। যৌনকর্মীদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে চলেছেন। তৈরি করেছেন দুর্বার মহিলা সম্বন্বয় সমিতি। যৌনকর্মী এবং তাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য নানা রকম প্রকল্প বাস্তবায়িত করেছেন। 

যৌনকর্মীদের নিয়ে ড. স্মরজিত জানার বিভিন্ন প্রকল্প, চিন্তাভাবনা এবং দুর্বারের বিভিন্ন কার্যকারিতার খবর ও লেখা থাকবে বাংলা সাহিত্য ওয়েব ম্যাগাজিনের এই পাতায়।

যৌনপল্লীর ছেলেমেয়েদের স্বপ্নপূরণে ফুটবল প্রশিক্ষণ শিবির

অধিকাংশ যৌনকর্মীদেরই সন্তান রয়েছে। তারাও মা। তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনেক স্বপ্নই তারা দেখে। তাদের ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনা করবে, খেলাধুলো করে আর পাঁচটা ছেলেমেয়েদের মত সমাজে বড় হবে। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করেছে দুর্বার তৈরি করেছে রাহুল বিদ্যানিকেতন আবাসিক ছাত্রাবাস।

এখানকার আবাসিকদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটাতে ফুটবল প্রশিক্ষণ শিবির শুরু করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজের মূলস্রোতের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ঘটানো। শুরুতে রাহুল বিদ্যানিকেতনের আবাসিকের ছাত্রদের নিয়েই এই প্রশিক্ষণ শিবির শুরু হয়। পরে বিভিন্ন যৌনপল্লীর ছেলেমেয়েরাও এখানে অংশগ্রহণ করতে থাকে। যৌনপল্লীর ছেলেমেয়েদের মায়ের পেশার কারণে এলাকার বাইরে কোথাও খেলাধুলো করতে গেলেই নানা ভাবে অপমান সহ্য করতে হত। তাই কলকাতার আশপাশের জেলাগুলি থেকে যৌনকর্মীদের সন্তানরা এই ফুটবল প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নিতে শুরু করে। প্রশিক্ষণ শুরু হওয়ার পর দেখা গেল যৌনকর্মীদেরছেলেমেয়েদের জন্য গড়ে ওঠা এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগদানের জন্য মূলস্রোতের ছেলেরাও উত্সাহী হচ্ছে।

ফুটবল খেলাকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ও উত্সাহের জেরে প্রথম ২০১০ সাল থেকে দুর্বার যৌনপল্লীগুলির মধ্যে আন্তঃজেলা ফুটবল লিগ শুরু করে। এই ব্যতিক্রমী ঘটনা এই রাজ্যেই নয়, গোটা ভারতবর্ষেই এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমাদের দেশে যৌনকর্মীদের মতো পিছিয়ে পড়া ও সামাজিকভাবে নিন্দিত একটি জনগোষ্ঠীর সন্তানদের নিয়ে এধরণের গঠনমূলক বেনজির উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এসেছিলেন অসংখ্য বিশিষ্ট ব্যক্তি, খ্যাতনামা খেলোয়াড়, শিক্ষাবিদ থেকে ক্রীড়াপ্রেমী মানুষজন। দুর্বারের হাত ধরে গত ৫বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এইসব খেলোয়াড়দের অনেকেই মূলস্রোতের ক্রীড়াজগতের মধ্যে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে। ২০১০ সালে কয়েকটি মাত্র যৌনপল্লীর ছেলেদের নিয়ে যে  উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, ২০১৪ সালে এই রাজ্যের ২০টি জেলার যৌনপল্লী থেকে ১২টি দল ফুটবল লিগে অংশ নেয়।

খেলাধুলার জগতে দুর্বারের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হল :

১) ২০১১-২০১২ সালে প্রথম দুর্বারের অনুর্দ্ধ ১২ বছরের খেলোয়াররা ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য শাখায় নার্সারি ফুটবল লিগে অংশ নেয়।

২) ২০১৩ সালে দুর্বারের বাছাই করা ৮ সদস্য স্লাম সকার ন্যাশানাল চাম্পিয়ান লিগে অংশ নেয় ও তৃতীয় স্থান দখল করে।

৩) ২০১৩ সালে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত স্লাম সকার ওয়াল্ড কাপে দুর্বারের ২ জন খেলোয়ার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং টুর্নামেন্টে টপ স্কোরার হিসেবে পুরস্কৃত হয়।

৪) ২০১৪ সালে নাগপুরে দুর্বার এর খেলোয়াররা চ্যাম্পিয়ন ট্রফি লাভ করে।

৫) ২০১৪ সালে দুর্বার ফুটবল টিমের এক সদস্য বিশ্ব বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড-এ উন্নততর ফুটবল প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরেছে।

দুর্বারের জন্য আজ যৌনপল্লীর ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও নিজেদের যোগ্যতা দেখাতে সফল হচ্ছে। জাতপাত, ধর্ম বা পেশাগত যেকোনও ধরণের বৈষম্যের অবসান ঘটাতে খেলাধূলোই হল সবচেয়ে সেরা মাধ্যম। এই কথা মাথায় রেখে দুর্বার ফুটবল লিগ এগিয়ে চলেছে আরও সম্ভাবনাময় আগামীর দিকে।

বিভাগটি কেমন লাগল, অনলাইনে মতামত লিখে জানান

সোনাগাছি মডেল

শর্মিলা চন্দ্র

সমাজে যারা পতিতা, যাদের ঠিকানা নিষিদ্ধপল্লী, তাদের সমাজ আজও দূরে সরিয়ে রেখেছে। কিন্তু এরাও মানুষ। সমাজে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মত তাদেরও মাথা উঁচু করে বাঁচতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এই সমস্ত মেয়েরা কেউ পরিস্থিতির চাপে পড়ে আবার কেউ দুষ্ট চক্রের কবলে পড়ে এই অন্ধকার গলিতে আসতে বাধ্য হয়। একটা সময় তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতা বলে কিছু ছিল না। সমাজের গুন্ডা, মস্তানরা তাদের প্রতিনিয়ত অত্যাচার করত। তাদের প্রতিবাদ করার কোনও জায়গা ছিল না। কিন্তু আজ সময় কিছুটা হলেও বদলেছে। আজ তাদের পাশে আছে দুর্বার। যৌমকর্মীদের সমাজের মূলস্ত্রোতে ফেরাতে, সমাজে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে এবং তাদের উপর গুন্ডা, মস্তানদের অত্যাচার বন্ধ করতে ১৯৯২ সালে তৈরি হয় দুর্বার মহিলা সম্বন্বয় কমিটি। দুর্বার তৈরির করার জন্য সবার প্রথমে যৌনকর্মীদের একত্রিত করার খুব প্রয়োজন ছিল। আর সেই কাজটা যিনি করেছিলেন, তিনি হলেন ড: স্মরজিত জানা। 

নয়ের দশকে এডস মহামারির আকার নিয়েছিল। যৌনকর্মীদের মধ্যে এই রোগের মাত্রা অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছিল। সেই সময় ৫০ লক্ষেরও বেশি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকারের অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ-এর পক্ষ থেকে এডস নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচী শুরু করা হয়েছিল। সংস্থার পক্ষ থেকে ড: স্মরজিত জানা সোনাগাছির যৌনপল্লীতে এডস নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেছিলেন।

শুধু এডস নিয়ন্ত্রণ নয়, তিনি প্রকল্পের বাইরে গিয়েও যৌনকর্মীদের জন্য বিভিন্ন রকম চিন্তাভাবনা করেছেন এবং বাস্তবায়িত করেছেন। সোনাগাছিতে কাজ করতে এসে ড: জানা বুঝেছিলেন সোনাগাছির মেয়েদের সবার আগে শিক্ষিত করতে হবে। তাদের উপর হওয়া সমস্ত রকম অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। যৌনকর্মীদের একত্রিত করে তাদের ক্ষমতায়ন দিতে হবে। তাদের মধ্যে এডস নিয়ন্ত্রণ করতে হলে তারা যাতে নিরাপদ যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। এরজন্য তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তারা যাতে তাদের কাস্টমারদের কন্ডোম পরাতে পারে তারজন্য তাদের সচেতন করতে হবে। কারণ বেশির ভাগ কাস্টমারই কন্ডোম ছাড়াই যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হতে চায়। তারা যাতে তার প্রতিবাদ করে সুস্থ যৌন সম্পর্ক  স্থাপন করতে পারে, সেই বিষয় নজর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এরজন্য যৌনকর্মীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। তাদের মধ্যে বিনা পয়সায় কন্ডোম বিতরণ করেন। যৌনকর্মীদের মধ্যে থেকেই বেশ কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে তৈরি করেন। তারা যাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্যান্য যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করতে পারেন। ড: জানা কেন্ত্রীয় সরকারের প্রকল্প নিয়ে সোনাগাছিতে এসেছিলেন, তার সঙ্গে নিজেরও কিছু পরিকল্পনা যুক্ত করেছিলেন। সেই কাজ সফলও হয়েছে। আজ এডসের মাত্রা অনেকটাই কমেছে। এডস নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সোনাগাছিতে যে প্রকল্প শুরু হয়েছিল তা আজ  মডেল হিসেবে পরিচিত। যা সারা পৃথিবীর কাজে যথেষ্ট স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

খবরাখবর

ডাঃ জানার বই প্রকাশ

গত ৩ ফ্রেব্রুয়ারি কলকাতা বইমেলায় দুর্বার প্রকাশণীর পক্ষ থেকে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট সমাজতত্ত্ববিদ ও এপিডেমোলজিস্ট ডাঃ স্মরজিত্ জানার লেখা তিনটি বইয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়ে গেল| ‘স্বাস্থ্যের উত্স সন্ধানে‘ , ‘রোগ মহামারীর আচারবিচার‘ ও ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমবায়ের দিশা ‘বই তিনটির প্রকাশ উপলক্ষে উপস্থিত ছিলেন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক প্রণব বর্ধন, চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ, অধ্যাপক সমর দত্ত, অধ্যাপক ও লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক অনিল আচার্য, প্রসূন ভৌমিক ও দুর্বারের সচিব ভারতী দে|

‘স্বাস্থ্যের উত্স সন্ধানে বইটিতে‘ জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের সঙ্গে ডাঃ জানার দীর্ঘ সময় যুক্ত থাকার সুুবাদে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন চিকিত্সা ও সংস্ক‘তি, রোগব্যাধি ও সামাজিক সংস্কার, বিকল্প চিকিত্সা, ওষুধ বাজারের নৈরাজ্য ইত্যাদি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলিকে তুলে ধরা হয়ে্ছে এই বইয়ে|

ডাঃ স্মরজিত্ জানা ও অধ্যাপক সমর দত্তের সম্পাদিত ‘অথনৈতিক উন্নয়নে সমবায়ের দিশা‘ বইটির সর্ম্পকে বলতে গিয়ে প্রণব বর্ধন বলেন,উন্নয়নের চলতি ধারায় সমবায়ের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বির্তকে না গিয়েও বলা চলে যে, সংকলনটি মধ্যে সমবায় নিয়ে নতুন ভাবনার সযত্ন প্রয়াস রয়েছে| পাশাপাশি এই সংকলনটির প্রকাশের নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী আমাদেরই  রাজ্যের যৌনকর্মীদের দ্বারা পরিচালিত একমাত্র সফল সমবায় ঊষা কো অপারেটিভের কর্মকান্ডকে তিনি  অনুসরণযোগ্য বলে প্রসংশা করেন|

দুর্বার প্রকাশনীর ‘রোগ মহামারীর আচারবিচার‘ বইটিতে মূলত ডাঃ স্মরজিত্ জানার গণ বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার নানা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলি সময়োপযোগী ও সাম্প্রতিক তথ্যসহযোগে সংকলিত হয়েছে|আগ্রহী পাঠকের নিঃসন্দেহে বইগুলি থেকে নতুন ভাবনাচিন্তার খোরাক পাবেন|

Copyright © 2013 Creative Media All Rights Reserved | Designed & Developed by Graphic World (9143382591)