অনুপমের একদিন

হাবিব আনিসুর রহমান

ডান দিকে মোড় নিয়ে আবার থেমে যায় বাসটা। সামনে গাড়ির লম্বা লাইন। সিগন্যাল পার হতে পারলেই সামনে পান্থপথ। পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট এভাবে কুৎসিত সময় গড়ায়। গাড়ির ছাদ ক্রমেই তেতে ওঠে। সূর্য তেরচা হয়ে তার শরীরের বাম দিকে উত্তপ্ত করে। সকাল দশটা হলেও অসহনীয় গরম। যাত্রীদের মুখে কোনো কথা নেই। কী হবে বলে? প্রতিদিন এভাবেই মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায় রাস্তাইয়। রুমাল বের করে হাত-মুখের ঘাম মোছে কেউ কেউ। অনুপমের চোখ পড়ে বাম পাশের বিলবোর্ডের ওপর। সামনে হোটেলের পিৎজার নিচে লাল অক্ষরে লেখা- হ্যাভ নেভার বিন সো ফ্যাবউলাস। যেন সুগন্ধ ছড়াচ্ছে, জিবে পানি আসার অবস্থা। নিচে দুটো ফোন নম্বর। সে প্রথম নম্বরটা সেভ করে মোবাইল ফোনে। পরে ফোন করে জানাবে দামটাম কেমন? মাঝে মাঝে সে এমন করে, নানা অভিজাত জায়গায় ফোন করে। দু’পাঁচ টাকা খরচ হয় তাতে কী? এসবের মধ্যে একটা বৈচিত্র্য পায়। এ হটেলের সামনে দিয়ে সে যাতায়াত করে তিন বছর, অথচ এক দিনও ভেতরে ঢুকে কোনো মেয়ে বন্ধুকে মুখোমুখি বসিয়ে পিৎজা, পাস্তা, কফি বা ঠাণ্ডা কিছুর অর্ডার দিতে পারেনি। মাঝে মাঝে শায়লার চেহারা বেসে ওঠে চোখের সামনে। আজ ওকে ফোন করে বললে- চলো, আজ সন্ধ্যায় পিৎজা-টিৎজা খাই, একটু ঘুরে আসি। 


শায়লার জীবনটাও ঝামেলা আর একঘেয়েমিতে ভরা। সম্মতি পেলে পেয়েও যেতে পারে। তবে শায়লা খুব শক্ত মেয়ে। আকাশে  উড়তে চেয়েছিল, হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল ধপ করে। তার পরও ওর সেই এককথা- নিয়তি, ভাগ্য এসব মানি না। এসব হল দুর্বল মানুষের খোঁড়া যুক্তি, আসলে তারা ভীতু, অক্ষম। স্রোতের সঙ্গে ভেসে যাওয়া মানে ওইসব ভাগ্যকে মেনে নিয়ে বলা আমি দুর্ভাগ্যের শিকার। যে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাতে পারে, সে-ই হচ্ছে সফল মানুষ, আথচ সাধারণ লোকে তাদের বলে ভাগ্যবান। একবারও দেখেনা মানুষটা সৌভাগ্যকে আদায় করে ছেড়েছে। 


শায়লার ভাবনা দারুন প্রভাবিত করে আনুপমকে। সে কি নিজেকে একটা ভীতু বা আক্ষম মনে করে! আজ ফোন করবে। সামনে যানজট কখন কাটবে, এগিয়ে যাবে বাস! যাত্রীরা কেউ কোনো কথা বলে না, সব চুপচাপ। আনুপমের ইচ্ছা করে খুব জোরে একটা চিৎকার দেয়, কিন্তু পারে না, দেওয়া হয় না। মানুষ বলবে লোকটা পাগল, মাথা খারাপ। এর মধ্যে জানালা দিয়ে ছোট ছোট কাগজে বিজ্ঞাপন এসে পড়ে যাত্রীদের কোলের ওপর। সময় কাটাতে ধীরে ধীরে মনোযোগ দিয়ে বিজ্ঞাপন পড়ে আনুপম –যারা যৌন অক্ষমতায় ভুগছে তাদের লিঙ্গে ড্রাগন তেল মালিশ করতে বলা হয়েছে, কেউ বিফল হলে মূল্য ফেরত দেবে কম্পানী। ছিঁড়ে ফেলে ছুড়ে মারে জানালা দিয়ে। আরে তেল মালিশ করে সফল হলো না ব্যর্থ হলো, এটা বোঝা যাবে কেমন করে! রাবিশ, পাশের যাত্রী বলল। যাত্রীদের মুখে একটু হাসি ফুটে আবার মিলিয়ে যায়। তখন বাসটা গর্জন করে সামনে এগিয়ে যায়। কিন্তু একশো বা সোয়াশো গজ এগিয়ে আবার থামে। লম্বা চুলওয়ালা রাগী এক যুবক জানালা দিয়ে মাথা বের ক’রে ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে তাকিয়ে চিৎকার দেয় – তোদের গুষ্টি মারি শালা খানকির বাচ্চারা, এইটা কোনো সভ্য দেশ ! চারপাশের থেমে থাকা গাড়ির ইঞ্জিন আর হর্নের শব্দের সঙ্গে শূন্যে মিশে যায় যুবকের চিৎকারধ্বনি। দু’একজন যাত্রীরা যুবককে শাবাশ দেয়- গালিটা এক্কের ঠিকমতো দিছেন ভাই। দশ-বারো বছরের একটা ছেলে, হাত-পা শরীর অস্বাভাবিক, কোনো রকমে সিটের রড ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদে—‘বাজানরা আমার দিকে একটু চাইয়া দেহেন, বাবা, কিছু করতে পারিনা, বাপ-মা মইরা গেছে, দুইটা ছোটো বোইন লইয়া বস্তিতে থাহি, প্যাটের খিদায় হাত পাতছি বাজান, যে যা পারেন দেন বাবা…..।’ যাত্রীদের পকেট থেকে দুই টাকার নোটগুলো বের হয়ে ছেলেটার হাতে পড়ে। ওকে দেখে অবাক হয় আনুপম, মানুষের শরীর এমন অস্বাভাবিক হয় কী করে ! কেউ কোনো কিছু দিয়ে ওর হাত-পা ছেঁচেছে মনে হয় !

আনুপম মোবাইল ফোন বের করে কথা বলে –স্যার, আমি বাসের ভেতর, পুরো শরীর কেঁপে জ্বর এল, হঠাৎ ভীষণ মাথাব্যথা, রাস্তায় অসম্ভম জ্যাম, আমি ফিরে যাচ্ছি স্যার, অফিসে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না……. স্লামালেকুম ।


অনুপম বাস থেকে নেমে ভিক্ষুক ছেলেটাকে খোঁজে। ততক্ষণে ছেলেটা পেছনের বাসে ঢুকে পড়ে। রাস্তার পাশের গাছটার নিচে দাঁড়িয় অপেক্ষা করে অনুপম। পান্থপথের উঁচু ভবনগুলোর পাশে বেমানান একটা টিনের চালের হোটেলে গিয়ে বসে। বসকে একশো ভাগ মিথ্যে বলেছে। ও মাঝে মাঝে এটা করে। নিজের জন্যে দুএকটা দিন অন্য পাঁচটা অসহনীয় একঘেয়ে নিরান্দন দিন থেকে বের করে নেয়। আসলে এটা কোনো মিথ্যাচার নয়, হয়তো ভেতরের মানুষটা সত্যিই জ্বরে পুড়ছে, মাথা যন্ত্রণায় ছটফট করে, অথচ কাউকে কিছুই বলা হয় না।

ভিক্ষুক ছেলেটাকে সামনের চেয়ারে বসতে সাহায্য করে সে,

- কত দিন ভিক্ষা করছিস ? পাশে এসে দাঁড়ানো বয়টাকে বলে, একে চা-সিঙাড়া দাও-          পরপর দুটো সিঙাড়া খেয়ে সে অনুপমের দিকে তাকায়। তাকে এভাবে ডেকে হোটেলে বসিয়ে সিঙাড়া খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর জন্যে সে ভীষণ আনন্দিত।

- আর খাবি ?

- হ খামু। সে মাথা নাড়ে। 

- এই, একে আরো দুটা সিঙাড়া দাও। বয়কে বলে। ছেলেটা সিঙাড়া, পানি, চা খায় খুব দ্রুত। কথা বলে,

- আপনে সাংবাদিক ?

- মনে হচ্ছে ?

- জানি না।

- কত দিন ভিক্ষা করছিস ?

- তিন বচ্ছর।

- ডেইলি ইনকাম কত ?

- কওন নিষেদ আচে আমাগো। চারপাশে তাকায় সে, তার চোখেমুখে ভয়।

- তোর বাবা-মা, ভাই-বোন কেউ নেই ?

- সাংবাদিক, যদি ফোটো প্যাপারে দ্যান, লগে আমার ইনকাম লিইখা দ্যান তাইলে অরা আমারে মাইরা ফালাইব।

- কারা ?

- আচে আপনে বুঝবেন না, তয় আপনারে আমি কিছু কমু।

- ভয় পাস না আমাকে ?

- আপনে তো সাংবাদিক না।

- কেমনে বুঝলি ?

- আপনের ব্যাগ দেইখ্যা, যারা সাংবাদিক তাগো ব্যাগ ছোটো, লগে ক্যামেরা থাহে। হেরা খুব চালাক।

- তাই নাকি ? তাহলে আমাকে কিছু বল? 

- আমরা ভিক্ষা কইরা যা ইনকাম করি, আমাগো সব ট্যাহা বাবার লুকে নিয়া যায়। 

- বাবাটা কে ?

- আমাগো মালিক, বস্তির ভিতরে আমরা অনেক লুলা-কানা থাহি, এগুলরে লুলা-কানা বানাইছে ভিক্ষা করনের লেইগা। 

- বলিস কী ? থাক, এসব কথা থাক। ভালো লাগছে না, তুই যা। ছেলেটা হাসে,

- একখানা কথা কই স্যার ?

- কী জলদি বল।

- বিরানি খামু।

- এখানে ওসব খাবার পাওয়া জায় না, তুই এখন যা।

- আসসালামু আলাইকুম, যাইগা সার, আপনে মানুষটা বহুত ভালা।


ছেলাটা চলে গেলে এক কাপ চা দিতে বলে অনুপম। সামনের উঁচু  বিলবোর্ডের দিকে  তাকায়। সাত দিনে সুন্দরী হওয়ার শ্রেষ্ঠ ক্রিম। পত্র- পত্রিকা-বিলবোর্ড ছেয়ে গেছে এসব ক্রিমের বিজ্ঞাপনে। প্রতিদিনের সৌন্দর্য প্রবৃদ্ধির প্রমাণ। পাশে ক্যাটরিনা কাইফ, বাচ্চা মেয়েদের ফ্রক পরে দাঁড়িয়ে আছে। তার উঁচু বুক, কোমর, পাছা, উরুদেশ গোলাপি ফিনফিনে পাতলা ফ্রকের ভেতর প্রায় দৃশ্যমান। অবিশ্বাস্য সুন্দরী মেয়ে ক্যাটরিনা অসংখ্য মানুষের সামনে জীবন্ত একটা হাসি নিয়ে আকাশে ভাসছে। অনুপম ভাবে, যারা কোকশাস্ত্র বিশেষজ্ঞ, তারা আগে আর্টিস্টকে বলে- স্কেচ করো, তারপর ফটোগ্রাফারকে সব কিছু বোঝানো হয়। তা না হলে ক্যাটরিনা কেন এমন প্রচণ্ডভাবে দোলা দেবে যুবকদের দেহমনে। আর বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নারী কেন এমন উতালা হয়ে সুন্দরী হতে চাইবে ? হোটেল থেকে বের হয়ে আবার ফিরতি বাসের জন্য ফুটপাতে গিয়ে দাঁড়ায় অনুপম। অঙ্ক কষে - বাসে করে যারা অফিস করে তারা প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘন্টা রাস্তায় কাটায়। এভাবে এতগুলো ঘন্টা রাস্তায় নষ্ট হয়ে গেলে জীবনে আর কী থাকে ! 


মেসের দরজার কড়া নাড়তেই চিৎকার দিল বুয়া—কেডা ? খাড়াইয়া থাহেন। অনুপম আবার কড়া নাড়ে বলে- দরজা খোল, আমি। বুয়া অনুপমকে দেখে হাসি দেয়, 

- আপনে! অফিসে গেলেন আবার ফিইরা আইলেন বুঝলাম না! 

- কেন তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছে ? তোমাকে এত কিছু বুঝতে হবে না, যাও। 

- রাগ করেন ক্যান ? আমি কি খারাপ কতা কইছি ? 


অনুপম রুমের তালা খুলে ফ্যানের সুইচের সামনে দাঁড়ায়। আছে কি বিদ্যুৎ ? সে সুইচ টেপে, কিন্তু ফ্যান ঘোরে না। ব্লেডগুলো স্থাবির অনড়। একটু আগের বাসের চাকার মতো থেমে আছে, ঘোরে না। তিব্র আক্রোশে ফেটে পড়ে অনুপম, তোমাদের গুষ্টি আমি………. মুখ দিয়ে সেই গালিটা বের হয়। বুয়া এসে বলে- স্যার এইসব কী কইতাছেন ? বুয়ার মুখে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। রং কালো হলেও এ মুহূর্তে তাকে ক্যাটরিনা মনে হয় অনুপমের। বুকে ওড়না পেঁচানো। শরীরের গাঁথুনি চমৎকার। সে বুকের ওপর থেকে ওড়নাটা সরিয়ে দু’বার ঝাড়া দিয়ে  গলায় জড়াল। উদ্ধত বুক দুটো প্রদর্শন করল অনুপমকে। 


- স্যার আপনে তো টায়ার, এক কাপ চা আনি?

- তোমার উদ্দ্যেশ্যটা কী বলো তো বুয়া?

- স্যার অহন তো মাসের পয়লা হপ্তা, আপনে কইলাম আমারে দুইশো ট্যাকা কর্জ দিবেন।

অনুপম বুয়ার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বলে,

- তুমি এখন যাও, কাজ করো। আমি রেস্ট নিয়ে খাওয়া-দাওয়ার পর বাইরে যাব, জরুরি কাজ আছে।

- লন, রেস্ট লন স্যার, কোনো কিছু লাগলে আমারে কইয়েন।


শুয়ে পড়ে অনুপম। তাকিয়ে দেখে ফ্যানের সুইচটা অন করা আছে কি না ? কানের পাশে মোবাইল ফোনটা রেখে গান শোনে….. এক একটা দিন বড় একটা একা লাগে…….. ঘুম চোখ খুলে দেখি ভোর নেই আজ, ভাল করে সকালটা পাওয়া হয় না….। উঠে বসে অনুপম – শালা গুষ্টি মারি তোমাদের একাকিত্বের। কিসের ভোর, কিসের সকাল, বাস ধরার সময় পাই না আবার বলে ভোর-সকাল!


বুয়া সামনে এসে দাঁড়ায়,

- লন স্যার চা খান, খুব সুন্দর কইরা বানাইছি, চা খাইলে শরীরটা ভালো লাগবে।

- বুয়া এসব কী শুরু করলে তুমি ? আমি জানি তিমি কেন এত শয়তানি শুরু করেছ, যত কিছুই করো, টাকা তোমাকে দিচ্ছি না। 

- চা খান, আমার ট্যাকার দরকার নাই। 


চায়ের সঙ্গে দু’টাকার ছোট্টো বিস্কুটের প্যাকেট এনেছে বুয়া। অনপম চায়ের কাপটা হাতে নেয়। শায়লার কথা ভাবে।

অসময়ে হঠাৎ সে মোবাইলের নম্বর টেপে। কানে ধরে অপেক্ষা করে……. হ্যাঁ রিং হচ্ছে…… কাপটা পাশে রেখে চিত হয়ে শুয়ে বুকের কাছে রাখে মোবাইল ফোনটা, রেখে লাউডস্পিকারটা অন করে…… রিং হচ্ছে, রিং হচ্ছে……

- হ্যাঁ অনুপম, কেমন আছ ? ওপার থেকে শায়লা বলছে।

- তাহলে নামের লিস্ট থেকে অনুপম হাসানকে ডিলেট করে দাও নাই, ভালো আছি, তুমি ?

- ভালো, হঠাৎ অসময়ে!

- তোমার ওখানে আসতে চাচ্ছি।

- কেন, কী ব্যাপার ?

- মোনোটোনাস, ভীষন বাজে একটা সময় যাচ্ছে সকাল থেকে, সন্ধ্যেবেলা সময় হবে ? ধরো তোমাকে নিয়ে বের হলাম ?

- হঠাৎ ! এত দিন তো চুপচাপ ছিলে?

- যে কোনো সময় মরে যেতে পারি তাই না ?

- বাইরে গেলে তো অনেক খরচ, আবার সময় নষ্ট, তা ছাড়া বড় সমস্যা তো... কোথায় যাবে ?

- যাবো মানে ভীষণ একঘেয়ে লাগছে, ভাবছি বড় হোটেলে বসব... গল্প করব...

- বড় হোটেল ! আদার ব্যাপারি জাহাজের খবর নিচ্ছ, কী ব্যাপার ? 

- আদা এখন অনেক মূল্যবান, আবার সেটা জাহাজে করেই আসে, আদার ব্যাপারি হতে পারলে তো বারিধারা, গুলশানে একটা দামি ফ্ল্যাট কিনে ফেলতাম…

- (হাসির শব্দ) কী খাওয়াবে ? 

- এই পিৎজা বা পাস্তা, ধরো একটু কফি বা তুমি বললে অন্য কিছু …

- বেতন পাইছ, না ?

- হ্যাঁ, পেয়েছি। তুমি চাইলে ইচ্ছামতো খরচ করতে রাজি আছি…

- অনুপম, হোটেলে বসে দামি পিৎজা খয়ার চেয়ে আমার এখন টাকার দরকার অনেক বেশি। চলে এসো, যাওয়ার চেষ্টা করব। 

অনুপম হাসান বহুদিন পর হাসে। 

   

প্রতিটি দিনই তো হাসিবিহীন চলে যায়, আজ না হয় একটু হাসি… মনে মনে বলে সে। শায়লা যেতে বলেছে, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে !

এটা শুধু শায়লার অনুমতি নয়, হতে পারে এটা এক ধরনের আমন্ত্রণ। অনুপম যেমন একঘেয়ে নিরান্দন জীবনযাপন করে, শায়লার জীবনটাও তো এমনই ! সে যেমন শায়লার সান্নিধ্য কামনা করে, একইভাবে শায়লাও হয়তো ওর সান্নিধ্য ভালোবাসে। অনুপম কল্পনা করে… আলো-আঁধারিতে মুখোমুখি বসে ওরা দুজন গল্প করছে, অসম্ভব সুন্দর লাগছে শায়লাকে। 


উঠে বসে অনুপম। বুয়া দরজায় দাঁড়িয়ে। নিশ্চয় সে কাপ নেওয়ার ছুঁতো করে ওদের কথোপকথন শুনেছে।  যা ভেবেছে ঠিক তাই! বুয়া বলে,

- বেতন পাইছেন ভালা কতা, কিন্তু একদিনে ওই বেডিরে লইয়া সবটি ট্যাকা উড়াইবেন, তারপর কইল বিয়ানে মান্নান স্যারের কাছে টাকা কর্জ করবেন, এইডা কি ভালা ?

হঠাৎ অনুপমের মাথায় রক্ত উঠে যায়। লাই পেয়ে মাথায় উঠে গেছে বুয়াটা, ওর এত বড় সাহস। সে বুয়ার সঙ্গে অস্বাভাবিক তর্কে লিপ্ত হয়। 

- তোমার কোনো কাম-কাইজ নেই স্টুপিড মহিলা, এক কাপ চা দিয়ে আমার মাথা কিনে নিয়েছ তাই না ?

- যা কইছি আপনার ভালার লেইগা কইছি, চেতেন ক্যান? 

  

অনুপম নিচে নেমে দাঁড়ায়। ইংরেজি কমডি সিরিজের নায়ক যখন সীমাহীন রেগে গিয়ে দাত-মুখ খিঁচিয়ে নিচুস্বরে ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে সংলাপ বলে, তেমন করে সে বলে,

- শাট আপ স্টুপিড, তুমি কি বুঝতে পারছ, কী বলছ ? দেখো বুয়া, সংবিধানিক ভাবে যেটা তোমার জন্য প্রযোজ্য নয়, সেটা বলা বা করা তোমার উচিৎ নয়, এসব আমার একান্ত ব্যাক্তিগত ব্যাপার, তুমি কাজের বেটি, তুমি তোমার  জায়গায় থাকো, আমাকে আমার জাইগায় থাকতে দাও, বেশি রাগালে ঘাড় ধরে বের করে দেব……

            

- ভালা কতা, খুব ভালা কতা, মেসে পরথম যখন আইছিলেন, তখনকার কতা সবটি ভুইলা গ্যালেন, তখন আমার লাগে যা কিছু করছেন, যা কিছু বলছেন অইগুলা কি সংবিধানে আছিল…

- উফ আসহ্য, আমি ভুল করেছি অসময়ে রুমে ফিরে, আমি ভুলেই গেছি, তুমি শুধু একজন কাজের বুয়া নও, তুমি আসলে ঝগড়া-ঝাঁটিতে পারদর্শিনী একজন মুখরা রমনী। তোমাকে টাইট দেওয়া দরকার।  


দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়ে অনুপম। চিত হয়ে পা নাচায় আর রাগ দমন করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। শেসে পুরো বিষয়টাকে অ্যান্টিথিসিস একটা সিনথিসিসে নিয়ে আসে। মেসের বেটিগুলোর দোষ কী ? ব্যাচেলররা এখানে থেকে চাকরি করে, চাকরি খোঁজে। এদের সবার বিয়ের বয়স পার হলেও বিয়ে করতে পারে না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে তাদের পেছনে মাসের বেতনের অর্ধেকটা চলে যাবে। ওসবের থেকে কাজের বুয়াই সস্তা। শুধু শুধু বুয়াকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সালাম জোয়ার্দার তো এক বিকেলে বুয়াকে সাজিয়ে-গুজিয়ে রমনা পার্কে নিয়ে গিয়ে চটপতি-ফুচকা খেয়ে এল। সবাই যখন জোয়ার্দারকে বলল –ব্যাপার কী ! হেসে উত্তর দেয় জোয়ার্দার, ব্যাপার তেমন কিছু না, এই একটু চেঞ্জ আর কী ! 


ডোরবেল টিপতেই দরজা খোলে শায়লা। পোশাক-পরিচ্ছদে সব সময় ভীষণ সচেতন সে। হালকা গোলাপি রঙের পাতলা ফতুয়া, তার সঙ্গে গাঢ় কালো জিন্স পরেছে। ওড়নাটা গলায় জড়ানো, ব্রাউন কালার করা চুল, উন্নত নাক, উঁচু বুক, সব মিলিয়ে শায়লা সবসময় অতুলনীয়া। আবার এ-ও হতা পারে, শায়লা সম্পর্কে অনুপমের উদার দৃষ্টিই শায়লাকে আর পাঁচজন নারী থেকে অতুলনীয় করে তুলেছে। একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেলেও জীবন নিয়ে ভীষণ আশাবাদী শায়লা। নিজের ফিগার, পোশাক, শরীরের রঙ- এসব নিয়ে তার ভাবনার অন্ত নেয়। শায়লা কথা বলে, 

- দেখে মনে হচ্ছে বেশ ভালো আছে ?

- আছি, তোমার অবস্থা কী ?

- ভালো, তোমাকে এত স্মার্ট লাগছে, কী  ব্যাপার ?

- কী জানি আমি তো নিজেকে দেখতে পাচ্ছি না। 

- আগে তো একটা নাম্বার ওয়ান ক্ষেত ছিলা, তাই না ? 

- আর এখন ?

- দারুণ। 

        

সোফার ওপর খুব কাছাকাছি বসেছে ওরা। 

দুজন দুজনার শরীরের গন্ধ পায়। শায়লা সব সময় সুগন্ধি ব্যবহার করে। অনুপম খুব বড় করে একটা শ্বাস টেনে নেই, এই মুহূর্তে ওটা একটা প্রানদায়িনী কিছু। প্রতিদিন সকালে উঠে মেসের খাবার, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা, বাসের ভেতর ঘণ্টার পর ঘন্টা বসে অথবা দাঁড়িয়ে থাকা, আবার রাতে মেসে ফিরে একদম ফালতু পলিটিক্স নিয়ে তর্ক-বিতর্ক। অসহ্য একঘেয়ে নিরানন্দ সব। অনুপম বলে, 

- এত ঝড়-ঝাপ্টার পরেও তুমি কিভাবে দাঁড়িয়ে আছ !

- দাঁড়িয়ে না থাকলে তো খড়কুটোর মতো ভেসে যাবো, তাই না ? 

- তোমার মুখ দেখে কিন্তু কিছুই বোঝা যায় না, মনে হয় তুমি আগের মতোই আছো। 

- সকালে একটা বুয়া আসে। ও সব পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে, রান্নাও করে, কিন্তু দুপুরে চলে যায়, রাতে থাকে না। 

- তাহলে রাতে ?

- রাতের জন্যে আর একজন আসে। কলেজে পড়া মেয়ে। রাতে থাকে। টিভি দেখে, গান শোনে, আশফাককে দেখে। আমি বাজারে গেলে ওর হাতে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে যাই। এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। 

- আত্মীয়স্বজন কাউকে এনে রাখা যায় না ? 

- না, ওর বা আমার তেমন তেমন কেউ নেই যে বেকার, এখানে থেকে সেবা দিতে পারবে। তা ছাড়া এটা সম্ভবও নয়। এখানে যারা থাকে, তদের আমি পে করি। ওরা আমার চলাফেরায় ইন্টারফেয়ার করে না, কিন্তু আত্মীয়স্বজন হলে নানা সমস্যা। তোমাকে অন্য একটা কথা বলি অনুপম …

- বলো …

- আমার আসলে একটা বড় অঙ্কের লোন দরকার। তোমাদের অফিস থেকে একটা লোনের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে?

- কেমন?

- ধরো দুই থেকে তিন লাখের মধ্যে।

- শোধ করবে কেমন করে !

- পারব, আমার বিশ্বাস আমি খুব কম সময়ে পরিশোধ করতে পারব। এই শহরে তরুণী মেয়েদের ওপর আমার অনেক আস্থা, তা ছাড়া ওরা ভীষণ পজিটিভ………

      

শায়লার শরীরের সুগন্ধি এখন ঘরময় ভেসে বেড়ায়। অনুপমের ভেতরে প্রচণ্ড কোলাহল। শায়লার সম্মতি পেলে এখনয় তাকে বুকের ভেতর জরিয়ে ধরে অজস্র চুমুতে ভরিয়ে দিত রঙিন ঠোঁট দুটো, তার বুক দলিত-মথিত হতো শক্ত হাতে। দ্রুত কল্পনায় একটা পরিপূর্ন সঙ্গমের ছবি আঁকে অনুপম  হাসান। শায়লা কি ভাবছে এখন ! সময়টা পার করা বড্ড কঠিন হয়ে পড়েছে অনুপমের। সে মৌনতা ভাঙে। 

- তুমি রেডি হও। সময় নষ্ট করে লাভ কী ?

- ও তো এখনো এল না ! ঘড়ি দেখে শায়লা, আনমনে কিছু বলে …


হঠাৎ ডোরবেল বেজে ওঠে। কে ? ও সেই মেয়েটা যে শায়লার কাছে থাকে, প্রতি মাসে শায়লা যাকে বেতন দেয়। 

অনুপম ভাবে সে মেয়েটা চলে এসেছে ! তাহলে নিশ্চয়ই একটু পরই তারা দুজন বের হতে পারবে। একটা ট্যাক্সি নেবে। তারপর ভোঁ করে ছুটবে সেই হোটেলটার দিকে। সেই সকালে দেখা বিজ্ঞাপন…পিৎজা অ্যান্ড পাস্তা…হ্যাভ নেভার বিন সো ফ্যাবিউলাস... পিৎজা অথবা পাস্তা…আবার সেই অশ্রুতপূর্ব পাখির ডাকের ছন্দে বেজে ওঠে ডোরবেলটা। উঠে দাঁড়ায় শায়লা, ঘড়ি দেখে…

- ভদ্রলোক এলেন মনে হয়। 

- ভদ্রলোক !

- ওই যে লোনের ব্যাপারটা, তোমাকে যেটা বলেছিলাম…….

- তুমি যে বললে সন্ধ্যায় কলেজের একটা মেয়ে আসে, রাতে থেকে…..

- হ্যাঁ, দুজনার একজন হবে। 

- বুঝলাম না লোন দেবে কে !

- এইচেএসবি ব্যাংকের ম্যানেজার সাহেব, উনিই লোনের ব্যবস্থা করে দেবেন…..

- কী নাম লোকটার ? 


শায়লা বিরক্ত হয় অথবা হয় না। অনুপমের কথার উত্তর দেবে কি দেবে না বোঝা যায় না। সে উঠে দাঁড়ায়। শায়লা এখন ধীরস্থির পায়ে হাঁটে। উত্তর দেয় শেষমেশ, 

- নামটা তো ঠিক জানি না, আমি একটা ফ্যাশান হাউসের জন্যে লোন চেয়েছি। ভদ্রলোক নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করে দেবেন (শায়লা দ্রুত কিছু ভাবছে) শায়লা বলে যাচ্ছে…


অনুপম, কলেজের সুন্দরী তরুণী মেয়েরা আমার সঙ্গে কাজ করবে, আমাদের টার্গেট হবে প্রথম দেশ, তারপর দেশ ছাড়িয়ে আমাদের পন্য বিদেশে রপ্তানি হবে, হবে মানে হবেই, তুমি দেখে নিও। শায়লা এবার অনুপমের একটা হাত ধরে….অনুপম অবাক হয়ে শায়লার দিকে তাকায়…শায়লা বলে, আমার সঙ্গে এসো, অনুপমকে বেডরুমে নিয়ে যায়, খাটের পাশে চেয়ারে বসিয়ে শায়লা কথা বলে যায়…… আশফাক ঘুমোচ্ছে…….ঘুম ভাঙলে তুমি বলবে, আপনাকে দেখতে এলাম…..কেমন আছেন ? আপনার স্ত্রীতো আপনাকে ইন্ডিয়ায় নিয়ে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে, বলবে মাদ্রাজে উন্নত চিকিৎসা চলবে……তুমি ওকে সাহস দেবে, বলবে….ভয়ের কিছু নেই, চিকিৎসা ঠিকমতো হলেই সব ভালো হয়ে যাবে….ও তো বিয়ের পর থেকেই তোমাকে চেনে তাই না……দেখবে ও কথা বলতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না…ওর ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠবে….বাম হাতটা একটু ওপরে ওঠানোর চেষ্টা করবে, কিন্তু পারবে না, শুধু চোখ দিয়ে জল গড়াবে…..তোমার দিকে অপলক চেয়ে থাকবে….হাজার প্রশ্ন থাকবে সেই চাহুনিতে, কিন্তু একটা প্রশ্নও করতে পারবে না তোমাকে….তুমি কিন্তু চুপ করে থাকবে না প্লিজ….শুনছ অনুপম…আগের কথাগুলোই রিপিট করে যাবে কেমন….ডোরবেল বেজে চলেছে। অদ্ভুত একটা ডোরবেল লাগিয়েছে শায়লা….বউ কথা কউ, বউ কথা কউ….শায়লা হাসে অথবা সে হাসে না, মনে হয় তার চোখ দিয়ে জল গড়ায়, সে বলে….বিয়ের পর আশফাক এই ডোরবেলটা লাগিয়েছিল…অফিস থেকে এসে ওটা টিপলেই এভাবে বেজে উঠতো। শায়লা বেডরুম থেকে ড্রইংরুমের দিকে হেঁটে যায়, মনে হয় ও দরজাটা খুলবে ।

গল্প বিভাগটি কেমন লাগছে, অনলাইনে মতামত লিখে জানান

অন্য জীবন

শর্মিলা চন্দ্র

টুকটুক হানিমুনে কোথায় যাবি ঠিক করলি? কিরে কোনও উত্তর দিচ্ছিস না কেন? প্রায় দু-তিনবার জিজ্ঞেস করার পর কোনও উত্তর না পেয়ে রান্না করতে করতে টুকটুকের মা ভাবল কি হল মেয়ে কোনও উত্তর দিচ্ছে না কেন, পরক্ষণেই  ভাবল রান্না ঘরের বাইরের ডাইনিং টেবিল থেকে উঠে গিয়ে হয়ত সে ঘরে চলে গেছে। রান্না ঘর থেকে হন্ততন্ত হয়ে বেড়িয়ে দেখল মেয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে একমনে কি যেন ভাবছে। মুচকি হেসে ভাবলেন মেয়েটার সদ্য বিয়ে হয়েছে। হয়ত সেই সব কথাই মেয়ে বিভোর হয়ে ভাবছে। মেয়েকে একটু চমকে দেওয়ার জন্য কাছে গিয়ে একটু ধাক্কা মেরে মজা করেই বলল কিরে সুব্রতকে নিয়ে ভাবতে এতটাই ব্যস্ত যে আমি তিন-চারবার একটা প্রশ্ন করলাম কোনও উত্তর দিলি না। এই সামান্য মজায় মেয়ে যা ভাবে ক্ষেপে গেল তাতে করুণাদেবী একরকম ভয় পেলেন। মেয়ে চিত্কার করে বলে উঠল মা সব সময় ইয়ারকি ভাল লাগে না। কি জিজ্ঞেস করছিলে বল? তোমার কি জানার আছে?

মা হতচকিত হয়ে বলল কি হয়েছে রে তোর? এইভাবে কথা বলছিস কেন? এরপরই মেয়ে কাঁদদে কাঁদদে নিজের ঘরে চলে গেল। মেয়ের এমন আচরণে মায়ের অনেক স্বপ্নই যেন একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করল। টুকটুক তাদের বড় আদরের একটি মাত্র মেয়ে। অনেক স্বাদ করে নিজেদের পছন্দ করা ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। শ্বশুড় বাড়িতে শুধু সুব্রত আর তার মা। সুব্রতর যখন ১৫ বছর বয়স তখন ওর বাবা মারা গিয়েছেন। সুব্রতর বাবা কলেজের প্রফেসর ছিলেন। মাও কলেজে পড়াতেন। এখন রিটায়ার্ড করেছেন। সুব্রতর একটা মাত্র দিদি, তারও বিয়ে হয়ে গিয়েছে। থাকে ইউএসএ-তে। বছরে এক থেকে দু বেশি এই শহরে আসে না। বিয়ের সম্বন্ধ করার সময় ভেবেছিলেন ছোট ফ্যামিলি। মেয়ে হয়ত সুখেই থাকবে। গ্র‌্যাজুয়েশন পাশ করার পর মেয়ে প্রাইভেট ফর্মে কাজে ঢোকার কিছুদিনের মধ্যেই এই সম্বন্ধ আসে। এমন ভালো ঘর-বড় আর হাতছাড়া করতে চায়নি টুকটুকের বাবা-মা। টুকটুকের বাবা কলকাতার নামী স্কুলের শিক্ষক। মেয়েকে ছোট থেকে ভালো ভাবে বড় যত্ন করেই মানুষ করেছেন। কিন্তু বিয়ের পর হঠাত্ কি হল? অষ্টমঙ্গলায় আসার পর মেয়ের এই আচরণে মায়ের মনটা কেঁদে উঠল। অনেক ভাবার পর ঠিক করলেন টুকটুকের বাবার সঙ্গে কথা বলে মেয়ের সঙ্গে কথা বলে জানবেন ওর ঠিক কি হয়েছে। কেন সে এমন আচরণ করছে?

দুপুরে খাবার টেবিলেও বেশ অন্যমনস্ক লাগছিল তাকে। ভাবলেন সুব্রতর সঙ্গে কিছু হয়েছে নাকি? আবার ভাবলেন না কালকে যখন টুকটুককে রেখে গেল, তখন ঠিকই তো মনে হল। দু মধ্যে কোনও রকম ঝামেলা থাকতে পারে বলে তো মনে হল না।

আমারও পরান যাহা চায়,তুমি তায়, তুমি তায় গো হঠাত্ টুকটুকের ফোনটা বেজে উঠল। ভাবল হয়ত সুব্রত ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করতে গিয়ে দেখল তার ছোটবেলার বন্ধু রিমঝিম। একরকম বাধ্য হয়েই ফোনটা ধরল। ওপার থেকে রিমঝিম বলে উঠল কিরে টুকটুক নতুন লাইফ কেমন এনজয় করছিস? হানিমুনে কোথায় যাবি কিছু ঠিক করলি? এই ধরণের প্রশ্নে সে একটু বিব্রতই হল। টুকটুক অনেক কষ্টে বলল না রে এখনও কিছু ঠিক হয়নি। হলে তোকে জানাব বলেই ফোনটা কেটে দিল। যে মেয়েটা ফোন করলে কত কথা বলে, কত মজা করে আর আজ শুধু দু কথা বলে ফোন কেটে দিল! টুকটুকের এই আচরণে রিমঝিমও অবাক না হয়ে পারল না।

ফোন রাখার পর টুকটুক নিজের মনেই ভাবল আমার জীবনে হানিমুন কি সত্যি কোনও দিন হবে? বৌভাতের রাত্রে কেন সুব্রতর মা টুকটুকের হাত ধরে বলে ছিল আজ থেকে আমার ছেলেকে নিয়ে নিলে? অষ্টমঙ্গলায় আসার আগের দিন রাত্রে টুকটুক যা দেখেছে সেটা কি সত্যি?

এই সব ভাবতে ভাবতে হঠাত্ টুকটুকের ঘরে ওর বাবা ঢুকলেন। কি ব্যাপার টুকটুক সন্ধে হয়ে গিয়েছে এখনও ঘরের আলো জ্বাল নি কেন? আমার জীবনের আলো চলে গেছে বাবা। টুকটুক এটা কি বলল? বাবা নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। মেয়েকে তিনি বড্ড ভালোবাসেন। মেয়ের কাছে বসে বললেন, কি হয়েছে তোর মা? এইভাবে মন মরা হয়ে বসে আছিস কেন? স্কুল থেকে ফেরার পর তোর মা বলছিল তুই নাকি আজ সারাদিন অন্যমনস্ক হয়ে ছিলিস। ঠিক মত খাওয়া-দাওয়া করিসনি। কি হয়েছে বল? মেয়ে যা দেখেছে সে কথা বাবাকে কি করে বলবে।

হঠাত্ই কলিং বেলটা বেজে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মা টুকটুকের ছোটবেলার বন্ধু রিমঝিমকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন দেখ না মেয়েটার কি হয়েছে, সারাদিন চুপচাপ বসে আছে। হ্ঁযা কাকিমা আমিও তো ওকে বিকেলের দিকে ফোন করেছিলাম, ও যে ভাবে কথা বলল আমার তো ভয় লাগল, তাই তো অফিস থেকে ফেরার পথে দেখা করত এলাম। টুকটুকের বাবা-মা দু  বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল, যাওয়ার সময় বলে গেল আমার মেয়েটাকে একটু স্বাভাবিক করে দে রিমঝিম।

রিমঝিমকে দেখে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল টুকটুক। এইভাবে কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে? তুই জিজ্ঞেস করছিলিস না রিমঝিম আমারা হানিমুনে কবে যাব? হ্ঁযা, প্রশ্নটা কি ভুল করেছি? মুচকি হেসে টুকটুক বলল না আমার আর হানিমুন হবে না। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটাই এখনও পর‌্যন্ত ঠিকভাবে তৈরি হয়নি। আর কোনও দিন হবে বলেও মনে হয় না। হানিমুন তো অনেক পরের কথা। টুকটুকের এই কথা শুনে রিমঝিমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তুই কি পাগল হয়ে গেলি নাকি টুকটুক? তোর কি হয়েছে বলত? এরকম পাগলের মত কথা কেন বলছিস? সুব্রতদার সঙ্গে কিছু হয়েছে?

জানিস ফুলশয্যার দিন অনেক রাত করে সুব্রত আমার ঘরে এসেছিল। বৌভাতের দিন সকালে হঠাত্ ওর মা আমাকে বলেছিল আজ থেকে আমার ছেলেকে নিয়ে নিলে? ভেবেছিলাম হয়ত, মজা করছে, ওর মায়ের এই কথা শুনে আমি বলেছিলাম, আপনার ছেলে আপনারই থাকবে। তখন বুঝিনি কেন তিনি এইকথা বলেছিলেন? রিমঝিম উদ্বিগ্ন হয়ে বলল কেন, কেন বলেছিল বল? ফুলশয্যার দিন ওর জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ও এসে কখন শুয়ে পড়েছে বুঝতে পারিনি। সকালে ঘুম থেকে উঠতে যাব দেখলাম ওর হাত আমার গায়ের উপর। ভেতরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা হচ্ছিল। হাতটা আস্তে করে সরাতেই ওর ঘুমটা ভেঙে গেল, সত্যি কথা বলত আমি অপেক্ষা করছিলাম হয়ত ও আমাকে কাছে টেনে নেবে। আমার সব আড়াল সরিয়ে আমাকে আপন করে নেবে। নিজের মনে মনে একটু রাগও হচ্ছিল, কেন রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম? এইদিনটা নিয়ে তো কত কিছু ভেবে রেখেছিলাম। দেখলাম ও ওপাশ ফিরে শুল। ভাবলাম হয়ত ঘুমিয়ে পড়েছি বলে অভিমান করেছে। ভয় ভয় জিজ্ঞেস করলাম কাল ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বলে রাগ করেছ? ও কি উত্তর দিল জানিস? বলল না না ভাল করেছে ঘুমিয়ে পড়েছ, আমার আসতে একটু দেরি হয়েছিল। ভাবলাম বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। ওর মা একা মানুষ, হয়ত সব কিছু সামলে আসতে দেরি হয়েছে। কিন্তু না, পরদিন বাড়িতে আমরা তিনজন। রাতে খাওয়ার পর সুব্রত বলল তুমি গিয়ে শুয়ে পড়, আমি আসছি। বলে রাত দু সময় ঘরে এল। সেদিন জোর করেই জেগে ছিলাম, আসার পর জিজ্ঞেস করায় বলল মায়ের ঘরে ছিলাম, সারাদিন বাড়ি থাকি না, তাই রাতে অফিস থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে মায়ের সঙ্গে রোজ গল্প করে শুতে একটু রাত হয়। এতদিন তাই করতাম, এখন না থাকলে মা হয়ত ভাববেন বিয়ের পর ছেলে পাল্টে গেল, তাই আর কি। মনে মনে ভাবলাম এইকদিন তো বাড়িতেই ছিলে, তারপর ভাবলাম সত্যি এতদিন ছেলেকে একা মানুষ করেছেন, ওর বাবাও অনেকদিন মারা গিয়েছেন। ছেলেকে একরকম চোখে হারান। ছেলেকে বড্ড ভালোবাসেন। ছেলে সারাদিন বাড়ির বাইরে থাকে। তাই বাড়ি এসে মায়ের সঙ্গেই পুরো সময়টা কাটায়। বুঝলাম মা-ছেলের মধ্যে অদ্ভুত একটা টান তৈরি হয়েছে, স্নেহের বাঁধনটা অনেকটাই পোক্ত। কিন্তু সেটা যে অন্যরকম সেটা আমি কল্পনাও করতে পারছি না রিমঝিম। এই ক রোজই রাতে ও দেরি করে ঘরে আসত। আমি অপেক্ষা করে করে ঘুমিয়ে পড়তাম, যেদিন এই বাড়িতে এলাম, তার আগের দিনও একই ঘটনা, আমি অপেক্ষা করে করে ভাবলাম একবার ওর মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি, ও কি করছি। গিয়ে দেখলাম মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর বলছে, তোর বউকে দেখলে আমার খুব রাগ হয়। তুই কথা দে ওই মেয়ের সঙ্গে তুই কোনও রকম সম্পর্ক তৈরি করবি না। তুই অন্য কাউকে নিয়ে থাকবি না, এটা আমি মানতে পারব না। সুব্রতও বলছিল, আমার বিয়েটা কেন দিলে মা? উত্তরে মা বলল, কি করব তোর দিদি বারবার বলছিল ভাইয়ের কবে বিয়ে দেবে? আত্মীয়-স্বজন সবাই জিজ্ঞেস করছিল। সবার মুখ বন্ধ করার জন্যই তো বিয়েটা দিলাম। আরও দেখলাম মায়ের বুকের কাপড়টা সরান রয়েছে। এটাও কি সম্ভব বল? টুকটুক অঝোরে কাঁদছিল আর বলছিল কেন আমার এতবড় সর্বনাশ করল? নিজের সবথেকে কাছের বন্ধুর এই পরিস্থিতি দেখে কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না রিমঝিম। হঠাত্ আবার কলিং বেলের আওয়াজে দু চমকে উঠল। এখন আবার কে এল? একটু বিরক্ত হয়েই রিমঝিমকে কথাটা বলল টুকটুক। কিছুক্ষণ পরেই রিমঝিমের ঘরের দরজায় কে যেন টোকা দিল। রিমঝিম দরজা খুলতেই ওর ভত দেখার মত অবস্থা হল। সুব্রতদা তুমি? নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না টুকটুক। সুব্রত এক পা এক পা করে ঘরে ঢুকতেই টুকটুক বলে উঠল এখানে কি চাই তোমার? তোমার মা জানেন তুমি আজ এখানে এসেছ? আজ না হয় কাল আমি তোমার কাছে আসতাম টুকটুক। আজ দুপুরে তোমার মা ফোন করে তোমার কথা বললেন, তাই আজ না এসে পারলাম না। আমার ভেতরে ভেতরে কি হচ্ছে সেটা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। টুকটুক তোমায় আমি কষ্ট দিতে চাই না। আমারও কষ্ট হয়। কিন্তু টুকটুক হাত জোর করে বলছি পারলে আমায় ক্ষমা কর প্লিজ...

শৈশবের সন্ধানে

শর্মিলা চন্দ্র

ঝুম তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। একটু পরেই ম্যাম চলে আসবেন, পড়তে বসতে হবে। ঘড়িতে তখন ৫.৩০টা বাজবে বাজবে করছে। সবে মাত্র স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে খেতে বসেছে তিয়াস। কোনও রকমে খাওয়া শেষ করা ছাড়া উপায় নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন ম্যাম। তাঁর কাছে পড়া শেষ করেই বসে পড়তে হবে স্কুলের টাক্স নিয়ে। তার সঙ্গে রয়েছে ম্যামের হোম ওয়ার্ক কমপ্লিট করার পর্ব। রাতে খাওয়ার পর একটু টিভি দেখতে বসলে চোখে য়ত রাজ্যের ঘুম এসে ভিড় করে ঝুমের। সে এখন ক্লাস ফাউভের স্টুডেন্ট। পড়াশোনার চাপও কম নয়। সোম থেকে শনি স্কুল আর টিউশন নিয়েই কেটে যায়। রবিবার স্কুল ছুটি থাকালেও ছুটিটা এনজয় করে কাটানোর ফুরসত পায় না ঝুম। কারণ সকালে থাকে আঁকার ক্লাস, তারপর বিকেলে নাচের ক্লাস। 

বাবার ইচ্ছে ছিল আদরের একমাত্র মেয়েকে গান শেখাবেন। আর মায়ের পছন্দ নাচ। আর পাঁচটা বাবা-মায়ের মত ওরা কিন্তু ঝুমের পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগা- না লাগা, ইচ্ছে-অনিচ্ছাকে গুরুত্ব দেননি। আবাসনের আর পাঁচটা বাচ্চার মতো ঝুমকেও তো তাদের সমতুল্য করে তৈরি করতে হবে। না হলে যে ওদের বাবা-মায়েদের কাছে লজ্জায় মুখ লোকাতে হবে। তাই মায়ের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়েই শুরু হল ঝুমের নাচের ক্লাস। সঙ্গে দিদুনের ইচ্ছায় আঁকার ক্লাস তো রয়েছেই। কয়েকদিন আগে ঝুমের আঁকার স্কুলে ছিল পরীক্ষা। কিন্তু সেই পরীক্ষা ভাল হয়নি। মায়ের হাতে খাতা দেওয়ার সময় আঁকার স্যার অসীম ঘোষ পরিষ্কার বললেন, ঝুমের আঁকার প্রতি মনোযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। পরীক্ষার ফলও ভাল হয়নি। ঝুমের আঁকার প্রতি নজর দেওয়ার কথাই সেদিন ঝুমের মাকে বলেছিলেন আঁকার স্যার। বাড়িতে এসে সেদিন মেয়েকে খুব বকাবাকিও করেছিলেন। মায়ের কাছে বকুনি শুনে কাঁদতে কাঁদতে সেদিন ঝুম ওর মাকে একটাই কথা জিজ্ঞেস করেছিল, কখন প্র্যাকটিস করব মা?  মেয়ের সেই প্রশ্নের কোনও পাত্তা না দিয়েই মায়ের সোজা উত্তর ছিল , আঁকার স্কুলে যখন ভর্তি হয়েছে তখন পড়াশোনার ফাঁকে আঁকাটাও ভালো করে শিখতে হবে। মায়ের বকুনি আর মেয়ের আকুতি চুপচাপ শুনছিল ঝুমের বাবা। সব কথা শোনার পর ঝুমের বাবার মনে প্রশ্ন জাগল, তাঁর ছোট্ট তিয়াস কখনই বা সময় পাবে ভাল করে প্র্যাকটিস করে পরীক্ষা দেওয়ার। এক নিমেষে হারিয়ে গিয়েছিল নিজের শৈশবে। তিয়াসের মত যখন ক্লাস ফাইভের ছাত্র ছিলেন, তখন তো উদ্যাম শৈশব কাটানোর ফুরসত পেয়েছিলেন। অলোকবাবুর ছোটবেলাটা কেটেছে মেদিনীপুরে গ্রামের বাড়িতে। সকালে ঘুমথেকে উঠে পাশের বাড়িতে স্যারের কাছে পড়তে যাওয়া। তারপর স্কুল। সেখানেও টিফিনের সময় বড় মাঠে খেলাষ এরপর স্কুল থেকে ফিরেই কোনও রকমের ব্যাগটা রেখে ছুঁটে যাওয়া বাড়ির সামনের মাঠটাতে। সেখান থেকে বাড়ি ফেরার যেন কোনও তাগিদই থাকত না। শেষে প্রায় সন্ধের মুখে মা ডাকতে গেলে তবে ঘরে ফেরা হত। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে বই নিয়ে পড়তে বসা। পড়া শেষ করে ইচ্ছে হলে গল্পের বই খুলে পড়ারও সময় পেতেন তখন। এইসব ভাবতে ভাবতেই হঠাত্ ঝুমের মায়ের ডাকে সম্বিত্ ফিরে পেলেন। টেবিলে খাবার দিয়েছে, খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়, আবার সকাল সকালউঠতে হবে। শৈশবে হারিয়ে যেতে বোধহয় সকলেরই ভালো লাগে।

রাতের খাওয়া শেষ করে সোফার এক কোণে বসে আবার ফিরে গেলেন শৈশবে। হঠাত্ মনে পড়ে গেল কলেজের দিনগুলোর কথা। কলেজে পড়ার সময়েই কলকাতায় আসা। আর তখন থেকেই জীবনটা যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছে। সারাদিন ছোটা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। ভাবলেন কতদিন খোলা আকাশের নীচে প্রাণ ভরে মুক্ত বাতাসের স্বাদ পাননি। অফিসের কাজের চাপে গ্রামের বাড়িতেও অনেকদিন যাওয়া হয়নি। নিজের শৈশবের সঙ্গে ঝুমের শৈশবের তুলনা করতে গিয়ে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। মনে মনে বলে উঠলেন, আমার তো কলেজে পড়ার সময় থেকে জীবনটা যান্ত্রিক হয়েছে, আর ঝুমের তো এই বয়স থেকেই জীবনটা একটু একটু করে যান্ত্রিক হতে শুরু করেছে। ভাবলেন আমাদের সময় অবসর কাটত বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করে, না হলে গল্পের বই পড়ে। একটু বড় হতে টিফিনের পয়সা বাড়ির লোককে লুকিয়ে হলে গিয়ে সিনেমা দেখে। আর আজ পড়াশোনার ফাঁকে সেই অবসরটা কোথায়? কারণ এখন জীবনটায় যেন বেশি করে দখল নিয়েছে হোম টিউটর, এক্সট্রা কারিকুলাম। ভাবতে ভাবতে বেশ কষ্টই পেলেন ঝুমের বাবা। ভাবলেন এখন স্কুল, কলেজ, অফিস সব জায়গায় ফার্স্ট পডিশন পাওয়ার লড়াই শুরু হয়েছে। অবশ্য ভাবলেন এখানে বাচ্চাদের আর দোষ কোথায়। তাঁদের মনে ফার্স্ট হওয়ার লড়াইয়ের বীজটা তো পোঁতেন তাদের অভিভাবকেরাই। সব সময় সন্তানদের একটা কথাই তো বলেন, সব কিছুতে প্রথম স্থান পেতে। না হলে কম্পিটিশনের দৌড় থেকে পিছিয়ে পড়বে। নিজের শৈশবের কথা ভাবতে গিয়ে ঝুমের বাবা মনে মনে হাসলেন আর ভাবলেন এখনকার বাচ্চারা তো অবসর কাটায় বোকা বাক্সর সামনে বসে। মোবাইলে গেম খেলে। বাইরে গিয়ে খোলা আকাশের নীচে খেলার স্বাদ পাওয়াটা তো এখন প্রায় সব বাচ্চার জীবন থেকেই হারাতে বসেছে।

শহর কলকাতায় এক টুকরো সবুজ মাঠের বড়ই অভাব। আর স্বামী-স্ত্রীর চাকরির সুবাদে ঝুমের শৈশব আজ পড়াশোনা আর এক্সট্রা কারিকুলামে বন্দি। শুধুমাত্র শহর কলকাতায় নয় এর কড়াল দৃষ্টি পড়েছে মফসলেও। সেখানেও ঝুমের মতো অনেক বাচ্চার জীবন থেকে মুছে গিয়েছে সবুজ ঘাসের ঘ্রাণ।

শৈশবের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাত্ নিজের মনেই বলে উঠলেন শৈশবে যদি একবার ফিরে যেতে পারতাম থাকার সময় জীবনটাকে অন্য ভাবে উপভোগ করেছিলাম। কিন্তু, ঝুমের মতো অনেকেই আজ ছোট থেকেেই এই স্বাদ পেতে বঞ্চিত। ভাবলেন তিয়াসকেও যদি একবারের জন্য জীবনের সেই স্বাদটা বোঝাতে পারতেন। 

অর্ন্তদ্বন্দ্ব

কৃষাণু

মেট্রো ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকের গলিটা ভীষণ সরু, নিত্যযাত্রীদের অফিস-টাইমে রীতিমত ঠেলাঠেলি করেই মেন রাস্তায় উঠতে হয়। গলির মুখটাতে আবার একটা পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকান, সেখানে যদি কোনও গ্রাহক দাঁড়িয়ে থাকে তো বিপজ্জনক। ঠেলাঠেলি করে কোনমতে ফুটপাতে উঠতেই দেখি ফলের রসের দোকানটা সুড়সুড় করে আরও এগিয়ে আসছে। অফিসে টাইমে কোথাও এতটুকু দাড়িয়ে পড়লে ভীষণ রাগ হয়, মনে হয় এইজন্যই বুঝি, আবার না বড়বাবুর রক্তচক্ষু দেখতে হয়। এবার যাহোক তাহোক করে একটা দৈনিক খবরের কাগজ কিনে বিরক্তিভরে হন হন করে হাঁটা দিই।

অফিসের বাইরের গেট থেকে চার পাঁচ পা পিছিয়ে এক বৃদ্ধা তোবড়ানো স্টিলের বাটি হাতে নিয়মিত ভিক্ষা করে। আমি শত ব্যস্ততায়ও ওই ভিখিরিকে দু-টাকা অথবা এক-টাকা হাতের কাছে বা বুকপকেটে যা থাকে দেই। ওই ভিখিরিকে সোলো কিংবা বত্রিশ আনা দিয়ে মনের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি হয়; একটা মানুষকে তো কিছুটা সাহায্য করতে পারলাম; এত মানুষের ভিড়ে আর নিত্য কলহের মাঝে; কিছুটা পুণ্যি তো কামালাম; না হয় কিছুটা পয়সা রোজ রোজ খসছে তাতে কি! এক হত-দরিদ্র বৃদ্ধ মানুষের পাশে তো দাঁড়ালাম। 

বৃদ্ধার করুন মুখটা দেখলেই বুকের মধ্যে কেমন যেন করে ওঠে। সাথে সাথে পকেটের খুচরো থেকে বেছে বেছে এক কিংবা দুই টাকার কয়েনটাই বার করে দেই, কখনো কখনো অফিসের কোনও সহকর্মী ব্যাপারটা দেখলে একটু গর্বিতও বোধ করি। মানুষটি আমায় উপকারী আর ভালোমানুষ হিসাবেই ভাববে। কতজনই বা আজকের যুগে এরম কর্ম রোজ রোজ করে, পালা করে ভিখিরিকে টাকা দেওয়াটাও একটা মহত কাজ এসব ভাবনায় মজে যায় মন। কোনও প্রবল সাংসারিক কিংবা অফিসের চাপে পড়লে অথবা খুচরো কোনও পাপ বোধে মনে মনে ভাবি একটা পুণ্যের উৎস তো আছে আমার কাছে। সেই ভাঙ্গিয়েই এভাবে বেশ কাটছিলো দিন। একদিন হটাত আশ্চর্য এক ঘটনার সম্মুখীন হতে হলো।

সেদিন বুকপকেটে ছিল মোবাইল ফোন, দুটো পাঁচশো টাকার নোট আর তার নিচে কিছু খুচরো পয়সা; যা বার করতে করতে কখন যে বেখেয়ালে একটা পাঁচশো টাকার নোট পড়ে যায় বুঝতেই পারিনি। আমি যথারীতি অফিসে পৌঁছে যাই, টিফিন বরাবরই বাড়ি থেকে নিয়ে যাই বলে অফিসে সাধারণত টাকার প্রয়োজন হয় না। বাড়ি ফেরার সময় সংসারের খুচরো বাজার করতে গিয়ে হটাত নজরে আসে আমার পকেটে একটা পাঁচশো টাকার নোট নেই। 

আমি ধন্দে পরে যাই, কোথায় পড়ে গেল, কোথায়ই বা পড়বে, আলগাভাবে কি রাস্তায় পড়ে গেল, এইসব ভাবতে ভাবতে বাড়ি ফিরলাম। রাতে মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগলো ওই খবরের কাগজের দোকানে পড়ল নাতো। না! তাতো সম্ভব নয় কারণ ওরকম দোকান; যদি কেউ পেয়েই থাকে; ফেরার সময়ে তো একটা ম্যাগাজিন কিনলাম; নিশ্চয়ই বলতো; বলেনি মানে নিশ্চয় ওই বুড়ি ভিখিরিটাই নিয়েছে; ঠিক খুচরো বার করতে গেছি আর ওমনি পড়ে গেছে।

একে তো ভিখিরি  তার উপর পাঁচশো টাকার নোট। ওই বুড়িটার লটারি লেগে গেলো, আমার থেকে প্রায় এক বছরের টাকা ও একসাথে হাতিয়েছে, ও কি আর দেবে। মাসের শেষ, আমার এতবড় ক্ষতি হয়ে গেলো, এইজন্যই ভিখিরিদের কিছু দিতে নেই, এবার দিলে খুচরো পকেটে রেখেই দেব। ওই বুড়িকে তো আর কোনও দিনই দেবো না, আর কেনইবা দেবো, এত করেও আমার এই পরিণতি হলো। আমার রাগে আর মন খারাপে এই সব ভাবতে ভাবতে সেই রাতে আর ঘুম এলো না। মাথার  ঘাম পায়ে ফেলে এত কষ্টের কামাই, ওই বুড়িটার মতন বাটি হাতে করে তো ফাউ আসছে না। 

আমি পরদিন সকাল হতে আর ওই টাকা নিয়ে ভাবি না। যা গেছে তা গেছে আর তো ফিরে আসবে না, আর ওই যে নিয়েছে তা তো একটা সম্ভাবনা, এরম চরম ভাবাটাও ঠিক নই। তবে একটা সিদ্ধান্ত আমি নেই, আর কখনো কাউকে ভিক্ষা দেব না, মন্দিরে হয়তো কখনো সখনো, সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন্য ব্যাপার। 

পরদিন নিয়মমাফিক দৈনিক খবরের কাগজ কিনতে গিয়ে শুনি, কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, কাল রাতে নাকি এই চার-মাথার ক্রসিংএ এক বৃদ্ধা গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায়, কেউ বা আবার বলে বিহারের মুঞের এ নাকি বাড়ি ছিল ওই বৃদ্ধার আর তার পরিচিত লোকেদের খোঁজ চলছে। 

বারোতলায় লিফট থেকে বেরিয়েই অফিসের দরজা, ঢুকেই বাঁ হাতে হাজিরা খাতায় সই করতে না করতেই বড়বাবু আমায় জোর গলায় হাঁক দেয়,

মিত্র-বাবু, শুনবেন একটু,

হ্যাঁ বলুন,

এক বৃদ্ধা এসেছিল আপনার খোঁজে 

আমার খোঁজে আবার বৃদ্ধা, আমায় সে চেনে, কি নাম বলুন তো

নাম জানা নেই তবে আপনার রং চশমা আর গঠনের বিবরণ যা দিলেন, তাতে আমি কিছুটা আন্দাজ করি আর আপনার ব্যাগের কথা বলতেই আমি বুঝতে পারি হ্যাঁ আপনাকেই উনি খুঁজছিলেন।

তা কি বললেন সেই বৃদ্ধা  কেনই বা দেখা করতে এসেছিলেন।

আসলে আপনি হয়ত কখনো ওনাকে পাঁচশো টাকা ধার দিয়েছিলেন উনি সেটাই ফিরত দিয়ে গেলেন। আমি বললাম অফিস বন্ধ হয়ে গেছে সোমবার আসতে, উনি তা কিছুতেই শুনলেন না, আর রীতিমত জোর করেই টাকাটা আমায় দিয়ে বললেন, বাবা এই বয়স, আজ আছি কাল নেই কারোর ঋণ নিয়ে যাওয়াটা ঠিক নয়।

এই-বলে বড়বাবু সেই দোমড়ানো পাঁচশো টাকাটা আমার হাতে দিয়ে দিলেন। হাতের মুঠো খুলতেই ভাঁজ হওয়া গান্ধীজীর ছবিটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে উঠছে। মেট্রো লাগোয়া রাস্তাটা আরও সরু হয়ে দুপাশের দেওয়ালেরা কেমন চেপে ধরছে আমায়। দয়া দাক্ষিণ্য, পাপ পুণ্যের ব্যবধান কেন জানি না বেড়েই  চলেছে। আলো আঁধারি রাস্তায় বসে থাকা ওই বৃদ্ধাটি তবে কে, কিই বা তার পরিচয়, কোথায়ই বা ছিল তার ঘর। জীবনে এতটা পথ চলে, আজ কেন জানি না নিজেকে কেমন ভিখিরি  ভিখিরি মনে হয়। মুঠোর মধ্যে ওই পাঁচশো টাকার তোবড়ানো নোটখানি এই মানবিকতার জাহাজ মনের কাঙ্গাল-রূপ কত সাবলীল ভাবে উন্মোচন করে দিলো।

শাহানা 

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী 

(সম্পূর্ণ কাল্পনিক এই গল্পের সঙ্গে কারওর কোন সামঞ্জস্য নেই)

বাড়ী সুদ্ধু সকলে কাঁদতে লাগলো। মেয়েটাকে বাঁচান গেল না। চিকিৎসার অভাবে মেয়েটা ছটপট করে মারা গেল। অসুখ ধরা পড়ার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। আঠারো বছরের মেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া এই প্রথম ঘটনা না। এরকম অনেক বাচ্চা,বুড়ো,বুড়ি,যুবতিকে প্রাণ হারাতে দেখা গিয়েছে এই এলাকায়। এলাকায় কোন ডাক্তারখানা নেই কিম্বা কোন ডাক্তার এই গ্রামে থাকতে চান না। যাতায়াতের অসুবিধা। রাস্তা মেরামত হয় না। প্রশাসন নিষ্ক্রিয়। অভিযোগ শোনার কেউ নেই। ভোটের সময় এমএলএ আসেন প্রতিশ্রুতি দেন তারপর পাঁচ বছর নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমোন।

যে মেয়েটি মারা গেল তার নাম ‘শাহানা’। এই পরের বছর 'নিকার' ঠিক হয়েছিল পাশের গ্রামের ছেলে সাকিল আহাম্মদের সঙ্গে। ছেলেটি পড়াশুনো করেছে। স্কুল ফাইনালের পর কম্পিউটার শিখে নিজেই একটা চাকরি যোগাড় করেছে কলকাতায়। ওখানে থেকেই বি.কম পড়ছে আবার চাকরিও করছে। খুব ভালো ছেলে। তাই শাহানার বড় ভাই ‘মীর আলী’, বোনের জন্য যোগ্য পাত্র হিসেবে ‘সাকিল’ কে পছন্দ করে। সাকিলের বাবা মা এসে ‘শাহানা’ কে দেখে যান। ওনারা পরের বছর ওদের নিকার দিন স্থির করেন। রক্ষণশীল পরিবার তাই বিয়ের আগে কেউই কাউকে দেখে নি।

শাহানা, বান্ধবীদের মাধ্যমে ‘সাকিলের’ কথা জানত কারন ওর স্কুলের বান্ধবীরা ওই গ্রাম থেকে আসে স্কুলে পড়তে। সাকিলের মামাতো বোন ‘নুর’ আবার শাহানার বান্ধবী। ওরা একই ক্লাসে পড়ত। শাহানা স্কুল ফাইনালের পর আর পড়াশুনো করার সুযোগ পায়নি। গ্রামের কাছে কলেজ নেই তাই পড়ায় ফুল স্টপ।

এই হচ্ছে এই গল্পের পূর্বাভাষ।

শাহানা সাকিলের ‘নিকা’ ঠিক হয়েও আল্লা তাদের সহায় হলেন না। শাহানার অকাল মৃত্যু, তার ভাই মীর আলীর মনে সবচেয়ে বেশি দুঃখ দেয়। সে মনে মনে স্থির করে এই গ্রামে একটা ছোট হাসপাতাল করবে। তাই সে ট্যাক্সি চালিয়ে যা রোজগার করত তা ছাড়াও প্যাসেঞ্জারদের কাছ থেকে রসিদের বই হাতে কিছু সাহায্য চাইতো তাদের গ্রামের হাসপাতাল তৈরির জন্য। কেউ দিত কেউ দিত-না। ৫ টাকা ১০ টাকা করে দিন দিন কঠোর পরিশ্রমে এবং গ্রামের কিছু সহৃদয় ব্যক্তির উদ্যমে প্রথমে একটি ঘর করে। যে জায়গাটার ওপর হাসপাতালের জন্য ঘর হয় সেটা ওদের বাপ ঠাকুরদা আমলের জায়গা। সেই জায়গা “শাহানা মেমোরিয়াল চ্যারিটেবল হসপিটাল” এর নামে রেজিস্ট্রি করে এবং একটা ট্রাস্ট বানায়। ট্রাস্টি মেম্বার হিসেবে কিছু গ্রামের সহৃদয় ব্যক্তি বিশেষ করে, যারা তাকে প্রচুর সাহায্য করেছে। তাদের নেয় এবং সেই মেম্বারদের দ্বারা নিজে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। সাকিলও তাতে থাকে।

আস্তে আস্তে হাসপাতাল আরম্ভ হয় ১০টি শয্যা বিশিষ্ট এবং একজন রিটায়ার্ড আর্মি ডাক্তারকে নিয়ে, যার নাম “মেজর শেখ নুরুল হাসান, এম.ডি ”। উনি কোন টাকা পয়সা না নিয়ে ওই ডাক্তারখানায় সকাল ৮ টা থেকে ১২টা অবধি পেসেন্ট দেখতেন। নিজে রোগীদের ফিজিসিয়ান স্যাম্পল থেকে ওষুধ দিতেন। কিছু পেসেন্ট যারা টাকা দেওয়ার সামর্থ্য রাখতো তারা ওষুধ কিনে নিত। ওই এলাকায় এন্সেফালাইটিশ (মস্তিষ্ক জ্বর) দেখা দিয়েছিল এবং তাতেই সম্ভবত শাহানার মৃত্যু হয় বলে অনুমান করেন ডাক্তার হাসান। বেশ ভালো কাটছিল। “শাহানা মেমোরিয়াল চ্যারিটেবল হসপিটাল” এ ডোনেসন দিলে যাতে আয়কর থেকে রেহাতি পাওয়া যায় তার জন্য মীর , আয়কর দপ্তর থেকে এবং কেন্দ্র সরকার থেকে অনুমোদন আনে। এরজন্য দিল্লী দৌড়য় বারে বারে। অনেক খড় কুটো পুড়িয়ে আজ হাসপাতাল ৫০ বেডের হাসপাতালে উন্নীত হয়। বেচারা মীর রাত দিন এক করে ওই হাসপাতালের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য। তার সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল তিনতলা নার্সিংহোমে পরিণত হয়। এখন চারজন ডাক্তার এবং ১২ জন নার্স। দুজন স্পেশালিষ্ট মেডিসিন এবং গাইনিক রয়েছে। তারা সবাই সপ্তাহে তিনদিন আসেন। একটা মেডিসিন ষ্টোর করেছে। প্যাথলজিষ্ট এবং স্যাম্পেল কালেক্টার মিলে ১২ জন। কিছু স্বেচ্ছাসেবী আছে তাদের মধ্যে যারা টাকা পয়সা না নিয়ে শ্রমদান করে।

ব্যাস এবার ওই হাসপাতালের ওপর কুনজর পড়ে স্থানীয় বিধায়ক মহাশয়ের। উনি নিজে ওর চেয়ারম্যান হওয়র জন্য উঠে পড়ে লেগে পড়েন। এরপর আরম্ভ হয় রাজনীতি। কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে স্থানীয় বিধায়ক ওই ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হতে চান। বলা বাহুল্য এতে মেম্বাররা কেউ রাজি না হওয়াতে আরম্ভ হয় পুলিসের জুলুম। মিথ্যা কেস দিয়ে মীরকে ফাঁসানোর চেষ্টা। কিছু চেলা চামুণ্ডাকে দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয় , “মীর লোকদের কাছ থেকে হাসপাতালের নাম করে টাকা ঠকিয়ে নিয়েছে বিনা রসিদে”। থানাবাবুরা সক্রিয় হয়ে পড়েন বিধায়ক মহাশয়ের নির্দেশে মীরের বিরুধ্যে। থানা থেকে মীরকে একলা ডাকা হয় থানায়।

মীর ওই অভিযোগ মিথ্যা এবং ও কেন থানাতে একলা যাবে তার পালটা অভিযোগ করে। বিনা ওয়ারেন্টে থানায় যাবে না সাফ জানিয়ে দেয় , কারা কত টাকা কবে দিয়েছে তার প্রমাণ দিতে বলে। এ বিষয় তার উকিলের মাধ্যমে কোর্টের দ্বারস্থ হয়। ওর নিজের গ্রাম এবং আসে পাশের সব গ্রামের লোকেরা বিধায়কের ওই বদ উদ্দেশ্য প্রশাসনকে লিখিত জানায়। এছাড়া কোর্টকেও জানায়। ওই সব কাগজপত্র এবং হাসপাতালের আরম্ভ থেকে আজ পর্যন্ত সমস্ত কাগজের সার্টিফায়েড নকল কোর্টে উকিলের মাধ্যমে দিয়ে হলফ-নামা দায়ের করে। এতে বিধায়ক ফ্যাসাদে পড়ে যান।

এরপর আরম্ভ হয় লেঠেলদের দিয়ে মীরকে আক্রমণ। ওকে আক্রমণ করা হয় সুপরিকল্পিত ভাবে এবং ওকে রক্তাক্ত করে ওরই তৈরি হাসপাতালের সামনে ফেলে পালায় লেঠেল বাহিনী।

ভাগ্যবশত: মীরের জ্ঞান ফেরে। মেজর হাসান মীরের চিকিৎসা করে ওকে সুস্থ করেন। গ্রামের লোকেরা রাস্তা বন্ধ করে। বিধায়কের বাড়ীর সামনে পিকেটিং করে। থানা ঘেরাও করে। কলকাতা থেকে ওদের গ্রামে টিভির লোকেরা আসেন। মীরের এবং গ্রামের লোকদের সমস্ত কথা ভিডিও রেকর্ডিং করেন। প্রায় প্রত্যেক চ্যানেলে ওই ভিডিও রেকর্ডিং দেখান হয়। মীরের সাহসিকতা এবং কাজের প্রশংসা করে দল নির্বিশেষে এবং বিধায়কের কাজের ঘোর নিন্দা হয়। গ্রামবাসিরা মীরের স্বার্থত্যাগ এবং হাসপাতাল নির্মাণে কঠোর পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করে ওকে পরে নির্বাচনে প্রার্থী করার সুপারিশ দেন।

এতে প্রশাসনের নিদ্রা ভাঙ্গে। থানার ওসিকে ট্রান্সফার করা হয়। বিধায়ককে পার্টি থেকে সাসপেন্ড করা হয়। মন্ত্রী জন সাধারণের কাছে ক্ষমা চান। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচারের অভিযোগে বিধায়কের বিরুধ্যে মামলা চলে।

মীর কিন্তু তার ট্যাক্সি চালান অব্যাহত রাখে। ওই টাকাতেই তার সংসার চলে। আজ শাহানার কথা খুব মনে পড়ছে। চোখের জল বাঁধ মানছে না। আজ ওর বোন বেঁচে থাকলে বিনা চিকিৎসায় মারা যেত না। মীরের সারা জীবনের আক্ষেপ ওর বোনকে বাঁচাতে পারলো না। হায় আল্লা আজ শাহানা যদি বেঁচে থাকতো কত খুশী হত।

তদিদং

সুপ্রভাত লাহিড়ী

বড় জামাইবাবু মারা যাবার পর দিদির অসহায়তা প্রকটভাবে প্রকাশ পেল। দিদিকে বড় জামাইবাবু তোলা তোলা করে রাখতেন। একটা সময় রান্না করা ছাড়া আর কোন কাজই দিদির ছিল না। আর সেটাও দিদির রান্নার সুখ্যাতির দরুন, বয়স বাড়ার সংগে সংগে সে পাটও চুকে গেছে। সংসারে মোটা মাইনের রাঁধুনি বহাল হয়েছে। সন্তানাদি না থাকায় সংসারে বাড়তি কোন চাপই দিদির নেই-মানসিক যন্ত্রনা ছাড়া। ঘরের বাইরের কোন কাজই করতে হয়নি। কোন ব্যাঙ্ক-এ টাকা আছে এবং সেটি কোথায়, গ্যাস-এর বুকিং কি করে করতে হয়, টেলিফোন-ইলেক্ট্রিকের বিলের টাকা কখন মেটানো হচ্ছে তা দিদির অগোচরেই থাকত। এ সবই বড় জামাইবাবুর দপ্তর।

বড় জামাইবাবুর মতামতই ছিল দিদির কাছে শেষ কথা এবং আমৃত্যু সেই ভাবেই সব চলছিল। তাই তাঁর আকস্মিক মৃত্যু বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতন অনুভূত হ’ল। আর সেই থেকে দিদি প্রতি পদে পদে হোঁচট খেয়েই চলেছে। আর আমিও সবকিছু সামাল দিতে দিতে দিদির সংসারে বাঁধা পড়ে গেলাম। আর দিদি বড় জামাইবাবুর স্মৃতিবিজড়িত বিগত দিনগুলোকে রোমন্থন করেই চলে, সব সময়েই তাঁর উপস্থিতি অনুভব করে, এখনও সিগারেটের গন্ধ পায়। ল্যামিনেশন করা জামাইবাবুর ফটোটারও জায়গা হয়েছে বিছানার সেই নির্ধারিত স্থানে। আলনায় এখনও ঝোলে জামাইবাবুর ব্যবহৃত পাঞ্জাবি। এ ব্যাপারে আমাদের অস্বোয়াস্তি থাকলেও দিদির সে কি প্রশান্তি! সুযোগ পেলেই পরম মমতায় হাত বোলায়।    

এ হেন অবস্থার মধ্যেই সব চলছিল। হঠাত্‍ই বিনা ছন্দেরও ছন্দপতন। সেদিন দিদির বাড়িতে যেতেই দেখি ওর পাগল পাগল ভাব। আমাকে দেখেই ডুঁকরে কেঁদে উঠল, ‘ওরে তোর বড় জামাইবাবু আর নেই। সারা বাড়িটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, সিগারেটেরও গন্ধ নেই।’ আমি বিরক্ত এবং যুগপত্‍ রেগেই দিদিকে থামাতে যাই। তাতে করে দিদির কান্নার মাত্রা আরও বেড়ে যায় সংগে উচ্চকণ্ঠে বিলাপ, ‘আমার মন কু-ডাক গাইছিল তাই তোর মেজদিকে ফোন করেছিলাম, ওরা এখন গয়ায়।’ আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, ‘তো’? দিদি আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে বড় জামাইবাবুর ফটো আঁকড়ে ধরে কেঁদে বলে ওঠে, ‘ওগো, আমার এইটুকু সুখও ওদের সহ্য হ’ল না-তোমার নামে গয়ায় পিণ্ডি দিয়ে দিল...!

সাগ্নিকা

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে ঘুঙুরের আড়তে বসে একটা একটা করে ঘুঙুর বেছে নিচ্ছিল জাহ্নবী। তার নাচের স্কুলের মেয়েদের জন্য সে বরাবর নিজে এসে বেছে নিয়ে যায় ঘুঙুর আর দড়ি। হ্যাঁ, কেউ কেউ হয়ত বাঁধানো ঘুঙুরই আনতে বলে, সেক্ষেত্রেও কোনও কম্প্রমাইস করেনা জাহ্নবী; দড়ি বাঁধাই হোক কি প্যাডে বাঁধা প্রতিটা ঘুঙুর বেছে নেয়, একটাও যাতে ভাঙ্গা না থাকে। এতে যে কি লাভ হয় অত শত জানে না সে কিন্তু এটাই তার অভ্যেসে পরিনত হয়েছে। নিজের ঘুঙুর কেনার মত করেই ওদেরটাও কিনবে দোকানের মালিক চিনে গেছে জাহ্নবীকে; তার বসার জন্য এখন স্পেশাল চেয়ারও রেখেছেন ভদ্রলোক। আসবার সময় ট্রেনে বাসে এলেও বাড়ি ফেরাটা ট্যাক্সি ধরেই করে জাহ্নবী; কারণ এক দিকে ক্রাচ নিয়ে আর এক কাঁধে অত ভারী ঘুঙুরের বোঝা নিয়ে বাস, ট্রেন করে তারপক্ষে ফেরা মুশকিল।

জাহ্নবী হয়ত নাচের জগতে একটা নাম হতে পারত মালবিকা সেন, অনিতা মল্লিকদের মত বা সুধা চন্দ্রন; নাঃ সে কোনটাই হতে পারলনা। কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে যে কোনও অনুষ্ঠানের একটা বড় সময় বরাদ্দ থাকত জাহ্নবীর নাচের জন্য। পাড়ার পুজো কমিটির দাদারা পুজোর সময় অনুষ্ঠানসূচী শুরু করত জাহ্নবীকে দিয়ে, সে কোন দিনের কোন স্লটের কতটা সময় নিয়ে অনুষ্ঠান করতে বা করাতে চায়। 

এমনিতে তার হাঁটা বড্ড পুরুষ সুলভ ছিল, মা বলতেন "মনে হয় কোনও পুরুষ মানুষকে শাড়ী পরিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে" কিন্তু স্টেজে উঠলে সেই কাঠ কাঠ মেয়েটাই কি যে অদ্ভুত কোমল হয়ে উঠত, অবলীলায় এমন ভাবে নাচত মনে হত বোধহয় শক্ত হাড় নেই ওর। জাহ্নবী যেন প্ল্যাস্টিক ক্লে দিয়ে তৈরী, যে কোনও দিকে যে কোনও ভাবে ওকে মোড়ানো যাবে। আবার কোনও কোনও নৃত্যনাট্যে পুরুষের ভূমিকায়ও অংশগ্রহণ করেছে সে। স্টেজ থেকে নামার পর তার অপরিচিত তো বটেই অতি পরিচিত মেয়েরাও এমন ভাবে ছেঁকে ধরত যেন সে সত্যিই অতি সুদর্শন নিপুন কোনও পুরুষ নৃত্য শিল্পী। নিজের গুনে নিজেই অবাক হত জাহ্নবী; কি করে একটা মেয়ে হয়ে সে এত দক্ষতায় কোনও পুরুষের ভূমিকায় অভিনয় করলো। হ্যাঁ, এটাও তো অভিনয়ই।

মোটামুটি পাড়ার সবার চাপে পড়েই নাচের স্কুল শুরু করেছিল সে। একটু আপত্তি ছিল বৈকি; সে জানত যে সে কিছুই জানে না এখনও। নিজে আগে ভালো করে শিখে তবে না শেখানো? খুব নামী শিক্ষিকার কাছে তালিম পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে তার; আর সেই সূত্রেই বহু বিখ্যাত নৃত্যশিল্পীদের গুরুবোন হিসাবে সান্নিধ্য পেয়েছিল। জাহ্নবী বুঝেছিল ওনাদের সমতুল্য সে কোনও দিনও হতে পারবে না তবু স্বপ্ন দেখতে দোষ কোথায়? 

স্টেশনে নেমে রেললাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে লেভেল ক্রসিং থেকে বাঁ হাতে স্টেশন রোড ধরে একটু এগোলেই সরকার পাড়া; জাহ্নবীর বাড়ি। বাবা খুব সাধারণ সরকারী কর্মচারী; তিনবোনের জাহ্নবীই বড়। কাজেই সংসারের হাল কিছুটা ধরতেই হয়; নাচের স্কুল একটা বড় উপার্জন। তাই তার পরিচিতি তো খুব একটা কম নয়; সেটাকে কাজে লাগালে স্কুলের নাম ছড়াতে সময় লাগবে না। 

রোজ সকালে নাচের প্র্যাকটিসের জন্য দৌড়ত গড়িয়াহাট, হ্যাঁ, রোজ; কারণ তার বাবার এত সচ্ছলতা ছিল না যে নাচের স্কুলের মত অঙ্কের মাইনে ভরবে। কন্সিডারেশনের জন্য আবেদন জমা দেওয়াতে শাপে বর হয়েছিল জাহ্নবীর। নাচের গুরু তাকে বলেন একমাত্র তখনি উনি জাহ্নবীর মাইনে কম করবেন যদি দেখেন জাহ্নবীর দিকের প্রবল আগ্রহ। সকল আটটা থেকে দুপুর অবধি অথবা দুপুর তিনটে থেকে রাত আটটা অবধি যে যে ক্লাস হয় সেখানে যেন উনি জাহ্নবীকে দেখতে পান। কোন সময় আসবে সেটা জাহ্নবীর ব্যাপার; কিন্তু রোজ আসতে হবে। তাই রোজ ছুটত, এতে তারই লাভ উভয় দিকেরই; মাইনে মকুব তো হবেই সাথে কত্ত কত্ত প্র্যাকটিসের সুযোগ পাচ্ছে সে। কিছু কিছু অজানা পদও শিখে নেবার সুযোগ হয়ে যাচ্ছে। যতদিন পড়াশোনা ছিল ততদিন অবশ্য সকালের বদলে বিকেলের ক্লাস গুলোতেই যেত। আলিপুর ক্যাম্পাস থেকে দৌড়ে দৌড়ে আসত ক্লাস করতে। নিজের পড়াশোনা শেষ হবার পরেই শুরু হয় পুরোদমে নিজের নাচের স্কুল। পড়াশোনা চলাকালীন দুই বোন শতদ্রু আর ঝিলম কেই মূলতঃ শেখাতো; সাথে সপ্তাহান্তে একদিন অন্য কিছু বাচ্চাদেরও তালিম দিত। শতদ্রু, ঝিলম ভালই নাচত কিন্তু জাহ্নবীর মত নয়।  জাহ্নবীর এইসব দৌড় ঝাঁপের বেশির ভাগ সময় দুটো আকুল চোখ তার সঙ্গী থাকত।

প্রথম যেদিন নিজের ঘুঙুর কিনতে এসেছিল দোকানে, অমন ঘুঙুরের আড়ত দেখে অবাক হয়ে গেছিল; কোনও ধারনাই ছিল না কেমন করে দেখে বেছে নিতে হয়; কতগুলো ঘুঙুরের জন্য কত খানি দড়ি লাগবে, আর কত গুলো নিলেই বা ভালো হয়। দোকানের ভদ্রলোকই সাহায্য করে দিয়েছিলেন; ষাটটা ঘুঙুর সেই অনুপাতে দড়ি। ঘরে এসে তিরিশ তিরিশ করে ভাগ করে নিয়ে বেনুনি করে বানিয়ে নিয়েছিল ঘুঙুর। আবিষ্কার করেছিল অনেক গুলোতেই বল নেই; কয়েকটার ফুল ভাঙ্গা। পরে এক সিনিয়রের থেকে জেনেছিল সাইকেল ইত্যাদি সরানোর দোকান থেকে বল বেয়ারিং নিয়ে ঘুঙুরে ভরে নিলেই হয়; আর কেনার সময়ই দেখে কিনতে হয়, নয়তো ভাঙ্গা ঘুঙুর বেজে শাড়ী বা কস্টুমের ক্ষতি হতে পারে। পরের বার থেকে তাই সচেতন জাহ্নবী। নিজে অবশ্য একশোর বেশি ঘুঙুর পড়েনি কখনো। ওই দেখে কেনার অভ্যাসটা আজও রয়ে গেছে।

পোস্ট গ্রাজুয়েশনের সময় পরিচয় হয় পশুপতির সাথে; গাঢ় হয় বন্ধুত্ব। বহুদিন তারা আলিপুর ক্যাম্পাসের সামনের রাস্তা ধরে টুক টুক করে হাঁটতে হাঁটতে গোপালনগর মোড় আসত ট্রাম ধরতে, নয়তো ন্যাশনাল লাইব্রেরি যেত পড়াশোনা করতে। পুরনো দিনের বিশাল বিশাল গাছওয়ালা কিছুটা নির্জন রাস্তা গুলো বেশ লাগত গল্প করতে করতে হাঁটতে। কোনও দিন হয়ত ঢু মারত হর্টিকালচার বা চিড়িয়াখানা। পরস্পরের উপভোগ্য সঙ্গ অনিবার্য হয়ে উঠছিল তাদের। পশুপতি অসম্ভব সুন্দর গান গাইতো; একটা ঘোর লেগে যেত জাহ্নবীর ওর গান শুনলে। জাহ্নবীর নাচের স্কুল খোলার পিছনে পশুপতিরও উৎসাহ ছিল। বেশ কিছু অনুষ্ঠানে সে জাহ্নবীর মাধ্যমে সুযোগ পাচ্ছিল গান গাওয়ার। একটু একটু করে তারও পরিচিতি বাড়ছে জাহ্নবীর সাথে সাথে। পাশ করে চাকরি কি পাবে, পাবে না, একসাথে স্কুল খুললে দুজনেরই লাভ এমনটাই বুঝেছিল জাহ্নবী। তাই সে আরওই বাধ্য হয়েছিল স্কুল খুলতে। পশুপতির অবশ্য নিজস্ব ছাত্র ছাত্রীও হতে শুরু করেছিল ওই স্কুল ছাড়াও। ফার্ন রো দিয়ে অলিগলি ঘুরে গোলপার্ক যাওয়ার পথে পশুপতিদের বাড়ি। কাজেই গড়িয়াহাটে জাহ্নবীর নাচ শেখার স্কুলে প্রায়শঃই উপস্থিত হত পশুপতি। সেখানেও দু'একটা অনুষ্ঠানে সুযোগ পেয়েছে গাওয়ার; প্রশংসাও কুড়িয়েছে। 

দুজনেই যখন সাংস্কৃতিক জগতে নিজেদের জায়গা করে নিতে শুরু করেছে, ঠিক করলো এবারে বিয়েটা করে নেওয়াই কাম্য। একসাথে থাকলে আরও সুন্দর করে কাজ করতে পারবে। কারণ পশুপতি একা হয়ত তেমন কিছু করে উঠতে পারবে না। দুই বাড়ির থেকে খুশি খুশি মনে তোড়জোড় শুরু হলো। 

সেদিন বৃষ্টি নেমেছিল খুব জোরে, নাচের ক্লাস সেরে গড়িয়াহাট থেকে বালিগঞ্জ স্টেশনের দিকে হাঁটছিল জাহ্নবী। খুব অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল তার, এবারে পশুপতি তার জাহ্নবীকে জটায় বন্দী করতে চলেছে। আবার মা বাবা দুই বোনের সংসার, সেখানের অভাব, বোনেদের ঝগড়া খুনসুটি সব হারিয়ে যাবে তার জীবন থেকে। নতুন পরিবেশ, নতুন পরিচয়। যদিও পশুপতিদের বাড়ি বহু বার গেছে, এমনকি আজও একবার যাবে নাকি ভাবছে। কারণ এই বৃষ্টি মাথায় সে ফার্ন রোর সামনে দিয়ে হেঁটে বালিগঞ্জ স্টেশনে যাচ্ছে; এটা পশুপতির মা ঠিক জেনে যাবেন আর এমন করুন করে অভিযোগ করবেন, জাহ্নবীর ভাবতেই খারাপ লাগে। তাছাড়া সে গিয়ে বৃষ্টি ধরা অবধি অপেক্ষা করতেই পারে, তারও যে খুব আপত্তি আছে তাতো নয়। নিজের ভাবনার মধ্যে ডুবে গিয়ে হাঁটছিল জাহ্নবী; সেই আকুল চোখ দুটো কখন যে তার পিছু নিয়েছে সে জানতেও পারেনি। রাস্তায় বেশ জল জমেছিল; নোংরা জল যদিও, জাহ্নবীর কিন্তু মজাই লাগছিল জল ঠেলে হাঁটতে। হঠাৎই একটা শক্ত কিছুতে এমন আচমকা হোঁচট খেল সে, একে অন্যমনস্ক, তায় পায়ের দিকে তাকিয়েও ছিল না, তারপর বৃষ্টি ভেজা,সবমিলিয়ে কেমন বেকায়দায় বিকট আছাড় খেল। জ্ঞান হারানোর আগে সে এইটুকুই বুঝেছিল পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা; একটা বিদ্যুতের ঝলকের মত লাগলো যেন, ব্যস আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরতে দেখল সে হাসপাতালে, মা বাবা দুইবোন ভয়ার্ত মুখে তাকানো তার দিকে। সে কিভাবে পৌঁছল হাসপাতালে, বাড়িতেই খবরই বা গেল কি করে, কিছু মনেও নেই, বুঝতেও পারল না। উঠে বসতে গেল, এমন যন্ত্রণা শরীরে যে নড়তেই যেন পারলো না। জ্ঞান ফিরেছে দেখে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে হাতজোড় করে প্রনাম করলো বাড়ির সবাই; 'এত কাঁদছে কেন ওরা? আচ্ছা পশুপতি কই?' ভাবতে ভাবতেই ডাক্তারবাবু এসে উপস্থিত; কিছু প্রশ্ন করলেন জাহ্নবীকে। ঘোরের মধ্যে কি কি উত্তর দিল নিজেই জানে না।  

ঠিকঠাক জ্ঞান ফেরার আগেই টের পেয়েছিল তার জীবনের নির্মম সত্য; সেদিন আছাড় খাওয়ার সময় ডান পা এমন ভাবে মুচড়ে গেছিল আর একটা লোহার পাত থেকে এমন ভাবে কেটেছিল যে পা হাঁটুর থেকে আলগা হয়ে গেছিল। সময় মত হাসপাতালে পৌঁছনোর ফলে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার ডান পা টা নেই। মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেছিল জাহ্নবীর। নাচই যার জীবনের শ্রেষ্ঠ আশ্রয় তার নাচ তো গেলই, স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতেও পারবে না। ঘরে ফিরতেই হলো একদিন হাসপাতাল থেকে; ঘরের পরিবেশ বাবা মায়ের দুশ্চিন্তা দূর করতে ঠিক থাকার অভিনয় শুরু হলো জাহ্নবীর। আর নিজেও বুঝলো আপাততঃ তাকে এই সত্য গ্রহণ করে নিতেই হবে, তাই এই যন্ত্রণা কাটিয়ে উঠতে পারলে সুস্থ হবে সে। তবে সব কিছু একা একা করছে, অবাক হয়ে আবিষ্কার করলো হাসপাতালের দিন কটায়, বাড়ি আসার পর থেকে আজ অবধি পশুপতি কিন্তু একদিনের জন্যও আসেনি বা ভুলেও একবারও ফোন করেনি। মোবাইলে অনেক বার চেষ্টা করেও বিফল; শেষ মেষ মা কে জিজ্ঞেস করেই ফেলল যে, কি করে হাসপাতাল পৌঁছল আর পশুপতিদের খবর দেওয়া হয়েছে কিনা আদৌ। জানল যে সম্পূর্ণ অপরিচিত কেউ একজন তাকে হাসপাতালে দিয়ে বাড়িতেও খবর দেয়; যখন বাড়ির সবাই পৌঁছয় হাসপাতালে তখন অবশ্য কাউকে পায়নি। আর পশুপতিরা খবর পেয়ে এসেছিল ঠিকই কিন্তু ওদের কাউকে কিছু না বলে কখন জানি চলেও গেছে। তারপর থেকে মায়েরাও কিছুতেই পশুপতির সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। পশুপতির মায়ের সাথে অতি কষ্টে একবার কথা বলতে পেরেছে; উনি জানিয়েছেন পশুপতি নাকি কি নিয়ে খুব ব্যস্ত, অন্য কিছু নিয়ে ওর এখন মাথা ঘামানোর সময় নেই।

দ্বিতীয়বার বাকরুদ্ধ জাহ্নবী; একটা দিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেনি এই কথা শুনে। যার বুকে মাথা রেখে সব ভুলে থাকার কথা; যাকে এখন জাহ্নবীর সব চেয়ে দরকার ছিল, তাকে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করছিল, তার বুকে ঝাঁপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল, মনে হচ্ছিল সেই মানুষটাই জাহ্নবীর চোখের জল মুছিয়ে দেবে, তাকে ভরসা দেবে, আজ সেই মানুষটাই তাকে নির্মম ভাবে ত্যাগ করলো? সারাদিন সারা রাত কান্নার পর সকালে আর জল ছিল না চোখে; তখন আগুন ঝরছিল। সব ঝেড়ে ফেলল নিজে, তার সাথে বাড়ির সবাইকে ডেকে নিজের নামে শপথ করিয়ে বলল যে আর যেন কেউ পশুপতির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা না করে, ওই নামটাও এই বাড়িতে আর নয়। কারণ তার এই বিপদের দিনে সে পশুপতিদের আসল রূপটা দেখে ফেলেছে; সে অতি ভাগ্যবতী যে এমন মানুষের সাথে তার বিয়েটা হয়নি। এই ঘটনাটা তো আর কিছু পরেও ঘটতে পারত; বিয়ে হয়ে গেলে কি করত পশুপতিরা? নাহ আর ভেবে লাভ নেই; আজ এই মুহূর্ত থেকে সে লড়বে। মা বাবা বোনেরা সাথে থাকলে ভালো, না থাকলে একাই লড়াই করে নিজের মাথা উঁচু করে বাঁচবে। 

দু'বোন তার কাছেই তালিম পাওয়া; এবারে নাচের স্কুলে তাদের প্রয়োজন হল। নিজে উঠে নাচ করে শেখাতে পারবে না ছাত্রছাত্রী দের, মূলতঃ সেই কাজ তা শতদ্রু ঝিলম করবে। আগের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছেড়ে গেছে, যে দুচারজন ছিল তাদর নিয়েই শুরু হল নতুন লড়াই। তাদের দেখা দেখি আবারও আসতে লাগলো ছাত্রছাত্রী;  রেজিস্টার করাল স্কুল, নাম দিল 'ত্রিবেনী ছন্দম'। প্রথম থেকেই স্টুডেন্টদের ঘুঙুর আর পোশাক তার কাছ থেকেই নিতে হবে এমন নিয়মটাই করে সে।

ঝিলম শতদ্রু বড় হয়েছে, জাহ্নবী তাই পারিশ্রমিক দিতে শুরু করলো ওদের; ওরা তো অবাক, কারণ স্কুলটা তো ওদেরও। সেটা ঠিক, কিন্তু কাল যখন ওদের বিয়ে হয়ে যাবে, তখন ওদের বদলে কোনও শিক্ষিকাকে সুযোগ দিলে তাদের কে তো পারিশ্রমিক দিতে হবে জাহ্নবীর; মানুষের মন, তখন যদি বোনেদের মনে হয় যে, দিদি ওদের সরলতার বা পরিবারের সদস্য হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়েছে, নিজের স্বার্থে।  এতসব ভেবে চিন্তেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে জাহ্নবী। তাছাড়া, সাংস্কৃতিক জগতে ওদেরও নাম হচ্ছে; দিদির কাছ থেকে আহ্লাদ করে হাত খরচের টাকা নিছে ভাবুকনা। প্রায় সারাবছরই ব্যস্ত থাকছে ওরা। তবে একটা প্রসঙ্গ জাহ্নবী অনেকবার তোলার চেষ্টা করলেও বাড়ির লোকের চূড়ান্ত অনাগ্রহ দেখে অভিমানে চুপ করে গেছে। সে চেয়েছিল নকল পা লাগিয়ে সেও সুধা চন্দ্রনের মত নাচ করবে। প্রথম দিকে টাকা পয়সার টানাটানি থাকলেও বছর ঘুরতে ঘুরতে সেই অসুবিধাও তো নেই। বাবা রিটায়ার করেছেন কিন্তু এককালীন যে পরিমান টাকা পেয়েছেন তা জমিয়ে রেখে মা বাবার সচ্ছন্দে চলে যাবে। তার নাচের স্কুল যথেষ্ট ভালো চলছে, শতদ্রু পুরোটা সময় স্কুলকে দিলেও ঝিলম একটা ছোটখাটো কাজ জোগাড় করেছে সাথে নাচের স্কুল কে দেখে; ফলে এখন সংসারে তেমন অসুবিধা নেই। তবুও কারওর মনে হল না জাহ্নবীর নকল পা লাগিয়ে নতুন করে বাঁচার কথা। জাহ্নবীর কষ্ট হয় সারাজীবনে, দুনিয়ায় এমন কাউকে কি পাবে না যে, তার শুধুমাত্র তার দুঃখের ভাগীদার হবে? 

দুই বোনের যে কোনও দিন ভালো ঘরে, ভালো বরে বিয়ে হবে এটা আন্দাজ করে জাহ্নবী জমাতে থাকে সাধ্য মত; কত গুনি বোন দুটো তার, সাথে সুন্দরীও। তেমন কোন বিয়ের সম্বন্ধ এলে কি খালি হাতে বিয়ে দেবেন বাবা? তারপর ঝিলমের আবার খুঁতখুঁতানি আছে, যেকোনো শাড়ী, যেকোনো কসমেটিক্স সে ব্যবহার করতে পারে না। ভালো পদ রান্না না হলে সেদিন পেট ভরে খাওয়াই হয় না তার; কাজেই বিয়েতে তেমন স্ট্যান্ডার্ড এর জিনিস না দিতে পারলে বা জাঁকজমক না হলে হয়ত দুঃখ পাবে। আর ঝিলমের বেলায় যদি এসব হয় শতদ্রুর বেলায় নয় কেন? সে চায় না বলে পাবেও না? নিজে যতটা পারে সাদাসিধা জীবন যাপন করে। সে বুঝেছে আর যাইহোক বিয়ের স্বপ্ন তার জন্য নয়। এত অল্প বয়সের কোন মেয়ে যে এত তাড়াতাড়ি এতটা ম্যাচিওর হয়ে উঠতে পারে; দায়িত্বশীল বড় দিদি বা বড় মেয়ে। তার ধারনাই ঠিক। হঠাৎই এক ভদ্রমহিলা তাঁর দারুন উচ্চশিক্ষিত, সুপ্রতিষ্ঠিত দুই ছেলের জন্য পছন্দ করলেন জাহ্নবীর দুই বোনকে। একই পরিবারে ঠিকই, কিন্তু থাকবে দুই বোন দেশের দুই প্রান্তে। বিয়ে একই দিনে হবে এমনটাই ঠিক হল, তাতে সবারই সুবিধা। ছোট দুই মেয়ের বিয়েতে আনন্দিত হলেও তাদের সব চেয়ে সুন্দরী, লড়াকু, আত্মসম্মানি, মেয়েটার জন্য বোধহয় এই প্রথম দুঃখ হল মা বাবারও। যদিও আজ যে অবস্থা তাতে কোন পুরুষ জাহ্নবীর জীবনে না থাকলেও চলে; কিন্তু মা বাবা থাকবে না এমন একটা দিন তো আসবেই, বোনেরাও নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।  তখন যদি এমন কেউ থাকে যে জাহ্নবীর সুখ দুঃখ ভাগ করে নেবে।  

পরবর্তিতে মা বাবার অবর্তমানে যাতে সম্পত্তি নিয়ে কোনো গোলমাল না হয়, আর জাহ্নবী যাতে সুষ্ঠু ভাবে থাকতে পারে ভবিষ্যতে, তাই বাবা বাড়ি দান করলো জাহ্নবীর নামে।  দুইবোন অবশ্য খুশি মনেই মেনে নিল এই সিদ্ধান্ত। 

বিয়ের কেনাকাটা উপলক্ষে নামী নামী দোকানেই গেল ওরা। শাড়ীর দোকানে ফুটফুটে একটা ছোট্ট পুতুলের মত মেয়ে জাহ্নবীর বন্ধু হল। ওর মাও বেশ মিশুকে, জাহ্নবীর নাচের স্কুলের অনুষ্ঠান নাকি সে ও দেখেছে; কারণ সে জাহ্নবীর এক গুরুবোন গিরিজাদির ছাত্রী। জাহ্নবীর ওপর সবারই একটু খাতির আছে; শ্রদ্ধা আছে তার লড়াই এর প্রতি, ফলে তার নাচের স্কুলের যে একটা দুটো অনুষ্ঠান হয়েছে তার বিজ্ঞাপন জাহ্নবীর গুরুজী এবং বাকি নামজাদা গুরুবোনেরাও নিজেদের স্কুলে দিয়েছেন, টিকিটও বিক্রি হতে সাহায্য করেছেন। সেই রকমই কোন এক অনুষ্ঠান লবঙ্গলতিকাও দেখেছে, কিন্তু জাহ্নবীর সাথে গিয়ে আলাপ করার সুযোগ পায়নি। বেশ আলাপ জমল ওদের, ফোন নম্বর আদান প্রদানও হল, কোনো এক প্রখ্যাত মিষ্টি প্রস্তুতকারকের পরিবারের মেয়ে লবঙ্গলতিকা; আর ওই পুতুলটার নাম মিষ্টি। শাড়ীর দোকানের কাছেই নাকি ওর শ্বশুরবাড়ি। লবঙ্গ জানালো কোনদিন যদি জাহ্নবীর কোনো কাজে সে লাগতে পারে তার ভালো লাগবে। লবঙ্গর শ্বশুরবাড়ি খুবই উদারমনস্ক, কাজেই যে কোনো কাজেই সে এগিয়ে যেতে পারবে জাহ্নবীর পাশে। জাহ্নবীর একটা প্রস্তাব মাথায় এলো কিন্তু প্রথম আলাপেই বলতে পারল না, দু-একটা দিন পর অবশ্য বলেই ফেলল ফোন করে।  

"আমার দুই বোনেরই তো বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তাদের জায়গায় যদি তুমি আমার নাচের স্কুলের দিদিমনি হও? আপত্তি আছে? আমি অনেক না হলেও তোমার যাওয়া আসার খরচটুকু দিতে পারব" 

"কি যে বল না দিদি, আমি তো বলেই ছিলাম তোমার যেকোনো কাজে লাগতে পারলে আমার ভালো লাগবে, ওই সব খরচ টরচ দিতে চাইলে কিন্তু আসব না, হ্যাঁ" অভিমান দেখায় লবঙ্গ। 

"আচ্ছা, বেশ তাই হবে, তুমি কিন্তু মিষ্টিকে ও এনো কেমন?" হাসে নিশ্চিন্ত জাহ্নবী। শতদ্রু ঝিলমের বিদায়ের আগেই নতুন দিদিমনি এসে গেল; যথেষ্ট ধনীর ঘরের মেয়ে এবং বউ তাও এতটুকু দেখানেপনা নেই। আর নাচও যথেষ্ট ভালো করে, ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মিশে যেতে সময় লাগল না। 

হই হই করে এগিয়ে এলো বিয়ের দিন; জোড়া বিয়ে বলে কথা, তায় বড় মেয়ের এমন দশা, আহা উহু করার তো লোকের অভাব নেই, কিছু আত্মীয় তারা বেশ কদিন আগের থেকেই এসে উপস্থিত। দূরদর্শী জাহ্নবী আন্দাজ করেছিল এটাই। পাড়ার মুদি দোকান থেকে চাল ডাল ইত্যাদি প্রয়োজনীয় জিনিস বেশি পরিমানে আগের থেকেই মজুত করেছে সে।  এই মুদি দোকানটা পাড়ার যে ছেলেটির, স্বয়ম্ভু, সে কোনরকমে পাস কোর্সে গ্রাজুয়েশন করে কিছুদিন নাকি চাকরি খুঁজেছে কলকাতায়। এদিক ওদিক ঘুরতে দেখা যেত তাকে, হঠাৎই এই দোকান খুলে বসে; বেশ উপকারই হয়েছিল লোকেদের, ভালই চলছে দোকান। বিয়ে বাড়ি উপলক্ষ্যে অর্ডার করা জিনিষপত্র সে নিজেই নিয়ে এসে তুলে দিতে লাগলো। জাহ্নবী একটু অবাক হলো বৈকি। 

"স্বয়ম্ভু দা, কি দরকার? মুটে দিয়ে পাঠিয়ে দিতে" 

"কিযে বলো না, ওরা তো আমারও বোনের মত, আর কাজ তো কাজই করলেই হলো। তুমি ভালো আছ তো?" জাহ্নবীর সামনে পড়ে যেন কেমন কুঁকড়ে যায় স্বয়ম্ভু, লোকের মুখে অবশ্য নামটা শম্ভু হয়ে গেছে। টুকটাক কথার পর স্বয়ম্ভু যেন পালিয়ে বাঁচলো। 

বিয়ে ধুমধাম করেই মিটল,বাড়ি খালি করে কোথায় কোথায় চলে গেল বোনদুটো। বাবার সাথে বসে হিসেব মেলাচ্ছিল জাহ্নবী, কার কার বকেয়া কত টাকা মেটানো বাকি ইত্যাদি। পরিস্থিতি এই মেয়েটাকে যেন কত বড় করে দিল। সেই সময়ে স্বয়ম্ভু এসে হাজির; ওরা তো ধরেই নিল বাকি টাকা নিতে এসেছে নিশ্চয়, কিন্তু ওদের অবাক করে দিয়ে স্বয়ম্ভু জানালো যে সে শতদ্রু ঝিলমকে নিজের বোনের মতই দেখে, তাদের বিয়েতে তো আর কিছু করতে পারেনি, সে এই জিনিষপত্র গুলোর দাম নিতে অপারগ। কথাটা জানিয়ে যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেল; অপরপক্ষের যুক্তি তর্কের কোনো সুযোগই রইল না। 

নাচের ক্লাস আবার চালু, লবঙ্গ আসে, সে জাহ্নবীকে যেন যত দেখে ততই মুগ্ধ হয়। আগেও শুনেছিল আবছা আবছা জাহ্নবীর জীবনের দুঃখ ভরা অংশটার সম্বন্ধে, কিন্তু এখন বুঝলো ওই রকম পাষন্ড মানুষের সাথে বিয়ে না হয়ে বোধহয় ভালই হয়েছে। জীবনভর দুঃখের থেকে বেঁচে গেছে জাহ্নবী। আর তাই খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেনি কোনদিন...কে সেই ব্যক্তি, কোথায় থাকতো, নাম কি? শুধু এটাই ভেবেছে যে আজকের দিনেও এমন মানুষ হয়? ভালবাসার ওপর ভরসা উঠে যায় এই সব মানুষের কীর্তি কলাপ দেখলে, অবশ্য খারাপ ভালো দুয়ে মিলিয়েই তো দুনিয়া। 

আজকাল স্বয়ম্ভু বিভিন্ন অজুহাতে তার মা বাবার কাছে আসছে লক্ষ্য করলো জাহ্নবী; মা বাবাও যেন কেমন নির্ভর করছে ছেলেটার ওপর, ব্যাপারটা জাহ্নবীর কাছে অদ্ভূত ঠেকলেও মা বাবার একটা সময় কাটানোর ভালো উপায় বলেই ধরে নিয়েছে। মাসখানেক পর এক এক করে দুই বোনের কাছে পাঠাবে মা বাবা কে মনস্থির করলো জাহ্নবী। তার যাওয়ার তো উপায় নেই, নাচের ক্লাস বন্ধ রাখা সম্ভব নয় তার পক্ষে। স্বয়ম্ভুকে গার্জিয়ান করে রেখে মা বাবা রওনা হলো। তাদের টিকিট কাটার থেকে ট্রেনে তোলা অবধি সবই করলো স্বয়ম্ভু জাহ্নবীর সাথে সাথে। সামনের দিনে যে জাহ্নবীর জন্য কি অপেক্ষা করছিল ঘুনাক্ষরেও কেউ টের পায়নি। মাঝপথে ট্রেন দুর্ঘটনায় একসাথে মা বাবা মারা গেল; পৌঁছতেও পারেনি শতদ্রুর বাড়ি। দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে শনাক্ত করে দেহ নিয়ে আসা, ঝিলম শতদ্রু কে খবর করা,  দৌড়ঝাঁপ সবই একা হাতে স্বয়ম্ভুই করলো। জাহ্নবী আরো একবার জীবনের এমন অপ্রত্যাশিত মোড়ে বাকরুদ্ধ। 

ক্রিয়া কর্ম মিটিয়ে বোনেরা ফিরে যাওয়ার আগে একদিন স্বয়ম্ভু এসে এমন একটা প্রস্তাব দিল যা সকলের চিন্তার বাইরে। সবাই চিন্তায় ছিল এবারে জাহ্নবীর কি হবে? একদম তো একা হয়ে গেল!! ঠিক সেই দুশ্চিন্তার জায়গাটা কেই দূর করলো স্বয়ম্ভু। সে বিয়ে করতে চায় জাহ্নবীকে। এমন প্রস্তাবের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। আলোচনা চলল তুমুল। স্বয়ম্ভুর শিক্ষাগত যোগ্যতা জাহ্নবীর অন্য বোনের বরদের থেকে তো বটেই এমনকি জাহ্নবীর চেয়েও কম। তাদের মত দারুন চাকরি করে না ঠিকই, কিন্তু মানুষটা অত্যন্ত খাঁটি। জাহ্নবীকে দয়া করছে না। বা জাহ্নবীর প্রতি প্রলুব্ধ নয়। স্বাধীনভাবে বাঁচা একটা মানুষ বিপদের দিনে কিভাবে সাহায্য করেছে, আর আজও করছে। নিতান্ত একজন বন্ধুর মতই জাহ্নবীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আর একে বিয়ে করলে বোনেরা নিজের নিজের সংসার মন দিয়ে করতে পারবে তাদেরও তো কদিনই বা হলো বিয়ে হয়েছে। মানসিক প্রস্তুতি ছিল না ঠিকই তবু এত কিছু ভেবে রাজি হলো জাহ্নবী। সামান্য আয়োজন করে রেজিস্ট্রি করে ওদের বিয়ে দিল বোনেরা। একটাই দুঃখ রইলো এটাই আর দুদিন আগে হলে মা বাবা দেখে যেতেন; কি আর করা যাবে!!!

চমক আরো কিছু বাকি, ফুলশয্যার ঘরে বোনেরা দিতে এলে স্বয়ম্ভু এমন ভাবে জাহ্নবীকে গ্রহণ করলো যেন আজ এই মুহূর্ত থেকে সে ছাড়া আর কারোর অধিকার নেই জাহ্নবীর ওপর। হুইলচেয়ার থেকে বিছানায় তুলে বসালো; অবাক চোখে দেখছে জাহ্নবী। বেশ কিছু সময় চুপ রইলো দুজনেই; নিরবতা ভাঙ্গলো স্বয়ম্ভু 

"তোমার এখন ঘুমিয়ে পরা উচিত, এত রাত হয়েছে, এই কদিন তো খুব ধকল গেল"

"তুমি এমন কেন করলে?" জাহ্নবীর প্রশ্ন

"মানে?"হঠাৎ এমন প্রশ্নে আমতা আমতা করে স্বয়ম্ভু

"মানে, আমার মত একটা পঙ্গু মেয়েকে বিয়ে করে নিজের জীবন বরবাদ করলে কেন?"

"তুমি পঙ্গু?" বলে ব্যথিত মুখে তাকালো স্বয়ম্ভু 

"দেখো জাহ্নবী, প্রতিবন্ধকতা আমাদের মনের ব্যাপার, যা তোমার নেই, আমি কিন্তু তোমায় দেখে উদ্বুদ্ধ। আমি আসলে এত লেখাপড়া করিনি তো, নাচ গানও পারি না, হয়ত অত গুছিয়ে বুঝিয়ে বলতেও পারব না। তুমি জান না, আমি কোনো রকম গ্রাজুয়েশন করে বিভিন্ন জায়গায় কাজের খোঁজ করতাম, টুকটাক পেতামও। তবে তুমি কলেজ যাওয়া শুরু করার পর থেকেই আমার কি যে হলো, তোমার কলেজের আশেপাশে কাজ নিতাম, খুবই সামান্য কিছু, আর তোমায় দেখতে গিয়ে সেগুলোও হারাতাম; পরে তুমি যখন মাস্টার্স করতে গেলে তখন ওই অঞ্চলে কিছু কাজ তো পাব না, এমনিই চলে যেতাম আলিপুর ক্যাম্পাসের সামনে, ভিড়ের মধ্যে মিশে তোমার না ঠিক তোমার নয়, তোমাদের পিছে পিছে ঘুরতাম নেশাগ্রস্তের মত। আর কোনো কাজ আমায় দিয়ে কোনো দিন হবে ভাবতেই পারিনি। তবে তুমি সেদিন বৃষ্টি ভিজে অন্যমনস্ক হয়ে যে কান্ড ঘটালে, জানি না,আমি, হয়ত, ওই জন্যই তোমার পিছে ছিলাম সেদিনও। তাতেও তো শেষ রক্ষা হলো না" চুপ করে রইলো দুজনেই, জাহ্নবীর বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না 'আমায় ভালোবাসত? তার মানে আমায় হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া বাড়িতে খবর করা এই সব ও করেছিল? ওই দিন?' 

"আমি জানি, ইউ ডিসার্ভ বেটার; তোমার মত মেয়ের আমার মত একটা ছেলের স্ত্রী হওয়া মানায় না। সমাজতো তোমায়, ওই তুমি যা বললে, 'পঙ্গু' ওই চোখেই দেখে। তোমার একজন দারুন শিক্ষিত, ভালো চাকরি করেন এমন মানুষের সাথে বিয়ে হলে সমাজের সবার আহা উহু বন্ধ হত; এখন তারাও বলবেন এই ঠিক, এমন মেয়ের যে বিয়ে হয়েছে এই না কত। বা তোমার মত বলবে যে নিজের ভবিষ্যত বরবাদ করলো। কিন্তু বিশ্বাস কর আমি, বরাবর, তোমায় ভালোবেসে এসেছি, সামনে দাঁড়ানোর মত সাহস ছিল না। আর তুমি যেদিন এই রকম অবস্থাতেও আবার নাচের স্কুল করলে, একা একা যেতে শুরু করলে সর্বত্র্য; আমি অভিভূত হয়ে গেছিলাম। ভাবলাম যে ও যদি পারে তাহলে আমিও কিছু করতে পারবই। তবে শ্রদ্ধা করি তোমায়, একটু হয়ত ভয় ভয়ও পাই।" লজ্জা লজ্জা হাসি দিয়ে বলল শেষ কথা গুলো। 

"তোমায় একটা প্রনাম করতে দেবে?" কেঁদে ফেলল জাহ্নবী। কাছে এসে দুই হাতে জাহ্নবীর মুখটা ধরে বলল 

"ছিঃ, তোমার স্থান পায়ে নয় আমার বুকে, কি করে দেই প্রনাম করতে? তাছাড়া আমি তোমার প্রনাম অন্তত পাবার যোগ্য নই। তুমি যেইভাবে নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, মনের দুঃখ ঝেড়ে ফেলে নতুন করে বেঁচে সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছ বেঁচে থাকা কাকে বলে; সেখানে আমার মত সাধারণ একটা ছেলে তোমার প্রণম্য হয় না জাহ্নবী।"

"হয়, হয়, তুমি আমায় সেদিন না বাঁচালে আজ কোথায় থাকতাম আমি? আর পড়াশোনা?" একটা ব্যঙ্গের হাসি দিয়ে বলল "দেখলাম তো পড়াশোনা করা, সংস্কৃতিবান পুরুষের নিদর্শন; হ্যাঁ, সব মেয়েদেরই হয়ত একটা স্বপ্ন থাকে, কেমন স্বামী হবে। কিন্তু সেই স্বপ্নে সব চেয়ে বড় যে চাওয়াটা থাকে তাহলো, মানুষের মত মানুষ একজন যেন স্বামী হয়। সে বিশাল কিছু অথচ মনুষ্যত্ব নেই এটা অন্তত আমার স্বপ্ন ছিল না। তাছাড়া, অমন বিশাল ভালো কোনো ছেলে যদি বিয়ে করতেনও আমায়, হয় দয়া পরবশ হয়ে, নয় নিজে কত মহত সেটা দেখাতেন। হয়ত আমি ভুলও বলতে পারি; দুনিয়ায় কি সবাই খারাপ? কিন্তু আমার তিক্ত অভিজ্ঞতায় আমি ভয় পাই। তোমার এডুকেশনাল কোয়ালিফিকেশন কি? বা তুমি মুদির দোকান করে সংসার কর কি না, এগুলো আমার কাছে তুচ্ছ। তুমি মানুষটা খাঁটি আর আমায় দয়া করে বিয়ে করছ না; এইটুকুই আমার বিয়েতে রাজি হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। হ্যাঁ, তারপর আমার বিয়ে হলে বোনদুটোও নিশ্চিন্তে সংসার করতে পারবে, কদিনই বা হল ওদের বিয়ের।" হঠাৎ স্বয়ম্ভুর ওপর ঝাঁপিয়ে পরে জাহ্নবী মারতে আর কাঁদতে কাঁদতে বলল 

"কেন, কেন, কেন এতদিন জানতে দাওনি? কেন বলনি আমায় কিছু? এই তোমার ভালবাসা? আমি একা একা কষ্ট পেয়েছি, ক্ষতবিক্ষত হয়েছি, কেন তুমি আসনি সামনে?" 

"আমি ঠিক যখন আসার তখনি এসেছি; নাহলে এত দিন সাহস হয়নি, আজ কেন হলো বলো? আর আগে আসলে তুমি আমায় গ্রহণ করতে পারতে?" বুকের ভেতর ভরে নিল জাহ্নবীকে।

"আচ্ছা, একটা কথা..." 

"কি?" 

"তুমি পা লাগিয়ে নাওনি কেন? না মানে, তোমাদের ওই ডান্সার কি যেন নাম উনিও তো ওই ভাবেই নাচ করেন, সরি আমি নাম ভুলে গেছি," পা লাগানো? সে তো জাহ্নবীর মনের কথা?

"না মানে, ওই জয়পুর ফিট না জয়পুর লেগ ওইখান থেকেই তো, ওটা তো খুব সম্ভব ফ্রি, আর উনিও তো ওইখান থেকেই পা লাগিয়েছেন" 

"সুধা চন্দ্রন.." 

"হ্যাঁ, হ্যাঁ, সুধা চন্দ্রন, সুধা চন্দ্রন।"

"তুমি এত কিছুর খবর জানো?"

"জানি, মানে, আসলে, তোমার নাচ দেখতে আমার ভারী ভালো লাগত; তোমার সাথে এমন হওয়ার পর কেবল ভাবতাম তোমায় যদি আবার নাচের স্টেজে পৌঁছে দিতে পারতাম। ওই একটা সিনেমা দেখেছিলাম ঠিক তার নায়িকার মত তুমিও আবার নাচ করে উপযুক্ত জবাব দিয়ে দিতে; আগে তো পারিনি কিছু করতে এখন যদি করি?" 

"তুমি জান না, এটা আমার স্বপ্ন ছিল; তবে আমি জানতাম অনেক খরচ"

"আচ্ছা, একটা আইডিয়া এসেছে বলব?" 

"তুমি কি এখনো আমায় ভয় পাচ্ছ নাকি? এমন প্রতিটা কথায় পারমিশন নিচ্ছ কেন?" 

"তা, পাচ্ছি বৈকি, বৌকে কে না ভয় পায়" বলে মুখ চিপে হাসছে স্বয়ম্ভু। কথাটা শুনে প্রথমটা রাগ রাগ চোখে তাকালেও হেসে ফেলল জাহ্নবীও।

"হ্যাঁ, কি বলবে বলছিলে?" 

"বলছি, জয়পুর যাবে? পা ও লাগিয়ে আসব, আর বিয়ের পরের ঘোরাও হয়ে যাবে" জাহ্নবী আর সামলাতে পারল না নিজেকে গলা জড়িয়ে ধরল স্বয়ম্ভুর

"যাব, যাব, একশবার যাব" প্রথম আদর করলো তাকে স্বয়ম্ভু; তার এতদিনের জমে থাকা ভালবাসা উজাড় করে দিল। ভালবাসার কাঙ্গাল জাহ্নবীও, তার পক্ষ থেকেও বাধা এলো না কোনো। বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দে ভাসলো দুজনে। 



জাহ্নবীর স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান সমারহে করা হয় প্রতি বছর। এবারের অনুষ্ঠানে স্বয়ম্ভুও আছে তাদের পাশে ফলে জাঁকজমক কিছু বোধকরি বেশিই হলো অন্যবারের তুলনায়।  লবঙ্গ এবারে তার স্বামীকে জোর করেই নিয়ে এসেছে, তাঁর নাকি এসব একেবারেই পোষায়না; লবঙ্গকেও অত দূরে গিয়ে নাচ শেখানোর থেকে বিরত রাখার ব্যর্থ প্রয়াসও নাকি চালিয়েছেন। স্বাধীনচেতা লবঙ্গ পাত্তা দেয়নি তাতে। যদিও তিনি নিজেও এক সময় গায়ক হবার চেষ্টা করেছিলেন। এবং খুব ভালই জানেন জাহ্নবীর আজ কত নাম ডাক, তবু বাধা দেওয়ার ত্রুটি ছিল না তাঁর তরফের। লবঙ্গ অবশ্য কৌশলে আসল খবরটা চেপে রেখেছিল; এবারের বার্ষিক অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ জাহ্নবীর নাচ। কথাটা যারা আগ্রহী তারা ঠিকই জানতেন এবং জাহ্নবীকে উৎসাহ দেবার, আশির্বাদ দেবার জন্য তার গুরুজি সহ সমাজের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।  অসামান্য অনুষ্ঠানের শেষে বড় বড় সংবাদ মাধ্যমের তুষ্ট প্রতিনিধিদের সামনে জাহ্নবী সকলের সাথে তাকে আজকের এই দিনটা ফিরিয়ে দেওয়ার নায়কের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। যদিও স্বয়ম্ভুর মতে সে নাকি কিছুই করেনি; সকলকে বিদায় জানানোর পর, কিছু মানুষের সাথে পরিচয় করতেই হয়; সেই উপলক্ষ্যে আজ  বহু দিন পর মুখোমুখি জাহ্নবী আর পশুপতি।

বেমানান

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

শেষাংশ

ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়েই খুব পরিচিত আরোও একটা গন্ধ; সারা বাড়ীতে ধুনো দিয়েছে। সন্ধ্যে দেবার শাঁখের ফুঁ ও শুনতে পেলো সাথে সাথেই, নিজের অজান্তেই হাতটা কপালে ঠেকায়। অভ্যেস অভ্যেস রক্তে মিশে আছে। ফুল্লরা কে পেয়ে জানতে চাইল ব্যাপার খানা কি? কারন তাদের তো কোনো জমিদারি ছিলোনা যে নায়েবমশাই থাকবে সে তার পরিবার বংশ পরম্পরায় এই বাড়ীর দেখভাল করবে, এই বাড়ীর উত্তরাধিকারি না আসা অবধি। যা শুনল তা'হোলো বাবা নাকি মারা যাবার সময়ে ডিক্লেয়ার করে গেছিলেন যে, এই বাড়ী থেকে গ্রামের সব ছেলেমেয়েদের বিয়ে হবে। অর্থাৎ গ্রামে কোনো বিয়ে লাগলে ঝড় বাদল কিম্বা স্থানাভাবে বিয়ে পন্ড না হয় কোনোমতেই। আর তাই গ্রামের সবাই শম্পার মা বাবার অবর্তমানে বাড়ীর ভেতরটুকু ঠিক রেখেছে তাদের নিজেদের স্বার্থে। ইনফ্যাক্ট শম্পার বন্ধুদেরও এই বাড়ী থেকেই বিয়ে হয়েছে। মূলতঃ মেয়ের বিয়েতে বরযাত্রদের থাকার জন্য বা ছেলেদের ফুলশয্যের জন্য ব্যবহার করা হয় এই বাড়ী, তবে আজ শম্পাকে দেখে সবাই সঙ্কিত ধরেই নিয়েছে শম্পা বাড়ী বিক্রি টিক্রির উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছে আর তাই কাল গ্রামের লোক শম্পার কাছে দরবার করতে আসবে। কথা বলতে বলতে শম্পা লক্ষ্য করছে ফুল্লরা সেই কাঁচের টপ ওয়ালা কাশ্মিরী কাঠের টেবিল টাকে শম্পা যেখানে বসা সেখানে এনে রাখছে। একটু পরেই কারনটা বোঝা গেলো, ফুল্লরার শ্বাশুড়ী চা জলখাবার নিয়ে এসেছে। হ্যাঁ, ক্ষিধে তো পাচ্ছিলই শম্পার, সাথে জেট ল্যাগের ঠেলায় ঘুম পাচ্ছে দেদার। অনুপমকে ফোনও করতে হবে; একটু একা না হলে করে কিকরে অথচ ফুল্লরাদের চলে যেতেও বলতে পারছেনা। চায়ের সাথে জলখাবারের দিকে তাকিয়ে শম্পার মুখটা তেতো হয়ে গেল, একবাটি ম্যাগী। যাঃ এখানেও? কোথায় ভাবছিল মুড়ি টুড়ি পাবে চায়ের সাথে। 

"হ্যাঁঅ্যা মা, সেদেশে বলে সব সময় পা'রুটি খেতে হয়?" প্রশ্নটা শুনে শম্পা বুঝল বৃদ্ধা বিদেশের গল্প শুনতে আগ্রহী। একটু হেসে বলল "নাঃ ঠিক তা নয়, ডাল ভাত, মাছ ভাত ও খাওয়া যায়" একটু অবিশ্বাস্য চোখে তাকায় ওরা। ইতোমধে্য দেখে জানলার ওপাশে কিছু উৎসাহী মুখ জুলজুল করে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ শম্পা

"হ্যাঁ রে ফুলি, তোদের বাড়ী না আগে মুড়ি বানানো হোতো? এখন আর হয়না?" ফুল্লরা গালে হাত এতো বছরেও মনে আছে শম্পার? ব্যস অমনি "আমি বললাম সে কে শোনে কার কতা, শম্পি সে দেশে এসব মাগী না কি এ খায়, আমার সই আমি ছিনিনে? বলিনি শম্পি মুড়ি চাবে?" শম্পা বুঝল এটা শ্বাশুড়ী বৌ এর কম্পিটিশন তাকে নিয়ে, কারন বৃদ্ধা ফুল্লরার কথায় মিইয়ে গিয়ে মুড়ি আনতে চলে গেলো। শম্পা বাচ্চা গুলোকে হাতের ইশারায় ডেকে ম্যাগী ভর্তি বাটিটা এগিয়ে দিলো, নিমেষে ছোঁ মেরে নিয়ে সব হাওয়া। সবে ফুল্লরাকে কাটানোর বুদ্ধি করছে, এরই মধ্যে দেখে ফুল্লরা উঠে তাকে টানছে। তারা এখন বসে টিভিতে কি সিরিয়াল দেখবে শম্পাকেও সাথে চায়। সে নাকি আজ কোন মেয়ের স্বামী তাকে স্ত্রী বলে স্বীকার করবে সবার চরম উত্তেজনা। তা ও যদি কোনো প্রখ্যাত লেখকের লেখা গল্প হোতো; বাজার চলতি লেখিকার মস্তিষ্ক প্রসূত গল্প যা কিনা ইল্যাস্টিকের সামিল। শম্পা বিদেশে বসেও এই সব সিরিয়ালের আঁচ পেয়েছে। কোনোরকমে ধানাই পানাই করে কাটালো ফুল্লরাকে। কি অদ্ভূত না? এই গন্ডগ্রাম, এখনও আঙ্গুলে গুনে বলা যায় কটা ছেলেমেয়ে স্কুলে পড়ে, বেশীরভাগ বাড়ী গুলোতে বাথরুম বা টয়লেট বলে কিছু নেই, অথচ ম্যাগী, টিভি সিরিয়াল এমনকি মোবাইল ফোন ও দিবি্য ঢুকে পরেছে দৈনন্দিন জীবনে। শম্পার ফোনটা দেখে বাচ্চাগুলো বলাবলি করছিল এই ফোন দিয়ে কি কি করা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। রাতে লাইন পেল না অনুপমের কাজেই সকালের অপেক্ষায়। ডিনারে ফুলিদের ঘরে খেতে গিয়ে দেখে যে পরিমান ভাত দিয়েছে সে বোধহয় শম্পার এক মাসের খোরাক। বাটি বাটি করে ডাল, মুরগীর মাংস, পাতের ওপর ভাজা। হায়রে এখানেও চিকেন? শম্পা অতি কষ্টে ওদের নিরস্ত করে নিজের পরিমান মতো খেল, চিকেন বাদ দিয়ে। 

অনুপমকে একবারই ধরতে পেরেছিলো ফোনে দিন দুয়েক আগে। এখানে মোবাইলের টাওয়ার পাওয়া মুস্কিল। যাকগে শম্পা ফিরে রিপোর্ট দিলেই বুঝবে। নিজের মনে ঘুরে বেড়ায় শম্পা, গল্প বলতে হয় বিদেশের, কি খায় কেমন করে থাকে, বিয়ে না করে কিকরে আছে এমন আরও হাজার একটা প্রশ্ন।  গ্রামের মানুষদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে সে বাড়ী বিক্রী করতে নয় সারাই করতে এসেছে। সেই অনুযায়ী কাজের লোকও টুকটাক আসছে দেখা করতে, কি কি করতে হবে কেমন খরচ হবে বোঝায় শম্পাকে। তবে এক্ষুনি কাজ শুরু করবেনা কারন এটা পৌষ মাস; সংক্রান্তি যাক তারপর হবে। শম্পার মাথায় একটা আজব খেয়াল এলো। ফুল্লরা আর গ্রামের আরো কয়েকজন বৌকে ডেকে বলে পৌষ সংক্রান্তিতে তাদের বাড়ী পিঠে উৎসব করবে গ্রামের সবাইকে নিয়ে। ওরা খুব উৎসাহী কিন্তু শম্পা দেখে চালের গুঁড়ো, ময়দা পাড়ার মুদি দোকান থেকে কিনে আনার কথা বলছে। নাঃ, শম্পা চায় সেই পুরোনো দিনের মতো চাল শুকিয়ে বেটে বানানো হবে আর ময়দা সে কিসে লাগবে? তার মা তো কোনোদিন ময়দা ব্যবহার করেননি পাটিসাপ্টা বানাতে।  এতো পরিশ্রম শুনেই পিছিয়ে যায় সব, শম্পাকে বোঝায় এখন চটজলদির যুগ অতএব সবই দ্রুত হয় এমনই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শম্পা পাল্টা বোঝায় যে এমন উৎসব তো আর প্রতিবার করতে আসবেনা সে, অতএব এবারে শম্পার মতানুযায়ীই হোক; সবাই হাতে হাতে করলে তেমন পরিশ্রম কৈ? আর মজাও হবে কতো। অবাক হয় শম্পা, বিদেশে বাঙ্গালীরা কিন্তু আজও যতোটা পারে নিয়ম মেনেই করে অথচ এখানে সে সব উঠে গেছে। শম্পাকে নিয়ে হাসাহাসি করে ওরা শম্পা কোন যুগে পড়ে আছে বলে, সে যেন বড্ড বেমানান এই যুগে; তবু কিছু করার নেই রাজী হতে বাধ্য ওরা।


সংক্রান্তির খুব ভোরে, গলায় ক্যামেরা জিনসের জ্যাকেট আর ব্র্যান্ডেড জিনস্ পরনে আস্তে করে বড় বাড়ীর গেট খোলে অনুপম। উঠোনে এক মহিলা লাল ক্রিম রংয়ের অতি পাতি তাঁতের ডুরে শাড়ী সাধারন করে পরে বসে আল্পনা দিচ্ছিল, গেটের আওয়াজে চমকে পিছনে তাকায়। অনুপমের যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয়না শম্পা দাঁড়িয়ে তার সামনে? এই কদিনেই মিশে গেছে এখানে? এই শম্পার সামনে অনুপমই যেন বেমানান। সাত সকালে পিটুলি গোলায় ন্যাকড়া ডুবিয়ে মধ্যমা দিয়ে টেনে টেনে আল্পনা দিচ্ছে, পরিশ্রমে মুখ লাল, শীতের সকালেও ঘর্মাক্ত। অনুপমকে দেখে ভুত দেখার মতো চমকেছে শম্পা, এই জন্যই ফোনে পাচ্ছিলনা তার মানে। অনুপম রওনা দিয়েছিলো তার কাছে আসার জন্য। একহাতে টিউবওয়েল পাম্প করে হাত ধুলো শম্পা, সবটাই অনুপমের কাছে চরম বিস্ময়। ফটো তুলতে শুরু করেছে শম্পার প্রতিটা কাজের। আল্পনা দেওয়া ফেলে ঘরে নিয়ে যেতেই জড়িয়ে ধরে অনুপম। 

"জাস্ট ভাবতে পারছিনা এটা তুমি? এমন অদ্ভূত শাড়ী পরে, এতো সকালে উঠে___; আজ কি আছে যে এতো আল্পনা টাল্পনা?" এতদিন পর কাছে পেয়ে নিজেকে অনুপমের হাতে সঁপে দেবার বদলে আস্তে করে ছাড়িয়ে নেয় শম্পা। 

"শোনো, এখানে এসব নয়, গ্রামের মানুষ হয়ত ভাবতেই পারবেনা তোমার আমার রিলেশন। কি দরকার কোনো কথা ওঠানোর? আজ পৌষ সংক্রান্তি আমি এখানে পিঠে বানানোর উৎসবে ডেকেছি সবাইকে। এখনি দেখবে সব চান করে কাচা কাপড়ে এসে উপস্থিত হবে। এখন ছাড়ো, কেউ দেখে ফেললে যা তা।" অবাক হয়ে তাকায় অনুপম, এতো বছরের চেনা শম্পা যেন নয়, যে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে বয়সে বড় হয়েও অনুপমের লিভইন পার্টনার।  এ যেন এই গ্রামেরই সেই মেয়েটা যে একদিন বিদেশ পাড়ী দেবার সময়ে আকুল হয়ে কেঁদেছিলো। কি কষ্ট করে অ্যাডজাস্ট করেছিলো অজানা অচেনা পরিবেশে। তখন বিকাশ স্যারের ছেলে অনুপমও ছোটোই ছিলো, বিদেশ যেতে গেলে কান্না পাবার কি আছে বোধগম্য হয়নি তার, আজ বুঝল শম্পার রুট আসলে এখানেই, শম্পাকে সব থেকে মানায় বুঝি এইখানেই। 

বেমানান

মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী

গাড়ীটা ধুলো উড়িয়ে চলে গেলে শম্পা তাকিয়ে রইল সেই দিকে। এভাবে আসাটা ঠিক হল কিনা এখনও সন্দেহ রয়েছে। গাড়ীটাকেও তো ছেড়ে দিলো। 'যাক গে, যা হবার হবে' মনে মনে ভেবে পা বাড়ালো বাড়ীর দিকে। এখান থেকে কয়েকপা হাঁটলেই সনৎকাকা দের চাষের জমি, তার আল বেয়ে গিয়ে উঁচু রাস্তায় উঠে ডানদিক মুড়লেই বাড়ী। এতো বছর পরেও সব পরিস্কার মনে আছে আর কিচ্ছুটি বদলায়নি যেন। এবড়ো খেবড়ো মেঠো পথে টুকটুক করে এগোয় শম্পা। তবে এই পথে তার ট্রলি ব্যাগটাকে টানতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। কখনও উঠিয়ে কখনও টেনে নিয়ে চলতে থাকল, বিকেল তিনটে সাড়ে তিনটেও যথেষ্ট রোদ। ঘাম ঝরতে শুরু করল, কি বিরক্তিকর রে বাবা। উঁচু রাস্তায় ওঠার মুখোমুখি কতোকগুলো রোগা রোগা কালো কালো ছেঁড়া জামা পেন্টুল পরা, রুক্ষ চুল, নাক ঝরছে ছেলে পিলে ঘিরে ধরল শম্পাকে। পিছে পিছে চলে আবার সুযোগে সামনে সামনেও হাঁটে। ওর ট্রলিটা দেখে মন্তব্য করে 'এটা কেমন গাড়ী রে?' আবার একটা একটু মাথায় লম্বা ফস করে বলে 'এটা গাড়ী না রে শুটকেশ চাকা লাগানো' শম্পার ফটফটে রং দেখে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে 'মেম না বল?' 'না রে ধূর মেম নাকি? শাড়ী পরা দেখিসনা?' 'সিলিলাল করে?' ওদের কথায় হাসি পাবার বদলে কেমন রাগ হতে শুরু করল শম্পার। 'যায় না কেন? এগুলো কি পিছে পিছে বাড়ী অবধি যাবে না কি? তবে তো হয়েছে' ভাবতে ভাবতে ডানদিকের মোড়। মোড় নিতে যাবে পিছন থেকে ডাক "শম্পিইই, র র" আলের ওপর দিয়ে দৌড়ে আসছে কাদা মাখা পায়ে লক্ষ্মী, ফুল্লরা, সোনামনি। দাঁড়িয়ে পড়ে, বন্ধুদের ডাকে সাইকেল থেকে নামে শম্পা, গ্রামের একমাত্র মেয়ে যে ইস্কুল যায়। খেলার সাথীরা ইস্কুলের গল্প শোনার জন্য আটকায় তাকে। পড়তে বসতে হবে, ক্ষিধে পেয়েছে এমন বিভিন্ন অছিলায় ওদের হাত থেকে নিস্তার পেতে চায় শম্পা। 

"তুমি কি বড় বাড়ী যাবে?" ছোট্ট একটা কচি গলার প্রশ্নে সম্বিত ফেরে শম্পার। হ্যাঁ বড় বাড়ীই তো বলত বটে তাদের বাড়ীকে। চোখের সামনে ছোটোবেলার দৃশ্য ভেসে আসায় অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলো। মোড় ঘুরতেই বাড়ীটা দেখা গেল। সাদা রং ছিলো কোনো এককালে, একেবারে কোনো রকম কোনো কায়দা বিহীন দোতলা বাড়ী। কতকটা স্কুল বিল্ডিং এর ছোটো সংস্করন লাগে। বাইরের পলেস্তারা খসে খসে গেছে বহু খানেই, রাংচিতার বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখতে দেখতে গেটের সামনে দাঁড়াল। এদিকে পিলার দিয়ে বড় গেট ওদিকে রাংচিতার বেড়া। আগে কোনোদিন ব্যাপারটা বেমানান লাগেনি আজ যেন বড্ড চোখে লাগছে। গেটটার অবস্থাও বেশ করুন রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে, কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপার উঠোন টা চকচকে করে নিকোনো। সেই মাটির উঠোন তার মায়ের আমলে যেমন থাকত। টিউবওয়েলটাও আছে ঠিক ঠাক, রেগুলার ব্যবহার হয় বোঝা যাচ্ছে। শুধু বাড়ীটার কেমন মলিন চেহারা হয়েছে। দুপাশের টানা লাল বারান্দা পরিষ্কার কিন্তু টিনের চালটা ভেঙ্গে ভেঙ্গে মতো গেছে, পুরোটাই জং পরা। ঘরের ভেতরের যে কি হাল কেজানে উঠোনে দাঁড়িয়ে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দিক দেখতে দেখতে ঠিক কি করা উচিত, চাবি কার কাছে খোঁজা উচিত ভাবছে শম্পা। নিজের বোকামোতে নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছিল। কি দরকার ছিল অনুপমের কথায় চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেখাতে যাওয়ার যে শম্পা এখনও এই গ্রামে থাকতে পারে, যেমন আগে থাকত। 'মানুষের ভালো ভাবে থাকার কোনো ট্রেনিং লাগেনা, তবে সাধারন বা খারাপ ভাবে থাকার টে্রনিং অবশ্যই লাগে' বয়সে ছোটো হলেও ছেলেটা মাঝে মাঝে মা ঠাকুমা মার্কা ডায়লগ দেয়, অনুপমের কথাটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পায় শম্পা। এই কটা বছরেই যে নিজের অভে্যস পাল্টে গেছে বুঝেছিলো ঠিকই কিন্তু ভেবেছিলো জীবনের একটা বড় অংশ যেভাবে কেটেছে একটু চেষ্টা করলেই সেভাবে থাকতে পারবে। এই গন্ডগ্রাম থেকেই তো একদিন বিদেশ পাড়ি দিয়েছিল, তখনও তো অ্যাডজাস্ট করতে হয়েছিলো প্রচুর। না হয় পুরোনো অভ্যেস ফিরিয়ে আনতে দুটো দিন লাগবে, কিন্তু এখন ভয় ভয় করছে পারবে কি না। ঘরের ভেতরটা যদি সাফ করে তবে থাকতে হয় তাহলে সব বীরত্ব ফুস হয়ে যাবে শম্পার। 

"ওমা এতো শম্পি। দেকো দিকিনি এগুলো বলে কি না মেম না সিলিলালের লোক" গলার আওয়াজে পিছন ফিরে তাকায় শম্পা। মোটাসোটা কালোকোলো চেহারা, অতি সাধারন সবুজ খয়েরি ডুরে তাঁতের শাড়ী, চপচপে তেল দিয়ে এত্তো বড় খোঁপা আর সিঁথি ভর্তি করে সিঁদুর কপালে জ্বলজ্বল করছে বড় সিঁদুর টিপ মহিলাকে চিনল না শম্পা। খানিকটা বোকা বনে তাকিয়ে রইল, কারন মহিলা তাকে চিনেছে মানে তারও চিনতে পারা উচিত ছিলো। ধবধবে ফর্সা ছিপছিপে চেহারা, বেশ রুচি সম্মত দামী শাড়ী পরনে, চেস্টনাট কালার করা ছোটো পিক্সি করে ছাঁটা চুল শম্পাকে যে এক ধাক্কায় চিনে ফেলেছে এটাই তো অবাক কান্ড। মুখোমুখি দুজন সমবয়সী একই গ্রামের মহিলা কিন্তু যেন আকাশ আর পাতাল। মহিলাটি শম্পার তাকানোর রকমে বুঝেছে যে শম্পা তাকে একটুও চেনেনি। 

"চিনতে পারিল নি তো? আমি ফুলি রে। এই গেরামেই তো বে হয়েছ্লো" 

"মাই গড, ফুলি? তুই? আমি সত্যিই ___" চূড়ান্ত অপ্রস্তুত শম্পা কে জড়িয়ে ধরে ফুল্লরা।  ওর গায়ের তেলচিটে গন্ধ, চুলের তেলের সেই শ্বাস ভারী করা মিষ্টি গন্ধ, আর মুখের পানের জর্দার গন্ধ প্রথমটা কেমনতরো লাগলেও এই সব গন্ধ যেন শম্পাকে তার পুরোনো দিন গুলোয় ফিরিয়ে নিয়ে গেলো। এগুলো তার খুব পরিচিত,শম্পার বা ওর মায়ের গায়েও ঠিক এমনই গন্ধ থাকত। বরং শম্পার প্রসাধনী এবং পারফিউমের গন্ধ ওর নিজের কাছেই অপরিচিত, এই পরিবেশে বড্ড বেমানান ঠেকলো। 

"অ্যাই দেকো, ও গোবিন্দা, অ্যাই দেক্ রে তোর ঠাকমা কৈ, চাবি নে আসি বলে গেল ঝে? ককন থেকে বলে দাঁইড়ে আচে।" বলতেই হুড়মুড় দুদ্দাড় কয়েকটা ছেলেপিলে দৌড় লাগালে। বেশ ছোটোখাটো একটা জটলা তৈরী হয়েছে শম্পাকে ঘিরে সবাই ই এমন চোখে দেখছে যেন ভীন্ গ্রহের প্রানী। আবার ফুল্লরা একমাত্র পরিচিত এবং শম্পা তাকে হাগ করেছে তাতে তার ভাবখানা মাটিতে পা পড়েনা টাইপ। একটু পরেই একটা দঙ্গলকে সাথে নিয়ে চাবি হাতে ফুল্লরার শ্বাশুড়ী উপস্থিত। শম্পার হঠাৎ মনে পড়ল পাড়ার বয়স্কদের প্রণাম করাটাই রীতি ছিলো। নীচু হয়ে "মাসিমা" বলে পা ছুঁলো বুড়ীর, গুঞ্জন চলছিলোই আরোও বাড়ল এই ঘটনায় কেউ যেন বিশ্বাসই করতে পারছেনা শম্পার কাজগুলো। 

দরজা খুললে শম্পা অবাক, এমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা যেন রোজ কেউ ব্যবহার করে ঘর বাড়ী। সবদিক ঝকঝকে, লাল মেঝে চমকাচ্ছে একই রকম, মনেহচ্ছে যেন মা এক্ষুনি 'শম্পু এলি মা?' বলে বেরিয়ে আসবে কোনো ঘর থেকে। ফুল্লরা মোটামুটি কৌতুহলী ভীড় কে তাড়িয়ে দিয়েছে, তার এখন প্রচুর দাপট, সে হোলো শম্পার সব থেকে কাছের জন। আস্তে আস্তে ঘরে যায় শম্পা, শীতের সন্ধ্যে যদিও তবু শম্পার চিটচিটে একটা গরমও লাগছে সাথে বেশ মশার পন্ পনানি শুনতে পাচ্ছে। খাটের ওপর বসেই ভাবল গা ধোওয়া প্রয়োজন। বাথরুম এই বাড়ীতে ছিলো তবে সে এখন কি দশা কেজানে। গ্রামে তো অন্যরা রাংচিতার বেড়ায় কাপড় মেলে আড়াল করে কলতলায় স্নান করতো। তা ও আবার তাদের কলতলাতেই কারন গ্রামে এই একটাই টিউকল।  ভাবতে ভাবতে শোনে টিউবওয়েলের ঘ্যাচাংকুঁচ ঘ্যাচাংকুঁচ শব্দ। কোত্থেকে বড় এক লোহার বালতি এনে তাতে জল ভরে টেনে বাথরুমে দিয়ে দিলো ফুলি চোখের নিমেষে। বাথরুমটা ও ঘরের মতোই পরিষ্কার, শুধু চৌবাচ্চাটা শুকনো পড়ে আছে এই যা। ফুল্লরাকে জিজ্ঞেস করবে ভাবছে যে ঘর বাড়ী এমন মেন্টেন করে কে? মুহুর্তে সে হাওয়া। আপাততঃ মশাদের গান শুনতে শুনতে হাত মুখ ধুয়ে নেওয়াটাই শম্পার কাজ।

(চলবে)

সাড়ে তিন রাত্রি, অতপর...

মো: সাইদুর রহমান

(শেষাংশ)

রাত সাড়ে ১২টা, আমি আমার গন্তব্যে সেই বাংলো বাড়ির কক্ষে ঢুকলাম। সেখানে আমার থাকার জন্য কেয়ার টেকার সব গুছিয়ে রেখেছেন। তারপর মুখ হাত ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে ক্লান্ত শরীরে ঘুমানোর জন্য বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ। তারই কিছুটা আলো দক্ষিণের জানালা দিয়ে আমার ওপর আঁচড়ে পড়ছে। মনে হয় যেন প্রেম দেবী আমাকে আলিঙ্গণ দিতে এসেছে। বেশ আনন্দ চিত্তে পূর্ণিমা দেবীর সাথে প্রেম করার জন্য বারান্দায় গেলাম। দক্ষিণের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি তো অবাক। সামনে বিস্তর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যে আমি মুগ্ধ। তার মাঝে পাতার ঝিরিঝিরি হাওয়া এক মুহূর্তে আমার ক্লান্ত শরীরকে শান্ত করে দেয়। ভাবছি যদি প্রতিটি রাত এই প্রকৃতির সাথে খেলতে খেলতে কাটাতে পারতাম!  হঠাৎ করেই আমার মাথায় একটি আঘাত পেলাম। তাকিয়ে দেখি আমার পায়ের কাছে একটি ছেঁড়া ফুল। অবাক তো হবোই বটে, রাত তখন সাড়ে ১টা। এই নির্জণ জায়গায় এতো রাতে কে আমাকে ফুল মারলো! ভাবতে ভাবতে একটি চিরকুটও পেলাম। তাতে লেখা ছিল, “আমার এই গৃহে তোমাকে স্বাগতম।” মনের মধ্যে যেমনই ভয় হলো, তেমনই কৌতুহলে আমি পায়চারি করছি। কিন্তু আশে-পাশে কারো দেখা পাচ্ছিনা। অবশেষে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছেনা। এরই মধ্যে আমার কানের কাছে ফিসফিস শব্দে শুনতে পাই, “তুমি চোখ খুলো না, আমি তোমার পাশেই আছি। তোমার সাথে প্রাণ ভরে কথা বলবো। তুমি চোখ খুললেও আমাকে দেখতে পাবে না।”

কন্ঠটি কোন এক প্রাপ্ত বয়স্ক রমনীর। কন্ঠটি শ্রুতি মধুর। আমি তার পরিচয় জানতে চাইলাম। কিন্তু সে বলেনি। তবে পড়ে জানাবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। তারপর আর কোন আওয়াজ আমি পাইনি। সেই রাতে আমার আরামের ঘুম হারাম হয়ে গেল। সকাল সাড়ে আটটার দিকে চা হাতে কেয়ার টেকার আমার রুমে প্রবেশ করলো। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, এই রুমের কোন ইতিহাস-ঐতিহ্য আছে নাকি ? কেয়ার টেকার আমার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো। তাছাড়া সে নতুন এসেছে, এই সম্পর্কে তার তেমন কোন ধারনা নেই। আমি বিষয়টি নিয়ে তার সাথে তেমন কোন কথা বললাম না। অনেকটা এড়িয়ে গেলাম। প্রসঙ্গ এড়িয়ে নাস্তার আয়োজন করতে বললাম। গোসল সেরে নাস্তা করেই বের হলাম কোন এক চা বাগানের উদ্দেশ্যে। চা বাগানের কর্মীদের সাথে কথা বলে একটি গবেষণামূলক প্রতিবেদন তৈরি করাই আমার কাজ। দিনের সবটুকু সময় কাজেই ব্যস্ত ছিলাম। সন্ধ্যা গড়িয়ে আসতেই মনে হলো বাগানের কোন এক কর্মীদের সাথে রাত্রি যাপন করতে হবে। তাহলে তাদের ভিতরকার আরো অনেক তথ্য আমি জানতে পারবো। দেখতে দেখতে রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেল। মনে পড়লো, “তুমি চোখ খুলো না, আমি তোমার পাশেই আছি।”

তাড়াতাড়ি ছুটে এলাম আমার রুমে। এসেই আগে বারান্দায় দাঁড়ালাম। তার সাথে কথা বলার জন্য শুয়ে চোখ বন্ধ করলাম। তারপর আমি শুনতে পারলাম নুপুরের ধ্বনি। আমি চোখ মেলতে উদ্ধত হলাম। সে বলতে লাগলো, “চোখ খুললে তোমার সাথে কথা বলবো না।” আমি চুপ হয়ে রইলাম। সে বললো , “তোমাকে আমার ভালো লাগে, তাই তোমার সাথে আমি গল্প করতে আসি। তুমি কি আমার সাথে প্রেম করবে ?” আমি অবাক হয়ে বললাম, “আমি তোমাকে জানিনা, কিন্তু তোমার সাথে আমার প্রেম হবে কি করে?” সে বললো, প্রেমের জন্য মন দরকার, কেবল মাত্র পরিচয়ই যথেষ্ট নয়। তবে তোমাকে আমার পরিচয় দিব। কিন্তু আজ নয়, অন্যদিন।” তারপর সে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আমি এখনো তাকে দেখতে পাচ্ছিনা। কয়েকবার তার হাতটা ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেই হাত খুঁজে পাইনি। আমার কাছে দ্বিধা, সংশয় আর কৌতুহল ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে লাগলো। সব কিছু উপেক্ষা করে আমি তাকে অনুরোধ করতে লাগলাম, “একবারের জন্য হলেও তুমি আমার সামনে আস।” তারপর আমি দেখতে পেলাম, দক্ষিণের বারান্দায় অবয়ব এক নারী মূর্তি দাঁড়িয়ে। আমি এক-পা, দু-পা করে সামনে এগিয়ে গেলাম। তার সামনে যাওয়া মাত্র সে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমায় জড়িয়ে ধরে হু..হু... করে কেঁদে উঠলো। আমি দেখতে পেলাম, সে সাড়ে ১৯ বছর বয়সী এক রমনী। পাশের দেয়ালটিতে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বলে, এই দেয়ালে প্রস্তরে আমার আত্মা মিশে আছে।

বিষয়টি বুঝতে একটু কষ্টই হয়েছিল বটে। সে বললো, “ তোমাকে এই বিষয়টি পড়ে বুঝিয়ে বলব।” কিন্তু আমি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল না হওয়া পর্যন্ত কি করে শান্ত হব! অবশেষে সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে চা-বাগান ও এখানকার মানুষের জীবন-যাপন সম্পর্কে বলতে লাগলো। আমি নিরব হয়ে তার সারা জীবনের সমস্ত দু:খ কষ্টগুলো ভাগ করে নিতে লাগলাম। রাত সাড়ে ৪টার দিকে ও আমাকে একা রেখে হারিয়ে গেল। আমি তাকে আর দেখতে পেলাম না। অতপর শ্রান্ত শরীলে আমি ঘুমিয়ে গেলাম। পরদিন সকালে আমি গবেষণার কাজে বের হলাম। রাতে মেয়েটি আমাকে চা-বাগান ও এখানকার মানুষের যে তথ্য দিয়েছে, তা আমার গবেষণায় অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছে। সারা দিনের কাজ শেষে আজ আমার ফিরতে ফিরতে বেশ দেরী হয়ে গেল। রুমে ঢুকতেই বেশ সুবাসিত গন্ধে আমি মুগ্ধ। অবশেষে আমি দেখতে পেলাম, অসাধারণ কিছু ফুল হাতে নিয়ে দক্ষিণের বারান্দায় নীল শাড়ী পড়া সেই রমনী আমার জন্যই অপেক্ষা করছে। গ্রিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রমণীর গায়ে আঁচড়ে পড়া চাঁদের আলোর ঝলকানিতে যেন স্বর্গের অস্পরা দেবী আমায় প্রেম নিবেদন করতে আসছে। আমি তার প্রেম গ্রহণ করলাম। তার সাথে প্রাণ খুলে কথা বললাম। তার পর সে আমাকে তার জীবনের আরোও অনেক গল্প শুনাতে লাগলো। “ আমি বিধবা বধূ। যৌবনের জোয়ারের উচ্ছাস আমার মধ্যে বিষণ ভাবে নাড়াচাড়া দিচ্ছে। স্বামী সম্ভবা আমি। ঐ যে দেখা যায় পুকুর ঘাট, আমি সেখানে বসে বসে পেয়ারা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ ৩জন শহরে বাবুর অনুপ্রবেশ ঘটলো এই বাড়িতে। তারা আমার দিকে ফিরে ফিরে তাকালো। তাদের মধ্যে একজনকে আমারও বেশ ভালো লাগলো। কয়েকদিনের মধ্যেই তার সাথে আমার বেশ ভাব তৈরি হলো। আমার জীবনের সমস্ত ঘটনা তাকে জানিয়ে দিলাম। সে বিষয়গুলো নিয়ে আমাকে দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন করলো না। তার মানে আমার সব কিছুই সে মেনে নিয়েছে। সে জানালো আমাকে সে ভালবেসে ফেলেছে। বিয়ে করে ঢাকায় নিয়ে যাবে। আমার আপত্তির কথাও জানতে চাইলো। আমি তো রাজি। আমি ও তাকে ভালোবেসে ফেলেছি। একদিন রাতে সে আমাকে কফি খাওয়ার দাওয়াত দিলো। আমি দাওয়াত গ্রহণ করে সন্ধ্যা সাড়ে ৮ টার দিকে আমি তাদের রুমে আসি। তাদের সাথে কফি খেতে খেতে অনেক সময় আড্ডা মারলাম। ঘড়ির কাটা সাড়ে বারোটা। ছেলেটি আমার কাছে এসে বসলো। আমার হাত ধরলো। তারপর এক আপত্তিকর কাজে আমাকে রাজি করানোর চেষ্ট করলো। কিন্তু আমি কিছুতেই রাজি হতে চাইনি। ছেলেটি মানতে নারাজ। এক পর্যায়ে তারা সবাই মিলে আমাকে জোর করে ধর্ষণ করলো। আমি রক্তার্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছি। আমার সেই কান্না, সেই চিৎকারে এই দেয়ালগুলোতে ফাটল ধরেছিল। হয়তো পৃথিবীর অন্য কেউ সেই চিৎকারের ধ্বনি শুনতে পায়নি। তাদের এই অপকর্ম ঢাকতে আমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করলো। আর  এখান থেকে পালিয়ে গেল তারা। আমার অভিশপ্ত আত্মা দেয়ালের প্রস্তরে এখনো ঘুরে ঘুরে কাঁদছে। তবে এখন প্রকৃতির সঙ্গে আমার একটা ভলো সম্পর্কও আছে। ” হঠাৎ তার বলা বন্ধ হয়ে গেল। আমি তাকে আর খুঁজে পাইনি। দেখতে দেখতে ভোর হয়ে গেল। আমি রীতিমত আমার কাজে বের হয়ে গেলাম। গবেষণার একেবারেই শেষ প্রান্তে আমি। মাঠের কাজ শেষে আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রুমে প্রবেশ করলাম। আমার অপেক্ষার প্রহর চলছে। কখন আসবে সেই রমণী।

আমি হাতের ঘড়ির দিকে বার বার তাকাচ্ছি আর পায়চারি করছি। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে আর আমার অস্থিরতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে পূর্ণিমা উপভোগ করছি। হঠাৎ করেই ফুলের সৌরভ আমার নাকে আসে। আমি ভাবছি হয়তো এখনি সে আসছে। কিন্তু সেই রাত্রিতে তার আর দেখা পেলাম না।

আমার সারাটি রাত এভাবেই কেটে যায়। পরদিন সকালেই আমাকে ঢাকায় ফিরতে হবে। কিন্তু তার সাথে আর দেখা হলো না। জানা হলো না আরো অনেক কিছুই। মনে একরকম কষ্টই পেয়েছি বটে। সকাল বেলা ট্রেনে ওঠলাম, ঢাকায় ফিরতে হবে। কিন্তু ট্রেনে উঠেই ঘটনা আরেকটা ঘটে গেল।

আশ্চর্যের বিষয়, ঢাকা থেকে আসতে ট্রেনে যেই মেয়েটির সাথে অনেক খোস গল্প হলো, আজ আবার ট্রেনে তার সাথে দেখা। আমি আগ বাড়িয়ে তার সাথে কথা বলতে চাইলাম। অথচ সে আমাকে চিনতেই পারেনি। সে আমায় বললো, “দেখুন আমি আপনাকে চিনি না, জানি না। আপনি যদি অযথা আমাকে বিরক্ত করেন, তাহলে আমি লোকজনদের ডাকতে বাধ্য হবো।” এবার আমিই বিরক্ত হলাম। নিজের মান-সম্মান বাঁচাতে থমকে গিয়ে সীটে বসে রইলাম। কিন্তু মাথার মধ্যে বিষয়টি কেবল মাত্র বার বার ভাবিয়ে তুলছে। এভাবেই কাটলো ট্রেনের সারাটা পথ। সময়মতো ট্রেন ঢাকায় এসে পৌঁছালো। বাসায় এসে আমার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে। সিলেটে থাকার ঘরে সাড়ে তিন রাত্রিতে সেই মেয়েটি এবং ট্রেনের মেয়েটির ব্যবহার আমাকে একেবারে হাঁফিয়ে তুললো।

আমি আমার জামা-কাপড় ছাড়তে গিয়ে পকেটে হাত দিতেই একটি চিরকুট বেরিয়ে আসে। তাতে লেখা ছিল, “দেখলে, আমি কিভাবে তোমায় চমকে দিলাম।”

সাড়ে তিন রাত্রি, অতঃপর...

মো: সাইদুর রহমান

অফিস থেকে বাসায় ফিরলাম রাত সাড়ে ১০ টায়। বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হতে না হতেই আমার ফোনটা বেজে উঠলো। মা ফোনটা এগিয়ে দিল। দেখলাম স্যারের নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। ভাবলাম আবার কোন গন্ডগোল করলাম কিনা কে জানে ! ফোন ধরতেই স্যার বললো, “ তোমার আবেদনটা গ্রহণ করা হয়েছে। তুমি কাল একেবারে রেডি হয়ে অফিসে চলে আসবে। কাল বিকেলেই সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে পার।”

আমি কয়েকদিন আগে অফিসে একটি আবেদন করেছিলাম। চা বাগানের ওপর গবেষণামূলক একটি প্রতিবেদন তৈরি করবো। অফিস আমার সেই আবেদনটি গ্রহণ করেছে। এমনকি সেখানে স্যারের এক বন্ধুর বাংলো বাড়িতে আমার থাকার সুয়োগও স্যার করে দিয়েছে।

আমি অফিস থেকে বিকেলেই রওয়ানা হলাম। সাথে বড় ক্যামেরাটা নিয়ে নিলাম। সময়মতো স্টিশনে গিয়ে উঠতে পারছি বলে হাঁফ ছেড়ে বাঁছলাম। বিকাল সাড়ে ৫ টায় ট্রেন ছাড়ার কথা রয়েছে। কিন্তু কি জানি কি সমস্যার কারনে সাড়ে ৫ টার ট্রেন প্রায় ১ ঘন্টা দেরি করে স্টেশন থেকে ছাড়ে।  ট্রেনের মধ্যে অনেকটা বিরক্তিকর সময় কাঁটছিল। সেই বিরক্তিকর সময়টা উপভোগ করতে পারলাম, পাশের সিটের ভদ্র মহিলার কারনে। তার কথা-বার্তা শুনে কিছুটা বিনোদনই উপভোগ করলাম। তিনি বেজায় রসিকও বটে। যাচ্ছেন সিলেটে। আমি যেখানে উঠবো তার ১ কিলোমিটার দূরেই তার বাসা। আমার হাতে ক্যামেরাটা দেখে, নিজের ইচ্ছাতেই ছবি তুলতে চাইলেন। এক গাল কাত করে হাঁসি দিলেন। খুব সুন্দর একটি ছবি আমি ফ্রেমে বন্দি করতে পারলাম। মনে হলো এটি একটি স্বার্থক ফটোগ্রাফি।  

কথা বলার মধ্যে মেয়েটি এক পর্যায়ে আমাকে বলে ফেললো, “আপনি বিয়ে করেছেন ? ” আমি বললাম, “ নারে ভাই, আমারতো বিয়ের বয়সই হয়নি। ” অমনিতেই মেয়েটি হা-হা করে হেসে পেললো। হাসিটা খুবই ভালো লাগলো। তার হাসিতে আমি মুগ্ধ। তবে আমি তাকে বিয়ের কথা জিজ্ঞাসা করিনি। কিন্তু মেয়েটি নিজের থেকেই বলতে লাগলো,----------

“আমার বয়স বেশী না ! আপনার মতোই ২৫ বছরে পা দিয়েছি। তবে এরই মধ্যে আমার ৩ বার বিয়ে হয়েছে। প্রথমে আমার বয়স যখন ১৬ বছর, সবে মাত্র পরিপূর্ণ কিশোরী , তখনই আমাকে আমার পরিবার থেকে এক প্রকার জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পোড়া কপাল আমার, বিয়ের তিন মাস পরেই আমার স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। আর আমি মাত্র ১৬ বছরে হয়ে যাই বিধবা। আমাকে পড়তে হয় সাদা শাড়ী। খুলে ফেলতে হয় কানের, গলার সব গহনা। কিন্তু তারপর আর আমার ঠাঁই হয়নি শ্বশুড় বাড়িতে। যদিও শ্বশুড় বাড়িতে আমার দেবরের সাথে এক প্রকার নিগুঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। বিষয়টি শ্বশুর বাড়ির সকলেই জানলো, কেবল তা নিয়েই এক প্রকার মাতামাতি। কিন্তু আমার পক্ষে সমর্থণ করার কেউ নেই। এমনকি আমার দেবরও আমার সাথে নেই। কারন সব দোষ আমার , আমি যে মেয়ে।


আমার সাথে আমার দেবরের সাথে যে সম্পর্ক ছিল, তা এক প্রকারের তার উপরি পাওনার আশায়। তাই যদি না হয়, তাহলে সে আমাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে এতো কুন্ঠিত কেন ? আপনি কি বলেন ? ”

আমি তার সাথে একমত হয়ে সায় দিলাম। এবার আমিও তার সাথে সুর মিলালাম। তার দু:খটা আমার মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করে।

 সে ট্রেন থেকে জানালা দিয়ে মুখের লালা ফেলে দিয়ে বোতল থেকে একটু পানি খেয়ে নেয়। ব্যাগের পকেট থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট বের করে খাওয়া শুরু করে। আবার আমাকেও স্বাদছে। আমি বিস্কুট নিতে কুন্ঠিত দেখে সে আমায় বললো, “আরে ভাই, ভয় নাই, আমি একটু চঞ্চল বটে, তবে খারাপ নই!” আমি বেশ ভাল করেই বুঝেছি যে, মেয়েটা সহজ-সরল। আমি মেয়েটার হাত থেকে বিস্কুট নিয়ে খেলাম। সে আবার তার বলা শুরু করলো। তবে যেখানে সে থেমে গিয়েছিল, সেখান থেকে আমাকেই আবার মনে করিয়ে দিতে হল।

সে বলতে লাগলো, “ কিন্তু আমার সেই দেবর সেটা চায়নি। তারপর আমি সংসার ছেড়ে চলে আসলাম বাবার বাড়িতে। আমার জীবনের লক্ষ্য নিয়ে ভাবতে থাকি। তাই মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আবার স্কুলে ভর্তি হই।  লেখা-পড়া ভালোই চলছে। আমার বেশ কয়েকজন ভালো বন্ধুও হয়। মেয়েদের ৫ জনের মধ্যে বাকি ৩ জনই বিবাহিত। কিন্তু আমার মতো কপালপোড়া আর কেই নেউ। স্বামীর সংসার নিয়ে বেশ সুখেই আছে। ” বলতে বলতে মেয়েটি জানালা দিয়ে দূরে গাছে ফুটন্ত ফুল দেখিয়ে বলছে, “ দেখুনতো ঐ ফুলগুলো কত সুন্দর না!” তারপর আবার শুরু করলো, “ বান্ধবীদের সাথে চলতে গিয়ে তাদের দাম্পত্য জীবনের সুখময় কাহিনী শুনে শুনে স্বামীর পরশ ও সংসার ধর্মের প্রতি আমার অনুপ্রেরণা আগের থেকে বেড়ে যায়। তাইতো বছর শেষ হতে না হতেই একটি বিয়ের সম্বন্ধ আসে। আর এতে খুব সহজেই আমি রাজি হয়ে যাই। পড়াশুনার বিষয়টা আর মাথায়ই ছিল না। হয়তো নতুন এ দাম্পত্য জীবনে সুখ সমৃদ্ধি পাবো বলে।

ছেলে দেখতে খুবই সুন্দর, স্মার্ট। তারপর খুব ঝাঁক-জমক করে বিয়ে হলো আমার। বড়লোকের সংসার। আমি সেই সংসারে খুবই আদরনীয়। বেশ সুখেই কাটছে আমাদের দাম্পত্য জীবন। কিন্তু কি জানি আমার স্বামীর মাথায় হঠাৎ করে কি ঢুকলো ! সে চেয়েছিল আমাকে নিয়ে সংসার থেকে আলাদা হয়ে যাবে। কিন্তু একান্নবতী পরিবারের সদস্যদের মতামতে সেটি আর হলো না। তারপর সে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। সমস্ত দোষ আমার ঘাঁড়ে চাপানো হলো। আমি যে মেয়ে! ছাড়তে হলো সুখের সংসার । আর কোনদিন তার দেখা পাইনি। এভাবেই কেটে যায় পুরো একটি বছর। সেই সাথে আমার কোলে জায়গা করে নেয় ছোট এক শিশু।  সন্তানকে বুকের ভিতর আগলে  রেখে বাবার বাড়িতে পড়ে থাকি। এক বছর পেরুতেই ৩য় বিয়ের প্রস্তুতি চলে। পূর্ববতী সকল ঘটনা জেনেই বর পক্ষ আমাকে নিতে রাজি হয়। বিনিময়ে বিপুল পরিমানে যৌতুক দিতে হবে। আমার বাবা যেন একটি আবর্জনার বোঝা বিক্রি করতে যাচ্ছেন। জমি বিক্রি করে বাবা আমার যৌতুকের টাকা পরিশোধ করে আমাকে বিয়ে দেন। কিন্তু লোভী স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির মানুষরা আরো যৌতুক নেওয়ার জন্য আমাকে অতিষ্ট করে তোলে।

একদিন স্বামীর সাথে বাক-বিতন্ডা হলে, সে আমাকে ইট দিয়ে বাড়ি মারতে যায়। হাত ফসকে সেই ইট পড়ে আমার শিশু সন্তানের মাথায়। আঘাত পেয়ে মারা যায় আমার সন্তানটি। প্রচন্ড ঘৃণা ও রাগে রান্না ঘরের বটি দিয়ে স্বামীর দেহ থেকে মাথা আলাদা করে দেই। খুনের দায়ে জেলের ঘানি টেনেছি শেষ কয়েকটি বছর। গত ৩ মাস পূর্বে কোন এক অজানা ব্যাক্তির করুনায় ছাড়া পাই জেল থেকে। তারপর একটি এনজিওতে কাজ করার সুযোগ পাই। এখন মোটামুটি ভালোই দিন চলছে। ”

আমি এতোক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে কেবল সেই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার বলা শেষ হলো, আর দুটি চোখের জলে বুক ভেসে গেল। আমার চোখেও জল চলে আসছে। তার জন্য এতোটুকু হলেও সমবেদনা জানাতে পারছি। আমি জানিনা সেই মেয়েটি কেন তার একান্ত ব্যাক্তি গত কথাগুলো আমার কাছে প্রকাশ করলো! তারপর দুজনেই থ মেরে বসে রইলাম।  আমার মাথায় ওর কথাগুলো শুধু হাঁফিয়ে দাফাদাফি করতে লাগলো। হঠাৎ করেই আমাদের রুমে কফিওয়ালা আসলো। আমরা দুজনেই কফি পান করলাম। আমাদের মধ্যে আর কোন কথা হইলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেশণ এসে পৌঁছলাম। ভাবছি ট্রেন থেকে নেমে ওর কাছ থেকে বিদায় নেব। কিন্তু তার আর দেখা পেলাম না! দুজনেই চলে গেলাম ...।

বাকি অংশ পরের সপ্তাহে

থার্ড পার্সন

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

গত সপ্তাহের পর শেষাংশ

---কিন্তু বম্বের সেই ঝামেলা? গল্পটা শুনতে শুনতে  জিজ্ঞেস করল তুলিকা।

---সে ঝামে্লা মুগ্ধা কেমন করে মিটিয়েছিল আমার জানা নেই। সতীশ উত্তর দিল।

---আর কখনও তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি মুগ্ধার? বীরেনবাবু জানতে চাইলেন। 

--- দেখা করব বলে একবার বম্বে গিয়েছিলাম আমি।এক্সিডেন্টের পর সুমনা ম্যাডাম আমায় চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিলেন,পরে জেনেছি তাতে বিশ্বদেবেরও সায় ছিল। আর আমার তখন মনের এমন অবস্থা যে শান্তিতে ট্যাক্সিও চালাতে পারছি না। সেইসময় বম্বে চলে গিয়ে তিনদিনের চেষ্টায় খুঁজে বের করেছিলাম মুগ্ধার ডেরা।ও তখন দাদারে একটা বাড়ির দোতলাটা কিনেছিল সদ্য।

---কী বলল তোমায়?

---দেখা করেনি। আমি দুদিন রাস্তায় বসে ছিলাম তাও না। শেষে ওই বাড়ির দারোয়ানের হাত দিয়ে আমার আর মুগ্ধার একটা জয়েন্ট ফটো ওর কাছে পাঠিয়ে দিই। দারোয়ান ফিরে এসে বলে যে ওর ম্যাডাম বলেছে, কুকুর-বেড়ালের সঙ্গেও মুগ্ধা দেশাই’এর ওরকম ছবি আছে। তাই বলে তাদের যখন-তখন বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া যায় না। ফটোটা হাতে পেয়ে আর ফেরত দেয়নি অবশ্য। সতীশ হেসে ওঠে।

---কিন্তু উনি তো নিজেও আর বিয়ে করলেন না?তুলিকা বলল।

---কে বলল, করেনি? নিজের খ্যাতিকে নিজে বিয়ে করেছে। আর আজ সেই খ্যাতিতে চিড় ধরেছে বলে ওর চাকররা, লোক লাগিয়ে আমার ঠিকানা বের করেছে।তাদের একজন মুগ্ধার গোপন চিঠি আমার হাতে দিয়ে বলছে,আপনাকে বম্বে যেতে হবে, মুগ্ধা দেশাই’এর পাশে বসে প্রেস কনফারেন্স করে বলতে হবে, সুমনা রায় যা বলেছে, সব মিথ্যা। আর তার জন্য পাঁচলাখ ,দশলাখ যত টাকা চাই, তক্ষুনি পেয়ে যাব। 

---তুমি কী বললে? বীরেনবাবু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।

---আমি আবার কী বলব? আমি তো আলঝেইমার্স পেশেন্ট। পুরোনো কোনও কথা মনেই নেই আমার।

---কী বলছেন?হতভম্ব তুলিকা বলে উঠল।

---বলেছে বস্তির দুটো ছেলে। আমি শুধু ভ্যাবলার মতো যে লোকটা বকবক করছিল তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। একসময় বড় এ্কবাক্সো মিষ্টি আমার বিছানায় রেখে লোকদুটো উঠে পড়ল। আর আমি বস্তির ছেলেদুটোকে আমার কথামতো অভিনয় করতে পেরেছে বলে দুশোটাকার সঙ্গে সেই মিষ্টি দিতে গিয়ে দেখলাম, আলঝেইমার্স রুগির ঘরে ওরা একটা মারাত্মক প্রমাণ ফেলে গেছে। মুগ্ধার হাতে লেখা চিঠি। 

---এই চিঠিটা মিডিয়ায় ফ্ল্যাশ করলেই আপনি এখন হিরো। তুলিকা হেসে  ফেলল।

সতীশ তিন-চার টুকরো করে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে, দলা পাকিয়ে লাইব্রেরির জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। তারপর হাসতে হাসতে বলল, কী যে বলো! এরকম চিঠি মুগ্ধা হয়তো অনেক কুকুর-বেড়ালকেও লিখেছে।

থার্ড পার্সন

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

গত সপ্তাহের পর

তখন কতই বা বয়স হবে মুগ্ধার? খুব বেশি হলে ছাব্বিশ- সাতাশ। বম্বে তখনও বলিউড হয়নি আর প্লেব্যাক সিঙ্গারদের সে সময় নিভৃতে থেকে গানটা গাইলেই চলত,  স্লিভলেস টপ পরে স্টেজে উঠে নাচতে হত না ।  এর সবচেয়ে ভালো দিক ছিল, মন দিয়ে রেওয়াজ করা যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কোনও ঝঞ্ঝাট নেই কোথাও, নিজের গলা বাদ দিয়ে মুখটাকে তুলে ধরার গলাকাটা প্রতিদ্বন্দিতা নেই। কিন্তু মুশকিলও ছিল। মিডিয়ার আলোর এত দাপট ছিল না বলে, ক্ষমতাশালীরা খোলাখুলি নিজেদের ক্ষমতা দেখাত। 

গান গাইতে এসে প্রথম দু-তিন বছরেই চার-পাঁচটা হিট দিয়ে দিতে পারার ফলে, মুগ্ধার জনপ্রিয়তা যেমন বেড়েছিল তেমন প্রযোজক, পরিচালক, সঙ্গীত-পরিচালকদের মধ্যে ওকে নিয়ে কথাও শুরু হয়ে গিয়েছিল। ওর গলার ওই অতুলনীয় রেঞ্জ, ভজন থেকে পার্টি-সং অনায়াসে গাইবার ক্ষমতা, মুগ্ধার ওপর নজর ফেলছিল অনেকের।  আর ঠিক তখনই মুগ্ধা কু-নজরে পড়ে গেল একটা প্রভাবশালী গ্রুপের। সেই গ্রুপের পাণ্ডা এক দমদার পাঞ্জাবি প্রযোজক মুগ্ধাকে বারণ করেছিল, দক্ষিণ ভারতীয় এক প্রযোজকের ছবিতে গান গাইতে। গানগুলো চমৎকার ছিল আর মুগ্ধার পারিশ্রমিক একলাফে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই ভদ্রলোক তাই না করার কোনও কারণ খুঁজে পায় নি মুগ্ধা।তাছাড়া ওর মনে হয়েছিল সে কোন ছবিতে গান গাইবে না গাইবে তাই নিয়ে অন্য কেউ লেকচার দেবে কেন? কিন্তু গান রেকর্ড হতে না হতেই দেখল একটা চক্র তার বিরুদ্ধে অতি-সক্রিয়। এ তো আর আজকের যুগ নয় যে  একটা মস্ত ইন্টারভিউ দিয়ে সবার মুখোশ ছিঁড়ে দেওয়া যাবে, সে সময় গায়িকার ছবিই বেরোত না কাগজে, ইন্টারভিউ তো দূর অস্ত।আর টিভির তো তখন অস্তিত্বই ছিল না প্রায়। তাই খ্যাতির সিঁড়িতে প্রথম পা রেখেই মুগ্ধা দেখল, পায়ের তলা থেকে মাটিটাই কে যেন সরিয়ে নিয়ে গেছে। আর তা নিয়ে যেখানেই  মুখ খুলতে যাচ্ছে সেখানেই ওকে চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে কারণ যে চক্র তার পিছনে লেগেছে তার বিষ-নজরে কেউই পড়তে চায় না। 

কোকিলকে যদি বলা হয় যে সে আর গাইতে পারবে না, কী করবে কোকিল? আত্মহত্যা? হয়তো না কারণ সে পাখি। কিন্তু মানুষের স্বপ্নটাকে যখন খুন করা হয় তার চোখের সামনে তখন সে মরে যাওয়ার কথা ভাববেই। মুগ্ধাও ভাবছিল। ঠিক তখনই বিশ্বদেব রায়কে পাশে পেল ও। দিনের পর দিন মুগ্ধাকে ওর গলার জাদু সম্পর্কে টোটকা দিয়ে বিশ্বদেব, মুগ্ধার হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু নিজের কেরিয়ারের ক্ষতি করেও মুগ্ধাকে চান্স পাইয়ে দিতে পারেনি বম্বের কোনও ভালো ফিল্মে। আসলে পরিস্থিতিটাই তখন এমন যে মুগ্ধার নাম শুনলেই সবাই আঁতকে উঠছে। এরকমই চলছে দেখে বিরক্ত মুগ্ধা একদিন খোলাখুলি বলল যে ও গান গাওয়া ছেড়ে দেবে। আর তার পরদিনই বিশ্বদেব ওর হাতে একটা প্লেনের টিকিট ধরিয়ে দিলেন।

টিকিটটা নেড়েচেড়ে অবাক মুগ্ধা জিজ্ঞেস করল, আমি কলকাতায় যাব কেন?

---গান গাইতে। বিশ্বদেব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন।

---কোথায়?

---বাংলা ছবিতে।  আমি সুর করব, তুমি গাইবে।কোনও ষড়যন্ত্র করে কেউ তোমায় আটকাতে আসবে না। 

---কিন্তু আমি তো বাংলা জানি না। মুগ্ধা অসহায়ভাবে বলল। 

---গানটা তো জানো। ওতেই হবে। বিশ্বদেব হাসতে হাসতে বললেন। 

বিকল্প কিছু ছিল না তাই সুটকেস গুছিয়ে বাধ্য মেয়ের মতো বিশ্বদেবের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসে মুগ্ধা। আর সেখানেই একদিন নিজের ড্রইংরুমে ওর সঙ্গে সতীশের আলাপ করিয়ে দেন বিশ্বদেব।বলে দেন মুগ্ধা যে গাড়িতে চড়ে যখন যেখানে ইচ্ছে যাবে, সেই গাড়ি সতীশই চালাবে। 

বিশ্বদেবের কথামতো সতীশকে ড্রাইভারই ভেবেছিল মুগ্ধা কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সতীশ হয়ে উঠল ওর কলকাতা গাইড। শহরের কোথায় কী আছে সব যেন সতীশের মুখস্থ। 

---কিন্তু তুমি তো কলকাতায় জন্মাওনি, বড়’ও হওনি, তাহলে? মুগ্ধা জানতে চাইল একদিন।

---যে শহরটায় আপনি জীবন বানাতে চাইবেন, সেই শহরটাকে আপনার খুব ভালবাসতে হবে। একদম দিল-জানসে ভালবাসতে হবে। তবেই না শহরটাও আপনাকে আপন করে নেবে। সতীশ জবাব দিল। 

সতীশের কথার উত্তরে কিছু বলতে গিয়ে থমকে গেল মুগ্ধা। ও’ও তো বম্বে’কে ভালোবাসতেই চেয়েছিল। কিন্তু বম্বে এমন একটা শহর যেখানে ভালোবাসার দাম টাকার অঙ্কে মাপা হয়।মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ঠিক হয় ক্ষমতার নিরিখে। সেখানে কেউ সফল হতে পারে, কেউ অসফল। কিন্তু বম্বে কি আপন করে নেয় কাউকে? 

কলকাতা যে আপন করে নেয় তা সতীশের ভিতর দিয়েই  টের পেল মুগ্ধা। বিশ্বদেব রায়ের স্ত্রী সুমনা আন্তরিক না হলেও ভালো ব্যবহার করতেন কিন্তু তার মধ্যে কোথায় যেন একটু শীতলতা লুকিয়ে থাকত। হয়তো তাই জরুরি কাজে পনেরোদিনের জন্য লন্ডন যেতে হওয়ায় বিশ্বদেব ওঁর লেকরোডের ফ্ল্যাটে রেখে যান মুগ্ধাকে।আর সতীশকে দিয়ে যান ওর সব দায়িত্ব। দিতে পারেন কারণ সেই প্রথম পরিচয়েই বিশ্বদেব বুঝেছিলেন যে সতীশ এমনভাবে ওর ওপর ন্যস্ত কাজ করে যেন তার ওপর ওর বাঁচা-মরা নির্ভর করছে।  

সুমনার দেখভাল সেভাবেই শুরু করেছিল সতীশ। ভোরবেলা ওর গলা পরিষ্কার করার গরম জল থেকে সন্ধ্যায় ভবানীপুরের  গলির ভিতর থেকে ওর জন্য গুজরাতি খাবার নিয়ে আসা পর্যন্ত, মুগ্ধার এমন কোনও প্রয়োজন ছিল না যা সতীশের নজর এড়িয়ে যেত। কিন্তু প্রয়োজনের বাইরেও একটা কিছু থাকে মানুষের জীবনে। আর কে  জানে, তাকেই হয়তো ‘মন’   বলে। মুগ্ধার সেই মন যখন হাঁপিয়ে উঠত অচেনা পরিবেশে তখন একটা চেনা মানুষ খুঁজত ও, সুখদুঃখের ঝাঁপি উপুড় করার জন্য। আর যেদিকে তাকাত সেদিকেই শুধু সতীশকে দেখতে পেত বলে, সতীশই হয়ে উঠল ওর গল্পের একমাত্র স্রোতা। 

প্রথমে হয়তো শুধু স্রোতাই ছিল সতীশ কিন্তু যতদিন যেতে লাগল তত ইনভলভড হতে শুরু করল ও। যে বম্বের সিনেমা জগতের কথা  হাঁ হয়ে শুনত প্রথমদিকে, কয়েকদিন যেতে না যেতেই সেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আর তার ভিতরে থাকা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে মতামত দিতে শুরু করল ও। শুনে মজাই লাগত মুগ্ধার। একটু হয়তো অবাকও হত কিন্তু ওর মনই ওকে বলত, হনুমান যদি রামের যুদ্ধকে নিজের বলে ভেবে নিতে পারে তাহলে সতীশ কেন মুগ্ধার হয়ে লড়তে পারবে না,অন্তত মনে মনে। বিশেষ করে ও যখন প্রতিদিন সকালে পরম ভক্তির সঙ্গে ‘হনুমান চালিশা’ পাঠ করে, পুজো করে বজরংবলীর?

পূজা যতদিন পূজা থাকে ততদিন কোনও সমস্যা থাকে না। সমস্যা হয় তা যখন প্রেমে পালটাতে শুরু করে। সতীশের ক্ষেত্রে তার সম্ভাবনা খুব একটা ছিল না। ও যখন বলত যে ওই পাঞ্জাবি প্রডিউসারকে হাতের কাছে পেলে  কষে দু’ঘা লাগিয়ে দিত, জোরে হেসে উঠত মুগ্ধা।কিম্বা ও যখন বাংলা সঙ্গীত জগতে মুগ্ধাকে সাফল্য পেতেই হবে বলে নিজে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস প্রায় মুখস্থ করত, তারপর মুগ্ধাকে তার এক-একটা প্যারাগ্রাফ পড়াতে বসত বাংলা উচ্চারণ স্পষ্ট করাবে বলে তখন হাসতে গিয়েও সিরিয়াস হয়ে যেত মুগ্ধা। ভাবত, এই অল্প কয়েকদিনে সতীশ নিজেকে কতটা জড়িয়ে ফেলেছে ওর সঙ্গে, ওর ভালো কীসে হবে তাই নিয়ে দিনরাত ভাবছে, তাহলে মুগ্ধাই বা কেন আরও একটু এফরট দেবে না নিজেকে প্রমাণ করার জন্য? বম্বের জন্য হাপিত্যেশ না করে কলকাতার সম্রাজ্ঞী হলেই বা ক্ষতি কী? 

এইভাবেই হয়তো এগিয়ে যেত সময়, কেয়ারটেকার আর গায়িকার ভিতর বয়ে যেত একটা নির্ভরতার স্রোত যার এই কূলে ‘ অ্যাডমিরেশন’ আর ওই কূলে ‘ প্রশ্রয়’  কিন্তু বিশ্বদেব রায় কলকাতায় ফিরে আসার কিছুদিন পরই ঘেঁটে গেল পুরো ব্যাপারটা। যার হাত ধরে কলকাতার সঙ্গীত জগতে প্রতিষ্ঠা পাবে ভেবেছিল, তার হাত যখন মুগ্ধার শরীরের সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে চাইল মুশকিল শুরু হল।তবু মুগ্ধা যতটা পারে অ্যাডজাস্ট করছিল। ওর প্রথম পুজো এলবাম গোল্ড ডিস্ক পে্ল যার জন্য, যার সুরে ওর গাওয়া দুটো বাংলা ছবির গান এমন সুপারহিট করল যে বম্বে পর্যন্ত খবর পৌঁছে গেল সেই লোকটা যদি ওকে একটু জড়িয়ে ধরে বা চুমু খায় তাহলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হয় না,ও নিজেকে বোঝাত।কিন্তু গোঁড়া গুজরাতি পরিবারের মেয়ে বলে এর বেশি কিছুতেই যেতে পারত না।  অথচ বিশ্বদেব সম্পূর্ণ পেতে চাইতেন ওকে। মুগ্ধা ওকে নিরস্ত করতে চাইলে, ক্রমাগত বলতেন যে মুগ্ধার ভিতর দিয়ে ওঁর সৃষ্টি করা সুর চরম সার্থকতা পায়; এবার ওঁকে নিজের ভিতরে নিয়ে বিশ্বদেবকে সেই সার্থকতার অংশীদার করুক মুগ্ধা। নয়তো বিশ্বদেব আর সুর তৈরি করতে পারবেন না। বলতে বলতে বিশ্বদেব ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা চালাতেন আর মুগ্ধা হাজারো অছিলায় সরে যেত ওঁর কাছ থেকে। 

পুরো ব্যাপারটাই যে সতীশ খেয়াল করত তা বলাই বাহুল্য কারণ তাকে মুগ্ধার দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন বিশ্বদেব নিজেই। কিন্তু এটা নিয়ে মুগ্ধা কখনও কথা বলেনি ওর সঙ্গে। বলেনি কারণ, মালিক বাড়াবাড়ি করলে চাকর তাকে কীভাবে বারণ করতে পারে? তাই একদিন যখন একা ঘরে ফুপিয়ে কাঁদা মুগ্ধার সামনে এসে সতীশ বলে যে মুগ্ধা যদি একবার অনুমতি দেয় তাহলে সে বিশ্বদেব রায়কে ধোবিপাট আছাড় মেরে মাটিতে পেড়ে ফেলবে, পরেরবার বদমাইশি করতে এলে, কিছুটা অবাকই হয় মুগ্ধা। সতীশকে বকা দিয়ে সে বলে যে বিশ্বদেব রায় মানী লোক সেটা মনে রাখতে।

---কিন্তু মানী লোক নিজেই যখন নিজের মান নষ্ট করে? মুগ্ধার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে সতীশ। 

                                     ... 

ঘটনাটা যেদিন ঘটল সেদিনও মুগ্ধার চোখে সতীশের চোখ পড়েছিল। তবে সরাসরি নয়। ড্রাইভার সতীশ তার সামনের কাচে চোখ রেখে দেখতে পেয়েছিল,মুগ্ধার দু’চোখের যন্ত্রণা। পিছনের সিটে তখন বিশ্বদেব রায় প্রায় মলেস্ট করছেন মুগ্ধাকে।সতীশের অস্তিত্বকে পাত্তাই না দিয়ে বিশ্বদেবের হাত মুগ্ধার ব্লাউজের ভিতর ঢুকতে চাইছে,আর মুগ্ধা ব্যর্থ চেষ্টা করছে,হাতটাকে সরানোর। সেই ব্যর্থতা জল হয়ে জেগে উঠছে মুগ্ধার চোখে আর ওর অজান্তে সেই জলই আগুন জ্বালাচ্ছে সতীশের মাথায়। উত্তেজনায় একসময় কিছুটা দাঁড়িয়ে উঠে মুগ্ধার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলেন বিশ্বদেব। আর তখনই কাণ্ডটা ঘটল। হাইওয়ের ধারে একটা বিরাট গাছের গায়ে আছড়ে পড়ল গাড়িটা। বিশ্বদেব টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়লেন। ওঁর মাথা্টা সজোরে ধাক্কা খেল গাড়ির কাচে। ঘাড়ে, মাথায় চোট লাগল সতীশেরও। শুধু বিশ্বদেবের শরীরের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল বলে তেমন কিছু হল না মুগ্ধার। 

অবশ্য হওয়া মানে তো শরীরে হওয়া বোঝায় না। তাই মাথায় এগারোটা স্টিচ আর কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচার নিয়ে বিশ্বদেব রায় যখন হাসপাতালে ভরতি তখন ওঁরই লেকরোডের ফ্ল্যাটে মুগ্ধা  সমস্ত রক্ষণশীলতা ভুলে গিয়ে সতীশকে জড়িয়ে ধরল। ওর গালে চুমু খেয়ে বলল, ইচ্ছে করে ওরকম এক্সিডেন্ট করলে, যদি তোমার কিছু হয়ে যেত ?

হনুমানজির ভক্ত সতীশ মুগ্ধার স্পর্শ শুধু শরীরে নয়, অন্তরে নিয়ে বলল, হলে হত। তোমার জন্য মরতেও পারি।

---আমার জন্য তোমায় বাঁচতে হবে সতীশ। নইলে এই রাক্ষসদের ভিতরে আমি বাঁচব কী করে?

---এই জগতে তোমার থাকার দরকার নেই। কী লাভ এই বম্বে, কলকাতার মতো বড় শহরে নোংরামি সহ্য করে টিকে থাকার? আমার সঙ্গে দ্বারভাঙ্গা চলো। সেখানে একটা ছোট ঘরে শান্তিতে থাকব আমরা। দু’বেলা সবজি-রুটি আর রাতে রামধুন, এর বেশি কী চাই? সতীশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মুগ্ধাকে।

মুগ্ধার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। সবজি-রুটি, রামধুন, দ্বারভাঙ্গা...এসব কী বলছে লোকটা? ও কী এর জন্য দিনে বারোঘণ্টা করে রেওয়াজ করেছে নাকি পাঁচবছর বয়স থেকে? এই প্রথম ওর বিশ্বদেব রায়ের জন্য একটু খারাপ লাগল। সতীশের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে প্রায় জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে মুগ্ধা বলল, আমায় খুব তাড়াতাড়ি বম্বে ফিরতে হবে ।

এরপর আগামী সপ্তাহে

থার্ড পার্সন

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

গত সপ্তাহের পর

সতীশ তখন ট্যাক্সি চালাত কলকাতার রাস্তায়। দ্বারভাঙ্গা থেকে এসেছে বছর দুয়েক, থাকে খিদিরপুরের দিকে, আরও তিনজনের সঙ্গে একটাই ঘরে, কিন্তু সেই ঘরে রাতে ঘুমোনোর সময়টুকু ছাড়া আর কখনই ওকে পাওয়া যায় না। সকাল নটা থেকে রাত্রি নটা, কোনও, কোনওদিন রাত দশটা পর্যন্ত ট্যাক্সি চালায় সতীশ। পাগলের মতো ট্যাক্সি চালায়।ট্যাক্সির মালিক ব্রিজলাল সাউ অবধি ওর হাবভাব দেখে অবাক বনে যান। অন্য সব ট্যাক্সিওয়ালা যেখানে সপ্তাহে চারদিনের বেশি ডিউটি করতে পারে না, সতীশ সেখানে সপ্তাহে ছ’দিন ট্যাক্সি চালাবার পর রোববারটাও হাফ- বেলা  চালাতে চায়। অন্য ট্যাক্সিওয়ালারা যেখানে প্রায় প্রতিদিন বাওয়াল করে সেখানে সতীশ, ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক, মালিককে একটা পয়সা কম দেয় না কোনওদিন।ব্রিজলাল তাই বাকি সবাইকে তুই- তোকারি করলেও সতীশকে, ‘তুমি’ করে বলেন আর বুঝতে পারেন এই ছেলেটা  অনেকদূর যাবে। 

দূর বা কাছের যাই হোক না কেন, সতীশ কোনও প্যাসেঞ্জারই পারতপক্ষে রিফিউস করে না কারণ তার কাছে প্যাসেঞ্জার মানেই লক্ষী।এই লক্ষীর দৌলতেই দুবছরে দুটো বোনের শাদি দিতে পেরেছে সে, ভাইটাকে কলেজে পড়াচ্ছে। হোলির আগে শেষ যখন বাড়ি গিয়েছিল তখন মা খুব জোরজার করছিল, শাদির জন্য। কিন্তু সতীশ পরিষ্কার ‘না’ বলে দিয়েছে। নিজের ট্যাক্সি না হওয়া পর্যন্ত সে বিয়ে করবে না। আর তার জন্য অন্তত আরও দুবছর সময় চাই সতীশের। সেই সময়টুকুর মধ্যে নিজেকে গুছিয়ে নেবে ও। ভবানীপুরের কাছাকাছি একটা ঘর নেবে যেটা আস্তানা হবে না। যেখানে তিনজন নয়, দুজন থাকবে। আর সেই দ্বিতীয় মানুষটা ওর জীবনে না আসা পর্যন্ত এই ট্যাক্সিই ওর প্রেম, ট্যাক্সিই ওর বউ। 

ভোরে ট্যাক্সি বের করার সময় গাড়ির ভিতরে- বাইরে গঙ্গাজলের ছিটে দিয়ে নেয় সতীশ। ব্রিজলাল বেশ কয়েকদিন ব্যাপারটা দেখে ওকে এর কারণ জিজ্ঞেস করায় সতীশ জবাব দিয়েছিল যে ওর মা’ও ঠিক এইভাবে গঙ্গাজল ছিটিয়ে প্রতিদিন ভোরে বাড়িকে সবরকম কলুষ থেকে মুক্ত করেন আর যেখানে ও দিনের বারোঘণ্টা কাটায় সেই ট্যাক্সিই তো ওর ঘরবাড়ি। 

কথাটা শুনে থম মেরে গিয়েছিল ব্রিজলাল।কিছু বলতে পারেনি কেবল পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল সতীশের। আর কয়েকদিন পরে  ব্রিজলালের অন্য ট্যাক্সিগুলো যারা চালাত সেইসব ড্রাইভারদের মধ্যে দু’তিনজন ওকে ঘিরে ধরে জানতে চেয়েছিল, সতীশ কী জাদু করেছে যার জন্য  চশমখোর ব্রিজলাল ওর কথা উঠলেই উচ্ছসিত প্রসংসা করতে থাকে।সতীশ কোনও জবাব দেয়নি সেই প্রশ্নের, শুধু হেসেছিল। মনে মনে বলেছিল, আমি কোনও জাদু জানি না, শুধু কাজ জানি।

নিজের কাজটুকু প্রাণপণ নিষ্ঠার সঙ্গে করার সেই তাগিদই সতীশকে বিশ্বদেব রায়ের চোখে পড়িয়ে দেয়। ভদ্রলোকের গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছিল রাস্তায়। আর উনি যাচ্ছিলেন দমদম বিমানবন্দরে প্লেন ধরতে। যে সময় ওর সেক্রেটারি চিৎকার করে সতীশকে থামায়, সেই সময়টার সঙ্গে প্লেন ছাড়ার সময়ের খুব বেশি তফাত ছিল না। ভালোর মধ্যে, তখন প্লেনে ওঠার চারঘণ্টা আগে থেকে এয়ারপোর্টে হত্যে দিয়ে বসে থাকতে হত না ।  খারাপের মধ্যে, তখন বাইপাস বলে কিছুর নাম শোনেনি কলকাতা। আর সেই  কলকাতার গলি-ঘুঁজিতে গাড়ি ঢুকিয়ে, সেই গাড়ি আবার বড় রাস্তায় তুলে  কীভাবে  সতীশ প্লেন মিস করতে দেয়নি বিশ্বদেবকে, সে কথা সতীশ ভুলে গেলেও, মনে রেখেছিলেন বিশ্বদেব। এয়ারপোর্টে নেমে তিনি একশোটাকা বখশিস দিতে যান সতীশকে। কিন্তু সতীশ সেই টাকা নেয় না কারণ সে তো শুধুমাত্র নিজের কাজ করেছে।তার জন্য এক্সট্রা নিতে যাবে কেন? সতীশের ব্যবহারে সামান্য অবাক হয়েছিলেন বিশ্বদেব, তা ওঁর গলার আওয়াজে বুঝতে পেরেছিল সতীশ। কিন্তু খুশি হয়েছিলেন না অখুশি তা বুঝতে পারেনি কারণ ভদ্রলোকের চোখে সানগ্লাস ছিল। এয়ারপোর্টে ঢুকে যাওয়ার ঠিক আগে সতীশকে নিজের কার্ড দিয়ে যান তিনি আর দিনসাতেক পর ওঁর বাড়িতে যেতে বলেন দেখা করতে। কী কারণে যেতে বলছেন সেটা বলেননি বিশ্বদেব আর বললে পরেও যে সতীশ যেত তা নয় কারণ কাজ কামাই করে কোথাও যাওয়াটা তার কাছে সময়ের অমার্জনীয় অপচয়।  একদিন শুধু রাতে ঘুমোবার আগে কার্ডটা হাতে নিয়ে দেখেছিল সতীশ। একপিঠে ইংরেজি আর অন্যপিঠে বাংলায় ভদ্রলোকের নাম লেখা। ইংরেজি ছোটবেলায় একটু- আধটু পড়েছে সতীশ আর তার ছোটবেলা অবধি মৈথিলী যেহেতু বাংলা হরফেই লেখা হত তাই বাংলা সে গড়গড় করে পড়তে পারত কলকাতায় আসার আগে থেকেই। আর কলকাতায় থাকতে থাকতে শব্দের মানেগুলো দু’কান দিয়ে অন্তরাত্মায় ঢুকে গেল। গেল বলেই আর পাঁচজন ট্যাক্সি- ড্রাইভারের মতো হিন্দি নয়, বাংলা কাগজ পড়ত সতীশ। আর সেখানেই একদিন বিশ্বদেব রায়ের ছবি দেখে ও। চোখ সেই সানগ্লাসে ঢাকা বলে সহজেই চিনতে পারল।  আর নিচের খবরটা জানাল বিশ্বদেব কী করেন। পড়ে বেশ কৌতূহল হল সতীশের। আর সেই কৌতূহলের রেশ না মিটতেই ও দেখল, ওকে নিয়ে  চরম কৌতূহল। কারণটা অদ্ভুত, ওর খোঁজে পুলিশ এসেছিল পাড়ায়। 

কেন এসেছিল, কী জিজ্ঞেস করছিল এসব কিছু জানার আগেই সতীশ টের পেল যে ব্রিজলাল তাকে ফেরারি আসামি ঠাউরে বসে আছে এবং সকালে গাড়ির চাবি দিতে চাইছে না। হতভম্ব সতীশ তাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতে গিয়ে দেখল, ব্রিজলাল ওর মুখের দিকে ভালো করে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। এই ব্রিজলাল কি ওর চেনা সেই ব্রিজলাল? এই পাড়াটাই কি সেই পাড়া যা ওকে আপন করে নিয়েছিল? উর্দিপরা কয়েকটা লোক খোঁজ করতে এলেই যা এরকম আমূল পালটে যায় তাকে কি ভালোবাসা বলা চলে? উত্তরের খোঁজে ক্লান্ত সতীশ একদিন থানায় গিয়ে দাঁড়াল আর প্রথমে  পঞ্চাশটাকা ঘুষ চাওয়া পুলিশ, কে জানে কী কারণে, ওকে বেশ আদর করে জিপে বসিয়ে বালিগঞ্জের একটা ছিমছাম দোতলা বাড়িতে নিয়ে গেল। 

ভিতরে ঢুকে সতীশ জানতে পারল যে বাড়িটা বিশ্বদেব রায়ের এবং সতীশ তার সঙ্গে দেখা করতে না আসায় তিনি সতীশের ট্যাক্সির নম্বরটা পুলিশকে দিয়ে বলেছিলেন, ওকে খুঁজে দিতে। বিশ্বদেব রায়ের মতো ফেমাস লোক ওর ট্যাক্সির নম্বর মনে রেখেছেন এবং ওকে এভাবে খুঁজছেন বলে পুলিশ ওকে নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানাতে বলে চলে গেল। কিন্তু বিশ্বদেব, সতীশকে ড্রাইভার হিসেবে বহাল করতে চাইছেন জানার পরই রাগে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করল সতীশের। কেন তিনি সতীশের খোঁজে পুলিশ পাঠালেন? শহরে কি আর ড্রাইভার ছিল না? কিন্তু কথাগুলো বলার আগেই ওর মনে পড়ে গেল যে ব্রিজলাল ওকে আর ট্যাক্সি চালাতে দেবে না। আর ব্রিজলাল না দিলে খিদিরপুরের অন্য কোনও ট্যাক্সি-মালিক যে দেবে তার গ্যারান্টি কী? তার চেয়ে উর্দি গায়ে প্রাইভেট গাড়িই চালাবে সতীশ। যে উর্দির জন্য এত লাঞ্ছনা তা গায়ে দিলে কেমন লাগে, দেখবে। 

সেই দেখার ইচ্ছেতেই বিশ্বদেব রায়ের প্রস্তাবে, 'হ্যাঁ' বলে দিল সতীশ আর কয়েকদিনের ভিতরেই হয়ে উঠল ওঁর সবচেয়ে বিস্বস্ত সহচর;এমন একজন যাকে ছাড়া বিশ্বদেবের এক মুহূর্ত চলে না। সতীশের সেই অনিবার্যতার কথা জানাতেই বোধহয় ছ’মাসে তিনবার ওর মাইনে বাড়িয়ে দিলেন সতীশ। আর তারপর হটাথ একদিন ওকে ঘরে ডেকে বললেন, আমার গাড়ি চালানোর থেকেও অনেক বড় একটা কাজ আজ থেকে করতে হবে তোমাকে। আমি জানি তুমি পারবে।

কী কাজ জিজ্ঞেস করার আগেই  ঘরে আর একজন ঢুকল। 

---চেনো একে? বিশ্বদেব রসিকতার সুরে জিজ্ঞেস করলেন।

সতীশ একটা কিছু বলতে গেল কিন্তু বলতে পারল না। ওর চোখ আটকে গেল, বিশ্বদেবের ড্রয়িংরুমে পা রাখা মেয়েটির মুখে।

বাকী অংশ পরের সপ্তাহে

থার্ড পার্সন

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

ভোরবেলায় কাগজ পড়ার অভ্যাস অনেকদিন চলে গেছে সতীশের। সে তাগিদ ছিল যখন সকালে ডিউটিতে যেতে হত একদম টিপটপ হয়ে আর স্টিয়ারিং’এর সামনে বসে সংক্ষেপে ওর বসকে শোনাতে হত, দিনের তাজা খবর,একদম দুমিনিটের মধ্যে। তার কম হতে পারে কিন্তু বেশি কিছুতেই নয়। তবে এমনও হয়েছে যে কোনও একটা খবর ডিটেলে শুনতে চেয়েছেন  আর তার ব্যাখ্যান করতে পনেরোমিনিট চলে গেছে সতীশের। কিন্তু সেরকম  ক্বচিৎ-কদাচিৎ ঘটেছে কারণ তখন প্রথমপাতা মানে রাজনীতি আর শেষপাতায় খেলার খবর। এন্টারটেনমেন্ট?  খায় না মাথায় দেয়? অমিতাভ বচ্চন যখন ‘কুলি’র সেটে আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন বম্বের  হাসপাতালে, তখন তিনি কেমন আছেন জানার জন্য সতীশ অন্তত দুটো পেপার পড়ত। কোনওটায় সাতের পাতায়, কোনওটায় ছয়ের পাতায়, পাঁচ-সাত লাইন করে খবরটা থাকত।আর এখন সইফ আলির, নিজের সতেরো বছরের মেয়েকে পাশে নিয়ে, করিনা কাপুরকে বিয়ের ছবি সব কাগজে ফ্রন্ট-পেজ নিউজ। সময় বদলে গেছে, আসলে। শুধু খবরের কাগজের নয়, সতীশের নিজেরও। তাই ওর কাগজ পড়ার সময়টা একধাক্কায় সকাল থেকে সন্ধ্যায় চলে এসেছে। বীরেনবাবুর কথামতো, ইন্ডিয়ান টাইম থেকে আমেরিকান টাইমে।

বীরেনবাবুকে এককথায় সতীশের সহপাঠী বলা যায়। যদিও উনি এমএ পাস  লোক এবং সতীশ টেনেটুনে ক্লাস টুয়েলভ, তবু এই ‘সরলাবালা স্মৃতি পাঠাগারে’ যে কয়েকজন বুড়ো ও হাফ-বুড়ো নিউজপেপার পড়তে আসে তার ভিতরে ওরা দুজনই রেগুলার।কারণটা দুজনের ক্ষেত্রে কিছুটা এক,কিছুটা আলাদা। বীরেনবাবুর স্ত্রী মারা যাবার পর থেকে ওঁর ছেলের বউ, ওঁকে টিভির সামনে ঘেঁষতে না দিয়ে একের পর এক সিরিয়াল দেখে যায়। হতাশ বীরেনবাবু নিজের পেনশনের টাকায় আর একটা টিভি কিনবেন ভেবেছিলেন কিন্তু তিনকামরার ফ্ল্যাটে ওঁর ঘরটাই যেহেতু ছোট-নাতনির পড়ার ঘর তাই ছেলে আর ছেলের বউ রীতিমতো ভেটো দিয়ে  সেই প্ল্যান বানচাল করে দিয়েছে। সতীশের অবশ্য ছেলে কিম্বা ছেলের বউয়ের সমস্যা  নেই,যেহেতু সে বিয়েই করেনি। তার ঘরে টিভিই নেই।আসলে একা মানুষের আটফুট বাই দশফুট বস্তির ঘরে  কালার টিভি থাকলে সেখানে দিনরাত গ্যাঞ্জাম লেগে থাকবে ছেলে, ছোকরাদের। আর এই গ্যাঞ্জাম পছন্দ করে না বলেই সতীশ নিজের খুপরিতে টিভি জিনিসটা ঢোকায়নি। মুখে বলেছে,খাওয়ার পয়সা জোটে না, টিভি কিনব কীভাবে? কিন্তু সতীশ বোঝে  তার গায়ের শার্ট,পায়ের জুতো কিম্বা গায়ে মাখার সাবানটা দেখে অনেকেই বোঝে যে সতীশ নির্জলা মিথ্যে বলছে; চাইলে সে এলসিডি কিনতে পারে। 

তবে এলসিডি কিনতে পারুক, না পারুক এককালে অনেককিছুই করার ক্ষমতা ছিল সতীশের। ছিল কারণ যে-সমস্ত লোকজনকে সে সামনে থেকে দেখেছে, যাদের সঙ্গে কথা বলেছে সারাদিন, রাত্রে টলোমলো অবস্থায় যাদের কেউ-কেউ ওর কাঁধে ভর দিয়ে কখনও গাড়ি, কখনও বা বেডরুম পর্যন্ত গেছে তাদের নাম শুনলে এই বস্তির লোকেরা ভিরমি খেয়ে পড়বে। হয়তো বা বিশ্বাসই করবে না, ভাববে সতীশ বানিয়ে বলছে। ভাবলে দোষই বা কী? সিংহ যদি ঘাস খাওয়া শুরু করে তাহলে মাসখানেকের মাথায় গাধাও এসে তাকে একটু গুঁতিয়ে দিয়ে যাবে! আর একা একা রেডিও চালিয়ে ঘুমিয়ে পড়া সতীশ ঝা যে এককালে সমীহ করার মতো কেউ ছিল তা বিশ্বাস করার মতো কোনও কারণ এই বস্তি কিম্বা গোটা মহল্লার কারও কাছে নেই।থাকুক,সতীশ তা চায়ও না।যে ঘি হাতে লেগে নেই, লোককে তার গন্ধের কথা শুনিয়ে খেলো করবে কেন নিজেকে ?  তাই বিকেল হতে না হতে পাড়ার এই লাইব্রেরিতে চলে আসে আর তিনটে-চারটে খবরের কাগজের পাতা উলটে বুঝতে চেষ্টা করে, যে সময়টা তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এগিয়ে গেছে,সেই সময়টা আসলে কীরকম। 

নামটা দেখে, লাইব্রেরির অল্পবয়সী অ্যাসিস্ট্যান্ট তুলিকা ওকে প্রথমদিন একটা হিন্দি কাগজ এগিয়ে দিয়েছিল। সতীশ সেটা একপাশে সরিয়ে রেখে টেনে নিয়েছিল লাইব্রেরির বাংলা কাগজগুলো।ওকে বাংলা অক্ষরে ডুবে যেতে দেখে, প্রথমদিন নিজের কৌতূহল সম্বরণ করেছিল তুলিকা,দ্বিতীয়দিনও; কিন্তু তারপর আর পারেনি। 

কিন্তু তুলিকার প্রশ্নের উত্তরে যতটুকু না বললেই নয়, তার চাইতে একটাও বেশি শব্দ উচ্চারণ করেনি সতীশ। আর সেই উত্তরের মধ্যে  নীরস কিছু তথ্য ছাড়া আর কিছুই ছিল না বলে, তুলিকা কথা চালিয়ে যাওয়ার রাস্তা পায়নি।চুপ করে গিয়েছিল।

কিন্তু বীরেনবাবু অত সহজে ছেড়ে দেবার লোক নন। উনি কয়েকদিন যেতে না যেতেই চেপে ধরেছিলেন সতীশকে, কী ব্যাপার বলুন তো ? 

সতীশ কষ্ট করে হেসেছিল, কোনও ব্যাপার নেই। সেই কবে ট্যাক্সি চালাতে কলকাতায় এসেছি, তারপর এখানে থাকতে থাকতে এই শহরটা ঘরবাড়ি আর বাংলা মুখের ভাষা হয়ে গেছে।

বীরেনবাবু একটু নস্যি নিয়ে মাথা নেড়েছিলেন,  মুখের ভাষা বাংলা তো কতজনেরই হয়ে যায় কিন্তু বাংলা মাতৃভাষা হয়ে গেছে, এমন বিহারি তো আর দেখলাম না ব্রাদার। 

আমার চেয়েও ভালো বাংলা বলতে পারে এমন অবাঙালি ট্যাক্সি-ড্রাইভারের সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দেব।সতীশ নিজেকে আড়াল করতে চেয়ে বলেছিল। 

আপনার মতো খবরের কাগজের পাতায় ‘শব্দসন্ধান’ করে এমন একজন নন-বেঙ্গলিকে আমায় দেখাবেন তো! 

সতীশ আর কিছু বলেনি কারণ বুঝতে পেরেছিল যে সে এই বুড়োর কাছে ধরা পড়ে গেছে।তার গোপন দুর্বলতা, বাংলা ‘শব্দজব্দ’ সলভ করা, যা সবার অলক্ষ্যে করবে বলে বিকেল-বিকেল লাইব্রেরিতে চলে আসে সতীশ, কীভাবে যেন বীরেনবাবুর চোখে পড়ে গেছে।আর তাই উনি ডুবুরির মতো সতীশের অনেকটা গভীরে ডুব দিতে চাইছেন। কিন্তু সতীশ সেটা এলাউ করতে চায়নি। চায়নি বলেই বীরেনবাবুকে একদিন বলে দিয়েছিল যে সে তার জীবনের ততটুকুই বলবে যতটা সে শেয়ার করতে চায়। 

বীরেনবাবু বুদ্ধিমান মানুষ, ইঙ্গিতটা বুঝতে দেরি না করে জবাব দিয়েছিলেন, চাপ দিয়ে কথা আদায়টা তো কৈফিয়ত। আমি আপনার কৈফিয়ত চাই না, বন্ধুত্ব চাই। 

আমাকে ‘তুমি’ করে বলবেন। সতীশ বলেছিল। 

তা বলতে পারি। তুমি আর আমি তো একই নৌকার যাত্রী। 

মানে?

মানে, আমি আমার ঘরের লোকদের থেকে পালাচ্ছি আর তুমি তোমার নিজের থেকে পালাচ্ছ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা দুজনেই পলাতক, তাই না? বীরেনবাবু হেসে উঠেছিলেন।

সতীশ সেদিন সেই হাসিতে যোগ দিয়েছিল কিন্তু  পরে মনে হয়েছিল যে আর ওর পলাতক হয়ে বাঁচার  দরকার নেই। এমন একটা জায়গায় ও এখন চলে এসেছে যেখান থেকে আর পিছনে তাকিয়ে কিছু চোখে পড়ে না। অতীত যখন অদৃশ্য তখন অতীত থেকে পালাবার প্রয়োজন কোথায়? 

প্রয়োজন নেই বুঝতে পেরেই একটু একটু করে আলগা হচ্ছিল  দেওয়াল। কথার থেকে নিজেকে সরিয়ে না রেখে আস্তে আস্তে সতীশ যোগ দিচ্ছিল  লাইব্রেরির আড্ডায়। মানুষের পড়ার অভ্যাস চলে গেছে বলে যে তুলিকা ঘ্যানঘ্যান করত, তাকে একদিন হটাথ করে  বিভূতিভূষণ আর  শরদিন্দু পড়তে চেয়ে একটু অবাক  আর অনেকটা খুশি করে দিল ও। বীরেনবাবুকে একদিন শোনাল ‘রামচরিতমানস’এর কোন স্লোকগুলো স্কুলে থাকতেই ওর মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল আর এখনও মনে আছে। অন্য একটা অতীত, স্বচ্ছ, আলোময় আস্তে আস্তে নিজেকে মেলে ধরছিল সতীশের ব্যবহারের ভিতর দিয়ে, খুলে দিচ্ছিল এমন একটা ভবিষ্যৎ যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক  নতুন করে তৈরি হতে পারে যে-কোনও মুহূর্তে। 

খুলে দিচ্ছিল। আজ এই মুহূর্ত পর্যন্ত। প্লাস্টিকের কাপ থেকে চায়ের শেষটা  শুষে নিয়ে যতক্ষণ না সতীশ খবরের কাগজটাকে ভাঁজ করে প্রথমপাতার নিচের দিকে চোখ রাখল। 

চোখ রাখামাত্র একটা বুলেট যেন দু’ভাগ হয়ে  আছড়ে পড়ল সতীশের দু’চোখে।

সতীশের মনে পড়ে গেল,তার সেই অতীত।  ছিল নয়, আছে।


কাল রাতে একটা অল ইন্ডিয়া টিভি চ্যানেল ওই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাতকার দেখানোর পর থেকে চব্বিশঘণ্টাও পেরোয়নি কিন্তু মুগ্ধা দেশাই’এর ল্যান্ডলাইনে অন্তত পাঁচশো ফোন  এসেছে। ওর সেক্রেটারি সঞ্জীব একটু বাড়িয়ে বলে সময়-সময় তবে এক্ষেত্রে ও যে খুব ভুল কিছু বলছে না, মুগ্ধা জানে। সঞ্জীবের দুটো মোবাইলের কললিস্ট ঘেঁটে ও দেখেছে, অন্তত, দুশো মিসড কল।  মজাটা হল, মুগ্ধা মোবাইল ব্যবহার করে না তাই মুগ্ধাকে কেউ ধরতে পারছে না আর সঞ্জীবকে নির্দেশ দেওয়া আছে, সমস্ত ফোনের উত্তরে একটাই কথা বলতে, ‘ম্যাডাম আউট অফ স্টেশন, ফিরলে পড়ে জানিয়ে দেওয়া হবে যে আপনি কথা বলতে চান।’এই কথাটা অবশ্য কেবলমাত্র কেষ্ট-বিষ্টুদের বলছে সঞ্জীব, বাকিদের ক্ষেত্রে ফোনের আনসারিং মেশিন কাজটা করে দিচ্ছে।কিন্তু তাতেও সঞ্জীবের টেনশন মুহুর্মুহু বাড়ছে আর সে ক্ষণে-ক্ষণে মুগ্ধাকে এসে বলছে যে এখনই কোনও পালটা স্টেপ না নিলে ব্যাপারটা এমন জায়গায় চলে যাবে যে  কিছু করার থাকবে না। স্টেপ যে একটা নিতে হবে সেটা মুগ্ধা জানে। কাল রাতে ওর  মোবাইল (যার কথা পৃথিবী জানে না,জানে পৃথিবীর তিন-চারজন লোক) যখন বাজতে শুরু করল তখন ও ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, কী ভেসে আসবে ওদিক থেকে। ওদিকের গলাটা যখন গম্ভীর ঠেকল তখনও তেমন কিছ মনে হয়নি কিন্তু টিভির সুইচ অন করতেই মাথায় যেন একটা দশমণ পাথর এসে পড়ল।এসব কী বলাবলি হচ্ছে টিভিতে? কেন হচ্ছে? সঙ্গে সঙ্গে মুগ্ধা চ্যানেলে ফোন করে ক্ষোভ উগড়ে দিতে চাইল। কিন্তু ওদিকের গলাটা শান্ত হতে বলল মুগ্ধাকে। চটজলদি রিয়্যাক্ট করে ঝামেলা বাড়াতে বারণ করল।

অতুল যেহেতু অনেকদিনের বন্ধু এবং বিজনেস পার্টনার তাই ওর কথা মেনে নিয়েছিল মুগ্ধা। কিন্তু দুটো ওষুধ খেয়েও ঘুমোতে পারেনি সারারাত।এপাশ-ওপাশ করেছে বিছানায়।আর শেষরাতে চোখ দুটো লেগে আসার আগের মুহূর্তেও মাথাটা দপদপ করছিল, মাথার ভিতরে একশোটা মাইকে কেউ যেন বাজাচ্ছিল, সেই সাক্ষাৎকারের প্রতিটা শব্দ। মুগ্ধা শিউরে উঠছিল ভেবে, ওর এতদিনের সজত্নলালিত ইমেজ কীরকম তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকার লাখ-লাখ ঘরে। লাখ নাকি কোটি?  এতদিন যারা ওর গান শুনে কেঁদেছে,ভালোবেসেছে, পাগল হয়েছে, আজ এই মুহূর্ত থেকে তারাই কি ওকে বম্বের হাজারও নায়িকার সঙ্গে একসিটে বসিয়ে দেবে? সেইসব নায়িকা যারা হিরোইন হবার জন্য, যার সঙ্গে খুশি শুয়ে পড়তে পারে? কিম্বা শুয়ে-শুয়েই হিরোইন হয়েছে যারা? সাক্ষাৎকারের শেষদিকে যখন ওই মেয়েলি মুখের সঞ্চালক তীক্ষ্ণ গলায় বলছিল, ‘ আমরা পুরুষরা হয়তো বুঝতে পারব না কিন্তু একজন মহিলার গোটা জগতটাই ধ্বংস হয়ে যায় যখন তার সংসার ভেঙে যায়’ মুগ্ধা হতবাক হয়ে তাকিয়েছিল টিভির দিকে আর একদম শেষে লোকটা যখন বলে উঠল, ‘তাহলে কি নায়িকা হোক বা গায়িকা স্টারডমের মূল্য সব মেয়েকেই দিতে হয়? আর মেয়েদের শীর্ষে উঠতে হলে সিঁড়ি ভাঙতে হয় না, বেডরুমে ঢুকতে হয়, কথাটা কি হলিউডের মতো বলিউডেও সত্যি?’ মুগ্ধা একটা পেপারওয়েট ছুড়ে মারল, টিভির দিকে। লাগলে পরে হয়তো ওই ইম্পোরটেড টিভির কাচে একটা চিড় ধরত কিন্তু মুগ্ধার গোটা অস্তিত্বে যে বিরাট ফাটল ধরিয়ে দিয়ে গেল ওই একটা অনুষ্ঠান তা জোড়া লাগত কি? 

---তোমার সম্পর্কে এতকিছু বলার সাহস পেল কীভাবে বিশ্বদেব রায়ের বউ? অতুল জিজ্ঞেস করল সকালে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে। 

---তুমি কি সন্দেহ করছ আমাকে? মুগ্ধা বিরক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।

---এটা আমার সন্দেহের বিষয় নয়। আমি ব্যাপারটা বুঝতে চাইছি।

---বুঝতে তো আমিও চাইছি। মুগ্ধা একটা চুমুক দিয়েই চায়ের কাপটা সরিয়ে রাখল। 

---পারছ না?

---পারলে পরে সাতসকালে তোমায় আমার বাড়ি আসতে বলতাম না। এটা আমার রেওয়াজের সময়। 

---সে তো জানি। কিন্তু আর পাঁচটা সকালের সঙ্গে তো আজকের সকালটাকে মেলানো যাবে না। আজ দেশের ঘরে-ঘরে তোমায় নিয়ে রেওয়াজ চলছে।

---কিন্তু তাতে আমার কী দোষ? 

---দোষ তোমার না হলেও এক্সিডেন্ট তোমার। তাই চোট- আঘাত একদম এড়িয়ে যাবে সেটা ভাবা ঠিক নয়।

---তুমি এরকম নির্লিপ্তভাবে সাধুদের মতো কথা বলে যাবে বলে তোমাকে ডেকে পাঠাইনি,অতুল। আমার অপমান যদি তোমার গায়েও লেগে থাকে,আমার বিপদটাকে যদি নিজের বিপদ বলেও মনে কর তাহলে বলো, নয়তো আমি ঘরে গেলাম।

মুগ্ধা দেশাই’এর আন্ধেরির এই নতুন বাড়ির টেরাসে সূর্যের আলোও যেন ফিলটার হয়ে আসে। এমন একটা মৃদু আভা সারা দিনরাত খেলা করে যে এই বাড়িটায় এলে ভুলে যেতে ইচ্ছে করে পৃথিবীতে হিংসা-মারামারি বলে কিছু আছে। যেন কোথাও কোনও রক্ত ঝরেনি কখনও, কেউ কারও কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেবে বলে হাত বাড়ায়নি, মায়াময় পৃথিবীর মায়া গুঁড়ো-গুঁড়ো কেকের মতো ঝরে পড়ছে আর প্রত্যেকটা দিনই নিজেকে এমনভাবে সাজিয়ে তুলছে যেন প্রতিদিনই ক্রিসমাস। 

কিন্তু আজ ক্রিসমাস নয়।আজ গুড ফ্রাইডে। আজ দেশের একশোটা কাগজে বেরিয়েছে,  প্রয়াত সঙ্গীত পরিচালক বিশ্বদেব রায়ের স্ত্রী সুমনা রায় দাবি করেছেন যে তাদের দাম্পত্য জীবন নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী, আর কেউ নন, মুগ্ধা দেশাই। মুগ্ধা, বিশ্বদেবের সুরে সবচাইতে ভালো গানগুলো গাইবেন বলেই বিশ্বদেবকে আর সব গায়িকার থেকে সরিয়ে এনেছিলেন আর সরিয়ে আনার জন্য নিজের শরীর ব্যবহার করতেও দ্বিধা করেননি।সুমনার বক্তব্য, মুগ্ধার গলায় বিশ্বদেবের সুর যেমন খেলত, মুগ্ধার শরীরে বিশ্বদেবের শরীরও একইভাবে খেলা করত। সেই খেলা এমনই খেলা যে উত্তেজনায় ইস্টবেঙ্গল- মোহনবাগান কিম্বা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকেও ছাপিয়ে যাবে। সেই খেলার নেশায় উন্মাদ বিশ্বদেব সুমনার মধ্যেও খুঁজে বেড়াতেন মুগ্ধাকে। আর যখন পেতেন না তখন অকথ্য গালিগালাজ এমনকি মারধর পর্যন্ত করতেন।খ্যাতির মধ্যগগনে পৌঁছে মুগ্ধা  হটিয়ে দিল বিশ্বদেবকে,নতুন- নতুন সুরকারের সঙ্গে কাজ করতে থাকল কিন্তু অবলীলায় ভুলে গেল সেই লোকটাকে, যার হাত ধরে ও প্রথম খ্যাতির স্বাদ পেয়েছিল, স্বল্প পরিচিতা এক গুজরাতি গায়িকাকে যিনি  সিংহাসনে পা রেখে গোটা দেশকে নিজের সাম্রাজ্য বানাবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তখন নিজের অসম্মানের কারণে ততটা জ্বলতেন না বিশ্বদেব, জ্বলতেন মুগ্ধার শরীর না পাওয়ার কারণে। শ্যামলা, দোহারা চেহারার অল্পবয়সী মেয়েদের দিকে ছুটে যেতেন তিনি কারণ তাদের মধ্যে মুগ্ধার ঝলক দেখতে পেতেন হয়তো বা। আরও এক মারাত্মক কথা বলেছেন সুমনা রায়। তার দাবি, বিশ্বদেব রায় মোটেও লম্পট বা চরিত্রহীন ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ প্রেমিক। তার সেই প্রেমকে ভাঙিয়েই মুগ্ধা দেশাই’এর উত্থান। আর প্রেমে ওরকমভাবে ঠকে যাওয়ার ফলেই বিশ্বদেব  অবিস্মরণীয় সব গান বানানো সত্ত্বেও আড়ালে চলে গেছেন।কারণ মুগ্ধা জীবন থেকে সরে যাওয়ার পর আর কিছুকেই তিনি জীবনে ঠাঁই দিতে পারেননি। না নিজের হারমোনিয়াম, না সুমনাকে। 

এই সমস্ত কথাগুলো আজ দেশে- বিদেশে লোকে চাটনির মতো তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছে আর মুগ্ধা দেশাই, যাকে একজন সঙ্গীত-সাধিকা, সংসারে থাকা এক সন্ন্যাসিনী বলে চিনত লোকে, মিডিয়ার খাদ্য হিসেবে সকাল-সন্ধ্যা এই চ্যানেল নয়তো ওই চ্যানেলের পরদায় ভেসে উঠছেন, গসিপের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। 

---তোমার অপমানের কথা পরে ভাবব। বিপদের কথা আগে ভাবি। আর সেটা নিয়ে ভাবার সময় একটা কথা আগেই মনে করিয়ে দেব, বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। পুরো ব্যাপারটা মাথায় রিওয়াইন্ড করে বলে উঠল অতুল। 

---মাথা ঠান্ডা রাখতে তো তুমি কাল রাত থেকেই বলছ কিন্তু আমি যদি চুপ করে থাকি, তাহলে ওই সুমনা মাগির কথাই বৈধতা পেয়ে যাবে না? সবাই ভাববে যে আমি চুপ করে আছি কারণ অভিযোগগুলো সত্যি। 

---তা, নাও ভাবতে পারে।বরং তুমি রাস্তার কলে জলের লাইনে দাঁড়ানো মেয়েদের মতো ঝগড়া করতে নামলে তোমার ডিগনিটি চোট খাবে।তবু তুমি যখন চাইছ, তখন আমি আজই সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তোমার তরফে একটা প্রেস রিলিজ করে দিচ্ছি। কিন্তু আমার সাজেশন,তুমি হাজার ডাকলেও কোনও চ্যানেলকে তোমার বাড়িতে ঢুকতে দিও না। ওরা নিজেদের টিআরপি বাড়াবার জন্য তোমায় কথার প্যাঁচে ফেলে দেবে। তুমি হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবে কারণ ওরা এমন-এমন সব প্রশ্ন করবে যে ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হওয়া দূরে থাক,আরও গাড়িয়ে যাবে। তুমি ইন্টারভিউ দেবে আর সেই ইন্টারভিউ দেখানোর পরপরই ওরা আবার সুমনা রায়কে স্টুডিওতে ডাকবে। তোমার বক্তব্য নস্যাৎ করার জন্য।এভাবে কেচ্ছাটা চলতেই থাকবে।আর তাতে তোমার ক্ষতি,  সুমনার নয়,কারণ ও তো পাবলিসিটিই চায়।

---তাহলে আমি কী করব? হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব? মুগ্ধা চেঁচিয়ে উঠল।

---না,কিন্তু শান্ত থাকবে। আর এমন একজনের নাম আমাকে বলবে, যে এই ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত নয় কিন্তু তোমার আর বিশ্বদেবের দুজনেরই কাছের লোক ছিল। 

---মানে? ইন্ডাস্ট্রির বাইরে কতটুকু মিশি আমরা? আমরা যখন একসঙ্গে কাজ করতাম তখন ওই গানের জগতের লোকরাই ঘুরঘুর করত,চারপাশে।

---তার বাইরে কেউ ছিল না? একটু ভাবো। খুঁজে পেলে তাকে আমরা আমাদের প্রেস কনফারেন্সে হাজির করাব। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত হলে লোকে বলবে তোমার থেকে কোনও সুবিধে পাওয়ার আশায় এসেছে...

---সে তো বাইরের লোক হলেও বলতে পারে আমি কিনে নিয়েছি...

---বলুক, তবু বাইরের লোকের একটা আলাদা বিশ্বাসযোগ্যতা আছে,বাইরের মানুষদের কাছে। আর সেরকম একজনকেই আমার চাই। 

---কোথায় পাব?

---পাওয়ার দায়িত্ব আমার। তুমি শুধু ভেবে বলো, এরকম কেউ ছিল? ঠাকুর, চাকর, ড্রাইভার হলেও চলবে। আছে?

---ঠাকুর, চাকর, ড্রাইভার, ড্রাইভার, ড্রাইভার...মুগ্ধার মাথায় একটা সুর খেলে গেল এই মারাত্মক ঝামেলার ভিতরেও।

বাকী অংশ পরের সপ্তাহে

সীমন্ত সিঁদুর 

তাপসকিরণ রায়

শেষাংশ

উঠে দাঁড়ালো অবন্তী। শরীর কেমন টলমল করছিল। রাতে মানস বাইরে থেকে খেয়ে এসে ছিল। প্রায় দিন ও এমনি করে। অবন্তীর ভীষণ খিদে পাচ্ছিল। রান্না ঘরে গিয়ে এক গ্লাস জল খেলো সে। না, খিদে পেলেও খাওয়ার ইচ্ছে ওর মন থেকে মরে গেছে।

পরদিন শনিবার। মানসকে না বলে অবন্তী চলে গেলো শ্রদ্ধানন্দের আশ্রমে। গিয়ে দেখল অনেক লোকের ভিড়। মেয়েদের লাইনে দাঁড়িয়ে গেলো ও। 

--মা! কি জানতে চাস বল ? সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ সাধু প্রশ্ন করলেন অবন্তীকে। 

অবন্তী কেঁদে ফেলল, ওর বুক ঠেলে কান্না বের হয়ে আসতে লাগলো--মুখে কিছুই বলতে পারছিলো না। 

--তোর অশান্তিময় জীবন, তাই তো ? আবার প্রশ্ন করলেন আশ্রম সাধু।        

এবার মাথা নাড়ল অবন্তী। 

--তোর স্বামীই তোর যন্ত্রণার কারণ রে! 

সাধুর কথায় অবন্তীর বুক চাপা কান্নার সবটা খুলে বেরিয়ে এলো যেন! কোন মতেই ও কান্নাকে বাধ মানাতে পারছিলো না।

--কিন্তু একটা কথা জানবি, মা! তোর পুণ্যফলেই তোর স্বামী বেঁচে আছে, তুই যদি মন থেকে ওকে ত্যাগ করিস তবে ওর মৃত্যু অনিবার্য! 

সাধুর মুখের দিকে বিহ্বল তাকিয়ে থাকে অবন্তী, মুখে তার কোন কথা নেই। শ্রদ্ধানন্দের কথা সে শুনে যাচ্ছে।

...তোকে এ কথাও বলে দিলাম, মা! কখনো তুই যদি পর পর তিন দিন তোর সিঁথিতে সিঁদুর না দিস তবে তোর স্বামীর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী! যা, তুই এখন ঘরে যা মা! ধীরে ধীরে উঠে যায় অবন্তী।

ঘরের ঝি, বিমা এসে দরজা খুলে দিয়ে ছিল। ঘরের ভিতরে এসে দেখে মানসের সঙ্গে একই খাটে বসে ওর পি.এ., প্রান্তিকা। মানসের উজ্জ্বল উৎফুল্ল চেহারা। ওরা দু জনেই কোন কথা নিয়ে হাসাহাসি করে যাচ্ছে। কত সুন্দর, উচ্ছলা এই প্রান্তিকা! আর মানস! কে বলবে একটা মাতাল লম্পট লোক ? ভরাট প্রেমিকের হাসি নিয়ে সে দিব্বি মুখোশের আড়ালে এক ভালো মানুষ! 

একটা কথাও বলল না অবন্তী। মানস, প্রান্তিকা, ওকে দেখেও যেন না দেখার ভান করে গেলো, অবন্তীর ভীষণ রাগ হচ্ছিল। চাপা রাগ ওকে ক্রমশ: ক্ষত বিক্ষত করে চল ছিল।

পাশের ঘর থেকে প্রেমিক প্রেমিকার ঢলানো হাসি আর যেন ও সহ্য করতে পারছিলো না। মনে হল, এর চে তো মৃত্যু ভালো ছিল! এ জীবনের মূল্য কি আছে ওর কাছে! বিয়ের পর কটা দিন ও শান্তি পেয়েছে ? কটা দিন মানস ওকে শান্তি দিয়েছে ? আত্মহত্যা করবে ও ? অবন্তীর মনে হল, না,আর না, এ জীবনের কোন মানে হয় না। আর কিসের টানে পড়ে থাকবে সে ? এমনি সময় বিমা ঘরে এসে ঢুকল। অবন্তীর কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে বলে উঠলো, তোমার সোয়ামী কেমন লোক গো! তুমি, আমি ঘরে আছি সেটাও ভুলে যাচ্ছে ? দেখো গিয়ে খাটে কেমন জড়াজড়ি, ঢলাঢলি চলছে! আমি চললেম বাপু! বিমা ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলো। 

হঠাৎ অবন্তীর সাধুর কথা মনে পড়ল, তোর পুণ্যে তোর স্বামী বেঁচে আছে, তার মানে অবন্তী যদি চায় মানসের কাছ থেকে সে মুক্তি পেতে পারে ? তবে মানস ওর জীবনের কতটা ? মন কঠোর হতে থাকলো ওর। কঠোর একটা ভাব ওকে যেন টানটান করে দাঁড় করিয়ে দিলো। দৃঢ় হয়ে ও নিজের মনে বলে উঠলো,  কেন ? আমি কেন মরবো ? আমি কেন আত্মহত্যা করবো ? কি দোষ আমার! আর আমার পুণ্য ফলে একটা চরিত্রহীন লোক নিজের স্ত্রীর সামনে অন্য মেয়ে নিয়ে দিনের পর দিন খেলে বেড়াবে! বারবার সাধুর কথা মনে পড়তে লাগলো অবন্তীর, কেবল তিন দিন সে সিঁথিতে সিঁদুর দেবে না—ব্যাস, তারপর থেকে তার শান্তি--তার জীবনে নেমে অসবে অখণ্ড শান্তি! অন্তত এই মানসিক, শারীরিক নির্যাতনের যন্ত্রণা থেকে তার মুক্তি! চাই না তার কাউকে, জীবন হোক ওর একার--একমাত্র একার! হোক তা স্তব্ধ, অসাড়, নিঃসঙ্গ--এক স্থিরতায় সে চুপ করে বসে থাকবে। না হয় গরীব দুখীদের সেবায় জীবনপাত করবে। 

পরদিন সকালে অবন্তী স্নান করে নিলো—না, সিঁথিতে এক বিন্দু সিঁদুর ছোঁয়াল না! তিন দিন সে এমনি করবে--সিঁথিতে সিঁদুর আর ছোঁয়াবে না। এ যেন স্থির প্রতিজ্ঞা!  

৪ 

সত্যি ওই দিন বিকেল থেকে মানস অসুস্থ হয়ে পড়ল! ও এখন হসপিটালে ভর্তি, হার্ট এটাক এসেছে ওর। ডাক্তার বলেছে, বাহাত্তর ঘণ্টা পার না হলে ওর বাঁচা মরা ব্যাপারে কিছুই বলা যাবে না!

আজ তৃতীয় দিন চলছিল। অবন্তীর মন প্রচণ্ড উৎকণ্ঠায় দিন, ঘণ্টা, সময়ের মুহূর্তগুলি কাটছিল। আগামী কাল ভোরে তিন দিন পূর্ণ হবে--বিনা সীমন্ত সিঁদুরে! আর তারপরই অমোঘ ছায়া ওর জীবন থেকে নেবে যাবে! না, মানসের জন্যে তার মনে বিন্দু মাত্র আপসোস হচ্ছে না। অবন্তী আজ তিন দিন প্রায় অভুক্ত পড়ে আছে! অফিসে যায় নি--বলতে গেলে শুয়ে বসেই তার দিন কাটছে। মাথা ঘুর ছিল ওর। মেঝেতে পাতা বিছানা থেকে উঠতে পারছিলো না। আর বেশী সময় নেই--তিন দিন, ঘণ্টা মিনিটে পূর্ণ হতে আর এক ঘণ্টা কিছু মিনিটই বাকী! আজ অবন্তীর শেষ বারের মত মানসের সঙ্গে দেখা  হবে--তারপর বিদায়! চির বিদায়!! 

অবন্তীর স্নানের সময় হয়ে এলো। চোখে কেমন অন্ধকার ঠেকছে। দেওয়ালে ভর দিয়ে কোন মত বাথরুমে ঢুকে গেলো ও। বালতি থেকে মগে জল নিলো, গায়ে ঢালল। শান্তি, খুব শান্তি লাগছে তার। কিন্তু পরক্ষণেই একি! এত গাঢ় অন্ধকার কেন ওর চোখের সামনে নেমে আসছে! ও দেওয়াল ধরে ছুটে আসতে চেষ্টা করল। হঠাৎ মনের মধ্যে এত উথল পাথাল করছে কেন! ঘড়ির দিকে চোখ গেলো তার, আর মাত্র দু মিনিট--তবেই হয়ে যাবে চব্বিশ ঘণ্টার হিসাবে তিন দিন--সাধুর ভবিষ্যৎবাণী ফলে যাবে! আর, ভাবতে পারলো না অবন্তী, মাথা তার ঘুরে গেলো, ছিটকে পড়ে গেলো ড্রেসিংটেবিলের পাশে। অন্ধকার--অন্ধকার--অন্ধকার—চারিদিক—তার মধ্যেই অবন্তী কোন মত ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ার টেনে সিঁদুরের কৌটো বের করল। দু আঙ্গুলের মাঝে এক চিমটি সিঁদুর নেবার চেষ্টা করল, কিন্তু পারলো না--সিঁদুরে আঙ্গুল ছুঁল মাত্র--আর সেই আঙুল তিন দিনের কয়েক সেকেন্ড আগে সে তার নিজের মাথায় ছুঁয়িয়ে দিলো। অবন্তীর চোখে দিনের বেলায় নেমে এলো রাত্রি! আলোকহীন গাঢ় অন্ধকার ভরে গেলো তার চারিদিকে—মানস বেঁচে ফিরে আসলেও, সে অন্ধকার থেকে  অবন্তী আর ফিরতে পারলো কোই!

সীমন্ত সিঁদুর 

তাপসকিরণ রায়

অবন্তীর খুব ইচ্ছা হল স্বামী শ্রদ্ধানন্দের কাছে একবার যাবার। অনন্তগিরি আশ্রমের সাধু তিনি। বহু বছর ধরে আশ্রমে থেকে জনসেবার কাজ করে যাচ্ছেন। এই ছোট শহর চাকদাতে তাঁর নাম বলতে গেলে সবাই জানে। গরীব দুখীদের সেবায় তিনি ব্রত নিয়েছেন। কারও দুঃখ দারিদ্রের কথা শুনলে আর বসে থাকতে পারেন না। আশ্রমের লোক পাঠিয়ে বা প্রয়োজনে নিজে গিয়ে তাঁদের দেখে সাহায্য করে আসেন। দরকারে টাকা পয়সা, খাদ্য খাবারের ব্যবস্থা করেন। 

ইদানীং তিনি সিদ্ধপুরুষ হয়েছেন। হাত দেখা ও ভবিষ্যৎবাণীতে নাকি তিনি পারদর্শী। অনেককে অনেক কিছু বলেছেন এবং সে বলা ভবিষ্যতে গিয়ে নাকি পুরোপুরি ফলে গেছে! সপ্তাহে একটি দিন--শনিবার তিনি হাত দেখেন, ভবিষ্যৎবাণী করেন--ভূত ভবিষ্যৎ বলার সঙ্গে সঙ্গে উপদেশও প্রদান করেন। ওই দিন ভিড় হয়। অবন্তী শুনেছে--দূর দূরান্ত থেকে অনেক মানুষ তাঁর কাছে হাত দেখাতে, উপদেশ নিতে আসে।

ঘরের কলিং বেল বাজায় চিন্তায় ছেদ পড়ল অবন্তীর। নিশ্চয় মানস ঘরে ফিরেছে। এখন রাত এগারোটা বেজে গেছে। রোজ মানস এমনি সময় ফিরে আসে। মদের নেশায় চুর হয়ে থাকে। হাত, পা, শরীর খুব একটা বেতাল হয় না, তবে ওই সময়টা ও চুপচাপ থাকতে চায়। কথা যেমনি বলতে চায় না, তেমনি শুনতেও চায় না। খুব রেগে যায়, বিশেষ করে অবন্তী যখন তার নেশা-পানের ব্যাপারে কিছু বলে। আর ঠিক তখনই মাতালের লক্ষণগুলি এক এক করে তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। অবন্তীর শরীরে পর্যন্ত এসে লাগে সে দুর্লক্ষণের পরিণাম!

প্রতি রাতের মত আজও স্বাভাবিক ভাবে ঘরে ঢুকল মানস। শরীরে টলার লক্ষণ নেই। মুখখানা গম্ভীর, যেন নিজের কোন গভীর চিন্তায় সে মগ্ন!

অবন্তী জানে এসময় কথা না বলাই শ্রেয়। তবু না বলে পারলো না। শ্রদ্ধানন্দের আশ্রমে যাবার কথা সে বলে ফেলল। খুব শান্ত স্বরে বলল, কাল শনি বার, শ্রদ্ধানন্দের আশ্রমে আমার সঙ্গে একটু যাবে ?

--ও সব সাধুটাধু আমি বিশ্বাস করি না।

--উনি সিদ্ধপুরুষ শুনেছি।

--চুপ, কোন কথা না, ও সব সিদ্ধ স্বামীটামী আমি বুঝি না, সব শালা স্বার্থপর জানি!

--কি বলছ তুমি! তুমি তো ভালো করে জানো--

--চুপ! অবন্তীকে ধমকে উঠল মানস, আর একটা কথা নয়! বলেছি  

না এ সময় আমার সঙ্গে কোন কথা বলবি না ?

--তবে কখন বলব ? ভয়ে ভয়ে তবু অবন্তী বলে উঠে। আর সঙ্গে সঙ্গে, চুপ,  শালী, বলে অবন্তীর গালে একটা চড় বসিয়ে দিল মানস।

রেগে গেলে এমনি হয়,তুমি থেকে তুই’য়ে নেমে আসে মানস—দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে।  অবন্তীর ভীষণ রাগ হয়,সাধারণ কথাও কি সে মানসের কাছে বলতে পারবে না! দিন ভর কতটুকু সময় সে পায়--বেলা নটা বাজতে না বাজতে অবন্তীকেও চাকরিতে ছুটতে হয়। শনিবার অবন্তীর ছুটি কিন্তু মানসের না। সেই রবিবার দুজনের মধ্যে দুটো কথা বলার সময় থাকে। কিন্তু সে দিনও মানস বেরিয়ে যায়--ঘরে এক দণ্ড থাকতে চায় না। ইদানীং শুনেছে অবন্তী, ওর পি.এ., প্রান্তিকার সঙ্গে খুব মেলা মেশা ওর। কোনও মেলামেশা বেশী দিন টিকে থাকে না। সময়ের সঙ্গে একঘেয়েমির পর পালা বদল করে মানস!

চরিত্রহীন,একটা লম্পটের ঘর করে অবন্তী। বিয়ের পাঁচটা বছর পার হয়ে গেলো, ওদের মধ্যে আজও ভালবাসা জন্মাতে পারে নি। ভালোবাসা! অবন্তী ভালবাসা কাকে বলে জানে না। বিয়ের পর নতুন নতুন আদর সোহাগের কটা রাত কাটিয়ে ছিল বটে, কিন্তু সে আর কটা দিন! তারপরই মানস তার স্বমূর্তি ধারণ করল। মদ খেয়ে ঘরে ফেরা, কিছু বললে বৌকে পিটানো। বিয়ের ক দিন পরেই অবন্তী জানতে পারলো, পাড়ার প্রমীলার সঙ্গে নাকি সে ঘুরে বেড়াচ্ছে! প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছিল অবন্তী, বিনিময়ে ও পেয়ে ছিল আঘাত, না শুধু কথার আঘাত না, রীতিমত শারীরিক নির্যাতন! প্রথমে থাপ্পড়, ধীরে ধীরে পায়ের জুতো উঠে এসে ছিল ওর পিঠে!

প্রথম প্রথম মনে হতো একি! অবন্তী কি কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে ? এই অমানুষের সঙ্গেই কি ওর ঘর করতে হবে ? বৌরা চট করে স্বামীর ঘর ছেড়ে যেতে পারে না। বিশেষ করে গরীব ঘরের অবন্তী তা পারে নি। কয়েকবার সে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিল--ক দিন পরে আবার তাকে ফিরে আসতে হয়েছিল। বিয়ের দু বছর পরে নিজের চেষ্টায় একটা চাকরী যোগার করল। অবন্তীর চে মানসকে তাতে বেশী খুশি মনে হয়ে ছিল। এক মাস পরেই সে খুশির রহস্য জানতে পারলো অবন্তী যখন ওর হাত থেকে মাসের মায়না ছিনিয়ে নিয়ে গেলো মানস, বলেছিল, তোমার তো আলাদা কোন টাকার দরকার নেই, দরকার হলে আমার কাছ থেকে চেয়ে নিও!

এই পাঁচটা বছরে অবন্তী এখন পাকা পোক্ত হয়ে উঠেছে। জেনেছে--এমনি ভাবেই তাকে চলতে হবে! এমনি প্রায় রাতের যন্ত্রণা গঞ্জনা সহ্য করে তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে। জীবনের কাছে যেন সে সমর্পিতা। সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে এগিয়ে চলা! আশার ক্ষীণ আলো জ্বলে থাকে মনের নিভৃত কোন কোণে--হয় তো কোন দিন ভালো দিন আসবে, হয় তো এ কৃতদাসী জীবন বদলাবে কোন দিন!

এমনি ভাবে পাঁচটা বছর পার করে দিয়েছে অবন্তী। মাঝে মাঝে তার মনে হয় আর কত দিন, কত দিন এ কৃতদাসীর জীবন তাকে বয়ে বেড়াতে হবে ? মৃত্যু পর্যন্ত কি তাকে এমনি ভয়াবহ জীবন বয়ে নিয়ে চলতে হবে! আর যে সে পারে না--হে ঈশ্বর! বল আর কত দিন ? দু চোখ জলে ভরে আসে অবন্তীর।

মানস শুতে গিয়ে দেখল সে পালঙ্কে চড়তে পারছে না! তার মানে আজ তার ওভার ডোজ হয়ে গেছে! কয়েক বার পা তোলার অসফল চেষ্টা করল। চীৎকার করে উঠলো সে, এই, এই, শোন, এদিকে আয় জলদী!

অবন্তীর চিন্তা ভঙ্গ হয়ে গেলো। একবার মনে হল, যাবে না মানসের কাছে।  একটা অমানুষ, বৌকে ঘরের পশু মনে করে! এখনো গাল তার জ্বলছে! থাপ্পড়ের চোট এখনো গালে স্পষ্ট অনুভব করছে  ও।

--এই হারামজাদী! এদিকে আয়, মানস গালি দিয়ে চীৎকার করে ওঠে।

অবন্তী মানসের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। পালঙ্কে উঠতে পারছে না সে তো অবন্তীর কি করার আছে! বাচ্চা ছেলে নাকি, কোলে করে উঠিয়ে দেবে!

মানসের রাগ তখন তুঙ্গে, তৃতীয় বার না ডেকে ও ফিরে দেখল, অবন্তী চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে। ওর মাথায় ভীষণ রাগ চড়ে গেলো, কি রে, ডাকছি—শুনতে পাস নি তুই ?

--আমি কি করবো ? অবন্তীর কথা শেষ হবার আগে ওর গালে এসে পড়ল প্রবল এক থাপ্পড়। গর্জে উঠলো মানস, তুই সব করবি!

--তোমায় আমি খাটে উঠিয়ে দিতে পারব ?

--আবার কথা,অবন্তীর দু কাঁধে জোরে ঝাঁকিয়ে মানস বলে উঠলো,আলবত পারবি,তোর বাপ পারবে! আমায় খাটে উঠিয়ে দিতে হবে তোকে, বলে, গায়ের জোরে অবন্তীকে ধাক্কা মারল। অবন্তী ছিটকে গিয়ে পড়ল পালঙ্কের কোনায়, বেশ আঘাত পেল ও। আর সেখানেই মাথা তার ঘুরে গেলো, চারদিকে অন্ধকার দেখল। এক সময় সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। রাত একটার পর অবন্তীর হুশ আসলো। চারদিকে তাকাল ও। মুহূর্ত পরে মনে পড়ল, মানসের ধাক্কা দেবার কথা। ও মেঝের এক কোনায় পড়ে আছে। ঘরের আলো জ্বলছে। সামান্য দূরে পালঙ্কের ওপর মানস শুয়ে আছে--ঘুমিয়ে আছে। মাতাল, তার নিজের শরীর ঠিক মত নাড়িয়ে নিজের জাগায় শুতে পারে নি! সমস্ত পালঙ্ক জুড়ে আড়াআড়ি পড়ে আছে! চোখের চশমা পালঙ্কের এককোণে পড়ে আছে। আধ হাঁ, মুখ খুলে সে দিব্বি  ঘুমাচ্ছে! এই যে অবন্তীকে মারল, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো, ও মাথায় আঘাত পেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকলো--সে দিকে মানসের কি বিন্দু মাত্র নজর পড়ে ছিল! না, এ মুহূর্তে অবন্তীর মনে হল, ওর সামনে পালঙ্কে এক অমানুষ পশু শুয়ে আছে! যার বাছবিচার বলে কোন বোধ নেই! এমনি একটা হৃদয়হীনের সঙ্গে অবন্তী বাস করে!

বাকি অংশ পরের সপ্তাহে

সমুদ্রপিপাসা

মানিকলাল অধিকারী

শেষাংশ

শুভ্র তন্ময়। দাদু কিনে দিয়েছেন প্লাস্টিকের ব্যাট বল। ভুবনেশ বসলেন বাঁধানো বেদীটাতে। এতটা পথ হেঁটে ক্লান্ত। মহাশ্বেতা বারবার বলে দিয়েছে রিক্সা নিতে। ওপাশ থেকে একটা লরি আসছে। শুভ্র ছুটছে রাস্তার ওপার থেকে বলটা কুড়িয়ে আনতে। ভুবনেশ বাজার ভর্তি ব্যাগ ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে জাপ্টে ধরলেন নাতিকে। লরিটা হুশ করে বেড়িয়ে গেল।

হৃৎপিণ্ডে ভূমিকম্প টের পেলেন ভুবনেশ। শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে বরফস্রোত। দরদর ঘামছেন। লাশ, রক্ত, চিৎকার! একটা ধূসর ছায়াছবি। দু’হাতে নিজের চুল ছিঁড়ছেন। নাতিকে বকলেন না। কোন রকমে বললেন, ‘যাও। ওদের সঙ্গে মাঠে খেলগে।’

তখন। ঠিক তখনি। ভুবনেশের সমুদ্রটা খুব কাছে চলে এলো। চলে এলো এই অশ্বত্থের ছায়ায়। লেজের ঝাপ্টা মেরে সরে গেল দিগন্তে।

দু’কান বেয়ে নামছে ফুটন্ত লাভা। পাল্‌স্‌ দেখলেন। ঘোড়া ছুটছে। দুপাশে হাত রেখে শরীর শিথিল করে চেয়ে রইলেন। অনেক উঁচু ডাল থেকে একটা শুকনো পাতা ঘুরপাক খেতে খেতে নিচে নেমে আসছে। ভুবনেশ চেয়ে রইলেন। চেয়েই রইলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছেন ভুবনেশ প্রায় পাঁচ বছর। বুবুন তখনো বেকার। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে ব্যাঙ্গালোরে। জামাইয়ের সঙ্গে কোনদিনই বনিবনা হয়নি শ্বশুরের। ছেলেবেলার বন্ধু পুলিন সংহিতাকে পছন্দ করেছিলো তার পুত্রবধূ হিসাবে। সংহিতার বি.এ. পরীক্ষা সামনে। এরকম একটা অজুহাতে বিয়ের প্রস্তাবটা তখনকার মত ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ভুবনেশ। আরতি বুঝতে পেরেছিলো স্বামীর প্রকৃত ইচ্ছেটা। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার তার জামাই হিসেবটা একটু বেশীই বোঝে। ব্যাস, বাল্মিকী, রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়ারের ছাত্র ভুবনেশ একেবারে বিপরীত মেরুর মানুষ। পুলিনের ছেলেকে একজন বড়মাপের বুদ্ধিমান মিস্ত্রির বেশি কিছু ভাবতে পারেন নি। তবু, বিয়ে দিতে হয়েছিলো, স্ত্রীর কথা রাখতেই। অধ্যাপকের ঘর করতে এসে আরতি তার বাণীলক্ষ্মীর সাধক স্বামীটিকে মনের মত করেই পেয়েছিলো। কিন্তু, পায়নি কোনদিন আর্থিক সচ্ছলতা। তার জন্য অবশ্য তার কোন ক্ষোভও নেই। অধ্যাপক হিসাবে কতই বা মাইনে পেতেন ভুবনেশ! কোন রকমে সংসার চালাতে কর্পূরের মতই উবে যেত মাইনের টাকা। ছাত্রছাত্রী, অভিভাবকেরা কতবার ধরেছে প্রাইভেট্‌ কোচিংয়ের জন্য। ভুবনেশ বলতেন, ‘দ্যাখো, সারা বছর ধরে তোমাদের পড়াই শুধু হ্যাম্‌লেট্‌। মাত্র পঞ্চাশ নম্বর। একটা হাফ্‌। যে এফিসিয়েন্সি নিয়ে আমি তোমাদের হ্যাম্‌লেট্‌ পড়াই, সেইভাবে বাকি পেপারগুলো তো পড়াতে পারব না।’

নাছোড়বান্দা ছাত্রছাত্রীরা ভুবনেশের কথা বুঝতেই চায় না। কিছু নোট্‌স্‌ আর সাজেশন্‌ পেলেই তাদের চলবে। ভুবনেশের মাথাটা গরম হয়ে ওঠে। ‘তোমরা আমাকে ডিজনেস্ট হতে পার্‌সুয়েড্‌ কোরো না। ব্ল্যাক্‌ এডুকেশনে আমি নেই। আমার যেটুকু রোজগার, সবটাই সাদা। সরকারকে আমি ট্যাক্স ফাঁকি দিই না।’

স্যারের মেজাজ বুঝতে পেরে ছেলেমেয়েরা সরে পড়ে। আরতি কাছে এসে বলে, ‘অনেকেই তো প্রাইভেট্‌ ট্যুইশন্‌ করছে। তোমাকেও আমি তাই করতে বলি না। তবে, সংহিতার বিয়েতে তোমার বন্ধু বোধহয় নগদ চাইবেন।’

ভুবনেশ সে কথার উত্তর দিলেন না। বললেন, ‘আরতি, অধ্যাপকেরা চিরকালই দরিদ্র। একসময় যখন আমি মাইনে পেতাম দুশো পচাত্তর টাকা, তোমার বাবা কিন্তু, ইতস্তত করেছিলেন তোমার বিয়ে দিতে। আমরা তখন পড়াতে এসেছি ভালোবেসে। বিজন ব্যাঙ্কের অফিসারের চাকরি ছেড়ে এসেছিলো পড়াতে। সবাই বলেছিল বোকা। কত টাকা লোকসান হল তার! বউ উঠতে বসতে বলত, গাধা। এখন আমাদের বেতন বেড়েছে অনেক। বেড়েছে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য। তবু, মাইনের অতিরিক্ত ট্যুইশনের কালো টাকা না পেলে মন ভরে না। আমরা, এই অধ্যাপকেরা এখনো দরিদ্র। মানসিক বৈকল্যের শিকার।’তারপর, বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটা দীর্ঘশ্বাস আর স্বগতোক্তি, ‘আরো কী অবাক লাগে, জানো? অমর্ত্য সেন, কিংবা মিসেস্‌ জোয়ান্‌ রবিন্‌সন্‌ কিংবা ডঃ ফেইন্‌ম্যান্‌ যদি ভারতবর্ষের কোন বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজের অধ্যাপক হতেন, তারাও বেতন পেতেন আমারই স্কেলে। এটাই প্রকৃত সাম্যবাদ। তাই না?’

আরতি জানে তার স্বামীর ফাঁসি কিংবা দ্বীপান্তর হওয়ার কথা। এই লোকটা ভারতবর্ষে বাস করে সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অবলীলাক্রমে। যখন, তখন। দেশটা চিন কিংবা রাশিয়া হলে......। ভাবতে পারে না আরতি। ফায়ারিং স্কোয়াড্‌ না সাইবেরিয়া?

স্বামীকে একলা থাকতে দিয়ে চলে যায় আরতি। একটু ঠাণ্ডা হলে সংহিতার বিয়ের ব্যাপারটা আলোচনা করা যাবে। ব্যাঙ্গালোরের ছেলেটি জামাই হলে সংহিতার আর্থিক সাচ্ছল্য আর স্ট্যাটাস্‌ - দুইই বজায় থাকবে। আর, মেয়ে তো বাপের মানসিকতা পায় নি। ওর সঙ্গে অনিন্দ্যর অমিল হবে না।

সংহিতা বিয়ের পর ব্যাঙ্গালোরে চলে গেল। বিয়েতে অস্বাভাবিক খরচ করতে হয়েছিলো। বিয়ের রাতে ফিক্সড্‌ ডিপোজিটের সার্টিফিকেট্‌ ছেলের হাতে তুলে দেওয়ার কথা। যেখান থেকে পেরেছেন চড়া সুদে ধার করেও নগদ টাকাটা জোগার করতে পারেন নি। চূড়ান্ত আশঙ্কায় ভুবনেশের নাওয়া খাওয়া বন্ধ। রাতে ঘুমোতে পারেন না। ঘুমন্ত বুবুনের মাথার চুলে আঙ্গুল ডুবিয়ে রাত্রি কেটে যায়।

আজও পুলিনের কাছে কৃতজ্ঞ ভুবনেশ। বিয়ের পিঁড়ি থেকে বর তুলে নিয়ে যান নি। শুধু বলেছেন, ‘ঘাবড়িও না। ওটা পরে দিলেও চলবে।’

ব্যাঙ্গালোরে চলে যাওয়ার আগে ভুবনেশ অনিন্দ্যকে টেলিফোনে বললেন, ‘তোমরা একটা জয়েন্ট য়্যাকাউন্ট খুলে রেখো। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টাকাটা তোমাদের য়্যাকাউন্টে জমা করে দেব।’

ওপাশ থেকে অনিন্দ্য জানতে চাইল, ‘কত দিন পর?’

‘সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই হয়ে যাবে।’

‘আমার আর্নিংটা কমে যাচ্ছে না?’

ভুবনেশ ‘থ’ হয়ে গেলেন। কী বলবেন বুঝতে পারছেন না।

চোখের সামনে একটা সমুদ্র। ক্রমাগত ঢেউ। ভুবনেশ একা হেঁটে চলেছেন বালির ওপর। শুধু একা।

খুব সংযত, ধীর, স্থির হবার চেষ্টা করলেন ভুবনেশ। আস্তে আস্তে বললেন, ‘তোমার বিয়ের দিন তোমাদের হাতে ফিক্সড্‌ ডিপোজিটের সার্টিফিকেট্‌ তুলে দেবার কথা ছিলো। আমি তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার ব্যর্থতায় তোমরা কোন বিরূপ আচরণ করনি। ইট্‌স্‌ মাই ফল্‌ট্‌। য়্যাণ্ড আই মাস্ট হ্যাভ্‌ টু কম্পেন্‌সেট্‌। তুমি নিশ্চিন্ত থেকো।’

তারপর ভুবনেশ অনেক দৌড়ঝাঁপ করে সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে একমাসের সুদ সমেত টাকাটা ফিক্সড্‌ করে দিয়েছিলেন।

ভুবনেশ বোবা হয়ে গিয়েছিলেন। অনিন্দ্যর সঙ্গে সহজভাবে কথা বলতে পারতেন না। তার শান্ত সহজ স্বচ্ছন্দে এক নিস্তরঙ্গ অস্থির যন্ত্রণা। তিনি কী ভুল করলেন? সংহিতা কি কষ্ট পাচ্ছে? বারবার সিলিং ফ্যান্‌টার দিকে তাকাতেন। কোন পোড়া গন্ধপেলে সমস্ত বাড়িতে তল্লাশি চালাতেন। নিজের কাছেই লুকোতে চাইতেন আশঙ্কাটা। নাঃ, সবটাই ভুল করেন নি। সংহিতার মুখে চোখে বসন্তের কৃষ্ণচূড়া। কিছুটা নিশ্চিন্ত হতেন। আর অনিন্দ্য এলেই স্বামীকে আগলে আগলে রাখত আরতি। সংহিতারা মাঝে মাঝেই টেলিফোন করে। ভুবনেশ মেয়ের সঙ্গে একটু হুঁ হাঁ দিয়েই আরতিকে ডেকে দ্যান।

পূজোতে মেয়ে জামাই এসেছিলো। আরতি ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে। দায় দায়িত্ব কর্তব্য পালনে ভুবনেশ কোন কার্পণ্য করেন নি। বুবুন জামাইবাবুর সঙ্গে ছায়ার মত ঘুরছে। আরতি স্বামীকে চোখে চোখে রাখছে।

মায়ের শাড়ি, বুবুনের প্যান্টসার্ট – এত দূর পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিলো। কিন্তু, অনিন্দ্য যখন শ্বশুরমশাইয়ের জন্য দামি ধুতি আর পাঞ্জাবির পিস্‌ নিয়ে এলো, ঝড়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেল তখনই।

একরোখা ভুবনেশ সংহিতাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি এই সাত মাসে নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি যে আমি বাবা মা ছাড়া কারো কাছ থেকেই কোন দিন কোন পার্থিব জিনিস নিই নি। তোমরা আমার পথটা বদলে দেবার চেষ্টা কোরো না।’ ভুবনেশ হাসলেন। আরতি কিছু বলতে এসেছিলো। হাতের ইসারায় তাকে নিরস্ত করলেন। ‘আর, বুবুন এবং তোমার মাকে এত দামি জিনিসপত্র দিয়ে তাদের অভ্যাসটা খারাপ করে দিয়ো না। তাছাড়া ব্যাঙ্গালোরে কি তুমি কোন চাকরি বাকরি জোগার করেছ?’

সংহিতা জবাব দিল, ‘না।’

‘তবে? তোমার কি উচিত অনিন্দ্যর উপার্জিত অর্থের এরকম যথেচ্ছ অপব্যয় করা?’

ইঙ্গিতটা ছুঁয়ে গ্যাছে অনিন্দ্যকে। সংহিতা জানে তার বাবা কেমন। পূজোর আনন্দটাই অকালবৈশাখীতে স্যাঁতসেতে হয়ে গেলো। ব্যাঙ্গালোরে ফিরে যাবার পর সংহিতা একা এসেছিলো প্রায় চার বছর পর ছেলেকে নিয়ে মায়ের শ্রাদ্ধে। তারপর আরো এক দশক।

সংহিতার মুখটা এখন ছবির মত মনে পড়ে ভুবনেশের। মাঝে মাঝেই ফ্রিজের ওপর থেকে ছোট্ট সংহিতার ল্যামিনেটেড্‌ ফোটটা বুকে চেপে তাকিয়ে থাকেন আকাশে।

তখন সমুদ্রটা চলে আসে ছায়াপথে। এই গ্যালাক্সিতে। অসংখ্য হাঙ্গর আর তিমিদের কিলবিল কিলবিল হাডুডু খেলা। টপাটপ গিলে ফেলছে তারাদের। একটা ডলফিন ছুটে চলেছে য়্যান্টেরাসের দিকে। রুদ্ধশ্বাস ভুবনেশ। হাঙ্গর আর তিমি মিলেমিশে পিছু নিয়েছে ডলফিনের। এগারো বছরের একটি ছেলে। মুণ্ডিত মস্তক। কোরা ধুতি। হাত থেকে মাটির হাঁড়িটা ফেলে ছুটছে। পড়ে যাচ্ছে। আবার ছুটছে।

ডলফিনটাকে বাঁচাতেই হবে।

সমুদ্রপিপাসা

মানিকলাল অধিকারী

‘ওগো শুনছো?’

‘হুঁ......’

‘এখন কেমন লাগছে?’

‘হুঁ......’

‘কী তখন থেকে হুঁ হুঁ করছ, বলতো? কাগজটা মুখ থেকে নামাও না। ওরকম বোরখার আড়ালে থাকলে কেউ কথা বলতে পারে?’ আরতির গলায় ঝাঁঝ।

‘বল।’ খবরের কাগজটা টেবিলে রেখে নড়েচড়ে বসলেন ভুবনেশ। আরতি ঘনিষ্ঠ হয়ে এল।

‘কতবার ঠাকুরপো বলছেন, যাও না একবার ডাঃ বৈদ্যর কাছে।’

‘আচ্ছা, তোমরা কি আমাকে পাগল ঠাউরেছো?’

‘এ কথা শুনলে কিন্তু তোমার নিরেট ছাত্রটিও হাসবে।’ আরতির কণ্ঠস্বরে প্রচ্ছন্ন বিস্ময়। ‘পাগলরাই কি কেবল সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যায়?’

‘তবে?’

‘তুমি ঐ যে সমুদ্র টমুদ্র কী সব বল না, আমার বড্ড ভয় করে। ঠাকুরপো যখন এত করে বলছেন একবার দেখতে দোষ কী?’

ভুবনেশ চুপ। চোখের সামনে তখন অন্য দৃশ্যপট। টগবগে সবুজ তাজা এক যুবক বারো বছর ধরে শেক্সপীয়ার্‌ পড়ছে এক দূরন্ত সমুদ্রের পাড়ে। নীল, নির্জন, নস্টালজিয়া। আর, তার বাবা দু চোখে শুষে নিচ্ছে সমুদ্রকে। প্রতিটি ঢেউ তার নখদর্পণে। ডাঃ বৈদ্য কি জানেন এই কাহিনী? ফ্রেমের ওপারে আরতির দীঘল চোখের দিকে তাকিয়ে ভুবনেশ কেমন উদাস হয়ে যান।

চোখের সামনে একটা সমুদ্র দেখতে পান ভুবনেশ। খুব কাছে। হাত দিয়ে ছোঁয়া যায়। সমুদ্রটা চলে আসে আম্রপালীর ছায়ায়। ঝাপিয়ে পরে চোখে। ভুবনেশ চোখ বুজে ফেলেন। হাসেন। ইন্‌স্টিংক্ট। চোরা স্রোত। নুন নুন রক্ত। অসংখ্য ঝিনুক। প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে আলাদা। রং-য়ে, চেহারায়। এগারো বছরের একটি ছেলে। মুণ্ডিত মস্তক। কোরা ধুতি। একা। শুধু একা হেঁটে চলেছে সমুদ্রের দিকে। একের পর এক ঢেউ আছড়ে পড়ছে। ছেলেটির কোন ভয় নেই। বালির ওপর পা ফেলে ফেলে সে চলেছে। শুধুই চলেছে।

‘তারপর?’ উৎকণ্ঠায় আরতির কণ্ঠস্বর ফ্যাকাশে। গলার শিরা ফুলে ফুলে উটছে।

‘ছেলেটি হারিয়ে গেল।’

ভুবনেশই এসব বলেছিলেন। বেশ কয়েকবার। আরতি ভয়ে ভয়ে থাকত। তারপর, ভুবনেশ ইউনিভার্সিটি চলে গেলে ডেকে পাঠিয়ে ছিলেন সুহোর্ত্রকে। সুহোর্ত্র বলেছিল ডাঃ বৈদ্যর কথা। সাইকিয়াট্রিস্ট। পাত্তাই দ্যাননি ভুবনেশ।

সাইকিয়াট্রিস্টের সম্বন্ধে ভুবনেশের অদ্ভুত এক য়্যালার্জি । এক রোগিনী এসেছিলো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে। ডাক্তার জিজ্ঞাসা ক্রলেন, ‘যদি আপনার একটি কান কেতে ফেলি, আপনার রিয়্যাক্‌শন্‌ কি হবে?’

‘ইট্‌স্‌ সিম্‌প্লি পেইন্‌ফুল্‌।’ রোগিনীর উত্তর।

ডাক্তার উল্লসিত সঠিক জবাব পেয়ে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন। ‘যদি আপনার দুটো কানই কেটে ফেলি। তবে?’

রোগিনী এক মুহূর্তও না ভেবেও জবাব দিল, ‘আমি দেখতে পাব না।’

ডাক্তার ভীষণ ঘাবড়ে গেছেন। তার প্র্যাক্‌টিশ জীবনে এরকম প্রশ্ন তিনি অসংখ্য রোগীকেই ছুঁড়েছেন। কখনো এমন উত্তর পাননি। ডাক্তার বেশ অনুরোধের ভঙ্গিতে ব্ললেন, ‘যদি একটু ব্যাখ্যা করেন আপনার দুকান কেটে ফেলার সঙ্গে দেখতে না পাওয়ার সম্পর্ক।’

রোগিনী হাসলো। ‘দুকান কেটে ফেললে চশমা লাগাবো কোথায়?’

ডাক্তারের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। রুমালে মুছে প্রেস্‌ক্রিপ্‌শন্‌ করতে বসলেন।

এতা হয়ত জোকস্‌। কিন্তু, ভুবনেশের এরকমই ধারণা ডাক্তারদের স্মবন্ধে। কতবার বলেছেন এ কাহিনী। আরতি হেসেছে।

তখন সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছেন ভুবনেশ। মায়ের ইচ্ছাতেই বেছে নেওয়া এই অধ্যাপক জীবন। গেস্ট হাউসের লাউঞ্জে ইজি চেয়ারে বসে আছেন। সামনে ধু ধু ফাঁকা। মেঘের পর্দাটা ধুয়ে গেছে বৃষ্টিতে। তিনধারিয়া পাহাড়ে ঝিকমিক করছে আলো। একটি ছেলে। এগারো বছর। মুণ্ডিত মস্তক। কোরা ধুতি। ধরা আর কাছা পরা। ছেলেটির দু’হাতে কিছু একটা ধরা আছে মাটির পাত্রে। আছড়ে পড়ছে পড়ছে অসংখ্য ঢেউ। কেউ জানতে চেয়েছিলো, কী হয়েছে। ছেলেটি উত্তর দিল, ‘মা’।

ভুবনেশ চমকে উঠলেন। দরদর করে ঘামছেন হিমালয় ছুঁয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়াতেও। শ্বাস-প্রশ্বাসে কালবৈশাখী। ডুকরে উঠলেন। প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার দূরে মা এখন কী করছেন? হাতঘড়িতে দেখলেন, সকাল আটটা। মা এখন পূজোর ঘরে।

তারপর দিনের আলোয় ভুবনেশ ভুলে গিয়েছেন সব। সবকিছু। বইয়ের পাতায় আর মায়ের মুখটা দ্যাখেন নি। দেখলেন তিনমাস পর। মাস তিনেক বাদে গ্রীষ্মের ছুটিতে যখন বাড়ি এলেন। উঠোনময় একরাশ ভিড়ে বাবা ছোটোকাকাকে টেলিগ্রামের বয়ান লিখে দিচ্ছেন। ‘ভুবনেশ, কাম্‌ শার্ফ।’

ত্রিবেণীর গঙ্গায় মায়ের অস্থি বিসর্জন দিতে গিয়েছিলেন। মাটির হাঁড়িতে অস্থি নিয়ে শ্মশান থেকেই রাতের ট্রেনে সোজা ত্রিবেণী। আলো আঁধারিতে গঙ্গার শরীরে ময়াল রহস্য। ভুবনেশের মাথার ভিতরে তখন লক্ষ ঝিঁ ঝিঁ। একটা একটা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নামছেন গঙ্গায়। সামনে আদিগন্ত বালির চর। একটা সুতোর মালা বারবার আসছে। আবার, সরে যাচ্ছে। সমুদ্রটা চলে এলো খুব কাছে। বিশাল একটা ঢেউ আছড়ে পড়ল পায়ের কাছেই। অস্থিভরা মাটির হাড়িটা ফস্কে গেল হাত থেকে। ভুবনেশ চমকে উঠলেন। কাকা চিৎকার করে বললেন, ‘ডুব দিয়ে এবার উঠে এসো। বেশিক্ষণ জলে দাঁড়িয়ে থেকো না।’

লন্‌ চেয়ারে আম্রপালীর ছায়ায় খবরের কাগজে চোখ রেখেছিলেন ভুবনেশ। আট মাসের নাতনী শ্রীতা বসে বসে আঙ্গুল চুষছে। মহাশ্বেতা রান্না ঘরে ব্যস্ত। একই সঙ্গে ঋতশুভ্রকে মুখস্ত করাচ্ছে নার্সারি রাইম্‌। বুবুন এখন সুপারে তাসের দেশে। বুবুনের অফিসের ভাত, টিফিন রেডি করে মহাশ্বেতা কাঁটায় কাঁটায় আটটায় প্রেসারের ট্যাব্‌লেট্‌ দিয়ে গেল। বুবুন সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল। ভুবনেশ বললেন, ‘সাবধানে যাস’।

এখন মহাশ্বেতার খানিকটা হাঁফ ছাড়া ভাব। ঘুমকাতুরে মহাশ্বেতা ঘড়িতে য়্যালার্ম দিয়ে রাখে। স্বামীকে ঠেলেঠুলে তুলে মহাশ্বেতা যখন বাইরে আসে, তখন ভুবনেশ ফেরেন মর্নিং ওয়াক্‌ সেরে। প্রথম প্রথম ভুবনেশই ডেকে তুলতেন বৌমাকে মর্নিং ওয়াকে যাবার আগে। মহাশ্বেতা লজ্জা পেত। ভুবনেশ সেই রুটিন্‌ পাল্টে দিলেন একটা য়্যালার্ম ঘড়ি এনে দিয়ে। তিনি ভাবতেন, ‘বেচারী খেটে খুটে অনেক রাতে শোয়। ছিনে জোঁকের মত আষ্টেপৃষ্টে মাকে শুষে নেয় নাতিটা। তারপর আছে বুবুনের বায়নাক্কা। সবার চাহিদা মিটিয়ে মহাশ্বেতা আর কতটুকু সময় পায় ঘুমোতে? আহা! ও বরং আর একটু ঘুমোক।’

পেনশনের টাকা পেয়ে যখন ঘড়িটা এনে দিয়েছিলেন বৌমার হাতে, মহাশ্বেতার চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছিলো। ভুবনেশ এখনো দেখতে পান। ভুবনেশ বলেন, ‘তুমি তো দশভূজা। তোমার শাশুড়ি থাকলে কিছুটা সুরাহা হত হয়ত বা কাল থেকে আরো একঘণ্টা পরে উঠো’।

যুদ্ধ শুরু সেই ভোর পাঁচটা থেকে। স্বামীর জন্য রান্না, শুভ্রকে স্কুলে পাঠানোর প্রস্তুতি, শ্বশুরমশাইয়ের স্বাস্থ্যের তদারকি – সবই এক হাতে করতে হয় মহাশ্বেতাকে। অনেকটা হর্‌লিক্‌সের বিজ্ঞাপণ। এই সংসারে বৌ হয়ে এসে শাশুড়িকে পায়নি। তার সৌভাগ্যকে ঈর্ষা করেছে বান্ধবীরা। মহাশ্বেতা ভাবত অন্যরকম।

শ্রীতা হঠাৎই কেঁদে উঠল। ভুবনেশ খবরের কাগজ থেকে মুখ সরিয়ে নাতনিকে কোলে তুলে নিলেন। ভেজা প্যান্টটা কোমর থেকে খুলতে খুলতে রসিকতা করলেন, ‘ভ্যাগ্যিস হ্যাগিজ্‌ নেই, বৌমা............’।

মহাশ্বেতা কান্না শুনে রান্না ঘরের জানালা দিয়ে মুখ বাড়ালো। দাদু নাতনির আলাপচারিতায় মৃদু হাসল। বলল, ‘যাই বাবা’।

কাছে আসতেই ভুবনেশ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বৌমা, টেক্‌নোলজির সঙ্গে স্নেহের সম্পর্ক কেমন, জানো?’

মহাশ্বেতা জানে শ্বশুরমশাই উত্তরটা আশা করে প্রশ্ন করেন নি। ভুবনেশ বললেন, ‘নেগেটিভ্‌, এক বিপরীতমুখী সম্পর্ক।’ শ্রীকে মহাশ্বেতার কোলে দিয়ে ভুবনেশ বললেন, ‘ওর ক্ষিধে আর ঘুম পেয়েছে বোধ হয়। শুভ্রর পড়া হল? দাও, বাজারের ব্যাগটা। একটু ঘুরে আসি।’

মহাশ্বেতার হাতে খবরের কাগজটা দিয়ে উঠে পড়লেন ভুবনেশ। চিনি ছাড়া এক কাপ লিকার চা খেয়ে নাতির হাত ধরে বেড়িয়ে পড়লেন। ফর্দ মিলিয়ে মুদির দোকান সারলেন। ফেরার পথে রাস্তার মোড়ে অশ্বত্থের তলায় দাঁড়িয়ে পড়ল ঋতশুভ্র। কাগজের বল আর একটুকরো কাঠে ক্রিকেট খেলছে দশ এগারো বছরের ছেলেরা। ভুবনেশ হাসলেন। শচীন-সৌরভ। ভুবনেশও দাঁড়িয়ে গেছেন নাতির সঙ্গে। ছেলেবেলায় কখনো ক্রিকেট খেলেন নি তিনি। ছুঁয়েও দ্যাখেন নি ব্যাট-বল। তবে, ড্যাংগুলি খেলেছেন। ড্যাংগুলি হল রুর্যা্ল ক্রিকেট। কি করে যে ড্যাংগুলির সঙ্গে ক্রিকেটের অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলেন! ভালোবাসেন ফুটবলও। ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের খেলা হলে রেডিও ছেড়ে আর নড়েন না। নাতি ঠাট্টা করে। ভুবনেশ হাসেন। নাতির ক্রিকেট অন্তপ্রাণ। নাতিকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটের সংক্রামক ভাইরাসে তিনিও আক্রান্ত। আর, ছেলের তো ক্রিকেট হিস্টিরিয়া! অগ্নিবীণায় ফিরেও ক্লাবে যাওয়া চাই-ই। পাছে লোড্‌শেডিংয়ে ফাঁকি পড়ে ক্রিকেট ফ্যান্টাসির একটা অনুচ্ছেদও।

বাকি অংশ পরের সপ্তাহে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

শেষ পর্ব

বিয়ের মোটে সাত দিন বাকি। ওখানে নিশ্চই সকলে ব্যাস্ত। শালু এখান থেকেই ছুটির জন্য দরখাস্ত পাঠিয়ে দিয়েছে। ছুটি মঞ্জুরও হয়ে গিয়েছে। তাই ওরা দুজনে সোজা কোলকাতা যাবে। অয়ন ফ্লাইটের টিকিট কেটে রেখেছে। ওরা তিন দিন আগে পৌঁচেচ্ছে। অয়নের আজ সারাদিন কোন কাজ ছিল না। আজ শনিবার এমনিতেই ওদের ছুটি। খোশ মেজাজে আছে সে। একটা নতুন গান শুনছিল এবারের পূজোর গান বোধ হয়। নতুন গানটা। ভালোই সুর হয়েছে। গানটা মন দিয়ে শুনছিল অয়ন। হঠাৎ শালুর ফোন এল ...। 

তোমার সুরের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ হলাম,

তোমার সুরের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ হলাম, 

সুরের আকাশে তোমায় যে দেখলাম, 

হেরিলে আমার মন উদাস হলাম, 

মেঘের পরশে যে শীতল হলাম।... (১)

তোমাকে না দেখে উদাস হলাম, 

তবুও বোঝে না মন কেন যে আমার, 

কেন বসে আছি ...বল এক বার, 

যেওনা তুমি গো প্রিয়া শোন একবার ... (২)

তোমা বিনা লাগে না যে ভালো আমার, 

বসে আছি পথ চেয়ে তোমার আসার, 

প্রহর গুনি সুধু তোমার আশায়, 

মন দেওয়া নেওয়া হবে সেই আশায়, 

মাতাল হব আমি তোমার ই নেশায়। ... (৩) 

তোমার সুরের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ হলাম, 

সুরের আকাশে তোমায় যে দেখলাম, 

হেরিলে আমার মন উদাস হলাম, 

মেঘের পরশে যে শীতল হলাম।... (১) 

তোমাকে না দেখে উদাস হলাম, 

তবুও বোঝে না মন কেন যে আমার, 

কেন বসে আছি ...বল এক বার, 

যেওনা তুমি গো প্রিয়া শোন একবার ... (২) 

তোমার সুরের ইন্দ্রজালে মুগ্ধ যে তাই, 

সুরের আকাশে তোমাকে দেখি যে তাই, 

আমি কত যে তোমাকে ভালোবাসি, 

আকাশের চাঁদ তারা... তারাও খুসি, 

মেঘের পরশে যে শীতল হলাম, 

এবার বলনা ... তোমার, দেখা কি পেলাম। ... (৪) 


গানটা মোবাইলে আপলোড করে সেভ করে রাখলো পরে শুনবে। 

শালুঃ কি হল গান শুনছো যে, আমার ফোন বেজেই যাচ্ছে ...! 

অয়নঃ বল তোমার কথাই ভাবছিলাম। 

টিকিট কেটেছ? 

সে আর বলতে ! তোমার বলার অপেক্ষা রাখি নাকি ! কাতা হয়ে গিয়েছে। তুমি তৈরি থেক আমি তোমায় পিক উপ করে নেব। কেমন। 

ঠিক আছে। আমার কিছু কেনা কাটার আছে সেগুল সেরে নিতে হবে ডিনারের আগে। (অয়নের সঙ্গে আজ দেখা হওয়ার কথা। রাতের ডিনার এক সঙ্গে খাবে ওরা।) 

ওকে। তুমি অন্যসব জিনিষ পত্র গুছিয়ে নিয়েছ?

সব গোছান হয়ে গিয়েছে ‘চাঁদ’। এসে দেখতে পার। 

শালুর গলায় হঠাৎ ‘চাঁদ’ কথাটা শুনে অয়নের আশ্চর্য লাগলো। পরে ভাবে ভালো মুডে আছে রাগিয়ে কাজ নেই। 

আজ ওদের দুজনের কোলকাতা ফেরার কথা। দুজনে এক সঙ্গে ফিরছে অনেক দিন পর। মনটা দুজেনেরি খুশী। বাড়ী ফিরে অনেক কাজ। 

শালুকে খুব শান্ত সুন্দর দেখাচ্ছিল। ফ্লাইটে দুজনে পাশাপাশি সিটে বসে গল্প করছিল। 

প্লেনটা, রান ওয়েতে ল্যান্ড করার আগে সিট বেল্ট পোঁরে নিল। আঃ স্বস্তির নিঃশ্বাস নীল দুজনে। ঘর ছেড়ে থাকতে ভালো লাগে না। ওদেরই বা লাগবে কেন?

শালিনীর জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। 

বাড়ী ফিরে শালু দ্যাখে বিয়ের পুরো ধুম ধাম আয়োজন। অদের আত্মীয় স্বজন সব এসে গিয়েছেন। দুই মামা মামি, মেস মাসি, এক কাকা উনি অবিবাহিত। মামাতো, মাসতুত ভাইরা সবাই এসেছে। দিদি জিজু টুকাই আছে। জিজুর মাথায় সব দায়িত্ব। ক্যাটারার যোগাড়, হলদিরামের ব্যাঙ্কে-ট হলে বিয়ের আয়োজন হয়েছে। সমস্ত কেনা কাটা... দিদি জিজু মিলে করেছে। শালুকে, মা সব দেখাচ্ছিলেন... শালুর মনটা অন্যমনস্ক দেখে বোঝেন ওর নিশ্চই বাবার কথা ভাবছে।

কিরে কি হল মা ... অমন অন্য মনস্ক কেন তুই?

কিছুনা ত ... ! কি আবার হবে? 

তবে গয়না গুল দেখছিস না কেন? ডিজাইন টা দ্যাখ !! 

(মুখ ফিরিয়ে নিয়ে) তুমিত যান আমার ও সব একদম ভালো লাগে না। এত টাকা খরচের কি ছিল? তোমার ভবিষ্যৎ, তোমার শরীর অসুস্থ হলে কে দেখবে মা? যদি ডাক্তার ওষুধের হঠাৎ প্রয়োজন হয়। তুমি ত সব শেষ করে দিয়েছ দেখছি ! টাকাগুলো এরকম ভাবে নষ্ট করলে? আমরা কে কখন কোথায় থাকি ! 

মেয়ের কথা দ্যাখ ! ওরকম বলে না। নষ্ট আবার কি রে? মেয়ের বিয়ে একবার ই হয়। আমার যা গয়না ছিল সেগুলো তোদের দুই বোন কে দিয়েছি। গড়ানোর মজুরি যা লেগেছে। ওরে তোরা সুখে থাকলেই আমার সুখ। আমার আবার কি হবে? দিব্বি থাকবো। তখন ত আর তোর চিন্তা থাকবে না ! ঠাকুরের নাম নেব আর গুরুদেবের আশ্রমে যাব। 

এত টাকা নষ্ট করেছ তোমরা। সাধারণ ভাবে কি বিয়ে হয়না? এ’ত এলাহি আয়োজন !! 

জিজু দিদি ঘরে ঢ়কে। কিরে পছন্দ হয়েছে তোর? দিদি বলে। 

তুইকি আমায় নতুন দেখছিস দিদি? আমি এসব পরি কোন দিন ! সং সেজে যাত্রা করতে যাব? সাধারণ ভাবে কি বিয়ে হয় না। 

না হয় না ... মা বলেন। কেন হবে? আমার কি নেই কিছু ! হা ঘরের মত বিয়ে দিতে হবে কেন?


গায়ে হলুদ

গায়ে হলুদের দিন বরের বাড়ী থেকে তত্ত্ব এল। সকলে হুমড়ি খেয়ে দেখছে কি এল বলে।

শালু, কি সুন্দর তত্ত্ব পাঠিয়েছে। খুব সুন্দর হয়েছে। 

শালু বলে, “তোরা খুশি ত, তাহলেই হল।” আমি ওসবের কিছু বুঝি না। 

সমাজের সব রীতি সময় নির্ভরশীল। সমস্ত রীতির মধ্যে সময়ের ছাপ পড়ে তাই নাকি গয়না ছাড়া বিয়ে হয়না। তাই বাঙ্গালীদের বিবাহ উৎসবে শাড়ী গয়না এসবের আকর্ষণ এখন ও প্রচলিত। শালিনী যত বোঝালেও এদের মগজে ওই ব্যাপারটা থাকবেই কেউ ঘোচাতে পারবেনা


আজ শালিনীর বিবাহ উৎসব

এই দিনটার জন্য শালুর মা বসেছিলেন। আজ তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। তার প্রধান দায়িত্ব সুচারু রূপে পালন করতে পারলে দক্ষিণেশ্বরে মায়ের পুজো দেবেন। মেয়ে যে বিয়েতে রাজি হয়েছে এটাই তাঁর চোদ্দ পুরুষের ভাগ্য। অয়নের মতন জামাই তাদের মতন ঘর পাবেন বলে আশা করেন নি। তবে মেয়ে তাঁর ‘মা সরস্বতীর’ প্রতীক। তার সুপাত্র জুটেছে তার ই পছন্দ অনুসারে। সেটাই সব চাইতে বড় কথা। সারা পাড়া সানাইয়ের সুরে মুখরিত। 

সানাইয়ের সুর আমায় বলে

ছোট বেলাকে যাচ্ছ ফেলে, 

সুরু হবে নতুন জীবন, 

হিয়ার মাঝে থাকবে স্বজন, 

ফুল ফুটবে হৃদয় মাঝে, 

স্মৃতিটুকু থাক তার ই মাঝে।


সব আত্মীয় স্বজনরা বিয়ের আয়োজন এবং খাওয়ার প্রশংসায় পঞ্চ মুখ। বর বধূকে আশীর্বাদ করে যে যার ঘরে ফিরে গেলেন। শালিনী তার নতুন জীবন আরম্ভ করবে শ্বশুর বাড়ীতে। শ্বশুর বাড়ীতে ওর সুখ্যাতিতে সব্বাই আনন্দে আত্মহারা। মোটা মুটি বিবাহ সুসম্পন্ন হল। বর বধূ বিদায় নিল কন্যা ঘর হইতে। সকলের চোখে জল। মা দিদি টুকাই সকলের কান্না কাটি দেখে শালিনী সামলাতে পারলোনা নিজেকে। তার ও চোখে জল ! বিদায় ত একদিন নিতেই হবে এটাই হিন্দু ধর্মের নিয়ম। কনকাঞ্জলি র সময় কন্যা  পেছন থেকে এক মুঠো চাল ছুঁড়ে পিতৃ মাতৃ ঋণ শোধ করা হাস্যস্কর ব্যাপার। কি মনে করতো এই পুরন দিনের ব্রাহ্মণ সমাজ? এটা যে বাবা মাকে কত অপমান করা তা তাদের ঘটে ছিলনা !  আজ এই সমাজে তাই মহিলাদের প্রত্যেক পদক্ষেপে ঘাৎ প্রতিঘাৎ সহ্য করে চলতে হয়। শিক্ষার প্রসার ঘটেছে কিন্তু কুসংস্কার এখন মানুষের মনে আছে। মানুষ শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের বিচার ধারা পাল্টান প্রয়োজন।

বিবাহ বাসরঃ-

বিবাহ বাসরে অয়ন শালিনীর জুড়ী সকলের পছন্দ। অয়নের বন্ধুরা এই প্রথম শালিনীকে দ্যাখে। ওর বিষয় আগে শুনেছিল তবে চাক্ষুষ দেখেনি। খুব জাঁক যমকে ওদের বিয়ের রিসেপপ্সন এখানে হয়। বাপের বাড়ীর গয়না আবার শ্বশুর বাড়ীর গয়নার ভারে শালিনী খুব অস্বস্তি বোধ করছিল। এগুলো সত্যি বাড়া বাড়ি লোক দেখান বলে মনে হয় শালুর। মুখে কিছু না বললেও পরের দিন মনে মনে ভাবে শাশুড়ি মায়ের হাতে তুলে দেবে সে সব গয়না। কি হবে তার এগুলো? মা বারে বারে বলে দিয়েছেন, ওখানে এমন কিছু না করতে যা তাদের সম্মান হানীর কারন হতে পারে। এ সব নিছক লোক দেখানি সেকেলে। এ সব সম্পূর্ণ বন্দ করা উচিৎ। যে দেশে এখন মানুষ দু মুঠো মুখে ভাত দিতে পারেনা অভাবের তাড়নায় সেখানে এগুলো তার মতে বিলাসিতা।

মনে মনে ভাবছিল ওইসময় আরও গহনার প্রেসেন্টেসন আসে।  অয়নের মাসি,পিসী,মামা মামি,কাকা সকলে যেন  কম্পিটিশন করে গয়না দিতে লাগেন। অয়ন কে তার বিরক্তির কথা জানায় চুপি চুপি।  ও বলে আজকের দিনটা চুপ থাকতে। পরে সব সমাধান হয়ে যাবে। অয়ন ওর মাকে ও বলে রেখেছে আগে থেকে।  

যাইহোক ক্রমে রাত অনেক হল। বর বধূ বাসর ঘরে গেল। সকলের হাঁসির ফোয়ারা।

অয়ন, শালুর জন্য হীরের আংটি কিনে রেখেছে বাসরে দেওয়ার জন্য  কিন্তু দেওয়ার সাহস নেই কারন ও জানে শালু খুব অসন্তুষ্ট হবে। ওটা ওর মতে টাকা নষ্ট করা।  তবুও একবার দেখানোর ইচ্ছা।

অয়ন- শালু, আমি তোমার জন্য একটা হীরের আংটি কিনেছি দেখবে।

শালু- ওই আংটি টাকি তোমার চেয়ে বেশি দামি? 

অয়ন- সত্যি বলছ !

শালু- কেন মিথ্যের কি আছে শুনি !

অয়ন- তুমি সত্যি কি ধাতে গড়া ভগবান জানেন। মেয়েরা প্রেসেন্টেসেন দিলে খুশী হয় আর তুমি?

শালু- কে খুশী হয় আমার জানার ইচ্ছে নেই তবে আমি খুশী হইনা।

অয়ন- তবে কিসে খুশী শুনি?

শালু- তোমার সান্নিধ্য। তোমার ভালোবাসা। ব্যাস আর কিছু চাই না।

অয়ন- ফ্যাল ফ্যাল করে দ্যাখে তার শালুকে। তার শালুর প্রতি গভীর শ্রধ্যা আসে। সত্যি আজকালকার মেয়েদের চেয়ে ও কত আলাদা। ওর মধ্যে লোভ নেই আছে আত্ম মর্যাদা, স্বাভিমান, সততা। অয়ন ধন্য শালুর মত স্ত্রী পেয়ে। সে নতুন ভাবে আবিষ্কার করলো শালুকে। সে শালুর  ‘আবিষ্কারের নেশাকে’  মর্যাদা  দেয়  দেবে। এটাই তার প্রতিজ্ঞা।

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

১৪শ পর্ব 

শালিনী সত্যি খুব দুঃখ পেয়েছে অয়নের ওই ব্যাবহারে। তার প্রাণে হয়ত সঙ্গীতের মুর্ছনা নেই কিন্তু কিছু শব্দ বেরিয়ে আসে সেগুল জুড়লে বোধ হয় একটা গান লেখা হয়ে যাবে। মনে ব্যাথা পেলে বোধ হয় আপনা হতে বেদনার গান লেখনির মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। শালিনী তার ব্যতিক্রম নয় কথাগুল ভাবতে ভাবতে ওর চোখে জল আসে।


আজ শ্রাবণের ধারার মত অশ্রু ঝরে

তোমার বিরহের বেদনা তে রক্ত ঝরে

মুখে নেই ভাষা আছে সুধু ভালোবাসা

বুঝি আমি তোমার চোখের যে ভাষা (১)

অশনি সঙ্কেত ওই আকাশে গুরু গম্ভীর নাদে

মেঘের পরশে আজ বাতাস যে কাঁদে

তবু ঝরে মোর আঁখি হতে অবিশ্রান্ত ধারা

কম্পিল যে আজ মৃদু তালে ধরণী ধরা (২)

তোমারি ছবি দেখি মনের আঙ্গিনায়

ভুলিনিগো তোমারে ভুলিনি যে হায়

বিরহ যাতনা যে আর নাহি সয়

স্মৃতিটুকু রেখেছি মনে এই ভরসায়

ফিরিয়া আসিবে তুমি সেই ভরসায় (৩)

আজ শ্রাবণের ধারার মত অশ্রু ঝরে

তোমার বিরহের বেদনা তে রক্ত ঝরে

.

এই বিশাল পৃথিবীতে একলা মহিলা নিজের সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে তার সমস্ত কাজ সুচারু রূপে করা এক কঠিন পরীক্ষার মত। তাতে উত্তীর্ণ হওয়া শক্ত। তার মনকে শক্ত করতে হবে। ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। অয়ন বুঝতে পারলোনা যে এটা এমন এক প্রতিষ্ঠান যেখানে কোন রকম অশালীনতা বরদাস্তর বাইরে। সামান্য কিছু ঘটলে শালিনীর ক্যারিয়ারের ওপর আঁচ পড়বে সেটা সে কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারবে না। কারুর কাছে মুখ দেখাতে পারবে না সেটা কি অয়ন বোঝেনা!! 

অয়নকে বোঝানর জন্য ফোন করে কিন্তু ও কেটে দেয়। বাড়ীতে কাউকে বোঝাতে পারবেনা। মা তাকেই দুসবে বারে বারে। এটাই বোধ হয় মেয়েদের প্রধান সমস্যা। অগত্যা বাড়ী যাওয়ার কথা ভুলে নিজের কাজে মন দেয়। ডঃ ভট্টাচার্য সত্যি ভদ্র লোক। উনি কিন্তু শালিনীর অনেক খারাপ ব্যাবহার সহ্য করেছেন। কিছু কখন মুখ ফুটে বলেন নি। বেশ কিছুদিন এরকম চলে। শালিনী বেঙ্গালুরুর ট্রেনিং টা পরে যেতে চায়। ওর মন একদম ভালো-না কদিন ধরে। মেয়েদের মনে প্রথম বসন্তে কোন পুরুষের আগমন হলে সাধারণত সেই আঁচড়টা থেকেযায়। সেটা ভুলতে পারে না ওরা। ওটাই অনাবিল প্রেমের নিদর্শন। ওতে কিছু খামতি থাকে না। এটাই বোধ হয় প্রকৃতির নিয়ম। তাই শালিনীর জীবনের প্রথম প্রেম তার মনে দাগ রেখে গেল। ও সেটা শত চেষ্টা করেও মুছতে পারছেনা।

এক রবিবারে মা ; জিজু, দিদি, টুকাইকে সঙ্গে করে হাজির হলেন ভুবনেশ্বর। শালিনী ওদের দেখে আশ্চর্য হয়। বলে কিগো তোমরা কিছু না বলে চলে এলে যে। আমাকে খবর দেবে ত! 

মা বলেন:- সবাই তোকে সারপ্রাইজ দেব ভাবলাম। কোই অয়নদের বাড়ীথেকে ত কেউ এলেন না। 

শালিনী:- আমি কি করে বলব মা এখানে বসে? ওরা আসবে কি না আসবে ওদের ব্যাপার। ওরা বড়লোক ওদের খেয়াল খুশী অনুজাই চলে। খেয়াল হয়েছিল আমাকে বিয়ে করবে বলে এখন সে খেয়াল মাথা-থেকে চলে গিয়েছে। ব্যাস। আমি দিব্বি আছি। আমাকে আর কেউ আর বিরক্ত করবেনা বিয়ের ব্যাপারে। তোমরা সব একে একে ফ্রেশ হয়ে নাও। দুটো বাথ রুম আছে। 

একটা বন্দ থাকে। তোমরা এলে ভালই হল। আজ চল সকলে মিলে পুরী যাই। 

টুকাইকে পেয়ে শালু খুব খুশি।

একটা টয়টা ইনো-ভা ভাড়া করে সকলে পুরী বেড়াতে গেল বেলা ১২ টা নাগাদ। ওখানে, “হলিডে রিসোর্ট হোটেলে” জিজু .. দুটো রুম বুক করেছিল। জিজু, দিদি দুজনে ব্যাঙ্কের থেকে এল টি সি পায় তাই ওরা প্রত্যেক বছর কোথাও না কোথাও বেড়াতে যায়। শালিনীকে অনেকবার বলেছে ওরা ওদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য কিন্তু ওত অন্য ধাতের মেয়ে। ওসব বেড়াতে যাওয়া ওর ভালো লাগে না। কিন্তু এবারে মা সঙ্গে তাই মানা করলনা। তাছাড়া এমনিতেই ওর কেমন দম বন্দ লাগছিল। 

পুরী বেড়ানটা ভালই লাগছিল। সমুদ্র, নুলিয়া, জগন্নাথ ঠাকুর দর্শন এর বিশেষ আকর্ষণ। মা মানত করেছেন শালুর বিয়ে হলে পূজো দেবেন। মা সত্যি উতলা হচ্ছেন ওর জন্য। তার-পরদিন শালুর ক্লাস ও সকাল সকাল মাকে নিয়ে ট্রেনে ফিরে আসে ভুবনেশ্বর। দিদিরা ওখানে আরও দুদিন থাকবে। 

অনেক দিন পর মাকে পেয়ে শালু খুব খুশি।

অনেক দিন বাদে মায়ের হাতের রান্না খাবে। সত্যি মা না-থাকলে ওর খুব বাজে লাগে।তাই নিজে বাজার থেকে সব গুছিয়ে কিনে এনেছে। বাজার থেকে ফেরার সময় মা’কে ওর কোয়ার্টারের সামনে ডঃ ভট্টাচার্য র সঙ্গে কথা বলতে দেখে আশ্চর্য হয়। কিছু প্রতিক্রিয়া না দেখিয়েই সারকে “গুড মর্নিং সার বলে উইশ করে”। 

আপনার মা এসেছেন বলেন-নিত মিস সান্যাল!

হ্যাঁ সার, মা আজ আমার সঙ্গে এসেছেন। 

বাঃ এত আনন্দের কথা। আমার কথা বলার লোক এসে-গিয়েছেন। আমার একটু সময় কাটবে। কোন আপত্তি নেইত আপনার! 

মা বলেন, “ওমা সে কি কথা! এত আনন্দের কথা। আমাদের ও সময় কাটবে”। আপনার মা বাবা কি দেশে? 

না মাসিমা ছোট বেলা থেকেই আমি পিতৃ হারা। মা স্কুলের টিচার ছিলেন। তিনি অনেক কষ্টে আমাকে মানুষ করেন। এখন উনি কলকাতায় আছেন মামার বাড়ীতে। 

মাকে নিয়ে আসেন না কেন? 

মায়ের বয়েস হয়েছে তাই উনি ওখানেই থাকতে ভাল বাসেন। 

ও তাই বুঝি। তুমি বাছা একদিন আমার এখানে আমার হাতের রান্না খেও। আমি গুছিয়ে নি তারপর তোমায় খবর দেব কেমন! 

শালিনী ও ঘর-থেকে সব শুনছিল। মায়ের আক্কেল দেখে অর গা রি রি করে উঠলো। একদম সেকেলে। হুট করে সকলকে আপন করে ফেলে। আগু পিছু ভাবে না কি হতে পারে! 

তোমার বিয়ে হয়েছে বাবা? সার লজ্জায় বলেন না মাসিমা হয়নি। আমি পরে আসবো একদিন। এখন জাই। কাল ক্লাসের জন্য পড়াশুনো করতে হবে। 

সার জাওয়ার পর শালু মায়ের ওপর খড়গ হস্ত। কি দরকার তোমার ওনার সঙ্গে এত কথার শুনি? তুমি এখানেও ওই এক কান্ড করবে দেখছি। সকলকে ধরে ধরে জিজ্ঞাসা করবে তার বিয়ে হয়েছে কিনা! কি তুমি মা! কেন বোঝ না এসব বলতে নেই। আমি পারব না তোমাকে বোঝাতে। শালু খুব আস্তে তার মা’কে বিদ্রূপের সঙ্গে বলে, “তা তোমার নতুন জামাইকে কবে খাওয়াচ্ছ শুনি?” 

মা হতবাক হয়ে-জান ওর কথা শুনে। ওই ছেলেটি খুব ভাল শালু। ওর সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছিল তাই বললাম। তুই রাগ করছিস কেন মা? ওত তোদের এখানেই পড়ায়। পাত্র হিসেবে-ত ভালই। 

মা .. মা .. তোমাকে নিয়ে আমার মাথা খারাপ হয়ে জাবে। গর্জে ওঠে শালু। যাকেই দেখবে ওমনি পাত্র হিসেবে তাকে গ্রহণ করবে। আমি কি এতই ফেলনা তোমার কাছে। আমার কোন মতা মত নেওয়ার প্রয়োজন হয় না দেখি তোমার! কি ভাবো মেয়েদের তোমরা! মেয়ে হয়ে জন্মান কি এতই পাপ! 

মা চুপসে জান। জানেন মেয়ের রাগের কথা। 

পরের দিন শালু যথারীতি কলেজে চলে জায়। 

ডঃ ভট্টাচার্য র সঙ্গে দেখা হয়নি কিম্বা কোন কথা হয়নি। ডাইরেক্টারের অফিস থেকে শালিনীর ডাক আসে। সেখানে গিয়ে ও বেঙ্গালুরুর ট্রেনিং এর চিঠি পায় এক মাসের ট্রেনিং আই আই এস সি 

তে .ওখানে প্রফেসার অনুরাগ কুমার, ডাইরেক্টর আছেন। টিকিট সমেত জার্নি এক্সপেন্সেস এবং এক মাসের আগাম মাইনে একটা খামে ভরে অফিসে দিয়ে দেয় শালিনীর হাতে। আর তিন দিন সময় আছে রওনা হওয়ার। 

জিজু, দিদি, টুকাই আজই এসে পৌঁছয়। মাকে ওদের সঙ্গে যেতে হয় কারন এখানে মা একলা থাকা সম্ভব না। শালিনী IIST তে থাকা কালীন ওখানে চেষ্টা করবে কোন জবের জন্য। অয়নের কাছে থাকতে পারবে। অয়ন ও ওর ওপর রাগ করবে না।

অয়নকে ওর মেল আই ডি তে একটা মেল পাঠায় বেঙ্গালুরু যাওয়ার আগের দিন। তাছাড়া ওকে এস এম এস করে স্টেশনে থাকতে বলে। শালিনী যানে, অয়ন কখনই না এসে থাকতে পারবে না। ৩২ ঘণ্টা ট্রেন জার্নির পর ওর খুব টায়ার্ড লাগছিল। স্টেশনে অয়ন আসবে কিনা জানেনা কিন্তু ওর দৃঢ় বিশ্বাস অয়ন আসবেই। সত্যি অয়ন এসেছিল। খুব গম্ভীর দেখাচ্ছিল। অয়নকে দেখে শালু ধাতস্থ হল।ওকে বোঝাতে চেষ্টা করল বিগত ঘটনার জন্য দুঃখিত কিন্তু ও নিরুপায় ছিল। অয়ন ও এক গুঁয়ে ছেলে। ও কিছুতেই ওটাকে সহজ ভাবে নিতে পারলোনা।


কালকে IIST তে জএন করতে হবে। তাই আজ কোথাউ রেস্ট নেবে শালু। Krishinton Suites হোটেল IIST র কাছে। তাই ওখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিল শালিনী।

ও নিজে সব ফর্মালিটির পর নিজের নামে রুম নিলো PAN কার্ড দেখিয়ে। অয়ন বারুণ করলনা কারন ও যানে শালিনী কারুর অনুগ্রহ পছন্দ করে না। দুজনের মধ্যে সেরকম কোন কথা হলনা। 

শালিনী রুমে গিয়ে আগে ফ্রেশ হয় পরে কিছু জলখাবার খায়। এখানে ইডলীর চল বেশি। তাই খেল দুজনে। তারপর সব ঘটনা অয়নকে একে একে বলল। অয়ন শুনে সেরকম খুশি হলনা। কিন্তু অখুশিও হলনা কারন ও সত্যি শালুকে ভালবাসে। শালু কিন্তু বিশাল বিয়ের আয়োজনের পক্ষে নয়। খুব কম লোকের আয়োজনের মধ্যে বিয়ে সারতে চায়। মায়ের ইচ্ছে দিদির বিয়ের মতন ওর বিয়ের ও আয়োজন করবেন এক ই ভাবে কিন্তু সেটা এখন সম্ভব নয়। এসব খর্চা বিলাসিতা মনে করে শালিনী তাই ও অয়নের মতা মত নিলো। 

অয়ন হ্যাঁ না কিছুই বললনা। শুধু বললো, আমি বাবা মায়ের একটাই ছেলে, তাঁদের ইচ্ছার বিরুধ্যে কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। 

শালুর নিজের কেরিয়ার আছে। ও এখন এই সব টাকা নয় ছয় করতে পারবে না সেটাও অয়নকে জানিয়ে দিল। 

দুজনের মধ্যে কেউ ই কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলোনা। যে যার যুক্তিতে অনড়। 

শালু খুব ক্লান্ত ছিল। ও হোটেলে গিয়ে রেষ্ট নিল। অয়ন চলেগেল ওর অফিসে। রাতে মার ফোন এল শালুর কাছে। অয়নের মা এসেছিলে শালুদের বাড়ী বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। ছেলের কথায় ৫০ জন বর যাত্রীতে ওনারা রাজি হলেন কারন ছেলে বলেছে শালুকে ছাড়া আর কাউকে ও বিয়ে করবে না। বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গিয়েছে ১৫ ই বৈশাখ। ভাল দিন আছে। প্রায় এক মাসের ওপর বাকি। এর মধ্যে সব প্রস্তুতি। 

শালু সব শুনল। কিছুই মন্তব্য করলনা। হুঁ হাঁ তে কথা সারল মায়ের সঙ্গে।

এর মধ্যে শালুর ট্রেনিং শেষ হতে চলেছে। 

অয়নের সঙ্গে মাঝে মধ্যে দেখা হয়। ওর কাজের চাপ বেড়েছে। রাতে ফোন করে। শালু এখানে প্রচুর ব্যস্ত থাকে। বাইরে যাওয়ার সময় পায়না। আজকাল অয়ন খুব চুপ চাপ হয়ে গিয়েছে আগের চেয়ে অনেক পাল্টে গিয়েছে এই কদিনে। রবিবার আসে শালুকে নিতে। কেনা কাটা করে। বেঙ্গালুরুর ইস্কনের মন্দীরে যায় দুজনে। যায়গাটা ওদের দুজনের ই ভাল লাগে। শালু মায়ের জন্য চন্দন কাঠ নিয়েছে। দিদির জন্য স্যান্ডেল উড সেন্ট ইত্যাদি। 

এবার ফেরার প্রস্তুতি। ওদের বিয়ের কার্ড ছাপান হয়ে গিয়েছে। আর মাত্র ৭ দিন বাকি। 

শেষ পর্ব পরের সপ্তাহে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

১৩শ পর্ব 

শালিনী মন স্থির করতে পারছেনা বিয়ের ব্যাপারে। অথচ বয়েস থাকতে , বিশেষ করে মায়ের মণ  রাখতে বিয়েটা সেরে ফেলতেই হবে। এত দিন এড়িয়ে চলেছে এখন না করে উপায় নেই। মায়ের বয়েস হচ্ছে। ওনার দিকটাও ভাবা প্রয়োজন।

আজ রবিবার। সারাদিন বিশ্রাম। ঘর গুছতে গুছতে মায়ের কথা ভাবছিল। আজ মায়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলবে সে। সেদিন মা নিশ্চয় খারাপ কিছু ভেবেছেন। ওর ব্যাবহার টা অনেক সময় রুক্ষ হয়েযায়। ও নিজেও বোঝেনা সে কথা। লোকে খারাপ ভাবে। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠলো ....... কে?

আমি ডঃ ভট্টাচার্য।

ও! হ্যাঁ সার .... দরজা খুলে গুড মর্নিং সার। আপনি কষ্ট করে এলেন কেন? আমাকে ডাকলেই আমি চলে যেতাম পার্কে! আসুন আসুন সার বসুন। 

ভেরি গুড মর্নিং। আজ আপনি মর্নিং ওয়াকে যান নি? আসলে  আপনি ঘর দোর কেমন সাজিয়েছেন দেখতে এলাম। আপনার অসুবিধে হবে না ত!

না না অসুবিধের কি আছে সার?  আপনি বসুন আমি চা করে আনি।

ডঃ ভট্টাচার্য শালিনীর ঘর গোছানোর সুখ্যাতি না করে থাকতে পারলেন না ... (শালিনী চা বিস্কুট হাতে ঢ়ুকছিল ঘরে) ... আপনি সুন্দর গুছিয়েছেন ঘরটা। আপনার ‘টেস্ট’ এর  প্রশংসা না করে থাকতে   পারছিনা। 

(চা দিতে দিতে) ... এটা বাড়িয়ে বললেন সার।  কি এমন গুছিয়েছি। কিছুই ত নেই গোছানর মত।  কিছু বই, রবীন্দ্র রচনাবলী, শরৎ রচনাবলী, মাদার টেরেসার ছবি, পরম পুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদা মায়ের যুগল ছবি। এ ছাড়া একটা এলসিডি-টিভি আর পাশে একটা ল্যাপ্ টপ।  পাসের ঘরে একটা  সিঙ্গিল বেডের খাট। ওটা গেস্ট রুম থেকে এনেছে। নতুন খাট এলে ফিরিয়ে দেবে।

চা খেতে খেতে সার চায়ের সুখ্যাতি করলেন। এটা ত বাগানের চা (দার্জিলিং টি)। বাঃ কি ফ্লেভার! একটা কবিতা মনে পড়ছে।

 

সকালের চা

ভরা পেয়ালায় তৃপ্ত মনে শেষ চুমুকেই মহা শূন্যতা

ধূমায়িত উষ্ণ শিহরন ক্ষণে মনের কাটায় বিষণ্ণতা।  

উদ্বুদ্ধ হলাম খানিক ক্ষণে কাটিয়ে দিলাম নীরবতা,

যত আলস্য নেই অবশ্য সকালের এই স্তব্ধতা।

এক পেয়ালা চা অবশ্য পুলক অনুভবের পূর্ণতা,

এর অন্যথা জীবন ব্যর্থ নেই তাতে কোন পূর্ণতা।

বাঃ। খুব সুন্দর। এটা কি আপনার লেখা।

না না। এটা যিনি লিখেছেন তিনি নেপথ্যে থাকেন। মানে থাকতে ভাল বাসেন। 

ও তাই।  হ্যাঁ আমার মামা এনেছেন এই চা। উনি ডুয়ার্ষে চা বাগানের ম্যানেজার। উনি মাঝে মাঝে   নিয়ে আসেন আসার সময়। আমাদের বাড়ীতে তাই ওই দার্জিলিং এর চায়ের চলন। বাবা ওই চা খেতে খুব ভাল বাসতেন ... চুপ করে যায় শালিনী।

কি হল? চুপ করে গেলেন যে!

আপনার কথা শুনব বলে। হেঁসে জবাব দেয় শালিনী ।

আমার কথা! ও না শোনাই ভাল!!  ছোট বেলায় বাবাকে হারাই। মা স্কুলের টিচারই করতেন। অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছি। কঠিন অর্থের অভাবে দিন কাটিয়েছি। টিউশনি করে লেখা পড়া করেছি। ধার দেনা করে এক বোনের বিয়ে দিয়েছি। এখন মা একা। রিটায়ার করেছেন। একাই থাকেন। আমি মাসে একবার যেতে চেষ্টা করি। নানান কাজে হয়ে ওঠে না। ওই ফোনে যা কথা হয়।

শালিনীকে একটু অন্য মনস্ক দেখাচ্ছিল। কি এক চিন্তায় মসগুল মনে হচ্ছিল। হঠাৎ বলে ,হ্যাঁ সার তারপর?

বোনের বিয়ের জন্য নিজের কথা ভাববার সময় পাইনি। 

এই সময় মায়ের ফোন এল। সাইলেন্ট মোডে ছিল তাই আওয়াজ হয়নি।  সরি সার কিছু মনে করবেন না। মায়ের ফোন। একটু কথা বলি!

 হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। আমি আসি তাহলে।

হ্যাঁ সার আপনি আসুন। (আসলে শালিনী এটাই চাইছিল। এর মধ্যে সারের অজান্তে মাকে একটা মিস কল দেয় সাইলেন্ট মোডে , তাই মা কল ব্যাক করেন)। 

ওপার থেকে .... শালু মা তোর শাশুড়ি একা এসেছিলেন।

শাশুড়ি! আকাশ থেকে  পড়ে!! কি বলছ তুমি? আমার আবার  শাশুড়ি??

হবু শাশুড়ি ... মেয়ের আমার সব কথায় খুঁত ধরা! পারিনা!! শোন মা।

বল। তা কি বলেছেন? এখানে তোমার আরেক জামাই আমার পেছনে লেগেছেন। ভাবছি তোমায় নিয়ে আসবো।

কে শুনি? ভাল ছেলে? অয়নের চেয়ে ভাল??

তোমার কি মনে হয় মা! তুমি বড্ড লোভী!!  ভাল ছেলে হলেই অয়নকে ছেড়ে তাকে ধরতে হবে? অয়নকে আমি কথা দিয়েছি মা।  আমি আমার কথার মূল্য হারাতে পারি না।

তা ঠিক বলেছিস মা। হ্যাঁরে ওরা ত কিছুই দাবি দাবা করছে না। ওদের শুধু ১০০ জন বরযাত্রী আসবে। তাদের আদর যত্ন করতে হবে।

ও বাবা! এত দুর কথা গড়িয়েছে! ‘মা’ আমার করিত কর্মা। তা তুমি কি বললে? 

কি আবার বলব। তোর দিদি জামাই বাবু ছিলেন। ওরা দফা করেছেন ৫০ জনের জন্য। আজকালকার বাজারে ১০০ জনের আয়োজন করা চাট্টিখানি কথা! তা ছাড়া আমাদের আত্মীয় স্বজন আছেন না!!

তারপর। এত বিশাল আয়োজন! তা তুমি আমায় ঘাড় ধাক্কা দেওয়ার জন্য আর কি কি আয়োজন করেছ বল-দেখি!! 

তোর সবেতে ঠেস দিয়ে কথা বলা। এই স্বভাব টা ছাড় শালু। শ্বশুর বাড়ী গেলে কি করবি শুনি?

আমি ওখানে যাব বলে কি করে জানলে? আমি আমার কাজের যায়গায় ফিরে আসবো। ওই সব বৌ সেজে আদিখ্যেতা আমার পোষাবে না। রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করে চলে আসবো। ও সব আয়োজন বন্দ কর। আমার সময় নেই টাকাও নেই। তাতে বিয়ে হয় ত হবে নাহলে নাই। টাকার শ্রাধ্য আমি করতে পারবোনা । কে দেবে অত টাকা শুনি? বাবা গত হওয়ার  পর যা টাকা আছে সে তোমার কিছু ভাল মন্দ হলে তখন! কে দেখবে? আমি তোমায় নিয়ে আসবো আমার কাছে। যত সব বুজরুকি ..১০০ জন বরযাত্রী .. মগের মুলুক!! দেশের লোক খেতে পাচ্ছেনা ওদের ১০০ জনের খাওয়ানোর জন্য আয়োজন দরকার। কি সব সেকেলে চিন্তা ধারা।

ঠিক আছে আমি সব শুনলাম। তুমি এখানে আমার কাছে আসার জন্য তৈরি হও। আমি গিয়ে তোমায় নিয়ে আসবো। এখানে একা থাকতে অসুবিধে আছে।

রক্ষে কর মা।  তোমার রাত দিন কট কটানি কে শুনবে?

তবে যে বল আমার জন্য তোমার চিন্তায় ঘুম হয়না!

সেতো হয় না। আমি ‘মা’। তুমি ত ‘মা’ হও নি কি করে বুঝবে মা?

তাহলে তুমি আসবে না! আমার এখানে অসুবিধে হচ্ছে। আমার প্রাইভেসি নষ্ট হচ্ছে।

প্রাইভেসি! কেন কে আবার তোর ‘প্রাইভেসি’ নষ্ট করছে শুনি। 

তুমি চিনবে না। তুমি আসবে কিনা বল? আমি তোমাকে শনিবার আনতে যাব। দু দিনের ছুটি আছে। তা ছাড়া আমার কাছে কিছু দিন থেকেই দেখ না।

ঠিক আছে তাই হবে। শনিবার কখন আসবি?

এখান-থেকে জন শতাব্দী তে যাব। পরের দিন ফিরে আসব। ওখানে ওই ট্রেনটা দেড়টা নাগাদ পৌঁছয়। মানে বাড়ীতে ঢ়ুকতে ৩ টে ত বটেই। গিয়ে ভাত খাব। তোমার হাতের রান্না অনেক দিন খাইনি।

মেয়ের আদিখ্যেতা দেখ! আজ বাদে কাল বিয়ে হলে তোর মা থাকবে? তখন কি করবি শুনি?

হোটেল থেকে আনিয়ে খাব। এখন ত তাই করছি মা। রান্নার সময় কোথায়?

অয়নের ফোন এল বোধ হয় ; এখন রাখি মা। ভাল থেক। ওইসব বিয়ের আয়োজন করতে হবে না। অয়নের সঙ্গে আমি কথা বলব তারপর ও যা বলবে তাই হবে। রাখি।

আচ্ছা। তাই হবে। আমি জানি সবেতেই তোমার খবরদারি। সে ছেলেটাকে তুমি ই বলবে সে কি আমার জানতে বাকি আছে! গোবিন্দের ইচ্ছা মা আমি কে!!

আবার কে কলিং বেল বাজায়? দরজার কাছে গিয়ে আই পিসে দ্যাখে অয়ন সঙ্গে সিকুরিটি !

দরজা খুলে অয়নকে দেখে হচ কচিয়ে যায়  ... ওমা তুমি! কিছু না জানিয়ে এলে যে!!  সিকুরিটির দিকে তাকিয়ে বলে তুমি এস।  উনি আমার পরিচিত।

কেন আমার ত আজ ই  আশার কথা। তুমি যান না? সেদিন ই ত কথা হল। তুমি আমাকে হোটেলে উঠতে বললে। মনে নেই।

ও হ্যাঁ হ্যাঁ!! তা কোন হোটেলে উঠেছ শুনি?

 খুব নামজাদা হোটেল “হটেল মে ফেয়ার লাগুন” ৩ স্টার হোটেল। একটা সুট নিয়েছি ।  আমাকে বসতে বলবে না।  ফ্লাইটে কিছু খাইনি। চল বাইরে খেয়ে আসি।

৩ষ্টার হোটেলে সুট নিয়েছে শুনে শালিনীর মনে খটকা লাগে। কিন্তু কিছু প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বলে ,  “ওমা সেকি? আমি আনিয়ে দিচ্ছি। তবে তোমার ওই হোটেলে আমি জেতে পারবোনা। একদিন ছুটি পাই সেটা বাড়ীতেই থেকে কাটাই। তাছাড়া এখানে আমি কোথায় বেরোই না। খুব প্রয়োজন হলে সিকুরিটি কিম্বা অন্য কাউকে দিয়ে আনিয়ে নি।”

কিন্তু আমি যে তোমার জন্য সুট বুক করলাম।  ঠিক আছে। আমার সময় কম। নেক্সট ফ্লাইট ৫ টায়। এই ক ঘণ্টা একটু তোমার সঙ্গে কাটাব। 

অসভ্যতা-মি করবে না কিন্তু। লক্ষ্মী ছেলের মত যা বলব তাই করবে। এখানে দেওয়ালের ও চোখ কান  আছে। আমি একা মহিলা বুঝতেই পারছ। এখন ও আমাদের বিয়ে হয়নি। 

হ্যাঁ তাই করব। বলে ত দেখ। আগে বাথ রুমে যাব। বাথ রুমটা কোথায়?

শালিনী, অয়ন কে  বাথ রুম দেখিয়ে সিকুরিটির কাছে গেল হোটেল থেকে ওদের দুজনের জন্য খাবার আনাতে।  তারপর মিসেস নায়ারের বাড়ী গিয়ে ওনার সঙ্গে কিছু কথা বলে  কোয়ার্টারে ফিরতে ফিরতে  মিনিট কুড়ি ত্রিশ সময় লেগেছে । কোয়ার্টারে এসে দ্যাখে দরজা হাট করে খোলা। ভেতরে কেউ নেই। অয়নের একটা চিরকুট দ্যাখে কম্পুটার টেবিলে ওপর,  তাতে লেখা- “সরি ডিয়ার আমি এসেছিলাম   তোমার সান্নিধ্য পেতে , তোমার হোটেল থেকে আনান খাবার খেতে নয়। আমাকে তুমি এভাবে অপমান করতে পার না। আমি তোমার জন্য দামি হোটেলের স্যুট বুক করেছিলাম। আমরা দুজনে সময় কাটাব বলে কিন্তু তুমি শুনলে না।  তুমি নিজেকে কি মনে কর? আমি তোমাকে বিয়ে করার জন্য কি এতই পাগল? আমার বাবা মায়ের কাছে আমি অনেক স্নেহ পেয়ে বড় হয়েছি। তোমার আমাকে এতই সন্দেহ যে তুমি আমাকে একা ফেলে চলে গেলে বাইরে! এটা কি ধরনের ভদ্রতা! ফর ইওর ইনফরমেশন আমি আর কোন দিন কোন সম্পর্ক রাখবো না তোমার সঙ্গে। গুডবাই!”

শালিনী থর থর করে কাঁপে চিঠিটা হাতে ধরে। দু চোখ বেয়ে জল বোয়ে যায়। অয়নকে ও সত্যি ভালোবেসে ফেলেছে। এখন তার মূল্য ওকে দিতে হবে। ওর বিষয় ভ্রান্ত ধারনা অয়নের। সেটা ওকে বোঝাতে হবে। কোন পর পুরুষের সঙ্গে হোটেলে সময় কাটান ওর মতন মেয়ের রুচিতে বাধে। কিন্তু কি করে বোঝাবে ও ...!

চলবে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

১২শ পর্ব

ডঃ ভট্টাচার্য কেন শালিনীর প্রতি ঘনিষ্ঠ হতে চাইছিলেন সেটা ওর জানার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই তবুও কেন যেন মনে হল ওনার থেকে আপাতত দূরে  থাকা শ্রেয়। কিন্তু শালিনী যা ভাবছে সেটা নাও হতে পারে। উনি হয়ত নেহাত বন্ধুত্বের খাতিরেই ওর কাছে বন্ধুত্বর হাত বাড়িয়েছিলেন। শালিনীর কি ওইরকম ব্যাবহার করা কি উচিৎ হল! বোধ হয় না। 

ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে। কি সব আজে বাজে চিন্তা তার মাথায় আসছে!

যথারীতি ক্লাসে গিয়ে ক্লাস আরম্ভ করল। সকলকে বারে বারে জিজ্ঞাসা ,“আর ইউ ক্লিয়ার। শ্যাল আই রিপিট এগেন। ডোন্ট হেজিটেট টু টেল মি ইফ ইউ  কান্ট আন্ডারস্তেন্ড। ওকে ” এটা বলা ওর স্কটিশে পড়ানো থেকেই অভ্যাস।   

ক্লাসের পর কমন রুমে যায় লাইব্রেরী থেকে এক গাদা বই নিয়ে। কমন রুমে ঢ়ুকতেই একটা বই পড়েযায় হাত থেকে। খুব অপ্রস্তুত বোধ করে , কারন ডঃ ভট্টাচার্য বইটা নিঃশব্দে তুলে দেন শালুর হাতে।  

 ডঃ ভট্টাচার্য:- আপনি এত রেফারেন্স বই পড়ার সময় পান?

শালিনী:- হ্যাঁ সার। সময় করে নিতে হবেই। আপনারা সিনিয়ার, আপনাদের কথা আলাদা , তাছাড়া আপনি কত ছেলে মেয়েকে তাদের রিসার্চে গাইড করেছেন তারা আপনার আন্ডারে ডক্টরেট করেছে। আমিত নতুন সার। আমি  না পড়লে নিজে বিষয়টার প্রতি ক্লিয়ার কনসেপ্ট না থাকলে ছাত্র ছাত্রীদের পড়াব কি করে? আমার পড়াশুনো বিশেষ প্রয়োজন। তাই ক্লাসের পর কমন রুমে এসে রেফারেন্স বইগুলো পড়েনি। নিজের নোট নিজে তৈরি করি।  

ঠিক বলেছেন। এটা অনেকেই করে না। ছাত্র ছাত্রীকে লাইব্রেরী-থেকে বই  নিয়ে পড়তে বলেন। কিছু রেফারেন্স ও দিয়ে দেন। তবে আমাদের এখানে  সকলে সম্পূর্ণ প্রস্তুতির পর ক্লাসে যান। এটা এখানকার সিস্টেম। আমার দেখে ভাল লাগল আপনি এখানকার সিস্টেম ফলো করছেন। ডার্টস গুড।  কিপ ইট আপ। ইফ  ইউ নিড এনি রেফারেন্স প্লিজ টেল মি। ওকে। আসি তাহলে। 

হ্যাঁ সার। শালুর ঘাম ছুটছিল কথা বলতে বলতে।  তা ছাড়া  সকালের ব্যবহারে ও খুব লজ্জিত কিন্তু সার কিছু মনে করেন নি মনে হচ্ছে। এখানে ও ছাড়া মৌসুমি মিশ্র নামে আরেকজন মহিলা আছেন উনিও নতুন। কিন্তু উনি এখানকার বাসিন্দা তাই ওঁর সঙ্গে প্রায় দেখা হয়না। ওনার ফ্যাকাল্টি আলাদা। 

সারাদিনের ক্লাস সেরে সন্ধ্যাতে ফেরে।  সন্ধ্যার সময় খুব টায়ার্ড থাকে। মা থাকলে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিতেন মুখের সামনে। এই সময় চায়ের বিশেষ প্রয়োজন। মাকে খুব মিস করছে শালু। কিন্তু কিছু করার নেই নিজেকে কষ্ট করতে হবে মা ত চিরদিন থাকবেন না ওর মুখে মুখে জোগাতে। 

মায়ের কথ ভাবতেই মায়ের ফোন। এটা কি টেলিপ্যাথি না কি?  

হ্যালো! হ্যালো!! শালু মা। কেমন আছিস? তোর কোন খবর না পেয়ে ফোন করছি। 

আমি ভাল আছি মা। এখুনি তোমার কথা মনে করছিলাম। তোমাকে আরেকটু পরেই ফোন করতাম। তোমরা কেমন আছ মা? টুকাই , দিদি , জিজু সব কেমন আছে? তোমাদের কথা সব সময় মনে করি মা।  একটা কথা তোমাকে বলি। অয়নের বাবা মা তোমার ওখানে যাবেন। ওরা গেলে সব যানতে পারবে। আমি এখন স্নান সেরে একটু পড়াশুনো করব। এখন রাখি।  

আমার কথা না শুনে , “অমনি রাখি”। তুই কি রে? তোর হৃদয় বলে কি কিছু নেই! আমার কথা কি মনে পড়ে না!!   ওনারা কেন আসবেন বল ত মা?  

হৃদয় আছে মা। তোমার কথা ভাবি। সকলের কথা ভাবি।  আমি কি করে বলব বল ওনারা কেন আসছেন? 

তুই সব জানিস। কি হয়েছে শালু বলনা?

আমার বলতে লজ্জা করে। তুমি সব জানবে। বললাম ত ওনারা আসবেন। আমি রাখি এবার।  

আচ্ছা বাবা আচ্ছা। মেয়ে আমার এতদিন পর কথা বলবে ...তাও  সব পেটে রেখে কথা বলে। কিছু খুলে বলতে পারে না। কি হয়েছে তোর?  

কি আবার হবে? ভালই আছি। আমার ঘুম পাচ্ছে মা।

এই বললি পড়বি আবার এখন ঘুম পাচ্ছে। কি হয়েছে তোর বলত? 

বললাম ত অয়নের মা বলবেন বলে।

কেন তোমার মুখ থেকে শুন-বোনা কেন? 

আমি জানিনা। তুমি বিরক্ত করো নাতো?

ও বুঝেছি! তা ভাল। ঠিক আছে কবে আসবে তারা? 

আমি কি করে বলব এসবের উত্তর। ওই জন্য আমি কিছু বলতে চাইনা তোমাদের। আমি রাখছি মা। ভাল থেকো। নিজের দিকে নজর দিও। আমার কথা ভেবনা। 

না তোমার কথা ভাববোনা! ঠিক আছে খেয়ে ঘুমিয়ে  পড়। ও হ্যাঁ ভাল কথা , অয়ন ফোন করে তোকে? 

হ্যাঁ অয়ন ফোন করে , বারে বারে করে। ফোন ধরলে তোমার মত ছাড়তে চায়না। সব সমান তোমরা। কথাগুলো একটু জোরেই বলল। তারপর ভাবল পাশের ঘরে  লোক শুনলে কি ভাববে? রাখছি মা। ভাল থেক।

চলবে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

১১শ পর্ব 

এখানে বেশ খাটুনি আছে । সকাল ৮টা থেকে ক্লাস । প্রাক্টিকাল ক্লাস । প্রায় সেমিনার, সিম্পোসিয়াম তাছাড়া কুইজ ,আওয়ার্লি, মান্থলি টেস্ট , প্রশ্ন পত্র করা ছাত্র ছাত্রীদের প্রপারলি গাইড করা ইত্যাদি। নিজেকে তৈরি করতে হয় তার জন্য লাইব্রেরিতে রিসার্চ টপিক পড়া । রেফারেন্সের জন্য বিভিন্ন বই পড়ে তবেই ক্লাসে জাওয়া । এখানকার পড়াশুনোর ধরন সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের। স্টুডেন্ট টিচার রেলেসনশিপ কিছুটা পরিবারের মতন। প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রীকে প্রপারলি গাইড করা অধ্যাপক অধ্যাপিকার দায়িত্ব যেটা সচর আচর অন্য সাধারণ শিক্ষানুষ্ঠানে দেখা যায়না । তাই এখানে শুধু থিওরি নয় প্রাক্টিকাল সেমিনার , সিম্পসিয়াম কি করে কন্ডাক্ট করতে হয়  এবং বিষয় সম্বন্ধে সম্পূর্ণ জ্ঞানের বিকাশের মূল বীজমন্ত্র দেওয়া হয় জাতে  এখান-থেকে সর্বোৎকৃষ্ট ছাত্র ছাত্রী পাস করে বেরিয়ে সেই বিষয়ে সম্পুর্ণ জ্ঞান আরোহণ করে  আরও গবেষণা চালিয়ে যেতে পারে ।

শালিনী একদম সময় পায়না । কোনমতে সকালে দুটো পাউরুটির টোষ্ট এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ে । সকাল ৮ টা থেকে প্রাক্টিকাল  বেলা ১.৩০ টায় ক্যান্টিনে লাঞ্চ খায় । বেলা  ২.০০ থেকে আবার ক্লাস । সারাদিন কি করে সময়গুলো চলে যায় বোঝা যায়না । কাউকে বেশি ফোন করতে পারেনা । রাতে যা মায়ের সঙ্গে আর অয়নের সঙ্গে দুটো কথা হয় ।

সারাদিনের খাটা খাটুনিতে রাতের ডিনারের জন্য দুটো রুটি একটু তরকারি আনিয়ে নেয় কাছের হোটেল থেকে । খাওয়ার এক কাপ গরম দুধ খেয়ে সোজা বিছানায় । চোখ বুজলেই গভীর নিদ্রা ।

 সারাদিনের এই ব্যস্তময় জীবন , মানুষকে অন্য কিছু ভাববার সময় দেয়না ।  তাই অয়নের কথা ভাববার অবকাশ নেই। অয়ন কিন্তু রেগে যায় বারে বারে। ও শালিনীকে চাকরি ছাড়তে বলেছে । শালিনীর সাফ কথা ,“আমার ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে অসম্ভব ।” কথাটা শুনে অয়ন চুপসে যায় । কিছু করার নেই । নারী স্বধীনতার যুগে ওর কথা কে শোনে আর শুনবেই-বা কেন !  

শালিনী ডঃ ভট্টাচার্যর কাছে অনেক কৃতজ্ঞ কারন উনি সমস্ত সময় সব বিষয়ে  ওকে গাইড করে যান । সব সেমিনারে ডঃ ভট্টাচার্য শালিনীর পাসেই থাকেন । এই ডঃ ভট্টাচার্য লোকটি খুব অমায়িক । উনি কেন অবিবাহিত জানতে ইচ্ছে করে শালিনীর । কিন্তু কারুর ব্যক্তিগত ব্যাপারে জিগ্যেস করা ওর রুচিতে বাধে ।

একদিন রবিবারে সকালে মর্নিং ওয়াকে শালিনীর সঙ্গে দেখা ডঃ ভট্টাচার্য ।

ডঃ ভট্টাচার্যঃ-  গুড মর্নিং ।

শালিনীঃ-    মর্নিং সার ।

আমাকে সার বলেন কেন ? আমি আপনার কলিগ ।

না তা হয়না সার । আপনি সিনিয়ার । তা ছাড়া আপনি প্রফেসার আমি আপনার ছাত্রীর মতন । আমি অনেক জুনিয়ার । আপনাকে সার না বললে ছাত্র ছাত্রীরা কি শিখবে আমাদের কাছ থেকে !

কিন্তু আমরা বন্ধু ত হতে পারি ।

বন্ধু ! না সার বন্ধু !! ও সব ফেস বুকে চলে প্রাক্টিকাল লাইফে নয় ।

বন্ধুর কোন বয়েস হয়না । আমি আপনার কলিগ্ , বন্ধু হতে আপত্তি কোথায় ?

না আপত্তি নেই তবে সহমতিও নেই ... আমার বন্ধু আছে । আমি এনগেজড    বলে শালিনী একটু এগিয়ে যায় । আমার একটু পার্সোনাল কাজ আছে , আমি আসি সার । নমস্কার ।  বলে এগিয়ে যায় ।

ক্ষিপ্র গতিতে পা চালিয়ে নিজের ঘরে পৌঁছে এক গ্লাস জল খায় । অয়নকে ফোন করে । অয়ন তুমি আমাদের বিয়ের দিন ঠিক কর । আমাদের বিয়ে হওয়া উচিৎ ।

শালুর কথা শুনে অয়ন হচ কচিয়ে যায় । কি হল শালু ? কিছু হয়েছে ?

না কিছু হয়নি! তবে বিয়ে যখন করব বলে স্থির করেছি তখন আর দেরি করে লাভ নেই। তোমার মা বাবা কে বলে দিন স্থির কর আমি আমার মাকে ফোন করে সব বলছি । এই মাসেই কোন দিন ঠিক কর ।

আ-মিকি যাবো শালু ?

না তার দরকার নেই । তুমি এলেই  হ্যাঁলাম করবে হয়ত সকলের সামনেই ... । 

না করব না । প্রমিস্ । আমি নেক্সট ফ্লাইটে যাচ্ছি । কোম্পানির কাজ আছে  কলকাতাতে । এমনি যেতাম । না হয় তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাব । কি বল ?

তোমাকে কিছু বলার উপায় নেই । আমার ছুটি নেই । কি করে তোমার সঙ্গে যাব ? বি প্রাক্টিকাল অয়ন সব বিষয় ছেলে মানুষী করা তোমার স্বভাব ।

আমার তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে । একটু হামি খাব ।

আমি কিন্তু ফোন কেটে দেব ।

না না কেট না প্লিজ ।

তবে ওসব কথা বলছ কেন ?

কি সব কথা ডার্লিং !

জানিনা । তোমরা সব এক গোয়ালের ষাঁড় ।

তোমরা ! মানে !!  আর কেউ জুটেছে বুঝি !!! ওই চশমা পরা লোকটা নিশ্চয় ঘুর ঘুর করছে ? আমি জানতাম ওর মতলব ভালোনা ।

কি জাতা বলছ ! উনি আমার সিনিয়ার প্রফেসার । আমার গাইড । ওনার বিষয় এসব বলতে তোমার লজ্জা করছে না । সকলকে তোমার দাঁড়ি পাল্লায় ওজন করনা অয়ন।

তাহলে আমি তোমার কাছে জাবনা । তুমি আমাকে সব সময় বাজে কথা  শোনাও কিন্তু শালু । আমি সহ্য করি তোমাকে ভালবাসি বলে ।

আমিও তোমাকে অনেক ভালবাসি বলে আজ তোমাকেই সন্মান দিয়ে বলছি বিয়ের প্রস্তুতি কর । আর দেরি করা ভালনয় ।

 শালুর মুখে আজ ভালবাসার কথা শুনে অয়ন স্তব্ধ হয়ে যায় । শালু সত্যি তুমি আমাকে ভালবাস ?

হ্যাঁ ! না বাসার কি আছে ? মেয়েরা একবার ই ভালবাসে মশাই । তোমাকেই ভালবাসি অন্য কাউকে নয় । এটা তুমি জানতে না!

কি করে জানব । মুখ ফুটে বলনি কোন দিন আজ বললে । সর্বদাই কলেজ , রিসার্চ , স্টুডেন্ট এই তোমার মুখে শুনেছি ।  প্রেম , ভালবাসা এসব তোমার মুখে দুর্লভ ।

আমিও মানুষ , আমি অন্যদের থেকে কি করে আলাদা হব বল।

তা ঠিক তবে তুমি বড্ড রুক্ষ । অন্যদের মত নও । আবার অন্য মেয়েদের মত শস্তাও নও যেটা আমাকে সবচেয়ে  বেশি আকৃষ্ট করে তোমার প্রতি।

তাই ! যানতাম-না । যেনে খুশি হলাম ।

আমিও যেনে খুশি হলাম তুমি আমাকে ভালোবাসো বলে ।

তবে তোমার মা বাবাকে বল প্রস্তাব নিয়ে যেতে আমাদের বাড়ী ।

বলে দেখব । বাবা কি রাজি হবেন ? মাকে আমি রাজি করিয়ে নেব ।

শালু একটা মিষ্টি হামি দেবে ?

‘দিলাম’ বলে ফোন  ছেড়ে দেয় শালু । লজ্জায় মুখ লালা হয়ে যায় তার । একি ছেলে মানুষী করছে সে !  এটা ছাত্র ছাত্রীরা করে থাকে । না: এবার সংযত হতে হবে তাকে ।

চলবে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

১০ম পর্ব 

এখানে শালিনী ভালোই আছে । সকাল ৯ টা থেকে ক্লাস । গেস্ট হাউস থেকেই ক্লাস করছে । নিজের পড়াশুনোর জন্য লাইব্রেরী তে বইয়ের অভাব নেই । রেফারেন্স বইগুল লাইব্রেরিয়ানের কাছথেকে একে একে নিচ্ছিল । কার্ডে ৬ টা বই পায় তাই সেগুল বেছে নিতে নিতে হঠাৎ ডঃ ভট্টাচার্য র সঙ্গে দেখা।

গুড মর্নিং ।  কেমন লাগছে আমাদের ইন্সটিটিউট ?

ভেরি গুড মর্নিং সার । হ্যাঁ ভালোই লাগছে । আমি এইরকম পরিবেশ ই খুঁজছিলাম । আপনাদের ল্যাব দারুণ। আমার খুব ভালো লাগছে এখানে ।

কোন অসুবিধে হলে বলবেন। এখানকার  একটা প্লাস পয়েন্ট কি জানেন এখানে ছেলে মেয়েরা ওয়েল ডিসিপ্লিন্ড তারা নিজের পড়াশুনো আর কেরিয়ারের কথাই শুধু ভাবে ; অন্যদিকে মন দেওয়ার সময় পায়না   । আসলে সকলেই ভাল মেরিটের ছেলে মেয়ে তাই ওদের পড়াতে অসুবিধে হয় না। আপনি কি বলেন?

হ্যাঁ নিশ্চই । স্টুডেন্ট লাইফে ডিসিপ্লিনটা র গুরুত্ব অনেক । যারা সেটা মেনে চলে তাদের জীবনে উন্নতির সোপান আপনা হতে আসে । ঠিক এস্কেলেটরের মতন তর তর করে এগিয়ে যাবে কোন বাধা থাকবেনা।

ঠিক বলেছেন । আমি একটু আসছি পরে দেখা হবে কেমন !

হ্যাঁ সার ।

আজ শালিনীর কোয়ার্টার এলটমেন্ট এর চিঠি আসে । খুব সুন্দর ছিম ছাম পরিবেশের মধ্যে কোয়ার্টার গুলো । ওর স্কেল অনুযায়ী  কোয়ার্টার এলট করা হয়েছে । ‘বি’ ব্লকের সেকেন্ড ফ্লোরে ‘ডি-৫’  । সামনে ফুলের  বাগান । ছোট্ট লন আছে । বিকেলে অনেকেই ওখানে সময় কাটান। ‘বি’ ব্লকে প্রায় সবাই ব্যাচেলার । একজন ম্যারেড এখানকার একাউন্টস অফিসার । উনি সদ্য বিয়ে করেছেন। ভদ্রলোক সাউথ ইন্ডিয়ান মনে হচ্ছে । আলাপ হয় নি । কাল রবিবার কোয়ার্টারে শিফট করবে । আজ দেখে-গেল । অফিস থেকে চাবি আর রেজিস্টার নিয়ে একজন কেরানী এসে শালিনীকে চাবি দিয়ে সই করিয়ে নিয়ে গেল ।

সারাদিনের ক্লাসের পর টুকি টাকি জিনিষ কিনতে কাছেই মার্কেটে যায় বিকেলে । সব প্রয়োজনীয় জিনিষ একে একে গুছিয় কিনে একটা অটো নিয়ে ফেরে । এখানকার রাস্তাগুলো খুব পরিষ্কার , কলকাতার মতন খানা ডোবায় ভর্তি রাস্তা নয় এখানে । এখন ও কোথাও যাওয়া হয়নি । মাইনে পেলে মা বলেছেন লিঙ্গরাজ  মহাপ্রভুর মন্দিরে গিয়ে পূজো দিতে । 

  

শালিনী  রবিবার সকালে ১৫ মিনিট ধ্যানে বসে । মেডিটেশন বা ধ্যান একটি বিশেষ ধরনের একাগ্রতা  যাদ্বারা যে কোন  কাজ খুব সহজেই করা যায় । মানুষের মনকে স্থির করতে সাহায্য করে । প্রত্যেক মানুষের দিনে ১৫ – ২০ মিনিট মেডিটেশন করা প্রয়োজন । ও এটা বহুদিন ধরে চালিয়ে আসছে । 

শালিনী তার প্রথম ক্লাসে ছাত্র ছাত্রীদের উদ্দেশে পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে কিছু তথ্য এবং এই বিষয় পাঠের আবশ্যকতা সম্পর্কে বক্তব্য রাখে । ছাত্র ছাত্রীরা ওর লেকচার মন দিয়ে শোনে । ওর  অধ্যাপনা এবং গবেষণার অভিজ্ঞতার কিছু বিষয় বস্তুর কথা ছাত্র ছাত্রীদের  সামনে তুলে ধরে ,  তাদের  বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য । সব  ছেলে মেয়েরা ধৈর্য নিয়ে সম্পূর্ণ লেকচার শোনে । এটা যেহেতু ইন্ট্রোডাক্টারি লেকচার সেটাকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপনা করতে পেরেছে বলে শালিনী মনে করে কারন সব ছাত্র ছাত্রীরা এক স্বরে ওর কথাগুলোর গুরুত্ব এবং আবশ্যকতা উপলব্ধি করে ওকে ধন্যবাদ দেয় ক্লাসের শেষে । এটাই ওর কাছে চরম পাওনা শিক্ষিকা হিসেবে। প্রথম ক্লাসের অভিজ্ঞতার কথা অয়ন কে রাতে ফোনে বলে । যদিও অয়ন এ বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দেয়না। তা এই কথোপকথন থেকে স্পষ্ট  ।

শালিনী: আজ আমি ক্লাসে ছাত্র ছাত্রীদের কাছথেকে খুব ভালো রেসপন্স পেয়েছি । আমি আজ খুব স্যাটিস্ফায়েড ।

অয়নঃ তুমি ত ভালো টিচার ।আগেও পড়িয়েছ স্কটিশে । রিসার্চ ও করেছ ।এ আর বেশি কি কথা !

না অয়ন এখানে পড়ানোর আলাদা মর্যাদা আছে সেটা তুমি বুঝবেনা ।

তা হয়তো ঠিক । তবে ...!

তবে !! তবে কি ?

না মানে আমি বেঙ্গালুরুথেকে বদলি হতে পারবোনা । কারন আমার বর্তমান কোম্পানি র প্যাকেজ ভালো এবং এখানে আমার ফিউচার যথেষ্ট ভাল ।

আমি ত তোমায় তা বলিনি । তুমি তোমার কাজে থাক আমি আমার কাজে থাকি ।

শালু সেটাতে কি আমাদের বিবাহিত জীবন সুখীর হবে ? তুমি বল !

কিন্তু অয়ন আমি এই কাজে এত মসগুল এবং সন্তুষ্ট তোমাকে ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারছিনা ।

এত ছাত্র ছাত্রী পড়াও তাদের বোঝাতে পার কিন্তু আমার বেলায় তোমার সব অভিজ্ঞতা চুপসে যায় । কি হয় তোমার বলত ?

ওরা ছাত্র ওদের কথা আলাদা । তুমি কি আমার ছাত্র হতে চাও ?

এবার বোধ হয় তাই হতে হবে । তাতে তোমার সান্নিধ্য পাব তোমার সঙ্গে এক বিছানায়...!

ও ছাড়া কি আর কিছু চিন্তা কর না তুমি ?

কি ছাড়া ?

আমি জানিনা যাঃ তুমি খুব ...!  

আমি কি ?

বলবনা ।

তবে রাখি !

না না প্লিজ রেখোনা । আমি এই সময় টুকু পাই তোমার সঙ্গে কথা বলার । একটু কথা বলনা ।

সুধু কথায় কি হবে ? কিছু কাজে কর । এক কাজ কর তুমি কম্প্যুটারে এস স্কাই-পিতে । আস্তে পারবে ?

না আমার স্কাই পি একাউন্ট নেই ।

খুলে নাও । এখন রিসেন্ট ভার্সন আছে । চ্যাট করবো তোমার সঙ্গে । তোমায় একটু দেখতে পাব অন্তত বল ।

দেখে কি করবে ?

এসেই দেখ্বেঃ-

কাল চেষ্টা করবো । বাই ।

শালিনী যানে অয়ন অধৈর্য হচ্ছে ওকে পাওয়ার জন্য । সেটাই স্বাভাবিক ছেলেদের ক্ষেত্রে । শুধু ছেলেরা কেন মেয়েদের ক্ষেত্রেও ওটাই স্বাভাবিক কিন্তু ও কেন আলাদা ও নিজেই জানেনা ।

রাতে খাওয়ার পর বিছানায় গিয়ে সারাদিনের ক্লান্তিটা আরামে কাটাতে চাইল ।  অয়নের ফোন দেখে  আশ্চর্য  না হয়ে পারলোনা ।

হ্যালো ! এখন শুতে যাওনি ?

না ঘুম পাচ্ছেনা । তোমার মুখটা মনে পড়ছে ।

তুমি ছুটি নিয়ে চলে এস ।

কি বলছ তুমি ? তোমার মাথাটি খারাপ হয়েছে ?

হ্যাঁ তাই হয়েছে । আমার তোমাকে চাই ।

কিন্তু বিয়ের আগে সেটা সম্ভব না । তা ছাড়া আমার নতুন চাকরিতে কে আমায় ছুটি দেবে ?

আমি কিছু জানিনা । আমার কথা তোমাকে শুনতে হবে ।

তাই ! যদি না শুনি !!

হ্যাঁ তাই ।

আচ্ছা বাবা আচ্ছা । আমার একটা বেগালুরুতে ট্রেনিং আছে এক মাসের । সেটা বোধ হয় পরের মাসের ১০ তারিখ নাগাদ । এখন কিছু ঠিক হয়নি । তবে যেতেই হবে।

তা ১০ তারিখ অব্ধি আমি কি করব ?

আঙ্গুল চোষ ।  কথাগুলো বলে ফোন কেটে দেয় ।

চলবে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

৯ম পর্ব

অয়নের সকালটা কেমন যাবে জানেনা। সকাল সকাল মেঘলা আকাশ। আকাশ ভারাক্রান্ত। ঘন মেঘে আচ্ছন্ন। শ্রাবণের বর্ষণমুখর দিনে, মনে মনে কবিতা রচনা করার প্রবল চেষ্টা। কলম  নিয়ে বসে পড়ে। নিজের ডাইরিতে লিখতে থাকে: 

শ্রাবণ ধারা

আজি শ্রাবণ ধারায় বসিয়া আছি তোমার পথ চাহিয়া

তুমি আসিবে বলিয়া মন আমার ওঠে গান গাহিয়া।

একি অবিশ্রান্ত ধারা চিত্তে জাগায় পুলক আমায় 

বর্যণ মুখর দিবসে বসিয়া আমার ই আঙ্গিনায়।।

একি ক্লান্ত বিষম দিবস রজনী যায় যে বোহিয়া

নাহি মানে কভু কোন বাধা কোন বাঁধনের হিয়া।

আঁকি তোমারি চিত্র নিত্য আমার মানস পটে

উত্থাল যৌবনের উন্মত্তো হৃদয় প্রেক্ষাপটে

নাহি কভু ভুলি জাতনা বিরহের বহ্নি শ্রোতে।

একি ঘন মেঘের আচ্ছাদনে আঁধার রাতে

গুনি মুহুর্ত প্রহরগুলি যায় অনিদ্রার রাতে।।

তুমি আসিবে বলিয়া মন আমার ওঠে গান গাহিয়া।

আজি শ্রাবন ধারায় বসিয়া আছি তোমার পথ চাহিয়া।।

 

অয়ন কাল ফিরে যাবে বেঙ্গালুরু। বাবা মাকে শালিনীর কথা বলেছে।

ওনারা কিছু উত্তর দেন নি।

মা বলেছেন তোমার যেখানে পছন্দ সেখানেই আমরা তোমার বিয়ের ঠিক করবো। তবে ওই মেয়ে খুব অহংকারী। ওইখানেই কি তুমি মন স্থির করেছ?

হ্যাঁ মা। ও একটু জেদি কিন্তু আজকাল ওর মত মেয়ে তোমরা খুঁজলে পাবে না। 

 

কেন পাবো না!

না মা পাবে না।

আমি বলে রাখছি,  ও যা  করেছে সেটার জন্য আমি দায়ি।

আসলে আমি ওকে বুঝতে ভুল করি। ও যে অন্য মেয়েদের চেয়ে আলাদা সেটা আমার বোঝা উচিত ছিল।

 

শালিনীকে খুব খুশি খুশি লাগছিল।  হঠাৎ শালিনীর মুখেও রবীন্দ্র সঙ্গীতের এক গানের কলি ঃ-   

আজি ঝর ঝর শ্রাবণ দিনে 

জানিনে জানিনে কিছুতে কিছু যে মন মানে না

ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে ...।

পরে সুরু করে তার প্রিয় রবীন্দ্র সঙ্গীত,  শ্রাবন্তি র কণ্ঠেঃ

শাও্বন গগনে ঘোর ঘনঘটা

       নিশীথ যামিনী রে ...।

কুঞ্জপথে সখি,  কৈসে যাওব

       অবলা কামিনী রে ...।।

মায়ের ডাকে শালিনীর গান থামে। স্নান সেরে খেয়ে নে। কাল জাওয়া। আবার ওই অচেনা অজানা জায়গা। 

তোমার কোন চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। আমি ত একাই সব জায়গায় যাই।  এবারে  আমাকে  অয়ন ভুবনেশ্বরে ছেড়ে নেক্সট ফ্লাইটে বেঙ্গালুরু ফিরে যাবে। এর আগের বার ত আমি একা গিয়েছিলাম বেঙ্গালুরু তখন কোন অসুবিধে হয়েছিল  কি?

তা হয়নি। তা তোমরা যা ভাল বোঝ তাই কর। আমি আর কদিন মা! তোমার বিয়েটা ভালয় ভালয় হলে বাঁচি।

হ্যাঁ মা তা আর বলতে! তোমার গলা থেকে মাছের কাঁটা নামবে!! তাই না?

ওই আরম্ভ হল। একটু যদি মায়ের মনটা বুঝতিস শালু। উনি আমাকে একলা ফেলে চলে গেলেন এই জঞ্জালে আমি ছট পট করছি। ঠাকুর জানেন সে কথা। মা রান্না ঘরে চলে যান।

শালিনী নিজের ঘরে ওর  জিনিষগুলো ভাল ভাবে চেক করে নেয়। দুটো ট্রলি ব্যাগ,  কিছু বই একটা মেকআপ বক্স (অয়ন ওকে প্রে-সেন্ট করেছিল) আর অন্য টুকি টাকি জিনিস। বাকি যদি কিছু সেরকম প্রয়োজন হয় তবে সেগুল ওখানেই কিনে নেবে। ফ্লাইটে কম লাগেজ ভাল এখন ত ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে ২৫ কেজির বেশি নিতে দেয়না।  এক্সট্রা লাগেজের জন্য $ 100  চার্জ করে। তবু ডোমেস্টিক ফ্লাইটে অতটা রেস্ট্রিক্সন নেই।  কাল সন্ধ্যা ৭ টার  ফ্লাইট। সন্ধ্যা ৫ টায় চেক ইন। সিকুরিটি চেকের পর সন্ধ্যায়  INDIGO র ফ্লাইট  No  6E447 CCA to BBA Dep. Time 19.05 hrs।  অয়ন বিকেল ৫ টার  সময় নেতাজী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ডোমেস্টিক টার্মিনালের কাছে আমার জন্য অপেক্ষা করবে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে।

মা দক্ষিণেশ্বরের কালী ঠাকুরের ফুল দিয়ে মাথায় আশীর্বাদ করে শালিনীকে রওনা করেন ওর মা ।  শালিনী বিকেল ৪.৩০ টের সময় ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে মা দুর্গা দুর্গা বলে।      

 

নেতাজী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট :

সন্ধ্যা ৫ টায় চেক ইন। সিক্যুরিটি চেকের পর ১৯টা ০৫ এ  ইন্ডিগো র ফ্লাইট। অয়ন বিকেল ৫ টার  সময় নেতাজী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ডোমেস্টিক টার্মিনালে  আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।  

এয়ারপোর্টে পৌঁছেই অয়নকে দেখে ধাতস্থ হয়। অয়ন ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এর কাছেই ছিল। শালিনীকে দেখে কাছে চলে আসে। লাগেজ গুল সঙ্গে নিয়ে অয়ন ওয়েটিং লাউঞ্জে চলে যায়। দুজনে এই-প্রথম এক সঙ্গে ফ্লাইটে যাত্রা করবে তাও মাত্র এক ঘণ্টার। সিকুরিটি চেকের পর কন-ভয়রে লাগেজ চলে যায়। ইন্ডিগোর ফ্লাইট নাম্বার 6E447 Dep. Time 19.05 hrs. From CCA to BBI মানে কলকাতা থেকে ভুবনেশ্বর। ভুবনেশ্বরে ১৯।৫৫ অর্থাৎ  ৮ টায় পৌঁছবে। Indigo Airlines এর বাস যাত্রীদের নিয়ে প্লেনের কাছে পৌঁছে দেয়। দুজনে পাশা পাশী উইন্ডোর পাসের দুটো সিটে বসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্লেন টেক অফ করে। উইন্ডোর সার্সি দিয়ে বঙ্গপ সাগরের দৃশ্য। নিচে সুন্দর বনের কিছুটা দৃশ্য দেখা জায়। আকাশ পরিষ্কার তাই দেখতে অসুবিধে নেই। এর পর খণ্ড খণ্ড মেঘের মধ্যে দিয়ে প্লেন এগিয়ে চলে নিচে নীল জল রাশি। সব মিলিয়ে মনোরম দৃশ্য।

অয়নঃ-  কফি খাবে শালু।

শালিনীঃ- না ওই হাড় মাগ্যি কফি খাওয়ার আমার কোন ইচ্ছে নেই।

এই ফ্লাইটে কিছু কমপ্লিমেন্টরই নেই। কিং ফিশারে তাও কিছু স্ন্যাক্স দিত।

কিছুক্ষণের মধ্যেই  ভুবনেশ্বর এসে-গেল। ধউলি শান্তি স্তূপ দেখা গেল। আকাশ থেকে ভুবনেশ্বরের এরিয়াল সার্ভে করে-ফেললাম দুজনে। ওটা লিঙ্গরাজ মন্দির বোধ হয়। বেশ সহর ভুবনেশ্বর।


বিজু পট্টনায়ক ইন্টারন্যাশনাল এয়ার পোর্টঃ

ছোট এয়ারপোর্ট হলেও বেশ সুন্দর ভুবনেশ্বর এয়ারপোর্ট। রাতের আলো ঝলমলে শহর। রাস্তা সুন্দর পরিষ্কার। এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেক আউটের পর অয়নকে সঙ্গে নিয়ে কারে উঠি। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করি,  কত সময় লাগবে,  ওখানে কাছে হোটেল আছে কিনা,  ইন্সটিট্যুটে থাকার ব্যবস্থা আছে কিনা ইত্যাদি। ড্রাইভারের কাছে শুনি  গেস্ট রুম আছে এবং ক্যান্টিনে বলা আছে আমাদের জন্য রাতের ডিনার এর জন্য।  আমরা শুনে ধাতস্থ হই। আমাদের দুজনকে NISER Institute থেকে কার রিসিভ করে নিয়ে যায়।  এয়ারপোর্ট থেকে সোজা রাস্তা সচিবালয় মার্গ ধরে ডানদিকে ঘুরে আবার সৈনিক স্কুল পেরিয়ে আবার ডান দিকে ঘুরলেই একটু পরে  National Institute of Science Education and Research,  Bhubaneswar.

 

খুব সুন্দর ইন্সটিট্যুট। ছিম ছাম পরিষ্কার ক্যাম্পাস। আমাদের দুজনকেই রিসিভ করার জন্য ডঃ জয়দীপ ভট্টাচার্য,  রিডার আসেন। অমায়িক ভদ্রলোক।  উনি  Jawaharlal Neheru Centre for Advance Scientific Research, Bangalore থেকে Ph.D করেছেন শুনে শালিনী খুব আগ্রহের সঙ্গে ওনার সঙ্গে বাক্যালাপে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এখানকার পরিবেশ এবং রিসার্চের স্কোপ অনেক বলে উনি বলেন। শালিনী  ওনার সঙ্গে কথা বলতে এতই মসগুল ছিল যে অয়নের কথা একদম  ভুলে যায়। পরের দিন বিকেল বেলা ৫ টায় অয়নের  Indigo  Airlines  এর 6E265 ফ্লাইট বেঙ্গালুরু যাওয়ার।  19.05 এ ছাড়বে রাত 22.20 পৌঁছবে।

 

অয়ন শালিনী এবং ডঃ ভট্টাচার্য র কথার মধ্যে শালিনীর উদ্দেশ্যে বলে শালিনী তাহলে আমি যাই!   

ও মা সেকি? আপনার ত এখানেই থাকার ব্যবস্থা আছে। বাই দি বাই আমি জয়দীপ ভট্টাচার্য এখানে ছোট খাট একটা  পোষ্টে  আছি।

শালিনী খুব অপরাধী মনে করে নিজেকে। অয়নের দিকে তাকিয়ে বলে সরি অয়ন আমার পরিচয় করান উচিত ছিল। আসলে...।

আসলে তুমি এখানে এসে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছ। হ্যাঁ ডঃ ভট্টাচার্য আমি ‘অয়ন’। বাকিটা শালিনীর কাছ থেকে জেনে নেবেন। আমার তাড়া আছে। বাই! বলে গট গট করে নিজের লাগেজ নিয়ে চলে জায়।

 

শালিনী এই পরিস্থিতি কি করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা। অয়ন! অয়ন!! দাঁড়াও লক্ষ্মীটি,  আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। 

অয়ন পিছু ফেরে না। এগিয়ে চলে। সে খুব অপমানিত বোধ করেছে। হবু বৌয়ের কাছথেকে এরকম উদাসীনতা আশা করেনি।

ক্রমশ

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

৮ম পর্ব

সকালে ঘুম থেকে উঠেই

অয়নের ফোন ।

সুপ্রভাত শালু ।

সুপ্রভাত । এমন ভাব দেখাচ্ছ যেন আমাকে অনেক দিন দেখনি !

সকাল সকাল আমাকে বকছ । 

তা কেন ! তবে এইতো মাত্র কয়েক ঘণ্টা কেটেছে ! সকাল সকাল ফোন করলে মা কি ভাববেন বলত ?

কি আবার ভাববেন ? আমাদের বিয়ে হবে তার আগে একটু ঘুর-বোনা ! আজ কোথায় যাবে বল ?

না আজ আমি কোথাও যাবো না ।

কেন ?

আমার কাজ আছে । দেখ অয়ন তুমি আমাকে ভালো করে যান আমি অহেতুক অকারণে কোথাও বেরুতে ভালো বাসিনা । আমার অন্য কাজ আছে ।

ওকে বাবা । টেক ইট ইজি ।

নো আই কান্ট টেক ইট ইজি । এইখানেই তোমার আমার মধ্যে পার্থক্য !

মানে?

মানে সিম্পল ...।

শালিনী যানে কথাগুলো অয়নের ভাল লাগবে না তাও ও বলতে বাধ্য হয়, “আজ  আমার বাবার মৃত্যু দিবস। আজ আমি একা থাকতে চাই অয়ন । আমাকে একা থাকতে দাও !”  

অয়ন বোঝে শালিনীর মনের অবস্থা । তাই আর কথা বাড়ায়না । “ও আচ্ছা আমি দুঃখিত । আমি জানতাম না । তুমি তোমার মত থাক ।  বলে ফোন কেটে দেয়”  

শালিনীর চোখের জল যেন শ্রাবণের ধারার মত অবিশ্রান্ত বয়ে যায় । কিছুতেই ভুলতে পারেনা বাবার সেই অকাল মৃত্যুর  দিনের কথা ।

একাকীত্বর মধ্যে  বাবার কথাগুলো মনে পড়ে ,“ মৃত্যু , ধ্রুব সত্য কিন্তু তাকে কেউ সহজ ভাবে নিতে পারেনা মা । আজ আমি রোগ শয্যায় পড়ে আছি কাল হয়তো থাকবোনা । তখন তোরা আমার ছবি টাঙিয়ে ফুলের মালা দিয়ে তিনটে ধুপ জ্বালিয়ে আমাকে স্মরণ করবি কিন্তু আমি নিজেও জানি না তোদের ডাক আমার কাছে পৌঁছবে কি না ! খুব আশ্চর্য লাগে আমার !”

বাবা তুমি কেন  এরকম বাজে কথা বলে আমাদের মনে দুঃখ দিচ্ছ ? আমাদের মনে কষ্ট হয় না তোমার এই কথা শুনলে ? তুমি কি চাও আমরা কষ্ট পাই?  

নারে মা । আমি চাইনা তোরা কষ্ট পাস ।  নিয়তির কাছে সকলেই বাঁধা । কি করি বল ? পেটের ব্যথাটা বেড়েছে । আমি বুঝতে পারছি আর বেশি দিন নয় ।

সেই দিন বেল ভিউ নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয় বাবাকে ।  অর্কদা , আমরা সকলে শত চেষ্টা করেও বাবাকে বাঁচাতে পারিনা । ডাক্তার চক্রবর্তী অপারেশনের পর  বাবাকে দুদিন লাইফ সাপোর্টে রাখার পর বলেন পেসেন্ট কোমায় আছে । অবস্থা ক্রিটিকাল বাঁচানো সম্ভব নয় । আমাদের তখন টাকা জলের মত খর্চা হচ্ছে । মা রাত দিন ঠাকুরকে ডাকছেন আর চোখের জলে ভাসিয়ে দিচ্ছেন । তবুও ঠাকুর শুনলেন না মায়ের ডাক । শেষে বাবা রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জুলাই ২ তারিখে । সারাজীবন আমার মনে থাকবে সেই  দিনটার কথা  । আমার চরম দুঃখের দিন সেই দিনটা ।  আমি ওই দিন একা থাকি ।

পরের দিন ঃ-  

জুলাই তিন তারিখে NISER এ জয়েন করার জন্য চিঠি আসে । শালিনী হার্ড কপি সফট কপি দুটোই পেয়ে অয়নকে জানায় । জুলাই ৭ তারিখে জয়েনিং ডেট ।

অয়ন বলে তুমি যা ভালো বোঝ তাই কর । তোমার কেরিয়ারের ব্যাপারে আমি হস্তক্ষেপ করার কে?

তা নয় তবুও তোমাকে জানালাম ।

Advertisement for : Faculty Position in National Institute of Science Education and Research for  “Assiistant Professor, Physics , NISER Bhubaneswar, Odisha, India. Pay Band 3 15600 to 39100 INR Grade Pay 7600. Free Quarter within Institute Campus. 

এই বিজ্ঞাপনের অপেক্ষায় আমি ছিলাম । আমার গাইড আমাকে বলেছিলেন ওই বিজ্ঞাপন বেরুবে বলে ।  আমি এক মাস আগে বেঙ্গালুরু জাওয়ার আগে ইন্টার্ভিউ দিয়েছিলাম । ওটার জন্যই বেঙ্গালুরু জাই পোষ্ট ডক্টরাল রিসার্চের জন্য। ৬ মাস ওখানে কাজ করি। ওই কাজের সুবাদেই  আজ এই এপএন্টমেন্ট লেটার পাই ।  

আমার স্বপ্ন অয়ন। ওই Institute এ কাজ করার সুযোগ পাব চিন্তা করতে পারিনি । আমি আজ খুব খুশি । আমি জানিনা তুমি কতটা খুশি !  

চলবে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

৭ম পর্ব 

অয়নকে নিয়ে শালিনী ওর নিজের ঘরে বসে। খুব ই অন্তরঙ্গ বন্ধু ওরা দুজনে মনে হচ্ছিল। একে অপরকে নাহলে চলবেনা মনে হচ্ছিল। হাঁসি ঠাট্টার মধ্যে সময় কেটে যাচ্ছিল। মা এতদিনে নিশ্চিন্ত। বোধহয় লোকনাথ বাবার পূজাটা আজই দেবেন। কাল মঙ্গল বার হয়তো কাল-ই দক্ষিণেশ্বরে পূজা দিতে যাবেন।

শালিনীঃ- তুমি বিয়ের পর আমাকে নিজের স্বাধীন মত কাজ করতে দেবে?

অয়নঃ- কেন তুমি কি পরাধীন দেশের নাগরিক নাকি যে আমায় এই কথা বলছ!

বাঃ যাচাই করবোনা। পরে আমাকে যদি বাধা দাও। মুচকি হাঁসে শালিনী।

কি হবে না হবে সে সিচুএসন অনুযায়ী ঠিক হবে। তবে তোমার ব্যক্তি স্বাধীনতায় আমি কে হস্তক্ষেপ করার!

ঠিক আছে আমি কিন্তু রিসার্চ চালিয়ে যাবো। চাকরি পেলে তাও করবো।

আজকাল এসব কেউ বলেনা শালু।

শালু! গ্রেট!! আবার বল। ভাগ্যিস শালি বলে বসেনি!!

কেন খারাপ লাগছে শুনতে?

না না। আমার মা ওই নামে ডাকে আমায়। তুমি ত আমার মায়ের দলে তাই ডাকতে পার। ও কে। ইটস ওকে।

আমাকে একটা গুড নাইট কিস্ দেবে?

আবার বাজে কথা!

দাও না।

শালু উঠে পালাতে যাবে, অয়ন হাত ধরে নিজের দিকে টেনে আনে।

কি হচ্ছে মা দেখলে কি ভাববেন। উম উম.... না ছাড়ো।

খুব অসভ্য তুমি। কলেজে ত এরকম ছিলে না।

অয়ন ঘোরে ছিল শালুর সান্নিধ্য তাকে মাতাল করেছে। একটা গান মনে পড়ে গেল ঃ

চাঁদ তুমি কেন এতো সুন্দর হলে:

চাঁদ তুমি কেন এতো সুন্দর হলে

তোমায় দেখে আমি মনের জানলা খুলে

পূর্ণিমাতে তুমি জেন অপরূপ লাগো

আমার প্রেয়সী বলে তুমি ভাল লাগো...(১)

একমুঠো আকাশে ভরা জ্যোৎস্না দিলে

অবাক হয়ে দেখি তোমায় সব ভুলে

রাত্রির অন্ধকার যেন যাতনা ভরা

ভুলে আছি আমি দেখে জোছনা ভরা...(২)

তারা ভরা আকাশে মেঘ ছিল বেশ

আমার কথাটা-তো হয়নিক শেষ

চাঁদের আলো এলো আমার দ্বারে

মনের জানালা খুলে এলো মোর ঘরে...(৩)

চাঁদ তুমি কেন এতো সুন্দর হলে

তোমায় দেখে আমি মনের জানলা খুলে

পূর্ণিমাতে তুমি জেন অপরূপ লাগো

আমার প্রেয়সী বলে তুমি ভাল লাগো...

 

শালিনী গান শুনছিল। খুব সুন্দর গানটা।

রাত অনেক হল শালু, ডাইনিং টেবিলে তোরা চলে আয় মা।

অয়ন অপ্রস্তুত হয়ে বলে, ‘আজ আসি’। বাকিটা কাল পাওনা রইলো, কেমন!

এই বলে উঠে পড়ে।

শালু অয়নকে দোর অব্ধি এগিয়ে দিল সঙ্গে মা। মা বলেন তুমি রাতের ডিনারটা এখানে সেরে জেতে বাবা!

না মাসিমা আবার একদিন আসবো। আজ অনেক খেয়েছি শালুর দিকে তাকিয়ে বলল।

আচ্ছা এসো বাবা। সাবধানে যেও কেমন।

আচ্ছা। আসি তবে।

এসো।

শালিনীর আজ দিনটা অন্য রকম কাটল। এরকম ওর কোনদিন হয়নি। আজ পর্যন্ত মন খুলে কারুর সঙ্গে কথা ব্যকন্ত, এক বাবা ছাড়া। বাবার জন্য মনটা খুব উতলা হয় মাঝে মাঝে। চোখে জল আসে। নিজেকে বোঝায়। সবাই ত সব সময় থাকবেনা পৃথিবীতে। যার যতদিন পরমায়ু সে তত দিন থাকবে। এটাই নিয়তির নিয়ম।

আয়নার সামনে শালু দাঁড়িয়ে।

আয়নার ভেতোরের শালু র প্রশ্নঃ কি আজ যে বেশ খুশি খুশি লাগছে। তোমার রিসার্চ তোমার পড়াশুনো সব জলাঞ্জলি দিলে ওই ছেলেটির জন্য! বাঃ শালিনী বাঃ!!

আমিও মানুষ আমার ও ইচ্ছা আছে। এতো দিন শুধু পড়াশুনো করেছি আর পড়িয়েছি। আজ নিজে পড়ছি।

কি?

ভালোবাসার পড়া। ওটাও দরকার।

তাইনাকি? তবে তোমার মা সারদামনির আশ্রম?

না ওটা আমার দ্বারা হবেনা। আমি অত কঠোর হতে পারবোনা। আমাকে জীবনের স্বাদ নিতে হবে। তা ছাড়া আমি চাইনা মাকে দুঃখ দিতে। মা দিন দিন আমার জন্য যা চিন্তা করছিলেন তাতে মায়ের অসুখ হত। আমি তখন নিজেকে ক্ষমা করতে পারতামনা। আমার দিদি জামাইবাবু সকলে আমার ওপর অখুশি ছিলেন। আমার নিজের জন্য আমি অন্যদের আর মনে কষ্ট দিতে রাজি নই। দেখা যাগ কি হয়।

ও আচ্ছা। তা বেশ। তবে তুমি অয়নকে ভালবেসে ফেলেছ।

বিয়ে জখন করতেই হবে তখন জাকে চিনি জানি তাকেই না হয় করলাম তাতে ক্ষতি কি!

হ্যাঁ তাও ঠিক।

তবে আর কেন এবার এসো। আমার ঘুম পেয়েছে।

চলবে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

৬ষ্ঠ পর্ব

শালিনী, নিজের ঘরে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াচ্ছিল। নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেই চিনতে পারে না। ও এমনিতেই কোন প্রসাধনের ধার ধারেনা। এতো সিম্পল মেয়ে আজকাল পাওয়া মুস্কিল। আয়নার ভেতরের শালিনী প্রশ্ন ছুঁড়ছে, “তুমি কি সত্যি সুখী?”

উত্তর: হ্যাঁ! না হওয়ার কি আছে? 

প্রশ্ন: অয়নকে কি তুমি ভালো বাস না? সত্যি বল। যদি তাই হয় তবে ওর সঙ্গে শপিং মল সিনেমা গিয়েছিলে কেন শুনি! ওর প্রতি তোমার উইকনেস নেই!! 

উত্তর: মোটে না। ওকে বন্ধু ছাড়া আর কিছুই ভাবি না। ওর সিনেমা হলের ব্যাবহার আমাকে বিব্রত করেছে। আমি অপমানিত হয়েছি। তাই আমি ওর মা বাবাকে কোন পাত্তা দিই নি। ওর আমার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। আমি নিজে একজন শিক্ষিকা আমার এই সব ছ্যাবলামি পছন্দ নয় তা সে ভালো করে যানে। তবুও ....!

ছেলেরা আবেগের বসে ওই রকম করে বসে। সেটা হয়তো তোমার কাছ থেকে সাড়া পেয়েছে তাই। 

না। আমি কোন প্রশ্রয় দি নি। ওটা ওর বোঝার ভুল। আমাকে ভালো বাসলে আমার সম্মান রাখতে শিখতে হবে। পাবলিক প্লেসে আমার হাত ধরাকে আমি, শালিনী সান্যাল প্রশ্রয় দি না। খুব চিপ ছেলে মেয়েরা এরকম করে থাকে। প্রেম একটা হৃদয়ের ব্যাপার সেটা কে জৈবিক ক্ষুধাতে পরিণত করে যারা তাদের আমি কামুক বলি। তারা আমার কাছে ঘৃণ্য মানুষ। 

তোমার যুক্তি তোমার কাছে শালিনী। ওর মানসিকতা তোমার সঙ্গে হয়তো মিল নাও খেতে পারে। তোমার চাওয়া পাওয়া, ভালো লাগা...ভালো না লাগা এ সব কি পুরুষ মানুষ বুঝতে পারে! তোমার বলা উচিত ছিল। 

এই টুকু না বুঝলে ওর আমার সঙ্গে থাকা উচিত হবে না। 

তোমার কি পুরুষ সংগ খারাপ লাগে। তুমি মন থেকে অয়ন কে ভালো বাসনা?

তা তো বলিনি। হ্যাঁ অয়ন ইনটেলিজেন্ট, স্মার্ট ওকে অনেক মেয়েই পছন্দ করবে আমার থেকে অনেক অনেক ভালো সুন্দর দেখতে মেয়ে হয়তো ওর জন্য পাগল হবে তবে শালিনী সান্যাল নয় .......!! শালিনী মনুষ্যত্বকে প্রাধান্য দেয়। বাহ্য চাক চিক্যকে নয়। মানুষ মানুষের মতন ব্যাবহার করলে তবেই সে গ্রহণিয়। 

ওই যে জৈবিক ক্ষুধার কথা বললে ওটা কি তোমার নেই!

বাজে প্রশ্নর জবাব আমি দি না। প্রসঙ্গ বদলাও। আমি “মা শারদা মায়ের” আশ্রমে জাই আড়িয়াদহতে। সেখানে আমার মত অনেক নারী অবিবাহিতা, সন্ন্যাসিনী। তারা কর্মে বিশ্বাস করে। তার কেউ ই বিয়ের জন্য পাগল নয়। তাদের লক্ষ্য এক মানুষের সেবা, অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনা। এর মধ্যেই তারা সমাজ সেবার মুল মন্ত্র পায়। কি সুন্দর আধ্যাত্মিক পরিবেশ। শান্ত সুন্দর। 

তবে কি তুমি সন্ন্যাসিনী হবে? 

বলা মুস্কিল। আমাকে আশ্রম গ্রহণ করলে হয়তো তাই হব। 

কিন্তু তোমার অয়ন! 

আমার অয়ন কেন বলছ? ও কেবল ই বন্ধু। আর কিছু না। 

মন থেকে বলছ! 

একদম। 

কিন্তু আমি মানি না। তোমার মনের মধ্যে অয়নের জন্য কোন স্থান নেই। 

কেন থাকবে না? তার জন্য ওকে আমার মন জয় করতে হবে ব্যাবহারে, কাজে কর্মে, চাল চলনে। 

তবে তুমি মা’ কে সেটা বলছ না কেন? 

আমি মেয়ে, মা.. আমার দোষ দেবেন! 

নাও হতে পারে। বলে দেখ। 

সম্ভব নয়।


পাসের বাড়ী থেকে গানের সুর ভেসে এলো--

কি করে ভুলিব তোমারে 

আঁখি জল ঝরে, বারে বারে 

বসেছি একাকী হায় 

তোমা বিনা অসহায়।

দিবস রজনী গুনি 

কবে তুমি আসিবে শুনি? ...(১)

এ মন মানে না আর 

মনে পড়ে বার বার 

তোমা বিনা মন লাগে না 

এ ফাগুন রাতে এসো না 

কিছুতে কিছু মন লাগে না 

ও প্রিয়ে তুমি কি বোঝ না!...(২)

আমার হৃদয় জুড়ে বসে আছে,

পাইনা কেন তারে কাছে।

নিশুতি রাত গেল,

তারাগুলো নিভে গেল, 

আকাশে চাঁদ ছিল,

এ শুভ লগনে কে এলো। ...(৩)

ঠিক সেই সময় ফোনটা বেজে উঠলো। এই সময় কার ফোন এলো! 

হ্যালো! কে? 

কে বলত! 

অয়ন?

তবে আমার কথাই ভাবছিলে বল! 

বাজে কথা রাখ, কবে আসছ কোলকাতা?

কি মনে হচ্ছে?

হেঁয়ালি কর না প্লিজ। 

এখানেই এসেছি ৭ দিনের ছুটিতে। তোমার বাড়ীতে-ত আমার জাওয়া নিষেধ তাই তোমাকে কোথায় দেখা করব .........? 

খুব বাজে লাগছে আমার। আসলে তোমার ওপর রাগটা ওনাদের ওপর ঝাড়লাম। আমি অনুতপ্ত। আজ আমাদের বাড়ী আসবে? 

কে? আমি! রক্ষে কর আমায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বিদেই করে দেবে তুমি। 

যাহ্। তা কখন হয়! রাগ করেছিলাম ঠিক ই তবে তুমিও ত কিছু বলনি আমায়। তোমার উচিৎ ছিলনা আমাকে বোঝানোর! 

তা ছিল। আসলে আমি নিজেও কি করতে কি করে বসে ছিলাম সে জন্য অনুতপ্ত। কোন মুখে তোমায় কিছু বলতাম।

আচ্ছা বাবা আচ্ছা। ঠিক আছে তুমি আজ এসো আমাদের বাড়ী। আমি অপেক্ষা করবো কিন্তু। 

ডন। 

ডন।। Bye . Sincerely I will wait for you .

বিকেলে সত্যি অয়ন এলো শালিনীদের বাড়ী। 

আয়না টা যতো নষ্টের গোঁড়া। ওই আয়নাই মেয়েদের ভাবুক করে আর নিজের রূপ সম্বন্ধে সচেতন করে। যতো অনা-ছিষ্টির কথা ওই আয়নাই বলে। নিজেকে খুঁটিয়ে দ্যাখে আর ভাবনার দুনিয়ায় বিচরণ করে। 

হটাত তার মোবাইল টা বেজে উঠলো।

অসময়ে কার ফোন এলো? শালিনীকে অপ্রস্তুত মনে হল। 

হ্যালো! কে? 

আমি অয়ন। তুমি কি আমার নাম্বার ডিলিট করে দিয়েছ?

ও। না না। একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। 

কার কথা ভাবছিলে?

কেন বলবো? 

বলই না শুনি!

শালিনী সাধারণত সাজ গোছ করে না। আজ সামান্য প্রসাধন করাতে সুন্দর লাগছিল তাকে।

মা দেখে বলেন কিরে শালু কি হল বলতো? 

কেন কি আবার হবে? তোমার সবেতেই আমাকে ছুঁড়ে প্রশ্ন! 

না মা, আমি ত জানি তোকে। মা আমার কি সুন্দর দেখতে লাগছে আজ। অনেক দিন দেখিনি তোকে রে। শুধু বকেছি। চোখ পুঁছে ফেলেন মা!

ওই! ওমনি কান্না কাটি!! কেন তুমি আমার জন্য এতো ভাবো বলত!

তুই কি করে বুঝবি মা? মা হলে বুঝবি। 

ওই এক কথা ‘মা’ হলে বুঝবি! 

বিকেলে একজন আসবে মা, বলে লজ্জায় শালু মাকে জড়িয়ে ধরে। 

কে সে শুনি? আমি কি সত্যি শুনছি। হে ঠাকুর, আমার ডাক শোন তুমি। 

মা তুমি না সবেতে উতলা হও।

অয়ন কে ডেকেছি। ও আসবে। ভালো কিছু খাবার কর ত। 

কি বলিস শালু সত্যি! দাঁড়া তোর দিদি জামাই বাবুকে ডাকি তবে। 

না ওদের এখন ডাকতে হবে না। পরে। আমার কিছু কথা আছে ওর সঙ্গে তারপর।

ঠিক আছে তাই হবে। মা রান্না ঘরে চলে জান হাঁসি হাঁসি মুখে।

এতদিন পর মাকে খুশি দেখে শালিনী নিজে বেশ খুশি। মাকে দুঃখ দেওয়া উচিৎ হয়নি। রিসার্চ করার সুযোগ দিলে অয়নকে তার বিয়ে করতে আপত্তি নেই। সত্যি ত সে সন্ন্যাসিনী হবে না। সংসার জখন করতেই হবে তবে দেরি করে লাভ নেই। তবে অয়নের মতা মত জানতে হবে। আমার ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা চলবে না। আমাকে আমার মত থাকতে দিতে হবে। 

বিকেলে অয়ন সত্যি এলো শালিনী র বাড়ী। বাড়ীর সামনেটাতে একটা সরু রাস্তা আছে তাই অয়নের নতুন পোলো গাড়ীটা পার্ক করতে অসুবিধে হচ্ছিল। 

শালিনী, আজ ফুলদানিতে সুন্দর ফুল দিয়ে সাজিয়েছে।ঘরটা খুব অগোছালো লাগছিল। অনেকটা নিজেই গুছিয়েছে। দরজায় নতুন পর্দা লাগিয়েছে। মা উঁকি মেরে মেয়ের সব কান্ড কারখানা দেখে মুখটিপে হাসছিলেন। যাগ ঠাকুর শুনলেন। বাবা লোকনাথ তোমার পূজো দেব দক্ষিণেশ্বরে মা কালীর পূজো দেব .... আমার শালুর বিয়ে হয়ে জাগ সব ঠাকুরের মানত অনুযায়ী পূজো দেব। 

ঘরে নক করাতে শালিনী আসে ঘরের দোর খুলতে।

অয়ন শালিনীকে দেখে অবাক হয়। সত্যি আজ শালিনী কে সুন্দর দেখাচ্ছিল। খুব স্মার্ট মেয়ে শালিনী। তাই সামান্য প্রসাধনে ওর ব্যক্তিত্য ফুটে ওঠে চোখে মুখে। 

‘এসো’শালিনী অয়নের উদ্যেশ্যে বলে। 

ঘরে ঢুকে অয়ন, নতুন সাজে ঘর দেখে মনে মনে খুসি হয়। এজে তার শালিনীর হাতের ছোঁয়া দেখেই বুঝতে পারে। 

কি দেখছ হাঁ করে! 

তোমাকে আর তোমার টেষ্ট কে দেখে। অপুর্ব। 

Thanks a lot . কি খাবে বল। 

তুমি দেবে?

আবার অসভ্যতামি! 

যা বাব্বা! তুমি কি এই রকম ভাবে আমাকে শাসন করবে? 

হ্যাঁ দরকার হলে তাই করবো। না করার কি আছে? তোমাদের মতন পুরুষদের আমি চিনি। সুধু খাই খাই ভাব। 

মা ঘরে ঢোকেন চা জলখাবার নিয়ে। মাথায় ঘোমটা দেখে শালিনী হেঁসে ফেলে। তোমার ভাসুর নাকি গো মা? ও আমার বয়সি! আমরা এক ক্লাসে পোড়তাম। আমার বন্ধু অয়ন। 

পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে অয়ন। 

থাক থাক বাবা। তুমি কত দিনের জন্য এসেছ?

এক সপ্তাহ থেকে চলে যাবো। 

ও মাত্র এক সপ্তাহ। 

তোমার বাবা মা কেমন আছেন? 

ভালো। 

তোমরা গল্প কর আমি আসি, কেমন! আজ এখানে খেয়ে জাবে বাবা। 

মায়ের, এই ‘বাবা’, ‘মা’ ডাকগুলো খুব সেকেলে লাগে শালিনীর। 

তোমার মা খুব স্নেহ ময়ি। 

হ্যাঁ সত্যি তাই। আমার মা খুব স্নেহ ময়ি। এখন থেকে হাত করে রাখ পরে কাজে লাগবে। 

কেন? 

কেন আবার। আমার নামে নালিশ করবে। মা তোমার পক্ষ নেবেন সর্বদা। 

তা তুমি জদি আমার কথা না শোন তবে ........ বাইরে কলিং বেলের আওয়াজ হল। 

কে এল? শালিনী বাইরে গিয়ে অবাক জিজু, দিদি, টুকাই সব এসে হাজির।

আমরা আর থাকতে পারলামনারে, দিদি বলে উঠলো।

বেশ করেছিস। আয়না। কি জিজু তোমার খবর?

আমার খবর ভালো না।

কেন?

আমার ওই গানটার কথা মনে পড়ছে, “মেরা পিয়া ঘর আয়া ও রাম জি” বলে হেঁসে ওঠেন। 

যাঃ। সব সময় আমার পেছনে লাগা। কোন কাজ নেই তোমার না! টুকাইকে কে কোলে নিয়ে ঘরে ঢোকে শালু। আলাপ করিয়ে দি ....

‘অয়ন’ আমার বন্ধু সেই কলেজ থেকে। ইনি আমার দিদি জামাইবাবু ...

নমস্কার। বুঝতেই পাচ্ছি। শালি না থাকলে, “ঘর লাগে শুনা শুনা, জামাইবাবু না থাকলে, দিল হুম হুম করে ঘবরায়ে...”

হা হা করে হেঁসে ওঠে সবাই।

মা সকলের জন্য চা জলখাবার নিয়ে আসেন। দিদি, জিজু ; সেন মহাশয়ের সন্দেশ মিষ্টি আর গরম ক্লাব কচুড়ি এনেছেন। 

আজ মা, দিদি,জিজু সকলে খুশি। টুকাই শালুর কানে কানে বলে নতুন মেসোর ওটা কি গাড়িগো? খুব সুন্দর গাড়ীটা। 

তুই মায়ের কাছে জা। এখানে বড়দের কাছে থাকতে নেই। পরে আসিস আমার কাছে। 

আচ্ছা বলে চলে যায় টুকাই।

চলবে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

৫ম পর্ব

শালিনীর জ্ঞান ফিরতে দেরি হলনা। খুব দুর্বল এবং মানসিক চিন্তায় প্রেশার লো। ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়ে গেলেন। অর্ক ; সমস্ত ওষুধ, হেলথ ড্রিংক , তাজা ফল বাজার থেকে সঙ্গে সঙ্গে কিনে আনল। কিন্তু শালিনীর ওই এক প্রশ্ন , “ওনারা কেন এসেছিলেন?” 

বোঝ ঠ্যালা!

মা বলেন , “ঘরে কি লোক আসবেনা মা! তুই কেন ও নিয়ে চিন্তা করছিস?”

না তা আসবে না কেন মা , তবে এনাদের ত আগে কখন দেখি নি , তাই!  

ও পরে শুনবি। এখন একটু ফ্রুট জুস খা দেখিনি। কিচ্ছুটি ত মুখে দি-সনা। শরীরের কি হাল করেছিস বেঙ্গালোরে গিয়ে। খেতিস না নিশ্চয়! 

কোন উত্তর না দিয়ে বাধ্য মেয়ের মত সব খেয়ে নেয়। সত্যি ও একটু দুর্বল হয়ে গিয়েছে। সেটা যে কারনেই হোক না কেন। 

পরের রবিবার অয়নের বাবা মা আসবেন কথা বলতে।

এরমধ্যে অয়নের ফোন এসে গিয়েছে মায়ের উদ্দেশে। ওই এক কথা , শালিনীর বাড়ী গিয়ে বিয়ের কথা পাড়তে।

অয়নের মা বাবা সময় মত রবিবার আবার আসেন। সঙ্গে মিষ্টির বাক্স। শালিনীকে বৌমা বানিয়েই ছাড়বেন। অয়নের পছন্দই ওনাদের পছন্দ। এটাই এখনকার রীতি নিয়ম। 

যথা রীতি কথো প কথনের পর ... শালিনী , মায়ের ডাকে ঘরে ঢোকে। পরনে শালোয়ার। দিদি , জিজু আর টুকাই। 

আজ খুব একটা রুক্ষ ভাব না করে সিচুএশন স্টাডি করছিল।

তুমি ত শালিনী না? অয়নের মায়ের প্রশ্ন।

আগে থেকে আট ঘাট বেঁধে এসেছেন মহিলা .... শালু ভাবে। হ্যাঁ আমি শালিনী।

আপনাদের ..... বলার আগেই দিদি বলে ,“ইনি অয়নের মা! আর উনি অয়নের বাবা”

নমস্কার। অয়ন আসে নি কেন? শালিনীর উল্টো প্রশ্ন।

না মা ও বেঙ্গালুরু তে থাকে।

আমি জানি।

ভদ্র মহিলা সাদা মাটা আর ভদ্রলোক , মানে অয়নের বাবা এখন খুব স্মার্ট আছেন।

তুমি কি অয়ন কে চেন মা? অয়নের বাবার প্রশ্ন।

হ্যাঁ ও আমার ক্লাস মেট। কেন বলুন তো! 

মা এসে বলেন ওনারা তোকে দেখতে এসেছেন।

আমায় দেখতে এসেছেন? মানে! আমাকে ত কিছু বল নি মা। অয়ন আমার ক্লাস মেট। ও , আমার বন্ধু তার চেয়ে বেশি কিছু না। এই বলে চলে জায় ঘর ছেড়ে।

মেয়ের রাগ জানেন মা। কিছু অঘটন ঘটার আগেই আগন্তুকদের চা জল খাবার এগিয়ে দেন।

এবার অয়নের বাবা মা সত্যি অপমানিত বোধ করেন। মাপ করবেন বোন , অনেক আপ্যায়িত হলাম এবার আমরা উঠি। এই বলে ওনারা উঠে পড়েন।

অর্ক দা , দিদি কিছু বলার আগেই ওনারা ঘর ছেড়ে চলে জান। ওদিকে মা মুখে কাপড় চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন। ঘরে একটা গম্ভীর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। শালিনীর ঘর ভেতর থেকে বন্দ।

তুই কি আমাকে শান্তিতে মরতে দিবি শালু! তুই কি চাস মা!! দরজায় কড়া নাড়েন মা। দরজা খোল। কথা শোন আমার মা। 

অর্ক , দিদি , টুকাই স্তব্ধ। গোটা ব্যাপারটা একটা জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কারুর মুখে কোন সাড়া শব্দ নেই। অর্ক খুব অপ্রস্তুত মনে করছিল। এই পরিস্থিতিতে মাকে ছেড়ে জাওয়া যাচ্ছেনা আবার থাকাও যাচ্ছেনা। টুকাই ও গিয়ে মাসির ঘরের দরজা ধাক্কায়। ও মাসি দরজা খোলনা। আমি ত এসেছি তোমার সঙ্গে কথা বলতে।

দরজা খুলে শালিনী টুকাইকে কোলে তুলে নেয়। আজ প্রথম তার চোখে জল। কেউ কিছু বলার আগেই শালিনী ঘরে ঢ়ুকে পড়ে। দিদি ঘরে গিয়ে শালিনীকে বোঝাতে চেষ্টা করে। কোন ফল হয়না। 

মাসির চোখে জল দেখে টুকাই কেঁদে ফেলে। ও মাসি কি হয়েছে? তুমি কেন কাঁদছ? 

কোই না ত। আমি কম্প্যুটারে বসেছিলাম তাই। তুই ক্যাডবেরি খাবি? 

না আমি কিচ্ছু খাবোনা। আগে বল তুমি কেন কাঁদছিলে?

তোর নতুন জামা কেনা না হলে তুই কাঁদি-সনা! আমার নতুন শাড়ী কেনা হয়নি তাই আমি কাঁদছিলাম। 

আমি বাবাকে বলব তোমায় নতুন শাড়ী কিনে দেবে। 

দুর বাবা কেন কিনে দেবে আমার মা কিনে দেবে। আমার মা আছে না! মা বাবা ছাড়া অন্য কারুর কাছথেকে কিছু নিতে নেই। ঠাকুর রাগ করেন। 

তবে যে তুমি আমায় পূজোতে , জন্ম দিনে নতুন ড্রেস কিনে দাও। 

আমি ত তোর মা’সি! মানে , মা’ দেখ। ‘মা’ মানে ‘মা’। ‘সি’ মানে কি? 

দেখ।

তাহলে কি হল, “মা দেখ” তাই না। তাই আমি তোকে ড্রেস কিনে দি। তুই ত আমার সোনাই মা। আজ তুই আমার কাছে থাকবি? 

হ্যাঁ।

তাহলে মা বাবা কি করবে? 

মা আমাকে ছেড়ে থাকতেই পারবে না! 

তুই থাকতে পারবিনা বল। কিরে ঠিক না! 

হ্যাঁ , মা আমাকে গল্প বলে ঘুম পাড়ায়। তুমি গল্প জানো। 

খুব জানি। শুনবি গল্প। আজ আমার কাছে থাকলে তোকে গল্প শোনাবো। 

তাহলে থাকবো। কিন্তু আমার স্কুল? 

ও তাইতো। না স্কুল বন্দ করা চলবেনা। 

তাহলে কি করে থাকবো?

তাইতো! কি করে থাকবি! 

মা আসেন ঘরে চায়ের কাপ নিয়ে। 

আমায় ডাকলে পারতে। আমি নিজে যেতাম।

থাক আর আদিখ্যেতা দেখাতে হবে না। বাড়ী হেস্ত নেস্ত করে ছাড়লে। আমার মরন না হওয়া ওবধি তোমার শান্তি নেই। নেই নেই করে ২৯ বছর বয়েস হল তোমার। এর পর কি হবে? 

ঠিক উল্টো টা মা। আমি না মরলে তোমার শান্তি নেই। তুমি ভালোকরে জানো আমার পছন্দ অপছন্দ। তবুও তুমি আমাকে জোর করে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বার করতে চাও। কখন খেয়াল রেখেছ তোমার মেয়ের মনের কথা। কি মা তুমি? 

আর কত খেয়াল রাখতাম তোর। সকাল থেকে সন্ধ্যে ওভধি তোর সেবা করাই আমার কাজ। তুই আমার খেয়াল রাখিস? 

এবার শালিনী গলা নামিয়ে বলে, মা তুমি আমার কথা ভেবোনা। আমি ঠিক আছি। আমার লখ্যে পৌঁছতে দাও। আমার পড়াশুনা শেষ হয়নি। আমি নিজের পায়ে দাঁড়াই। কেন তুমি বোঝনা। আমাকে না জিগ্যাসা করে ঘরে লোক ডাকো! এটা কি ঠিক বল! আমি ত বলেছি আমার সময় হলে আমি নিজে তোমাকে জানাবো। 

সে দিন আর আসবে না রে। তার আগেই আমি মরে যাবো।

অমন করনা মা। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। আমি তোমাকে দুঃখ দিতে চাইনা। 

মা মেয়ের ঝগড়ার মধ্যে দিদি নাক গলায়না। দিদি খুব শান্ত স্বভাবের। শালিনী ঠিক উল্টো। ওর বাবার মত এক রোখা , এক গুয়েঁ , জেদি মেয়ে। তাই বাবার খুব প্রিয় ছিল শালিনী। 

এর কোন সমাধান হবে বলে মনে হয়না। জিজু, দিদিকে টুকাইকে নিয়ে ফিরে জান। জিজুকে আজ খুব গম্ভীর মনে হচ্ছিল। শালিনীকে কেউ বুঝতে চেষ্টা করেনা। ও আলাদা ধাতে গড়া। ওর চিন্তা ধারা সম্পুর্ণ আলাদা। এর পর ও কি এ বাড়ীতে কেউ আসবে শালিনীকে দেখতে? 

মা মেয়ের মধ্যে কথা নেই। শালিনী নিজের ঘরে। মা রান্না ঘর আর পূজোর ঘর এই করে দিন কাটাচ্ছেন।

শালিনী , নিজের ঘরে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াচ্ছিল। নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেই চিনতে পারে না। ও এমনিতেই কোন প্রসাধনের ধার ধারেনা। এতো সিম্পল মেয়ে আজকাল পাওয়া মুস্কিল। আয়নার ভেতরের শালিনী প্রশ্ন ছুঁড়ছে , “তুমি কি সত্যি সুখী?”

উত্তর: হ্যাঁ! না হওয়ার কি আছে? 

প্রশ্ন: অয়নকে কি তুমি ভালো বাস না? সত্যি বল। যদি তাই হয় তবে ওর সঙ্গে শপিং মল সিনেমা গিয়েছিলে কেন শুনি! ওর প্রতি তোমার উইকনেস নেই!! 

উত্তর: মোটে না। ওকে বন্ধু ছাড়া আর কিছুই ভাবি না। ওর সিনেমা হলের ব্যাবহার আমাকে বিব্রত করেছে। আমি অপমানিত হয়েছি। তাই আমি ওর মা বাবাকে কোন পাত্তা দিই নি। ওর আমার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল। আমি নিজে একজন শিক্ষিকা আমার এই সব ছ্যাবলামি পছন্দ নয় তা সে ভালো করে যানে। তবুও ....!

ছেলেরা আবেগের বসে ওই রকম করে বসে। সেটা হয়তো তোমার কাছ থেকে সাড়া পেয়েছে তাই। 

না। আমি কোন প্রশ্রয় দি নি। ওটা ওর বোঝার ভুল। আমাকে ভালো বাসলে আমার সম্মান রাখতে শিখতে হবে। পাবলিক প্লেসে আমার হাত ধরাকে আমি , শালিনী সান্যাল প্রশ্রয় দি না। খুব চিপ ছেলে মেয়েরা এরকম করে থাকে। প্রেম একটা হৃদয়ের ব্যাপার সেটা কে জৈবিক ক্ষুধাতে পরিণত করে যারা তাদের আমি কামুক বলি। তারা আমার কাছে ঘৃণ্য মানুষ। 

তোমার যুক্তি তোমার কাছে শালিনী। ওর মানসিকতা তোমার সঙ্গে হয়তো মিল নাও খেতে পারে। তোমার চাওয়া পাওয়া , ভালো লাগা...ভালো না লাগা এ সব কি পুরুষ মানুষ বুঝতে পারে! তোমার বলা উচিত ছিল। 

এই টুকু না বুঝলে ওর আমার সঙ্গে থাকা উচিত হবে না। 

তোমার কি পুরুষ সংগ খারাপ লাগে। তুমি মন থেকে অয়ন কে ভালো বাসনা? 

তা তো বলিনি। হ্যাঁ অয়ন ইনটেলিজেন্ট , স্মার্ট ওকে অনেক মেয়েই পছন্দ করবে আমার থেকে অনেক অনেক ভালো সুন্দর দেখতে মেয়ে হয়তো ওর জন্য পাগল হবে তবে শালিনী সান্যাল নয় .......!! শালিনী মনুষ্যত্বকে প্রাধান্য দেয়। বাহ্য চাক চিক্যকে নয়। মানুষ মানুষের মতন ব্যাবহার করলে তবেই সে গ্রহণিয়। 

ওই যে জৈবিক ক্ষুধার কথা বললে ওটা কি তোমার নেই!

বাজে প্রশ্নর জবাব আমি দি না। প্রসঙ্গ বদলাও। আমি “মা শারদা মায়ের” আশ্রমে জাই আড়িয়াদহতে। সেখানে আমার মত অনেক নারী অবিবাহিতা , সন্ন্যাসিনী। তারা কর্মে বিশ্বাস করে। তার কেউ ই বিয়ের জন্য পাগল নয়। তাদের লক্ষ্য এক মানুষের সেবা , অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনা। এর মধ্যেই তারা সমাজ সেবার মুল মন্ত্র পায়। কি সুন্দর আধ্যাত্মিক পরিবেশ। শান্ত সুন্দর। 

তবে কি তুমি সন্ন্যাসিনী হবে? 

বলা মুস্কিল। আমাকে আশ্রম গ্রহণ করলে হয়তো তাই হব। 

কিন্তু তোমার অয়ন! 

আমার অয়ন কেন বলছ? ও কেবল ই বন্ধু। আর কিছু না। 

মন থেকে বলছ! 

একদম। 

কিন্তু আমি মানি না। তোমার মনের মধ্যে অয়নের জন্য কোন স্থান নেই। 

কেন থাকবে না? তার জন্য ওকে আমার মন জয় করতে হবে ব্যাবহারে, কাজে কর্মে , চাল চলনে। 

তবে তুমি মা’ কে সেটা বলছ না কেন? 

আমি মেয়ে , মা.. আমার দোষ দেবেন!

নাও হতে পারে। বলে দেখ। 

সম্ভব নয়।

চলবে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

৩য় পর্ব

এখানকার কাজ শেষ। বাড়ী ফেরার তাড়া। ইয়শোওন্তপুর হাওড়া সুপারফাষ্ট এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে। শালিনী একাই ফিরছে ২ এসি কোচে। সঙ্গে একটা ট্রলি ব্যাগ আর কিছু ছোট খাটো জিনিষ। খুব ব্যস্ত লাগছিলো। অনেকটা পথ কোরমঙ্গালা থেকে ইয়শোওন্তপুর ষ্টেশন। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বগিতে উঠে। জিনিষ পত্র ঠিক জায়গায় রেখে একটা টাইম ম্যাগাজিন নিয়ে বসলো। যে যার বার্থ এ উঠে বসছে। সামনের বার্থের এক ভদ্রমহিলা শালিনীর দিকে তাকিয়ে বললেন “কোলকাতা যাবে বুঝি?”

হ্যাঁ। আপনি?

আমিও। সঙ্গে কেউ নেই? 

‘না’ ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাতে ওলটাতে। 

ও! আমিও একলা যাচ্ছি মা। তাই ভাবলাম তোমার সঙ্গে একটু কথা বলে সময় কাটাবো। 

হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়। বলুন না। 

আমি এখানে আমার ছেলে বৌ এর কাছে এসেছিলাম। 

আপনার ছেলে কি করেন? 

ছেলে বৌমা দুজনেই ইনফোসিসে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। 

ও তাই! ভালো। 

তুমি?

আমি! আমি আপাতত কিছু করিনা। 

তোমার বিয়ে হয়েছে? 

কথাটা শুনেই শালিনী বিরক্তির ভাব প্রকাশ করে। আমায় কি দেখে মনে হচ্ছে আমি বিবাহিতা? 

না মা। জিগ্যেস করলাম বলে কিছু মনে করনা। 

না না। আচ্ছা মাসিমা বিয়ে ছাড়া কি মেয়েদের কিছু কাজ নেই! বিয়ে না করে কি মেয়েরা সমাজের অন্য কোন ভালো কাজ করতে পারে না! আপনার কি মনে হয়। 

কাজ তো অনেক আছে মা। কেউ এভারেস্ট অভিযানে যাচ্ছে , কেউ ক্রিকেট খেলছে , কেউ সাঁতার কাটছে , কেউ সিনেমা করছে ....... 

এগুলো সমাজের মঙ্গলের কাজ কিনা জানিনা তবে হ্যাঁ নাম যশের জন্য ঠিক আছে। 

তুমি কি কিছুই কর না মা?

দেখে কি মনে হচ্ছে আপনার? ... উল্টো প্রশ্ন শালিনীর।

কিছু একটা কর নিশ্চয়। কি কর মা? 

কলেজে পড়াতাম এখন পড়াইনা। বেকার বলতে পারেন।.... ইচ্ছে করেই কিছু খুলে বলল না , আবার বিয়ের কথা না পেড়ে বসেন মহিলা। ম্যাগাজিনটায় চোখ বুলতে লাগলো। প্রত্যেক বয়স্কা মহিলাদের এই এক প্রশ্ন ; বিয়ে , ছেলে মেয়ে বিরক্ত লাগে এক ঘেয়ে কথা শুনতে। অন্য কোন প্রশ্ন নেই?

মহিলা , মনের মতন উত্তর না পেয়ে চুপসে গেলেন। উনিও একটা বোই বার করে মুখের সামনে ধরলেন। 

খুব অলস লাগছিল শালিনীর। অনেকটা পথ এক টানা অটো তে। সেই সকালে বেরুন। ট্রেনে এসির ঠাণ্ডাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানেনা। টি টি র ডাকে উঠে পড়ে। 

টিকিট চেকিং এর পর আবার ঘুমিয়ে পড়ে। সামনের মহিলাও ঘুমিয়ে পড়েন। 

রাতে ট্রেনের জঘন্য খাবার খেতে রুচিতে বাধলেও উপায় নেই। ডিনারে , ভেজ খেয়ে আবার শুয়ে পড়ে। আসলে জেগে থাকলেই ভদ্রমহিলার প্রশ্ন বাণে জর্জরিত হতে হবে। অহেতুক কথা বাড়বে তার চেয়ে চুপ থাকাই শ্রেয়।

৪র্থ পর্ব

হাওড়া ষ্টেশন এ গাড়ী ইন করে প্রায় আধ ঘণ্টা লেটে। নিজের লাগেজ গুছিয়ে প্ল্যাট ফর্মে হাঁটা দেয়। 

প্রি পেড ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়িয়ে টাকা জমা দিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে পড়ে। 

বাড়ি পৌঁছে শান্তি। সোজা বাথ রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়। 

মা’ জল খাবার নিয়ে মুখের সামনে , সঙ্গে চা।

চলে এলি ভালো হল। বাবা আমার চিন্তা গেল। মেয়টা কোথায় রইলো কি খেল!

প্রত্যেক দিন ত তোমায় ফোন করতাম। তবু চিন্তা! 

হবেনা? 

কেন?

ও তুই বুঝবিনা। বই ছাড়া ত কিছু জানিশনা। নে খেয়ে নে। পরে কথা হবে।

সত্যি খিধে পাচ্ছিল। ট্রেনের যা খাবার! গা গুলোয় খেলে। লোকে বাধ্য হয় তাই খায়। 

বিকেলে দিদি এলো। 

কিরে শালু ফিরে এলি?

কি করতাম তাহলে?

কেন তোর রিসার্চ! 

শেষ করেই ত এলাম। ছোট প্রোজেক্ট। এবার দেখি কি করি। নাইজারে (NISER) সাইন্টিস্ট চায় দেখি পাই কিনা। ওটা ভালো ইন্সটিটিউট , মাইনে ভালো। পেলে চলে যাবো। আমাকে আমার রিসার্চ চালিয়ে যেতে হবে , আমার টার্গেটে না পৌঁছন পর্যন্ত।

সারা জীবন টা কি এই করেই কাটাবি?

এ ছাড়া আর কি করবো বল? আমি ত তোদের মত গুছিয়ে ঘর সংসার করতে পারবো না।

কেন পারবি না! আমারা কি পারতাম? পারতে হবে সংসারের সেই নিয়ম।

এই খানেই তোর আমার মধ্যে মত ভেদ! “ওই সংসারের সেই নিয়ম” কথাটা আমি মানতে রাজি নই। 

অফিস থেকে জিজু এসে হাজির। টুকাই আগে থেকেই এসে গিয়েছে। মাসির কাছে বেঙ্গালুরুর গল্প শুনছে। 

হঠাৎ বাইরে রাস্তায় একটা প্রাইভেট কার আমাদের বাড়ীর সামনে এসে দাঁড়ালো। 

কার থেকে সু-টেড বুটেড এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এবং সঙ্গে এক ভদ্রমহিলা। হাতে মিষ্টি। 

শালিনী কিছুই বুঝলোনা। ও নিজের ঘরে চলে গেল। এনাকে ত কোন দিন আমাদের বাড়ী দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না। ইনি কে? হঠাৎ মাথায় কারেন্ট লাগার মত একটা শক পেল। অজ্ঞান হয়ে গেল শালিনী। ভাগ্যিস বিছানায় পড়ে গিয়েছিল নাহলে কি হত কে জানে। 

টুকাই ঘরে ঢুকে মাসিকে বিছানায় ও ভাবে পড়ে যেতে দেখে তার মাকে ডাকে। টুকাইয়ের ডাকে দিদি গিয়ে দ্যাখে শালিনী বিছানায় অস্বাভাবিক ভাবে পডে গিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে ডাক্তার আসেন। অর্ক নিয়ে আসে সঙ্গে করে। 

যারা এসেছিলেন তারা হতভম্ব। বাড়ী সুধু সকলের হৈ চৈ। কি হল কি হল? 

ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা বৈঠক খানায় বসে আছেন। কেউ কাছে নেই অথচ যেতেও পারছেন না ওনারা। 

শেষে ভদ্রমহিলা ভেতরের ঘরে গিয়ে দেখলেন শালিনী বিছানায় শুয়ে। ডাক্তার , প্রেশার পালস দেখে জ্ঞান ফেরানোর জন্য চিকিৎসা সুরু করেন। 

শালিনীর মা কপালে হাত জোড় করে ঠাকুর কে ডাকতে শুরু করেন।

কিছুক্ষণ পরে শালিনীর জ্ঞান ফেরে। ডাক্তার বাবু অর্ক কে কিছু প্রেসক্রিপশন দিয়ে চলে যান। অর্ক সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ নিয়ে আসে।

শালিনীর মা’র এতক্ষণ খেয়াল ই ছিল না ঘরের অতিথিদের কথা। কাছে গিয়ে হাত জোড় করে বলেন মেয়েটা বেঙ্গালুর থেকে এসে খুব দুর্বল লাগছিল। আজ কি যে হল আপনারা আসার সঙ্গে সঙ্গে এরকম অজ্ঞান হয়ে জাওয়া এই প্রথম বার .... 

না না আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। এটা তো অপ্রত্যাশিত। কেউ কি জানতো এরকম হবে বলে। আমরা বরং আরেক দিন আসবো কেমন! 

শালিনীর দিদি ও ঘর থেকে আসে চা জলখাবার নিয়ে। 

মা বলেন বসুন না এসেছেন এতো কষ্ট করে। আমাদের ভাগ্য আপনারা নিজে এসেছেন। আমার লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে। একটু মিষ্টি মুখ করে জান। 

আপনি ব্যস্ত হবেন না। ও কি আস্তে পারবে? আমরা অন্য কোন দিন আসবো। আজ চলি। আমাদের টেলিফোন নাম্বার দিয়ে যাচ্ছি। সুস্থ হলে খবর দেবেন। কেমন! আজ আসি তাহলে!! 

আচ্ছা! আপনারা যা ভালো বোঝেন। ঠাকুরের যা ইচ্ছা। কিছুই খেলেন না। 

খাওয়া কি পালাচ্ছে বোন। আবার আসবো আপনি চিন্তা করছেন কেন? ভদ্রমহিলার মুখে ‘বোন’ শব্দ টা শুনে ‘মা’ ধাতস্থ হলেন। 

শালিনীকে দেখতে এসেছিলেন ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা। তবে কে ওনারা? ব্যাপার টা কিছুই জানা গেলো না।

চলবে

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

দ্বিতীয় পর্ব

কম্প্যুটার খুলে সিভি ফাইলটা খোলে। মনে মনে ভাবে বার্কের (ভাবা এটমিক এনার্জি কমিশন) কিম্বা ইন্সটিট্যুট অফ ফিজিক্সের চাকরিটাতে আবার অ্যাপ্লাই করব। খুব ভুল হয়েছে ঘরে থাকা।  বাইরে গেলে এক্সপোসার হবে। এই স্কটিশে আমার ভবিষ্যৎ কি? ইউ জি সী পেতে অনেক দেরি। সেই থোড বডি খাডা...খাডা বডি থোড! ওর প্রফেসারের সঙ্গে যোগা যোগ করে হাইয়ার রিসার্চের কথা মনে মনে চিন্তা করে। বাবা ওর নামে যে টাকা রেখে গিয়েছেন সেটা নিয়ে ফরেনের কোন ভাল ইউনিভার্সিটিতে পোষ্ট ডক্টরেট রিসার্চ করলে উন্নতি আছে। বিদেশের ডিগ্রীর দাম আছে। শালিনীর থিসিসটা “এপ্লিকেশন অফ ন্যানো টেকনোলজি ইন এপ্পলায়েড ইলেক্ট্রনিক্স” যেটা ন্যানো ফিজিক্সের বিষয়। বিষয়টা একেবারে নতুন তাই ও এটা নিয়ে আই আই এস সী , বেঙ্গালুরু তে যোগা যোগ করতে চায়। আজ বাবা থাকলে ওকে নিশ্চয় উৎসাহ দিতেন হাইয়ার রিসার্চের জন্য পরের দিন বেঙ্গালুরুর ফ্লাইটে শালিনী চলে-গেল। ওখানে এক বান্ধবীর ফ্ল্যাটে ওঠে। সকালে আই আই এস সী ( Indian Institute of Science) এতে যায়। Carbon Nanotube Based Sensors Funded by: DST, Project no. 563 কাজে সুযোগ পায় প্রফেসর ডঃ অরুণাভ চক্রবর্তীর আন্ডারে। শালিনী যা চাইছিল তাই পেল এখানে। 

এরমধ্যে অয়নের সঙ্গে হঠাৎ দেখা একটা শপিং মলের কাছে। শালিনীকে দেখে অয়ন হতভম্ব হয়ে যায়। দুজনে চোখা চোখই হয়। ওরা অপোসিট ফুট ধরে হাঁটছিল পরস্পরকে দেখে দুজনেই দাঁড়ালো। 

“কি ব্যাপার এখানে”? অয়নের প্রশ্নের অপেক্ষায় যেন ছিল শালিনী 

“কেন আমার কি এখানে আস্তে মানা”! ভুরু কুঁচকে শালিনীর জবাব অয়নকে ছুঁড়ে।

তা কেন! 

তবে? 

কৌতূহল! , মানে just inquisitiveness বলতে পারো।

মেয়েদের ব্যাপারে কৌতূহল থাকা মোটেই ভালো না Mr Ayon Banerjee , am I correct! 

Yes Madam! 

কোথায় উঠেছ? 

কেন যাবে নাকি সেখানে?

আবার ওই এক উত্তর just for inquisitiveness!

আমারও এক উত্তর মেয়েদের ব্যাপারে কৌতূহল থাকা মোটেই ভালো না Mr Ayon Banerjee!! 

দুজনেই হা হা করে হেঁসে ওঠে।

কফি খাবে?

তা হলে মন্দ হত না!! তবে পেমেন্ট আমি করবো।

তোমায় নিয়ে পারা মুস্কিল। কেন আমি দিলে ক্ষতি কি? 

না না আমি দিলে তোমার ক্ষতি কি শুনি? 

তর্ক কোর না আজ অন্তত আমার কথা একটু রাখ শালিনী। চল কে এফ সী কাউন্টারে জাই।

অয়নের সান্নিধ্য এই বিদেশ ভুঁইতে খারাপ লাগ-ছিলনা। সত্যি নারীর কাছে পুরুষ মানুষের প্রয়োজন আছে ; নারী যতোই উচ্চ শিক্ষিতা , উচ্চ পদাধিকারী হোক না কেন!এটাই বোধ হয় প্রকৃতির নিয়ম। 

হঠাৎ অয়ন বলে ,“কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কি ভাবছ? ”

কিছু না! বিব্রত বোধ করে শালিনী। কি আবার ভাববো। মা একা আছেন ওনার কথাই মনে হচ্ছিল!! কেমন আছেন কে জানে? 

কেন ফোন করনি? 

হ্যাঁ রাত্তিরে করি কিন্তু কাল করিনি। সত্যি মা’কে ফোন করেনি শালিনী।

অয়নকে ঘুণাক্ষরেও যানতে দি লোনা ওর কথাই ভাবছিল বলে ~! মেয়েরা পারেও বটে!! অয়ন কিছু স্ন্যাক্সের অর্ডার দেয়। কে এফ সী চিকেন আর পিটযা। 

এতোগুলো কেন আনাচ্ছ? আমি অত খাইনা! 

জানি আজ খেতেই হবে। তুমি ত কফি খাওয়ালে আমি মানা করিনি এবার আমি যা খাওয়াবো তুমি প্লিজ মানা করনা। 

আমি ওসব খাইনা অয়ন। আমরা ভেতো বাঙ্গালী ওই সব খাবার খেলে পেটের অসুখ হবে , তখন কে দেখবে?

কেন! আমি , আমি দেখবো!!

আহারে! কি আমার কলির কেষ্ট ~ আমায় করবে তুষ্ট? 

নাইবা হলাম কলির কেষ্ট ~ তোমার জন্য নয় করবো কষ্ট! 

দুজনেই হা হা করে হেঁসে ওঠে। 

খাওয়া শেষ করে অয়ন শালিনীকে ছেড়ে আসে কোরমঙ্গালা অবধি ট্যাক্সিতে।

রাস্তায় অনেক কথা হয়। শালিনীর পোষ্ট ডক্টরেট এর জন্য ফেলোশিপ। রিসার্চ এর স্কোপ ইত্যাদি ইত্যাদি। 

অয়ন এখন বেঙ্গালুরুতেই থাকে নতুন কোম্পানিতে। মাঝে মাঝে চেন্নাই , দিল্লী জায় কোম্পানির কাজে। 

শালিনী এখন আর অয়ন কে অপছন্দ করেনা কেন নিজেই জানেনা। আসলে বন্ধু হিসেবেই ওকে গ্রহণ করেছে। নিজের মনকে বোঝায় বন্ধুত্বতে দোষ কি? 

ডঃ অরুণাভ চক্রবর্তীর সব সময় ব্যস্ত থাকেন নিজের রিসার্চ নিয়ে। শালিনীকে গাইড করছেন একটা নতুন বিষয় নিয়ে কার্বন নেনো টিউব বেসড সেন্সার্স। বেশ কিছু তথ্য ভিত্তিক কনফারেন্স এবং সিম্পোজিয়াম এর মধ্যে সময় কাটে সকলের। পরিবেশটা সরস্বতীর আরাধনা ছাড়া কিছু নেই। যে যার রিসার্চ নিয়ে ব্যস্ত। খাওয়ার সময় থাকেনা এদের। এরা এতোই মসগুল হয়ে থাকে রিসার্চ নিয়ে। শালিনী জীবনে অনেক রিসার্চ করলো। নতুন কাজ প্রায় শেষ হতে চলেছে। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টের টাকা এই বছর শেষ। এর পর কি? 

হঠাৎ অয়নের ফোন। হ্যালো! বল অয়ন। 

আজ শনিবার আমার অফিস ছুটি।

কিন্তু আমার নয়। 

জানি , ছুটি নাওনা!

হুম দেখছি। “আমাদের প্রোজেক্ট এর কাজ প্রায় শেষ। এবার বাড়ী যেতে হবে। ফেলোশিপের টাকা আর পাবো না। আবার সেই মায়ের ঘেন ঘেনানি”। কথাগুল্প মনে মনে ভাবে শালিনী। 

কি হল? উত্তর দিচ্ছ না কেন? 

অয়ন তোমাকে একটা কথ বলি। তুমি কিছু মনে করবে না বল। 

ঠিক আছে বল। আচ্ছা কথাটা না হয় দেখা হলেই বলবে। আমি আসছি তোমাকে নিতে। 

মানা করতে পারলো না শালিনী। কিছু একটা অলস আবেগের বসে বলে বসে “ঠিক আছে এস কিন্তু রাত করতে পারবোনা ”। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই অয়ন এসে হাজির।

চল।

কোথায়?

চলইনা। 

‘আই-নক্স’ এ SANDLER BARRYMORE ‘BLENDED’। 

হলে সিনেমা দেখতে দেখতে পপ কর্ন খাচ্ছিল দুজনে। আজ জেন শালিনী জীবনের সব বাঁধন থেকে মুক্ত। নিজেকে হারিয়ে দিতে চায় অয়নের কাছে। কিন্তু তাতে শালীনতা থাকা প্রয়োজন। 

হঠাৎ বেড় রুম সিন শালিনীকে বিব্রত করে। নায়িকার অনাবৃত বক্ষ যুগল আর ঘন ঘন চুম্বনের দৃশ্য অয়নকেও কিছুটা উত্তেজিত করে ফেলে। 

শালিনীর হাত অজান্তে স্পর্শ করে ফেলে।

শালিনী হাত সরিয়ে নেয় এবং উঠে পড়ে বলে , “চল রাত অনেক হয়েছে আমার আর ভালো লাগছেনা”। 

সেকি! মাঝ খান থেকেই চলে যাবে?

হ্যাঁ যেতেই হবে লোকের সামনে অসভ্যতামি আমি পছন্দ করি না। তোমার জানা উচিত ছিল। চোখথেকে অগ্নি বর্ষণ হচ্ছিল।

কিছু সিন ক্রিয়েটের আগেই অয়ন বাধ্য ছেলের মত উঠে পড়ে। 

অয়ন বিব্রত বোধ করে। বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সির খোঁজ করে। শেষে শালিনী আর ও উঠে পড়ে একটা ট্যাক্সিতে। কিন্তু একি! শালিনী সামনের সিটে ড্রাইভারের কাছে বসে!! 

রাস্তায় কোন কথাই হয় না। অয়ন অপরাধীর মত পেছনে চুপটি করে বাধ্য ছেলের মত বসে-পড়ে। মনে মনে ভাবে এই মহিলার জেদ ভাঙ্গতেই হবে। এটা তারকাছে চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়। কিন্তু এই মহিলা অন্যদের মত সোজা সরল নয়। এরমধ্যে সৌন্দর্যের ছিটে ফোঁটা নেই। রুক্ষ বাস্তব ধর্মী এক অহংকারী মহিলা। এর কাছে কামনা বাসনা প্রাধান্য পায়না। তবে কি সত্যি তাই? আরও ভেতোরে ঢুকতে হবে বুঝতে হবে। সে যে ব্যাপার টা করলো তাতে ভুল থেকে গেল। এখন হয়তো শালিনী আর কথা বলবে না কিছুদিন। 

শালিনীর বাসা এসে-গেল। গাড়ী-থেকে নেবে ড্রাইভারের হাতে ১০০ টাকার নোট দিয়ে বলে “ভাই সাব মিটারে কিত্না হুয়া”? 

৯০ রুপিস মাদাম। ঠিক হ্যায় রখ লিজিয়ে। 

অয়নকে গুড নাইট বলে নেবে গট গট করে হেঁটে যায় উত্তরের অপেক্ষা না রেখে। 

অয়নও ও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়।

আগামী সপ্তাহে তৃতীয় পর্ব

আবিষ্কারের নেশা

ত্রিভুবনজিৎ মুখার্জী

প্রথম পর্ব 

শালিনীর থিসিসটা “এপ্লিকেশন অফ ন্যানো টেকনোলজি ইন এপ্লায়েড ইলেক্ট্রনিক্স” যেটা ন্যানো ফিজিক্সের বিষয়। বিষয়টা একেবারে নতুন তাই ও এটা নিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থান, কলকাতা তে যোগা যোগ করতে চায়। শালিনীর প্রফেসার ওকে দিয়ে এই রিসার্চ ওয়ার্ক করিয়ে ছিলেন। নতুন বিষয়ের নতুন দিগন্ত , তাই ভুরি ভুরি প্রশংসা পায় শালিনী। আজ বাবা বেঁচে থাকলে কখনো শালিনীকে বিয়ের জন্য উৎব্যাস্ত করতেন না বরং উৎসাহ দিতেন আরো রিসার্চের জন্য।

কলেজ থেকে ফিরতে দেরি হচ্ছে। আজকে শুক্রবার। প্রায় এরকম হয় বিশেষ করে শুক্রবার। বাসে লোকে বাদুড় ঝোলার মতন অফিস ,স্কুল - কলেজ থেকে বাড়ি ফেরে। কি অবস্থা কোলকাতার! লোকগুলো প্রাণ হাতে নিয়ে যাওয়া আসা করে। 

শালিনী কি করে বাড়ি ফিরবে? উল্টো-ডাঙ্গায় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। লোকের ভিড়ে ভিড়। বাসের চেয়ে লোকের সংখ্যা ক্রমশ বেশি হচ্ছে। ও এরকম বাদুড় ঝোলার মতন বাসে উঠতে পারবে না। খুব চিন্তায় ছিল। অটো এই রুটে বেশি জায় না আজকাল। তবুও অটোর ভরসায় দাঁড়িয়ে রইল। 

হঠাৎ ‘অয়ন’ এসে ‘শালিনীর’ কাছে দাঁড়াল। 

অয়ন ঃ “ কি ব্যাপার? বাড়ি ফিরবে কি করে? বাসের অবস্থা দেখছ!” 

শালিনী ঃ “তুমি কোন দিকে যাবে?” 

আমি ‘বাঙ্গুর’ , তুমি? 

আমি ‘তেঘোরিয়া!’ 

বাসের আজ খুব বাজে অবস্থা। কেষ্টপুরে এতো রাস্তা জ্যাম থাকে , কি করে যাবে? 

যেতে ত হবেই। 

চল অটো আসছে উঠে পড়ি। দেরি করনা। 

কিন্তু কিন্তু করে অটোতে উঠলো শালিনী ...। পার্সের অবস্থা খুব একটা ভালোনা ... দুটো কুড়ি টাকার নোট আছে। তবুও অন্য উপায় নেই দেখে উঠে পডে। বাড়ি পৌঁছতে সেই সাতটা সোয়া সাতটা ত হবেই। গিয়ে স্নান সেরে কালকের ক্লাসের জন্য প্রিপারেসন। হ্যাঁ , শালিনী ‘ফিজিক্স’ পড়ায় ‘স্কটিশে’। ও , পি.এচ.ডির পর ভাবা এটমিক রিসার্চ সেন্টার (BARC) এবং ইন্সটিট্যুট অফ ফিজিক্স , ভুবনেশ্বরে এক সঙ্গে দু জায়গায় সাইন্টিস্টের জব পায় , কিন্তু কোলকাতা ছাডবেনা শালিনী! তাই স্কটিশে অধ্যাপিকার অফারটা আপাততঃ একসেপ্ট করল। 

অয়ন , শালিনীর ক্লাস মেট। ও এম.টেকের পর আই আই এম , কোলকাতা (জোকা) থেকে এম বি এ করে একটা মাল্টি ন্যাশনাল ফার্মে আছে। মাঝে মাঝে দ্যাখা হয় শালিনীর সঙ্গে ব্যাস আর কিছু না। 

কোম্পানির থেকে এই জন্য বলে গাডী কিনতে। আমি গাড়ীর লোণ নিতে কুণ্ঠা বোধ করছি কারন এই জব ছেডে দেব শিগগিরি। নতুন চাকরী ..ওই লোণের ঝামেলায় পড়তে চাই না ..... কথাগুলো একসঙ্গে বলে অটোয় উঠে পডে অয়ন। 

শালিনী ও উঠে পডে ওর পেছনে। রাস্তা ঘাটে একটা পুরুষের প্রয়োজন সঙ্গে থাকা ...তাই বিনা দ্বিধায় উঠে পডে শালিনী। 

অয়ন বাঙ্গুরে নেবে জায়। বাগুইহাটির কাছে আবার জ্যাম ..... তখন ৭টা বেজে গিয়েছে। আর একটুখানি রাস্তা ... দুর নিজের গাডী থাকলে এসবের ঝামেলা থাকেনা। কিন্তু কোলকাতার রাস্তায় ড্রাইভিং ...! রক্ষে কর! কথাটা ভাবতেই একটা গোলমালের আওয়াজ পেল। 

রে রে করে এক অটো চালক এক ভদ্রলোক এর সঙ্গে বচসা। রাস্তার লোকগুলো বোবার মতন হেঁটে পার হচ্ছে। জেন কিছুই হয় নি! নির্বিকার!! আসলে কোলকাতায় থাকলে চোখ কান মুখ সব বন্ধ রাখা দরকার। কথাগুলো কানে এল ; ৮ টাকা ভাডা ১০০ টাকা দিলে আমি কি টাকার গাছ রেখেছি? কত খুচরো নিয়ে ঘুরবো। শালা সকাল থেকে মাল পডে নি পেটে। 

লোকটিও ছাড়ার পাত্র নয় তিনিও বলছেন , আমরাই বা খুচরো পাই কোথা থেকে? একশো টাকা বার করলেই শেষ। ভদ্রলোক লোকাল বোধ হয় নাহলে এতো সাহস হবে না!সমানে বচসা চালিয়েছেন। 

আপনার কাছে ভাঙ্গানি আছে দাদা?

কত? 

২০ টাকা!

হয়েযাবে দিদি। আপনি কোথায় নাববেন? 

লোকনাথ বাবার মন্দিরের কাছে।

ওখান অবধি ২০ টাকাই ভাডা। 

শালিনী র যেন গা থেকে জ্বর নাবলো। প্রত্যেক দিন অটো আর প্যাসেঞ্জারের মারপিট রক্তা রক্তি কাগজে দেখে ওর রাস্তা ঘাটে ভয় করে। কাল খুচরো সঙ্গে রাখবে। বাসের ওপর ভরসা নেই। বাস মালিকেরা স্ট্রাইক এর ডাক দিয়েছিল। ডিসেলের যা দাম বেড়েছে! ওদের ই বা দোষ কি? তবে ভাড়া বাড়েনি রক্ষা। 

ঘরে পৌঁছে একটু ফ্রেশ হয়ে নেয় তারপর সোজা বাথরুমে ঢুকে পডে। শাওয়ার খুলে স্নান। আঃ! রোজ রোজ এই বিচ্ছিরি জার্নি যেন পোষায় না। এর একটা বিহিত করতে হবে। এ মাসে মাইনে পেলে একটা লোণ করবে ... কারের লোণ। বাজেটের পর কারের দাম কমেছে। দেখি ব্যাঙ্ক ম্যানেজার কি বলেন? শালিনীর জামাই বাবু সল্ট লেক স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। উনি যদি কিছু আডভাইস করেন ত। ওর পে সার্টিফিকেট এর জন্য কাল এপ্লাই করবে প্রিন্সিপাল কে। হয়ে যাবে বোধ হয়। তবে ও তো ইউ জি সি স্কেল পায় নি এখন। এদিকে ৭ম পে কমিশন বসে গিয়েছে। সত্যি গরিব মানুষ গুলো কি খাবে এর পর? হু হু করে যা দাম বাড়বে ইলেকশনের পর .. কি দেশের অবস্থা .. কেউ বোঝার নেই! আশ্চর্য!! 

মা চা নিয়ে হাজির। 

তুমি কেন আনলে মা? আমি নিজে করে নিতাম।

থাক মা। আর ও টুকু করতে হবে না। স্বশুর বাড়ী গিয়ে কর। এখন তোমার মা বেঁচে আছে। 

সন্ধ্যে বেলায় বাজে কথা বোলোনা মা! তুমি কি করে জানলে আমি , তোমার ওই শ্বশুর বাড়িতে যাবো বলে? 

আমার নয়.. তোমার মা , সবাই যায়। তুমিও যাবে। 

আর যদি আমি না যাই। আমি যদি তোমার কাছে থাকি। আপত্তি আছে?

আদিখ্যেতা দেখো মেয়ের! হ্যাঁ আছে মা। সব দিন তো আমি বেঁচে থাকবো না!

তোর সঙ্গে ওই ‘অয়ন’ বলে ছেলেটা পড়তো না! কেমন দেখতেরে ওকে? নিয়ে আয় না এক দিন। 

কেন বলত? আমি ডাকলেই ও আসবে কি করে বুঝলে? ওর সঙ্গে আর দেখা হয় না আমার। আমাকে ও সব বলবে না। আমার এখন কিছুই হলনা ... তোমাদের মেয়েকে বাডী থেকে বিদেই না করলে ভাত হজম হয় না? 

ও মা সে কি কথা? আমি তাই বলেছি নাকি? এই যে বললি অয়ন তোর সঙ্গে এক ই অটোতে এলো বলে!

তাতে কি হয়েছে? অটোতে এলো বলে ওমনি তাকে বাড়িতে ডাকতে হবে? তুমি যে কি না মা! আশ্চর্য! তোমরা পারো বটে!! 

ঠিক আছে , আমি তোর মামাকে বোলব একটা বিঙ্গাপন দিতে আনন্দ বাজার পত্রিকাতে, “পাত্র পাত্রী কলমে”। 

কিসের? 

চা টা খেয়ে নে মা। জুড়িয়ে যাচ্ছে যে। 

তোর বাবা বেঁচে থাকলে আমাকে কি এসব চিন্তা করতে হত রে মা? সব ই গোবিন্দের ইচ্ছা।

দেখ মা আমাকে ওই বিয়ে ফিয়ের ব্যাপারে বিরক্ত করলে আমি কিন্তু বাইরে চাকরি নিয়ে চলে যাবো। 

তবে কি সারা জীবন আইবুডো মেয়ে বসে থাকবে? 

ওই সব গেঁও কথা শুনতে আমার একদম ভাল লাগেনা। কলেজ থেকে ফিরেছি আমাকে একটু রেষ্ট নিতে দাও। তোমার ওই এক ঘেয়ে ঘ্যান ঘ্যান আমাকে এই ঘর ছাড়তে বাধ্য করবে। আমাকে পরে দোষ দিওনা! কথাটা বলে গট গট করে চায়ের কাপ হাতে নিজের ঘরে চলে গেল শালিনী। 

শালিনীর মা হতবাক হয়ে মেয়ের কথা শুনছিলেন। মনে মনে ভাবলেন আজকালকার মেয়েরা দুটো লেখা পড়া শিখে নিজেদের কি মনে করে? আমি হলাম গেঁও! কথায় বলে,“সোমত্ত মেয়ে ঘরে থাকলে মায়ের গলায় মাছের কাঁটার মতন আটকে থাকে। না পারবে গিলতে না পারবে ফেলতে।” আমার হয়েছে যতো জ্বালা!! এইবলে রান্না ঘরে চলে জান।

শালিনী র মোবাইলটা হঠাৎ বেজে উঠলো। 

হ্যালো। কে বলছেন? 

অয়ন। একটা সুখবর আছে। আমি গাড়ী কিনছি। 

তাই! কংগ্রাচুলেসন। কি গাড়ী?

ভক্স ওয়াগন এর এর ‘পোলো’ মডেলটা আমার প্রিয় ওটাই কিনছি। কোম্পানী ৪% ইন্টারেস্টে লোন দিচ্ছে। বাবা বললেন ,“কিনে নাও। এখন যা কোলকাতার রাস্তার অবস্থা , রাস্তার ধুলো আর পলিউসন থেকে রক্ষ্যা পাবে। পরে ফ্লাই ওভার হয়েগেলে গাড়ী চালাতে অসুবিধে হবে না।” ড্রাইভিং টা জানি তবে আরেকটু হাথ পাকাতে হবে। 

হুম। ঠিক বলেছেন তোমার বাবা। কবে খাওয়াচ্ছো? 

যদি বল কাল। 

কাল আমার একটা ক্লাস আছে। ঠিক আছে বোলব। বাই। 

শালিনী খুব একটা সায় দেয় না অয়ন কে। শালিনী অয়ন দুজনেই পড়া শুনয় ভাল ছিল। শালিনী র ফিজিক্স ভাল লাগতো তাই অনার্স নিয়ে পড়ে। পরে এম এস সি , পি এচ ডি। এখন ও ডক্টর শালিনী সান্যাল। 

অয়ন প্রথম থেকেই আই আই টি র জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। বি টেক এর পর ক্যাট দিয়ে জোকা তেই এম বি এ করে মার্কেটিং এ। ফেলোশিপ করতে পারতো কিন্তু ভালো চাকরির অফার পেয়ে কাজে জএন করে ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি হিসেবে। পরে মার্কেটিং ম্যানেজার হয়ে কোলকাতায় পোস্টিং পায় একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে। পে প্যাকেজ ভালো তা ছাডা কোম্পানির ফ্যাসিলিটি অনেক। 

শালিনী কোম্পানি জব একদম পছন্দ করে না। বলে গলায় লেংটি(টাই) বেঁধে কোম্পানির দালালি যা মার্কেটিং তাই। যতই মাইনে পাগ না টিচিং জব শ্রেষ্ঠ। ওতে নিজের সাবজেক্টের সম্পর্কে ছাত্র/ছাত্রী দের আকৃষ্ট করা তাদের ভালো করে বিষয়টা বোঝান। রিসার্চ করা। এ সব সমাজ সেবার কাজ। ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ আছে মার্কেটিং এ আছে? আয়ন খুব ভাল ছেলে জানি কিন্তু ও কি করল? নিজের মাথাটা কোম্পানিকে বিক্রি করে দিল! ভাল সেলস দেখালে উন্নতি নাহলে ...! এরা টাকা ছাডা জীবনে আর কিছুর মূল্য দেয়না। খুব মেটেরিয়ালিসটিক হয়ে যায়। খুব একটা শান্তিতে থাকে না। কাজের প্রেসারে খিট খিটে হয়ে যায়। অকাল বৃধ্য হয়ে চুল উঠে টাক পড়ে জায়। ম্যাগো টাকটা শালিনী একদম পছন্দ করে না। নিজেই নিজের মনে কথাগুলো ভাবতে থাকে , কিন্তু একি তারতো এ সব ভাবার দরকার নেই। মাথাটা ঝাঁকিয়ে নোট টা প্রিপায়ার করছিল বি এস সি পার্ট ওয়ানের থার্মোডাইনামিক্সের ক্লাসের জন্য। 

শালিনীর ক্লাস শেষ না হতেই অয়নের ফোন। অনিচ্ছা সত্যে কল রিসিভ করে “হ্যালো” বলল। 

আসছ ত! 

কোথায়? 

পার্ক হোটেলে। 

ও বাবা আমি ওসব জায়গায় জাইনা। আমি ফুচকা খেতে ভালো বাসি গল্প করতে করতে। 

কি ফুচকা? তুমি কি বাচ্চা? 

হ্যাঁ। তুমি চলে এস আজ আমি খাওয়াচ্ছি তোমায়। দেখবে কিরকম টেস্ট। 

সরি ম্যাডাম আমি রাস্তার জিনিষ খাই না। ওতে হেপাটাইটিস হয়। তোমার টেস্ট টা সেই স্কুল পডুয়া মেয়েদের মতন। একটু মড হও। ডক্টরেট করেও ...।

না না আমি মড কোনদিন হতে পারবো না আয়ন। আমি আমিতে থাকতে চাই। 

তবে তোমার সঙ্গে আমার কেমিস্ট্রি ঠিক মিলবে না।

আমিত মেলাতে চাইনা। তুমি কল করেছিলে আমি করি নি। আর কেমিস্ট্রি র কথা আসছে কোথা থেকে? আমরা শুধু বন্ধু তাই নয় কি? 

অয়ন অপমানিত মনে করল নিজেকে। ছিঃ একটা অর্ডিনারি শিক্ষিকা সে কিনা এতো ডাঁটের কথা বলে! আর না। ওকে বাই এজ ইউ লাইক। বলে ফোন কেটে দিল। 

শালিনী ওটাই চাইছিল। ও এক দম ওই হোটেলে বসে হ্যা হ্যা করে শস্তা মেয়েদের মত কারুর ঘাডে খাওয়া পছন্দ করে না। নিজের ঘর আর কলেজ ছাডা কোথাউ কারুর সঙ্গে যায়নি। প্রফেসাররা তাই ওকে খুব স্নেহ করতেন ইউনিভার্সিটিতে। 

এদিকে মা , মামাকে দিয়ে এক বিঙ্গাপণ দিয়েছেন। হঠাৎ রবিবারের আনন্দ বাজার পত্রিকায় পাত্র পাত্রী বিঙ্গাপনের পেজটাতে লাল কালি দিয়ে গোল করা দেখে বিস্ময় হয় শালিনীর। পডে দ্যাখে , ওমা এত তার জন্যই ...। আশুক মামা দেখাচ্ছি মজা। আমাকে কি পেয়েছে এরা। একটা কমডিটি না কি? খুব রাগ হয় মা’র ওপর। 

হঠাৎ ল্যান্ড ফোনে রিং হয়। ও ঘর থেকে মা ছুটে আসেন ফোন ধরতে। 

হ্যালো! কে বলছেন? 

আপনি একটা বিঙ্গাপণ দিয়েছেন ...।

হ্যাঁ। 

মায়ের কাছ থেকে ফোনটা ছাডিয়ে ... মেয়ের মাথা খারাপ আছে আর কালো বেঁটে চলবে!! 

ও দিক থেকে লাইন কেটে যায়। 

একি করলি শালু?

ঠিক করেছি। যার বিয়ে তার মতা মত নিয়েছ? কি ভাব তোমরা? আমি গোলাম না বাজারের মাছ? কি ভাবো তোমরা?? এরকম করলে আমি সত্যি ঘর ছেড়ে চলে যাব। রাগে থর থর করে কাঁপে শালু।

মায়ের চোখ থেকে অবিরাম অশ্রু। মা চায়ের কাপটা শালুর হাতে দিয়ে বলেন আমাকে শান্তিতে মরতে দিবি না তুই? তোর বাবা আমাকে কি জ্বালা যন্ত্রণায় রেখে গেলেন। 

তুমি শান্ত হও মা।বাবকে কেন টানছ এর মধ্যে। তোমার গলার কাঁটা আমি.. বাবার ছিলাম না! আমার বিয়ের কথা একদম ভেবো না। সময় হলে আমি নিজেই তোমাকে বলব। তবে এখন না। শান্ত হও। আমার অনেক কাজ বাকি।

আমি জানি রে সে দিন আসবে না। আমি ত তোর মা আমি জানি তোকে! তুই মা’ হলে বুঝবি।

আমার ওইরকম মা হওয়ার প্রয়োজন নেই যে মা তার সন্তানকে বুঝতে চায় না!

এই কাটা কাটা কথা আমি সহ্য করব কিন্তু পরের ছেলে সহ্য করবে কেন? 

আমিতো কারুর মাথার দিব্বি দি নি আমার কথা সহ্য করতে। তুমি কেন আমাকে বুঝতে চেষ্টা করনা। আমি আর পাঁচটা মেয়ের মত স্বামী ঘর দোর বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে থাকতে চাই না পৃথিবীতে। পৃথিবীতে আরও অনেক কাজ আছে যা মেয়েরা করতে পারবে। করা উচিৎ বলে আমি মনে করি। এই বিশাল পৃথিবী তার প্রত্যেক কোনে আছে বিভিন্ন মানুষ তারা সুধু বাচ্চা জন্ম না দিয়ে দেশের অনেক উপকারে আস্তে পারে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ এই জন্য অসফল হচ্ছে আমাদের দেশে। ছেলে মেয়ে চাকরি পেলেই মা বাবাদের মাথা ব্যথা ছেলে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে সংসারী করা। এতে কি হচ্ছে? অনেক ভাল ব্রেন নষ্ট হচ্ছে। 

আমি অত পডাশুন করিনি তোর মত। আমি তাই জানিনা মা। আমার ভাবনা চিন্তা তোর সঙ্গে কোন দিন খাপ খায় নি........... 

বেলা বারোটা নাগাদ দিদি জামাই বাবু এলেন। সঙ্গে টুকাই। 

মা রকমারি রান্না করে রেখেছেন। সেকেলে শ্বাশুডিদের মত মাথায় ঘোমটা দিয়ে জামাই বাবু কে বলেন, “এসো বাবা এসো।” 

টুকাই শালিনীকে দেখে দউডে আসে। মাসি আমার ক্যাডবেরি তা দাও। 

দাঁড়া আনছি বলে ফ্রিজের দিকে এগুলো।

শ্রাবন্তি, শালিনীর দিদি আর অর্ক শালিনীর জামাই বাবু। দুজনেই মাকে কিছু জিঙ্গাসা করতে যাচ্ছিল শালিনীকে দেখে চুপসে গেল। 

শালিনী বুঝেও না বোঝার ভান করল। জিজু কি খবর তোমার? অর্ক কে দেখে বলল শালিনী।

তুমি না থাকলে মন উদাস থাকে সখী। 

তাই তবে দিদিকে ছেড়ে এখানেই থাক ঘর জামাই হয়ে। 

তাও আচ্ছা সখী। 

তবেরে দেখাচ্ছি তোমাকে। 

সকলে হেঁসে ফেলে। সত্যি অর্ক-দা খুব মাই ডিয়ার। 

টুকাই বলে ,“ঘর জামাই কি গো মা”? 

গোয়ালে চাষির ঘরের বলদ। গলায় দড়ি বাঁধা থাকে খেতে দিলে খায় আর জোয়াল কাঁধে গরুর গাড়ী টানে। তাকে বলে ঘর জামাই। বুঝলি।

যা: কি সব বাজে কথা বলে মা। একদম বাজে। মিথ্যা কথা বলছ তুমি। 

শালিনী , টুকাইকে ক্যাডবেরি দিয়ে বোঝায় পরের ছেলেকে ঘরে খাইয়ে দাইয়ে রাখাকে ঘর জামাই বলে। এখন এটুকু জান পরে বড হলে পুরোটা জানবি।

অর্ক বলেন, “শালু তোর জন্য তবে তাই দেখি।” 

ভাল হবেনা বলছি অর্ক-দা। 

তোর অয়নের খবর কি? আমাকে ফোন নাম্বারটা দে না! আমি কথা বলে দেখি। 

তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে শালিনী। কি? সে খবর ও মা তোমাদের দিয়েছে। 

মা! মা! 

কি হল? অত চ্যাঁচাচ্ছিস কেন?

তুমি কেন এই সব বল আমার নামে। কি পাও? 

কি বলেছি? 

গট গট করে নিজের ঘরে ঢুকে জায় শালিনী।

কম্প্যুটার খুলে সিভি ফাইলটা খোলে। মনে মনে ভাবে বার্কের কিম্বা ইন্সটিট্যুট অফ ফিজিক্সের চাকরিটাতে আবার এপ্লাই করব। খুব ভুল হয়েছে ঘরে থাকা। বাইরে গেলে এক্সপোসার হবে। এই স্কটিশে আমার ভবিষ্যৎ কি? ইউ জি সি পেতে অনেক দেরি। সেই থোড় বডি খাড়া ... খাড়া বডি থোড়!! ওর প্রফেসারের সঙ্গে যোগা যোগ করে হায়ার রিসার্চের কথা মনে মনে চিন্তা করে। বাবা ওর নামে যে টাকা রেখে গিয়েছেন সেটা নিয়ে ফরেনের কোন ভাল ইউনিভার্সিটিতে পোষ্ট ডক্টরেট রিসার্চ করলে উন্নতি আছে। বিদেশের ডিগ্রীর দাম আছে। শালিনীর থিসিসটা “এপ্লিকেশন অফ ন্যানো টেকনোলজি ইন এপ্লায়েড ইলেক্ট্রনিক্স” যেটা ন্যানো ফিজিক্সের বিষয়। বিষয়টা একেবারে নতুন তাই ও এটা নিয়ে ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থান, কলকাতা তে যোগা যোগ করতে চায়। শালিনীর প্রফেসার ওকে দিয়ে এই রিসার্চ ওয়ার্ক করিয়ে ছিলেন। নতুন বিষয়ের নতুন দিগন্ত , তাই ভুরি ভুরি প্রশংসা পায় শালিনী। আজ বাবা বেঁচে থাকলে কখনো শালিনীকে বিয়ের জন্য উৎব্যাস্ত করতেন না বরং উৎসাহ দিতেন আরো রিসার্চের জন্য। ওর প্রফেসার বিদেশে অনেক ভালো অফার পেয়েছিলেন কিন্তু উনি ভারতে ফিরে কোলকাতা ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতাই শ্রেয় মনে করেন। সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শালিনী স্কটিশে অধ্যাপিকার চাকরিতে যোগদান করে। কিন্তু ওখানেও মন বসে না কারন ও আরও অনেক রিসার্চ করতে চায়। আমেরিকাতে গেলে সম্ভব। আমেরিকা জাওয়ার টাকা নেই। যেটুকু পুঁজি আছে সেটা ফুরলে চলবে কি করে? তাই কোলকাতা থেকেই রিসার্চ এর চিন্তা করে। 

স্কটিশ থেকে ছুটি নিয়ে নেয় এক মাসের। মনে অনেক স্বপ্ন অনেক আশা উদ্দীপনা আর আবিষ্কারের ব্যগ্রতা ওকে সব পেছনে ফেলে এগিয়ে নিয়েছে। পোষ্ট ডক্টরাল প্রোগ্রাম এর জন্য ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থান, কলকাতা তে সিলেক্টেড হয়। ফেলোশিপের টাকায় অনায়াসে চলবে। আর শালিনীকে কেউ বিরক্ত করবে না বিয়ের জন্য।

পরের সপ্তাহে দ্বিতীয় পর্ব

অসম্পুরণ বৃত্ত

কৃশানু নস্কর

আমাদের রংপুরের বাড়ির দেউরিতে হটাৎ হই হই শব্দ হতে থাকে। বারান্দা দিয়ে  উকি মেরে দেখি সে এক ধুন্ডুমার কাণ্ড, সবাই ডাকাত ডাকাত করে চিৎকার সুরু করেছে। আমার ছোটো কাকু আমাদের বাড়ির মেয়েদের চিলেকোঠার ঘরে বন্ধো করে সক্কলকে চুপ করে থাকতে বলে। দম বন্ধো করা ওই  স্যাঁতস্যাঁতে ঘুপচি ঘরে আমরা অতোগুলো মহিলা,  আর বাইরে ঘনো ঘনো রোষের আওয়াজ আর চিৎকার, সব মিলে মিশে ওষ্ঠাগত প্রাণ। হটাত গুলির কী বিকট আওয়াজ, কিছুক্ষণের মধ্যে মশালের মতও দপ দপ আলগুলো গ্রামের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লো। অনেকে ঐ ঘর থেকে চলে গেলেও আমি ওই ঘরেই কিভাবে যে ঘুমিয়ে পরি, বুঝিনি। সকালে উঠে দেখি আমার বাবা তাড়াহুড়ো করে আমাকে আর মাকে নিয়ে নীচের মন্দির দালানে এসেছে। সেখানে দাড়িয়ে দেখি আমাদের পুরো বাড়িটা লন্ডোভণ্ড। সেদিন নাকি দৈনিক পত্রিকাতেও বের হয় যে লাল দল এসে রংপুরের জমিদার বাড়ি হামলা করে, আর সকল দলিল দস্তাবেজ পুড়িয়ে দেয়........।

আমার বাবা ওইসব ঝুট ঝামেলার মধ্যে পড়তে চাইছিলনা না বলে আমাদের নিয়ে তাড়াহুড়ো করে শহরে নিয়ে চলে যেতে চাইছিল। আমার মন তখন ভিসন বিষণ্ণ.  প্রয়োজনীয় ব্যাগ পাঁটরা নিয়ে একটি মোটর ভ্যানে আমরা রওনা দিই নিকটবর্তী হাসদি রেলওয়ে স্তেসনে, আর সেখান থেকে আমি মা আর ন কাকা আসি কলকাতায়। বাবা ওনার বেবসা পাত্তারি গুছিএ সপ্তখানেকের মধ্যে ফিরে আসে কলকাতায়। ওই রাত্রের ঘটনার পর আমরা যে তাড়াহুড়ো করে হটাত কলকাতাই চলে আসি, তার পিছনে দুটো কারণ ছিলো, যা কয়েক বছর পরে আমি জানতে পারি; একটা তো ওই রাতের ঘটনা, আর একটা!!

কলকাতায় প্রথমে প্রথমে খুবই অস্বস্তি হতে থাকে আমার, খোলমেলা নই একদমই, মানুষ জনও কেমন সিমাবদ্ধ, আমার একটি বছর পড়াশোনাও ক্ষতি হয়। এখানে এসে আবার আমি কোলেজে প্রথম বরষে ভর্তি হই। কলকাতা  শহরের অবস্থাও তখন আমাদের গ্রামের মতই টালমাটাল, সত্তরের দশক, রাস্তা ঘাট দেঅআল পোস্টারে সব যায়গাএ লাল ই লাল। একবার তো কলেজে হটাত ক্লআসের বাইরে দৌড়োদৌড়ি, বোমের আওয়াজ// সেই গুলি; বন্দুক; লুণ্ঠন আর দাবনল। সময়ের সাথে পরিবেষ আস্তে আস্তে কিছুটা ঠিক হয়, আমিও ধীরে ধীরে মানিএ নিতে থাকি এই নতুন মানুষজনেদের সাথে। নতুন বন্ধু; রেস্তোরা; রঙ্গিন দুনিয়া, ধীরে ধীরে কেমন জেনো ওই গ্রামের সোঁদা গন্ধ আমার শরির থেকে ঝরে উবে যায়। উন্মাদোনা আর উত্তেজনা আমাকে ঘিরে রাখে সারাক্ষণ। কিছু বড়ো আর ভালো করে দেখানোর চেষ্টা আর প্রচুর সুখের জনে বিভোর্ হতে থাকি। আমার পড়াশোনা পরিবেশ-বিজ্ঞান নিয়ে, যা ওই সময়ে ভিষন চাহিদার ছিলো, বিশেষত বাইরের দেশগুলোতে। যথযাতো ভাবে কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি স্কলারসিপ পেয়ে পারি দেই আমেরিকাতে আর ফেলোশিপস শেষ হতে না হতেই ওখানকার একটি কলেজে জুনিওর লেকচারার হিসাবে কাজও পেয়ে যাই। ধীরে ধীরে আরও একটি পরিবেষের সঙ্গে মানিয়ে নিই, এবারে জেনো একটু তাড়াতাড়িই হয়ে গেছিল সবকিছু। এরই মধ্যে আমার বিয়ে হয় একজন বিদেশীর সাথে, উনিও এখানে আমার মতো একটি কলেজে সিনিওর  লেকচারার। আমার কলকাতা যাওয়া আসা প্রথমের দিকে বছরে একবার, আস্তে আস্তে দু বছরে, এখন তো পাচ সাত বছরে একবার; তাও হয়ে ওঠেনা। বিয়ের এক বছরের মধেই আমার বাবা মারা জান আর তার দু মাসের মধেই আমার মা। এই পৃথিবীতে ধীরে ধীরে বড়ো একা হয়ে পড়ি আমি। বাঁচার রসদ বলতে আমার দুটি পুত্র সন্তান যাদের আমি স্বদেশী শিষ্টাচার ও আচার-বিচারে বর করে তুলেছি। আমার বয়স বাড়তে থাকে, চল্লিস পইতাল্লিস ছুঁইছুঁই, ধীরে ধীরে আমার ওই উদ্দম আর অনেক সুখের খোজার জিঘাংসা কেমন জেনো ঝাপ্‌সা হতে থাকে। কোনো কিছুতেই আমার মন বসতে চাই না। আমার এতকিছুর মধ্যেও রংপুরের ওই রাতটি আমাকে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়ায়, ঘেমে যায় আমার সারা সরির কপাল মাথা। 

আমার দেশের একমাত্র যোগাযোগ বলতে আমার যেততুতো দাদা হর্ষ। আমাকে এই কিছুদিন হল সে একটি চিঠি পাতায় এই উল্লেখ করে যে, ওদের পরিবারে নিত্তও কোলাহল ও সংসারীক ঝামেলার জননো আমাদের রংপুরের বাড়ির নাকি ভাগাভাগি হবে। আমার প্রাপ্য পইসাকরি ও বিভিন্ন বইসইক কাগজে সই এর জননে ডেকে পাঠায় রংপুরে। আমার দাদা যে আমায় মিস্টি বলে এখনো মনে রেখেছে তা চিঠিতে পড়ে আমার পুরাতন সব স্মৃতি মনে পরে যায়। আমার সম্পত্তির কোনও লোভ নেই, তবু কেনো জানিনা শেষবারের মতো যেতে চাই, দেখতে চাই, আমার ফেলে আসা সব কিছু। আমার ছেলেদের দেখাতে চাই আমার ছোটবেলার গ্রাম/আমার জান্মস্তান। এখন মনে করি যে জীবনের সব থেকে মূল্যবান সময়টুকু আমি ওই রংপুরে ফেলে এসেছি, আমার শৈশব, কিশোর, অর্ধ-যৌবন। আমি জানতাম, আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পরে কিন্তু রংপুর আমাকে কোনো দিনও ভুলতে পারবে না। 

আমাদের গ্রাম ছাড়ার যে দুটি কারণের কথা এক্কেবারে প্রথমে উল্লেখ করেছিলাম, তার মধ্যে একটি হল ওই লাল দল আর দ্বিতীয়টি হলো, সমরেশ; আমার প্রথম প্রেম। রংপুর মহাবিদদালয়ের প্রথম বরসের ছাত্র ছিলাম আমরা, আমি বায়োলজি আর ও রাসষস্ত্রবিজ্ঞানের।

আমাকে রোজ একটা করে কবিতা উপহার দিতো সে আর আমি দিতাম আমার হাতে তৈরি পুতুল। সমরেশই প্রথম আমাকে স্বাধীন ভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল। নিম্নওমধহবর্তী পরিবারের ছেলে ছিল সমরেশ, বাড়ি ছিল গ্রামান্তরে। বিদেশী চিন্তাধারার বই পড়ত সবসময়, চিন;  রাসিয়া; লাতিন আমেরিকার বিপ্লবের কথা বলত, আরও কতকিছু, আর আমি সুধু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হা করে শুনতাম আর কত কি ভাবতাম। আমি, সমরেশ ও আমার প্রিও বন্ধু ঝিলিক কতো মোজই না করেছি এই রংপুরে। চিদম নদীর ঘাট, গোশাইপাড়ায় যাত্রা দেখা, কলেজ কাট মেরে সিনেমা দেখতে সদরে। এমনকি আমি আর ও পালীয়েও যাবো ভেবেছিলাম। হটাত একদিন কলেজে এসে শুনি ওর নাকি মাের খুব শরীর খারাপ, আর তার জন্য সদরে গেছে দুসপ্তার জন্য মায়ের চিকিৎসা করাতে।  ইতিমধ্যে আমার বাবা জানতে পারে আমার আর সমরেশ এর ব্যাপারে, সমরেশ যেহেতু আমায় না বোলে চলে যাই, তাই খানিকটা অভিমান কোরে আর খানিকটা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে, আমি অনেকটা সাবধানী হয়ে পড়ি। সেই রাতের ঘটনার পর থেকে, আজ অবধি জাতোবারই সমরেশ কে নিয়ে আমি বাড়িতে জিজ্ঞাসা করেছি, ততবারই আমার প্রশ্নের আমূল না দিয়ে এড়িয়ে যায় সকলে।  

ইতিমধ্যে আমি গ্রামে ফিরে সমরেশের খবর করতে, আমার প্রিয় দাদা হর্ষ, আমায় জানাই, যে সেই ভয়াবহ ডাকাতির কথা, ওই লাল দলের মধে নাকি সমরেশও ছিলো একজন। আমাদের বাড়তে যা ডাকাতি হবে তা আগে থেকেই টের পেয়ে পুলিস মোতায়েন ছিলো, যা আমরাও যানতম না।  সেরাতে যে গুলি চলেছিলো তাতে সমরেশ মারা যায়। তাহলে যে সদরে আর ওর মায়ের অসুখ, ওটা মিথহা ছিল; সমরেস বোম বানানো সিখতে গিয়েছিল সদরে। সেই ছোটবেলাতেই ওর হাত ধরে সপথ নিয়েছিলাম বাঁচব আর মরবো যে একসাথে। একটিবারও কেন মনে করলনা আমাকে ছেড়ে চলে জাবার আগে, হইত এতটাই ভালবাসত যে সে জানত তার সাথে আমার কোনও ভবিষ্যৎ ছিলনা।  একটী বারের জননেও যদি সেই রাতের বলতেই বেরইএ পরতাম, গুলিটা যদি আমার বুকে নিতাম, ওর স্ত্রী হোএ যদি কাটাতে পারতাম সারাটা জীবন। এই শহর-সমাজ-হিংসা-হনহানীতে আমি বেঁচে থেকেও মৃতো ছিলাম যে এতগুলো বছর। রাত হয় হর্ষদা আসে, সব কাগজে সই করে দেই, যেখানে যেখানে বলে...সবকটা জাইগাতেই। আমার কেনো জানি না এক মুহূর্তের জননো  থাকতে ইচ্ছা করছিলো ওই গ্রামটতে। সকাল হতে না হতেই আমরা ট্যাক্সি করে রওনা দেই স্টেশনের পথে। চিদাম নদী সুখিএ গেছে, বড়ো বড়ো বাড়ি ঘিরে ফেলেছে গ্রামটাকে কাচির মতো, শুনতে পাই ঝিলিক নাকি গ্রামের একটা ছেলের সাথে বিএ করে বেশ সুখে আছে। রাস্তার দুদিকে মানুষ ওবাক দৃশটিতে তাকিয়ে থাকে আমার বিদেশী সন্তানদের দেখে। ঐ সেই চোখগুলো, ফিরে ফিরে আবার বাঈশ বছর পর, সেদিন সকালেও এরা সব জানত আর আজও।

এই মন এই দেহ

রেজা নু

সাত

সকাল না হতেই খবর ছড়িয়েছে। লতিফ সর্দারের বাড়িতে লোকজন আসছে। আসমা কার সাথে গিয়েছে জানাজানি হলেও কোথায় উঠেছে তা অনুমান করবার চেষ্টা চলছে। একজন বলল, ‘দবিরির পাছায় বাড়ি দিলি বের হবেনে কুতায় গেচে। সাথে সাথে বেশ কিছু পায়ের শব্দ রাস্তায় নামলো। কিছুক্ষণ পরে উঠোনে উবু হয়ে আছড়ে পড়লো দবির। হাত পেছনে বেঁধে দড়াম করে ঠেলে ফেলেছে কেউ। মোচড় দিয়ে উঠতে গেল। ঘুমচোখে চারদিকে ঝাঁপসা দেখছে। ভীড় ঠেলে আসমার মা এগিয়ে এসে মুখ দবিরের চোখের কাছে এনে জানতে চাইলেন, ‘তুই আইলি না কমাস আগে আমাগের বাড়ি? আসমা তুগের ফুল দেলে। ভাবিলাম, গিরামের ছেইলে তুরা। ভালমানসির মতো লাগদিলো তো সেদিন। মনে মনে এইরাম তাতো ভাবিনি। আমার মাইয়ে কনে তাই ক। ঠাস করে চড়ের শব্দ হলো। এরপরে প্রচˆ ঘুষি-বর্ষণ। মৌচাকের মতো ঘিরে ঘরলো সবাই। কান্না আর গোঙানির ভেতর আসমা কোথায় আছে, বলতে লাগলো দবির।   


তখনই কিছু লোক চলে গেলো কৃষ্ণ নগরে। উত্তমের মামা কিছুতেই ভাগ্নেকে তাদের হাতে তুলে দিতে রাজি হলেন না। কথা কাটাকাটি শুনে বের হয়ে এলো উত্তম। একগুছ আগুনবর্ণ চোখ তার ওপরে। 

‘আপনারা যান, আমি আসমাকে নিয়ে একটু পরেই বাড়ি আসছি। মামার সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না।

‘তুমি খুব ভাল ব্যাভার করিচাও গিরামের মাইয়ের সাতে। তুমার মুকি মানায় না এইরাম কতা।

‘আমি আসমাকে ভালবাসি ভাই। ভালবাসা কি অন্যায়?

‘ন্যায়-অন্যায় সালিসি ফায়সালা হবে। স্ুলমাঠে লোকজন আইয়েচে। হেডস্যার বিচার করবে।

‘বিচার যিনিই করেন, আমরা হাজির থাকবো। আপনারা এখন আসেন।


খোলামাঠে হাতলওয়ালা চেয়ারে ওবায়েদ মাস্টার বসা। তাঁর দুপাশে গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। লোকজন গোল হয়ে দেখছে। মাঝখানে, একটি চেয়ারে আসমা বসেছে। উত্তম পাশেই দাঁড়ানো। দবির জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে ঘাসে।

‘উত্তম, তোমরা দুজনই আমার স্টুডেন্ট। পড়াশোনায় ভাল। ান-গরিমাও মন্দ বলে মনে হয়নি কোনওদিন। এ-কি করলে?

‘স্যার, বেয়াদবী নেবেন না। আমরা তো ভালবেসেছি।

‘এ একটা অসম সমর্ক। তুমি হিন্দু, আসমা মুসলমান।

‘আপনি ানী মানুষ। অনেক কিছু আপনার কাছ থেকেই শেখা স্যার। আপনার চাইতে মনের ভাষা আর কে ভাল বুঝবে? কথাগুলো বলে স্যারের মুখের দিকে তাকাল উত্তম। ওবায়েদ মাস্টার মাথা চুলকালেন। 

‘হিন্দু হয়েও কাস্টে না মিললে তুমি হিন্দু মেয়ে বিয়ে করতে পারবা না, মুসলমানের মেয়ের দিকে হাত বাড়াও কোন্ ভরসায়? গ্রামের-প্রধান প্রশ্ন ছুঁড়লেন। 

‘হাত আমি বাড়াইনি মোড়ল সাহেব। অন্তর বিছিয়েছিলাম, খোলা মাঠের মতো। আসমাকে আমি, শুধু আমারই জেনেছি। ও-ও আমাকে।

এতক্ষণ নীরবতা ছিল। উত্তমের কথার পরপরই বেশ গলা চড়ালো কেউ কেউ। মোড়ল সাহেব হাত ইশারায় চুপ থাকতে বললেন। আসমার দিকে তাকালেন।

‘হিন্দু ছেইলের সাতে বিয়ে শরীয়তে হারাম জানো না তুমি? আসমা এতক্ষণ কথার সময় সবার মুখের দিকে নির্বিকার চোখে দেখছিল। মোড়লের কথায় সচকিত হলো। সির চোখে তাকিয়ে থাকলো।

‘হৃদয় মানুষ চেনে, ধর্ম চেনে না, মোড়ল সাহেব। আর শরীয়তে কোনও মেয়ের দিকে নজর পড়লে বিদু্যত বেগে চোখ সরানোর বিধান আছে। এই মজলিসে আপনি আমার দিকে কয়বার কয় নজরে তাকিয়েছেন কসম করে বলেন। 


গুঞ্জন উঠলো মানব-বত্তে। ফিক করে হেসে দিলো সবাই।

‘কী এত বড় কতা। এই পুঁচকে মেয়ে, মানুষ চেনো না তুমি?

‘আগে চিনতাম না, এখন চিনেছি। এমনকি যাকে ভালবাসলাম, তাকেও আজ নতুন করে জানলাম। মনের হিসাব-কিতাব সবসময় মেলে না। অনেক কিছু শুধু আলোতেই দেখা যায় না, অন্ধকারেও কারও কারও রূপ বেশি করে ভেসে ওঠে।

‘কি  বলতি চাও আসমা? 

‘বলতে চাই, পুরুষের কাছে একটা মেয়ে, শুধুই মেয়ে। সুবিধামতো জায়গায় তারা শুধুই পুরুষ হয়ে ওঠে। না প্রেমিক, না বন্ধু।

‘কী হইয়েচে নির্ভয়ে বলো।

‘ভয় আর কোথায়? মানব-বনে হরিণী হয়ে জন যার, অহরহ অকারণ ভীরুতা তার সারা জীবনের সঙ্গী। সেই ভয় টুকুও  নেই এখন। আজ আলো-অন্ধকারের বিভেদ খুলে দিই দাঁড়ান।

‘পর্াির কইরে কও


উত্তম ও দবির দুজনের দিকে ঠাˆা করুণ চোখে তাকাল আসমা। দষ্টি চারদিকে একবার ঘুরিয়ে আঙুল উঠিয়ে বলল, ওরা আমার শরীরে বিদু্যত ঢেলেছে মোড়ল সাহেব। সেই বিদু্যতে আলো হয় না। অন্ধকার বাড়ায়। দুজন তো দুই বিশ্াসের। কিন শরীর মননে প্রথমজনের থেকে দ্বিতীয় জনের সময় আলাদা করে কিছু তো টের পাইনি ! 

‘হায়, হায়। বলো কি?

‘ঠিকই বলছি।  তবু আমি তারে ভালবাসি।

‘এরপরও?

‘হ্যাঁ, এরপরও। হয়ত উত্তম ক্ষণিকের তাড়নায় করেছে এমন। আরেকজন নিয়েছে সময়ের ফসল। আমাকে  চলতে তো হবে। পার কি আর পদচিহ্ন মনে রাখলে চলে?  মেয়েরা তো মত্তিকার চেয়ে কম কিছু না। ধরিত্রি দেখে না, কোন্ কিষাণ কর্ষণ করে কিসে, ফসল ঠিকই দেয়।


ভিড়ের ভেতর পাথর হয়ে বসে ছিলেন আসমার বাবা। একজন হাতে ধরে ওঠালো। কানে কানে কথা বলতে বলতে পাঞ্জাবীর পকেটে কিছু রাখলো। এগিয়ে গিয়ে মেয়ের হাত ধরলেন লতিফ। 

‘চল্, বাড়ি চল্ । আর পাগলামি করিস নে মা।

‘তুমি যিকেনে নিয়ে যাও, যাবো আববা। কিন উত্তমরে ভুলতি পারবো না।

‘তোর মা কানতি কানতি পাগল হইয়ে গেচে। আমাগের চাইয়ে ওই ছ্যামড়া তোর কাচে বেশি আপন?

‘তুমরা তো বাপ-মা। তুমাদের জন্যি ভালবাসা তো  আলাদা আববা। কেন বুজদি চাও না?

‘সব বুজি রে মা। একন বাড়ি চল্ ।


সন্ধ্যার পর বিজলি গিয়ে আর আসেনি। আসমাদের বাড়িতে অন্ধকার উবু হয়ে আছে।  রান্নাঘরের চুলার আগুন ফুঁসে ফুঁসে উঠছে। সেই আলো ছলকে ছড়িয়ে যাছে উঠোনে। জলচৌকিতে বসে আছে আসমা। একটা দরোজার পাল্লা বাতাসে খুলে আবার ভেজিয়ে দিছে। রান্না করতে করতে মা চোখ-নাক মুছছেন। পেটে প্রচˆ ক্ষুধা আসমার। চোখে রাজ্যের অবসাদ। 


 বেলতলা থেকে এসে রান্নাঘরে গেলেন লতিফ। পিঁড়ে টেনে বসলেন। ভারীচোখে তাকালেন।

‘কান্নাকাটি কইরে না জাহানারা। মাইয়ের মন এখন ওর নিজিরও হাতছাড়া। আইজ হোজ কাইল হোক, চইলে আবার ও যাবে। ওই ওর সাতে। ইডা আমাগের কপাল।


দুচোখ ভেসে যাছে জাহানারার। ঝম করে তাকালেন স্ামীর দিকে। লতিফ আবারও মুখ খুললেন, আজ সালিসির সুমায় চেয়ারম্যান দেকা কইরেচে আমার সাতে। হেডমাস্টার আর মোড়ল সাহেব বিচার কইরেচে বইলে মুরুববীগের সামনে কিচু বলিনি। এত কোম বয়েসে চেয়া্যারম্যান হলি যা হয়। তা, আইসে এটটা জিনিস দেলে আর কিছু কতা বইললো। বলতে বলতে পকেট থেকে ছোট্ট একটা শিশি বের করে মাটিতে রাখলেন। 

‘আইজ রাত্তির ভাতের সাতে মিশুইয়ে মাইয়েরে খাওয়াই দিয়েনে। মাইয়ে যায় যাক, মান সমান বাঁচুক।

জলভরা দুটো চোখ যেন ঠিকরে বের হয়ে আসবে। জাহানারার এমন দষ্টি দেখে ভয় পেলেন লতিফ। চোখ নামিয়ে নেমে এলেন উঠোনে। 


শিশিটা আঁচলে গুঁজে আসমাকে ডাকলেন। ভাত বাড়তে বাড়তে মেয়েকে দেখছেন। তরকারি মেখে ভাত মুখে দেবার আগে মার দিকে তাকাল আসমা।

‘তুমিও খাইয়ে ন্যাও মা। তুমার মুখ শুকনো। খুব ক্ষিদে লাইগেচে বুজতি পারতিচি।

‘আমার চিন্তা তোর করা লাগবে না। তুই খাইয়ে শুইয়ে পড়।

‘রাগ কইরে না মা। আমার মনে বড় কষ্ট।

‘আমার মনে শান্তির বইন্যে বচে তা দেখতি পাছিস নে?


আসমা কথা বাড়ালো না। খেয়ে দেয়ে চুপচাপ নিজের ঘরে গেল। অন্যদিন জানালা খুলে শোয়। আজ বন্ধ রাখলো। বিজলি এখনও আসেনি। লাইনে মনে হয় বড় কোনো সমস্যা হয়েছে। তারটার ছিঁড়ে গিয়ে থাকবে। হারিকেনের আলো নিবু করে দিয়ে বিছানায় শরীর মেলে দিতেই বুঁজে এলো চোখের পাতা।


সকালে বাবার কান্নায় ঘুম ভাঙল আসমার। গরুর জাবনা দিয়ে এসে লতিফ দেখেন, বউ বিছানায় নেই। এদিক ওদিক তাকাতেই ফুলের বাগানের বেড়ায় শাড়ীর আঁচল ঝুলছে দেখতে পেলেন। এগিয়ে গিয়ে দেখেন মাটিতে শুয়ে আছে জাহানারা। মুখে ফেনা। কালচে-নীল চোখ দুটো চুপ হয়ে আছে আকাশমুখি গাঁদা ফুলের দিকে।

(শেষ)

এই মন এই দেহ

রেজা নু

পাঁচ

হেমন্তের শেষাশেষি। শীত আসি আসি। সকাল থেকে প্রায় শীতার্ত হাওয়া বয়। হিম হাওয়া গায়ে মেখে হালিমাদের পুকুরে স্ান করতে আসে উত্তম। ধীরে ধীরে হালিমার মার সাথেও সখ্য হয়েছে। মধুর ব্যবহারে মু হয়েছেন মহিলা। একসময় হালিমার মা সার্কাসে নাচতেন। তাই গানের দল বা অভিনয়ের আলাপে সময় বয়ে যায়। প্রায়ই বন্ধুর হাত ধরে পুকুরপাড়ে বনটাতে আসমা-ও আসে। কলেজ থেকে ফিরে বই নিয়েই হালিমাদের বাড়িতে পা ফেলে। সারাবিকেল কাটে বনের ঝুলোনায়। মাঝে মাঝে বনের গভীরে চলে যায় আসমা আর উত্তম। ঝালমুড়ি দিতে গিয়ে হালিমা উত্কর্ণ হয়ে শোনে ওদের কথা। কিছু বোঝে, কিছু বুঝতে পারে না। আলতো পায়ে অজান্তেও গিয়ে দেখেছে, সামনা-সামনি বসে আছে পাতার পরে। নির্বাক। শুধুই দেখে দুজন দুজনকে, মাঝে মাঝে ঠোঁট নড়ে সির হয়ে যায়। মুচকি হেসে কেশে কাছে যায়। আসমা হাত ধরে বসায়। তিনজনে মিলে গল্পে গল্পে বিকেলটা সন্ধ্যা বানিয়ে দেয়। 


রাজগঞ্জ বাজারে বাবার ঔষধের দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছে উত্তম। রাত তেমন হয়নি। অন্ধকারও ততটা ঘন নয়। পিচের পরে সাইকেলের চাকার গতি বুঝতে পারা যায়। গোপিকান্তপুর বাজারের কাছাকাছি এলে চা স্টলগুলোর সামনের বিজলির আলোর ঝলক চোখে পড়ল। সাইকেলের গতি কমিয়ে থামতে যাবে। হঠাত পেছনের কেরিয়ারে কারও উঠে পড়ার ভারে প্রায় পড়ো পড়ো হলো। দুপাশে পা নামিয়ে থামলো। তাকিয়ে দেখে দবির। ‘আইজ তোরে পাইছি  ধরনের হাসি ওর মুখে। 

‘আজকাইল কনে থাকিস, দোস্তো? কমাসে তোর চিহারা কয়বার দেকিচি গুইনে কতি পারবো। হইন্যে হইয়ে খুঁজদিচি। ব্যাপারডা কি বল দিনি?

‘কাজে কর্মে ব্যস্ত আছি রে। চল্ চা খাতি খাতি গল্প করি। 


চুমুক দিয়ে কাপের ভেতরে চায়ের রঙ দেখছে উত্তম। কাচের কাপ আঙুলের গোলে বাঁকা হয়ে মুখে এসে এসে ঠেকছে। আর ছুপ ছুপ করে আওয়াজ হছে। দোকানির মাথার উপরে ঝুলানো বিসকুটের ঠোঙা আর কলার ছড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে কাপটা প্রায় মুখের কাছে ধরে রাখলো। 

‘চার সাতে কডা বিশকুট দোবো দাদা? কলা খাও কয়ডা। সাগর কলা। কি মোলাম ঘিরাণ দেকিচাও?  পানরাঙা দাঁতে হেসে বলল দোকানি। 

‘দ্যাও চাচা। দবিরির বেশি কইরে দ্যাও। বান্দরডা কলা না খাইয়ে শুকোয় যাচে। গম্ীরমুখে রসিকতা করল উত্তম। আশেপাশের সবাই হো হো করে হেসে উঠল। দবির না হেসে উত্তমের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। লক্ষ্য করছে অনেকক্ষণ থেকে। রাত নেমে এসেছে। ছোট ছোট ঝুপড়ির মতো দোকানগুলোয় আলো নিভে যেতে লাগল। উত্তম উঠে রাস্তার পাশে গাছে ঠেস দেয়া সাইকেলে হাত রেখে ইশারা করল দবিরের দিকে। দবির তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। 


ডানহাতে হ্যান্ডেল ধরে সাইকেল হাঁটিয়ে নিছে উত্তম। দুই চাকার মদু গতির বিপরীতে মাঝে মাঝে ইটের খোয়া এসে ছিটকে যাছে। দবিরের পায়ের স্যান্ডেল ফুটছে পট পট করে। সাইকেলের চেনের কির্ কির্ শব্দ থেমে গেলো উত্তমদের বাড়ির পাশের কদম গাছের তলায়। ঘন পাতা অন্ধকার ঘন করে ছায়া ফেলেছে নিচে । চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে দুজন। কিছু একটা শুনবার প্রতীক্ষায় দবির। 

‘মন দিয়ে শোন্ দবির।

‘কিচু না কলি শোনবো কী কইরে? হাহা। তোর মাতা খারাপ হইয়ে গেলো?

‘মাথা ঠিক আছে। শোন্, ঘোরপ্যাঁচ না কইরে আসল কতায় আসি। আমি একজনরে ভালবাসি।

‘ভালবাসিস? তোর তো কোনওদিন মাইয়েগের পাল্লায় পড়তি দেকিনি। আমি আলাপ করতি চালি থামায় দিতিস। কতিস, মেয়েরা সবচাইতে সর্বনেশে মোহ, হুট কইরে পেরেমে পইড়ে যাতি নেই। একন তোর বেলায় একি হইলো?

‘এই জিনিসে না পড়বার নিশ্চয়তা কেউ দিতি পারে না। অন্ধকারে কাদা-পথে চলবার মতো। কখন পা পিছলাবে কওয়া শক্ত। শোন্, ওকে নিয়ে অন্য জায়গায় যাবো আমি। তুই সাতে আচিস কিনা ক।

‘তোর কোন্ কাজে আমি সাতে ছিলাম না তাই ক দিনি। তা মাইয়েডা কিডা?

‘আসমা।

‘অ্যা...। আ-স-মা? ওই পরীর মতোন মাইয়েডা? ওরে খুদা। তা জানাজানি হলি কেলেংকারি হইয়ে যাবেনে।

‘সেই জন্যি তো মামাদের গ্রামে নিয়ে বিয়ে করবো। সব ঠিক কইরে ফেলিচি। আগামী শনিবার রাত্তিরি তুই হালিমাদের বাড়ির পাশের রাস্তার কোণায় থাকবি। আসমা আসবে। নিয়ে মাঠের মদ্যি দিয়ে আড়াআড়ি কৃষ্ণ নগরে যাবি। আমি শুক্রবারে মামাদের ওখানে যাচি।

‘ঠিক আচে। দবিরের চোখে ভয় বিসয় ও কৌতুহল ।

ছয়

পূর্ণিমার পর কিছুটা ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ আকাশে। মলান জোছনা। তারার আলোর ঢেউ। খোলামাঠে আগে আগে আসমা। পেছনে দবির। শেষ হেমন্তের প্রায় ফসলশূন্য মাঠ। মাঠভরা ঢেলা।  জোছনায় ঢেউয়ের মতো লাগছে ঢেলাগুলোকে। শীতের সবজির প্রসতি কোনও কোনও ক্ষেতে। আল ধরে চলছে ওরা। মাঝে মাঝে জমিখˆ বড় হওয়ায় ক্ষেতের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি পথ করে নিছে পা। 


চষে মই দেবার পর একটি জমির মাটি বেশ ঝুরঝুরে। চলতে আরাম লাগছে। আসমার কান্ত পা  গোড়ালি পর‌্যন্ত ডুবে যাছে কোমল মাটিতে। সাথের ব্যাগ দবিরের ঘাড়ে। ব্যাগটা ছোট হলেও ভারি। কোমর বেঁকিয়ে সামনের দিকে মুখ ঝুঁকে হাঁটছে দবির। মাঝে মাঝে দেখে নিছে মুখ তুলে। মাটিতে পা হড়কে পেছন দিকে হেলে হঠাত বসে পড়ল আসমা। একহাতে ভর দিয়ে অন্যহাত শূন্যে তুলে উঠতে চাইছে। হাতটা বরাবর চাঁদ। পাতলা মাড়ের মতো আলো ঝরছে। তারাদের পশ্চিমে যাবার প্রসতি। উপরের হাতটা ধরে ওঠাতে গেল দবির। আসমা ইশারায় মানা করে নিজেই উঠতে গিয়ে আবার পড়ে যাছিল। দবির হুমড়ি খেয়ে পড়লো আসমার বুকের ওপর। একহাতে ব্যাগের ফিতে টেনে সরিয়ে দিতে লাগলো। চাঁদটা কেমন ঝাঁপসা হয়ে যাছে। পলক ফেলে ফেলে দষ্টি  ফর্সা করতে চাইছে আসমা। দুহাত একসাথে করে দবিরের গলা ঠেলে উঠিয়ে দিতে চাইল। সরানো গেল না। ভাবলো, পুরুষ মানুষ এমন পাষাণের মতো ভার! দবিরের মুখ নেমে এলো কানের কাছে, ‘আমি কাউরে কিচু কবো না। কেউ জানবে না। দেখো, এই রাত্তিরির মাঠে কাকপক্ষিও নেই। না, কইরে না। কানের কাছের কথার বিষে জর্জরিত আসমা দবিরের চুল খামচে ধরল। এক ঝটকায় উঠতে গেল। দবির দমবার পাত্র নয়। দাঁত খিচিয়ে চুল ছাড়িয়ে কপাল ঠেসে ধরলো আসমার কপালে। বিশাল পেরেক যেন বিঁধে গেল আসমার মাথায়। ব্যথায় ঠোঁট বাঁকিয়ে চোখ বুঁজল। অবসন্ন  দুহাত দুপাশে ফেলে অনেক কষ্টে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলো। মেঘে মুখ ঢেকে আছে চাঁদ। তারাগুলো পালিয়ে যাছে হুড় হুড় করে। দবির আর ভারি মনে হছে না। কেমন ঢেউয়ের ওপরের শোলার মতো দুলছে। 


চোখে আঠা নিয়ে তাকাল আসমা। টলোমলো পায়ে চলছে। ব্যাগ থেকে পানির বোতল এগিয়ে দিলো দবির। বলল, আর বেশি দূর নেই। ওই যে আন্ধার দেকা যাচে, ওইডে উত্তমের মামার আমবাগান। ওকেনে থাকবে ও। আমাগের আগোয় নিতি আসপেনে। 

দবিরের দিকে রক্তচোখে তাকিয়ে থাবা দিয়ে বোতল মাটিতে ফেলে খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগোল। 


কৃষ্ণ নগর গোপিকান্তপুর থেকে খুব দূরে নয়। মাঠ পেরোলেই গ্রামের শুরু। উত্তমের মামার বাড়ির পেছনের পাঁচিলের পর এই বিশাল আমবাগান। সামনের রাস্তা দিয়ে আসলে লোকে টের পেয়ে যেতে পারে। তাই এই ব্যবসা। অন্ধকারের খুব ভয় আসমার। জমাট কালোর ভেতর দিয়ে কী করে যাবে ভাবছে। বড় জোনাকির আলো যেন জ্বলে উঠল বনের ভেতর। আঁকাবাঁকা হয়ে জ্বলে থির হলো আলোটা। ফিসফিসানির শব্দে সচকিত হলো ওরা। 

‘এই দবির, এই দিকি পথ। আয়। 

আসমা থমকে দাঁড়াল। পিঠে মদু হাত রেখে এগিয়ে যেতে বলে একটা গাছের আড়ালে মিলিয়ে গেল দবির। 


টর্চের  ক্ষীণ আলোটা পায়ের পাতা হয়ে মুখে লাগল। সরে গেল পরক্ষণেই। উত্তম এগিয়ে এসে ডান হাত ধরলো আসমার। বাঁ হাতে কাঁধ জড়িয়ে শরীরের সাথে মিশিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। চার পায়ে দুই পায়ের কদম। দুটো শরীরে একই চলার দুলুনি। 

‘আমি একটু বসবো।

‘আছা, দাঁড়াও। খালি জায়গা আছে কিনা, দেখে নি। 


প্রাচীন এক আমগাছের ডাল চারদিকে কালো ছাতার মতো খোলা। তার নিচে দাঁড়াল ওরা। উত্তমের হাতের আলো বত্তাকার ঘাসবিছানো জায়গাটায় ঞ্চল হলো। টুপ করে বসে পড়লো আসমা। উত্তমও। মাঠের ভেতর নিঃশেষ হবার নিশানা পেলেও এইখানে ওদের মতো চলে যাবার আগে জিরিয়ে নিছে রাতটা। একটু দুরে সর্ সর্ আওয়াজে কী যেন দৌঁড়ে গেল। ভয় পেয়ে নিবিড় করে উত্তমের গলা জড়িয়ে ধরলো আসমা। ডালপালা নড়েচড়ে উঠছে। ভোরের বাতাস পাখিদের ঘুম মুছে দিয়ে চলে যাছে মাঠের দূরে। সীমাহীন শঙ্কায় উপরের দিকে তাকাল। 

‘কোনও ভয় নেই। আমি আছি না

‘হুম।


এতপথ হাঁটার কান্তিতে শীত মনে হয়নি। ভোরের বাতাস ঘাম জমিয়ে দিছে ত্বকে। কাঁপছে আসমা। বুঝতে পেরে আরও ঘন করে আঁকড়ে রাখলো বুকের ভেতর। মুখের কাছে নিঃশ্াস ফেলে বলল, তোমাকে এমন করে পাবো, ভাবিনি। সব ব্যবসা হয়েছে। কালই বিয়ে করছি আমরা। তুমি কি বলো?

‘আমার কিছু বলার থাকলে কি আর সব ফেলে সব পাবার পথে পা বাড়াতাম উত্তম?


ভেজাচোখে তাকিয়ে দেখে অন্ধকারেও উত্তমের চোখে অথৈ জলের ছায়া। ছায়াটা বিন্দু হয়ে গড়িয়ে পড়লো। এক অবিছেদ্য আলিঙ্গনে জড়ালো দুজন। কাত হয়ে শুয়ে বাহু বিছিয়ে আসমার মাথাটা আলতো করে রাখলো উত্তম। বন বন ঘ্রাণের ভেতরও পাপড়ি মেলেছে ফুলেরা। দুজনের নিঃশ্াসের সুবাস মিলে একাকার। মিহি করে কথা বলছে দুটো স্র। অবিরাম চুম্নের পর আবারও আধো আধো কথা। বুঝবার জো নেই, কোনটা চুমু আর কোনটা কথার সম্ার। 


উত্তমের ডানহাত কামিজের গলা গলিয়ে আসমার বুকে নেমে এলো। পাঁচ আঙুল খেলা করছে পালাক্রমে দুটো ঢেউয়ে। নিজের শ্াসের তাপে পুড়ে যাছে আসমা। উত্তমের হাত উঠে এসে আসমার নাভিমূল হয়ে নিচে দেবে গেল। কুঁকড়ে উঠে কোনওরকমে আসমা বলল, এখন থাক।

‘আমিই তো। বিয়ে তো হছেই। মানা কেন করছো, লাভ? হাঁসফাঁস করে বলল উত্তম। হাত আরও চঞ্চল হলো। কিছু আগে, ঢেউয়ে শোলার দোলা আবারও অনুভব করতে লাগলো আসমা। বুঁজে এলো চোখ।  


চোখ মেলে দেখে, জানালা গলে রোদের ফালি এসেছে বিছানায়। উত্তম বসে আছে। মুখের দিকে তাকিয়ে পিঠে হাত রেখেছে। সেই মুখ রোদের মতোই উজ্জ্বল। রাতের কথাটা ভাবছে আসমা। স্প্ন নাকি সত্যি বুঝে উঠতে পারছে না। ভাবনামগ্ন দেখে কথা বলল উত্তম।

‘রাতের বেলা আসার সময় বনের ভেতরে সংাহীন হয়ে গিয়েছিলে। কোলে করে এনে শুইয়ে দিয়েছিলাম। কেমন বাচা মেয়ের মতো ঘুমোলে। এখন কেমন লাগছে?


তলপেটে বেশ ব্যথা অনুভব করলো। উঠতে উঠতে ঢোক গিলে হাসি আনতে গিয়ে ঠোঁট বেঁকে গেলো আসমার।

এর পর পরের সপ্তাহে

এই মন এই দেহ

রেজা নুর

তিন

অভিনেত্রীরা চলে যাছে।  ভ্যানে মণিরামপুর, এরপরে বাসে যশোরে যাবে। পিচের রাস্তা বাজারের ওপর দিয়ে রাজগঞ্জে গিয়ে মিশেছে। এবার জোর বষ্টির প্রকোপে পিচের কার্পেট একটু পর পর উঠে গিয়ে ইটের সলিং ভেসে উঠেছে। লাল গুেঁড়া পাউডার উল্লাসে উড়ে বেড়ায় যানের চাকায়। উত্তম ও দবির ভাল দেখে একটা ভ্যান এনে রাধা আর যশোদাকে বসতে বলল। যশোদা হাসিমুখে বিদায় নিয়ে ভ্যান ছাড়বার অপেক্ষা করছে। ডানদিকে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে। রাধা একবার হাসবার চেষ্টা করে হাত নাড়ল উত্তমের মুখের দিকে তাকিয়ে। ভ্যান নড়ে উঠল। উত্তমের ডানহাত তখনও শূন্যে সাপের ফণার মতো ওঠানো। তাই দেখে ফিচ্ করে হেসে মুখ নিচু করলো অপসয়মান দোলায়িত রাধা। ফিরে তাকাল আবার। হাত নামিয়ে পেছন ফিরে মাঠের ঘাসে এসে বসল উত্তম। 

‘রাধা তোরে ভালবাইসে ফেইলেচে কলাম। মনে ব্যথা নিয়ে চইলে গেলো কিন। রসিয়ে রসিয়ে বলল দবির।

‘উমম, কী বলতিচিস? উত্তমের আনমনা জবাব।

‘আর  অতো আউলা হতি হবে না। নে চা খাইয়ে নে। স্টলের দিকে তাকিয়ে দবির গলা চড়াল, ‘এই দুকাপ চা পাটায় দে দিনি

‘আউলা টাউলা কিচু নারে, কাইলকের নাটকটার কথা ভাবদিচি।

‘নাটকের কতা আবার ভাবার কী হইলো? তোর যা অভিনয় হইয়েচে। সাংঘাতিক। বিশেষ কইরে ঝুলোনায় রাধার মান ভাঙাইনের সীনটা দারোণ। সখিরা সব কত অনুনয় বিনয় কইল্লো, আর রাধা তোর দিকি মুকই তোল্লে না, কিন তুই কী সুন্দর আদরে আদরে হাসির ফুল ফোটালি রাধার চোকি-মুকি, আহা। পেরেমের দিশ্শোই তোর তুলনা নেই রে।

‘ মঞ্চের রাধা না দেখলিও, আমি ফাঁকে ফাঁকে আরেক রাধারে দেকিছি, দবির।

‘সে কী? সে আবার কিডা?

‘বলবো?

‘বলবি নে মানে? একুনি ক।

‘বন্দাবনে চারিদিকে তাকাবার ভান করবার সময় যখন দর্শকদের দিকে হাত বিছিয়ে চোখ বুলালাম, দেখলাম একজোড়া চোখের নজর ঝাঁঝরা করে দিছে আমাকে। খুবই পরিচিত সেই ডাগরচোখজোড়া। বড় বিঁধে যাওয়া সেই মুখের হাসি। হৃদয়ে পড়ে থাকা প্রেম-বুভুক্ষু-বক্ষের শুকনো পাতার ওপরে যার চপল হরিণী-চঞ্চল চলা মর্মর ধবনি তোলে, সেই রে।

‘দ্যাখ, দোস্তো, আমি অত ভাষা বুজি নে। তুই কিনক আবার শুদ্ধ ভাষায় ডায়লগ মারতিচিস। খুসা কেলাইয়ে ক কিডা। তোর ভাল লাগলি ব্যবস্তা আমি করবো।

‘সেদিন যাদের বাড়িত্তে ফুল আনিলাম, সে-ই হরিণী রে বন্ধু।

‘ও হো হো। আ-স-মা।  বলে একটু উদাস হলো দবির। মাথা ঝাঁকাল। ‘চল্, আবার অন্য কোনও কাজের নাম কইরে দেকা কইরে আসি। 

‘নারে, বার বার যাওয়া বেমানান। তাছাড়া আমার মন কেমন কইরতেচে। সাহসে কুলোয় না। মেয়েদের সামনে আমার অস্স্তি হয়। অভিনয়ের সময় ভিন্ন কথা। ও তো আর সত্যি না। তোর কিচু করা লাগবে। বাদ দে। 

কয়দিনের অবিরাম খাটুনি, রাত জেগে অভিনয়, আর নির্ঘুম ভাবনায় এই ভর সন্ধেয় চোখ ভেঙে আসছে উত্তমের। খেলার মাঠটাকে মনে হছে বিশাল বেডরুম। টলতে টলতে উঠে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। দবির উঠে সাথে বাড়ি পর‌্যন্ত যাবার কথা বললে ইশারায় মানা করে আবছা আঁধারে মিলিয়ে গেল স্ুল ঘরের পেছনের রাস্তায়। 

চার 

বেশ বেলায় হালিমার ডাকে ঘুম ভাঙল আসমার। পুবের জানালা দিয়ে রোদ এসে বিছানা ভরে আছে। কুয়াশা-চোখে উঠে ঘরের হাক সরাল। টলোমলো পায়ে আবার বিছানায় ফেলে দিলো নিজেকে। হালিমা হাসিমুখে উপুড় হয়ে থাকা বন্ধুর পিঠের ওপরে বুক দাবিয়ে জড়িয়ে ধরলো। ঘুমভরা আলস্য-লাস্য দেহ অন্যদেহের ভার পেয়ে আরও আবেশী হয়ে উঠল। আদর-উছল বিড়ালির মতো উমম্ উমম্ শব্দে বুঁদ হয়ে পড়ে রইল আসমা।

‘ও সই, আইজ আর ঘুম ভাঙবে না ? কী এমন স্প্নে মইজে আচিস,তাই ক দিনি। কৃষ্ণ বিহনে রাধার একি দশা ...। পর জনমে রাধা বানাইস তারে রে...। হিহিহি।

কথায় মদির হয়ে রইল আসমা। ওঠার নাম নেই। আরও নিবিড় করে জড়িয়ে আছে হালিমা। কানের কাছের নিঃশ্াস ঝড়ের মতো লাগছে। চিবুকের চুল সরে সরে গিয়ে সুড়সুড়ি বুলিয়ে দিছে। একবার হালকা করে কানে ফুঁ দিলো হলিমা। মোচড় দিয়ে পাশ ফিরে খিলখিল করে ঘুমচোখে হাসতে লাগলো আসমা। একসাথে কলেজে যাবার সময় কতরকম হাসে, কিন এই হাসির ছটায় অন্য রঙ ছড়ানো। 

‘পুজোর ছুটি শেষ হতি চইল্লো। কিলাশ শুরু হইয়ে যাবেনে। চল্ কিছু খাইয়ে আমাগের পুকুর পাড়ের মেহগনি বাগান থেইকে বেড়ায় আসি। আসমাকে বুকের সাথে মিশিয়ে কানে কানে বলল হালিমা। 

হালিমাদের বাড়ির চারপাশের গাছপালা বনভূমির মতো দাঁড়ানো। চওড়া উঠোনের শেষে ঢেঁকিঘর। তার পাশ দিয়ে সরু পায়েচলা ঘাসেভরা পথ গিয়ে পড়েছে পুকুরঘাটে। সবুজ পাতার ছায়ায় এই ছোট্ট জলাশয় সবুজ হয়ে থাকে। মাঠের জমির একাংশ নিয়ে হালিমার বাবা মেহগনি বাগান করেছেন। কিনারে কয়েকটি শিশুগাছও আছে। গাছগুলো শিশুকাল পেরিয়ে এখন যৌবনে। প্রবল গরমের সময় হাওয়ারা যেন এইবনে এসে গা জুড়োয়। দড়ি জালের মতো পেঁচিয়ে দুই গাছে বেঁধে দোলনা টানানো। কলেজ খোলা থাকলে ব্যাগভর্তি বই এনে এইখানে বসে বসে পড়ে হালিমা। সমস্ত দষ্টির দূরে, আলো-আঁধারির আড়ালে।   শান্ত বাতাস আর পাতার মর্মরে মন অবারিত সুখে কেঁদে কেঁদে উঠতে চায়। পুজো শেষে আরও বেশি নীরবতায় ছেয়ে গেলো। সব বাজনার ঝংকার নিয়ে বিদায় নিয়েছেন আনন্দময়ী। মানুষের প্রাত্যাহিক জীবনেও কেমন ক্ষণিক অবসাদ। 

দোলনায় চুপচাপ বসে আছে আসমা। দড়ির দুপাশে ধরা, দষ্টি নামানো। ঝুঁকে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে। একটা চপ্পল হঠাত খুলে ছিটকে গেলো। মাটির হিম ছড়াল পা বেয়ে শরীরে।  গাছে হেলান দিয়ে বন্ধুকে দেখছে হালিমা। ওর মার মতো ফর্সা ও। একেবারে লাল। ভর দুপুরে, বনের আবছায়ায় মনে হয় সূর‌্য এই উঠল। 

‘দোল্ দিয়ে দেবো সই?

‘না। শুদু বইসে থাকতি ভাল লাইগদেচে। তুই দোল খা, আমি বাগানডা ঘুইরে দেইকে আসি। অনেক দিন তো আসা হয় নি।

অন্যপায়ের চপ্পল খুলে রেখে উঠে দাঁড়াল আসমা। খুব সাদা খড়খড়ে বনের জমিন। একটু পর পর হলুদ মেহগনি পাতা পড়ে আছে। পায়ের ধুলো পাতায় মুছে মুছে পিছে ফেলে যাছে বক্ষের পর বক্ষ। দূরে একমনে দাঁড়িয়ে বন্ধুর পত্র-নুপূর শুনছে হালিমা। 

বনের কিনার ঠেকেছে মাঠের দিকে বয়ে চলা পথে। সবুজ চিত্রল চরের মতো লাগছে দেখতে। কোথাও যাবার তাড়া নেই পথটার। মাঠের ফসল দেখে, হাওয়ার বয়ে চলা দেখে, নির্জনতা দেখে--- হঠাত হঠাত কেউ এলে পৌঁছে দেয় প্রান্তর পেরিয়ে দূরের গন্তব্যে। আসমার গন্তব্যহীন চলা থমকে গেলো। আকাশী নীলের শার্ট পরা শুভ্র-তনু কেউ পথ ফেলে বনের নির্জনে আসছে। একটা বড় গাছের আড়ালে লুকালো আসমা। লাল ওড়নার ঘোমটার প্রান্তে একটি চোখ শুধু আলোকরশ্মি হয়ে রইল। চেনা চেনা লাগছে। কে এই সময়ে এইখানে! অন্তহীন সময়ও বুঝি প্রান্ত খুঁজে পায়। লোকালয়ের সমস্ত কোলাহল থেকে দুরে, নিঃসীমে দাঁড়ানো যেন সে। রোদ-সফেদ রাজকুমার এগিয়ে আসছে। অপার অবসন্নতায় টলে পড়তে চাইছে আসমার শরীর।

‘যে সূর‌্যোদয় দেখবো বলে এলাম, সে কেন এমন স্ছো-অস্তে সঁপে দেয় নিজেকে? টেনে টেনে সংলাপের মতো কথাগুলো বলতে বলতে কাছে এসে দাঁড়াল উত্তম। অবগুণ্ঠন নিয়ে ধীরে গাছের আড়াল থেকে সরে এলো আসমা।

‘আ-পি-নি ! এই সময়ে, এইখানে?

‘এই কথা জানবার ইছে আমারও

এরপর দুজনই নীরব। সরব শুধু দুইজোড়া চোখ। ভোরের আলো আর দিনের অভ্রফুল একাকার এই নির্জনে। নিজেকে সামলে নিতে কিছু বলবার চেষ্টা করে আসমা।

‘এটা আমার বন্ধুদের বন। বেড়াতে আসি মাঝে মাঝে। তা আপনি জানলেন কি করে?

‘ভনিতা না করে বলি, জানি না আপনি কীভাবে নেবেন। আমি নিজেও জানি না, পথ আমাকে কেমন করে আপনার সামনে এনে দাঁড় করালো !

‘সত্যি বলতে কি, আমারও তো পথ কোন্ পথে তা খুঁজতে এই অবেলায় বের হওয়া 

‘দুঃখিত এত শিগগির এই কথা বলছি, আমাদের পথ মিলতে পারে কি?

‘আমার মনে হয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে ‘শিগগির বলতে কিছু নেই। বহুদিনের পরিচয়ে যা হয় না, মুহূর্তের দেখাশোনায় অনড় সমর্কের ইমারত গড়ে উঠতে পারে।

‘বাহ, এত সুন্দর কাব্যিকতা। চমত্কার বলেন তো আপনি।

‘আপনিও তো কম নন। শুধু নাটকের ডায়ালগ নয়, বাস্তবেও কেমন বিনম্র-মধুর আপনার কথা।

‘তোমার ভাল লাগে? দুষ্টু হেসে চোখ ছোট করে তাকাল উত্তম।

‘হুম, লাগে, সারাদিনরাত শুনতে ইছে করে তোমার কণ্ঠস্র। চমকে তাকিয়ে হিহিহি করে হাসল আসমা।

হঠাত দেখল উত্তমের  উত্সুক চোখ। মুখের আলো নেভা। শান্ত কিন উদ্বিগ্ন চোখে সামনে তাকিয়ে আছে। সেই দষ্টি ধরে পেছনে তাকাল আসমা। হালিমা দাঁড়ানো। দুজনকে সির চোখে দেখছে। ওরা দেখে ফেলার পরও হালিমার ভাবান্তর হলো না। উত্তম আর দেরি করলো না। শুকনো ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে হাত উঠিয়ে ইশারা করলো আসমার দিকে।

‘আসি এখন, আপনি চাইলে পরা কথা হবে আবার।

‘ইছে করলে আরও কথা বলতে পারেন। 

‘না না, এখন যাই। বলে সামনের দিকে আরেকবার তাকিয়ে ঘুরে দাঁড়াল উত্তম। লম্া লমা্ পা ফেলে রাস্তায় উঠে এলো।

উত্তমের যাবার পথের দিকে এক নিমেষে চেয়ে আছে আসমা। পেছনে প্রান্তর ফেলে বাজারের দিকে হাঁটছে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে হঠাত হঠাত ভেসে উঠছে। পিঠে কারও হাতের ছোঁয়ায় দষ্টির সুতো কাটলো। পায়ের শব্দ ও কায়াটা মিলিয়ে গেল।

‘কৃষ্ণর পাট করিলো, এই সেই উত্তম না?

‘হুম। 

‘তোর সাতে জানা-পরিচয় আচে, জানতাম নাতো?

‘ধুর। আমিও কি জানতাম? পুজোর আগে ফুল নিতি আইলো, সেইদিন দেখলাম ভাল কইরে।

‘শুদুই দেখলি? দেখলি আর চিত পটাং হলি? হিহিহি

‘চিতও হইনি, উপুড়ও হইনি,সই। আমি সোজা-ই আচি।

‘মনে তো হচে না। সই, মন তোর, দেহ তোর। তবু এটটা কতা বলি, ভাইবে চিন্তে করিস, যা করার। সমাজ বইলে এটটা কতা আচে।

‘ভাললাগা ভাবনার সুমায় দেয় না রে সই। ফুল নিতি যেদিন আইসলো, ওরে দেখেই মোমের মতো গইলে যাতি লাইগলো আমার ভিতরের আমি। অতি কষ্টে অবসন্ন হাতে ফুলগুলো ছিঁড়লাম আর এটা-ওটা জিসে করার ছলে দেখতিছিলাম। কয়েকটা অতিরিক্ত ফুল তুইলে দিবার সুমায় সর্শ লাগিছিল হাতে। বিদু্যত যেন ছড়ায়ে গেল আমার গায়।

‘তুই মরিচিস সই।

‘রাধারা কি মরে আর? কৃষ্ণর প্রেমের আগুনে জীবিত হয় বার বার। 

এই মন এই দেহ

রেজা নুর

দুই

বিসর্জনের আগের দিন। প্রতিদিনের সন্ধ্যার চেয়ে আজ কিছুটা বিষণ্ণ-আনন্দ ভক্তদের ভেতর। প্রায় সারাদিন মাইকে বেজেছে ভক্তির গান,--- ‘মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে... মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে। এই গানের সকরুণ আবেদনের সাথে সাথে নতুন আনন্দে ভরে উঠেছে সবার মন, যখন সারা এলাকা আজকের রাতের গানবাজনার মাইকিংয়ে মুখর হয়ে উঠেছিল। রাতে, পূজো শেষে নাটক মঞ্চস হবে, ‘রাধাকৃষ্ণ। সংগীত ও নাট্যপরিচালনায় রয়েছেন স্ুলের শিক্ষক বিধান চন্দ্র রায়। কুশীলবরা অধিকাংশই এলাকার। রাধা ও যশোদা চরিত্রের জন্যে অভিনেত্রী আনা হয়েছে যশোরের বৈকালী অপেরা থেকে। শীতে যাত্রাপালা জমে। গরমে অবসর। তাই এখন এতবড় গানের দলের লোক মিললো। 

গোপিকান্ত পুর বাজার লোকজনের আনাগোনায় গমগমে। দোকানে দোকানে চায়ের কাপের টুং টাং আওয়াজ। কথার ফাঁকে ফাঁকে হাসির হল্লা উঠছে মাঝে মাঝে। আশেপাশের দুদশ গ্রামে মাইকিং করে মুখে চোঙ নিয়ে ভ্যান এসে দাঁড়ালো চা স্টলের সামনে। গান বাজছে তখনও। চোঙটা কৃষ্ণ নগরের মাঠের দিকে ফিরিয়ে চার অর্ডার দিতে গেল ভ্যানওয়ালা। কাঠের বেঞ্চ থেকে সরে বসার জায়গা ছেড়ে দিলো একজন। অল্প ভলু্যমের গানে উত্কর্ণ হয়ে আছে কেউ কেউ। ফিরোজা বেগম গাইছেন, ‘ওরে নীল যমুনার জল... বল্ রে মোরে বল... কোথায় ঘনশ্যাম, আমার কৃষ্ণ ঘনশ্যাম...। পশ্চিমের দিগন্তে কমলা আলোর রেখা। তরকারি আর মাছের বাজারের ছোট ছোট ছাউনিগুলোয় বিজলি বাতির চোখ জ্বলজ্বল করছে অন্ধকারে ষাড়ের রাগী চোখের মতো। বাজার মসজিদের মিনার থেকে মাগরিবের আযান ভেসে আসলো হঠাত। ভ্যানওয়ালা দৌঁড়ে গিয়ে গান বন্ধ করলো। যতক্ষণ আযানের সুর তরঙ্গের মতো ভেসে ভেসে ইথারে মিলাল, সারা বাজারে কেমন এক অপার্থিব নীরবতা ছেয়ে রইল। এই ভর সন্ধ্যাবেলা যেন মফিজ মুয়াজ্জিনের সুরেলা ভরাট স্রের ভেতর দিয়ে স্রষ্টা ডাকছেন। যার হাতের তালুতে খেলছে ওই অপার নীলিমা, অজর তারাদল, আর মেঘের সামান। আযান শেষ হলে গুঞ্জন উঠলো আবার। 

‘তা, রাধারানী তো আইসতেচে, কিনক কৃষ্ণ কিডা হচে গো, তা জানা গেলো?  চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কেউ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো।

‘কেন, জানো না। কৃষ্ণ হবে আমাগের উত্তোম। ওর ঝাঁকড়া চুল, মুটা মুটা চোখ আর খাড়া নাকে কৃষ্ণ যোনো জ্যান্ত হয়ে ওটপে স্টেজের পরে।

‘কিনক উত্তম তো দুদির মতন ফষ্সা। কৃষ্ণ তো শ্যামলা।

‘তা হলি কি হবে, মেক আপ কইরে সাজবে। 

‘তা ঠিক তা ঠিক।  কয়েকজন একসাথে বলে উঠল।

‘কী ঠিক। প্রশ্নটা শুনে পেছনে তাকাল সবাই। চা দোকানি মুচকি হেসে তাকাল উত্তমের দিকে। 

‘আরে, তুমি যে। সারাদিন কনে ছিলে। জানতে চাইল একজন।

‘কনে আবার? গানের জোগাড় যন্তর করা কোম কষ্ট? সবাই তো আরামে যাইয়ে চটের পরে বসপেনে। মুখ বেকিয়ে বলল দবির। 

‘তা জায়গা না পালি তোর ঘাড়ের পরে বসপো কলাম আমি, দবির। হাহাহ।

‘চুপ কর দিনি দবির। চল্, চা খাইয়ে নি। আয়। দবিরের ঘাড়ে হাত দিয়ে বলল উত্তম।

রাত প্রায় 11 টা। তবু মনে হছে সন্ধ্যা মাত্র নামল। অন্ধকার জমাট বাঁধেনি। বেশ ফুরফুরে বাতাস বইছে। মনে হছে সমস্ত অন্ধকার উড়িয়ে দূরে কোথাও রেখে রেখে আসছে এইসব বাতাসেরা। আর চার গ্রাম দূরের নদী থেকে স্ান করে শরীর জুড়িয়ে ফিরে আসছে মুঠো মুঠো তারার হাসি হাতে নিয়ে। 

বাবা-মাকে বলে পাশের বাড়ির বন্ধু হালিমার সাথে গান শুনতে বের হয়েছে আসমা।  বেলতলা পার হয়ে খোলা মাঠের দিকে তাকাল। কালো নদীর জলের মতো ঢেউ খেলে আছে অন্ধকার। আকাশের সবগুলো তারা ফুটে বেরিয়েছে আজ। কোনও  কোনও রাতে উজ্বল কিছু তারা সারারাত জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে থেকে চলে যায় সকালে। আজ কোনও তারা-ই আড়ালে থাকতে রাজি হয়নি। মনে হছে আরেকটু জোরে বাতাস বইলে টুপটাপ তারার ফল ঝরে পড়বে পথে। 

‘এত এদিক-ওদিক কি দেখতিচিস সই? বন্ধু বলল। 

‘কিচু না রে, আইজগের রাইতটা যেন অন্যরকম রে। অনেক তারা আকাশে। অন্ধকারও তেমন না। বাতাসও ঠাˆা ঠাˆা। শরত্কাল না যেন শীতকাল। গায়ের ওড়নাটা মেলে আরও কয়েকভাঁজ করে গায়ে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল আসমা। 

পাশাপাশি চারপাঁচজন হাঁটা যায় এমন মাটির পথ প্রাইমারি ও হাইস্ুলের মাঝখান দিয়ে মাঠে মিশেছে। দোতলা স্ুলটা থমথমে হয়ে আছে। মদু সোরগোল ভেসে আসছে। অসষ্ট গুঞ্জন ছাপিয়ে বাদ্যযন্রে আওয়াজ কথা বলে উঠছে। তবলার, টাক্ টাক্ টাক্, বাঁশির লঘু সুর তুলে চুপ হয়ে যাওয়া, জলের ওপরে চাড়া চালার মতো চিড়্ চিড়্ করে হারমোনিয়ামের রীডে আঙুল দৌঁড়াল কারও, চাকির ঝুনুত ঝুনুত স্র কয়েকবার ঝংকার তুলে ছড়াল চারদিকে। মাঠের কোণায় এক মুহূর্ত দাঁড়াল দুজন। মˆপের আলো মলান। ডীম লাইটের লালিমায় প্রতিমাগুলো মনে হছে শেষ বিকেলের পশ্চিমের আকাশে ভাসছে। দূর্গার তীরের প্রান্ত অসুরের বুকের রক্তে দেবে আছে। আবছা ছায়ায় রক্তের ধারার বদলে মনে হছে কালি ঝরছে বুক থেকে। দুর্গতি নাশিনী অসুরের বুকের সমস্ত অন্ধকার যেন বের করছেন খুঁড়ে খুঁড়ে। 

বাদ্যযন্গুলো গলা ছেড়েছে এখন। পালার বই নিয়ে মঞ্চের এককোণায় বসেছেন বিধান। মেয়েদের বসার জায়গার দিকে এগোলো ওরা। একেবারে সামনে জায়গা না মিললেও খুব দূরও নয়। অনেক আলোর আনাগোনা হলো মঞ্চের চারপাশের পর্দার ওপর। মনে হলো, আলোগুলো বেজে বেজে উঠছে বার বার। সেইসব নানারঙ মুখরিত আলপনায় বন্দাবনের ঝুলোনার পাশে রাধা-কৃষ্ণ দাঁড়ানো ত্রিভঙ্গে। সাদা কুচির ধুতি ঢেউয়ের মতো পাট পাট করে নেমেছে কৃষ্ণের পায়ের পাতায়। বাঁশির সুরের উনেখ-মুখে দশ আঙুল। আঙুলগুলো ওঠানামা করে করে সুরের খই ছিটিয়ে দিছে সারামাঠে। প্রথমে উত্তমকে চিনতেই পারেনি। কণ্ঠ শুনে চিনল। ফর্সা রঙ ফেটে বেরিয়ে আসছে মলিন মেক আপের আস্তরণ ছেড়ে। একটু বাঁকা হয়ে রাধাকে ঝুলোনায় বসাতে যাবার সময় হৃদয়ে মোচড় টের পেলো আসমা। এক মুহূর্তে রাধারূপ মেয়েটা ওর সামনে থেকে উধাও। নিজেকে এমন হালকা কখনও লাগেনি। উত্তমের পাশে ঝুলোনায় বারে মতো বসনে এক মেঘলোক রমণী যেন হয়ে আছে। এমন ভাবনায় কতক্ষণ কেটেছে কে জানে! চারদিকের এলোমেলো সোরগোল আর হালিমার হাতের খোঁচায় সম্তি এলো। বলল, কনে ছিলি এতক্ষণ, চল্ সই বাড়ি চল্। গান শেষ।

আসমা ভেবেছিল, সবাই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। বারান্দার আলো জ্বলছে। মা-বাবা গল্প করছেন। ওদেরকে দেখে আসমার মা বললেন, এত শিগগির চইলে আসলি, গান ফুরোয় গেচে? হিহিহি

‘হু চাচী। গান শেষ। তুমি যাতি পাইরতে। কি সুন্দুর অভিনয়। যাত্রাদলের মাইয়ে আইলো বলল হালিমা। 

‘আমি আর তোর চাচা যে গান শুনিচি, যাত্রা দেকিচি, তা তুরা জীবনেও দেকতি পারবি নে। ইরা আর কি অভিনয় করবে। আমরা দেকিচি পিসি সরকারের জাদু, রঞ্জন দেবনাথের লিকা যাত্রাবইর পাট। 

‘তা ঠিক বলিচাও চাচী। দিন যতো যাচে, আনন্দ ফুর্তি সব কুইমতেচে।

‘রাধা হয়েচে শুনলাম যাত্রার এটটা মাইয়ে, তা কৃষ্ণ কিডা হইলো হালিমা। লতিফ পানের পিক ফেলে বিড়িতে একটা লম্ার দম দিয়ে জানতে চাইলেন।

‘উত্তম। ওই পাড়ার উত্তম, কৃষ্ণ সাজিলো, চাচা।

‘তালি ভাল হয়েচে। ছেইলেডা দেখতিও যিরাম, কতা-বাত্তাও খুব ভাল।

‘তুমি ওরে দেকিচাও চাচা?

‘শুদু তোর চাচা ক্যান, আমিও দেকিচি। সে-দিন আইলো আমাগের বাড়ি। ফুল আর ব্যালের পাতা নিতি। রান্নাঘরের বেড়ার ফাঁক দে দেকিলাম। একেবারে চানের মতো ফসষ্া ছেইলেডা। হড়বড়্ করে বলে গেলেন আসমার মা জাহানারা।

(এরপর পরের সপ্তাহে)

এই মন এই দেহ

রেজা নুর

উঠোনের কোণে গোলাপ গাছ লাগিয়েছে আসমা। শুরুতে, কদিন পর পর নতুন নতুন চারা এনে লাগাত।  দেখে, বাবা বােঁশর চটার বেড়া দিয়ে দিলেন। বালিকা বয়সে জামতলার ছায়ায় খেলার ফাঁকে ফাঁকে বেড়ার ভেতরে নিশ্চুপ, মাথায় সবুজ পাতার ঝোঁপ নিয়ে বসে থাকা গাছগুলো দেখে যেত। সাথীরা হাসতো। বলতো, ‘তোর বাগান কি এখনই ফুলে ভরে উঠবে? কেবলই তো লাগালি। বার বার যেয়ে দেখতে হয়? লজ্জায় হেসে আবার খেলায় মন দিত। আজ সেই বাগানে কত ফুলগাছ এসেছে। যখনই কারও কাছে খোঁজ পায় নতুন ফুলের, আনিয়ে নেয়। সেদিনও, ওপড়ার কেউ টাইমফুলের সন্ধান দিলে, নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছে। লালচে চিকন বাঁকা বাঁকা দˆ ভেঙে মাটিতে পুঁতে দিলে কদিন পরে সরু সবুজাভ পাতার চোখে উঁকি দেয়। 


বর্ষা চারদিক ধুয়ে মুছে বিদায় নিয়েছে। পরিছন্ন আকাশে ফিনফিনে মেঘেরা বেড়াতে আসে। হঠাত হঠাত ধোঁয়াশার মতো উড়ে এসে আবার মিলিয়ে যায়। দেখে যায় গোপিকান্ত পুরের এই সময়ের আয়োজন। হাইস্ুল মাঠে টিচারষ্ রুমের সামনে শারদীয় পূজার মˆপ বানানো হয়েছে। পূজার ছুটিতে স্ুল ঘরটা বিশাল মাঠে একা দাঁড়িয়ে থাকে। বিকেলবেলা একটু কোলাহল শোনে। ফুটবল নিয়ে সদলবলে মাঠে আসে উত্তম, দবির ও অন্যান্যরা। বিকেলের সেই খেলাও স্তিমিত এখন। উত্তমরা এখন মˆপ সাজাতে ব্যস্ত। আশেপাশের দশগ্রামের ভেতর এতবড় উত্সব আর হয় না। শুধু পূজা নয়, ঈদের সময়ও এরা সমান আয়োজনে মাতিয়ে রাখে এলাকা। থানা শহর থেকে মাত্র মাইল দূয়েক দুই এই ছায়া ছায়া গ্রাম। ইটের বাড়ি থেকে শুরু করে, মাটির চাঁচের কিংবা টিনের বাড়িও রয়েছে। কোনও উত্সবই একা কারও নয়। সবার মনপ্রাণ ঘিরে থাকে প্রতিটি আনন্দ-আয়োজনে।

পাড়ার কারও কারও বাড়ি থেকে খাট চেয়ে এনে স্টেজ বানানো হয়েছে। সামিয়ানার তাবুর ঘনছায়া সেই সারিসারি খাটের ওপরে। মাত্র একদিন পরেই পূজা শুরু। কিছু ফুল বেলপাতা আর কচি কলাগাছ সংগ্রহ করতে হবে। উত্তমকে ভাবনামগ্ন দেখে হাতের কাজ রেখে দবির এগিয়ে এলো।

‘কি ভাবদিচিস  দোস্তো?

‘উমম? গাঁদা ফুল, বেলপাতা, আ...র একটা কলাগাছ কোত্থেকে আনা যায় বল তো?

এলাকার সব বাড়ির আনাচ-কানাচ চেনা দবিরের। থুতনিতে হাত রেখে মুখ নাড়িয়ে ঝম করে বলে উঠল, জানি, কার্ কাছে পাওয়া যাবে? চল্ আমার সাথে।

জোছনা রাতের মতো বিকেল। যে পূর্ণিমায় আকাশে এক ফোঁটাও জলকণা থাকেনা, সেইরকম। চাঁদ ইছেমতো আলো ছিটোয়। চালের গুঁড়োর মতো আলো এসে ঝরে পাতায়, ঘাসে, শিশিরে। বিকেলটাও তেমন আজ। আসমার বাগানের ফুলে ফুলে জোছনার মতো রোদ বসে আছে। সূর‌্যকেও আজ বুঝি চাঁদ হয়ে যাবার বাসনা হয়েছে। ওর বাগানটা ধীরে ধীরে বাবার উঠোন শুষে নিয়ে ফুল ছড়িয়েছে। দুপুরের পর ফুলের এ-গলি ও-গলি ঘুরে বেড়ায়। কোনওটার পাপড়ি ঝরে গেলে ছোট্ট ডালায় রাখে। অনেকগুলো পাপড়ি এনে গামলার পানিতে ভাসায়। সকালে গোছলের সময় ওই ঘ্রাণ-নিঃসত পানি প্রথম মাথায় ঢালে। উবু হয়ে কিছু পাপড়ি তুলতে যাবে, উঠোনে পায়ের শব্দে ফিরে তাকাল। বাঁ হাতের কনুইয়ে কঞ্চির ডালা ঝুলছে। ডানহাতে ছিন্নফুল। চোখ কিছুটা ছোট হলো আসমার। এ-সময়ে এরা? দবিরকে চেনে ভালমতো। দক্ষিণ পাড়ায় বাড়ি। পাশের ছেলেটার নাম জানে কিন আলাপ পরিচয় তেমন নেই। স্ুলের কয়েক বছরের সিনিয়র। মেয়েদের কমনরুম থেকে স্যারের পিছে পিছে কাসে যাবার সময় একজটলা ছেলেদের সাথে এই মুখটিও ভেসে থাকতো। আসমার আড়ষ্টতা বুঝতে পেরে উত্তম কথা বলল। ‘এত বড়, এত সুন্দর ফুলের বাগান আপনার আগে দেখিনি তো কোনওদিন? আসমা কী বলবে ভেবে না পেয়ে লাজুক হেসে ফুলগাছগুলোর দিকে দেখল। মুখটা ধীরে উঠিয়ে তাকাল ছেলেদুটোর দিকে।

‘আপনি আপনি কচিস ক্যান্ উত্তম। ইশকুলি ও আমাগের দুই কিলাশ নিচে পইড়তো। আমি যখন সেভেন পাশ দোবো দোবো ভাব, ও তখন কেবুলি পিরাইমারি ছাইড়ে হাই ইশকুলির দিকি তাগাচে।

‘কী যে সব বলিস না দবির। হোক জুনিয়র। আপনি বলতে দোষ কি? তাছাড়া হুট করে কাউকে ‘তুমি  বলাটাও শোভন না। বিশেষ করে মেয়েদেরকে। 

‘না, না, আপনি আমাকে ‘তুমি করে বলতে পারেন। আসমা বলল।

‘না, তা হয় না। ... অন্য কোনও দিন হয়তবা। 

‘ঠিক আছে, আপনার যেমন ইছে। তা কি কি ফুল প্রয়োজন?

‘গাঁদা ফুল আর কি কিছু বেলপাতা দরকার ছিল।

‘আপনারা বসেন, আমি নিয়ে আসছি। উঠোনের জলচৌকির দিকে দেখিয়ে দিয়ে বেছে বেছে ফুল তুলে ডালায় রাখতে লাগলো আসমা। 

‘দু:খিত, আপনার ফুলগুলো ছিঁড়তে কষ্ট হবে জানি। অপরাধির মতো শোনাল উত্তমের গলা।

‘কষ্ট তো হয়ই। কিন নষ্ট তো হছে না এগুলো। বুঝতে পেরেছি, এ দিয়ে কি করবেন।

‘তুমাগের বেলের পাতা কিন পাইড়ে নিয়ে যাবানে যাবার সুমায়। চাচা রাগ করবে না তো? আসমার দিকে একদষ্টিতে তাকিয়ে বলল দবির।

‘না, আববা কিছুই বলবে না। এত বড় বেলগাছ থেকে কিছু পাতা ছিড়লে ক্ষতি কি? তাছাড়া বাতাসও তো পাতা ছিঁড়ে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আববা বাতাসরে বকে তখন? হিহিহি।


আসমার রসিকতায় হো হো হাসল দুবন্ধু। ঝুড়ি ভর্তি হলুদ গাঁদা ফুল নিয়ে রাস্তায় নেমে এলো। 


গ্রামের একেবারে শেষ মাথায় মাঠের শিয়রে আসমাদের বাড়ি। পেছনের রাস্তাটার পরই বিস্তৃত মাঠের শুরু। স্ুলের দিকে যেতে কিছুপথ হাঁটলেই ওদের জমির কোনায় রাস্তার পাশেই বড় বেলগাছটা। আশে পাশে আর কোনও গাছ নেই। দূরে কিছু খেজুর গাছ অনাহুতের মতো দাঁড়ানো। শীতকাল এলে যখন গাছিরা ওদের ডাল কেটে মাথা চেছে দেয় রসের জন্য, ওরা তখন সারাক্ষণ হাসিমুখে চেয়ে থাকে কখনও খোলা প্রান্তরের দিকে, কখনও লোকালয়ে। এইসময় ঝাঁকড়া মাথায় কাঁটাওয়ালা ডাল দোলায় শুধু। বেলতলায় বসে কান্ত পথিকেরা বাউল বাতাসে খেজুর-চূড়ার মাথা ঝাঁকানো দেখে আর বিশ্রাম নেয়। তলাটা শুকনো এঁটেল মাটির মতোই খড়খড়ে। শানের মতো মসন। এখানে এসেই মাটির ওপরে বসে পড়ে সবাই। উপরে সবুজ ঘন বেলপাতার বাজনা। পাতাগুলো যেন সবুজ সবুজ দীর্ঘ নিঃশ্াস ছুড়ে দেয় মাঠের দিকে। সেই শ্াস ঝোড়ো হাওয়া হয়ে বয়ে যায় ধান-পাট কিংবা অড়হর ক্ষেতে। এইসব এইখানে, অবসরে শুয়ে বসে দেখেন আসমার বাবা লতিফ সর্দার।

 

বেলগাছের গোঁড়া থেকে একটু তফাতে চটার মাচা করেছেন লতিফ। মাঠ বা বাড়ির কাজকর্ম সেরে ওখানে বসে বিশ্রাম নিছেন। দবির ও উত্তমকে দেখে তাকালেন।

ও চাচা, ভাল আছ? 

আছি ভাল, তুই কিরাম। কনে যাচিস, দবির। 

এটটা দরকারে আলাম গো চাচা।

‘তোর আবার কি দরকার পইলো। তুই তো টো টো কোমানির ম্যানেজার। কাজ কিসির?

‘দ্যাকো দিনি চাচা। কীরাম লজ্জা দিতিচাও। দূর্গো পূজো আইয়েচে না। উত্তম সব একা কইরে পারে? 

‘তা ঠিক। ছ্যামড়াডা এলাকার সবকিছুতি আগে আগে। ইরাম হাউশ কইরে ঈদ-পুজো পার্বণের কাজ উত্তম ছাড়া আর কিডা করে?

‘এলাকার ছেলে হিসেবে এটা তো আমার কর্তব্য লতিফ চাচা। এত প্রশংসা করলে তো লজ্জা লাগে।

‘না না, উত্তোম। যা সত্যি তাই কচি। অল্যায্য কতা তো কইনি।

‘বিএ পাশ করে কোনও চাকরি নিই নি চাচা। এইরকম অল্প পাসের চাকরিও নেই আজকাল।  বাবার ওষুদের দোকানে যা একটু বসি গিয়ে মাঝে মাঝে। হাতে সময়ও আছে। তাই সমাজের কাজে ব্যয় করবার চেষ্টা করি আর কি

‘আইচা বুজলাম। এইবার কও কি দরকার তুমাগের।

‘কিছু বেলপাতা নিতাম, চাচা। গাচে ওটপো? বলল দবির।

‘সাবদানে উটিস। বেলের কাটা কিনক সংঘাতিক। গাচে উইটে পাড়া ভাল। পাতা েঁছড়বে না। পূজোর জন্যি তো? সাবধানে এটটা এটটা ধইরে ধইরে পাড়িস।

‘আইচা, চাচা।

(এরপর পরের সপ্তাহে)

যাত্রা

রেজা নুর 

‘শেষবারের মতো কী দেখতে চাও তুমি?’—  কথাটা শুনে মুখে অল্প হা নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন মোহসিন। 

প্রশ্নটা গোলমাল পাকিয়ে উঠছে মাথার মধ্যে। কিছুটা রসিকতার মতোও মনে হতে লাগলো। কেননা কথার ফাঁকে দড়াম ক’রে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় টেনে আনা হাবীবের লক্ষণ। প্রশ্ন শুনে সামনের লোক ঘাবড়ে যায় আর ও মজা দ্যাখে।

‘তোমার কথাটা তো বুঝলাম না হাবীব, খোলাসা করো’ 

আর কতো খোলাসা করবো, খোসা কেলিয়ে বলেছি মামা, হাবীব উত্তর দিলো।

‘মানে?’

‘মানে আপনি এই জীবনের বেলা-শেষে মৃত্য-শয্যায় যখন আজরাইল ফেরেশতার অপেক্ষায় থাকবেন, তখন ফাইনাল চোখ বুঁজার আগে কী বা কাকে দেখতে চান? অতি সাধারণ সওয়াল’।


মোহসিনের মুখটা আবারও হা হলো। এবার একটু বেশীরকম। থুতনিটা ঝুলে গেলো। একটা মাছি ভন্ ভন্ করছে। হা-খোলা মুখে গেলেও বোধহয় মুখের ভেতর থেকে গান বাজনা সেরে বেরিয়ে আসতে পারবে। মুখ বন্ধ ক’রে চোখ খুললেন একটু বেশি। 


দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ আয়না হয়ে আছে। চৈত্র মাস। পৃথিবী তাতিয়ে তুলেছে আগুনের মতো সূর্যালোক। তবে বেশি গরম লাগছে না। পেয়ারা তলায় ঝুলন্ত চেয়ারে ব’সে আছেন মোহসিন। দুইদিকে খুঁটি পুতে টান করা জালের ইজি চেয়ার। একবার উঠে আধশোয়া হলে এমনিতেই দুলে ওঠে। পিঠ এদিক ওদিক করলে দোলা থামে না। মিরপুর দশ নম্বর গোল চত্বর থেকে পল্লবীর দিকে যেতে মিনিট দশেক হাঁটলে মোহসিনের বাসা। আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পার হলে দুতিনটে বাড়ীর পরে ডানদিকের টিনশেড। রাস্তা থেকে একটুকরো ঘন বন মনে হয়। বিশাল কৃষ্ণচূড়ার একটা ডাল নুয়ে এসে আড়াল করেছে মেইন গেইটাও। বাড়ীর ভেতরে ধবধবে আঙিনা। গ্রামের বাড়ীটার আদল উঠিয়ে এনেছেন মনে হয়। ইটের দেয়ালের ওপর টিনের ছাউনি। বারান্দায় ওঠার আগে চওড়া সারি ক’রে ইট পুঁতে পুঁতে মাঝখানে টুকরো পাথর বিছিয়ে পথ করা। সারি সারি পাতাবাহার ঝাঁকড়া হয়ে সরু পথ সরুতর করেছে আরও। যাওয়া আসার পথে গায়ে হাত বুলিয়ে দেয় যেনো পাতাগুলো। কাঁঠাল গাছ লাগিয়েছেন এককোণায়। আরেক পাশে জামরুল। বেশি জায়গা যাতে না নেয় তাই কলমের আমগাছও লাগিয়েছেন। কাঁঠাল গাছের বেলায় আপত্তি তুলেছিলেন গিন্নি। বলেছিলেন, এখানে কী ছাগলও পুষবে না-কি। খোকনকে ব’লে বাঁকা একটা লাঠিও কিনিয়ে এনে দিই। মুসা নবীর মতো পাতা পেড়ে পেড়ে খাওয়াবে’। মুখ তুলে সুর ক’রে জবাব দিয়েছিলেন, ‘কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়...’।  মৃদু হেসে অন্যদিকে চলে গিয়েছিলেন গিন্নি। 

মোহসিনের হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে আরেকবার তাড়া দিলো হাবীব। যেনো জবাবটা শোনা খুবই জরুরি। ‘কী হলো মামা, শুধু মনে মনে হাসবা না উত্তরটা দিবা?’  একমাত্র বোনের একমাত্র ছেলে। বড়মামার হৃদয়ের ভেতরে ওর আনাগোনা। চতুর্থ সন্তান বলা যায়। বড় ছেলে পড়াশোনা শেষ ক’রে চাকরী করছে। হারমেন মেইনার স্কুল এন্ড কলেজ-এ ইংরেজির প্রভাষক। মেয়েটা এবার ফিজিক্সে এম এ ফাইনাল দেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ছোট ছেলে ক্লাস টেনে পড়ে। নিজের সন্তানদের তালিকায় হাবীবের স্থান কোনটা তা ভেবে বের করা মুশকিল মোহসিনের জন্যে। বয়সের দুরত্ব, সম্পর্কের গম্ভীরতা, কিংবা জেনারেশন গ্যাপের পরিমাপ কমে এসে একরকম মিহিন মোলায়েম বন্ধুত্বের বাষ্পময় উষ্ণতায় জাত হয়ে আছে মামা-ভাগ্নের সম্পর্ক। তাই তো হাবীব মৃত্যু-শয্যার মতো বিষয়টা নিয়ে এরকম সরল রসিকতা করতে পারে।


‘আমি আমার এই বাড়ীর উঠোনটায় বেদে পাটি পেতে আকাশভরা তারা দেখে দেখে চোখ চির-বন্ধ করতে চাই হাবীব’। খুব গভীর ভাবনামগ্ন মন নিয়ে জবাব দিলেন মোহসিন। হো হো ক’রে হেসে উঠলো হাবীব। জানালার পর্দা সরিয়ে একনজর দেখে আবার পর্দা টেনে দিলেন রোকেয়া। 

‘মা-মা... কোনো গ্যারান্টি আছে তোমার  অন্তিম সময়টা রাতের বেলায়ই এসে হাজির হবে?’ তা’ছাড়া আকাশে যদি তখন মেঘ থাকে, কী করবা’

মোহসিন মাথা চুলকোলেন। অনেক ভেবে উত্তরটা তৈরি করেছিলেন। আবার চিন্তায় ফেলে দিলো ছেলেটা।

হাবীবের দিকে অসহায় চোখে তাকালেন। বললেন, ‘তুই বাসায় যা, তোর ছুটি চলছে ব’লে আমার অবসর সময়টা নষ্ট করিস না’।

‘তোমার অফুরন্ত অবসর অনন্ত ভাবনায় ভরে দিচ্ছি মামা, থ্যাংক য়্যু দাও’

‘হা-বী-ব,  আমার সামনে থেকে যা’। অন্যরকম স্বরে বললেন মোহসীন। হাবীব আস্তে ক’রে উঠে মামীর রুমের দিকে গেলো।

কলেজ থেকে কী কারনে যেনো একটু তাড়াতাড়ী বাসায় ফিরলো বড়ো ছেলে তৌহিদ। রোকেয়া দুপুরের খাবার দিয়ে দিলেন টেবিলে। হাতলওয়ালা বড়ো চেয়ারটায় মোহসিন বসেন। অন্যপ্রান্তের চেয়ারে রোকেয়া । টেবিলে সবকিছু সাজিয়ে দিয়ে তিনিও বসে পড়েন সবার সাথে। ডাইনিং টেবিলের মাঝখানে নিচে চাকা লাগানো কাঠের গোলাকার প্রশস্ত চাকতি বসানো আছে। তার ওপর বিভিন্ন পাত্র নানা পদের তরকারি আর ভাত সাজানো। একেক জনের নেয়া হয়ে গেলে চাকা ঘুরিয়ে নিজের কাছে এনে ইচ্ছেমতো তুলে নিচ্ছে সবাই। অন্যান্যদিন হলে হাবীব কথা ব’লে মাতিয়ে রাখতো সবাইকে। আজ চুপচাপ। রোকেয়া তাকিয়ে আছেন ওর দিকে। তৌহিদ এমনিতেই কম কথার ছেলে। অল্প শব্দে টেনে টেনে ছোট ছোট বাক্যে কথা বলে। মা মনে মনে বলেন, এই ছেলে ক্লাসে লেকচার দেয় কীভাবে তা একদিন দেখতে হবে। মোহসিন ধীরে নলা তুলছেন মুখে। দু’একবার তাকালেন তৌহিদের দিকে। কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,  মৃত্যু সম্পর্কে তোর ভাবনা কী রকম রে?’

অবাক আর ব্যথাদীর্ণ দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকালো তৌহিদ। জবাব না দিয়ে শান্তভাবে তাকিয়ে থাকলো। মা’র দিকে দেখলো একবার। মা-র চোখেও কিছু না বোঝার দৃষ্টি। মোহসিন তাড়া দিলেন, কী-রে কিছু বলছিস না যে?

‘মৃত্যু জীবনে খুব স্বাভাবিক পরিণতি, বাবা। বললো তৌহিদ। 

‘আরও বিস্তারিত বল্’। মোহসিন বললেন। ‘পারলে কোটেশান টোটেশান টেনে বল্’।

‘কবি আলফ্রেড টেনিসন মৃত্যুকে ‘সীমানা-অতিক্রম’ বলেছেন। সসীম থেকে অসীমে যাত্রার সিংহ দরোজা হলো মৃত্যু। তাঁর  Crossing the Bar কবিতার কয়টা লাইন এরকম বাবা: 

“Twilight and evening bell,

     And after that the dark!

And may there be no sadness of farewell,

     When I embark;


For  tho’ from out our bourne of Time and Place

        The flood may bear me far,

I hope to see my Pilot face to face

        When I have crost the bar.”


আর ব্রাউনিং তো প্রবীণতাকে জ্ঞানসমৃদ্ধতায় উপনিত ভরপুর  এক মুগ্ধ বয়স ভেবেছেন। জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো নেড়েচেড়ে দেখার অবসর মেলে এই বয়সে। 


রোকেয়া অবাক হলেন। যে ছেলেকে শাসন করেছেন, বকেছেন কখনও কখনও। টু শব্দ করেনি। নিচুস্বরে জবার দিয়েছে কথার। নীরবে কীভাবে জীবনের সুগভীর জ্ঞান শুষে নিলো টের পাননি তিনি। তৌহিদের কথার মধ্যে কোনো ছায়া নেই। শুধু আলো। কেমন নিস্তরঙ্গ, নিরন্তর কথামালার ভেতর সুবাসিত উপলদ্ধি জড়ানো। চোখ ছল ছল ক’রে উঠলো রোকেয়ার। মোহসিন চোখ বন্ধ ক’রে আছেন। হয়তো টেনিসনের ‘সীমানা’র কথা ভাবছেন। তাঁর ‘পাইলট’কে দেখতে পাবার আশাও জাগছে মনে। ব্রাউনিঙের মুগ্ধময় প্রবীণতার কথা ভাবছেন।


মেইন গেটে খট্ খট্ আওয়াজে সবাই তাকালো সেই দিকে।  কে এলো, মনে হয় তারা চলে এসেছে। মনে মনে বললেন রোকেয়া।  কেউ কিছু বলার আগে হাবীব উঠলো। ডানহাত উঁচু ক’রে রেখে বামহাত দিয়ে খিল খুললো। পকেট গেট দিয়ে মাথা নিচু ক’রে ঢুকলো তারা। মুখ তুলেই দেখলো হাবীব দাঁড়ানো। 

‘তুই এতো সকাল সকাল আসলি যে? ক্লাস শেষ?’ বললো হাবীব।

‘আগে বলো, আমাকে রেখে খেতে খেতে কী গল্প করলে? রিপিট করতে হবে’।

‘আমি আজ একটা কথাও বলিনি, লেকচার শুনেছি, প্রফেসর সাহেবের।

‘মানে?’

 ‘তৌহিদ প্রফেসরের’।


তারা’র হাসি সবাই শুনলো ডাইনিং টেবিলে বসে। কাছে এলে রোকেয়া বললেন, এক্ষুণি হাত মুখ ধুয়ে আয়, খেয়ে নে’ 

‘আচ্ছা মা’


গরমের দিনগুলো খুব বড়ো। সারাদিনের উত্তাপ এসে জড়ো হয় সন্ধ্যায়। বৃষ্টি হলে ভাঁপ ওড়ে। বিকেলে কী ভেবে বেশ এক ঝাপটা বৃষ্টি দিয়েছিলো ঠনঠনে আকাশটা। সেসময় হাওয়া ভিজে হয়ে এলেও এখন আবার যা তাই। কিছুক্ষণ পর পর থমকে ছুটে এসে উড়ে যাচ্ছে পল্লবীর ওই দিকে। নতুন নতুন বাড়ীঘর পার হয়ে এয়ারপোর্টের ওপাশের খোলা মাঠের দিকে যাচ্ছে মনে হয়। মাগরিবের নামাজের পর চা বসাতে যাচ্ছিলেন রোকেয়া। মোহসিনের কথায় ফিরে তাকালেন।

‘আমাদের বাসায় বেদে পাটি আছে? খেজুর পাতার মাদুর?’  মোহসিন জানতে চাইলেন।

রোকেয়া তাকিয়ে থাকলেন। বুঝতে চেষ্টা করছেন। টেনে টেনে বললেন, মা-দু-র আছে, খেজুর-পাতারটা তো নেই’। মনে মনে অবাক হলেন। কী হলো লোকটার। বাসায় কী আছে না আছে তা ওর  চেয়ে আর কে ভালো জানে? আজ হঠাৎ বেদে পাটির কথা বলছে কেনো? এ নিশ্চয় হাবীবের কান্ড। নতুন নতুন চিন্তা ঢুকিয়ে দেয় মাথায়। 

‘আচ্ছা মাদুরটা দাও’ ভাবলেশহীন স্বরে বললেন মোহসিন। 

একটু পরে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে মাদুর বাড়িয়ে দিলেন। মোহসিন অলস হাতে বগলদাবায় গুঁজে উঠোনে এলেন। খোলা জায়গায় পাটিটা পেতে কনুইয়ে ভর দিয়ে কাঁত হয়ে শুলেন। সামনে ছোট বকুলগাছটার পাশ দিয়ে কৃষ্ণচূড়ার মাথা ছুঁয়ে দৃষ্টি দিলেন আকাশের দিকে। দিনের বেলা বৃষ্টি হওয়াতে খুশি হয়েছিলেন। রাতের বৃষ্টি পছন্দ না মোহসিনের। মেঘে ঢেকে যায় তারাগুলো। মনে হয় দুদ্দাড় জলের তোড়ে ধুয়ে যাবে তারার আলো।  


আকাশে এখন মেঘের চিহ্ন নেই। কাঁসার থালার মতো মাজাঘষা চাঁদ একলা লটকে আছে ডালটার আগায়। আজ মনে হচ্ছে পূর্ণিমা। তবে জোসনা অতটা ফকফকে না। কেমন যেনো মিনমিনে। চাঁদটা হঠিয়ে দেয়া যেতো। তারারা তবে মার্বেলের মতো এমন ঝকঝকে আকাশ-মাঠে গুর্ গুর্ ক’রে গড়িয়ে নেমে আসতে পারতো। 


কনুইয়ের কাছে নরোম কিছু অনুভব করলেন। ফিরে দেখেন হাতের নিচে বালিশ পুরে দিচ্ছেন রোকেয়া। দুপদাপ পায়ের শব্দে তাকালেন পাতা বাহার গাছগুলোর দিকে। তারা আসছে।

‘কী করছো বাবা?’

‘তারা দেখার চেষ্টা করছি, চাঁদটার জন্য হচ্ছে না’।

‘এইতো আমি বাবা’

‘তুই তো আমার সাত আকাশের তারা, মা’। আচ্ছা তোদের পদার্থ বিদ্যায় সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে কি কিছু আছে? 

‘বাবা, আইনস্টাইনই তো বলেছেন, “ আমার বিশ্বাস, আমরা যা কিছু করি কিংবা যে জন্য বাঁচি, সবকিছুর পেছনে কার্যকারণতত্ত্ব ক্রিয়াশীল রয়েছে; এটা বরং ভালো যে, আমরা এর সবকিছু দেখতে পাই না”। তুমি কি জানো বাবা কথাগুলো কার সাথে বলেছিলেন? আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে আলাপের সময় বলেছিলেন’। তাই অত বেশি ঘাটতে বা দেখতে না যাওয়াই ভালো বাবা’।

‘আমার দেখা নিয়ে তোর মাথা ঘামাতে হবে না। তোকে যা জিজ্ঞেস করেছি তাই বল’। 

‘আচ্ছা তাহলে শোনো। পদার্থ -বিজ্ঞানী  মরিস পেজ বলেছেন, “ যেমন সাগরের উপরিভাগ আমাদের জানা সমগ্র এলাকার তুলনায় একটি নগণ্য অংশ, তেমনি আমাদের প্রাকৃতিক বিশ্বের সবই মহাশূন্য ও কালের বিশেষ আয়তনের মধ্যে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও যে সমগ্র বাস্তবতার অতীব ক্ষুদ্র একটি অংশ হতে পারে – সেই বাস্তব রাজ্যে তাঁর ( স্রষ্টার) অবস্থিতি”।


কথাগুলো ব’লে বাবার দিকে তাকালো তারা। রোকেয়া আলতো ক’রে মেয়ের হাত ধরলেন। অন্যহাত রাখলেন মাথার ওপর। মুগ্ধ-চোখে তাকিয়ে থাকলেন মুখের দিকে। এই ম্রিয়মান জোসনায় তারার মুখখানা কেমন উজ্জ্বল! সেদিনের মেয়ে মুখ বেঁকিয়ে কেঁদে বায়না করতো আজ বাবার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছে কী সুন্দর! চোখ দুটো একটু চুলকে উঠলো রোকেয়ার। মোহসিন চোখ বন্ধ ক’রে ছিলেন। তারা বাবার গায়ে হাত রেখে ডাকলো।

‘তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছো বাবা?’

ঘুম থেকে চোখ মেলার মতো ক’রে তাকালেন মোহসিন। সেই চোখে ঘুম নেই, ভাবনার রেখা আঁকা।

‘বাবা, একটা কথা বলি?’

‘বল্’ । ভারি গলায় বললেন মোহসিন।

‘তোমার মনটা মনে হয় এলোমেলো হয়ে আছে, চিন্তা করছো খুব। দু’একটা কবিতার লাইন শোনাই?’ 

‘তুই বলবি ফিজিক্সের কথাবার্তা, কবিতা পাবি কোথায়?’

‘বাবা, তুমি তোমার মেয়েকেও চেনো না? এমন কবিতা শোনাবো যাতে মাটির ঘ্রাণ আছে, শিশির, কাঁঠাল ছায়া এইসব...’

“কোন্ যেন পরী চেয়ে আছে দু’টি চঞ্চল চোখ তুলে!

পাগলা হাওয়ায় অনিবার তার ওড়না যেতেছে দুলে!

            গেঁথে গোলাপের মালা

            তাকায়ে রয়েছে বালা,

বিলায়ে দিয়েছে রাঙা নার্গিস কালো পশমিনা চুলে!

বসেছে বালিকা খর্জুরছায়ে নীল দরিয়ার কুলে!”


মোহসিন অবাক হয়ে শুনলেন মেয়ের মগ্ন উচ্চারণ। কী সুন্দর আবৃত্তি করলো, জীবনানন্দ। কোন্ কবিতাটা যেন।  কপাল কুঞ্চিত ক’রে ভাবলেন। মনে পড়লো, ‘মরীচিকার পিছে’। মেয়েটা বাংলা সাহিত্য পড়লেও পারতো।


খেজুরের ছায়ায় না হোক খেজুর পাটিই সই এখন। আর দরিয়া? জীবনের চেয়ে বড়ো দরিয়া কোথায়? এই দরিয়ার কুলে ব’সে ব’সে ওই বালিকার মতো স্মৃতির মালা গাঁথতে গাঁথতে দিন যায়। কী আশ্চর্য আমাদের জীবন! জন্মের পর থেকে যখন চারদিকে তাকাবার বয়স হলো, মনের ভেতর গেঁথে যেতে লাগলো সব। মন-ক্যামেরার রীল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ইচ্ছেমতো দেখে নেয়া যায় দৃশ্যগুলো। কখনও মলিন হয় না তা। ঠিক সেইরকম রঙিন, চকচকে, উজ্জ্বল। 

অস্তিত্ববান হওয়াটাও কতো ভাগ্যের। কত প্রাণী আছে এই পৃথিবীতে। গাছপালা। ডালপালা নাড়িয়ে দিয়ে যায় হাওয়া। ওরাও অসীম উল্লাসে ঝড় এলে উড়ে যেতে চায়। অনঢ় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তবু। আমরা মানুষ। কথা বলতে পারি। হাঁটাচলা ইচ্ছেমতো। ওহ! কী উদার দান এই অস্তিত্ব, বেঁচে থাকা। মহাকালের কোন্ সময়ে আমি আসবো তা অজানা আমার। যাবার সময়টা হয়তো আঁচ ক’রে নেয়া যায়। সূর্য আর কতদিন ঘুরবে আকাশে কে জানে? আমি শুধু জানি, এই চোখ আলোহীন হবে একদিন। আমার এই ঘর-বাড়ী, স্ত্রী কন্যা পুত্র-প্রিয়জন সবই থেকে যাবে আকাশের নীচে। আমার যাত্রা হবে হয়তোবা অন্যকোনো আকাশের দিকে। একবার যখন দেখবার অধিকার মিলেছে, শেষ দেখা বলতে বোধহয় কিছু নেই। সেরকম মানতেও  মন চায় না। 


হাবীবকে বলে দিতে হবে চোখ বোঁজার আগের ও পরের দৃশ্যগুলো একই চোখে ধারণ করে নেবো।

পুরনো লেখা
অণু গল্প

স্বপ্ন বাজী

শুভজিত্ বসাক

বাস্তবের মেঘ আকাশে ঘনীভূত হয়ে স্বপ্ন সমন্বিত বর্ষা অঝোর ধারায় পড়ে মিশবে শুষ্ক ভূমিতে,কাগজের নৌকা জলে ডুবে গেলেও ঐ স্বপ্নবারিতে ঠিকই পাড়ি দেবে এমনই ভেবেছিল পাঞ্চালী। কিন্ত স্বপ্নগুলোকে এভাবে পরাজয়ের মুখ দেখাতে হবে তা কল্পনাতীত ছিল। জুয়ায়বাজি হারার পর চুলের মুঠি ধরে লোকসম্মুখে পাঞ্চালীকে অনিচ্ছাকৃত মনের বিপরীতে টেনে-হিঁচড়ে আনল বীর দুঃশাসন! তারপরস্বপ্নচারীণীকে বলপ্রয়োগে বিবস্ত্র করবার প্রয়াসে এইবার সে সফলকাম। প্রতিটা স্বপ্ন এবার জুয়ায় হেরেছে, তাই দাসীর স্বপ্নমূল্য কিছু নেই। তাকে বিবস্ত্র করে ক্ষান্ত নেই রীতিমত নারীলজ্জার সবটুকুই আজ বিসর্জিত ঐ মিথ্যা স্বপ্নে যেখানে একদিন কাগজের নৌকা নির্দ্ধিয়ায় নাকিভাসানোর সংকল্প হয়েছিল! এখনো ধর্মের কি কিছু অবশিষ্ট তাহলে ধর্মরাজ এখনো কি বাজী লাগাচ্ছেন? প্রচন্ড জুয়া খেলা চলেছেএখনো, গর্বের অবশিষ্টাংশের স্বপ্নটুকুও আজ রেহাই পেল না আমাদের নিজের থেকেই। প্রবঞ্চিত-চক্ষুলজ্জার মিছে সমাজের কটুক্তিতে প্রতিদিনহারছি আর বিবস্ত্র করছে “বীর দুঃসমাজ”; অট্টহাসিতে মুখরিত চতুর্দিক,তবু সান্ত্বনা দিই নিজেকে জয় পরের দানেই!

Copyright © 2013 Creative Media All Rights Reserved | Designed & Developed by Graphic World (9143382591)