দর্শনের আলোকে পথের পাঁচালী

অরূপজ্যোতি ভট্টাচার্য

পথের পাঁচালীর সাথে দুজন প্রবাদপ্রতিম বাঙালি ব্যক্তিত্বের নাম জুড়ে আছে। একজন বন্দনীয় ভাষাভূষণের বিভূতি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, আর একজন সত্যজিত রায়। পথের পাঁচালীর যাত্রা পথ শুরু হয়েছে ১৯২৯ সাল থেকে। সেই যাত্রাপথ সবাক চিত্রকাব্য হয়েছে ১৯৫৫ সালে। ভাষা চিত্র আর চিত্রকাব্য দু-জায়গাতেই আসল উদ্দেশ্য আনন্দ দেওয়া। যে আনন্দ আসে মনের কোনে লুকিয়ে থাকা হৃদয় নিঃসৃত জারক রসের সাথে রসাস্বাদনের সম্ভোগ। এক জায়গাতে বিভাব আর অনুভব-এর সংযোগ ঘটে সাহিত্যের অনুঘটন এ; আর সিনেমাতে নাটকের কুশীলবদের উপস্থাপনায়।

ভাষা কাব্যে পথের পাঁচালী আর চিত্রকাব্যে পথের পাঁচালী-র মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য হল দূর্গার রেলগাড়ি দেখা। বিভূতিভূষণ এর দূর্গা রেলগাড়ি দেখেনি। সত্যজিত রায় এর দূর্গা রেলগাড়ি দেখেছে। পথের পাঁচালী পড়লে বা সিনেমা দেখলে চোখে জল আসে। এই জল বাস্তবের চোখের জলের থেকে আলাদা। কাব্যে যখন চোখে জল আসে তখন পাঠক আনন্দ পায়। দুঃখতে চোখে জল পড়ার যে আনন্দ সেটা কাব্যে হয়। এই আনন্দ আমাদের মনের নয়টি স্থায়ী ভাব আর তেত্রিশটি অস্থায়ী ভাবের নির্যাস থেকে রস নিস্পত্তি ঘটিয়ে আসে। শেক্সপীয়ার এর ট্রাজেডি নাটকের আনন্দ আর মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ-এ আনন্দ অনেকটা সেই করুণ রস এর বহিঃপ্রকাশ। বিভূতিভূষণ-এর দূর্গা রেলগাড়ি দেখেনি। এই অতৃপ্তিতে যে বিষাদের সুর, এটা মন-কে গভীর ভাবে ছুঁয়ে যায়। ট্রাজেডি আমাদের মনকে বেশি আকর্ষণ করে। কারণ এতে অন্তরের লুকিয়ে থাকা অতৃপ্তি, যে রসাস্বাদন ঘটায়, তাতে বাস্তবের যন্ত্রণা ভুলে মানুষ্ ক্ষণিকের জন্য দুঃখে চোখে জল ফেলে। সেই জলে আনন্দ পাওয়া যায়। ট্রাজেডি নিয়ে দার্শনিকদের মতবাদ আর মতভেদ এর অন্ত নেই। এই প্রসঙ্গে অ্যারিস্টটল এর ক্যাথার্সিস তত্ত্ব উল্লেখ করা যায়। ক্যাথার্সিস হল ড্রামাটিক আর্ট এর একটা প্রকাশ যেটা ট্রাজেডিকে বর্ণনা করে। সত্যজিত রায় এর দূর্গা কিন্তু রেলগাড়ি দেখেছে। কিন্তু বৃষ্টি ভেজা উচ্ছল মেয়েটা যখন রোগ সজ্জায় শেষ নিঃশ্বাসের প্রহর গুনছে, সেই দৃশ্যপট দর্শকের চোখে জল এনে দেয়। সিনেমাতে এটাই বোধ হয় ক্যাথার্সিসের সার্থক প্রয়োগ। 

বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীতে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হল অপু। অপুর শিশুমনের কল্পনা মহাভারতের মহাযুদ্ধকে নতুন অনুভূতিতে সজীব করেছে। শিশুমনের কল্পনায় কর্ণ আর অর্জুন এর তিরন্দাজী আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। যতগুলো তীর মারলে শিশু মনের আশাপূর্ণ হয়, অপুও ততগুলোই তির মারত। কর্ণের চরিত্র অপুর শিশুমনে একটা আলাদা মাত্রা আনত। আমার বিচারে মহাভারতে কর্ণ আর রামায়নে মেঘনাদ দুজনেই এক। দুজনেই চোখে জল এনে দেয়। শিশুমনে ট্রাজিক হিরোর প্রভাব অপুর চরিত্র দিয়ে খুব ভালো বোঝা যায়। শিশু হৃদয়ে ক্যাথার্সিস নিয়ে বিভূতিভূষণের এই পরীক্ষা সাহিত্যের আলোকে যে কতখানি সফল সেটা বিশ্বের সাহিত্য সম্ভারে খুবই বিরল। 

 

বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীতে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল অশ্বত্থ গাছের উপস্থাপনা। এত বিচিত্র গাছ থাকতে অশ্বত্থ গাছ কেন ? উর্ধমুলম অধশাখম অশ্বত্থ প্রাহুরব্ব্য়ম। অশ্বত্থ গাছের সাথে হিন্দুদর্শনের একটা সংযোগ আছে। মানুষ কি করে শেখে তার সাথে জীবাত্মা আর পরমাত্মার যে সংযোগ সেটা অশ্বত্থ গাছ দেখিয়েছে। মানুষের শিক্ষা পদ্ধতির ওপর অনেক দার্শনিক মতামত দিয়েছেন। লক, হিউম,বার্কলে এনারা বলেছেন মানুষ বুদ্ধি দিয়ে শেখে। লিবনিজ, দেকার্তে, স্পিনোজা এনারা বলেছেন মানুষ অভিজ্ঞতা দিয়ে শেখে। এমনুএল কান্ট্ বলেছেন মানুষ অভিজ্ঞতা পূর্ব একটা শক্তি দিয়ে শেখে। যেটাকে বলে আপ্রাযরী। বিভূতিভূষণ দেখিয়েছেন শিশুমনের ওপর সাহিত্যের প্রভাব বিশেষ করে ট্রাজিক হিরো। উনি একটা নতুন মতামত দিয়েছেন। মানুষ সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে শেখে। পথের পাঁচালীর পথ হয়ত এই জন্য আজ শেষ হয়নি।

লেখাটি কেমন লাগল, অনলাইনে মতামত লিখে জানান

হিন্দু সংস্কৃতি ও গঙ্গাদূষণ

সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়

শেষাংশ

শ্রীরাম ইন্সস্টিটিউট ফর ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষনায় দেখা গেছে, হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ২,৫২৫ কিমি প্রবাহ পথে ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ জনবসতি, প্রতি বছর কোটি কোটি কোটি লিটার নর্দমার জল সরাসরি গঙ্গায় এসে পড়ে, এর ফলে জলে দূষণের পরিমাণ মাত্রা ছাড়া। জলে জীবানু, বিশেষ করে.ই-কোলাইয়ের মতো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং গঙ্গার জল বিষাক্ত হয়ে পড়েছে, গঙ্গা এখন কার্যত কলেরা, কৃমি, টাইফয়েড, ভাইরাল ফিভার, কানে সংক্রমন, গ্যাস্ট্রোয়েনটারাইটিস এবং হেপাটাইটিস-এ,বি,সি,ই, ডিসেন্ট্রি প্রভৃতি রোগের আঁতুড় ঘর হয়ে উঠেছে.

গবেষণায় দেখা গেছে—

গঙ্গোত্রী- পানের অযোগ্য

দেব প্রয়াগ-চাষে ব্যবহারের অনুপযুক্ত(fecal colliform>5000mpn/dl)

কানপুর- জলে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণের আতঙ্কজনক বাড়বাড়ন্ত

ঋষিকেশ- চাষে ব্যবহারের অনুপযুক্ত

হরিদ্বার- চাষে ব্যবহারের অনুপযুক্ত

এলাহাবাদ-ই-কোলাইয়ের ভাঁড়ার 

গতবছরের গবেষণা অনুযায়ী স্টার আনন্দ জানিয়েছিল যে, গঙ্গোত্রী থেকেই দূষিত হতে শুরু করেছে গঙ্গা। হিন্দুদের এই পবিত্র তীর্থক্ষেত্র গঙ্গার উৎসস্থল গোমূখ থেকে মাত্র ২০ কিমি দূরে. গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে গঙ্গার জলে সংক্রমনের সূচক হিসেবে ব্যাকটেরিয়ার সম্ভাব্য সর্বাধিক সংখ্যা (mpn=maximum probable number) ভয়াবহ,. গঙ্গোত্রীতে এর পরিমাণ ২৬ প্রতি ১০০mL, দেব প্রয়াগে ২২,০০০, হরিদ্বারে ১৪,০০০, কানপুরে ৩,৫০০,০০, এলাহাবাদে ৭০,০০০, বারাণসীতে ৮৮,০০০, পাটনায় ৪৬,০০০ এবং মালদায় ৯০০। সাধারনভাবে mpn পরিমাণ প্রতি১০০mL এ ১০ ছাড়ালেই তা বিপজ্জনক, ব্যাকটেরিয়ার এরকম উপস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে, গঙ্গার জল পান তো দূরের কথা তা চাষবাস এবং স্নানেরও উপযুক্ত নয়।

গঙ্গাদূষণমুক্ত রাখার দাবিতে হরিদ্বারের স্বামী নিগমানন্দ ১১৪ দিন অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন ২০১১তে। তিনি ত রাজনীতির কোন দলের কেউ ছিলেন না, শিল্পপতিও ছিলেন না। চার মাস ধরে তার অনশনশেষে মৃত্যুতে কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার বা উত্তরাখণ্ডে বিজেপি সরকার কারো মাথাব্যথা হয় নি, মাথা ধরে নি মুখরোচক সংবাদে দেশ উত্তাল করা সংবাদমাধ্যমগুলোর। শুধু পরিবেশকর্মী জয়া মিত্র, মহাশ্বেতা দেবী, নদীবিশেষজ্ঞ কল্যান রু্দ্রের ক্ষীন কন্ঠের আক্ষেপ ছাড়া। গঙ্গাবক্ষের পাথর তোলা আর পাথর ভাঙ্গার ক্রাশারের কারবারে সিলিকোসিস এর মত দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছিলেন এলাকার গরিব মানুষ। ভোটদরদী সরকার, জনদরদী স্বামী নিগমানন্দকে নিরবে মরতে দিলেন।

পরমার্থ নিকেতনের স্বামী চিদানন্দ সরস্বতী বলেছেন, গঙ্গা দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গঙ্গার তীরে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে নদী দূষণের কারণে প্রতিবছর ১০ লাখ মানুষ মারা যায় এবং এ বিষয়টি বেশিরভাগ মানুষই বুঝতে পারে না। বোমা বিস্ফোরণে ১০জন আহত হলে গোটা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়, অথচ এক্ষেত্রে কারো কোন হেলদোল নেই।

গঙ্গাদূষণ শুধুমাত্র গঙ্গাতীরে বসবাসকারী ৪০ কোটি ভারতীয়েরই ক্ষতি করছে না, করছে ১৪০টি মাছের প্রজাতি, ৯০টি উভচর প্রাণীর প্রজাতি ও ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী গাঙ্গেয় শুশুকেরও।

২০১২তে Indian council of medical research এর উদ্যোগে national cancer registry programme এর সমীক্ষায় দেখা যায় দেশের ৩০টি রাজ্যের মধ্যে গঙ্গাতীরবর্তী উত্তর্ প্রদেশ বিহার পশ্চিমবঙ্গে ক্যানসার প্রবনতা সবচেয়ে বেশি। সরকারী হাসপাতালের রেকর্ডই বলছে ভারতে শিশুমৃত্যুর সবচেয়েবেশি দায়ী কারণ গঙ্গাজলবাহিত সংক্রমণ।

1986 সাল বারানসীর ঘাট থেকে শূরু হয়েছে ‘গঙ্গা অ্যাকসন প্ল্যান’ এর বহু শত কোটি টাকার যাত্রা। যদিও জনতা ও সেচ্ছাসেবী বেসরকারী সমীক্ষক সংস্থার মতে এর নীট ফল শূন্য। ভারতের সনাতন নগরী, প্রাচীনতম তীর্থ, বর্তমান(2014)প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনীক্ষেত্র, বারানসীতে গঙ্গাদূষণের মাত্রা ১-২ million mpn/ml। সংকটমোচন ফাউনণ্ডেশন নামক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সমীক্ষায় প্রকাশঃ

Location / Parameters
Biochemical Oxygen Demand (mg/l)
Fecal Coliform Count / 100ml
At beginning of the Varanasi City ... Near Assi/Tulsi ghat
3-8 mg/l
20,000 - 100,000 per 100ml
Downstream of the Varanasi City ... Varuna confluence with Ganga
20-50 mg/l
100,000,000-200,000,000 per 100ml
Permissible limits for bathing
Less than 3mg/l
Less than 500 per 100ml

পুণ্যস্নান কি পাপস্নানে রূপান্তরীত? দশ-পাঁচ হাজার বছর আগে গঙ্গা সত্যই প্রানদায়ী কলুষনাশিনী ছিল।এতদিনকার অজস্র পাপের ভারে জর্জরিত গঙ্গা আজ মৃতপ্রায়।তার চিকিৎসা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে গঙ্গার পার বাঁধানো ও গঙ্গাপারের সৌন্দর্য্যায়নের অন্যান্য ব্যাবস্থা যা গঙ্গা পরিকল্পনার নামে কলকাতায় বা বারানসীতে নেওয়া হয়েছিল গত তিরিশ বছরে তা হাস্যকর, মূমুর্ষু দেহে অলঙ্কার পরিয়ে সেবা করার মতই নিষ্ঠুর অপব্যয়।

সম্প্রতি গঙ্গাকে বাণিজ্যিক যাতায়াতের জলপথে রূপান্তরীত করা ও বারানসী থেকে হূগলী পর্যন্ত ১৬০০ কিমি পথে গঙ্গা ও তার উপনদীর উপর ১৬ বাঁধ নির্মানের কথা বলা হচ্ছে সরকারপক্ষ থেকে। কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানীচালিত নৌ চলাচলে নদীর দূষণ বাড়বে এবং ১৬টি বাঁধ নদীস্রোত রুদ্ধকরে ১৬টি বড় পুকুর তৈরী করবে। এই উদ্যোগ গঙ্গার স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা পুনরুদ্ধারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী।

গঙ্গার উচ্চপ্রবাহে রয়েছে অলকানন্দা নদীতন্ত্র। সম্প্রতি বিশেষ্জ্ঞদের পরামর্শ এর উপরে নির্নীয়মান ২৪টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ত্যাগ করতে হবে গঙ্গা ও তার দুই তীরের জীবজগৎ বাঁচাতে। ভারতের বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞরাই এটা চেয়েছেন। নেপালের নদীগুলি যেমন মহাকালী কর্ণালী গণ্ডক কোশী গঙ্গানদীর মোট জলের ৪০ শতাংশ এবং শুখা মরশুমে গঙ্গার জলের ৭০ শতাংশ দেয়। এদের উপরে যত বাঁধ নির্মিত হয় গঙ্গার জলের বেগ ও পরিমাণ তত কমে। কিন্তু প্রধানত: ভারত সরকারের পরিচালনায় ভারত-নেপাল যৌথ উদ্যোগে বাঁধগুলি করা হচ্ছে ও হবে। উন্নয়নের নামে করা এই সব প্রকল্প কিন্তু ৪০-৫০ কোটি ভারতীয়(সাথে আরো আনুমানিক সাত কোটি বাংলাদেশি ও নেপালবাসীর) জীবনরেখা উদ্ধারের নীতির পরিপন্থী।South Asia Network on Dams, Rivers & People জানাচ্ছে Indian Himalayas moving towards highest Dam Densities in the World. প্রকৃতসত্য হল নির্মানরত ও নির্মানের উদ্যোগ হয়েছে এমন বাঁধের সংখ্যা প্রায় ৪০০।Ganga basin would have the highest number of dams (1/18 km of river channel dammed) in the world, followed by the Brahmaputra (1/35 km)and the Indus (1/36 km). নিত্যপূজার উপচার বাসীফুল, ফল, পাতা, ছাই, ধূপকাঠির শেষাংশ নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে, বদলে মাটিতে পুঁতে দেওয়া যেতে পারে। ঔপচারিক পূজার বদলে নামজপ, গায়ত্রী জপ, সূর্যপ্রণাম, আসন, মনঃসংযোগ, ধ্যান, প্রানায়াম বা ব্যাবহারিক কর্মের নিষ্কাম যোগে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। চতুর্বর্গপুরুষার্থ ও কর্মযোগের আদর্শসকল যুগের উপযোগী। 

দুর্গাপূজা ইত্যাদি সম্মিলিত পূজা এবং সমবেত যাগযজ্ঞের শেযে বর্জ্য উপচার এবং মূর্ত্তি নদী পুকুরে না ফেলে জৈব ও অজৈব রাসায়নিক উপাদানগুলির প্রতিটির নিজ নিজ পুনর্ব্যবহারের শাস্ত্রীয় নিষেধ নেই, কেবল আচারে অনুমোদন দিতে হবে সকলকে, প্রয়োজনে আইন প্রনয়ন করতে হবে। 

মিউনিসিপ্যালিটি ও পঞ্চায়েতগুলিকে নিশ্চিত করতে হবে যে পয়ঃপ্রনালীর জল নদীতে না যায়। মানুষ ও গৃহপালিত পশুর মৃতদেহ যেন নদীতে ফেলা না হয়।পশুর মৃতদেহ কবর দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।

মোট জলপ্রবাহ ও স্রোতের বেগ বাড়াতে নদীর বুকের বাঁধগুলি তুলে দিতে, হবে। নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর অপমৃত্যু হয়। নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে ৩৪ টি নদীবাঁধ সরিয়ে দেবার সুপারিশ করেছেন। পাপহরা গঙ্গা পাপগ্রাহী হতে শুরু করল যখন হরিদ্বারের নিকটে বাঁধ দিয়ে গঙ্গার জল অন্যত্র পাঠানো শুরু হল। মোট জলপ্রবাহ বেশি থাকলে আগত বিষ দ্রুত লঘু হয়ে যায়, স্রোতের বেগ বেশি থাকলে বিষ দ্রুত দূরে অপসারিত হয়।

গঙ্গার উৎসথেকে প্রবাহ বরাবর সর্বত্র গঙ্গায় নোংরা জল ফেলা বন্ধ না করলে এবং গঙ্গার কোন নদী-উপনদীতে নতুন করে বাঁধ দিয়ে গঙ্গার জলপ্রবাহ কমিয়ে দেওয়া বন্ধ না করলে, নদীতে মৃতদেহ ফেলা বন্ধ না করলে, শহরগুলিতে গঙ্গার দুইপারে কঠিন আবর্জনা জমানো বন্ধ না করলে, কলকারখানা ও শহরের পয়ঃপ্রনালীর শেষ-মুখ শোধনাগারে না গেলে এবং সারা দেশে বারো মাসে তের পার্বনের অজস্র(কয়েক কোটি) মুর্ত্তি নিমজ্জন বন্ধ না করলে, গঙ্গায় প্রাতঃকৃত্য বন্ধ না করলে কিছুতেই কোন এলাকায় গঙ্গাদূষণ কমানো যাবে না। ছোট ছোট এলাকাভিত্তিক চেষ্টা কোন সুফল দেয় নি, দেবে না। 

সুপ্রীম কোর্ট বলতে বাধ্য হয়েছেন, ২০০ বছরেও গঙ্গাশোধন হবে না। 

আমরা মঙ্গল গ্রহে যেতে সফল, কিন্তু গঙ্গাদূষণনিয়ন্ত্রণে? যা ৫০ কোটি ভারতীয়ের জীবনরেখা? গঙ্গাদূষণ নিয়ন্ত্রন আর কতদিন রাজনীতিক বা রাষ্ট্রনায়কদের মুখের বুলি হয়ে থাকবে? না।বৃথাই হিন্দুরা বলে গঙ্গা আমাদের মা! (তথ্যগুলি ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইট থেকে সংগৃহীত, লেখার সঙ্গেই তথ্য উৎস দেওয়া আছে) 

হিন্দু সংস্কৃতি ও গঙ্গাদূষণ

সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়

ভারতের নদীগুলিকে বাঁচাতে প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি নদী পরিবেশ রক্ষা পরিষদ গঠন করেছিলেন। কলকাতায় পরিষদের অফিস বন্ধ ২০০২ থেকে। তাই কোটি কোটি টাকা গঙ্গাতীরের সৌন্দর্যায়ন এর নামে খরচ হলেও নাব্যতা বাঁচাতে হালফিলে তেমন তৎপরতা চোখে পড়ে না। মাঝেমধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশে রাজ্য প্রশাসন কিছু কিছু বিধি নিষেধ আরোপ করে, কিন্তু সেগুলি আদৌ মানা হয় কী না সে বিষয়ে নজরদারি করা যায় না পরিকাঠামোর অভাবে। এভাবেই চলতে থাকলে গঙ্গার নাব্যতা ২২ ফুট থেকে কমে আগামী ১০ বছরের মধ্যে মাত্র ৫ ফুটে দাঁড়াবে বলে পরিবেশবিদদের আশঙ্কা। সেক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে যাবে ফেরি ও জাহাজ পরিষেবাও।

গঙ্গায় মূর্তি বিসর্জন দেয়ায় নদীখাত ভরাট হয়ে নদীর গভীরতা ও ধারণক্ষমতা কমছে আর জলে দূষণমাত্রা বাড়ছে। ধর্মীয় এ বিষয়টি নিয়ে জোরেশোরে কেউ কথা না বললেও মূর্তি বিসর্জনের বিকল্প পথের সন্ধানে মাঠে নেমেছে অনেকেই। গঙ্গা- দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম প্রধান নদী। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ২,৫২৫ কি.মি. প্রবাহ পথে ভারতেই প্রায় ৪০ শতাংশ জনসংখ্যার জীবন-রেখা হচ্ছে গঙ্গা নদী। ভারতীয় পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করে বলছে, মূর্তির গায়ে সিসাযুক্ত রং এবং ক্যাডমিয়ম ও অন্যান্য জৈব যৌগ গঙ্গার পানিকে সারাবছর দূষিত করছে। সেই সঙ্গে মূর্তির মাটি, বাঁশ, ফুল, বেলপাতা, মালা বা শোলার যাবতীয় অলঙ্কার ভরাট করে তুলছে গঙ্গার তলদেশ। বিসর্জনের পর মূর্তির গায়ে থাকা সিসা ও ক্যাডমিয়াম গঙ্গাতে মিশে মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢোকে। স্নানে ও পানে সিসা নিয়মিত শরীরে ঢুকলে মানুষের বুদ্ধি কমে, স্মৃতি হ্রাস পায়, রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি হয়, কোষ্ঠকাঠিন্যও দেখা দেয়। কলকাতার মানুষের শরীরে নানাভাবেই নিয়মিত সিসা ঢুকছে। ক্যাডমিয়াম এর কারণে দুরারোগ্য ব্যাধি হয় বৃক্কে যকৃতে ও অস্থিমজ্জায়। মূর্তি বিসর্জন, আবর্জনা, নোংরা ও বর্জ্য নিক্ষেপের কারণে গঙ্গা হারিয়েছে তার স্বচ্ছতাও। 

হিন্দুঘরে প্রতিদিন দেবতার পুজো হয়। কেউ বলেন গৃহদেবতা, কেউ শিবলিঙ্গ, শালগ্রাম শিলা, কেউ বা সত্যনারায়ন, সন্তোষী মা, গণপতি বাপ্পা, কত বাড়ীতে কত নিত্যপূজা। পূজার উপচার ফুল, বেলপাতা, তুলসীপাতা, ধূপকাঠি, টিকে। একদিনের পূজাশেষে পরের দিন এগুলো বর্জ্য পদার্থ। প্রতিদিন আসবে টাটকা ফুল,পাতা, পরদিন তা আবার বাসী হবে। যেখানে সেখানে ফেলা চলবে না, পাপ হবে, ফেলতে হবে জলে, খুব ভাল হয় যদি ফেলা হয় মা এর গর্ভে (মা গঙ্গা-হায় রে তোমার কোটি কোটি সন্তান)।সেই সুবাদে কাগজের ঠোঙার কাগজ, প্লাস্টিকের ঠোঙার প্লাস্টিক, ধূপকাঠির পোড়াশেষে ধূপ না থাকা কাঠিটুকু, টিকের ছাই - নদীখাতের জলধারণক্ষমতা কমাতে, দুষক পদার্থের গাঢ়ত্ব বাড়াতে যাদের জুড়ি নাই। 

 কলুষিত হতে হতে গঙ্গার জল এখন এমন অবস্থায় চলে এসেছে যে, তার মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন এক প্রজাতির জিন। যা কিনা বিভিন্ন জলজ ব্যাক্টেরিয়ার জীবনচক্রে মিশে গিয়ে সেগুলোকে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী করে তুলছে বলে দাবি করলেন এক দল গবেষক। ব্রিটেনের নিউ ক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয় এবং দিল্লি আইআইটি-র বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান পত্রিকা ‘জার্নাল অফ এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি’তে। গবেষকদের দাবি: গঙ্গার উজানে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জলের নমুনা সংগ্রহ করে তাঁরা জিনটি খুঁজে পেয়েছেন। পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যে সব ব্যাক্টেরিয়ার জীবনচক্রে সেটি প্রবেশ করে, অ্যান্টিবায়োটিক তাদের কোনও ক্ষতি করতে পারে না। এখানেই শেষ নয়। অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাক্টেরিয়াগুলো এক বার মানুষের শরীরে ঢুকলে স্থায়ী ভাবে সেখানেই ঘাঁটি গাড়ে। অন্ত্রে বাসা বেঁধে বংশবিস্তার করে। এবং মলবাহিত হয়ে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশে, সেখান থেকে আরও মানুষের দেহে। তারা জিন সঞ্চারিত করে অন্য অপ্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াকেও অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী করে তোলে। যে প্রক্রিয়া জারি থাকলে গুরুতর স্বাস্থ্য-সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কলকাতার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কলেরা অ্যান্ড এন্টেরিক ডিজিজ (নাইসেড)- এর গবেষকদের অনেকে। 

জার্নাল অফ এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি’তে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটির অন্যতম লেখক নিউ ক্যাসলের ডেভিড গ্রাহাম জানাচ্ছেন, গত বছর মে-জুনে তাঁরা হৃষিকেশ-হরিদ্বারে গঙ্গার জলের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। নমুনাগুলি পরীক্ষা করা হয় দিল্লি আইআইটি-র ল্যাবে। প্রতিটি নমুনাতেই হদিস মিলেছে বিশেষ জিনটির, গবেষকেরা যার নাম দিয়েছেন BLANDM-1। এর অস্তিত্ব প্রথম মালুম হয়েছিল ২০০৮-এ, দিল্লির যমুনাজলে। তার পরেই দিল্লি আইআইটি সবিস্তার গবেষণায় নামে। উদ্যোগের অংশীদার হয় নিউ ক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়।

ওদের যৌথ গবেষণার রিপোর্ট বলছে, মে-জুনে হৃষিকেশ-হরিদ্বারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে গঙ্গার জলে বিএলএএনডিএম-১ জিনেরও পোয়াবারো হয়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় মে-জুনে তাদের সংখ্যা বাড়ে প্রায় ৬০ গুণ। বিজ্ঞানীদের অভিমত, জলে বর্জ্য মেশার ফলেই জিনটির জন্ম। কলিফর্ম-সহ গঙ্গার জলে বসবাসকারী যাবতীয় ব্যাক্টেরিয়ার মধ্যেই তাঁরা এটির উপস্থিতি ধরতে পেরেছেন। যে কারণে গঙ্গাপাড়ের বাসিন্দাদের সতর্ক করেছেন।

গবেষকেরা জানান, কুম্ভ ইত্যাদি নানা তীর্থযাত্রাও গঙ্গার জলে বিএলএএনডিএম-১ জিনের পরিমাণ বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। “আমরা দেখেছি, বিভিন্ন তীর্থের সময়ে গঙ্গায় ওই জিনের উপস্থিতি অন্তত ২০ গুণ বাড়ে। কুম্ভমেলা দশেরা ছটৃ বা অন্য পরবের সময় লক্ষ তীর্থযাত্রীর মলমূত্র গঙ্গায় মেশে, তেমন সিঁদুর, তুলসীপাতা, ফুল-বেলপাতার মতো বর্জ্য জলে মেশে। আমাদের অনুমান, এ হেন পরিস্থিতিতে জিনটির বংশবৃদ্ধি দ্রুত হয়।” লিখেছেন গ্রাহাম। নাইসেডের বিজ্ঞানী প্রভাসচন্দ্র সাধুখাঁর কথায়, “এটা এক ধরনের অভিযোজন। অনুকূল পরিবেশে বাঁচার তাগিদে নতুন জিনের জন্ম।” 

এবং হরিদ্বার বা হৃষিকেশের গঙ্গায় যখন এর সন্ধান মিলেছে, তখন কলকাতার গঙ্গাতেও তা পাওয়া যাওয়া আশ্চর্যের কিছু নয় বলে প্রভাসবাবুর আশঙ্কা। এই কথা মাথায় রেখে তাঁর সুপারিশ: গঙ্গার জলে বর্জ্য ফেলা অবিলম্বে বন্ধ করা জরুরি। নচেৎ জনস্বাস্থ্যে গুরুতর সঙ্কট দেখা দেবে। এ সম্পর্কে গঙ্গাপাড়ের অধিবাসীদের সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শও দেন তিনি। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ-বিজ্ঞানী শরদিন্দু চক্রবর্তীর আক্ষেপ, “গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানে বর্জ্য ফেলা বন্ধের প্রস্তাব ছিল। তার পিছনে তিন দফায় বেশ কয়েকশো কোটি টাকা খরচও করেছে কেন্দ্র। তবু গঙ্গার জল দূষিত হচ্ছেই।” 

মানুষকে সচেতন করা না-গেলে গঙ্গার দূষণ-সমস্যা যে মেটার নয়, গবেষণাপত্রটি তা আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বলে মনে করছেন ওই পরিবেশ-বিজ্ঞানী। 

কানপুরের সবচেয়ে বড় চামড়া কারখানা সুপার ট্যানারি লিমিটেডের পরিচালক ইমরান সিদ্দিকী বলেন, নদীদূষণের জন্য শুধু টেনারি কারখানাকে দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু এ খাতটি যে লাভজনক, তা কেউ দেখছে না। তিনি বলেন, এখানে একটি সত্য আছে, তা হলো নদীদূষণের মোট বর্জ্যের মাত্র ২ শতাংশে জন্য দায়ী ট্যানারিগুলো।কিন্তু রসায়নবিদ অজয় কানুজিয়া বলেন, ট্যানারিগুলোতে প্রতিদিন কী পরিমাণ বিষাক্ত তরল সৃষ্টি হয় এটা কেউ জানে না। তবে সবার ধারণা, প্রতিদিন ৯০ লাখ লিটার। কানপুরের ৪০০র অধিক ট্যানারী থেকে মেশা ক্রোমিয়াম বিষ এর গাঢ়ত্ব বিপদসীমার ৭০ গুন। সকল নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক একমত যে রাসায়নিক বা শিল্পদূষণের অর্ধেকের বেশি আসে চামড়া কারখানা থেকে।গঙ্গায় মেশা বর্জ্য তরলের ১২ শতাংশ বিবিধ শিল্পের উপজাত(industrial effluents), যেমন কাগজশিল্প চর্ম শিল্প বস্ত্রশিল্প কসাইখানা খাদ্যপ্রক্রিয়াকরন পাতনশিল্প ইত্যাদি।

(শেষাংশ আগামী সপ্তাহে)

হিন্দু সংস্কৃতি ও গঙ্গাদূষণ

সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়

গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত একটি আন্তর্জাতিক নদী। এই নদী ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় নদীও বটে। গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২,৫২৫ কিমি ; উৎসস্থল পশ্চিম হিমালয়ে ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে। জলপ্রবাহের ক্ষমতা অনুযায়ী গঙ্গা বিশ্বের প্রথম ২০টি নদীর একটি। গাঙ্গেয় অববাহিকার জনসংখ্যা ৪০ কোটি এবং জনঘনত্ব ৩৯০ /কিমি২। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নদী অববাহিকা। 

মূল গঙ্গা নদীর উৎসস্থল ভাগীরথী ও অলকানন্দা নদীর সঙ্গমস্থল। হিন্দু সংস্কৃতিতে ভাগীরথীকেই গঙ্গার মূল প্রবাহ বলে মনে করা হয়। যদিও অলকানন্দা নদীটি দীর্ঘতর। অলকানন্দার উৎসস্থল নন্দাদেবী, ত্রিশূল ও কামেট শৃঙ্গের বরফগলা জল। ভাগীরথীর উৎস গোমুখের গঙ্গোত্রী হিমবাহ (উচ্চতা ৩,৮৯২ মি)।

গঙ্গার জলের উৎস অনেকগুলি ছোট নদী। এর মধ্যে ছটি দীর্ঘতম ধারা এবং গঙ্গার সঙ্গে তাদের সঙ্গমস্থলগুলিকে হিন্দুরা পবিত্র মনে করে। এই ছটি ধারা হল অলকানন্দা, ধৌলীগঙ্গা, নন্দাকিনী, পিণ্ডার, মন্দাকিনী ও ভাগীরথী। পঞ্চপ্রয়াগ নামে পরিচিত পাঁচটি সঙ্গমস্থলই অলকানন্দার উপর অবস্থিত। এগুলি হল বিষ্ণুপ্রয়াগ (যেখানে ধৌলীগঙ্গা অলকানন্দার সঙ্গে মিশেছে), নন্দপ্রয়াগ (যেখানে নন্দাকিনী মিশেছে), কর্ণপ্রয়াগ (যেখানে পিণ্ডার মিশেছে), রুদ্রপ্রয়াগ (যেখানে মন্দাকিনী মিশেছে) এবং সবশেষে দেবপ্রয়াগ যেখানে ভাগীরথী ও অলকানন্দার মিলনের ফলে মূল গঙ্গা নদীর জন্ম হয়েছে।

এরপর গঙ্গা কনৌজ, ফারুকাবাদ ও কানপুর শহরের ধার দিয়ে একটি অর্ধ-বৃত্তাকার পথে ৮০০ কিলোমিটার পার হয়েছে। এই পথেই রামগঙ্গা (বার্ষিক জলপ্রবাহ ৫০০ কিউমেক) গঙ্গায় মিশেছে। এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমে যমুনা নদী গঙ্গায় মিশেছে।সঙ্গমস্থলে যমুনার আকার গঙ্গার চেয়েও বড়।যমুনা গঙ্গায় ২৯৫০ কিউমেক জল দেয় যা উভয় নদীর যুগ্মপ্রবাহের জলধারার মোট ৫৮.৫%।

এখান থেকে গঙ্গা পূর্ববাহিনী নদী। যমুনার পর গঙ্গায় মিশেছে কাইমুর পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদী তমসা (বার্ষিক জলপ্রবাহ ১৯০ কিউমেক)। তারপর মিশেছে দক্ষিণ হিমালয়ে উৎপন্ন নদী গোমতী (বার্ষিক জলপ্রবাহ ২৩৪ মি৩/সে)। তারপর গঙ্গায় মিশেছে গঙ্গার বৃহত্তম উপনদী ঘর্ঘরা (বার্ষিক জলপ্রবাহ ২,৯৯০ মি৩/সে)। ঘর্ঘরার পর দক্ষিণ থেকে গঙ্গার সঙ্গে মিশেছে শোন (বার্ষিক জলপ্রবাহ ১,০০০ মি৩/সে), উত্তর থেকে মিশেছে গণ্ডকী (বার্ষিক জলপ্রবাহ ১,৬৫৪ মি৩/সে) ও কোশী (বার্ষিক জলপ্রবাহ ২,১৬৬ মি৩/সে)। কোশী ঘর্ঘরা ও যমুনার পর গঙ্গার তৃতীয় বৃহত্তম উপনদী। 

পশ্চিমবঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলার গিরিয়ার নিকটে গঙ্গা দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে পদ্মা ও ভাগীরথী। পদ্মা প্রশস্ততর শাখা। এটি দক্ষিনপূর্বগামী হয়ে বাংলাদেশে যমুনা নদীতে পড়ে। বাংলাদেশে যমুনা নদীর (ব্রহ্মপুত্রের বৃহত্তম শাখানদী) সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার মূল শাখাটি পদ্মা নামে পরিচিত। আরও দক্ষিণে গিয়ে যমুনা ব্রহ্মপুত্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম শাখানদী মেঘনার সঙ্গে মিশে মেঘনা নাম ধারণ করে শেষপর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। গঙ্গার শীর্ণতর শাখা ভাগীরথী দক্ষিনগামী এবং যথাক্রমে ভাগীরথী ও হুগলী নামধারণ করে শেষে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদীর বদ্বীপ বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ।এর আয়তন প্রায় ৫৯,০০০ কিমি২ (২৩,০০০ মা২)। বঙ্গোপসাগরের তীর-অনুযায়ী এই বদ্বীপের দৈর্ঘ্য ৩২২ কিমি(২০০ মা)। গঙ্গা-মেঘনা নদীর মিলিত জলপ্রবাহের চেয়ে একমাত্র আমাজন ও কঙ্গো নদীর জলপ্রবাহের পরিমাণ বেশি। পূর্ণ প্লাবনের ক্ষেত্রে একমাত্র আমাজনই গঙ্গার চেয়ে মধ্যে বৃহত্তর। 

হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২৫০ কিলোমিটার (১৬০ মা)। হৃষিকেশের কাছে গঙ্গা হিমালয় ত্যাগ করে তীর্থশহর হরিদ্বারে গাঙ্গেয় সমভূমিতে পড়েছে।গঙ্গার মূলধারাটি হরিদ্বারের আগে সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হলেও হরিদ্বার পেরিয়ে তা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাঁক নিয়েছে। হরিদ্বারে একটি বাঁধ গড়ে গঙ্গা খালের মাধ্যমে উত্তরপ্রদেশের দোয়াব অঞ্চলে সেচের জল পাঠানো হয়। এখানেই সর্বনাশের শুরু। ১৮৫৪তে গঙ্গায় প্রথম বাঁধ পড়ল হরিদ্বারে। কমল মূল গঙ্গায় মোট জলপ্রবাহ। 

 

গঙ্গাতীরেই ভারতের ৪০ শতাংশ শোক বাস করে।গড়ে উঠেছে রাজধানী পর্যটননগরী শিল্পনগরী তী্থনগরী।এছাড়াও বিবিধ পালাপার্বনে সমগ্র দেশ থেকে কোটি মানুষের আগমন হয়। বর্তমানে গঙ্গা অববাহিকার ৫০টি শহর থেকে গঙ্গায় আগত শুধু নাগরিক বর্জ্য তরলের পরিমান প্রায় ৩০০ কোটি লিটার প্রতিদিন (domestic sewage)।প্রতি দশ বছরে এই পরিমাণ ডবল হয়ে যায়। গঙ্গা নদী দূষণমুক্ত রাখার জন্য ভারত সরকার এ পর্যন্ত ১৬ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। নদীদূষণের ৮৫ শতাংশ আসে নাগরিক বর্জ্য থেকে।। কানপুরের অলাভজনক সংস্থা 'সংকট মোচন ফাউন্ডেশন'-এর নির্বাহী পরিচালক ডি কে সান্দ এর ভাষায়, হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত নদীতীরবর্তী দেশগুলোর পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা খুবই খারাপ। গৃহস্থালী ও কারখানার বর্জ্য নদীর তলদেশে জমে এর নাব্যতা হারাচ্ছে, দিন দিন ছোট হয়ে আসছে নদ-নদী। গঙ্গার তীরেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি মন্দির। এর ফলে লোকসমাগম বেশি ঘটে এবং দূষণ বাড়ে। ড্রেন দিয়ে ময়লা তরল. মল, সাবানের ফেনা ও অন্যান্য আবর্জনা এসে পড়ছে নদীতে। কিন্তু এগুলো রোধে কারো কোনো উদ্যোগ নেই। 

ফিকাল কলিফর্ম (fecal coliform) হল স্তন্যপায়ী প্রাণীর পেট থেকে মলমূ্ত্রের মাধ্যমে বা মৃতদেহ পচে জলে মাটিতে মেশা বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া। এগুলো নানা রোগ সৃষ্টি করে। এছাড়াও মলমূত্রের মাধ্যমে আসে রোগসৃষ্টিকারী প্রোটোজোয়া, কৃমির ডিম। যেখানে গবাদি পশু মলত্যাগ করে, তীর্থস্নান, বা পুন্যলগ্নের স্নানের সময় যেখানে স্নানার্থীর স্থায়ী-অস্থায়ী শৌচাগার আছে, যেখানে পয়ঃপ্রনালীর মাধ্যমে নগরের লক্ষ বাড়ীর শৌচালয়ের জল, সেপটিক ট্যাঙ্কের জল এসে মেশে সেখানে জল গঙ্গার জল হলেও পবিত্র নয়। জলে রোগজনক জীবানুর গাঢ়ত্বের একক mpn/dl। ১dl=১০০ml mpn=most probable number। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রক পর্ষদ ও রাষ্ট্রীয় নদী সংরক্ষণ আধিকারিক এর দ্বারা মনোনীত স্নানযোগ্য নদীর বাঞ্ছনীয় কলিফর্ম ৫০০mpn/dL বা কম, এবং ২৫০০র বেশি হলে কখনই মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু সবাই মেনে নিচ্ছে অন্ধ বিশ্বাসে আপ্লুত হয়ে।গঙ্গা হিন্দুদের কাছে পবিত্র নদী। তাঁরা এই নদীকে দেবীজ্ঞানে পূজা করেন। গঙ্গায় মৃত্যু হলেও হিন্দুরা সদগতি হয়েছে বলে সান্তনা পায়।তাই তারা মানুষ ও গৃহপালিত প্রিয় পশুর মৃতদেহ গঙ্গায় ভাসিয়ে দেয়। 

জলে মল বা জৈবপদার্থ(প্রসাদী ফলমূল, মিষ্টান্ন, ফুল-বেলপাতা, তিল-তুলসী, মলমূত্র-ঘাম-রক্ত, মৃতদেহ)পচে জৈবপদার্থ-ক্ষয়কারী জীবানুর দ্বারা, যাদের বলা হয় বিয়োজক (decomposer & converter microbes)।জীবানুর দ্বারা জৈব পদার্থের পচনে জলে দ্রবিভূত অক্সিজেন ব্যয় হয়ে গেলে জলজ উদ্ভিদ ও প্রানী অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়। জলে যত বেশি জৈবপদার্থ মেশে, বিয়োজক ও পরিবর্তক এর অক্সিজেন চাহিদা তত বেশি। এই biochemical oxygen demand(BOD)জলদূষনের একটি পরিমাপ। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রক পর্ষদ মতে পানীয় জলে কলিফর্ম মাত্রা সর্বোচ্চ ৫০mpn/dl, BOD সর্বোচ্চ ২mg/L। জলের পবিত্রতা কতটা তার পরিমাপ জলে দ্রবিভূত অক্সিজেন এর মাত্রা(DO)। স্নানযোগ্য ও পানযোগ্য জলে দ্রবিভূত অক্সিজেন এর বাঞ্ছনীয় নূ্ন্যতম গাঢ়ত্ব ৬mg/L। জলে পচনশীল জৈব পদার্থ, ধাতব রাসায়নিক, কারখানার উষ্ণ বর্জ্য জলীয় তরল মিশলে DO কমে। জলের শীতলতা বাড়লে, স্রোতের বেগ বাড়লে, মোট জলপ্রবাহ বাড়লে DO বাড়ে। এখানে গঙ্গার জলের পূর্বতন পবিত্রতা, বর্তমান অপবিত্রতার কারণ নিহিত।

গঙ্গার দূষণ বিপদমাত্রা ছুঁয়েছে অনেক আগেই। ফি বছর দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের পর তা আরও ভয়াবহ আকার নেয়। ক্রমেই কমছে নদীর নাব্যতা। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গীন, যে অবিলম্বে কোনও ব্যবস্থা না নিলে, আগামী ১০ বছরের মধ্যে ফেরি ও জাহাজ পরিষেবা বন্ধ হতে পারে । এমনই আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। মা দুর্গার চার ছেলে মেয়ে এবং অসুর ও সিংহকে ধরলে প্রতিটি পুজো পিছু বিসর্জন দেওয়া হয় সাতটি করে প্রতিমা।কলকাতা শহরে বারোয়ারি ও বাড়ির পুজো মিলিয়ে মোট সংখ্যা ১৭০০। এর ওপর রয়েছে ছোটবড় সাড়ে ৫ হাজার লক্ষ্মীপ্রতিমা। আড়াই হাজার কালী প্রতিমা, হাজার খানেক জগদ্বাত্রী প্রতিমা ও ছটপুজোর জন্য জলে ফেলা হাজার মেট্রিকটন কলা, ফুল ও বেলপাতা। সবমিলিয়ে ৩০ দিনের ব্যবধানে চার চারটি বড় উৎসব গভীর সংকটে ফেলছে গঙ্গাকে। 

বাকি অংশ পরের সপ্তাহে

বাংলা সিনেমার বিবর্তন প্রোডাকশন ম্যানেজার থেকে লাইন প্রোডিউসার

অলভ্য ঘোষ

নাবালক ! কথাটার মধ্যে বয়স এবং অভিজ্ঞতার খামতি আছে। কিন্তু এই নাবালকয়ই যখন সাবালকদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় তখন আমরা কী বলি ? বয়সে নবীন কিন্তু অভিজ্ঞতায় প্রবীণ।

প্রাচীন চিত্র শিল্পের বয়স কত ? প্রায় ৩২,০০০ বছর। ফ্রান্সের Grotte Chauvet এ অবস্থিত। ভাস্কর্য শিল্পের বয়স ? জার্মানির Hohlenstein Stadel এলাকার ৩০ সেমি লম্বা Lowenmensch প্রায় ৩০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের। প্রাগৈতিহাসিক সঙ্গীতের খোঁজ পাওয়া যায় পুরাতন প্রস্তরযুগের পুরাতত্ত্ব ঘাঁটলে। ৪০,০০০ বছর পুরাতন জাপানিদের Shakuhachi বাঁশির মতো ; হাড় দিয়ে তৈরি এক মুখ বন্ধ ; গায়ে একাধিক ছিদ্র বিশিষ্ট Divje Babe Flute পুরাতন প্রস্তরযুগের গুহা থেকে পাওয়া প্রাগৈতিহাসিক সঙ্গীতের সাক্ষী বহন করে। সাহিত্যের প্রাচীনতার ব্যাপারটাও সকলেই জানেন। প্রাচীন মিশরীয় সাহিত্য;সুমেরীয় সাহিত্যের পাশাপাশি বিশ্বের প্রাচীনতম সাহিত্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এত কথা বলছি কেন বলুন-তো ? বলছি এই কারণেই চিত্র,ভাস্কর্য,সঙ্গীত,সাহিত্য,নৃত্য-নাটক সকল শিল্পের সমন্বয়ে গঠিত সবার থেকে নবীন আধুনিকতম বৃহৎ এবং শক্তিশালী শিল্প মাধ্যম চলচ্চিত্রের নবীনতা এবং সমৃদ্ধতা চিহ্নিত করার জন্যে। মাত্র ১৮৯৫ সালে Lumiere Brothers এর হাতে জন্মানো নবীন এই শিল্প মাধ্যমটি জনপ্রিয়তায় অন্যান্য শিল্প মাধ্যমকে পিছনে ফেলে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।

সাহিত্য এবং কলাবিদ্যার সব আঙ্গিকেই কিছু না কিছু কাজ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। এমন কি নাচেও। কিন্তু তাঁর জীবন কালের সবচেয়ে শক্তিশালী শিল্প মাধ্যম চলচ্চিত্রে তেমন মন দেননি। নাটকের ধারা অনুক্রমে বিশ্বভারতীর জন্য টাকার প্রয়োজনে চিত্রনাট্য ছাড়া নিউ থিয়েটার্সের বীরেন্দনাথ সরকারের প্রস্তাবে " নটীর পূজা " চলচ্চিত্রের রূপ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩২ এর মার্চ এপ্রিল জুড়ে চিত্রা আর পূর্ণ থিয়েটারে দিন পনেরো বাণিজ্যিক ভাবে দেখানোর পর ছবি টি উটে যায়। লোকে নেয়নি। ১৯২৫ ও ১৯৩০ এর মুক্তি প্রাপ্ত আইজেনস্টাইনের " ব্যাটলশিপ পোটেমকিন " আর " জেনারেল লাইন " কিছুটা হলেও দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।ভালোমন্দ কোন মন্তব্য করেননি। ইউরোপে কিন্তু ১৯৩০ এর মধ্যেই শিল্পী-সাহিত্যিক,দার্শনিক সকলেই প্রযুক্তি নির্ভর এই নতুন শিল্প মাধ্যমটির অপার সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বময় আলোচনা করেছে। চলন্ত ছায়াছবি দেখানো এক বিশ্বজোড়া ব্যবসায় দাঁড়িয়ে গেছে খুব দ্রুত। ভারতে পার্সি ব্যবসায়ীরা ব্যবসাটা ধরে নিয়েছিল। ১৮৯০ সালে প্রথম কলকাতা শহরে বাইস-কোপ দেখান হয়। হিরা-লাল সেন রয়াল বায়স্কোপ কোম্পানির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্টার,মিনারভা ,ক্লাসিক থিয়েটারে নাটকের দৃশ্যাংশ প্রদর্শন করতে থাকেন। তারপর অনেক দিন বাদে ১৯১৮ সালে ডি.জি ; ধীরেন্দ্রনাথ গাঙগুলি ইন্দ্র ব্রিটিশ ফিল্ম    কোম্পানির প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও প্রথম বাঙলা ছবি "বিল্লমঙ্গল " তৈরি হয় ১৯১৯ সালে ম্যাডান থিয়েটারের ব্যানারে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া জুড়ে ফিল্ম    প্রদর্শন ব্যবসার এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল ম্যাডান কোম্পানি। কলকাতাতেও ফিল্ম    প্রযোজনায় ম্যাডানদের ভূমিকাই ছিল অগ্রণী। এদের তৈরি "জামাই ষষ্টি"ছিল প্রথম বাংলা টকি। ১৯৩২ সালে " American Cinematographer " নিবন্ধে Wilford E Deming একজন অ্যামেরিকান ইঞ্জিনিয়ার যিনি কিনা প্রথম ভারতীয় সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে যুক্ত ছিলেন। টালিগঞ্জ জেলার নব নির্মায়মান শিল্প অঞ্চল টিকে হলিউডের সাথে তুলনা করে কাব্য করে টলি উড বলে অবিহিত করেছিলেন। হলিউড যেমন ছিল অ্যামেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সিনেমা শিল্পের কেন্দ্র স্থল। তেমনি টালিগঞ্জ হয়ে উঠেছিল ভারতীয় সিনেমার মধ্যমণি। মহানগরীর বুকে গড়ে উটতে শুরু করেছিল নিউথিয়েটারস, ইন্দ্রপুরী, ভারত-লক্ষ্মী, রাধা, ক্যালকাটা মুভি-টন এর মতো Studio গুলো।

স্মৃতি মন্থন করলে দ্যাখা-যাবে ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পকে হাতধরে হাটতে শেখান থেকে কথা বোলতে সবটাই করেছেন কোননা কোন বাঙালী ব্যক্তিত্ব। বাংলা দেশে চলচ্চিত্র ব্যবসা শুরু হয়েছে ১৮৯৬-৯৭ সালে। হীরা-লাল সেন সর্বপ্রথম ১৯০১ থেকে ১৯০৩ সালে ক্লাসিক থিয়েটারে অভিনীত "আলি-বাবা","ভ্রমর","সীতারাম" প্রভৃতি নাটকের দৃশ্যাংশের প্রদর্শন করেন। এ ছবিকে অনেকেই ছবি বলে মনে করেন না। তবে এটুকু-তো মানতেই হবে;এ ভাবনাই পশ্চিম অঞ্চলে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম পুরোধা দাদাসাহেব ফালকে কে ১৯১৩ সালে "হরিশ্চন্দ্র"চলচ্চিত্র নির্মাণে এবং গ্রামে গঞ্জে প্রদর্শনে উৎবুদ্ধ করেছিল। ১৯১৩ থেকে ১৯৩২ সালে নির্বাক চলচ্চিত্র যুগে বিশ-তিরিশের সময়কার চলচ্চিত্রে কেউ ভাবতে পারেনি সামাজিক বাস্তবতা –আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে ভারতীয় জাতিসত্তার আত্তীকরণের কথা। শুধুই ছিল এক নিষ্ঠুর অখণ্ড বাজারের প্রচেষ্টা। ১৯২৪ সালে ধীরেন্দ্রনাথ গাঙগুলি হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়কে মুখ্যকরে নির্মাণ করেন "রাজিয়া বেগম"। কিন্তু তদানীন্তন হ্রায়দারাবাদ রাজ্যের শাসক নিজামের হুকুমে এ ছবি সে রাজ্যে দেখান যায়নি। সমকালীনতা -অর্থনৈতিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক আবর্তের প্রভাব সৃষ্টির এই ছিল সর্বপ্রথম এক বাঙালীর কিঞ্চিত প্রয়াস। ১৯২৯ সালে রবি ঠাকুরের কাহিনী অবলম্বনে বাংলা ছবি "বিচারক"সেন্সরের সেন নজরে পড়ে। তার পর অনেক ঝামেলার মধ্যে গড়মিলের-স্বাধীনতা এল ! কিন্তু আশার ঝিলিক অবসাদেই মিলিয়ে গেল। ১৯৫২ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার ক্যামেরা ম্যান বিমল রায় জমি থেকে কৃষকের বিচ্ছিন্নতার মর্মান্ত্তিক সত্যকে চলচ্চিত্রায়িত করে নির্মাণ করেছিলেন "দো বিঘা জমিন" কার্লোভিভেরি ও কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি পুরস্কৃত হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রবেশ করে সামাজিক বাস্তবতার এক ধারা আর এক বাঙ্গালীর হাতে। এ ছিল ঐতিহাসিক পৌরাণিক ছবি থেকে রুচির বদল ঘটিয়ে হৃদয় স্পর্শী সংবেদনশীল ছবি নির্মাণের ইতিবৃত্ত। কিন্তু তখনও ভারতীয় সিনেমা চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা পায়নি। ছায়াছবি যে স্বনির্ভর সার্বভৌম ভারতীয় চলচ্চিত্রে তা সর্ব প্রথম প্রমাণ হয় ১৯৫৫ সালে বাংলা চলচ্চিত্র "পথের পাঁচালী" মুক্তিতে। মেজাজে আঙ্গিকে বক্তব্যে দর্শনে সম্পূর্ণ নতুন ধারার প্রচলন করলেন সত্যজিৎ রায় যা কল্পনা করাও ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের কাছে কষ্টাতিত। ১৯৫১ সালে নিমাই ঘোষের "ছিন্নমূল"ও১৯৫৩সালে সলিল সেনের "নতুন ইহুদী"বাংলা ছবি তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের জগতে যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল তা "পথের পাঁচালীতে"এসে সুস্পষ্ট রুপপেল-ভারতীয় সিনেমায় এহল এক যুগান্তকারী ঘটনা।

Cinema is a directors media .চলচ্চিত্রের শৈলী মূলত পরিচালক নির্ভর;তাবলে অভিনেতা,অভিনেত্রী,সুরকার সম্পাদক,শিল্প নির্দেশক,করিয়গ্রাফার,লাইট-ম্যান ,ক্যামেরাম্যান ,মেকাপম্যান ,প্রডাকশন বয়। সর্বোপরি প্রডিউসার বা প্রযোজক ছাড়া ছবি নির্মাণ কী সম্ভব ? কখনোই না !এই দেখুন না প্রযোজক যদি না থাকে টাকা আসবে কোথা-থেকে। কম কিংবা বেশী টাকা ছাড়া সিনেমা নির্মাণ এই ডিজিটাল যুগেও সম্ভব নয়। পরিচালক যদি ছবির প্রাণ হন প্রযোজক সিনেমার রক্ত বাকিরা অস্থি মজ্জা অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। রক্ত ছাড়া যেমন প্রাণ সঞ্চার সম্ভব নয় ;বাজেট অনুসারে অর্থের যোগান ছাড়া চলচ্চিত্র নির্মাণও অসম্ভব। বিদেশী চলচ্চিত্রে কোন কোন পরিচালক প্রযোজকের ভূমিকার গুরুত্বটি বুঝে নিজেরাই নিজেদের ছবির প্রযোজনা করেছেন। যেমন  মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক এবং প্রযোজক স্টিভেন স্পিলবার্গ ;তিনি তিনবার একাডেমী পুরস্কার লাভ করেছেন এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি অর্থ উপার্জনকারী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। ভারতের হিন্দি ছবির প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক;যশ রাজ ফিল্ম    কোম্পানির যশ রাজ চোপড়ার কথা কে না জানেন।ঋত্বিক ঘটক কিংবা সত্যজিৎ রায় কেও নিজেদের ছবির প্রযোজনার দায়িত্ব নিতে দেখা গেছে। চন্ডুলাল শাহ কিংবা বীরেন্দনাথ সরকারের নাম প্রযোজক হিসাবে ভারতীয় ছবির আতুর ঘরের ইতিহাসে উচ্চারণ করাহয়। অনেকের ধারনা টাকা দিয়েই প্রযোজকের দায়িত্ব শেষ। তেমনটি নয়। pre production থেকে ছবির Holl release অবধি থাকে অনেক কাজ ;পেছনে থাকে অনেক মানুষের অবদান। ছবির শুরুতে পর্দায় যাদের নাম কেবল এক ঝলক খেলে যায় বাকি কথা অব্যক্ত থেকে যায় তেমনি দশরকম প্রযোজকের নাম আপনাদের শোনাচ্ছি। এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার বা নির্বাহী প্রযোজক ,সুপার ভাইজিং প্রডিউসার ,প্রডিউসার ,কো প্রডিউসার ,কো আর্ডিন্যাটিং প্রডিউসার বা সমন্বয়কারী প্রযোজক , অ্যাসোসিয়েট প্রডিউসার,লাইন প্রডিউসার,প্রোডাকশন ম্যানেজার ,এক্সিকিউটিভ ইন-চার্জ অফ প্রোডাকশন,সেগমেন্ট প্রডিউসার। এই হলো ১০ ধরনের প্রডিউসার। প্রথম ৬ টি পজিশনের প্রডিউসাররা বিশেষত ফিল্মের র প্রফিটের শেয়ার পেয়ে থাকেন। বাকিদের একটি নির্দিষ্ট স্যালারি নিয়েই খুশি থাকতে হয়। তবে সাধারণত একটি ফিল্মে    তিন ধরনের প্রডিউসার থাকেন। প্রডিউসার ,এক্সিকিউটিভ প্রডিউসার এবং প্রোডাকশন ম্যানেজার। সবচেয়ে ব্রাত্য যে জোন তিনি এই প্রডাকশন ম্যানেজার। কখনো পাদ প্রতিমের আলোয় আসেন না !ভোগেন অর্থনৈতিক অনটনে। পায়ে হাওয়াই চটি ,মুখে আধকাঁচা না কামানো দাঁড়ি,চেহারায় দীনতার ছাপ। আটপৌরে পোশাকে বগলে একটা টাকা ভর্তি ছোট ব্যাগ-নিয়ে কিছুদিন আগেও টালিগঞ্জ পাড়ার এদিক ওদিক ছুটে বেড়াতেন প্রোডাকশন ম্যানেজাররা।  শুটিঙটা যাতে যথাযথও ভাবে চলতে পারে তার কোন ব্যাবস্হারয়ি ত্রুটি রাখেননি তারা। অথচ আজ পর্যন্ত প্রোডাকশন ম্যানেজাররা কুশীলবের মর্যাদা পায়নি। ভারতবর্ষের বুকে কত ফিল্ম   উৎসব বা ফিল্ম    সমারোহের আয়োজন করাহয় ; পুরস্কৃত করা-হয়না তাদের। তাদের জন্য নেই তেমন ভাবে কোন সংগঠন কিংবা সরকারি আনুকূল্যতা।

বাংলা ছবির শুরুর থেকে আজ পর্যন্ত প্রোডাকশন ম্যানেজাররা প্রত্যেকটি প্রডাকশন ইউনিট কে তাদের নিজেদের পরিবারের মতো দেখত। প্রত্যেকটি ছবি কে সন্তানের মতো স্নেহকরে তাদের গড়ে ওঠার পেছনে যত্ন আরতির কোন ত্রুটি রাখতেন না। বাজেট অনুযায়ী ইক্যুপমেন্ট ভারা করা বা কেনা ; ক্রু মেম্বার হায়ার করা সহ সকল ধরনের টাকা পয়সার অডিট ফ্লো ঠিক করে রাখতে তাদের হতে হয়েছে বিরাট কিপটে। পান থেকে চুন খোসালেই প্রডিউসার কে জবাব দীহি করতে হয়েছে প্রডাকশন ম্যানেজার কে। এদিকে বাজেটের বাইরেও খরচা চলে আসে রাহুর মতো। বাজেট ফেইল করলে আর রক্ষে থাকেনা প্রডাকশন ম্যানেজারদের।

প্রডাকশন ম্যানেজার রা এযাবৎ কাল পর্যন্ত টালিগঞ্জে প্রডাকশনের আর্থিক আনুকূল্যতার দিকেই শুধু লক্ষ্য রাখেননি কার্য সমাধা করতে প্রত্যেকের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা আদায় করেছেন। প্রাক উৎপাদন থেকে উৎপাদন সমাপ্তি ও সরবরাহ পর্যন্ত প্রডাকশন ম্যানেজার রা সমস্তরকম দায়িত্ব বহন করেছেন। উৎপাদন বাজেট ও শুটিঙয়ের আবশ্যকীয় চাহিদা গুলোর সম্পৃক্তই করন ঘটিয়েছেন। শুধু ক্র সদস্যদের ক্ষতিপূরণ,মীমাংসা ও আপসেই নয় প্রাত্যহিক উৎপাদন জনিত সমস্তরকম সমস্যার এমন কি প্রশাসনিক সমস্যারও সমাধান করে এসেছেন এতদিন ধরে প্রডাকশন ম্যানেজার। শুধু শিডিউলিং নয় ;উৎপাদনের দাবীকৃত লোকেশন ও সমস্ত রকম দুষ্প্রাপ্য সরঞ্জাম সরবরাহের ব্যাপারে তাদের জুড়ি মেলা ভার। বাংলা সিনেমায় এতদিন পর্যন্ত প্রডাকশন ম্যানেজারয়ই ছিল অপরিহার্য।

চলচ্চিত্রের নীতি নির্দেশের বিষয়টি পাউন্ড ডলার লিরার ঘেরা টোপে গচ্ছিত। পৃথিবীতে চলচ্চিত্রের প্রসার ও প্রচারে চালকের আসনে মহাজন ব্যবসায়ী জমিদার মধ্যবিত্ত যাদের শ্রেণী বৈশিষ্ট্যই হল সংঘর্ষের পথকে বর্জন। সে জন্য চলচ্চিত্রের বৃহৎ অংশই সমগ্র পৃথিবীতে কালান্তরের ঘটনাকে এড়িয়ে গিয়েছে। ১৮৯৫ সালে চলচ্চিত্রের জন্ম থেকে এই মুহূর্ত পর্যন্ত ইউরোপের চলচ্চিত্রের কর্ণধারেরা সযত্নে এড়িয়ে গেছেন অন্তত তিনটি কালজয়ী ঘটনা। প্রথমটি হল ১৮৭১সালের প্যারী কমিউনের অভ্যুত্থান ও ব্যর্থতা। দ্বিতীয়টি হল ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে আট ঘণ্টার লড়াই এবং তৃতীয়ত জার্মানিতে নাৎসিবাদের উত্থানের পশ্চাতে ব্রিটেন,ফ্রান্স ও মার্কিন ষড়যন্ত্রীদের ভূমিকা।

আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বেয়াল্লিশের ভারত ছাড়ো আন্দোলন , তেতাল্লিশের মন্বন্তর ,ছেচল্লিশের দাঙ্গা ও সাতচল্লিশের দেশভাগ এ দেশের চলচ্চিত্রে তেমন ভাবে ছাপ ফেলেনি। চলচ্চিত্র কে শ্রেণি নিরপেক্ষ বিনোদনী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে গনচেতনায় বিভ্রান্তি তৈরি করা সম্ভব -আপাত সুখের নৈরাজ্যের অতলান্তে নিয়ে যাওয়া যায় সহজে। তাই সমাজ পরিবর্তন নয় মনোরঞ্জনের সুবাদে মুনাফা একেই চিরকালের দৃঢ় অবলম্বন করে আসছে হিন্দি চলচ্চিত্র।সাতের দশকেই বাংলায় ৩৫০ টি সিনেমা হলের মধ্যে ৬০-৬৮টিতে মাত্র বাংলা ছবি প্রদর্শিত হত। বাকি ২৮০ থেকে ২৯০ টি হল ছিল হিন্দি ছবির দখলে। ১৯৫৭ সালে ৫৪ টি বাংলা ছবি তৈরি হয়েছে। ১৯৭০ সালে সেটা দাঁড়ায় ২৫ টিতে। গান,রোমান্স,দারিদ্র্য বিলাসের বাংলা ছবি হিন্দি ছবির সাথে পাল্লা-দিতে রোজ বদলাচ্ছে। শুধু মুম্বাই থেকে নয় বিষয় ও আঙ্গিক ধার করছে দক্ষিণ থেকেও,অবহেলিত বাংলার সাহিত্য নির্ভরতা। রাজনৈতিক ফ্লেইভ্যার সম্বলিত অরাজনৈতিক ছবি নির্মাণ চলছে জোর কদমে। চলছে জনসাধারণের মানসিক বিপর্যয়কে হাল্কা মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ঢঙে আর নতুন জট-পাকিয়ে দেওয়া। এই দৌড়ে বাংলা ছবিতে ঢুকেপড়েছে কর্পোরেট দুনিয়া। বাংলা ছবির বাজার বেড়ে গেছে পাঁচ ছয় গুন। উৎপাদন বেড়েছে কুড়ি শতাংশ। অ্যামেরিকা,Iceland,Newcastle,ব্যাংকক পৃথিবীর সেরা দর্শনিয় স্থান গুলো এখন বাংলা ছবির লোকেশন। যেখানে আগে ৪০ থেকে ৫০ টি ছবি  বাজারে নির্মিত হত এখন হয় ১০০ টারো বেশি। প্রথম দিনের মুক্তিতেই জিৎ অভিনীত বাংলা ছবি"বস"ঘরে তুলেনিতে সক্ষম হয়েছে ৭৫ লাখ টাকার ও বেশি। উৎপাদনের মান উন্নয়নে ও Packaging এবং Marketing এর দিকে লক্ষ রেখে বাংলার পরিচালকেরা এখন কর্পোরেট হাউস গুলোর দরজায় দাঁড়িয়ে। হলিউড ও বলিউডও কোলকাতায় আসছে শুটিং করতে।  ফলে বাংলা ছবির হেঁসেল টাও যাচ্ছে পাল্টে প্রতি নিয়ত। মান্ধাতার আমলের প্রডাকশন ম্যানেজারের বদলে ইংরেজি বুলি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাবহারে সক্ষম কনভেন্ট স্কুলে পড়া ছেলে পুলে ঢুকে পড়ছে লাইন প্রডিউসার হয়ে।

লাইন কথার অর্থ পঙক্তি রেখা বা সারি। তার মানে লাইন প্রযোজকের বাংলা করা হলে তাকে সারি প্রযোজক বলাচলে। সারি প্রযোজক বা লাইন প্রডিউসারের উৎপত্তি হলিউডে। লাইন প্রডিউসার হয় এমন একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক যিনি কিনা ফিচার ফিল্ম    ,টেলিভিশন ফিল্ম    অথবা টি.ভি অনুষ্ঠানের পর্বের প্রাত্যহিক কাজকর্মের কার্যনির্বাহী বিশেষ প্রতিনিধি। একজন সারি প্রযজোক একবারে একটির বেশি ছবিতে কাজ করতে পারেন না। তারা দায়বদ্ধ থাকেন চলচ্চিত্র নির্মাণ চলাকালীন মানব সম্পদের যোগানে এবং সকল প্রকার সমস্যার সমাধানে ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে।

অ্যামেরিকান প্রডিউসার গ্রিল্ড(PGA)য়ের নিয়ম অনুসারে লাইন প্রডিউসার একমাত্র ব্যক্তি যিনি একজন প্রযোজক বা একাধিক প্রযোজকের সাথে নির্মায়মান চলচ্চিত্রটির পুংখানুপুক্ষ বিবরণের তালিকা সহযোগে সরাসরি যোগাযোগ রেখে থাকেন। সব বিভাগের  নেতৃবৃন্দ লাইন প্রযোজকের কাছে উৎপাদন কার্যের বিবরণ প্রতিবেদন বা রিপোর্ট পেশ করেন। এর থেকেই লাইন প্রডিউসার প্রযোজক বা প্রযোজকদের কার্যের উৎপাদন কর্মের গতি বা কর্ম অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিন্ত করেন।

লাইন প্রডিউসার পরিচালকদের ভাবনার বাস্তবয়ানে সহায়তা করেন ;কখনোই তারা সৃজনশীলতায় হস্তক্ষেপ করেন না। স্বভাবতই তিনি সক্ষম হন প্রতিটি বিভাগের সম্পদের যোগানে ও কাজের গতি তরান্বিত করনে। তবে তিনি উৎপাদন মূল্যের কথা মাথায় রেখে সৃজনশীল পরিণাম থেকে ফিল্মের র গুরুত্ব পূর্ণ দিক পরিবর্তন করতে পারেন। উদাহরণ স্বরূপ তার পছন্দ অনুসারে চিত্রায়নের স্থান শিল্পের আঙ্গিক কে প্রভাবিত করে প্রকল্পের চেহারাই বদলে দিতে পারে। পরিচালক সব বিশুদ্ধ শৈল্পিক সিদ্ধান্তের জন্য ভারপ্রাপ্ত ; প্রযোজক তাকে সমস্ত রকম প্রয়োজনীয় চাহিদা গুলোর সরবরাহ ও তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে পরিচালকের সৃজনশীল ধারনা টিকে মূর্ত করে তুলতে সাহায্য করে। লাইন প্রযোজকের মুখ্য উদ্দেশ্য চূড়ান্ত বাজেট কে সম্মান করা এবং সময় মতো তার যোগান দেওয়া। প্রাত্যহিক শুটিং এর যাবতীয়  আবশ্যকীয় সিদ্ধান্ত গুলো লাইন প্রযোজকের দ্বারাই গ্রহণ করা হয়। প্রশাসনিক দিক ;বিশেষত যে দিক গুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব বর্তমান সেই সমস্ত দিক গুলোকে সামলানোই লাইন প্রডিউসারের কাজ। শুধু ক্র সদস্যদের ক্ষতিপূরণ ,মীমাংসা ও আপসেই লাইন প্রযোজকদের কার্য সীমাবদ্ধ নয় ; প্রাত্যহিক উৎপাদন জনিত সমস্তরকম সমস্যার সমাধান করাই এদের কাজ। উৎপাদনে দাবীকৃত সমস্ত সরঞ্জাম সরবরাহ ;প্রয়োজন হলে অপ্রত্যাশিত শিডিউলিং পরিবর্তন থেকে ক্র এবং প্রযোজকের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনের কাজ ও করে থাকেন লাইন প্রডিউসার।

একনজরে একজন দক্ষ লাইন প্রডিউসারের যে সমস্ত গুন গুলো থাকা দরকার তা হল ফিল্ম    বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মুখ্য প্রডিউসারদের কাছথেকে আদায় করার ক্ষমতা। মানুষকে প্ররোচিত করার ব্যাপারে দক্ষ হওয়া। প্রডাকশন বাজেট তৈরি ও কন্ট্রোল করার ক্ষমতা রাখা। দুর্দান্ত যোগাযোগের নৈপুন্যতা অর্জন করা। পুরো টিম কে মোটিভেট করার মতো মনোবল সম্পন্ন হওয়া। চরম পেশাদারী দ্রুত কাজ  করিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখা। আইনগত ব্যাপার স্যাপার সম্পর্কে জানা এবং কাজের সময় সবার নিরাপত্তা ব্যাপারে সুনিশ্চিত করা। নেগোশিয়েশন  বা আপোষ মীমাংসা করার ক্ষমতা রাখা। দ্রুত সিদ্ধান্ত তৈরির ক্ষমতা ডেভেলপ করা। এর জন্য ফিল্মের পুর প্রসেসটা হাতের তালুর মতো জানা দরকার। কূটনৈতিক চালেও দক্ষ হওয়া দরকার।  সর্বোপরি খুবই কর্ম শক্তি সম্পন্ন এবং উদ্যমী হওয়া দরকার।

হলিউড বা বলিউডে কিহয় বলতে পারবোনা ;আমাদের এখানে লাইন প্রডিউসার মানেই প্রযোজকের খুব কাছের লোক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কর্পোরেট বাবুরা তাদের পেয়ারের লোককেই এ কাজে নিযুক্ত করেন। এর জন্য প্রয়োজনও হয়না কোন গ্রিল্ড স্বীকৃতি। এর ফলে দক্ষ অদক্ষ দুই প্রকারের লোকই ঢুকে পড়ছে এই পেশায় ।

লাইন প্রডিউসার কেবল চলচ্চিত্রের উৎপাদন কাজেই নিযুক্ত থাকেনা। মার্কেটিং ,প্রচার ,দৃশ্যমানতা এবং রিলিজ পর্যন্ত থাকে লাইন প্রযোজকের ভূমিকা।

শুধু টলিউডে নয় হলিউডে ও বলিউডের ছবিতেও এখন কোলকাতার লাইন প্রডিউসারদের দক্ষতার সাথে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে।  ফলে বাংলার বাইরের প্রযোজকেরাও কোলকাতায় কাজ করতে আসছেন উৎসাহের সাথে এর ফলে ফিল্ম   শিল্পের সাথে যুক্ত বাংলার শিল্পী ও কলাকুশলী দের কর্ম সংস্থান বাড়ছে।

সাধারণত সহকারী পরিচালক ও ইউনিট প্রডাকশন ম্যানেজার থেকে লাইন প্রডিউসাররা আসেন। যাদের সময়ের ব্যবস্থাপনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণ কার্যের উপযুক্ত উপাদান সরবরাহ সম্পর্কে সঠিক ধারনা থাকে। অঞ্জ লোক কখনোই এ কাজের উপযুক্ত নয়। তবে ফ্লিম স্কুলের ডিগ্রী না হলেও চলে।

বাংলা চলচ্চিত্রে লাইন প্রডিউসারের আগমন প্রডাকশন ম্যানেজারের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। ম্যানেজারের সম্মান দাঁড়িয়েছে তলানিতে। টালিগঞ্জ পাড়ায় লাইন প্রডিউসারদের কাজকর্ম প্রডাকশন ম্যানেজার দের মতো হলেও প্রযুক্তি ও একাধিক ভাষার দক্ষতা প্রডাকশন ম্যানেজারদের থেকে তাদের অনেকটা উচ্চতায় এগিয়ে দিয়েছে। কর্পোরেট মুখি বাংলা ছবির বাজারে। পজিশন ওয়াইজ লাইন প্রডিউসার দের উপরে রাখা হচ্ছে ; বড় বাজেটের ফিল্মে   র ক্ষেত্রে লাইন প্রডিউসারের আন্ডারে কাজ করছেন এক বা একাধিক প্রডাকশন ম্যানেজার।

বলা খুব কঠিন কর্ম দক্ষতায় প্রডাকশন ম্যানেজারদের তুলনায় লাইন প্রডিউসারেরা বাংলায় এগিয়ে কিনা ! কারণ;প্রডাকশন ম্যানেজারের সংস্কৃতি অনেক প্রাচীন বাংলা সিনেমায়। কখনো কখনো পুরুষানুক্রমে এই পেশায় যুক্ত থেকেছেন বেস কিছু লোক। ফলে ফিল্ম    নির্মাণের আটঘাট তাদের নোখ দর্পণে। সেখানে তরুণ প্রজন্মের যারা লাইন প্রডিউসার হয়ে আসছেন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতেই লেগে যাবে বেশ কিছুটা সময়। আর এই পেশায় অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বড় মূলধন ;এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

সেদিন হয়তো বেশি দূরে নেই ; যেদিন প্রডাকশন ম্যানেজারের পদটাই পুরপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। থেকে যাবে অব্যাপ্ত সেই আট পৌড়ে মানুষ গুলোকে নিয়ে বাংলা সিনেমার টেকনিশিয়ানদের নস্টালজিয়া ;প্রচুর টাকা লগ্নি হবে। কর্পোরেট চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করবেন বাংলা চলচ্চিত্রের বাজারে। সুবিধা মতো পুঁজি উৎপন্ন করবে অনেক পজিশন বিলুপ্ত করবে অনেক পথ। আসংখ্যার কথা যেটা স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ ;"পথের পাঁচালী"র মতো আন্তর্জাতিক উন্নত বাংলা সিনেমা নির্মাণ বন্ধ হয়ে যাবে। একছত্র ধনতান্ত্রিক পুঁজির হাতে বিষয় হীনতায় ভূগবে বাংলাচলচ্চিত্র। বাঙালী জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও সঙ্কট এবং সমকালীন বাংলা সমাজের শ্রেনীচেতনা স্থান পাবে না চলচ্চিত্রে। আপাত সম্মোহনে ডুবে থাকবে বাংলা ছবির আপামর দর্শক। সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের চৌহদ্দির মধ্যে আমল পাবেনা বস্তুত স্বাতন্ত্র্যবোধ ও মর্যাদাকে চেতনায় অভিষিক্ত করার মহান শিল্পরিতী। তবে পশ্চিমী চলচ্চিত্রে ডি সিকে, রুসলিনি, গদার ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েও ভোগবাদী ধনতান্ত্রিক সভ্যতার বিকল্প সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শন স্থাপন করতে পারেনি। জা পল -সার্ত্রে ও আলব্যের কামুর বিচ্ছিন্নতাবাদ ও অস্তিত্ববাদ দর্শনের প্রতিফলন ঘটেছিল রেনে, রে-নোয়া, ফ্রাঁসোয়া, ক্রুফোডিসিকাসোলিনিপাসোলিনিইঙ্গমার বার্গম্যান প্রমুখের ছবিতে। কিন্তু এই শূন্যতা বোধের উজ্জ্বল প্রতিফলনও এদেশের ছবিতে কোথায়।

তবে আশার কথা বাংলার মৃয়মান হয়ে পড়া চলচ্চিত্র শিল্প পুঁজির বিকাশে অক্সিজেন পাচ্ছে; নব প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অনান্য ভাষা ভাসির চলচ্চিত্রর সাথে দৌড়ে পাল্লা-দিয়ে বাংলা ছবির মান উন্নয়ন ও বাজার বর্ধনের কাজ চলছে। বাংলা চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত মানুষের অন্নের সংস্থান বাড়ছে।


তথ্য সূত্র :

১) সিনেমার শতবর্ষে ভারতীয় সিনেমা -প্রফুল্ল শুর

২) সিনেমা সংক্রান্ত -পুন্দ্রেু শেখর পত্রী

৩) The Economic Times-Corporates join Tollywood bandwagon, Bengali film budgets rise to about 5-6 times Tasmayee Laha Roy, ET Bureau Jan 2, 2014 .

৪) Wikipedia-Line producer;Literature History;History of Sculpture;History of Painting;Cinema of West Bengal .

৫) রূপের কল্পনির্ঝর : সিনেমা আধুনিকতা রবীন্দ্রনাথ- সোমেশ্বর ভৌমিক।

৬) আমার ব্লক কম: চলচ্চিত্র প্রযোজক হবার পথে।

আগের সংখ্যার পর

১২৫ বছর পেরিয়ে কবি টি. এস. এলিয়ট

নিত্যানন্দ খাঁ 

এরপর প্রকাশিত হল কবির The Hollow Men নামক কবিতা। এটিও পাঁচটি স্তরে গ্রথিত। এখানেও কবির একই মানসিকতার ক্লান্তিকর প্রবাহ। তবে আগের কবিতাটিতে ছিল পটভূমির প্রাধান্য। এখানে সেই যায়গায় প্রাধান্য পেল সেই পটভূমির মানুষগুলি। আধুনিক জীবনের বিতৃষ্ণা, অসহায়তা ও শূন্যগর্ভতা বহনকারী মানুষগুলিকে কবি পূর্বোক্ত পটভূমি থেকে ছেঁকে তুলে এখানে প্রতিষ্ঠিত করলেন। কবিতাটির বক্ত্যব্য সহজতর, তাঁর ভঙ্গিগত দুর্বোধ্যতাও কম এবং ছন্দটিও নবীন। এখানে কবি নিজেই চরিত্র এবং সকল আধুনিক মানুষের প্রতিনিধিরূপে বক্তব্য রেখেছেন। ‘আমরা’ শব্দটির দ্বারা কবি নিজেকে সকল আধুনিক নাগরিক মানুষের প্রতিনিধি করে নিয়ে বলেছেন, এই সকল মানুষ ফাঁপা, শূন্যগর্ভ, যে-কোনো বলিষ্ঠ ও উদার অনুভব থেকে বঞ্চিত, খড়ভর্তি-মাথাওয়ালা পুতুলের মতো; লক্ষ্যহীন ভয়গ্রস্থ। 

এরপরের কাব্যগ্রন্থ Ash-Wednesday. প্রকাশকাল ১৯৩০। পূর্বের কবিতা The Hollow Men প্রকাশের পর অতীত হয়েছে পাঁচ বছর। The Hollow Men শেষ হয়েছিল ‘For thine is the kingdom’, বাইবেলের উক্তিকে তীব্র ব্যঙ্গ করে। কিন্তু এখন কবি পরিবর্তিত মানুষ। এখন তাঁর অনুভব ‘our peace is his will’. এবং তাঁর নিগূঢ় আকূতি ‘Let my cry come unto thee’. Ash-Wednesday সম্ভবত এলিয়টের দুরূহতম রচনা। এই গ্রন্থ তাঁর জীবনের একটি নতুন পর্যায়ের পরিচায়ক। 

সমকালীন ক্ষয়গ্রস্থ জাগতিক প্রেক্ষাপটের দুঃসহ পীড়নে আর্তকবি খ্রিষ্টান ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে শেষ পর্যন্ত আশা ও মুক্তি অন্বেষণ করেছেন। তাঁর এই ধর্ম-প্রত্যয় আরও তীব্র হয়েছে ভারতীয় হিন্দুদর্শন-‘উপনিষদ’ ও ‘গীতা’-র দ্বারা, যার ইঙ্গিত আমরা The West Land কবিতার what the thunder said অংশের শেষ চারটি স্তবকে পেয়েছি। সেখানে শুরু, আলোচ্য কবিতায় তাঁরি দৃপ্তপদ আগমন এবং Ariel Poems কবিতা সংরহের মধ্যদিয়ে Four Quarters-এ তার পরিণতি।

উপরোক্ত তিনটি কবিতার মধ্যে প্রথম দুটি কবিতা বিশেষভাবে বহু কবিকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে The West Land. নব্য আধুনিক বাঙালি কবি শুধু এর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেনই নয়, দিক্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে একে অনুকরণও করেছেন। যদিও বাংলা কাব্যে এলিয়টের প্রভাব নিয়ে সুধীজনেরা দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁদের কারো মতে, এলিয়টের ধর্মবিশ্বাস, ইতিহাস চেতনা, তাঁর সমাজ পরিমণ্ডল বাঙালিয়ানার মতো নয়। তাই প্রভাব শব্দটি খাটে না। তৎসত্ত্বেও অধিকাংশ ব্যক্তির মত, এলিয়টই সবচেয়ে বাঙালির কাছের কবি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এলিয়ট পড়েছেন ও অনুবাদ করেছেন (অথচ সৌহার্দ থাকা সত্ত্বেও ইয়েটসের কবিতা নিয়ে কিছু বলেন নি)। চিঠিপত্রে ব্যবহৃত হয়েছে এলিয়টীয় শব্দ (যেমন এক সময় মোলিয়ার-এর জ্যুঁদার প্রসঙ্গ ব্যবহার করেছিলেন)। অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা একটি চিঠির বাক্য এই রকম (২৩/০২/১৯২৯)- ‘আমার বড়ো বড়ো চিঠির বহর দেখে মনে কোরো না আমার অবকাশের West Land বুঝি বহুবিস্তৃত।’আর. এফ. লিখেছেন (১৯৪১)-‘I am interested to read what you say about Mr. T.S. Eliot. রবীন্দ্রনাথকে এলিয়টের কবিতাংশ পাঠাতেন অমিয় চক্রবর্তী। যদিও হপকিন্স ছিলেন তাঁর আদর্শ। তথাপি তিনি এলিয়টের ছায়া এড়িয়ে যেতে পারেন নি। তাই “অভিজ্ঞান বসন্ত” কাব্যে পড়ি-‘পোড়ো মেঠো মন/নিরন্ন নীল জীবন’, যা বহুশ্রুত এলিয়টীয় পংক্তির উদ্ভাসন- ‘This is dead land/this is cactus land’.

তিরিশের দশকের বাঙালি কবিরা অনেকেই এলিয়ট-প্রাণিত। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, পরবর্তী দশকের সমর সেন, প্রমুখ অল্পবিস্তর এলিয়টের কবিতায় উজ্জীবিত। আর তাঁর কাব্যনাট্য অনুপ্রাণিত করেছে বুদ্ধদেব বসু, রাম বসু, কৃষ্ণ ধর, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ কবিকে। বুদ্ধদেব বসু যদিও সরাসরি তাঁর কবিতা এলিয়ট-প্রভাবিত স্বীকার করেন নি। তবু দেখা যায়, যুগের বন্ধ্যাত্ব বা যান্ত্রিক জীবনযাপন ও ক্লান্তি বর্ণনায় এলিয়টই তাঁর পথ প্রদর্শক। যেমন, “দময়ন্তী” কাব্যে দেখা যায়-‘এ যে জীবনে মরণে দেখি, মরণই জীবন’। Sweeny Agonistes-এ পাই-Death is life and life is death. প্রায় অনুবাদ হয়ে উঠেছে ‘আটচল্লিশের শীতের জন্য’ কবিতার এই পংক্তি-‘অনবরত অবসানে আরম্ভ গতির’। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যে অনেকখানি এলিয়টের ভাবনায় প্রাণিত, এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না। তাঁর ব্যক্তিজীবন ও পারিপার্শ্বিক তাঁকে যে নিষ্ফলা কণ্টকিত নিঃসঙ্গতায় নিক্ষেপ করেছিল সঙ্গতভাবে এলিয়ট হয়েছিলেন আরাধ্য। তাঁর  কাব্যাদর্শ অন্যতম ‘উটপাখি’ কবিতায় দেখি কবির বীক্ষা-‘কথায় লুকাবে? ধূ ধূ করে মরুভূমি/ক্ষয়ে ক্ষয়ে ছায়া মরে গেছে পদতলে’। এলিয়ট তাঁর West Land কাব্যে লিখেছেন- ‘And the dead tree gives no shelter, the crikets no relief/And the dry stone no sound of water. ‘The West land’ এর প্রভাব পড়েছে অনেক ক্ষেত্রে বিষ্ণু দের অনেক কবিতায়। “Here is no water but only rock/Rock and no water and sandy Road.” “চাঁদের আলোয় চাঁচর বালির চরা/এখানে কখনো বাসর হয় না গড়া (চোরাবালি, ঘোড়সওয়ার)। 

১৯৬৫-তে এলিয়ট-এর মৃত্যু হলে বিচ্ছিন্নভাবে একাধিক পত্রিকায় তাঁর সম্বন্ধে প্রবন্ধ ও তাঁর কিছু কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ পি. লাল সম্পাদিত নিবন্ধ-সঙ্কলন T.S. Eliot: Homage from India(Writers Workshop). পঞ্চান্নটি প্রবন্ধ ও শক-কবিতার এই সঙ্কলনে বেশ কয়েকজন বাঙালি লেখকের রচনা আছে। জগন্নাথ চক্রবর্তীর প্রবন্ধে ১৯৬৫-তে এলিয়ট সম্পর্কে সাধারণ মনোভাবের একটি রূপরেখা পাওয়া যায়-“Eliot is a major poet of the century but not a ‘great’ poet………Eliot is a decisive poet, because he decided and set the tone of whatever was to come after him in poetry.” (Thought on Eliot). যদিও দ্বিতীয় দাবিটিও বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে আজ আর আমরা মানতে পারি না। লেখকও বাংলা কবিতার কথা ভেবে সম্ভবত উক্তিটি করেনি।

ষাটের দশকের কবিতায় নয়, কিন্তু কবিদের মনে এলিয়টের জন্য যে শ্রদ্ধা ও প্রীতির আসন অম্লান ছিল আজ যেন তাতেও ধুলো জমেছে কিছুটা। তরুণতর কবিদের কাব্যশিক্ষায়, মননে, ভালোবাসায় এলিয়ট আজ আর অপরিহার্য নন। তরুণতর এই কবিরা এলিয়টের সেইটুকুই কিছুটা নিচ্ছেন যেটুকু গঠনের দিক থেকে সাঙ্গীকৃত হয়ে গেছে ত্রিশের কবিদের লেখা থেকেই। সে জন্যই হয়তো এলিয়টের জন্ম শতবর্ষে কিছু আলোচনাচক্র অনুষ্ঠিত হলেও, কিছু কিছু অনুবাদ ও স্মরণমূলক প্রবন্ধ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও বাংলা লিটল ম্যাগাজিনকে প্লাবিত করতে পারেনি এলিয়ট-ভাবনা। সেই স্মৃতিচারণ কবি এলিয়টের ১২৫তম জন্মজয়ন্তীর এই বছরেও তেমন উজ্জ্বল হয়ে দেখা দেয়নি। অথচ একথা স্বীকার করতেই হবে এলিয়ট আধুনিক কাব্যধারার এক অনন্য প্রতিভা, এক অনন্য আধুনিক কবিব্যক্তিত্ব। ইতালির মহাকবি দান্তের ইনফার্নো, পার্গেটোরিও এবং প্যারাডিসোর ছকে তিনি বিশ্বাসের এক ভিত্তি ভূমিতে উপনীত। বিশ্বচেতনাবোধের উন্মেষে তিনি শুধু য়ুরোপের নয়, বিশ্বের কবি; আধুনিক বিশ্বের রূপকার।  

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জীঃ

১) টি. এস. এলিয়টঃ বাঙালি মন ও মননে, তাপস বসু(সম্পা.)।

২) বোদলেয়ায় থেকে এলিয়ট ও বাংলা কবিতা, বারীন্দ্র বসু।

৩) সাহিত্যঃ পূর্ব ও পশ্চিম, তরুণ মুখোপাধ্যায়।

১২৫ বছর পেরিয়ে কবি টি. এস. এলিয়ট

নিত্যানন্দ খাঁ 

ঘরখানি সরু, লম্বাটে। টেবিলটি বেশ ছোট, কাগজপত্রের ভিড় নেই, একপাশে কিছু বই ও না-খোলা চিঠিপত্র। পাতলা চেহারার এলিয়ট সাহেব কিছু পড়ছিলেন, উঠে দাঁড়িয়ে সেই বাঙালি যুবকটির হাত ধরে ঝাঁকিয়ে অত্যন্ত নিচু গলায় বললেন, ‘হাউ ডু ইউ ডু?’ এরপরই প্রথাগত আলাপপর্ব আর টুকিটাকি কথাবার্তা। কিছুক্ষণ পরে তারা দুজনেই চুপ। ইতিমধ্যে একজন সুদর্শন যুবক এসে চা দিয়ে গেছে টেবিলে। যুবকটির হয়তো মনে হল তার দিক থেকে একটা কিছু বলা উচিৎ, তাই হঠাৎ মনেপড়া ভঙ্গীতে সে বলল, বাংলায় আপনার কবিতার অনুবাদের বই বেরিয়েছে। আমাদের বিখ্যাত কবি বিষ্ণু দে অনুবাদ করেছেন, আপনি জানেন? এলিয়ট মৃদু হেসে বললেন জানি। ‘ভিষ্ণু ডে! ভিষ্ণু! ব্রাহ্ মা-ভিষ্ণু-শিভা...... এই ট্রিনিটি। আচ্ছা তুমি বলতে পার, ভিষ্ণু আর শিভার অনেক ভক্ত আছে, তাঁদের মন্দির আছে, প্রতিদিন এই দুই দেবতার পুজো হয়, কিন্তু ব্রাহ্ মা-ও এঁদের সমান হলেও মন্দিরে কেন তার পুজো হয় না? বলা বাহুল্য বাঙালি যুবকটি এই প্রশ্নের উত্তর সেদিন দিতে পারেনি। শুধু সেদিনই কেন,গত ২৩শে অক্টোবর ২০১২, দিকশূন্যপুরে পাড়ি দেওয়ার আগে পর্যন্তও তার কাছ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাইনি। অনেকটা হয়তো সেই জন্যই এই ১২৫ বিছরের ব্যবধানে টি. এস. এলিয়টকে আরেকবার ফিরে দেখা উচিৎ। কারণ আমার মনে হয় সেদিন তিনি যুবক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে ব্রাহ্ মা-র প্রচ্ছন্নে নিজের কথাই বলেছিলেন। 

এলিয়ট আধুনিক যুগের সব থেকে প্রভাব বিস্তারী এবং সব থেকে বিতর্কিত কবি। আধুনিক প্রগতিশীলতার বাণীবহ, অথচ তাঁর কাব্যের সর্বাঙ্গ ব্যপ্ত করে decadence বা অবক্ষয়। তিনি আবেগকে বাদ দিয়ে বুদ্ধিকেই সর্বস্ব করেছেন তাঁর কবিতায়। অথচ বুদ্ধির সার্থকতা যে বাধ্যতা সৃষ্টিতে তাকে তিনি সমূলে বিনষ্ট করতে চেয়েছেন। তাঁকে অনুকরণ ও অনুসরণ করা হয়েছে ব্যাপকভাবে। কারো-কারো মতে, জাগ্রত মনন ও অনুভুতির তিনি এক সমন্বিত প্রকাশ। আবার কেউ-কেউ বলেন, তাঁর কবিতা ভঙ্গিসর্বস্ব এবং ধার করা পণ্য। তিনি ছিলেন পাটোয়ারি ব্যবসাদার। তাঁর কবিতাকেও সুকৌশল-প্রচারে তিনি পণ্যশ্রেষ্ঠ রূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর বহু বক্তব্য ‘হঠোক্তি’, কিন্তু তবুও তিনি জিজ্ঞাসা জাগান। কেউ কেউ বলেন জীবনকে তিনি আমূল প্রত্যাখ্যান করেন, আবার কারো মতে তাঁর মনন ব্যাপ্তি অপরিসীম। অনেকে বলেন তাঁর আন্তর্জাতিকতা বোধ তুলনাহীন, আত্মসচেতনতা সুগভীর। তাঁর কবিতায় বিতৃষ্ণা, একঘেয়েমি ও ক্লান্তির ধারাবাহিক মিছিল পাঠকের বিমুখতা সৃষ্টি করে। আবার তাঁর প্রতিবাদে অপরের বক্তব্য, এলিয়টের কবিতার গভীর আকর্ষণের জন্যই তাঁর কবিতার ভাব ও আঙ্গিকের এত অনুকরণ অন্য কবিদের কবিতায়। বিংশ শতাব্দীর ইংরেজ কবি ও পাশ্চাত্য অন্যান্য কবিদের মধ্যে এলিয়টের স্থান অনন্য। ১৯৩০-এর সমসাময়িক কালে সারা য়ুরোপীয় সাহিত্যে তাঁর প্রভাব। অল্পসংখ্যক যে-সকল ইংরেজ কবি ইংরেজি কবিতার যুগন্ধর প্রতীকপুরুষ রূপে গৃহীত, এলয়টের স্থান তাঁদেরই মধ্যে। নব্য-আধুনিক বাঙালি কবিদের একটি বড় অংশও দিগ্ বিদিক-জ্ঞানশূন্য হয়ে তাঁকে অনুকরণ, অনুসরণ করেছেন।

এলিয়ট চিরাচরিত ইংরেজি সাহিত্যের সম্পূর্ণ বিরোধী। এই বিরোধ কাব্যের বিষয়বস্তু, আঙ্গিক ও আত্মপ্রকাশ-ভঙ্গিতে। কবিতার বিষয়বস্তু প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর যুগের অপরিসীম ক্লান্তি, যান্ত্রিকতা ও শূন্যতা। কবি অনুভব করেছেন, শিল্পবিপ্লব থেকে উত্থিত সামাজিক পরিবর্তন পুরাতন সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেছেন। সেই সংস্কৃতি ছিল কৃষিনির্ভর, সেখানে ধনী-দরিদ্র উভয়ই একই ভিত্তি-সংলগ্ন এবং ধর্ম ও রাষ্ট্র জীবন্ত সম্পর্ক অন্বিত। সেই ভিত্তি ধসে গেছে, নীতিবোধের অবক্ষয় হয়েছে, শিক্ষার ভিত্তিও পরিবর্তিত। তা ক্রমশঃ বিজ্ঞানমুখী ও বস্তুবাদী। সারা য়ুরোপের সংস্কৃতি ভাণ্ডার, সাহিত্য, ভূ-প্রাঙ্গণ, বিজ্ঞান, দর্শন প্রভৃতির বিপুল সমুদ্র থেকে বিচিত্র প্রতীক উত্তোলন কোরে কবিতায় তার প্রয়োগ। এর ফলে যুদ্ধোত্তর যুগের বিমূঢ়তা, পথসন্ধানে বিভ্রান্তি, স্বতঃস্ফূর্ত মৌলিক কল্পনা-অভিব্যাক্তিতে বাধা তাঁর কাব্যের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাস যেমন দীর্ঘ তেমন জটিল, অন্তত শিল্পোন্নত পশ্চিম য়ুরোপের ক্ষেত্রে। কবিকে অতি সচেতন ভাবে স্থাপন করতে হয় সেই ইতিহাসের জটিল ঘূর্ণিতে। আপন অস্তিত্ব বিপন্ন কোরে খুঁজতে হয় চূড়ান্ত ‘আমি’-কে। এই তো নিয়তি। হোল্ডারলীনের মতো কবিকেও আর্তনাদ করতে হয়-‘in such spiritless time, why to be a poet at all?’ হেগেল আরোপ করেন গুরু দায়িত্ব কবির ওপর, “Poetry will have to take on the business of so through a recasting and remodeling of reality that, faced with the unyielding mass of prosaic, it will find itself involved in manifold difficulties”

“manifold difficulties” আসতে আরম্ভ করেছিল কিছু আগে থেকেই। সামন্ততন্ত্রবাদের পতনের পর থেকে; মধ্যযুগীয় সংশ্লেষণ, medieval synthesis, ঘুচে যাবার পর থেকে। কিন্তু তার হিংস্র রূপ, কদর্য নগ্নতা প্রকাশিত শিল্পবিপ্লবের যুগে। ছিন্ন ভিন্ন মানুষ, বাইরে ও ভিতরে। রক্তাক্ত। অথচ এই রক্তক্ষরণ দেহের ভিতরে। সে তার নিজের কাছে এক নয়, বহু। একে অপরের সঙ্গে দেবাসুরের যুদ্ধে নিরত। এই রক্তাক্ত সত্তার আর্তি অপরূপ ভাষা পায় মার্ক্স-এর কাছে শিলারের চিঠিতে। এই হল fragmentation of man, divided self, multiple self. আর মার্ক্স তাঁর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেন অ্যালিয়েশন তত্ত্বে। বিষ্ণু দেও প্রকাশ করেন এই ভাবে, ‘ছত্রধর নেই আজ সম্পূর্ণ মানব’। তাঁর স্মৃতি অবসর বিনোদনে দ্বারকায়, স্মৃতি তাঁর যমুনার নীল জলে বৃথা মাথা কোটে।

য়ুরোপ সেদিন অগ্রাহ্য করেছে মার্ক্সকে। করে লাভ হয় নি। বরং আত্মক্ষয়ে হয়েগেছে পাংশু নীল। আর এই ঘুর পথে যেতে যেতে romantic symbolist-রা ভ্রান্ত রীতিতে অনিবার্য প্রশ্নকে একান্ত করে তুল্ল-চুরান্ত কী তবে? কী অপরিবর্তনীয় নিত্য সনাতন? কবিতা না রাজনীতি? হয়তো বোদলেয়ার থেকে এর শুরু। কবি ‘পারিয়া না আরিস্ট্রক্যাট’; নাকি উভয়ত? এই প্রশ্ন টেনে আনে বোদলেয়ারকে, ১৮৪৮-এ ব্যারিকেডের সামনে; আবার তাঁকে ঠেলে দেয় অশুভ পুষ্পের সুগন্ধী নরকে। ১৯১৬ সালের আইরিশ অভ্যুত্থান ইয়েটসকে লেখায়, ‘A terrible is born’, আবার এই ইয়েটসকে ঠেলে দেয় নিরাবয়ব শুদ্ধ প্রতীকে কিংবা ফ্যাসিবাদের প্রতি আসক্তিতে। এই উতলা আর্তি রুশ বিপ্লবের ব্লককে লেখায়, ‘The twelve’. আবার নিয়ে যায় আত্মহননে। এই প্রশ্নই টমাস মানকে এই সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য করে আজ, ‘the destiny of man presents its meaning in political terms’. সামগ্রিক অবস্থাকে সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাইকেল পোলানি এইভাবে প্রকাশ করেন, “It has erupted in two directions, to towards art and philosophy towards politics. The first was a move towards extreme individualism, the second, the country, towards modern to totalitarianism’’. অবশ্য এইসব বুদ্ধিজীবীদের কাছে ‘totalitarianism’ বলতে বোঝায় সাম্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ।

সৌভাগ্য বলতে হবে এলিয়টের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা হল এই ভাবে- multiple self না unity of self? আমার অনেক মুখ। কিন্তু কোন মুখটা একান্ত আমার? আমার অনেক সত্তা। কোন সত্তায় আমার সমগ্র? এই আমার empirical সত্তা সত্য; নাকি আমার কবি সত্তা? Symbolist ঐতিহ্য ধরে এলিয়টও empirical সত্তা এবং কবি সত্তাকে ভাগ করলেন।            

 হার্ভার্ডের ছাত্রাবস্থা-থেকেই এলিয়ট কবিতা লিখতে শুরু করেন। প্রথম থেকেই তাঁর কবিতা ইংরেজি কবিতার পুরাতন ধারা ত্যাগ করে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এবং নবতর আঙ্গিকের মধ্যদিয়ে ব্যক্ত হয়। তাঁর কবিতায় অইতিহ্য-ব্যত্যয় এবং অ-পূর্বত্ব তাঁর কবিতা প্রকাশের পথে বিশেষ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শেষ-পর্যন্ত কবি এজরা পাউন্ডের সহায়তায় এলিয়ট সেগুলি প্রকাশ করেন।

এলিয়টের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ Prufrock and Other Observations(১৯১৭)। এতে স্থান পেয়েছে তাঁর বিখ্যাত “ The Love Song of J. Alfred Prufrock(১৯১১), “Portrait of a Lady”, “Preludes”, “Rhapsody and a Windy Night”. এই কাব্যের রচনাগুলি সমকালের বিরক্তি, একঘেয়েমি, শূন্যতা ও নৈরাশ্যকে বুদ্ধিদীপ্ত আলোকপাতে ঘৃণ্য ও পরিহাস্য করে তুলেছে।

এরপর ১৯২২-এ প্রকাশিত হল এলিয়টের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য কাব্য ‘The West land’. কবির সমকালীন য়ুরোপীয় পরিবেশ ও তাঁর ব্যক্তি জীবনের দাম্পত্য অশান্তি আলোচ্য কাব্য রচনার প্রেরণারূপে কাজ করেছে। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে। চারিদিকে বিপুল ধ্বংসের অবশেষ। লন্ডন শহর যেন এক পোড়ো জমি। ১৯২৩-এ ‘Kangaroo’ উপন্যাসে ডি. এইচ. লরেন্স লন্ডনের যে চিত্র রচনা করেছেন, ‘The West Land’-এর পটভূমিও তাই। ১৯২২-এর অক্টোবরে এলয়ট সম্পাদিত The Criterion পত্রিকায় কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ঐ বছরেই গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির শিল্পরূপ অনেকাংশে Fisher-King- এর Grail উপকথার সমধর্মী। The West Land প্রথম মহাযুদ্ধ-পরবর্তী য়ুরোপের যেন এক বন্ধ্যা জমি। বন্ধ্যা জমি উর্বর হওয়ার অপেক্ষায়।

বাকি অংশ পরের সংখ্যায়

পুরনো লেখা
Copyright © 2013 Creative Media All Rights Reserved | Designed & Developed by Graphic World (9143382591)