বিশ্ব সঙ্গীত দিবস

সম্পাদক হিসাবে কিছু লেখার তাগিদেই যেন কিছুটা ভারিক্কি হয়ে যেতে হয়। যেন পৃথিবীর যাবতীয় বিষয়ের উপর অল্প বিস্তর জ্ঞান বিতরণ করার ক্ষমতার অধিকারী আমি এবং সে বিষয়ে যথাযথ বিশ্লেষণ ও মতামত দেবার বরাত দেওয়া হয়েছে আমাকে। 

২১শে জুন বিশ্ব সঙ্গীত দিবস। গত পর্বে ‘বাবা’ প্রসঙ্গে বার বার আমার বাবার ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে। সঙ্গীত প্রসঙ্গে আবার তাঁকে প্রবেশ করতে হ’ল।

শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী, রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য আমার বাবার সঙ্গীত শিক্ষাগুরু ছিলেন দিনেন্দ্র নাথ ঠাকুর(দ্বিজেন্দ্রনাথের পিতা) ও অনাদি দস্তিদার। আর ভীমরাও শাস্ত্রী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্র শেখাতেন। তাই বাবা সঙ্গীত ছাড়াও অনেকরকম বাদ্যযন্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। কবিগুরুর গানের দলে বাবা স্থান পেয়েছিলেন। সেই সূত্রেই শারদোত্সীব, ঋণশোধ, বর্ষামঙ্গল ইত্যাদি সংগীতানুষ্ঠানে তিনি সবসময়েই অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সে ক্ষেত্রে, আমি মোটেই সংগীতজ্ঞ নই এবং সঙ্গীতচর্চাও করি না। কিন্তু গোটা বছর ধরে দিনের কোন না কোন সময় গান না শুনলেও চলে না। প্রভাতী অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত গান সারা দিনই মনের মধ্যে অনুরণিত হতে থাকে। গুনগুন যে একেবারেই করি না তা নয়। আর বাথরুমের গান? সে ঘটনা ঘটলে বাড়ির লোক বোঝে আজ ঘরের মানুষের দিলখুশ্।

প্রতিবেদক একজন সঙ্গীতপ্রেমী। তবে তার সুরবোধ থাকলেও সে সুরেলা গায়ক নয়। সঙ্গীত জগতের প্রতিটি শিল্পীর প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা। আবার বিখ্যাত বিখ্যাত সব সঙ্গীত শিল্পীদের সহযোগী শিল্পীদের ভূমিকা এবং প্রচার সেভাবে না হওয়ার জন্য মন ভারাক্রান্ত হয়। পাগল করা গায়ক মান্না দের সঙ্গে তবলায় সঙ্গতকারী হিসাবে রাধাকান্ত নন্দীর খ্যাতি বোধহয় এক ব্যতিক্রমি ঘটনা। সঙ্গীতে বাজনদারদের ভূমিকা বার বার অনুভূত হলেও তারা সে ভাবে পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে পারেন না। এক্ষেত্রে একক বাজনদারদের কথা আলাদা। তবে এখন তাও সংগীতের আগে অথবা বিরতিতে কিছু কিছু নামীদামী সংগীতশিল্পী তার সঙ্গতদারদের পরিচিতি দেন।

সঙ্গীত, বাঙালীর জীবনে জ্ঞান হওয়া ইস্তক, প্রোথিত হয়ে থাকে। মাযের কোলে ঘুমপাড়ানী গান দিয়ে যার শুরু। প্রায় প্রতিটি বাঙালী পরিবারে সন্ধ্যে বেলায় জোড়াবিনুনী দুলিয়ে হারমোনিয়ম সহযোগে কিশোরীদের গান এই কিছুদিন আগে অবধি বাধ্যতামূলক ছিল। কনে দেখার আসরে অনেক বঙ্গললনাকেই দু-কলি গান গেয়ে পার পেতে হয়েছে। এখনও গ্রাম-বাংলায় এই রেওয়াজ বিদ্যমান। সন্ধ্যে লাগতেই প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই শঙ্খধ্বনির সঙ্গে সংগীতের রেওয়াজও কানে আসে। মন চলে নিজ নিকেতনে। এদের কাছে রোজই সঙ্গীত দিবস।

এই জাগতিক জীবনের প্রতিটি শব্দ, প্রক্রিয়ার মধ্যেই সুর ধ্ব্নিত হয়, তার উত্পত্তিস্থল যাই হোক না কেন। আর সে সুর অনুভব করতে পারেন প্রকৃত সঙ্গীতজ্ঞই। তাদের সূক্ষ অনুভূতি সৃষ্টি করে অনবদ্য, মনমাতানো সব সুর। তার বিস্তার, ঝংকার চোখে আনে জল, শিহরিত হয় দেহ, উদ্দাম হয় শ্রোতৃকুল, হরিণের পাল আসে ধেয়ে, হিংস্র পশুও হয় শান্ত সমাহিত। প্রকৃতি-বিধাতার এ এক বিস্ময়কর দান যা মনুষ্যজাতিকে সেই দাতার কাছে চিরঋণী করে রেখেছে। তানপুরার চারটিই তার। কিন্তু এই চারটি তারেই সাতটি স্বর সৃষ্টি হয়। কে বলে বাদ্যযন্ত্র প্রাণহীন?

সংগীতের কথা উঠলেই আমাদের দেশের ‘গানের জুটি’ দের কথা মনে পড়ে। যেমন, ‘সলিল-সবিতা’(‘ও আলোর পথ যাত্রী....’ বা ‘আমরা সে গান গাইতে পারলাম কই!/ আমরা এমন জুটি বাঁধতে পারলাম কই!’)। ‘কিশোর-রুমা’ (‘এই তো হেথায়, কুঞ্জ ছায়ায় স্বপ্ন মধুর মোহে....’)। ‘সুমন-সাবিনা’(‘এখানে সুমন ওখানে সাবিনা / গান ছাড়া আর কিছুই ভাবিনা’)| গজল সম্রাট ‘জগজিত্‍-চিত্রা’। ‘রাহুল-আশা’(‘জানি না কোথায় তুমি, হারিয়ে গেছ আর পাব কি না’)| ও আরও কত বিদেশী ‘গানের জুটি’।

যে কোনও আন্তর্জাতিক খেলাধূলা, অলিম্পিকের আসরে বিভিন্ন দেশের প্র্তিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রতিযোগী দেশগুলির জাতীয় সঙ্গীত ধ্বনিত হয়। বিভিন্ন সুরে সুরময় হয় সে আসরগুলি। ভাষার বাধা সরিয়ে সুর সেখানে জয়ী। তারই প্রমাণ আমাদের জাতীয় সঙ্গীত- বিশ্বের দরবারে সাবচাইতে জনপ্রিয় হিসাবে সমাদৃত এবং স্বীকৃত। 

প্রায় প্রতিদিনই  সাহিত্য নিয়ে আপনাদের মতামত, আলোচনা, সমালোচনা আমরা পেয়ে আনন্দিত, গর্বিত। আপনাদের সুচিন্তিত মতামত আমাদের আরও উত্সাহিত ও অনুপ্রাণিত করবে। অনলাইনে আপনিও আপনার মতামত জানাতে পারেন।

আদি সাহিত্য

আমাদের মানে ভারতের আদি সাহিত্য কী? এবারের সম্পাদকীয়তে সেই আলোচনাটাই হোক না হয়। ভারতের প্রাকআর্য যুগে প্রাচীন ভাষা, যা ঠিক পুরোপুরি সংস্কৃত নয়,  আজ তা বিলুপ্ত। আমাদের আর্য উত্তর প্রথম ভাষা ছিল সংস্কৃত। ওই প্রাচীন ভাষায় প্রথম সাহিত্য রচিত হয়েছিল বেদ, বিশুদ্ধ সংস্কৃতে নয়। বেদকে জগতের প্রাচীনতম সাহিত্য গ্রন্থও বলা হয়। এই বেদ চারটি-ঋক্, সাম, যজু এবং অথর্ব। বেদের সহযোগী সাহিত্যও অনেক রচিত হয়েছিল; যেমন, বেদপাঠ ও শিক্ষার ব্যকরণসহ ষড় বেদাঙ্গ, বেদ সংহিতা পাঠের সহায়ক রূপে গ্রন্থগুলি যথা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক; উপনিষদের সাহিত্য ও দর্শনগুলি আরো পরের রচনা। চার বেদ ছাড়া ষড়বেদাঙ্গ ছিল প্রায় সমকালীন, যেমন, শিক্ষা, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, কল্প, ছন্দ ও জ্যোতিষ। এইরকম প্রত্যেক বেদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্রাহ্মণও ছিল দু-একটি করে। ব্রাহ্মণগুলির সংগে সংশ্লিষ্ট করে রচিত হয়েছিল আরণ্যকগুলি। উপনিষদগুলি দর্শনরূপে রচিত হয়েছিল আরো পরের যুগে, ভিন্ন আদর্শে ও উদ্দেশ্যে।

প্রথম যুগে মানুষ নানা প্রাকৃতিক শক্তির উপরে দেবত্ব আরোপ করে প্রার্থনা জানাত, শান্তির জন্যে যজ্ঞ করে উপাসনা করতো, সেই দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রশস্তি উচ্বারণ করে। ঋষিগণ নানা মন্ত্র রচনা করে স্তব-স্তুতি দ্বারা এইসব যজ্ঞে ঘৃত বা সোম নামক লতার সোমরস আহুতি দিতেন। তখনো দার্শনিক চিন্তা, পরজন্মবাদ বা মোক্ষ লাভের চিন্তা তাঁদের ভাবনায় জন্ম নেয়নি। সে সব অনেক পরে। মুখে মুখে প্রাচীন প্রাকৃত ভাষায় আর্যঋষিগণ এইসব মন্ত্র রচনা করতেন। একদম নিরস এইসব সূক্তকে রসসিক্ত করার জন্যে মন্ত্রগুলি ছন্দোবদ্ধ আকারে গীত হ’ত। এই সূক্তোসকলের মন্ত্রগুলিই হ’ল আদি কাব্য সাহিত্য। যে ঋষিগণ যজমানের কল্যাণ কামনায় যজ্ঞ করতেন তাঁদের বলা হ’ত ঋত্বিক। ঋত্বিক তিন শ্রেণীর ছিলেন। যাঁরা স্তব আকারে মন্ত্রপাঠ করতেন তাঁদের বলা হ’ত হোতা, যিনি গান করতেন তিনি উদ্গাতা, যিনি অগ্নিতে ঘি বা সোমলতার রস আহুতি দিতেন তিনি অধ্বর্ঘু। প্রথম যিনি বা যাঁরা মন্ত্র আবৃত্তি বা পাঠ করতেন, তাঁরাই সেগুলি সংকলন করলেন সর্বপ্রথম, আর তারই নাম হলো ঋকবেদ একে সংহিতাও বলা হতো। এইভাবে গীত মন্ত্রগুলি নিয়ে সামবেদ, আহুতির মন্ত্র নিয়ে ঋজুর্বেদ। অথর্ববেদ অনেক পরের রচনা। এর বিষয়,যজ্ঞের অনুষ্ঠানপদ্ধতি, জাদুবিদ্যা, ভৈষজ ইত্যাদি। পন্ডিতেরা প্রমাণ করেছেন যে প্রথম দুই-তিন বত্‍সরে যে তিনটি বেদ রচিত হয় তাদের মধ্যে ঋকবেদই ছিল প্রথম রচিত সাহিত্য। সাম ও যজু অন্ততপক্ষে তার শতবর্ষ পরে রচিত। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য পন্ডিতেরা অনেক মতপার্থক্যের মধ্যেও মোটামুটি সাব্যস্ত করেছেন, ঋকবেদ অন্ততপক্ষে খৃষ্টের দু হাজার পূর্বে রচিত। কেউ কেউ চার হাজার বছর পূর্বেও বলেছেন। কোন মতই প্রমানিত সত্য নয়। তবে যুক্তিবাদীরা বলেন, বেদব্যাসের রচনা বলে এইগুলি মোটামুটিভাবে মহাভারতের যুগের কাছাকাছি। কেননা বেদব্যাস সেযুগেরই মানুষ ছিলেন।

ঋকবেদের সূক্তগুলি ছন্দোবদ্ধ ভাষায় রচিত কাব্য। এর পাঠেই বেদাঙ্গাদি রচিত হয়। সুতরাং এই ঋকবেদ এক বিরাট কাব্যসাহিত্য। একে পরিণত কথাসাহিত্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু সংস্কৃতই এদেশের সকল নবীন ভাষার জননী, সেই হিসেবেও এই ঋকবেদ এদেশের সর্বপ্রাচীন সাহিত্য গ্রন্থ। সেদিক থেকে আমাদের বাংলা সাহিত্য ঋকবেদের সার্থক উত্তরসূরী। অতএব আজকের সাহিত্য সেকালের ঋকবেদের মতো অকৃত্রিম হোক, এই কামনা করি।

ভাষা দিবস

বলিষ্ঠ স্বভাবকবি(বিশেষতঃ ছড়ার) শ্রী উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়ের সময়োচিত রচনা ‘ভাষা’ দিয়েই একুশে ফেব্রুয়ারীর এই প্রতিবেদন:

               ভাষা আমার ভাষা তোমার

               ভাষাই ভালবাসা

               বাংলাদেশের বাংলা ভাষা

               বুকের গরব আশা।

               এই ভাষাটাই ঢালছে মধু

               কানের গহ্বরে

               ভাষার ফুলে সুগন্ধি আর

               হাসছে রবি করে।

               আসছে আবার ভাষা দিবস

               একুশে ফেব্রুয়ারী 

               রক্ত দিয়ে রাঙ্গানো ভাষা

               বুকে আঁকড়ে ধরি।

             

২১শে ফেব্রুয়ারী! আমাদের পড়শী একটি ছোট্ট দেশের স্বাধীনতার লড়াই, জাতীয়তার লড়াই, মাতৃভাষার লড়াই এক হয়ে গিয়েছিল। উন্নীত জাতীয় ভাষায় উন্নতি হয় জাতির। বাংলা দেশ মাতৃভাষাকে সামনে রেখে স্বাধীনতাকে কেড়ে নিতে পেরেছিল। ভারত বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির এক মিলনমেলা, এটা সুখশ্রাব্য হলেও আজ যে বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রকট প্রকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে আঞ্চলিক ভাষার অযত্নে লালিত হওয়া, যথাযোগ্য মর্যাদা না পাওয়া। সত্যি কথা বলতে কি, ভাষার মর্যাদা দিতে হয় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে। এ ব্যাপারে সরকারের অনুমোদন, হস্তক্ষেপ এবং সর্বোপরি ধারাবাহিক সহযোগিতা, নজরদারী, বাধ্যতামূলক কিছু ব্যবস্থা লাগু নিশ্চিত করা বিশেষ ভাবে প্রয়োজন।

ওপার বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম বিস্ফোরণ বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারী। মাতৃভাষাকে যারা বুকের রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন সেই রফিক, জব্বর, সালাম, বরকত, তাজুনের উত্তরসূরী আমরা এপার বাংলায়। কারণ, একুশের শহীদদের মাযের মুখের ভাষার সংগে হুবহু মিলে যায় আমাদের মাতৃভাষাও। তাই তো পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহ র ভাষা সচেতন মানুষেরা ২১শে ফেব্রুয়ারী দিনটিকে পালন করেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সংগে, নানান উত্সাব, অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। শুধুমাত্র শহীদ বেদিতে মাল্যদানই নয়, এই দিনটি ভাষাপ্রেমীদের শপথ নেবারও দিন।

এবছরও যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে স্বতষ্ফুর্ত ভাবে এই দিনটি পালিত হয়েছে ওপার বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। শহীদ বেদীতে মাল্যদান, বর্ণাঢ্য মিছিল, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারী...’ গানের মধ্য দিয়ে মানুষ এই দিনটিকে স্মরণ করেছে। পেট্রাপোল সীমান্ত এদিন দুই দেশের মহামিলনের রূপ নেয়।

 এদিন আবার মনে করিয়ে দেয় বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলনের শহীদদের কথা। ১৯শে মে, ১৯৬১, এক বিশাল মিছিল যখন বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে শ্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন শিলচর রেল স্টেশনে, তখন পুলিশ প্রথমে টিয়ার গ্যাস ছোড়ে এবং তার পর পরই নির্বিচারে গুলি ছুড়তে থাকে। একে একে লুটিয়ে পড়েন কমলা ভট্টাচার্য(বাংলা ভাষার জন্য প্রথম মহিলা শহীদ), কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সত্যেন্দ্র দেব, শচীন্দ্র পাল, হিতেশ বিশ্বাস, সুকুমার পুরকায়স্থ, তরণী দেবনাথ, কুমুদ রঞ্জন দাস, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুনীল সরকার...এই এগারো জনের জীবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলা ভাষার অধিকার। আবার, ১৯৯৬ সালের ১৬ই মার্চ, আসামের করিমগঞ্জে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা স্বীকৃতির দাবীতে আরও একজন শহীদ হন। তিনি হলেন সুদেষ্ণা সিংহ...মাতৃভাষার জন্য ২য় মহিলা শহীদ!

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০১৫ সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলের পুরানো ক্ষত খুঁচিয়ে দিল...চিবুক হল আরও সুদৃঢ়। দায়িত্ব আমাদের। চলবে শপথ পূরণের পালা।

            শব্দব্রহ্ম মুনিঋষিদের ছিল অবগত

            ভাষা যে শব্দের অন্য নাম তা ছিল অজানা

            জানলে, খুনীদের ব্রহ্মহত্যার দায়ে

            শাপানলে করতেন ভস্মীভূত....।

হাফগেরস্ত 

সমাজের সব চাইতে নিপীড়িত সেই অংশের অধিকারহীনতা, যাদের আধুনিক পরিভাষায় যৌনকর্মী বলা হয়।

এই কলকাতা শহরের গোড়াপত্তনের ইতিহাসে প্রথম একশো বছরে এই পেশা বর্তমান কালের মতন নিন্দনীয় ছিল না। সেই হেতু এদের নামকরণ হয়েছিল, ‘বারবধু’। যদিও এ কথাটাও ঠিক যে, এরা কোনদিনই বারবধূ থেকে গৃহবধূর সম্মান পান নি। ১৭৯৩ থেকে ১৮৮৫ সাল অবধি কলকাতার দেহব্যবসা স্বাধীন পেশা হিসাবেই গণ্য হতো। পরবর্তী পর্যায়ে প্রশাসনের চোখে এরা ‘পতিতা’ বলে পরিগণিত হয়। ইতিমধ্যে যে নতুন ব্রাহ্মণ আন্দোলন শুরু হয় তাতে সব চাইতে ক্ষতি হয় দেহব্যবসায় নিযুক্ত থাকা মেয়েদের। এদের সম্পর্কে ঘৃণা ও অবহেলার মনোভাব গড়ে ওঠে। সাবেক কলকাতার মূলস্রোত থেকে এদের আলাদা করে নির্দিষ্ট সীমানা বেঁধে দেওয়া হয়। তাদের এলাকার পরিবর্তিত নামকরণ হয়ে যায়, ‘লালবাতি এলাকা’, ‘নিষিদ্ধ পল্লী’ ইত্যাদি। আর সংযোজিত হয় নতুন নামকরণ, ‘পতিতা’, ‘গণিকা’, ‘বেশ্যা’, ‘খানকি’ ইত্যাদি, ইত্যাদি। লণ্ডনেও এদের বসবাসের জায়গাকে বলা হতো ‘হাউস অফ ইল রেপুউট’(খারাপ জায়গা)।

জাগতিক জীবনে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্র আছে যেখানে যুক্তিগ্রাহৃতা কিছুতেই প্রবেশাধিকার পায় না, যৌনতা এরকমই একটি ক্ষেত্র। আর বর্তমান দৈনন্দিন জীবনে এই বিষয়ে যুক্তিগ্রাহৃ আলোচনা খুব একটা নজরে আসে না। 

অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই বহুগামিতা প্রচলিত সংস্কারের সংগে সঙ্গতি রেখে ভালোমন্দের বিচারটা একমুখী। অথচ বাস্তব অন্য কথা বলে। আর এই ক্ষেত্রে তথাকথিত ভালোলোকেদের দলটাই ভারী। সে দলে আছেন বহু পন্ডিত ব্যাক্তি, রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্ব, রাষ্ট্রপ্রধান, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক এবং আরও অনেক দেশে-বিদেশে বন্দিত মানুষ। যৌন সংযমের কিছু আপাত লক্ষণ দেখে চরিত্র বিচার করা বোধহয় ভুলই হবে। আবার বহুগামি বলে তারা আরও বেশি শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠবেন সেটাও ঠিক নয়।

মূল কথাটা হলো যৌনতায় পাপ নেই, শারিরীক সম্পর্কেও পাপ নেই। তবে মাত্রাতিরিক্ত তবে অতি লোভ-লালসার বসবর্তি হয়ে নারীর দখল করার প্রয়াসের মধ্যে অবশ্যই দোষ এবং পাপ আছে। শুধু এক পক্ষের সুখ কাম্য নয়, মিলিত আনন্দই সুস্থ যৌন সম্পর্ক। এটাই নিষ্ঠুর বাস্তব এই যে যৌন পেশায় নারীর আগমন বহু ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র দেহজ সুখের আকর্ষণে নয়, পশ্চাতে আছে নিদারুণ দারিদ্র্যের নিষ্পেষণ সাথে সামাজিক উত্পীড়ন। যেখানে পুরুষ অপেক্ষাকৃত ধনী অপরদিকে সহায় সম্বলহীন নারী, যৌন সাহচর্য আর উপভোগ সংঘটিত হয় নিছক অর্থের বিনিময়ে, যৌনতা পরিবর্তিত হয় যৌন ব্যবসায়ে। একবার যৌন পেশায় নাম লেখালে সুস্থ জীবনে ফিরে যাবার সব পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এদের সন্তানেরাও সমাজের চোখে হয়ে থাকে অস্পৃশ্য, ঘৃণ্য এবং শিক্ষার ও মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সন্তানদের নিয়ে এরা অভিশপ্ত জীবনযাপনের পথে নিক্ষেপিত হয়। স্বাভাবিক কারণেই এই সব যৌনকর্মীরা অচিরেই বিগতযৌবনা হয়ে পড়ে, দেহ হয় অপটু, রোগগ্রস্ত। বাকি জীবন কাটে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যে। 

যৌনকর্মীদের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে সাম্প্রতিক কালে আলোচনার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। যৌনকর্মীরা সংগঠিত হতে শুরু করেছে এবং যেখানে যৌনকর্মীরা যত বেশি সংগঠিত, সেই সব জায়গায় এই ধরনের অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার তুলনামূলক ভাবে কম। সোনাগাছি প্রকল্প’ - এ রাজ্যের যৌনকর্মীদের সংগঠন নিঃসন্দেহে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বেশী সময় ধরে তারা এ রাজ্যের যৌনকর্মীদের সংগঠিত করেই ক্ষান্ত হয় নি, সারা দেশ জুড়ে স্ত্রী, পুরুষ ও হিজড়ে যৌনকর্মীদের সম্মিলিত করে রাজধানী দিল্লীতে হাজির করেছিল। যুক্তিপূর্ণ মানবিকতার সীমানায় ‘দুর্বার’ এক মূর্তিমান গঠনমূলক ঝড়। এ ঝড়ের গতি রুদ্ধ হবার নয় আর হবেও না-এই-ই একান্ত প্রত্যাশা।

পরিশেষে বর্তমান প্রজন্মের অত্যন্ত বলিষ্ঠ কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোট্ট একটি কবিতা দিয়ে শেষ করছি:

এই দেশ

যেখানে তাঁর ছিড়ে যায়

গলায় ঝুলে থাকে সুর

শিশিরে ভেজা ফুল চুষে

ধারালো হয় রোদ্দুর।


পাহাড় উঁচু হয় আরও

কেবল জল যায় নীচু

যেখানে বাচ্চারা বলে,

খাইনি রাত থেকে কিছু।


চলো-না সেই দেশে চলে যাই

ভালোবাসার পথ হাঁটি

যেখানে কলগার্ল-ও সন্ধ্যায়

জ্বালায় দুটো ধুপকাঠি!

বই বনাম বউ

বইমেলা উদ্বোধন পর্ব যথাযথ ভাবে সাঙ্গ হবার পরদিন হঠাত্‍-ই হাজির হয়েছিলাম মিলনমেলা প্রাঙ্গণে। অধিকাংশ স্টলই তখন প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেজে গুজে তৈরী হবার জন্যে। অক্লান্ত সে পরিশ্রম। যন্ত্রের মতন সব প্রস্তুতি পর্ব। অনেকেই ফ্লেক্সি, হোর্ডিং, বইয়ের তাক, বাইরে থেকে তৈরী করে এনে স্টল তৈরীতে উঠে পড়ে লেগেছে। এছাড়া ডেকরেটর-রা তো আছেই। ওদের কাজকর্মের ধরণ ধারণ প্রস্তুতি পর্ব অনেক কমার্শিয়াল এবং সুপরকল্পিত। শুধু কি রকম চাই সেটা বলার অপেক্ষায়। এ সব দেখতে দেখতে কখন যে দে’জ পাবলিকেশন-এর কাছে এসে দাঁড়িয়েছি, নিজের কাছেই তা অবাক লাগছিল। আরও অবাক হয়ে যাই সামনে পথ আগলিয়ে থাকা শ্রীকান্ত কে দেখে। উফ্ কতদিন বাদে দেখা! প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়ি, ‘কি রে তুই!’ বলতেই শ্রীকান্ত আমাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। তারপর একটা জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলে ওঠে, ‘তোকে এখানে দেখতে পাব তা ভাবতেই পারিনি। কি যে ভাল লাগছে না কি বলব।’ এরই মধ্যে হাত-কেটলি চা এসে উপস্থিত। আমরা দুজনে লিকার ভর্তি চায়ের প্লাস্টিক কাপ হাতে নিয়ে সামনের বাঁধানো চাতালেই বসে পড়লাম। তারপর শুধুই কথা আর কথা, যেন ফুরতেই চায় না দুজনের। প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে চলেছে সব রকম আলোচনা। আর এই সব চলতে চলতেই এসে পড়ল শ্রী কান্তর কনফার্মড অকৃতদার থাকার প্রসংগ। এই বয়সে এসেও ওকে এখনও এ বিষয়ে এতখানি স্পর্শকাতর দেখব ভাবিনি। মাছি তাড়ানোর মতন বিয়ের ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়ে বেশ জোরে হেসে ওঠে শ্রীকান্ত। তারপর হাসতে হাসতেই আমার হাতে হাত রেখে বলে, ‘বন্ধু, তুই সেই একই রকম রয়ে গেলি! আমিও ওর হাতের ওপর নিজের হাতের চাপ বাড়িয়ে মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলে উঠি, ‘না বন্ধু, ইতিমধ্যে আমার অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন হয়েছে কিন্তু তুমি সেই আবাল্যের শ্রীকান্তই রয়ে গেছ। কিন্তু যে কারণে তুমি দ্বার পরিগ্রহ করলে না সেই বই-এর বিক্ষিপ্ত টিলা, ঢিপি, পাহাড়ের টানে ঠিক হাজির! হাজির নতুন বইয়ের গন্ধ নিতে, পুরানো দুস্প্রাপ্য সব বই-এর টানে!’ শ্রীকান্তর দমকে দমকে যে হাসি শুরু হ’ল তা আর থামতেই চায় না। তারপর হঠাত্‍-ই জায়গা ছেড়ে উঠে আমাকে আদেশের ভংগিতে বলে, ‘এই সন্তু, এখান থেকে উঠবি না। আমি যাব আর আসব।’

অপসৃয়মান শ্রীকান্তর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আমি ফিরে চলে গিয়েছিলাম আমাদের যৌবন বেলায়। শ্রীকান্ত আমার চাইতে বছর খানেক বড়ই হবে। ওরা দুই ভাই শ্রীমন্ত আর শ্রীকান্ত। তা ওর বাবা বড় ভাই শ্রীমন্তর ব্যাংকে একটা চাকরি হতেই বিয়ে দিয়ে দেন। পাত্রী দ্বারভাঙার মেয়ে। একটু ডাকাবুকো টাইপের। যাই হোক, ওর দাদা-বৌদি দ্বিরাগমন থেকে ফিরে আসার পর পরই এক ভোরে শ্রীকান্ত এসে হাজির। বেশ উদ্বিগ্ন। আমি কারণ জিজ্ঞাসা করায় খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ধরা গলায় বলে, ‘জানিস সন্তু, এর থেকে বিয়ে না করাই ভালো।’ আমি একটু ঠাট্টা করেই বলেছিলাম, ‘এই তো সবে তোর দাদার বিয়ে হল, আর এখন তোর এই সব কথাবার্তা কেন?’ আরে এসব কি আর সাধ করে বলি রে! যথেষ্টই কারণ আছে বন্ধু।’ তারপর ওর ব্যাক্ষান শুনে আমার চক্ষু চড়কগাছ। ‘তুই তো ভালোমতনই জানিস সন্তু, দাদা আর আমার কি বই পড়ার নেশা! দু দু-টো লাইব্রেরীর মেম্বার হওয়া ছাড়াও প্রতি মাসে আমরা দাদা-ভাই মাইনে/টুইশনির টাকার একটা ভালো পরিমাণ বই কেনার পিছনে ব্যায় করি। বাড়ির এক তৃতীয়াংশ জায়গাই বই-এর দখলে। আবার দু-ভাইয়ের বিছানাতেও রয়েছে ওদের দখলদারী। আবার বিছানায় যাবার সময়েও দু-ভাইয়ের হাতে ধরা থাকে বই। পড়তে পড়তে ঘুম এসে গেলে সে বই জায়গা করে নেয় মাথার বালিশের গায়ে বা পিছনে।এতদিন এই ভাবেই চলেছিল কিন্তু এখন এই নিয়েই অশান্তি, বৌদির আপত্তি, আর তাতেই যত বিপত্তি। বৌদির হুকুম, এখন থেকে বই ছাড়াই দাদাকে বিছানায় প্রবেশ করতে হবে। অন্যথায় তাদের স্থান হয় মশারি নিসৃত হয়ে মেঝেতে, অবশ্যই বৌদির উদ্যোগে। বাড়ির অন্যান্য জায়গায় রক্ষিত বইগুলোরও ছাদের কোণে বা ও রকমই সব জায়গায় পুনর্বাসন দেবার উদ্যোগও ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আর এ নিয়ে বাড়িতে জোর অশান্তি। বই যেন বৌদির সতীন। তাই শ্রীকান্ত আর এ লাইনে নেই। আর সত্যি সত্যিই এই ভয়ে শ্রীকান্ত আর বিয়েই করল না। দেখতে দেখতে আমাদের সব বন্ধুদের বিয়ে হয়ে গেল। শ্রীকান্ত ঝাড়গ্রামে এক উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে ইতিহাসের শিক্ষকতা নিয়ে আছে। মাঝে মাঝে দেখা হলেও এবার বেশ অনেকদিনের ব্যবধানেই ওদের পুনর্মিলন হল এই মিলন মেলা প্রাঙ্গনে। এই সব পুরানো কাসুন্দি ঘাঁটতে ঘাঁটতেই শ্রীকান্ত সপারিষদ এসে হাজির। সংগের লোকটির হাতে ধূমায়িত দু-কাপ কফি আর ওর হাতে একটা ঝোলানো কাগজের প্যাকেট। বুঝলাম ওতে ভাজাভুজি কিছু আছে-শ্রীকান্তের ভাজাপোড়া খাবার অভ্যাস বরাবরের। ‘নে নে শুরু কর’ বলে সংগের লোকটিকে ইঙ্গিত করে কফির কাপ দুটো আমার হাতে চালান করে দেবার জন্যে, আর হাতে ধরা প্যাকেটটা নিয়ে আমার পাশে ধুপ করে বসে পড়ে।

চিকেন প্যাটিস সহযোগে কফি চলতে থাকে। শ্রীকান্তর মুখে চওড়া হাসি, ‘কিরে, নিজে নিজেই পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে চলেছিলি না? আমি ঠিক মুখ দেখেই মালুম করে নিয়েছি। বাবা তুমি হচ্ছ চিন্তার পরতে কথার কারিগর, এটাই তোমার জগত্‍।’ আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে ছদ্মকোপে বলি, ‘ম্যালা ফ্যাচ্ ফ্যাচ্ করিস না, কেমন আছিস তাই বল।’ ‘কেমন আছি মানে? বিন্দাস আছি। সারাদিন ছাত্র ঠেঙিয়ে বাড়ি ফিরে বই-এ মুখ গুঁজে পড়ে থাকি। রাত করেই শুতে যাই, সঙ্গী তখনও বই। তোরা কি করে ম্যানেজ করিস বল তো?’ ‘ আমি ঠোঁট টিপে টিপে উত্তর করি, ‘আরে বাবা, আমার দুটো শয্যা। একটার সংগী বই আর অপরটির সিংহভাগ জুড়ে (অবশ্যই দু-চারটে বালিশ সহযোগে)বিরাজ করেন বউ। মাথা খারাপ! দুই সতিনের এক বিছানায় ঠাঁই হয় নাকি? প্রথম রাত বই-এর বিছানায়, দ্বিতীয় অর্ধ অবশ্যই বউ-এর পাশে। নো খটাখটি। বুঝলি হাঁদা গঙ্গারাম?’ হাসতে হাসতে শ্রীকান্ত প্যাটিস খাওয়া হাতেই আমার হাত চেপে ধরে। আব্দার করে, সন্তু, তুই আমাকে নিয়ে কত মজার মজার কবিতা লিখেছিলি, মনে আছে তোর? আমি একটু ম্লান হেসে মাথা নাড়াই, ‘না রে সে সব অপরিণত, ঠাট্টা-ইয়ার্কির কান্ড, ও সব মনে থাকে না তবে তোদের মতন কিছু বইপ্রেমী, কবি, সাহিত্যিক দের সংস্পর্শে তো আছি বহুদিন ধরে সে সব লব্ধ অনুভূতি সম্বল করে দু-চারটে কবিতা, রম্যরচনা যে লিখি নি তা নয়, একটা কবিতা তো কাল রাতেই লেখা। সংগের ঝোলাতেই আছে, শুনবি?’ শ্রীকান্ত উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ায়। আমি ওকে শান্ত করে টেনে পাশে বসাই। ঝোলা থেকে খাতাটা বের করে পড়তে শুরু করি:

তোমায় দেব বিস্তীর্ণ প্রান্তর

একটু সবুর করো,

আমি গুছিয়ে নি,

ইতস্তত ছড়ানো সব।

দরজার কাঁধে ঝোলানো সার্টের পর সার্ট    

খাটের ওপর বিস্তর বই-খাতা-কাগজ

হৃদয় এখন অভ্যস্ত, 

খাঁচার মধ্যে দিন গুজরান।

সবুর করো, আমায় একটু সময় দাও

ঘর তুলবো, রাজমিস্ত্রীর খোঁজে আছি,

একে ওকে শুধোচ্ছি, তেমন কারিগর কই?

যে তুলবে ঘর, রয়ে যাবে সব স্মৃষ্টির জন্মসূত্র!

তুমি একটু সবুর করো,

তোমায় দেব ফাঁকা ঘরের কাকলি

তুমি একটু সবুর করো,

আমায় একটু সময় দাও।


কবিতা শেষ করে শ্রীকান্তর দিকে চেয়ে দেখি মাথা নিচু করে থম মেরে বসে আছে। আমি ওর পিঠে হাত রেখে একটু চাপ দিতেই আমার দিকে ফিরে চাইল। চোখ ভর্তি জল। জামার হাতা দিয়ে সে জল মুছে ধরা গলায় জানতে চায় কবিতার নাম। আমার ফিসফিসিয়ে উত্তর—‘অম্বুচিহ্ন’।

ধর্মের আঙিনায় রাজনীতি

আদিকাল থেকে মানুষের মানসিক ক্রমবিকাশ এবং নৈতিক জীবন নিয়ন্ত্রনে ধর্মের যে সুগভীর ভূমিকা প্রবাহমান তা অনস্বীকার্য। ধর্ম মানুষকে পাপাচারমুক্ত, পাশবিক প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে সমাজবদ্ধ জীবনযাপনে ব্যাপৃত রেখেছে। বিজ্ঞানের যুগান্তরকারী অগ্রগতি এবং নিয়ন্ত্রণ সত্বেও বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনীতিবিদ থেকে সুদূর গ্রাম্যপরিসরে, প্রাত্যহিক তুলসীতলায় সন্ধ্যাবাতি দেওয়া গ্রাম্যবধূও ধর্মের অনুশাসনে আবদ্ধ। আর ধর্মের প্রতি এই বিশ্বাস বা মোহ থেকে অচিরেই সৃষ্টি হয়েছে মানুষের বিবিধ ধর্মাচরণ। জাত-পাত-সূচিতা বা কৃচ্ছসাধন ধর্মাচরণের সংগে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে। আর ধর্মের প্রতি যুগ যুগ ধরে যে মোহ, বিশ্বাস, দূর্বলতা তাকে মূলধন করে তথাকথিত কিছু ধর্মীয় নেতা প্রায় অধিকাংশ সময়েই রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক স্বার্থে ধর্মাচরণকে নিয়ন্ত্রণ এবং বিপথগামী করে।

এটাই সত্য যে, যখনই রাজনৈতিক বাতাবরণের মধ্যে ধর্ম তাঁর নিজস্বতা খুইয়েছে বা রাজনীতি এবং ধর্ম একই মেরুতে এসে ঠেকেছে, তখনই সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করে ঘটে চলে মানবিকতার নিধনযজ্ঞ! সম্রাট অশোক রাজনীতির ক্ষেত্রে ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটালেও বৌদ্ধধর্মকে তিনি মানবিক ধর্ম হিসাবে প্রচার করেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও ধর্মীয় সংঘাতই তাঁর সম্রাজ্যের পতনের কারণ। এ ব্যাপারে সার্থক ভূমিকা ছিল সম্রাট আকবরের পরধর্ম সহিষ্ণুতাই তাঁর সফল সম্রাজ্য বিস্তারের প্রেক্ষাপট এবং সর্বধর্মালম্বী প্রজাবতসল প্রশাসক হিসাবে যুগান্তরেও প্রশংসিত। কনস্ট্যানটাইন খ্রিস্টধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তখন খ্রিস্টান ধর্মের রাজনৈতিক আশ্রয় দরকার ছিল, আবার রাজনীতির ক্ষেত্রে দরকার ছিল ধর্মীয় স্বীকৃতি। ইউরোপের ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রগুলো অচিরেই পোপের আহ্ববানে ‘ক্রুসেড’ যুদ্ধে মেতে ওঠে। প্রায় দুইশত বছর ধরে মুসলিমদের থেকে জেরুজালেম উদ্ধার করার জন্যে সাধারণ মানুষের সমস্ত অধিকার বিসর্জন দিয়ে যুদ্ধ করেছিল খ্রিস্টানরা। এই যুদ্ধের হোতা এনেছিলেন পোপ। ভারতের ইতিহাসে আলাউদ্দিন খিলজি উল্লেখযোগ্যভাবে ধর্মকে রাষ্ট্রশক্তি থেকে দূরে রেখেছিলেন। কিন্তু মহম্মদ বিন তুঘলক মৌলবী আর উলেমারদের চরম বিরোধিতায় রাষ্ট্রশক্তিকে বিকিয়ে দেন। মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব ধর্মাশ্রয়ী রাষ্ট্রীয় আদর্শ কার্যকরি করতে গিয়ে সাম্রাজ্যের পতন ডেকে আনেন। তাই রাজনীতির সাথে ধর্মের সমীকরণটি কোনও অবস্থাতেই সুখকর নয়। আপাত সুখকর হলেও এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যতের অন্ধকার!

 পরিশেষে, এটা বিস্মৃত হলে চলবে না যে ভারতীয় সংস্কৃতির ‘বহুত্ববাদ’ এক হাতে হিন্দুরা তৈরী করেননি। এটি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ধর্মালম্বীদের মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তাই কোনও ঘৃণার রাজনীতিই ভারতের এই সুমহান ঐতিহৃ কালিমালিপ্ত করতে পারবে না। 

প্রেম

গত সপ্তাহের পর


প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে চীনের পরেই যেমন জাপানের প্রসঙ্গ এসেছে তেমনি গ্রীসের পরেই রোমের প্রসঙ্গ এসে পড়ে। চীনের সুপ্রাচীন শিল্প-সাহিত্যের প্রভাবে জাপান উদ্বুদ্ধ হয়েছিল তাদের নিজস্ব প্রতিভার বিকিরণে কিন্তু রোমের ক্ষেত্রে তা ছিল কেবল অনুকরণ মাত্র। প্রকৃতিগত কারণে রোমানরা একদম গদ্যময়। হৃদয়বৃত্তি সেখানে অনুপস্থিত.....সবটাই মোটাদাগের, কষ্টসহিষ্ণু সৈনিকের মতন। সৌন্দর্যবোধের অভাব অনুভূত হয় রোমান প্রকৃতিতে। গ্রীকদের ন্যায় ইন্দ্রিয়ালুতার সঙ্গে রোমান মনে যুক্ত হয়েছিল বর্বরতা ও ধর্ষকামিতা। স্বাভাবিক কারণেই হৃদয়বৃত্তির স্থান সেখানে কোথায়?

কাতুল্লাস্ই রোমান সাহিত্যে প্রথম প্রেমের কবি। তাঁর কবিতায়ও ভাবালুতা কম। অপর কবি হোরেস লিখেছিলেন অনেক কিন্তু তাতে প্রেমের টান ও হৃদয়াবেগ ছিল অনুপস্থিত। তবুও হোরেসের চেয়ে ‘তিবুল্লাস’ বা ‘সেকতাসের’ হৃদয়াবেগ ছিল অনেক আন্তরিক। যদিও প্রেমের কবি হিসেবে ‘অভিদের’ খ্যাতি ছিল সবচাইতে বেশি।

আরবী সাহিত্যে প্রেমের কবিতা এক প্রাচীন ঐতিহ্য। আরব বেদুইনের জীবনে প্রেমই ছিল অন্যতম অবলম্বন, যাকে আঁকড়ে ধরে সে তার অনিশ্চিত জীবনের অর্থ খুঁজে পেত, দরিদ্র জীবনে বেঁচে থাকার এক ঐশ্বর্যশালী রসদ হয়ে উঠত। আরবী প্রাচীন লোকগাথায় প্রেমের বর্ণনা এক বিশিষ্ট স্থান করে নিয়েছিল। অন্যান্য বিষয়ের বর্ণনার সংগে সংগে কবিকে প্রেমের প্রসঙ্গ উত্থাপন করতেই হতো। বেদুইনের জটিলতাহীন খোলামেলা জীবনে প্রেমের যে ধারণা গড়ে উঠেছিল তার প্রকৃতি যে সহজ, সরল ও মেঘমুক্ত হবে তা সহজেই অনুমেয়।

ফিরে আসি স্ব-ভূমিতে। এটা লক্ষণীয় যে, সংস্কৃত কোনও কাব্যেই প্রেম কখনও স্বতন্ত্রভাবে বর্ণিত হয়নি। অন্য অনেক কিছুর প্রসংগক্রমে প্রেম বর্ণিত হয়েছে, বিবৃতি ও বর্ণনার মাধ্যমে। অবশ্য এর ব্যাতিক্রমও ঘটেছে কালিদাসের কুমারসম্ভব ও রঘুবংশের দুটি সর্গে-রতিবিলাপ ও অজবিলাপের ক্ষেত্রে। কালিদাসের মেঘদূত প্রেমকাব্য বটে কিন্তু সম্পূর্ণ অবিমিশ্র প্রেম তারও বূষয়ভূত নয়। প্রেম নামক হৃদয়বৃত্তির বিস্তার যে কত ব্যাপক, হাসি-অশ্রু, মান-অভিমানের আলো-ছায়ায় তার যে কত বর্ণবৈভব ভারতীয় সাহিত্যে তা অপরিচিত ছিল না। সংস্কৃত কবিরা কবিতায় প্রেমের বিচিত্র অনুভূতি, আনন্দ-বেদনা, হৃদয়ের গভীরতার মুহূর্তগুলিই তুলে ধরেছেন।

পরবর্তী যুগের কবিদের মধ্যে প্রেমের কবিতায় জয়দেব নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ। জয়দেবের গীতগোবিন্দ আঙ্গিকের দিক থেকে যাই হোক, আবেদনে পুরোপুরি লিরিক। গীতগোবিন্দের যে-কোন অংশই পৃথকভাবে সম্পূর্ণ আস্বাদযোগ্য।

দেশ হতে দেশান্তরের প্রাচীন সাহিত্যে বিমূর্ত প্রেমের প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা থেকে এটা প্রতিফলিত যে প্রেম-নামক হৃদয়বৃত্তির ধারণায়, অনুভবে ও প্রকাশভঙ্গিতে কত তারতম্য, কত প্রকারভেদ! আবার প্রাচীন মনের সংগে প্রেমের আস্বাদে আধুনিক মনেরও মিল! কালের ভূমিকা এখানেও কোন ক্রিয়া ঘটাতে অক্ষম। মানুষের সকল হৃদয়বৃত্তিই চিরটাকাল ধরে সংস্কৃত হয়ে চলেছে। একমাত্র এই হৃদয়বৃত্তিটিই কালের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে মানুষের মনে যুগ থেকে যুগান্তরের সেতুবন্ধন করে যেতে পেরেছে। (শেষ)

প্রেম

শুরুতেই যে কথা বলা প্র্য়োজন তা হলো প্রেমের কোনো বিশেষ তত্ত্ব নির্ণয় বা নির্দিষ্ট করতে এই প্রতিবেদন নয়। প্রেমের আভিধানিক অর্থ যাই হোক, বহমান কালে আমরা সেই শব্দটিকে ঘিরে শব্দাদির বৃত্তি সৃষ্টি করে নিয়েছি। প্রেমের মূলে কাম, কিন্তু কাম যে প্রেম নয় তাও পরিষ্কার, বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না। আর যে বিচিত্র রূপের মধ্য দিয়ে কামের প্রেমে পরিণতি তা আমাদের কাছে বিনা প্রমাণে উপলব্ধ হয়েছে। কিন্তু এই রুপান্তরের প্রকৃতি সম্পর্কে প্রাচীন কালের বিভিন্ন জাতির ধারণা সর্বত্র একই রকম ছিল না। আবার প্রেম যে কাম নয়, কামেরও উর্ধে, সে সম্পর্কেও কোন প্রাচীন জাতিরই ধারণার পার্থক্য ছিল না।

প্রেমেরও কিছু পর্যায়ক্রম লক্ষণীয়। প্রেমের প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ জীবজগতের প্রত্যেকের সংগে সমান, সে সাধারণ। কিন্তু চুড়ান্ত পর্যায়ে সে অসংখ্যের মধ্যেও বিশিষ্ঠ ও অসাধারণ। মানুষকে সর্বপ্রথম ব্যক্তিত্বের আস্বাদ দিয়েছে প্রেম। যখন সমাজে, সভ্যতায় ব্যক্তিত্ববোধ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, প্রাণধারণের তাগিদে মানুষ যখন কর্মে ও বিশ্বাসে যুগের সংগে অঙ্গাঙ্গি ভাবে যুক্ত, সেই আদিমকালেও পুরুষ অথবা নারী সমষ্টি থেকে পৃথক হয়েছে পারস্পরিক চুম্বকীয় আকর্ষণে। সেখানে প্রেম প্র্য়োজন, দেহের ভক্ষদ্রব্য। আর যেহেতু জীবনধারণের নিমিত্ত সমাজে খাদ্যের উত্পাদন, বন্টন ও সংরক্ষণ একটা নির্দিষ্ট নিষেধের গন্ডিতে বাঁধা, সেই হেতু প্রেমও সমাজ-সংস্কারের নিয়ন্ত্রনে থাকে। আবার প্রেম যখন দেহকে ছাড়িয়ে মনেরও খোরাক হয়ে ওঠে তখন সেই প্রয়োজন মেটাবার উপায় কোনো সুচারু, বিধিবদ্ধ পথে সব সময় সম্ভব হয় না। তখন তা সমস্ত বিধি নিষেধকে মনে মনে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, সামাজিক রীতি-নীতিও বিপর্যস্ত হয়। আর এটা তো অনস্বীকার্য যে প্রেমের প্রকৃতি চিরকালই প্রধানত অসামাজিক।

ঋগবেদে প্রাচীনতম প্রেমের সন্ধান পাওয়া যায়। একটি ঋষি যম ও যমী, অপরটি পুরুরবা ও উর্বশী। যম-যমী সূক্তের বিষয়বস্তু, সহোদর যমের প্রতি যমীর প্রবল কামজ আকর্ষণ ও যমের প্রত্যাখ্যান আর পুরুরবা-উর্বশী সূক্তের বিষয় বিরহী পুরুরবার মিলনকামনা ও উর্বশীর সান্ত্বনা। পুরুরবা ও উর্বশী সূক্ত যে-কোনো যুগের যে-কোনো রুচির মাপকাঠিতেই প্রেমের কবিতা রূপে বিবেচিত হবে কিন্তু যম-যমীর সূক্তটি অসাধারণ বলিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কামের নগ্ন ও বিকৃত প্রকাশ বলে হয়ত উপেক্ষিতই হয়েছে। ভারতীয় সাহিত্যে পুরুরবা-উর্বশীর প্রেম কাহিনী চিরায়ত জনপ্রিয় আখ্যান। এছাড়াও আর এক নারী-ঋষির দুটি ঋককে প্রেমের কবিতার মর্যাদার যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে, সেটি হলো নারী-ঋষি লোপামুদ্রা। দুটি ঋকেই লোপামুদ্রা উদাসীন, ভোগস্পৃহাহীন, তপস্বী স্বামীকে অকপট ভাষায় নিজের কামনা ব্যক্ত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে যে আক্ষেপের সুর, বেদনার অভিব্যক্তি তা একান্ত ব্যক্তিগত হয়েও যেন তামাম নারীত্বের আকুতিরই বহিঃপ্রকাশ।

ভোগাকাঙ্গ্ক্ষী মর্তলোকের জীবনের ধর্মসম্পর্ক বহির্ভূত কামনা-বাসনার যে দিকগুলি পরমার্থকামী ঋষিরা বর্জন করে চলার চেষ্টা করতেন, অথর্ববেদের মন্ত্রগুলি সেগুলিরই বহিঃপ্রকাশ। বস্তুত কামপ্রসঙ্গ বহু সূক্তের বিষয়বস্তু। অথর্ববেদে, যৌন-অযৌন যে কোনো কামনা সকল দেবতারও বড়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অগ্নির সঙ্গে অভিন্ন!

পৃথিবীর প্রাচীন সাহিত্যগুলির মধ্যে একমাত্র চীনের সাহিত্যেই অবিচ্ছিন্ন ভাবে প্রেমের কবিতার ধারা প্রবহমান। প্রবাদ আছে, কনফুশিয়াস নিজে চীনের প্রাচীনতম কবিতা-গ্রন্থ শি চিঙ্-এর সংকলন করেছিলেন। আবার, তিনি নাকি শি চিঙ্-এর প্রেমের কবিতাগুলি বারবার পড়ার জন্যে  তাঁর ছেলেকে উত্সাহ দিতেন, বলতেন এগুলি যে পড়ে না তার ভবিষ্যত্ অন্ধকার। এও বলতেন যে এদের মধ্যেই সমস্ত রহস্যের চাবিকাঠি আছে। এগুলি পড়লে কেউ হয়তো স্বর্গে পৌঁছতে পারে, কিন্তু এদের বাদ দিয়ে স্বর্গে পৌঁছানো অসম্ভব। তবে শি চিঙ্-এর কিছু কিছু প্রেমের কবিতা এক কথায় লোক-সঙ্গীত এটাও ঠিক। চীনা প্রেমের কবিতায় কাম ও প্রেমের কোনো নির্দিষ্ট গন্ডি খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, সরাসরি যৌন কল্পনা ও তার প্রতীক ব্যবহারে চীনাদের কোনো দ্বিধা বা কুণ্ঠা নেই, নেই যৌনতাকে উপজীব্য করার বিন্দুমাত্র প্রচেষ্টা। এ ব্যাপারে তাদের মাত্রাবোধ ও ভারসাম্য লক্ষণীয়! চীনের সাহিত্যে কবির সংখ্যা যেমন প্রচুর, প্রেমের কবিতার সংখ্যাও গণনাতীত! এমন কোনো উল্লেখযোগ্য কবি নেই যিনি প্রেমের কবিতা লেখেন নি। চীনে সাধারণত উচ্চ ও সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তানরাই কবিতাপ্রেমী এবং উল্লেখযোগ্য কবি। হান বংশের সম্রাট উ তি এবং কাও তি বরাবরই উচ্চ মানের কবি হিসেবে স্বীকৃত।

প্রেম পর্যায়ে জাপানী ও চীনাদের মানসিকতায় একটা মিল থাকলেও তার প্রকাশভঙ্গিতে বেশ অমিল। চীনা কবিরা ভাবপ্রকাশে একটা লাগাম মেনে চলে, অপরদিকে জাপানী কবিতায় সংযমের চুলচেরা হিসাব পরিলক্ষিত হয় এবং এতে স্বাভাবিক স্বতঃষ্ফুর্ততা ব্যাহত হয়। ফলে উচ্চাঙ্গের কবিতা সৃষ্টির দ্বার রুদ্ধ হয়ে পড়ে। জাপানী কবিতায় এই সংযমের বেড়াজালের জন্যে হৃদয় যেন কঠোর শাসনে তার চাঞ্চল্য হারিয়ে ফেলেছে। জাপানীদের আকর্ষণ সুরের চাইতে ছবির মধ্যেই নিবদ্ধ। যদিও চীনা কবিতায় সুর ও ছবি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু জাপানী কবিতায় ছবিরই প্রাধান্য। আর কবিতায় প্রতীক ব্যবহার আর কৌশলী শিল্পের মুখ্যতার কবিতার পূর্ণ রস অনুভব করা কঠিন।  কোকিন শুর কবিতাগুলি তার প্রমাণ। তাই প্রেমের সর্বব্যপী আবেগ প্রকাশ করার ক্ষেত্রে জাপানী হাইকু কবিতাগুলি ঠিক উপযুক্ত নয়।

গ্রীক লিরিক সাহিত্যে প্রেমের কবিতার প্রাচুর্য সত্ত্বেও সত্যিকারের প্রেমের কবিতার সংখ্যা অতিশয় কম, এটা আশ্চর্যের। নর-নারীর যৌনসম্পর্ক বা কামকে গ্রীক হৃদমূল্য দিতে পারেনি। সে জায়গায় স্থান পেয়েছে নর ও নর অথবা নারী ও নারীর ঘনিষ্ট সম্পর্কই সত্যিকারের গ্রীক প্রেমের মূল ভিত্তি। এ যেন সমকামিতার জয়গান। বস্তুত সেই কারণেই নারীর মনস্তত্ব ও হৃদরহস্য সম্পর্কে গ্রীক কবিদের জ্ঞান বোধহয় এত সীমাবদ্ধ আর নরনারীর প্রেমের অনুভূতির ব্যপারে তাঁরা এতখানি উদাসীন।

চলবে…

স্যার

শৈশব, কৈশোর, যৌবন এবং প্রৌঢ়ত্বের প্রান্তে আসা ইস্তক স্যারেদের যে সব স্মৃতি ভীড় করে থাকে তার অধিকাংশই খুব মধুর নয়। আমার মতন বহু ছাত্র-ছাত্রীর জীবনেই তা অনুভূত হয়েছে এবং গুমরে মরেছে কিছুদিন তারপর হতাশ হয়ে মেনে নিয়েছে  ভবিতব্য বলে। এর মধ্যে সবচেয়ে পীড়াদায়ক কারণটি হ’ল ‘পক্ষপাতদুষ্টতা’। যেখানে ১৯ ও ২০র ছোট ব্যবধানটা বেড়েই চলে এবং এতে কি রসায়ন কাজ করে তা স্যার নামক ঈশ্বরই জানেন। গুরু ও শিষ্যর সম্পর্ক যত নিবিড় হয় ততই সামগ্রিকভাবে তা বহু ছাত্র-ছাত্রীকে প্রভাবিত করে। এর ফলশ্রুতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন। একটি ক্লাসে দু-তিন-চারটি ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকের বেশি মনোযোগ প্রাপ্তির কারণে পরীক্ষায় খুবই ভাল ফল করল অথচ ওই ১৯-২০র মধ্যের অনেকের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ না দেওয়ার কারণে এবং একটু মেধার তফাতে থাকা ছাত্রকুলের প্রতি অন্তত: নূনতম মনোযোগের অভাবে কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ফল ভাল হ’ল না। গাধাকে পিটিয়ে ঘোড়া বানানোর কারিগর কোথায়? সেই ধৈর্য, মানসিকতার শিক্ষক হাতে গোণা, কি অতীতে, কি বর্তমানে! ঘোড়াকে আরও চকচকে, আরও চনমনে করে তোলার দিকেই তাঁদের আগ্রহ। তাই বেশীরভাগই স্কুলবাড়ি, স্কুলের মাঠ, গাছ-গাছালি, বন্ধুবান্ধব এই সব সুখ স্মৃতি রোমন্থন করে জারিত হয়।

কেদার ভাদুড়ী কে ডাকতাম ‘কাকামনি’ বলে। তিনি আমার স্যার, প্রকৃত মেন্টর। এক আশ্চর্য মানুষ! পড়া শুরুর আগে, মিনিট দশ পনের বিশ্বের নানা বিষয়ে আলোচনা করতেন। বা সদ্য লেখা  একটা কবিতা পকেট থেকে বের করে নিজেই পড়ে শোনাতেন। কিছু বুঝতাম, কিছু বুঝতাম না। না, বোঝাবার দায়িত্ব তিনি নিতেন না। কখনো কখনো দু-একটা কবিতা আমাকে দিয়েও দিতেন নিচে নাম সই করে। কি হাতের লেখা! যেন মুক্তো ঝরে ঝরে পড়ছে!

দাদা আমার স্কুলের রেজাল্ট এবং বিশেষ করে ইংরেজি বিষয়ের উন্নতির বহর দেখে ‘কাকামনি’ কে অনুরোধ করেন আমাকে বাড়িতে পড়ানোর জন্যে। বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি ব্রিটিশ আর্মি তে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে যে তিনটি যুদ্ধ জাহাজ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ(Mutiny) করেছিল সেই জাহাজগুলির একটিতে ছিলেন কেদার ভাদুড়ী । যুদ্ধফেরতা তিনি আমাদের স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। পঞ্চম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণী অবধি ইংরেজি পড়াতেন। সময়ে সময়ে, নির্ধারিত শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে বাংলা, ইতিহাস ভূগোল ও যোগ্যতার সঙ্গে পড়াতেন। আমাদের স্কুল ছিন্নমূল উদ্বাস্তু এলাকায় অবস্থিত ছিল এবং বেশীর ভাগ ছাত্ররাই আসত্‍ গরীব পরিবার থেকে। বহু ছাত্রই তার দ্বারা  উপকৃত হয়েছিলেন।

আমার সে বছর নবম শ্রেণীতে উত্তরণ হয়েছে। আমাদের বাড়ির সুবাদে ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমাকে চিনতেন। এক কথায় রাজি হয়ে যান। আমাকে পড়ানোর নির্দিষ্ট সময় থাকলেও তার প্রায়ই হেরফের হ’ত এবং তিনি তা আগাম জানিয়েও দিতেন। প্রথম দিন পড়াতে এসেই আমাকে সুন্দর একটা ডায়েরী দেন, বেশ মোটা। প্রথম পাতায় গোটা গোটা করে আমার নাম লিখে দেন....প্রথমেই বাবু...সম্বোধন করে। আর নির্দেশ জারী করেন এই বলে যে, প্রতিদিন দশটি করে নতুন ইংরেজি শব্দের প্রতিশব্দ ডিক্সেনরী থেকে খুঁজে বের করে শিখতে হবে, আর সেই মোটা ডায়েরীতে লিখতে হবে। তিনি দেখতেন এবং তাতে আরও শব্দ সংযোজিত হ’ত। প্রতি পাতার শেষে থাকতো তারিখ সহযোগে তার অমূল্য স্বাক্ষর! ইংরেজি ভাষার পাঠ্যবই ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ের চর্চাও চলত। মাসখানেকের মধ্যেই নিজেই নিজের উন্নতি বুঝতে পেরেছিলাম। কেমন জানি নিজের ওপর আস্থাও বেড়ে যাচ্ছিল। ও কথা কাকামণি কে বলতেই বলেছিলেন, ‘ওই আস্থা, বিশ্বাস যাই বল না কেন, ওটা বাড়ানোই আমার কাজ, বাকিটা তুই-ই করবি।’ তারপর একটা ইংরেজি সিনেমা দেখিয়ে দিলেন রবিবার ‘এলিট’ সিনেমায়। বাবা, মা, দাদারা কাকামনির ওপর আমাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমিও স্কুলের ভীড়ে হারিয়ে যাইনি। কত ভাল ভাল ইংরেজি বই  দেখেছি...টেন কম্যান্ডমেণ্ট্স’, ‘বেনহুর,’ ‘ফিফটি ফাইভ দেজ এট পিকিং’, ‘ওলিভার টুইস্ট’, গানস্ ওফ ন্যভারণ’ আরও কত.....।

না, আমার কাকামনির গায়ে হাত তোলার কোন পাটই ছিলনা। ক্বচিত্‍ প্রয়োজন হলে চোখটা একটু বড় বড় করে আমার দিকে দৃষ্টি মেলে দেওয়া- বুক অবধি ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেত। ব্যস, পরক্ষনেই একটা হাসির কথা। গুরু-শিষ্য দুজনেই অট্টহাসিতে মেতে উঠতাম। 

এহেন মানুষেরও  রুদ্রমূর্তি আমি দেখেছি। হাফইয়ার্লি পরীক্ষার আগের শেষ রবিবার। সকাল নটায় কাকামণি পড়াতে এসেছেন। চুপচাপ ছন্দপতন। টুক করে একটা ছোট্ট ইটের কুঁচি এসে আমার পিঠে লাগল। বেশ বুঝতে পারলাম রাস্তা থেকে তাক করে কেউ মেরেছে। চমকে উঠেও আবার সামনের খাতায় মন দিলাম। পরপরই আরও দুটো কুঁচি এসে পিঠে লাগল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কাকামনি চকিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজা খুলে একেবারে রাস্তায়। এবার যার হাত ধরে টানতে টানতে ঘরে ঢুকলেন সে আমারই বন্ধু, বাচ্ছু, পাশের বাড়িতেই থাকে। ইতিমধ্যেই বেচারা দুটো বিরাশী সিক্কা হজম করে ফেলেছে। আমি কাকামনির পায়ে পড়ে গেলাম। আর তাতেই বেচারা রক্ষা পেয়ে গেল। হাত ছাড়া পেতেই এক ছুটে ঘরের বাইরে। আমি এরপর অপার বিস্ময়ে কাকামনিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আপনি দুম করে মেরে দিলেন?’ সেই পরিচিত হাসি আর উত্তর, ‘দেখলি তো, কোথায় পড়ে রে ছোকরা?’ আমি একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নাম বলতেই মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলতে লাগলেন, ‘দেখবি ওটা এবার মানুষ হয়ে যাবে।‘…..সেই বাচ্ছু আজ আমেরিকায়, লব্ধপ্রতিষ্ঠিত এক ইঞ্জিনিয়ার।

কাকামনি আজ আর নেই। রজনীগন্ধার মতন অগোচরে থেকে আমার রজনী কে ভরে তুলেছেন তাঁর সৌরভ-গৌরবে।

আর্তি

ইএম বাইপাসে ট্র্যাফিক জ্যাম একটা নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। তার ওপর যোগ হয়েছে মেট্রো রেলের কাজের জন্য রাস্তা সংকোচন। নিত্যযাত্রীদের এটা এখন গা সওয়া ব্যাপার। তারা টাইম ম্যানেজমেণ্টের আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু অসুস্থ, মরণাপন্ন রুগীদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স-এর তো হুটার,ঘূর্ণায়মান নীল আলোই শুধু সম্বল। অ্যাম্বুলেন্স প্রচণ্ড শব্দে হুটার বাজিয়েই চলেছে। রুগীর মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। চোখ দুটোর মধ্যে অদ্ভুত ধরনের এক আশঙ্কার ছায়া ঘুরে ফিরে যাচ্ছে। অস্থির এবং বিপজ্জনক ভাবে স্যালাইন লাগানো হাতটা ওঠানোর চেষ্টা চলেছে।মুখোমুখি সিটে বসা আলুথালু ভদ্রমহিলার নিরন্তর প্রয়াস চলেছে তাকে শান্ত রাখার। হুটারের তীব্র আর্তনাদে আশেপাশের বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীদের হৃদকম্প উপস্থিত। মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। তা কিন্তু ট্রাফিক পুলিশকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করছে না। তিনি তখন ত্রিস্তর আলোর নীতিতে আটকে রয়েছেন। এতে কি রুগীর প্রাণ আটকে থাকে? 

অ্যাম্বুলেন্স-এ হুটার বাজানোর স্বপক্ষে যুক্তি থাকতেই পারে। রাস্তা খালি পাওয়া যায়, যদি মেলে কিছু বাড়তি সহানুভূতি।কিন্তু ট্র্যাফিক জ্যাম, মিছিলে পড়লে? রাস্তা না খুললে কি গাড়ির মাথায় মাথায় চড়ে এগিয়ে যাওয়া যায়? দু-একবার হুটার বাজালেই তো ট্র্যাফিক পুলিশের গোচরে ব্যাপারটা আসে না! তার ওপর এম্বুলেন্সের মাথায় লাগানো আলোর ঝলকানিও তো অবস্থার গুরুত্ব জানান দেয়। তাই না কি?

এই সব আপত্‍কালীন অবস্থার জন্য আলাদা লেন করার জায়গার অপ্রতুলতা থাকতেই পারে। লাল আলোকে সবুজ করে উদ্ভূত অবস্থা সামাল দেওয়া যায় না? মন্ত্রী-আমলাদের যাতাযাত-এর সময় আগাম খবর থাকার দরুন সেই রাস্তা একমুখী হওয়া সত্তেও হুটারের শব্দ সহযোগে আরক্ষাবাহিনী সমেত লাইন দিয়ে গাড়ি চলার পথ সুগম করে দেওয়া হয়। বাদবাকি আমজনতা জ্যামের পর ঘ্যাম লোকদের কল্যাণে পরিস্থিতির চাপ নিতে নিতে দু-চারটে কটু কথা যে বলে না তা নয়। কিন্তু ব্যস, ওই পর্যন্তই। এ পোড়া দেশে চিকিত্‍সা পাওয়ার আগেই যে ভোগান্তি রুগীদের কপালে জোটে তা অহরহ দেখে শুধুই দীর্ঘশ্বাস পড়ে। এটা ভীষণ ভাবে ভাবায়। ভাবতে বলি অনেককেই, যদি আর কোনও বিকল্প ব্যবস্থা মাথায় আসে, সীমিত ক্ষমতার মধ্যেই...।

সাহিত্যে অশ্লীলতা

আজকের আলোচ্য বিষয় প্রসঙ্গে প্রথমেই যে কথাটা মনে আসে তা হ’ল, মুক্ত মনের আনন্দ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে সৌন্দর্যকে প্রমাণ করা যায় না। মুক্ত মনের আনন্দের অভিব্যক্তি আসে পবিত্রতা থেকে। এ সৌন্দর্যরস এক চমত্কা্রিত্ব। তাই রাজ শেখর বসু বলেছিলেন, ‘লেখক, কবিকে বাকশৌচ, মনঃশৌচ ও নির্দোষতা অভ্যাস করতে হবে। তবেই সার্থক রসসাহিত্যের সৃষ্টি হবে।’ এই নির্দোষতা বোধকেই মূলতঃ সৌন্দর্যবোধ রূপে ব্যখ্যা করা হয়ে থাকে সংস্কৃত সাহিত্যে। এতে নির্দোষতা বোধে শৃঙ্গার রসের নানা বৈচিত্রপূর্ণ আখ্যানেরও সুন্দর বর্ণনা আছে। কলুষতামুক্ত সৃষ্টি অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে না।

রবীন্দ্রনাথ ‘সত্য ও সুন্দর’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘মানুষের আপনাকে নিয়ে বৈচিত্রের লীলা সাহিত্যের কাজ। সে লীলার সুন্দরও আছে, অসুন্দরও আছে।....যা আনন্দ দেয় তাকে মন বলে সুন্দর। আর তাই সাহিত্যের সামগ্রী। কি দিয়ে সৌন্দর্য বোধকে জাগায় সে কথা গৌণ।’ তাই, যে সাহিত্যে লাবণ্যময় রূপ নেই তা অসুন্দর বা অশ্লীল। এই স্পর্শকাতর ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ ‘কড়ি ও কোমল’-এর ‘চুম্বন’ কথাটিকে আড়ালে রেখেও মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে রোম্যানটিক রূপ দিয়েছেন....:

অধরের কানে যেন অধরের ভাষা

দোঁহার হৃদয় যেন দোহে পান করে

গৃহ ছেড়ে নিরুদ্দেশ দুটি ভালোবাসা

তীর্থযাত্রা করিয়াছে অধর সঙ্গমে।


আবার সুনীলের কল্পনায় বাস্তবের নারী রূপান্তরিত হয়ে যায় ‘নীরা’ তে। আর ‘নীরা’কে মাধ্যম করে রোম্যানটিক ভালোবাসা প্রস্ফুটিত হয় বিভিন্ন দৃষ্টিকোনে, যেমন :

আমি গৌতমবুদ্ধকে একবার মাত্র একবার

নীরার মুখ চুম্বনের অধিকার দিই

অন্ততঃ ওরা দুজন কয়েক মুহূর্তের জন্য আনন্দের পতাকা

তুলে ধরুক।

এই ভেবে আমি পাশ-বালিশের মতন জড়িয়ে ধরি ঘুম।


আপাতদৃষ্টিতে রক্ষণশীল হিসেবে প্রতীয়মান না হলেও কিছুটা ছুঁতমার্গীয় দর্শনে আস্থাশীল বলে কালি ও কলম মহলে প্রতিবেদকের পরিচিতি। বহমান কালের সঙ্গে হয়তো বা সেই কারণেই সন্ধি স্থাপনে অনাগ্রহী। এটা হয়তো বা প্রতিবেদকের ব্যর্থতা অথবা বন্দিত্ব :

আমার এই বন্দীদশা

সেও তো তোমার

না, বলব না, বিশ্বাস করো

কিছু বলব না

আমাকে শুধুই সঙ্গ দাও

আর ছায়া …….......

তোমার শরীরে আমার সব কান্না শুষে নাও।


এখানে রক্ষণশীল চাপে দেহগত মিলনে কোনো যৌনধর্মী শব্দের প্রয়োগ হল না। অথচ সুনীল কেমন ‘নিরা’র বেলায় সাবলীল। এই হোচ্ছে সুনীল...আমাদের সুনীল। 

আসলে কবিতার অনুভূতিতে যদি থাকে আমারই ব্যথা, আমারই প্রত্যাশা যা আমার গভীরে নিজেরও আয়ত্বে ছিল না এতকাল, সে কবিতাই হয়ে উঠতে পারে আমার প্রেয়সী, আমার সহযোদ্ধা, আমার নিজস্ব দর্পণ। সেই কবিতাই কবি হিসাবে আমার হৃতপিণ্ডের কাছাকাছি এক দায়বদ্ধতার সৃষ্টি। কাব্যের অপরিহার্য অঙ্গ। কবির অন্তর্জগতের  অনুভূতির এই জোয়ারের ভাষার প্রকাশ কে অনেকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। কিন্তু অশ্লীলতার সংজ্ঞা কি আজও নিরুপিত হয়েছে?

সময়ের দ্রুতগতি ও অস্থিরতা

মোটর সাইকেলটা ঝড়ের বেগে ছুটে এল। আমাদের পাড়ার মুখার্জী বাড়ির মেজ বউ ও তার ষোড়শী কন্যা রাস্তার দু-ধারে ছিটকে পড়ল। সমান গতিতে তীব্র হর্ন সমেত ওদের মাঝখান দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল মোটর সাইকেল আরোহী। দুকানে মোবাইলের তার ঝুলছে। তিনি এখন স্বপ্নরাজ্যে। আমি ছুটে গেলাম মা ও মেয়ের কাছে। তাদের আঘাত যতখানি না দেহে, তার শতগুণ মানসিক। দুজনেই রাস্তা থেকে উঠে আমাকে দেখে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠল, ‘দেখলেন আমাদের গায়ের ওপর দিয়েই চালিয়ে দিচ্ছিল। আমরা দুজনে দু-দিকে ছিটকে না গেলে কি হ’ত বলুন তো? আমি উত্তেজিত, ‘সবটাই তো আমার চোখের সামনে ঘটলো। আমারই তো হাত-পা কাঁপছে। এরা সব কোন গ্রহের মানুষ? কোনই ভ্রুক্ষেপ নেই। একই গতিতে বেরিয়ে গেল! কালে কালে কি সব হচ্ছে বলতো মেজোবউ?’ এ তো গেল দু-চাকায় উপবিষ্ট দানবের কীর্তিকলাপের চাক্ষুস অভিজ্ঞতা। আছে, আরও আছে।

এবার আসা যাক ত্রিচক্র যানের চালকদের গতির প্রকৃতি। গড়িয়া থেকে বারুইপুর যাচ্ছি অটোতে চেপে। প্রথমে কিছুটা ধীর গতি, অবশ্যই যাত্রী ধরতে। তারপর সিটে বসে থাকাই দায়। সাঁই সাঁই করে করে এপাশ ওপাশ দিয়ে বড়, ছোটো সব গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে আর আমি ভয়ে শিউরে শিউরে উঠছি। সহযাত্রীরা অবাক বিস্ময়ে পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছেন। প্রতিবাদের ভাষা স্তব্ধ। আমি আর থাকতে না পেরে আস্তে চালানোর কথা বলতেই বেশ জোরেই হেসে উঠল অটোচালক। হাসতে হাসতেই ওর কটাক্ষ, ‘কাকু, ভয় পেলে চলে!গতিই না থাকলে ঠিকঠাক পৌঁছবেন কি করে? আর আমারও তো ট্রিপ বাড়বেনা।’ বুঝলাম বর্তমান গতিময় জীবনের ছোঁয়াচে রোগে এও সংক্রামিত। তারপর সেই একই গতিতে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে ভাড়া মেটাতে যেতেই আবার তার হাসি। বাকী পয়সা ফেরত্‍ দিতে দিতে আমাকে এই বলে আশ্বস্ত করল, ‘একদম ভয় পাবেন না। এ শর্মার হাতে পড়লে গাড়ি আলাদা প্রাণ পায়।’ ওই বাঁধনছাড়া গতিতে সেই গাড়ি বিশেষ প্রাণ পেলেও এর ঠিক দু-দিন বাদেই রাজপুরের কাছে এক দুর্ঘটনায় বেঘোরে প্রাণ গেল দুই অটোযাত্রীর, বাকীরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় আহত। ঘটনাটা এ ক্ষেত্রে কাকতালীয় হলেও এটাই এখন বাঁধনছাড়া গতির নিত্যনৈমিত্তিক ফসল।

চারচাকা গাড়ির বিশেষ করে পয়সাওয়ালা বাবাদের ইঁচড়ে পাকা ছেলেদের হাতে গাড়ি পড়লে কি হয় তা ই এম বাইপাসের দুর্ঘটনার সালতামামি থেকেই পরিষ্কার। এই প্রসঙ্গে চারচাকা/ছয়চাকা গাড়ির গতি-প্রকৃতির একটি অভিজ্ঞতা প্রসূত উদাহরণ না দিলেই নয়। বেলেঘাটা বাইপাস থেকে এখন রাস্তায় যে সাদা ছোট গাড়িগুলো বেরিয়েছে তাতে চড়েছিলাম। গন্তব্য গড়িয়া বাস ডিপো। গাড়িতে ওঠার পর থেকেই আমি আর হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়াতেই পারছি না। বাসের সমস্ত যাত্রীরাই এ ওর গায়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন। সামনের সিটে বসে থাকা এক ভদ্রমহিলা, কোলে ছোট্ট শিশু, জানালার রড আঁকড়ে নিজেদের স্থির রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আর ক্রমাগত আর্তনাদ করছেন, ‘ভাই, একটু আস্তে চালান-পড়ে যাব যে।’ এর পর আমি এবং বাকী যাত্রীরা হৈ হৈ করে উঠলাম। একজন যাত্রী ভীড় সরিয়ে ড্রাইভারের পিছনে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে বলে উঠল, ‘এক্ষুনি বাস থামান বলছি।’ কিন্তু কে কার কথা শোনে। স্টপেজ আসলে প্রায় ধাক্কা দিয়ে রাস্তার মাঝখানে যাত্রী নামিয়েই আবার সেই দুরন্ত গতি। টার্গেট সামনের আর একটি সাদা বাস। হয় সেটি একই রুটের নয় অন্য রুটের হলেও যাবে প্রায় একই রাস্তা ধরে। বাসের ভিতর সমস্বরে প্রতিবাদী ঝড়ের মুখে বাসের ঝোড়ো গতি স্তিমিত হ’ল। স্তিমিত হতে হতে শম্বুক গতিতে পরিণত হ’ল। আবার বাসে ঝড় উঠল, ‘কি হ’ল দাদা, এই ভাবেই কি বাস চলবে নাকি?’ ড্রাইভার সাহেব সামনের দিকে তাকিয়ে চড়া সুরে বলতে লাগলেন, ‘বাসসুদ্ধ হার্টের পেশেণ্ট থাকলে বাস এই ভাবেই চলবে।’ বুঝুন, দুদিন আগেই এ এম বাইপাসের ধারের খালে বাস পড়ে যাবার ঘটনা ইতিমধ্যেই অবসৃত। ওদের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমার আপনার গতিকে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে। শুধু দ্রুতগতি ও অস্থিরতা সমাজের একটা শ্রেণীর প্রতিটি কার্যকলাপকে কী ভয়ংকর ভাবে কব্জা করে ফেলেছে! শুধু ছুটে চলো নইলে পিছিয়ে পড়তে হবে এই অজানিত ভয়ই তাদের ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে। মাঝে মাঝে ধীর গতি, হার মানা? নৈব নৈব চ। আমিই এক নম্বরে থাকবো তাই আমাকে প্রাণপনে ছুটে চলতে হবে। চলার পথের সংগীদের কথা ভাববার সময় কোথায়? পূজোর সময় বাবা, মা, ভাই-বোনেদের ধুতি-পাঞ্জাবী, শাড়ী, জামা-কাপড় দেওয়াটাই আমাদের সমাজে চলে এসেছে। এখন আমার ভাইপো, আই টি সেক্টরের বড় চাকুরে, তার কাকীকে গেল পূজোতে একটা প্লাজমা টিভিই উপহার দিয়ে ফেললো। আমার স্ত্রী বিগলিত হয়ে সে কথা বলতেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছিল, ‘Earn money,burn money.’ 

আর একটি অভিজ্ঞতার কথা বলেই সময়ের দ্রুতগতির উদাহরণের ইতি টানবো- এ নিয়ে সহস্র পৃষ্ঠার রচনার অবকাশ থাকা সত্বেও। বাবার অকাল মৃত্যুতে নিয়মমাফিক ভাবে তাঁর মেয়ের চাকুরীর ব্যবস্থা হ’ল। ভাল মেয়ে। বাংলায় অনার্স গ্রাজুয়েট। সংসারে মা ও ছোটবোন। মায়ের চাকুরীর বয়স পেরিয়ে যাওয়ার দরুন মেয়েরই চাকুরী প্রাপ্য হ’ল। যেহেতু মেয়েটির বাবা ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত তাই স্বাভাবিক কারণেই আমি বেশ খুশী। কিন্তু আমার এই খুশী যে এত ক্ষণস্থায়ী হবে তা কে জানত! ড্রেসকোড নিয়ে আমি অতি সচেতন না হলেও সচেতন। চাকরিতে জয়েন করার দু-চার মাসের পর থেকেই ওর পোশাক-আশাক, চালচলন-এর বহর দেখে অফিসের সবার চক্ষু চড়কগাছ। অফিসের কাজে কাগজপত্র, ফাইল নিয়ে আমার ঘরে  ঢুকলে আমিও অপ্রস্তুত হই। ওইটুকু মেয়েকে আমি কি বলব? এর মধ্যেই ওর মায়ের ফোন এল। ওর চালচলন নিয়ে বাড়িতে অশান্তি চলছে। ও নাকি বাড়ি ছাড়ার প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েছে। তাই বাধ্য ওকে ঘরে ডেকে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ও একটা ইংরাজী দৈনিকের পাতা খুলে আমার চোখের সামনে মেলে ধরে বলল, ‘দেখুন স্যার, আমি পেজ-কোর এর মেম্বার হয়ে গেলাম।’ কিছুই বুঝলাম না। চোখের সামনে ঘুরতে লাগল কিম্ভুতকিমাকার স্বল্পবসনা কিছু উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের ছবি। সেই ভীড়ে ওকে না খুঁজেই আমি ‘ও তাই বুঝি’ বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে প্রায় এক ছুটেই অফিসের বাইরে চলে এলাম, অত্যন্ত দ্রুতগতি ও অস্থিরতার সঙ্গে।

অফিসের সামনের বাগানে পায়চারি করতে করতে মনটা একটু শান্ত হ’ল। সত্যিই তো, সবাই তো ছুটছে ভবিষ্যতের জন্যে। ছুটছে তো ছুটছেই। ছুটতে শিখেছে কিন্তু কোথায়, কখন থামতে হবে সেই গতির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা তাদের একেবারেই নেই। তাই হুমড়ি খেয়ে পড়ার বহু দৃষ্টান্ত আছে। মনে পড়ে যায় টি॰এস॰এলিয়টের সেই বিখ্যাত লাইন কটির কথা, ‘What shall i do now? What shall i do? I shall rush out as I am, and walk the street with my hair down so? What shall we do tomorrow? What shall we ever do? The hot water at ten and it rains, a closed car at four and we shall play a game of chase pressing lidless eyes and waiting for a knock upon the door.’

আরও মনে পড়ে যায় কবি নীরেন চক্রবর্তীর জীবনের যাত্রাপথের বিখ্যাত ও সময়োচিত কয়েকটি লাইন, ‘প্রশ্ন জাগে কিসের জন্যে এতটা পথ ছুটে এলাম। বুঝিনা ঠিক কার বিরুদ্ধে এত যুঝি? উড়িয়ে দিয়ে সকল পুঁজি কাকে পেলাম? প্রশ্ন জাগে কিসের জন্যে এতটা পথ এমন করে ছুটে এলাম।’

প্রতিবেদকের মনেও এ প্রশ্ন জাগে। এ প্রশ্ন নিশ্চয়ই জাগে আরো অনেকের মনে। উত্তর-ও বোধ হয় একটাই। সেটা হ’ল ‘সময়ের কান্না’।

বাবা

আজকের প্রসঙ্গ বাবা। অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। মাযের প্রসঙ্গে লিখতে গেলে বাবা সেখানে খুবই কম ঘোরাফেরা করেন। কিন্ত বাবাকে নিয়ে কিছু লিখতে গেলে মা এসে পরবেনই পরবেন। যেমন বাবা হচ্ছেন পরম নির্ভরতার জায়গা, মা হচ্ছেন আশ্রয়স্থল। অঙ্কুরিত থেকে পৃথিবীর আলো দেখা থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি স্তরে মা সেই জায়গাটা একচেটিয়া করে রেখেছেন। বাবা সংসারের কর্তা, এটা জ্ঞান হওয়া ইস্তক আমরা জেনে এসেছি। আমাদেরও সেটা বোঝানো হয়েছে, যেখানে মুখ্য ভূমিকা ছিলো মাযের। ‘সন্ধ্যের আগে বাড়ি ঢুকতে হবে’, ‘পরীক্ষা এসে গ্যাছে, এখন সিনেমা ,আড্ডা বন্ধ’, ‘ওই বখাটে ছেলেটার সঙ্গে মেশা বারণ’ ইত্যাদি ইত্যাদি এ সবই মা মারফত বাবার নির্দেশ। এ সব অনুশাসন এর অন্যথা হলে সেই আশ্রয়স্থল মা।নিজের শরীরে আঘাত হজম করেও তিনি শেষ রক্ষা কর্তা। প্রতিবেদক কে বাঁচাতে গিয়ে প্রায়শই  শাঁখা ভাঙ্গার কারণে তার মাকে সর্বক্ষণের জন্যে সোনা বাঁধানো শাঁখা পরতে হতো, অমঙ্গলের আশঙ্কায়। তাও মা বাবার পক্ষ নিতেন। বাবার রাগের স্বপক্ষে যুক্তি দেখিয়ে আমার ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা থাকতো নিরন্তর। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাযের জিত্‍ হতো। আর বাবার শাসনের সুফলটা পুরোপুরি ভোগ করেছি আমি। বাবা কি সন্তানকে শাসন করে সুখ পান? মোটেই না। দ্বিগুন কষ্ট পান। শাসন প্রক্রিয়ার পর পরই একটু সঙ্কোচ বোধ আসে, নিজেকে গুটিয়ে নেন। বহুসময় অভুক্ত থেকে শয্যা নেন।মার রাগ গিয়ে পড়ে সন্তানের ওপর। এ প্রসঙ্গে নিজের ঝুলি থেকে একটা ঘটনার উল্লেখই যথেষ্ঠ। বাবার সাধের ডোআর্কিন-এর হারমোনিয়মের ওপরের কাঁচে বাবার নাম সোনার জলে লেখা ছিল। এক কথায় বাবার প্রাণ ছিল সেই হারমোনিয়ম। একমাত্র বড়দির,(যার ওপর বাবার স্নেহের মাত্রাটা একটু বেশীই ছিল) সেটিকে ব্যবহার করার অনুমতি ছিল। বড়দি গানও করেন অসাধারণ। যাই হোক, একদিন সেই হারমোনিয়ম তাড়াহুড়ো করে নামানোর সময়  ওপরের কাঁচটায় চিড় ধরে যায়। দিদি ভীত হয়ে পরে। আর আমিও তার সাক্ষী হয়ে যাই। ব্যস্ বড়দি আর যায় কোথায়। এরপর আমি বড়দিকে ব্ল্যাকমেল করতে লাগলাম-বাবাকে বলে দেবার ভয় দেখিয়ে। বড়দিও এটা-সেটা দিয়ে আমার মুখ বন্ধ করে রেখেছিল বেশ কিছুদিন। এরপর একদিন দরকষাকষির সময় বাবা সেখানে উপস্থিত। বড়দি আমাকে নিয়ে সরে পরার মূহুর্তে বাবা খপ করে ওর হাতটা ধরতেই বড়দি ভ্যাঁ করে কেঁদে সবিস্তারে সব বলতেই বাবা মুষ্টি বদল করে আমাকে নিয়ে পড়লেন। আমি কিছু বলবার আগেই ডান গালে পড়ল এক চড়, ঘুড়ে গিয়ে দেওয়ালে কপাল ঠুকে গেল। এরপর বাবার প্রস্থান। বড়দি তখন আমার শুশ্রূষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বাবা সে রাতে কিছু খান নি। বাবার পক্ষ নিয়ে মার কাছে আমাকে বকুনি খেতে হয়েছিল।  পরদিন স্কুল যাবার সময় বাবা কাছে এসে দাঁড়ালেন, আলতো করে চিবুক ধরে আমার মুখটা ভালো করে দেখলেন। বাঁ দিকের কপালটা তখন দৃশ্যত একটা বড় টোপাকুলের আকার নিয়েছে। সেখানে বাবার আলতো ছোঁযায় আমি উফ্ করে উঠতেই বাবার সস্নেহ উক্তি, ‘আজ স্কুল থাক।’ আমি মাথা নেড়ে বলি, ‘আজ ইংলিশ টেস্ট।’ চমকে উঠে আবার বাবার জিজ্ঞাসা, ‘কপালের ব্যাপারে কেউ জানতে চাইলে?’ আমি শশব্যস্ত হয়ে বলে উঠি, অন্ধকারে দেওয়ালে মাথা ঠুকে গ্যাছে।’ এরপর বাবা ধীর পায়ে শোবার ঘরে ঢুকে যান। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে আবার মার আক্ষেপ শুনতে পাই, ‘তোরা যে সব কি করিস। মানুষটা আজ মুখ ভার করেই সারা দিনটা কাটিয়ে দিলো, অফিসও গেল না!’

বয়স যত বেড়েছে, তত বাবার শাসনের যাতার্থতা অনুভব করেছি। মনে করেছি যে ওসবের প্রয়োজন ছিল এবং আছেও। কারণ তাতে ওনার সমস্ত শুভ চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিলাম আমরা। আমরা তো বাবার দুটো রূপই দেখেছি। আর একটু বড় হতেই বাবা শাসনের সঙ্গে সঙ্গে একটা কথা যোগ করতেন, ‘যখন নিজে বাবা হবে তখন বুঝবে....।’ হ্যাঁ, এখন বুঝি কতটা সত্যি সে কথা।

বাবার কথা বলতে বলতে আবার মাযের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বাবা-মায়ের শোবার ঘরের দেওয়ালে মায়ের অনেক নকশী-শিল্প কাঠের ফ্রেমে বাঁধনো দেখেছি। এই  সবই মাযের সব প্রাক-বিবাহ অপূর্ব শিল্পকীর্তি। বাপের বাড়ি থেকে চেয়ে চেয়ে নিয়ে আসা। বিবাহ পরবর্তী জীবন কেটেছে সংসারের ঘানি টেনে। বাবার কথা লিখতে গিয়ে তারই একটা চোখের সামনে ভেসে ভেসে উঠছে...

পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম

পিতাহি পরমং তপ:

পিতরি প্রীতিমাপন্যে

পিয়ন্তে সর্বদেবতা।

মেদিনীকম্প

পায়ের তলার মাটির কাঁপুনি-দলুনি কী ভয়ংকর তা আর এখন কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। এ কদিনে মানুষ তা কেঁপে কেঁপে টের পেয়েছে। পেয়েছে সমস্ত প্রাণীকুল। অবাক, বোধশক্তিহীন এক অনুভূতি। এবারের ভূমিকম্পের বাড়তি অধ্যায় হ’ল, শরীরে এক অদ্ভুত অস্বোয়াস্তি। কেমন হঠাত্‍-ই শরীর খারাপ অনুভব করা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব; এক অদ্ভুত রকমের অসহায়তা বোধ করা। আর যে দেশের ওপর দিয়ে এই প্রলয়ংকরী ধ্বংসলীলা চলল এবং তারপরেও চলেছে, তারা কিন্তু এ সব কিছু বুঝে উঠবার আগেই সব শেষ। ব্যক্তিগত অস্বোয়াস্তি সমষ্টিগত ভাবে গোটা নেপাল দেশটাকে নাঁড়িয়ে দিয়েছে। সরকারি মতে মৃতের সংখ্যা ৮ হাজারেরও বেশী। পরিসখ্যান অনুযায়ী আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে দু-হাজার। আর সার্বিক ক্ষয়-ক্ষতি অপরিমেও, অবর্ণনীয়! উচ্চ, মধ্য ও নিম্নবিত্তকে আজ এক করে দিয়েছে নাগরাজ! ওরা সবাই আজ খোলা আকাশের নীচে, পথে-প্রান্তরে, অস্থায়ী তাঁবুর আশ্রয়ে। হতচকিত, নির্বাক, নিথর, ভাবলেশহীন দু-চোখে অনুযোগ নেই, শুধুই বিস্ময়! কেন এমন হ’ল! আমরা কী অপরাধ করলাম! নেই কোনও সংকেত, নেই কোনও আগাম সতর্কবার্তা! প্রকৃতিদেবী কেন এত বিরূপ, কেন এত নির্দয়! পরমকল্যাণময়ের প্রতি বিশ্বাসে টান পড়তে শুরু করে দিয়েছে।

শৈশবে সৃষ্টির আদি রহস্য প্রসংগে ঠাম্মার কাছে শোনা সেই কাহিনীটি মনে পড়ল...পৃথিবীকে ধারণ করে আছেন যে মহানাগ, তাঁরই খেয়ালী মাথা নাড়া থেকেই সৃষ্ট হয় ভূমিকম্প। শৈশব থেকে কৈশোরের দোরগড়ায় পৌঁছানো অবধি এ ব্যাপারে ছিল না কোনও সংশয়। তারপর বয়স বাড়ার সংগে সংগে পাঠ্যবই সুত্রে সংশয়ও জাগতে শুরু করেছিল। সাপের ফণার দোলায় যদি চরাচর দুলে উঠবে তবে সমগ্র বিশ্বজুড়ে একই সংগে কম্পন হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা তো অন্য কথা বলে! তারপর বিজ্ঞানের হাত ধরে আমরা ভূমিকম্পের প্রকৃত কারণ সম্বন্ধে এখন ওয়াকিবহাল হলেও, কিছুটা অধরা রয়ে গিয়েছে প্রকৃতির এই অবগুণ্ঠিত রহস্যগুলো। বিজ্ঞানের যুক্তিগুলো সমাদৃত হলেও প্রশ্নের অতীত নয়। প্রকৃতি তাঁর অধরা রূপ সম্পূর্ণ উন্মোচনে ভারী নারাজ, ফলে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণা চলেছে নিরন্তর। প্রতিটি ভূমিকম্পের চুলচেরা বিশ্লেষণ চলেছে পৃথিবী জুড়ে, সংগে নানাবিধ ব্যাখ্যা। মহাজাগতিক মহাজাগতিক সে সমস্ত বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ছাড়াও বিভিন্ন পারমানবিক বিস্ফোরণ, অগ্ন্যুত্পাত বা অন্যান্য ভারসাম্য বিনাশকারী কারণ থেকেও ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। এর সংগে যুক্ত হয়েছে আমাদের বেশ কিছু অবিমৃষ্যকারিতা। বিশাল বিশাল জলাধার নির্মাণের সময় ভূবিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী ভূত্বক যথাযথ পরিমাপ, বিশ্লেষণ হয় না। ফলতঃ সেই জলাধারের নীচেই দুর্বল ভুত্বকের ফাটল দিয়ে জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে ভূস্তরে চাপ সৃষ্টি করে, তার সংগে জলাধারের জলের বিশালভর যুক্ত হয়। এ তো বিপর্যয়কে সাদরে আহ্ববান আর কি। অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বিশাল বিশাল বাড়ি বানানো, ভূগর্ভস্থ জলের যথেচ্ছ ব্যবহার,এই ভয়াবহতাকে আরও কাছাকাছি ডেকে আনতে পারে।

এখন সব চাইতে বড় প্রশ্ন হ’ল, এই বিভীষিকা থেকে মুক্তির পথ কি? এই মূহুর্তে ভূমিকম্পকে আটকানোর মতন সাবালক আমরা হইনি। ভূমিকম্পকে প্রতিহত করার মতন কোনও পন্থা বিজ্ঞানীরা এখনো আবিষ্কার করে উঠতে পারে নি। তবে তার পূর্বানুমান সম্ভব। সম্ভব বৈজ্ঞানিক কারিগরীকে কাজে লাগিয়ে ভূমিকম্পের ধ্বংসকে অন্তত আংশিক প্র্তিহত করা। অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ জাপান আধুনিক প্রযুক্তিতে বহুতল নির্মাণে বহুদিন ধরেই সক্রিয় আছে।

বিজ্ঞানী-গবেষকদের গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন যদি ব্যবস্থা নিতে পারে তবেই কাজের কাজ হবে। আগাম সতর্কবার্তায় মানুষ কিছুটা মানসিক প্রস্তুতি,তাত্ক্ষনিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম হবে। আশা রাখি, ভবিষ্যতে বিজ্ঞান সেই দক্ষতায় পৌঁছবে যখন ভূমিকম্পের মতন প্রাকৃতিক ঘটনাকে মানুষ নিয়ন্ত্রণ করবে।

প্রকৃতি ও রবীন্দ্রনাথ

২৫শে বৈশাখ। প্রতিটি রবীন্দ্রপ্রেমীর উদ্বেলিত হবার দিন। গানে, কবিতায়, প্রবন্ধ-নিবন্ধে, আলোচনায় ভরা থাকবে সারা সপ্তাহ। মন চায় আমিও সেই আনন্দযজ্ঞে সামিল হই। কিন্তু আশঙ্কা হয়। এই তৃণসম জ্ঞানের পুঁজি নিয়ে মহীরুহকে উপজীব্য করে কিছু লেখা! সম্পাদকীয় ‘ধরিত্রীক্রোড়’ লেখার সময় মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা, অদূরদর্শিতা, প্রকৃতির রোষানল, বিমুখতা নিয়ে অভিব্যক্তি প্রসঙ্গে হঠাত্‍-ই বিশ্বকবির কথা মনের কোণে ভেসে উঠেছিল। তিনি আজ আমাদের মধ্যে থাকলে কি ঋতুবৈচিত্র নিয়ে তার অবিস্মরণীয় অনুভূতি স্মৃষ্টির ডালিতে সাজিয়ে বিশ্বের আপামর জনগণকে মুগ্ধ অভিভূত করতে পারতেন? সেই সৃষ্টিরই এক ঝলক আজকের সম্পাদকীয়...

প্রতি বছরই প্রকৃতি তার ছয় ঋতু নিয়ে হাজির হয় ছয় ভাগে। আমরা সাধারণ ভাবেই ওই ছয় ঋতুকে উপভোগ করলেও কবি প্রত্যেক ঋতুতেই পেয়েছেন তার বিভিন্ন রূপ, রস, গন্ধ, অনুভূতি ও তার রঙ্গ । আর সেই দূরদৃষ্টির প্রকাশ হয় সুমধুর সুর, ভাষার পরিপাট্য ও তাল লয়ের সমাহারে। 

প্রখর তপন তাপে হৃদয় যখন তৃষ্ণায় কেঁপে ওঠে, সঙ্গে সঙ্গে কবির দৃষ্টি চলে যায়, ‘জানি ঝঞ্ঝার বেশে দিবে দেখা তুমি এসে...’ এই সুদূর চিন্তায় গেয়ে ওঠেন, ‘এস এস হে তৃষ্ণার জল...’ চেনা-না-চেনার নেশার বিদ্যুত্‍ ঝলকের সঙ্গে সঙ্গে মেঘ ডম্বরুর গুরু গুরু ধ্বনি কবির হৃদয়ে বেজে উঠতেই গেয়ে ওঠেন, ‘বাদল মেঘে মাদল বাজে...’। উদাস মন ভেসে চলেছে, ‘কোন সে অসম্ভবের দেশে’, যেখানে ‘নূপুর শুনে ময়ূর নেচে ওঠে’-আরও কতই না কথা, কতই না সুর। 

কবির স্বচ্ছ দৃষ্টি সুদূর প্রসারিত। বাদলের সুরের শেষ দেখতে পাচ্ছেন, ‘বেণু বনের মাথায়’ যেখানে অন্য রঙের সমাবেশ হয়েছে পাতায় পাতায়, তাই নতুন অতিথির আগমনী সুর বেজে ওঠে প্রাণে, ‘ শরত্‍ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি...’ । দেখতে পাচ্ছেন কাশের গুচ্ছ, শেফালীর মেলা, নবীন ধানের মঞ্জরী; উদাত্ত সুরে গেয়ে উঠলেন, ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ...’। তাত্ক্ষনণিক চিন্তার উদয় হয়েছে ফসল ফলাবার তাই কথা ও সুরের উদয় হল, ‘আমরা চাষ করি আনন্দে...’ সঙ্গে সঙ্গে কিসের যেন শিহরণ উপলব্ধ হল, প্রাণে জেগে উঠল ‘হিমের রাতের ওই গগনের...’, আর দেখতে পেলেন শীতের হাওয়ায় আমলকি পাতার নাচন। পরক্ষনেই দৃষ্টি পড়ল ঝরা পাতার মেলায়, ফুল ফোটাবার সমারোহে-গানে প্রাণ ভরে উঠল, ‘বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা...’। ফুল ফোটাও একদিন শেষ হবে-কবির দৃষ্টি আরম্ভের শেষ থেকে শেষের আরম্ভের দিকে ফিরে যায়-তাই বসন্তকে অনুরোধ জানালেন, ‘বসন্ত তোর শেষ করে দে রঙ্গ...’।

গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো সারলাম এই আর কী...

বাঙালীর জীবন ও নাট্যসংস্কৃতি

বাঙালীর জীবন থেকে ক্রমশঃ নাট্যসংস্কৃতি অপসৃয়মান। বঙ্গসংস্কৃতির সেই বিনোদনের চাহিদায় কি ভাঁটা পড়েছে? পাড়ায় পাড়ায়, পুজোমন্ডপে বা অন্য কোন উত্‍সব-অনুষ্ঠানেও তো নাটক আর মানুষকে সেভাবে টানে না। কেন?

নামকরা রঙ্গালয় গুলিতে এখনো বিভিন্ন গোষ্ঠী দ্বারা নাটক মঞ্চস্থ হয়। পেশাদারী বলে নাট্যালয়গুলিতে নিয়মিত নাটক পরিবেশিত হয়। সেই সব মঞ্চস্থ নাটক গুলির সমালোচনা, মূল্যায়নও প্রকাশিত হয় বিভিন্ন নামী-দামী-অনামী পত্র পত্রিকায়। ব্যস্, ওই পর্যন্তই, সবই কেমন যেন গতানুগতিক, নিয়ম রক্ষার তাগিদ, রুজি-রুটির ধান্দা। গ্রাম বাংলায়, কলকাতার বাইরের কিছু কিছু শহরের কিছু নাট্যসংস্থা, আঞ্চলিক নাটকের দল প্রচুর প্রতিকুলতার মধ্যেও এই সংস্কৃতি অল্পবিস্তর ধরে রেখেছে।

সত্যি কথা বলতে কি নাটক একটি যুতবদ্ধ চেতনাসমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ, যার মহড়ার শুরু থেকে প্রযোজনা পর্যন্ত থাকে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু মানুষের বিরামহীন চিন্তা-ভাবনা, নিরলস পরিশ্রম, কর্মতত্‍পরতা এবং আরও কিছু মানুষের উত্সাহ, উদ্দীপনা এবং হার্দিক অভিলাষ। এক সামগ্রিক সামাজিক শিল্পকলা! যা বাঙালীর সমাজ-জীবন থেকে কি সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছে?

মনে হচ্ছে যেন বাঙালী এতদিনে সত্যিই সত্যিই পেশাদার হয়ে উঠল। সেই মুক্তমনা, দিলদরিয়া, আমুদে, নাটুকে মানুষগুলো আজ কোথায় গেল? নির্মম পেশাদারী বৃত্তি তাড়ালো বাঙালীর নাটুকে ভূতটাকে। এ এক নিষ্ঠুর সত্য! পাশ্চাত্যের পেশাদারী মানসিকতার ‘পেশা’র দিকটাই আমরা সাগ্রহে হাত পেতে নিয়েছি। কিন্তু সেই পেশার সংগে গুণগত উত্কর্ষের যে সম্পর্কটা থাকে সেটা আমরা বেমালুম ভুলে গেছি, যা আমাদের ঐতিহৃবাহী সাংস্কৃতিক চেতনাকে ভেঙে চুরমার করে দিল। আমরা রইলুম নীরব দর্শক, নাটকের নয়, তার ধ্বংসলীলার। নাটক তো শুধুমাত্র বিনোদনকেন্দ্রিক নয়। এতে থাকে সমাজ বিবর্তনের ডাক, দিনবদলের অঙ্গীকার! নাটকে যেমন থাকে বাঁশির আওয়াজ তেমনি  অসির ঝনঝনানি, গোলা-বারুদ, কামানের তুমুল নির্ঘোষ।যা মানুষের মুখে মুখে ঘোরে, অচিরেই হয় কালজয়ী। কিছু গিমিক, বাস্তব বহির্ভূত আঁতেলপনা আজ আর সমাজের এক বৃহত্‍ অংশের নাট্যপ্রেমীদের আর তেমন ভাবে টানে না। আজ আর মুখে মুখে ফেরে না, ‘কলকাতা এক দুঃস্বপ্নের নগরী’, ‘টিনের তলোয়ার’, ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’, ‘কল্লোল’, ‘অঙ্গার’, ‘মারীচ সংবাদ’ এমন কিছু আলোড়ন সৃষ্টিকারী নাট্য প্রযোজনা।

সিনেমা, টিভির আগ্রাসন হেতু আজ বেশীরভাগ মানুষকেই আর সেভাবে নাট্যমুখী করা যাচ্ছে না। এ দিকে আবার বিভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক দলগুলির যা কিছু চিন্তা-ভাবনা, দিশা দেখানোর ক্ষমতা, দক্ষতা আছে, তারা সাধারণ মানুষের অন্দরের অন্তরে প্রবেশ করবার যে চাবিকাঠি, সেই নাটক, যাত্রা-পালা গানের মাধ্যমে জনসংযোগের আয়োজন, তা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হতে বসেছে।শিল্পের দাবীকে উপেক্ষা করলে এর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। 

বিগত দিনে রাজনৈতিক দলগুলি যে সমস্ত বিভিন্ন ধরনের সমাজ সচেতক নাটক, যাত্রা-পালা দর্শককুলের সামনে উপস্থিত করত সে সব শুধুমাত্র প্রচারসর্বস্ব ছিল না। বহমান জীবন থেকে উঠে আসা রূঢ় বাস্তব পরতে পরতে জড়িয়ে থাকত সেই সব প্রযোজনায়। শুধু তাই নয়, সেই সব উপস্থাপনা শুধু শিল্পরসসমৃদ্ধই ছিল না, আপামর জনগণকে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করে রাখতো।এই সাংস্কৃতিক উদ্যোগ জন্ম দিয়েছিল আদর্শ চিন্তাধারা এবং সুস্থ জীবনের জন্য সংগ্রামী মানসিকতার। কিন্তু আজ সে সব কোথায়? কোথায় বাঙালীর সেই সৃষ্টিশীলতা, সমাজ সংস্কারের উদাত্ত আহ্বান?

বাঙালীর নাটুকে নেশাই পারে সেই সুপ্ত চেতনাকে পুনরায় জাগ্রত করতে, স্বধর্মে ফিরিয়ে আনতে। নাট্যচর্চা বাঙালীর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।তাকে বিচ্ছিন্ন, অবহেলা করার অর্থ শুধুমাত্র বঙ্গসংস্কৃতির ধ্বংস সাধনই নয়, গোটা ভারতীয় সংস্কৃতিরও অপূরণীয় ক্ষতি।

ইতিহাস কি আমাদের ক্ষমা করবে?

নববর্ষ বনাম নিউ ইয়ার

নববর্ষ না নিউ ইয়ার কোন দিনটি আমাদের বেশী কাছের, এই ব্যাপারটা প্রতি নববর্ষেই মনে উঁকি দিয়ে দিয়ে যায়। যেমন ১৪২১শে মনে খচখচ্ করেছে, আবার ১৪২২-এর দোরগড়ায় এসেও সেই একই প্রশ্ন মনে হানা দিয়েছে। এ নিয়ে আমি বহুজনে প্রশ্ন রেখেছি, উত্তর এসেছে বিক্ষিপ্তভাবে, হৃদয় কাড়ে নি। 

আসলে নিউ ইয়ার ওল্ড ইয়ারের বড়দিনের আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। বড়দিনের অধিকাংশ উইস এবং কার্ড দুই অনুষ্ঠানকে জড়িয়েই আদান প্রদান হয়। চলে প্রতিযোগিতা, কে কাকে আগে উইস করবে এবং কার্ড পাঠাবে!পুরো ডিসেম্বর মাস জুড়েই যেমন কার্ড কেনার হুজুগ তেমনি সারা জানুয়ারী মাসটাই চলে যায় সেই কার্ড পেতে পেতে।

নিউ ইয়ারে রাত বারোটায় পার্কষ্ট্রীট তো আছেই, সেই সঙ্গে নানান স্বাদের, আকৃতির কেক। আসলে শীত কালের জন্যেই ফার্স্ট জানুয়ারি এডভানটেজ বেশী পায়। হই-হুল্লোড় করেও দম ফুরোয় না, ক্লান্তিও আসে না।এই দিনটি পৃথিবীর সব লোক মানে বছর শুরুর দিন হিসাবে, তাই এর প্রচারটাও বেশী। আমরা নিজেরাও তো ইংরাজী মাসটাকেই মেনে চলি(বিবাহ ও অন্যান্য শুভঅনুষ্ঠানের দিন ক্ষণ ছাড়া)। তাই তার এত প্রচার, দাপট এবং গ্রহণযোগ্যতা। কিন্তু পয়লা বৈশাখের নিদাঘ এতে বেশ কিছুটা বাদ সাধে... ‘দারুন অগ্নি বাণে রে...’। খাওয়ার আয়োজন থাকে প্রচুর-হরেক রকম, লোভনীয় এবং পাতপেড়ে, সব গরমের বাধা উপেক্ষা করে। নববর্ষের পার্ক স্ট্রীট হচ্ছে-গঙ্গার ঘাট-ভোর রাতে গঙ্গাস্নান তারপর কালীঘাটে মায়ের বাড়ি-খেরো খাতায় ছয়লাপ-দোকানে দোকানে বাঁধা কলাগাছ-সিঁদুরে চর্চিত সিদ্ধিগণেশ-জ্বলন্ত  ধুপকাঠি-হালখাতা-মিষ্টির প্যাকেট-গ্লাসে করে ঠান্ডা পানীয়/শরবত-বাংলা নতুন বছরের ক্যালেণ্ডার...। নববর্ষে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি-নতুন জামাকাপড়...উফ্ তার কি গন্ধ!

সত্যি কথা বলতে কি, ১লা বৈশাখ কখনই স্বভাবে হাই-ফাই নয়। একটু শান্ত, কোমলই তার হাবভাব। ঠাঁট-বাঁট প্রচণ্ড কিন্তু প্রদর্শনমূলক নয়।একলা বৈশাখ যেন সত্যিই আভিজাত্যে ভরা বড়ই একলা...

স্বামী বিবেকানন্দ : একটি ছোট্ট ঘটনা

স্বামী গভীরানন্দ-র ‘যুগনায়ক বিবেকানন্দ’ পড়তে পড়তে একটি ছোট্ট ঘটনার উদ্ধৃতি, বর্তমান গভীর অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সময়োপযোগী হবে, এই ভেবে, আজকের সম্পাদকীয়।

প্রথিতযশা ফরাসী গায়িকা মাদাম এমা কাল্ভে ১৮৯৪ খ্রিঃ অঃ-এর মার্চ মাসে, যখন তিনি যশের সর্বোচ্ব শিখরে অধিষ্ঠাতা, মেট্রোপলিটান অপেরা কোম্পানীর সংগে চিকাগোয় আসেন। এই নামকরা গায়িকাটি ছিলেন চড়া মেজাজী, একগুঁয়ে এবং পুরোমাত্রায় ভোগী মহিলা। স্বাভাবিক কারণেই তাঁর জীবনে শান্তি ছিল না। তিনি ছিলেন স্বামী বিচ্ছিন্না এবং তাঁর একমাত্র কন্যা ওই সময়েই আগুনে পুড়ে শিকাগোতেই মারা যায়। মাদাম কাল্ভে তখন জীবনের প্রতি সম্পুর্ন বীতশ্রদ্ধ এবং আত্মহত্যা প্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর এক বন্ধু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁকে স্বামী বিবেকানন্দর কাছে নিয়ে যেতে চাইলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আর এরই মধ্যে চারবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেও বিফল হন। পঞ্চম বারের সময় যেন দৈব নির্দেশেই যে বান্ধবীর গৃহে স্বামীজি ছিলেন সেখানে এক ভোরে গিয়ে উপস্থিত হন। তাঁকে বৈঠকখানায় বসান হয়। আর মাদাম যখন চেয়ারে স্বপ্নাবিষ্টের মতন বসে আছেন সেই সময়ে তিনি শুনতে পেলেন পাশের ঘর থেকে কে যেন ডাকলেন, ‘ভেতরে এসো বাছা, ভয় পেয়ো না।’ যন্ত্রচালিতের মতন মাদাম সেই পাশের ঘরে প্রবেশ করেন। স্বামীজির পাঠকক্ষ। মাদাম দেখলেন, একটি চেয়ারে স্বামীজি উপবিষ্ট, সামনে টেবিল।

মাদাম ঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। স্বামীজি ধ্যানমগ্ন, এক প্রশান্তির পরিবেশ। তাঁর গৈরিক পোশাক মেঝে অবধি নেমে এসেছে, পাগড়ী সামনের দিকে ঈষত্‍ ঝোঁকনো, নিম্নদৃষ্টি। একটু পরে চোখ না তুলেই বললেন, ‘বাছা, কী ঝোড়ো হাওয়াই না তুমি নিয়ে এলে। শান্ত হও।’ তারপর অতি শান্তস্বরে মাদামের জীবনের একান্ত ব্যক্তিগত কুঠুরির দরজা-জানলা হাট করে খুলে দিলেন। তাঁর জীবনের গোপন জটিলতা, উদ্বেগ সম্বন্ধে বহু কথা বলতে লাগলেন, যে সব কথা মাদামের ঘনিষ্টতম বন্ধুরাও জানত না। এ যেন এক অলৌকিক ব্যাপার। বিহ্বল হয়ে মাদাম প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনি এত সব জানলেন কি করে? কে আপনাকে এ সব বলেছে? স্বামীজি মৃদু হেসে চোখ তুলে ওনার দিকে তাকালেন, এ যেন এক বালখিল্যের ন্যায় প্রশ্ন! তারপর মৃদুস্বরে বলেন, ‘কেউ আমাকে কিছু বলেনি। আর বলার প্র্য়োজন আছে কি? আমি খোলা বইয়ের মতন তোমার ভেতরটা পড়তে পারি।’ তিনি তাঁকে আরও বলেন, ‘ তোমাকে সব ভুলে যেতে হবে। আবার খুশি হও। আর সুখী হও। নিজের শরীরটাকে সুস্থ করো। চুপ করে বসে শুধু দুঃখের কথা ভেবোনা। তোমার অন্তরের ভাবাবেগকে বাইরে কোন একটা রূপ দাও। তোমার আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের জন্য এটা দরকার। তোমার শিল্পকলার জন্যও এটা অত্যাবশ্যক।’

সেদিন স্বামীজির কথায়, তাঁর ব্যক্তিত্বে যারপরনাই মুগ্ধ হয়ে বিদায় নিয়েছিলেন মাদাম এমা কাল্ভে। পরবর্তীতে স্বামীজির সংগে ঘনিষ্ট পরিচিতি হবার সুবাদে তিনি জেনেছিলেন যে স্বামীজি মানুষের বিশৃংখল চিন্তারাশিকে শান্ত করে ধীরে ধীরে স্বমত গ্রহনের উপযোগী করে তুলতেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর কথাগুলি লোকে পূর্ণ ও অচঞ্চল মনোযোগে শুনতেন।

মাদাম কাল্ভে স্বামীজিকে পরবর্তীকালে ‘ম্ঁ পেরে’(আমার পিতা) বলে সম্বোধনও করতেন। তিনি ভারতবর্ষেও এসেছিলেন।

অন্দরের অন্তরের খেলা

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনাল। খেলবে ভারত আর প্রতিপক্ষ কে? বাংলাদেশ। এই খেলাকে কেন্দ্র করে দুই বাংলার আবেগ যেমন জড়িয়ে ছিল তেমনি এটাও ঠিক যে বাংলাদেশের মতন বাংলা ভাষা-ভাষি মানুষেরাই শুধু ভারতে বসবাস করেন না। এখানে এক রাজ্যের বাইরে পা রাখলেই অন্য ভাষা, তারপরেরটির মুখ্য ভাষা অন্য। তাই আবেগটা ছিল দুই বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

এই খেলাকে কেন্দ্র করে সোশাল মিডিয়ায় মন্তব্যের ফুলঝুরি বয়ে চলেছিল আর তার মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় ওপার বাংলার কিছু মানুষ যেমন খোলাখুলি, স্বাভাবিক ভাবেই সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ দলকে তেমনি এপারের বেশ কিছু মানুষ বাংলাদেশের প্রতি আবেগপ্রবণ হয়েও চেয়েছে ভারতের জয়, আর কিছু মানুষ জন্মস্থান, একই মাতৃভাষার টানে স্রোতের বিপরীতে রায় জানিয়েছে। তাই স্বাভাবিক কারণেই জমে উঠেছিল তরজা, দেশকে ছাপিয়ে এক অভিন্ন ভাষার আবেশে।

এই বিষয়ে সোশাল মিডিয়ায় উল্লিখিত কিছু কিছু মন্তব্য সরস এবং যুক্তিপূর্ণ হলেও এর প্রায় অধিকাংশই নিতান্ত আবেগতাড়িত এবং একপেশে। আবার কিছু কিছু মন্তব্য বিরক্তিকর, অবাঞ্চিত এবং সরাসরি ব্যাক্তি আক্রমনের পর্যায়ে পড়ে একটা অবাক করা ব্যাপার হ’ল এই যে, এই সব লঘু তরজায় জড়িয়ে পড়েছিলেন সমাজের অনেক বিদগ্ধজন, প্র্থিতযশা এক গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক। এটা অনভেপ্রিত, যা দুই বাংলার মায়ের ভাষা অনুমোদন করে না।

যাই হোক্, এই দু-দেশের ক্রিকেট খেলাকে ঘিরে আমার মূল আকর্ষণ ছিল একটাই যেটা পৃথিবীর আর কোন দেশেই নেই, অদূর ভবিষ্যতে হবারও কোন সম্ভাবনা নেই। একই কবির রচনা, দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত। খেলার আগে সেই দুটি শোনা যাবে পর পর, ধ্বনিত হবে সারা মাঠ জুড়ে, কণ্ঠ মেলাবেন খেলোয়াড় থেকে দর্শককুল! তাই খুব ভোর ভোর উঠে প্রাত্যহিক পর্ব সেরে, কোন রকমে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে, জামা-প্যান্ট, জুতো পড়ে একদম রেডি হয়ে দূরদর্শনের সামনে হাজির। উদ্দেশ্য, দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত শেষ হলেই আমি অফিস রওনা দেব। এই সব দেখে শুনে গিন্নি ও বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা হতবাক। এ আবার কি ধরনের পাগল! একটা দিন ছুটি নিলে কি হয়? শান্তিমতন পুরো খেলাটাই দেখুক না হয় বাড়ি বসে! ছুটিগুলোতে তো পচন ধরে গন্ধ ছেড়েছে! কিন্তু না, টিভির পর্দার থেকে সবুজ মাঠে উপস্থিত থেকে খেলা দেখাই আমার বেশি পছন্দের। তবু, অবরে সবরে খেলা দেখতে টিভির সামনে বসি, পরে হাইলাইটস্ দেখি, কিন্তু এক নাগাড়ে সচল পর্দায় নজর লাগিয়ে বসে থাকি না।

টিভির সামনে বেশ উত্তেজিত আমি। ঠিক নটায় জাতীয় সঙ্গীত শুরু হ’ল। প্রথমে বাংলাদেশ... ‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালবাসি...’ আমার দু-চোখ দ্রবীভূত হতে চলেছে, বিস্তারের সংগে সংগে নামল জলের ধারা। গলার মাঝখানে ডেলার মতন কি উঠছে আর নামছে, আমি নিজেকে সংযত করতে করতেই গানটা শেষ হয়ে গেল। শুরু হ’ল...জন গণ মন অধিনায়ক জয় হে/ভারত ভাগ্য বিধাতা..., চড়াই-উত্‍রাই-এ সে গানও শেষ। শুধু শেষ হ’ল না গান দুটোর রেশ। হঠাত্‍-ই গিন্নির কথায় চমকে উঠি, ‘একী তোমার চোখে জল? খেলা শুরু হয়ে গেছে নাকি? ভারতের উইকেট পড়েছে নাকি? গিন্নির সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি চশমটা খুলে সোফা ছেড়ে উঠতে উঠতে ওকে আঙুল দিয়ে টিভির দিকে ইশারা করলাম। সেটা দেখে ও আরও অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘তবে তুমি কাঁদছিলে কেন?’ আমি ওকে এড়িয়ে ঘর থেকে বেরুতে যেতেই সে আমার পথ আগলে দাঁড়িয়ে, 'আগে বলো তুমি কেন কাঁদছিলে?' আমি মৃদু হেসে বলি, 'দেখ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতে কী রকম পাগল করা আবেগ জড়িত। সারা গানটার মধ্যে কেমন মা মা গন্ধ, আর আমাদের গান- বিভিন্ন রঙ এবং গন্ধের এক ফুলমালা। একই কবির সৃষ্টি! কতবার শুনেছি, শুনছি আর আপ্লুত হচ্ছি। এটা তো আর খোলা মাঠের খেলা নয়-অন্দরের অন্তরের খেলা...

ট্যাক্সি...ট্যাক্সি...ট্যাক্সি

আজ দিনের আলো ফোটার প্রায় সংগে সংগেই আকাশ  কালো করে আবার যেন রাত্রি নামল, সংগে প্রবল বৃষ্টি! আমাকে বেরুতেই হবে তাই নিজেকে তৈরী করে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েই আছি, কখন দিনের আলো স্পষ্ট হয়, বৃষ্টিটা ধরে আসে। আমার হা-পিত্যেশ ব্যর্থ হ’ল না, কিছুক্ষনের মধ্যেই বেশ আলো ফুটে রোদেরও দেখা মিলল, বৃষ্টিও আস্তে আস্তে ধরে এল। হুড়মুর করে বেড়িয়ে পড়লাম।

রাস্তায় থিক থিক করছে লোকে। বাস কম, অটোর-ও যেন আকাল পড়েছে। হলদে পরী বা নীল সাদা ‘নন রিফুইসাল’ বকের-ও দেখা নেই। আর দেখা মিললেও সাড়া মিলবেই তার ভরসা কোথায়? ‘যাব না’ বললে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়, ‘কোথায় যাবেন? জিজ্ঞাসা করলে খুবই বিরক্ত বোধ হয়। গাড়িতে উঠে বসার পর প্রশ্নটা মানায় কিন্তু গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে এই প্রশ্নটা বিরক্তিকর। ট্যাক্সিওয়ালার পছন্দসই গন্তব্যস্থল হলেই তিনি যেন যাবেন এই রকম সব হাভভাব। ভাগ্যিস বাবার নামটা জিজ্ঞাসা করে না!

যাই হোক্, একটা রিক্সা ধরে পাটুলিমোড়-বাই পাসে এসে উঠলাম। দেখি দুটো হলদে পরী আর একটা নন রিফিউসাল নীল সাদা বক। খুশী মনে ওদিকে দু-পা এগুতেই সামনে দাঁড়ান দু-জন চালকই সমস্বরে বলে ওঠে, ‘যাবে না’, ‘যাবে না’। আমি তাও ওদের দিকে আরও একটু এগিয়ে গিয়ে বলি, ‘সল্ট লেক’ যাব। তবুও না, আর সেই না টা আবার হাত নাড়িয়ে, বাক্য ব্যয় করে নয়। ভীষণ রাগ হ’ল। সামনেই ট্রাফিক বুথে গিয়ে পুলিসকে বলতেই সেও যারপরনাই বিরক্ত, ‘কি হচ্ছে সব বলুন তো?’ তারপর একটা কমপ্লেইন স্লিপ নিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলেন, ট্যাক্সির নম্বরটা নোট করে আমাকে দিন, তারপর দেখছি...।’ আমি কাগজটা নিয়ে ফিরে এসে ট্যাক্সিগুলোর নম্বর টুকতে যেতেই ট্যাক্সিওয়ালারা হারে রে রে করে ছুটে এল, ‘ও দাদা, কি নম্বর টুকছেন? বললাম না গাড়ি খারাপ।’ আমি বিরক্ত হয়ে বেশ রেগেই বলি, ‘কখন বললেন যে গাড়ি খারাপ।’ ও বাবা! এতেই ওরা রেগে কাঁই! ‘কী আপনি এত মেজাজ দেখাচ্ছেন, যেন গিলে ফেলবেন নাকি?’ আমি বেশ হকচকিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসবার আগেই সেই পুলিস টিকে আমার দিকেই এগিয়ে আসতে দেখলাম। আর তাতেই ওদের চড়া সুরে ঘাটতি দেখা গেল, ‘স্যার, দেখুন আমাদের দুটো গাড়িই সকল থেকে খারাপ হয়ে আছে। কি করে যাই?’ এ কথার উত্তরে পুলিসটি কিছু বলবার আগেই একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট মোটর বাইক নিয়ে অকুস্থলে হাজির। বিস্তারিত সব শুনলেন, তারপর সেই দুই ট্যাক্সি চালককে স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি সরিয়ে গ্যারেজে নিয়ে যেতে বললেন। আর নীল সাদা নন-রিফুইসল ট্যাক্সির চালকের পাত্তা না পাওয়াতে সেটির নম্বর টুকে রাখলেন। তিনি আরও একটি কাজ করলেন, সহকর্মী পুলিসটিকে দিয়ে আমাকে একটি রানিং ট্যাক্সি ধরিয়ে দিলেন। আমাকে ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে এই বলে আশ্বস্ত করলেন, ‘আপনি নিশ্চিন্তে যান, আমি এই গাড়িটির নম্বরও নিয়ে রাখলাম।’

এই হ’ল ইদানিং কালে কলকাতার ট্যাক্সি কালচার! রুট, ভাড়া, মিটারে কারচুপি, খুচরো পয়সা, সবেতেই গণ্ডগোল বাকবিতণ্ডা ইত্যাদি, ইত্যাদি। সব কিছুই ওরা ঠিক করে দেবে! ওরাই ঠিক করে দেবে কোন রুট দিয়ে গেলে জ্যাম কম হবে। অতিরিক্ত ভাড়া চাইবে আর তা দিলেই খারাপ গাড়ি ভাল হয়ে যাবে আর গন্তব্যস্থল মনপসন্দ! এতদসত্বেও ওরা নাকি অত্যাচারিত! পুলিস, প্রশাসন, উর্ধমুখী জ্বালানীর দাম, সবই ওদের বিরুদ্ধাচরন করছে। ওদের সুবিচার দেবার লোক কোথায়? আছে, আছে, ওদের পাশে দাঁড়ানোর লোকের অভাব! রঙ-বেরঙের ইউনিয়ন আছে না! তারা তো ওদের দুর্দশার কথা বলতে বলতে প্রায় কেঁদেই ফেলেন আর কি! আবার পুলিস প্রশাসনের একদম মাথায় যিনি আসীন তিনি তো এক ঝটকায় রিফুইসল ফাইন-ই কমিয়ে দিলেন। কারণ হিসাবে তিনিও বেদনা বিদুর কন্ঠে ওদের অসুবিধার কথাই শুধু উল্লেখ করেছেন। আর যারা সত্যি সত্যিই ভুক্তভোগী তাদের অভিযোগের কোন গুরুত্বই দেওয়া হ’ল না। মোদো মাতাল, দুষ্কৃতী ছাড়া আপামর জনগণ কেন কেন ট্যাক্সিওয়ালাদের ওপর জুলুম করবে? ট্যাক্সি ভাড়া বাড়তে বাড়তে এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে নিতান্ত সখ করে কেউ ট্যাক্সি চাপেন না। ট্যাক্সিওয়ালারা তো আর নিঃস্বার্থ সেবা করছে না! মিটারে উল্লিখিত ভাড়ার টাকা কড়ায় গণ্ডায় উসুল করে(বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ফেরতযোগ্য খুচরো টাকা-পয়সা ছাড়াই)। টাকা দেবে যাত্রী সকল আর সুবিধাটুকু ভোগ করবে ট্যাক্সিওয়ালা! এ ক্ষেত্রে অবিচারের শিকার কারা? অথচ সেই কবে থেকে ট্যাক্সি চড়া! চালকের আসনে প্রায় অধিকাংশই পাগড়িধারী পাঞ্জাবী অথবা পাগড়িবিহীন শিখ। যুগপত্‍ নিরাপত্তা আর শিষ্টাচারের প্রতীক। সেই সময় বাড়ির মা, ঠাকুমা, দিদিমারা ভয়ে আঁতকে উঠতেন বাড়ির মেয়েদের একা ট্যাক্সি ধরে বাড়ি ফেরা অথবা কাজের প্রয়োজনে কোথাও যাওয়া নিয়ে। কিন্তু কোনদিনও কোন মহিলা সওয়ারী ট্যাক্সিওয়ালার হাতে অপদস্থ হয়েছেন, অশ্লীল কিছু ঘটেছে এটা  এক আধবার ঘটলেও এখনকার মতো নির্মম পরিস্থিতি হয়নি। দু-তিন দিন ছাড়া ছাড়া মহিলারা এর শিকার হচ্ছেন, অপদস্থ হচ্ছেন, ধাক্কা মেরে ট্যাক্সি থেকে নামিয়ে দেওয়াও হচ্ছে তাদের। আর আজ! ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে অবসৃত হবার পথে সেই ট্যাক্সিড্রাইভার কুল! এই ব্যাপারে মাস ছয়েক আগের একটা ঘটনার উল্লেখ বোধহয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তখন সন্ধ্যে সাতটা হবে, চেতলা থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। শরীরটাও ভালো নেই, তার ওপর একটু তাড়াও ছিল, তাই ট্যাক্সি ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু গন্ত্যব্যস্থল জেনেই মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিল। এরই মধ্যে একটা ট্যাক্সি থামল, মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় যাবেন?’ গন্তব্যস্থল শুনেই আবার স্টার্ট দিল, একটু দূরে গিয়ে থামল, তারপর ব্যাক করে এসে দয়া দেখাল, ‘রাণীকুঠি অবধি যেতে পারি, যাবেন?’ অগত্যা, আর ট্যাক্সিতে উঠে বসতে না বসতেই ড্রাইভার সাহেবের লেকচার শুরু হয়ে গেল, ‘শুনিয়ে সাব, আমার তকলিফ্ হ’ল তাও আপনাকে নিয়ে নিলাম। জানেন সাব, এই সরকারের আমলে আমাদের খুবই টাইট অবস্থা। পুলিস খুব ঝুট ঝামেলা করছে। লোকসান করে গাড়ি চালানো যায়? ওদিকে দেখুন, নীতিশকুমারজী কেমন সুন্দর সরকার চালাচ্ছে বিহারে? বলুন সাব।’ আমি অবাক হয়ে বলে উঠি, ‘আপনার লোকসান কোথায়?আমি তো ভাড়া দিয়েই যাচ্ছি। আর আপনি তো আপনার সুবিধা মতন জায়গাই আমাকে নামিয়ে দেবেন। তারপর আমাকে আবার অটো, বাস বা রিক্সা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। আপনার বুঝি রানিকুঠিতেই গ্যারেজ?’ নির্লজ্জের মতন চালকটি বলে ওঠে, ‘আপনি তো ঠিক ধরিয়েসেন!’ তারপর খিক্ খিক্ করে সে কী হাসি তার! আমার মেজাজটা একদম খিঁচড়ে গেল, ‘আপনারা ক পুরুষ পশ্চিমবঙ্গে।’ সংগে সংগে উত্তর এল, ‘চল্লিশ বত্‍সর ধরে, দাদু-বাবা-কাকাদের সংগে। জমি-জমা সব বিহার মুলুকে।’ আমি দাঁতে দাঁত চেপে বলি, ‘আহা রে! এত কষ্ট করে এখানে পড়ে আছেন কেন?’ নীতিশ কুমারের রাজত্বে চলে গেলেই পারেন।’ সামনের লুকিং গ্লাস দিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে সে মৃদুস্বরে বলে, ‘সাব কা গুসসা আ গিয়া, ছোড়িয়ে......।' বাকী রাস্তাটা আর সে কথা বাড়ায় নি।

এ তো গেল ক্ষুব্ধ আমাদের কথা। একবার ভাবুন তো আমাদের এখানে আসা বিদেশীদের কথা! তারা কি পরিমাণ লাঞ্ছিত, নিগৃহীত, প্রতারিত, অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হচ্ছেন প্রতিনিয়ত! এ ব্যাপারে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি আজ কোথায়? ভাষাগত বাধার সুযোগ নিয়ে প্রায়শই তারা হচ্ছেন প্রতারিত। এ ক্ষেত্রে বিদেশী ট্যাক্সি ড্রাইভার প্রসংগে শ্রদ্ধেয়া নবনীতা দেব সেন-এর একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল যেটি উল্লিখিত হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে এক বাংলা সাপ্তাহিকে। নবনীতাদি একবার প্লেন মিস করে কপর্দকশূন্য হয়ে পূর্ব জার্মানি থেকে ফিরছিলেন মস্ত ভি আই পি বন্ধুর ভরসায় ,যার এয়ারপোর্টে গাড়ি পাঠানোর কথা ছিল। রাত  একটায় প্লেন থেকে নেমেছেন, দেখেন কেউ নেই। তিনি তখন সেই বন্ধুর বাড়িতে ফোন করেন সংগের অবশিষ্ট খুচরো টাকার কিছুটা দিয়ে। বন্ধুটি দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, ওর বাড়িতে একটা বড় সড় পার্টির আয়োজন হয়েছে তাই তিনি যেন একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে ওয়াই ডাব্লু সিএ-তে চলে যান, ওখানে ওনার নামে একটা ঘর বুক করা আছে। এই কথা শুনে নবনীতাদি বিহ্বল হয়ে পড়েন। সেই নির্দিষ্ট আস্তানায় উপস্থিত হলে কে ট্যাক্সি ভাড়া দেবে? এ সব ভাবতে ভাবতেই তিনি আর একটি ফোন করেন তাঁর এক আত্মীয়াকে। ফোন ধরে সেই বৃদ্ধা তাঁকে নির্দেশ দেন একটা একটা ট্যাক্সি ধরে তক্ষুনি ওনার ওখানে চলে আসতে, ভাড়া তিনিই দিয়ে দেবেন। আর এও বলে দেন যে রওনা হবার আগে ফোনে ট্যাক্সির নম্বরটা ওনাকে জানাতে, এক ঘন্টার মধ্যে ওনার বাড়িতে না পৌঁছলে তিনি পুলিসে খবর দেবেন। সেই মতন নবনীতাদি একটা ট্যাক্সি ধরলেন এবং চলন্ত অবস্থায় ট্যাক্সির নম্বরটি ওনার সেই আত্মীয়াকে জানিয়ে দেন।

ট্যাক্সি গন্তব্য স্থলের দিকে এগিয়ে চলেছে আর তিনিও ট্যাক্সি ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলেন যে তাঁর কাছে কোন টাকা-পয়সাই নেই। এই কথা শুনে সেই ট্যাক্সি ড্রাইভার অট্টহাস্যে বলেন যে, টাকা-পয়সা, সোনা-দানা থাকলেও তা নিরাপদ, এটা তো ডাকাতের গাড়ি নয়! এই কথা নবনীতাদি তাকে আদ্যপান্ত পরিষ্কার করে দিয়ে বলেন যে তাঁর নিজের কাছে ট্যাক্সিভাড়াই নেই, ওনার আত্মীয় সেটা দিয়ে দেবেন, আর সেই ভাড়া নিতে ড্রাইভারটিকে চারতলায় উঠতে হবে, আত্মীয়াটি বৃদ্ধা এবং শ্বাসকষ্টের রোগিনী। সব শুনে ট্যাক্সিওয়ালাটি সেই আত্মীয়ার খুবই প্রশংসা করেন নবনীতাদির নিরাপত্তার ব্যাপারে এ রকম ভাবনা চিন্তা করবার জন্যে। সে নিজেও বৃদ্ধাটিকে একবার চাক্ষুষ করতে চান। সেই মতন কাজও করেছিল সে চারতলায় বাক্স তুলে দিতে এসে, যেটা ট্যাক্সিওয়ালার কম্ম নয়। ভাড়ার ওপর কোন টিপস্ ও সে নেয়নি। নবনীতাদি এবং তাঁর আত্মীয়র সংগে আলাপ সে বেজায় খুশী হয়েছে এই কথা বলে, শুভরাত্রি জানিয়ে ফিরে যায়!

সব ট্যাক্সিওয়ালারাই অমানুষ, কর্কশ আর আমরা সব যাত্রীরা ভালো মানুষ, এটা ভাবা বা বলা অবশ্যই ভুল। মোদো-মাতাল প্যাসেঞ্জার দের হুজ্জতিও ওদের কম পোয়াতে হয় না। মুখোমুখিও হতে হয় অনেক অবিবেচক, অমানুষ যাত্রীদেরও, যারা নির্দিষ্ট ও সঠিক ভাড়া নিয়েও অন্যায় ভাবে ঝগড়া-ঝাটি বা বঞ্চিত করেন ওদের। গলি, ঘুপচি বা বড় ফ্লাট বাড়ির তলায় ট্যাক্সি থামিয়ে ‘এই একটু আসছি’ বলে বেপাত্তা প্যাসেঞ্জেরও আছে। আবার মাঝে মধ্যে ট্যাক্সি ড্রাইভারদের সততার উদাহরণ সংবাদ পত্রিকা/বৈদ্যুতিন মাধ্যম-এর দ্বারা অবগত হই। তবে হরে দরে দাঁড়িপাল্লাটি হেলে আছে সেই সারথিটির দিকেই...

বসন্ত এসে গেছে...

বসন্ত এসে গেছে...। এ ঋতু জানান দিচ্ছে বসন্ত এসে গেছে। ভোরের প্রথম আলোয় মৃদু শিরশিরানি হাওয়ায় বসন্তের আগমনী বার্তা যা আবার অনুভূত হয় দিবাকর মুখ লোকানোর পর। এর পর পরই এসে পড়ে দোল, হোলি উত্সব। রিন রিন করতে করতে আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ে মনমন্দিরে।

অন্যান্য ঋতু আবাহনের অনুষ্ঠানের মতন শান্তিনিকেতনেও বসন্তবরণ উত্সনব শুরু হয় কবিগুরুর মানসিক তাগিদে। এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করেন ক্ষিতিমোহন সেন, বিধুশেখর শাস্ত্রী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। দোলের দিন হয় এই উত্সতব। রবীন্দ্রনাথ দোল ও হোলিকে সমস্ত প্রাদেশিকতা ও অসংযম থেকে মুক্ত করে সুন্দর ও সুরুচিপূর্ণ বসন্তোত্সলবে পরিণত করেছেন।

বসন্তোত্স ব উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন-‘বত্স রে বত্সতরে...আম্রকুঞ্জে দোল উত্স্বের দিনে-নৃত্যগানে, কাব্যেছন্দে সুন্দরের অভ্যর্থনা করিয়া থাকি। বসন্তের দক্ষিণ সমীরণে যে দৈববাণী ঊর্ধলোক থেকে নেমে এসেছে এই ধরার ধূলায়, তাকে অন্তরের মধ্যে প্রতিধ্বনিত করে নেবার জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন।’

কবিগুরুর মহাপ্রয়ানের পর অবনীন্দ্রনাথ আশ্রমের ভার নেন। সেই সময়েও যথারীতি বসন্তোত্সনব অনুষ্ঠিত হত। আম্রকুঞ্জের বেদীতে তিনিই বসতেন। দোল উত্সবে সবাই কবিগুরুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন, কিন্তু অবনীন্দ্রনাথের সর্বাংগে সবাই আবীরে ভরিয়ে দিত এবং তিনি তা উপভোগও করতেন।

দৃষ্টি পড়ে ঝড়াপাতার মেলায়। সংগে সংগে কবিগুরুকে মনে পড়ে যায়। তাঁর ফুল ফোটাবার সমারোহে-গানের কথাও কানের কাছে গুনগুনিয়ে ওঠে, ‘বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা...।’ এই ফুল ফোটাও একদিন শেষ হবে, তাই তাঁর বসন্তকে অনুরোধ জানানোও শুরু হয়ে যায়, ‘বসন্ত তোর শেষ করে দে রঙ্গ।’

বসন্ত তো ক্ষণস্থায়ী। কি প্রকৃতিতে, কি জাগতিক জীবনে! রেশ থাকে, আবার মিলিয়েও যায়। সেটাও জাগতিক কারণে। রয়ে যায় তার জন্যে নিরন্তর বিলাপ-হা বসন্ত!

বসন্তের রেশ থেকে গেল প্রতিবেদকের অন্তরে, কিন্তু প্রতিবেদন হল সংক্ষিপ্ত।

একুশে...

‘মোদের গরব, মোদের আশা,

আ’মরি বাংলা ভাষা’

 

২১শে ফেব্রুয়ারী! আমাদের পড়শী একটি ছোট্ট দেশের স্বাধীনতার লড়াই, জাতীয়তার লড়াই, মাতৃভাষার লড়াই এক হয়ে গিয়েছিল। উন্নীত জাতীয় ভাষায় উন্নতি হয় জাতির। বাংলা দেশ মাতৃভাষাকে সামনে রেখে স্বাধীনতাকে কেড়ে নিতে পেরেছিল। ভারত বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির এক মিলনমেলা, এটা সুখশ্রাব্য হলেও আজ যে বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রকট প্রকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে আঞ্চলিক ভাষার অযত্নে লালিত হওয়া, যথাযোগ্য মর্যাদা না পাওয়া। সত্যি কথা বলতে কি, ভাষার মর্যাদা দিতে হয় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে।

ওপর বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম বিস্ফোরণ বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারী। মাতৃভাষাকে যারা বুকের রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন সেই রফিক, জব্বর, সালাম, বরকত, তাজুনের উত্তরসূরী আমরা এপার বাংলায়। কারণ, একুশের শহীদদের মাযের মুখের ভাষার সংগে হুবহু মিলে যায় আমাদের মাতৃভাষাও। তাই তো পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহ র ভাষা সচেতন মানুষেরা ২১শে ফেব্রুয়ারী দিনটিকে পালন করেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সংগে, নানান উত্‍সব, অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। শুধুমাত্র শহীদ বেদিতে মাল্যদানই নয়, এই দিনটি ভাষাপ্রেমীদের শপথ নেবারও দিন।

এবছরও যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে স্বতষ্ফুর্ত ভাবে এই দিনটি পালিত হয়েছে ওপার বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। শহীদ বেদীতে মাল্যদান, বর্ণাঢ্য মিছিল, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারী...’ গানের মধ্য দিয়ে মানুষ এই দিনটিকে স্মরণ করেছে। পেট্রাপোল সীমান্ত এদিন দুই দেশের মহামিলনের রূপ নেয়।

এদিন আবার মনে করিয়ে দেয় বরাক উপত্যকায় ভাষা আন্দোলনের শহীদদের কথা। ১৯শে মে, ১৯৬১, এক বিশাল মিছিল যখন বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে শ্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন শিলচর রেল স্টেশনে, তখন পুলিশ প্রথমে টিয়ার গ্যাস ছোড়ে এবং তার পর পরই নির্বিচারে গুলি ছুড়তে থাকে। একে একে লুটিয়ে পড়েন কমলা ভট্টাচার্য(বাংলা ভাষার জন্য প্রথম মহিলা শহীদ), কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সত্যেন্দ্র দেব, শচীন্দ্র পাল, হিতেশ বিশ্বাস, সুকুমার পুরকায়স্থ, তরণী দেবনাথ, কুমুদ রঞ্জন দাস, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুনীল সরকার...এই এগারো জনের জীবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলা ভাষার অধিকার। আবার, ১৯৯৬ সালের ১৬ই মার্চ, আসামের করিমগঞ্জে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ভাষা স্বীকৃতির দাবীতে আরও একজন শহীদ হন। তিনি হলেন সুদেষ্ণা সিংহ...মাতৃভাষার জন্য ২য় মহিলা শহীদ!

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০১৫ সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলের পুরানো ক্ষত খুঁচিয়ে দিল...চিবুক হল আরও সুদৃঢ়। দায়িত্ব আমাদের। আবার শপথ নেবার পালা।

পন্ডিত ভীমসেন জোশী

এমন বিশেষ কয়েকটি দিন আছে যেদিন হঠাত্‍ করে কিছু কিছু ব্যক্তিত্বের কথা খুব মনে হয় যাঁরা সেই দিনটির জন্য সরাসরি কোন ভাবে যুক্ত না হয়েও যুক্ত হয়ে থাকেন। যেমন, ১৫ই আগস্ট, ২৬শে জানুয়ারী। তাঁদের মধ্যে অবশ্যই একজনের নাম পন্ডিত ভীমসেন জোশী। এই ২৬শে জানুয়ারীর সকালেই টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে এল... ‘মিলে সুর মেরে তুমহারা....’ নিজের সুরে সবাইকে মিলিয়ে দিয়ে চার বছর আগে ৮৯ বছর বয়সে চলে গেছেন ভারতীয় মার্গ সংগীতের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ও প্রাণপুরুষ এই ব্যক্তিটি।

পন্ডিত জোশীর বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক, দাদু কীর্তনিয়া হওয়ার সুবাদে বাড়িতে গানের পরিবেশ ছিল। গান শেখার জন্যে ওনাকে প্রথম জীবনে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। গানের তালিম নিতে এসেছিলেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। পাহাড়ী সান্যালের বাড়িতে পেয়েছিলেন আশ্রয়। নানাবিধ গৃহস্থালী কাজের সঙ্গে জুটত একটু তালিম। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় তখন প্রচণ্ড ব্যস্ত তাই তালিমও হত অনিয়মিত। তারপর নানান চড়াই-উতরাই এর পর উস্তাদ আব্দুল করিম খানের প্রধান শিষ্য পন্ডিত সওয়াই গন্ধর্বের কাছে খুব ছোট বয়সে নাড়া বেঁধেছিলেন ভিমসেন। গিরিজা দেবীর স্মৃতি চারনায়(ভীমসেন প্রসঙ্গে) জানা যায় যে ওই অল্প বয়সে রোজ কয়েক ক্রোশ হেঁটে ২ঘড়া জল নিয়ে আসতেন গুরুজীর জন্যে। বাড়িতে গুরুমাকে রুটি করতেও সাহায্য করেছেন, ঘরও পরিষ্কার করতেন নিয়মিত। তারপর সাধনা শুরু হত। সঙ্গীত সাধনার সময় তাঁর কোন বাহৃজ্ঞান থাকত না। হয়তো বা কোন কোন দিন অর্ধাহারে তাঁর কেটে যেত, তবুও গুরুর থেকে তালিম নেওয়ার খামতি ছিল না।

ভীমসেন জোশীর খেয়াল গান শুরু হত এক ভিন্ন মাত্রায়,ব্যতিক্রমি ঢঙে। তাঁর গায়কী শৈলী ছিল ভিন্ন ধরনের। কোন গতানুগতিকতার প্রভাব তাঁর সঙ্গীত পরিবেশনে পরিলক্ষিত হয় নি। কিন্তু সেই গানই শ্রোতাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে গভীর ভাবে প্রবেশ করেছে, বিমুগ্ধ করেছে, আবিষ্ট করেছে মনোমন্দির। এখানেই তিনি বিজয়ী। ধ্রুপদী সঙ্গীত ছাড়াও তাঁর স্বচ্ছন্দ যাতায়াত ছিল ভজন, ঠুংরি, দাদরার মতন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে।

বহু সন্মান পেয়েছেন ভীমসেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ১৯৭২-এ পদ্মশ্রী, ৭৫-এ সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমী, ৮৫-তে পদ্মভূষণ, সেরা কন্ঠের জন্যে ন্যাশানাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডও- ৮৫ তেই। ১৯৯৯ তে পদ্মবিভূষণ আর ভারতরত্ন ২০০৮-এ।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের 'কোহিনুর' আর দ্যুতি ছড়াবেন না।

কে ছিলেন সফদার হাসমি...

সফদার হাসমি ছিলেন এক প্রতিবাদী চরিত্র। সাম্যবাদে দীক্ষিত এক সমাজ সচেতক, যিনি তাঁর মতাদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে প্রাণ দিতেও দ্বিধা করেননি।

সফদার হাসমি ছিলেন একাধারে নাট্যকার, গীতিকার, অভিনেতা, নির্দেশক, শিক্ষক, ভারতের কম্যুইনিস্ট পার্টির সদস্য এবং সাংবাদিক। ভারতবর্ষের পথনাটিকায় তিনি অন্যমাত্রা যোগ করেছিলেন। তাঁর ‘জননাট্য মঞ্চ’ এবং ‘জনম’ নামক নাট্যসংস্থার জন্ম হয় ১৯৭৩ সালে। তাঁর নাট্যগোষ্ঠীর দ্বারা পরিবেশিত অনেক নাটকই সাধারণ মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করেছে, উদ্বুদ্ধ করেছে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার। পথনাটিকাকে তিনি জনসংযোগের এক অভূতপূর্ব মাধ্যমে পরিণত করেছিলেন। পথনাটিকা, তাঁর ভাষায়, এক স্বচ্ছ এবং ত্রুটিহীন প্রতিবাদের মাধ্যম এবং তথাকথিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মস্তিষ্কপ্রসূত থিয়েটারের বিরুদ্ধে। চার দেওয়ালের মধ্যে স্টেজের উপর অভিনীত নাটক পরিবেশিত হয় সমাজের কিছু বিক্ষিপ্ত দর্শকের সামনে, যাদের পরিলক্ষিত হয় ভয় এবং বিস্ময় থেকে উদ্ভূত শ্রদ্ধা। অথচ তাঁর পথনাটিকা জুড়ে থাকে বঞ্চনা, লাঞ্ছনা অতিক্রমের ইতিহাস। শ্রমজীবী মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থলের ধূমায়িত প্রতিবাদ ধ্বনি পথনাটিকার মধ্যে উপস্থাপন করতে করতে তিনি হয়ে ওঠেন বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধি। তাঁর নাটকের উপস্থাপনায় থাকে হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা এক কান্নার কথা, সর্বজনীন এক মানবতার, হৃদয়স্পর্শী অভিজ্ঞতার কথাও বলে। অচিরেই তিনি শ্রমজীবী, কৃষিজীবী এবং অত্যন্ত সাধারণ মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর হার না মেনে অন্যায়ের প্রতিরোধের প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে ‘পথনাটিকার’ কারণে অনেক শত্রুও তৈরী করেছিলেন।

পথনাটিকা সাধারণ মানুষের কাছে আসার এক জনপ্রিয় মাধ্যম। সফদার হাসমি এই পথনাটিকাকে এক গুরুত্বপূর্ণ ও নিবিড় জনসংযোগের মাধ্যম হিসাবে পরিগণিত করতে সফল হয়েছিলেন।

১৯৭০ সালে ভারতবর্ষের তত্কাললীন প্রধানমন্ত্রী যখন নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রিগিং-এর জন্য অভিযুক্ত, তখন তাঁর পথনাটিকা ‘কুর্সি, কুর্সি, কুর্সি’(চেয়ার, চেয়ার, চেয়ার) নিউদিল্লী বোটক্লাব প্রাঙ্গণে প্রদর্শিত হয়। অসামান্য উপস্থাপনা! একজন রাজা চেষ্টা করছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে তার কুর্সি(চেয়ার) ছেড়ে দেবার, কিন্তু চেয়ার-এর সংগে সংগে রাজাও উত্থিত হচ্ছে।

তাঁর ‘জনম’ নাট্যগোষ্ঠীর দ্বারা পরিবেশিত পথনাটিকাগুলির মধ্যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য হ’ল ‘মেশিন’(একটি ট্রেন্ড ইউনিয়ন মিটিং-এ ২ লক্ষ কর্মচারীর সামনে প্রদর্শিত)। ‘গাঁও সে শহরত’(নির্যাতিত ক্ষুদ্র চাষীদের নিয়ে), ‘তিন ক্রোড়’(বেকার সমস্যা), ‘আউরত্‍’(নারীজাতির প্রতি আক্রমণ), ডি টি সি কি ধান্ধনি’(মুদ্রাস্ফীতি)উল্লেখযোগ্য। তিনি ছিলেন নাট্যসংস্থার অঘোষিত পরিচালক। তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ‘জনম’ চব্বিশটি পথনাটিকার চার হাজার প্রদর্শন করে। হাসমির আরও দুটো উল্লেখযোগ্য উপস্থাপনা হ’ল, ম্যক্সিম গোর্কীর ওপর ‘এনিমিজ(১৯৮৩) এবং ‘মোটেরাম কা সত্যগ্রহ’(হাবিব তনবীর এর সঙ্গে,১৯৮৮)। ১লা জানুয়ারী ১৯৮৯। এক অভিশপ্ত দিন। দিল্লীর সন্নিকটে, সর্হিবাবাদ-এর ঝন্দপুর গ্রামে যখন ‘জনম’ নাট্যসংস্থার ‘হাল্লাবোল’(আক্রমণ) পথনাটিকা পরিবেশিত হচ্ছিল তখন তদানীন্তন শাসকদলের দুষ্কৃতিরা নাট্যকর্মীদের আক্রমণ করে। সেই আক্রমণে সফদার হাসমি নৃশংসভাবে খুন হন। উল্লেখ্য, তাঁর মৃত্যুর দু দিন পর তাঁর স্ত্রী মলয়েশ্রী হাসমি সফদারের ‘জনম’ গোষ্ঠিকে নিয়ে সেই একই জায়গায় ‘হাল্লাবোল’ যথাযথ ভাবে পরিবেশন করেন।

সফদার হাসমি শ্রমজীবি, নিপীড়িত মানুষের সুখ-দুঃখ স্পন্দনের রূপকার। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই তাঁর মায়েরই ভাষায় যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালে তাঁর জীবনী প্রকাশে:

সাথী, তোমার নাম, তোমার কর্মকাণ্ড, তোমার দায়বদ্ধতা কখনোই বিস্মৃত হবার নয়। তোমার সাহসিকতা আজ আমাদের দু-বাহুতে শক্তি জোগায়। তোমার ভালোবাসা আজ এবং আগামী দিনগুলোতে জড়িয়ে থাকবে। আমরা আশা ছাড়ছি না। যদিও তুমি সেই আশার দিশায় আমাদের পাশে হাঁটবে না কিন্তু তোমার হাসি, তোমার সঙ্গীত আবার ভেসে উঠবে আমাদের কন্ঠে এবং আমরা এগিয়ে চলব নতুন সমাজের লক্ষ্যে। তোমার দৃষ্টান্ত আমাদের অনুপ্রাণিত করবে আমাদের ঈপ্সিত লক্ষ্যে। বিদায়... 

পিঠে খেলে মনে রয়

পৌষ সংক্রান্তি এসে গেল। সঙ্গে করে নিয়ে এল কনকনে ঠান্ডা। হাড়কাঁপানো শীতে উনুনের পাশে বসে পিঠে খাওয়ার আনন্দ যে পেয়েছে সেই জানে পিঠের মাহাত্ম। পিঠে খেলে মনে রয়। নলেন গুড় দিয়ে চিতোই পিঠে বা পাটিসাপটা, পুলি পিঠে এ সবই অন্তরের অন্তঃস্থলে দাগ রেখে যায়। তাই আবার বলি, ‘পিঠে খেলে মনে রয়।’

নলেন গুড়ের প্রেমে মাতোযারা হয় অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে বঙ্গসন্তানরা তো এ সময় আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। বাংলার মানুষ নগরায়ন এবং বাজারি চটকদারিতে পৌষ পার্বণ উত্সব ভুলতে বসেছে। আর সেই কারণেই পিঠে খাবার মজা থেকে বঞ্চিত হয়েই চলেছে।বর্তমান প্রজন্ম শুধু ছবিতেই নানা রকম পিঠে দেখতে পায় আর বড়দের কাছ থেকে তার আস্বাদনের মহিমা অবগত হয়। পিঠে খাওয়া আজ তাদের ভাগ্যে বড় একটা জোটে না। বড় বড় রেস্তোরায় এই পিঠে পরম্পরার কিছু নিদর্শন রাখলেও তা মা-ঠাকুমা, দিদিমাদের পেলব হাতের ছোঁয়া দিতে পারে পৌষ পার্বণের পিঠেতে? তাঁরা সংক্রান্তির বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতেন। নারকেলের ছোবড়া ছাড়ানো থেকে নারকেল কোড়া, আতপ চাল ভিজিয়ে বাটা ইত্যাদি। ছাঁচের পিঠের জন্যে বিভিন্ন আকৃতির মাটির ছাঁচ তৈরি করা, যার সাথে  বস্তুতই লোক শিল্পের একটা যোগ আছে। সরু চাকলি, দুধপুলি, গোকুল পিঠে আরও কত সব বাহারি নাম! চাল-বাটা, ডাল-বাটা, ছানা, ক্ষীর নারিকেল ইত্যাদি যোগে প্রস্তুত পিঠা-কুল এক অভাবনীয় শিল্পকীর্তি...পিঠাপুলি-ভাজা পিঠা, সিদ্ধ পিঠা ও আরও কত কী!

বাংলার পিঠে লোকশিল্পের মধ্যে অবশ্যই অন্যতম। বহু গুণীজনের দ্বারা তা স্বীকৃতও। কিন্তু হায়!এই লোকশিল্পীরা সে সন্মান পান না। এই শিল্পের ঐতিহ্যকে রক্ষার কোন প্রচেষ্টাও নেই। পরন্তু আধুনিকতার নামে এই পরম্পরাকে ভুলে যাবার চেষ্টাই থাকে। ফলশ্রুতি স্বরূপ এ রস থেকে বঞ্চিত হওয়া। 

ব্যতিক্রম আছে, যারা এই শিল্পকে নিজের করে রাখতে চান তাদের নিজস্ব রুচিবোধের মধ্য দিয়ে।

অম্বল

সম্পাদকীয়তে আজকের প্রসঙ্গ, ‘অম্বল’। না না, শেষ পাতের সেই বস্তুটি মোটেই নয়। এ হচ্ছে গ্যাস/অম্বল। শতকরা ৯০ শতাংশ বাঙালীর যা জীবনসঙ্গী। কিন্তু কেন? এটা কি কোন জাতির পরিকাঠামোগত সমস্যা? না, সেটা আদৌ ঠিক নয় তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যবহারিক জীবনধারা, অনিয়মানুবর্তিতা অনেকাংশেই এর জন্য দায়ী। ঝোলে-ঝালে আহার। ঘরে তো বটেই, বাইরের খাবারেও লাগামছাড়া অনিয়ম। সাদামাটা রান্না একেবারেই না-পসন্দ আর তখন মুখ চোখের ভাবই একদম বদলে যায়। রাধুনীর বদনামও হয়। আবার এর ব্যতিক্রমও আছে। কোনরকম অনিয়ম না করেও অনেকে এই রোগের শিকার হন। সেক্ষেত্রে রুগী নিজে তো অস্বোয়াস্তি এবং রোগজনিত কারণে কষ্ট পানই অপরদিকে আশপাশের পরিজনদের সে কষ্ট বোঝাতেও অক্ষম হন। ‘কিছুই মুখে দেয় না-তার আবার অম্বল আসে কোত্থেকে?’ অবিবাহিত মেয়েদের ক্ষেত্রে এই ব্যাধি ততখানি বিব্রত বা অস্বোয়াস্তির কারণ হয় না নিজস্ব পরিমণ্ডলে। সব চাইতে অসুবিধায় পড়েন এই রোগে আক্রান্ত বিবাহিত মহিলারা, শ্বশুরবাড়িতে আসা ইস্তক। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা আড়াল করবার জন্যে মুখ বুঁজে তেলে-ঝোলে অনিয়মিত ভোজন চললেও অচিরেই তা প্রকাশ পায় খাবার পাতে অনীহা, অল্প খাবার গ্রহণ করা বা কোন একবেলা না খাওয়ার কারণে। শুনতে হয়, ‘এইটুকু টুকু মেয়েদের এত অল্প পরিমানে খাওয়া তাও আবার অম্বলের কারণে, এর ওপর মাঝে মাঝে উপবাস, ভাবাই যায় না। আরে এটা তো লোহা খেয়ে হজম করবার বয়স।’ তাই বধূটিও অশান্তি এড়াতে পাতে বেড়ে দেওয়া সবটুকু কোনরকমে গলঃধকরন করে পরে  বাথরুমে গিয়ে বমি করে রেহাই পাওয়া আর কি।

শ্বাশুড়ীমার খাইয়েই শান্তি।‘এত কষ্ট করে রান্না করলাম, ভালো করে না খেলে মনটা কেমন যেন করে! কেন গো রান্না ভালো হয় নি বুঝি? কাদের জন্য যে এত সব রান্না করি’..ইত্যাদি, ইত্যাদি। মৃদু অনুযোগের পরিসমাপ্তি এই ভাবেই ঘটে।

আবার অম্বলের রুগী নতুন জামাইরাও যে এ ব্যাপারে শ্বশুরবাড়িতে হেনস্তা হন তাও ঠিক।‘এ বাবা, এ জামাই দেখি কিছুই খায় না এত লজ্জা করলে চলে! নিজের বাড়ি মনে করে সবটুকু মুখে তোলা চাই কিন্তু। তুমি খাবে বলে সেই ভোর থেকে হেঁসেলে ঢুকেছি। না খেয়ে খেয়ে তো শরীরটার এই হাল করেছ! বয়সটা তো পড়ে রয়েছে বাবা! না খেলে পরিশ্রম করবে কি করে?’ এমন আরো সব কতই না কথা! যেন ছেলেটির বাপের বাড়িতে ওকে না খাইয়ে রাখে আর কি। আমার এক বন্ধুর কীর্তির উদাহরণ এই প্রসঙ্গে দেওয়া যেতেই পারে।

বন্ধুটি আমার দীর্ঘদিনের অম্বলের রুগী। সে যা খায় তাই নাকি অম্বল হয়ে যায়। আমরা ঠাট্টা করে বলতাম,‘কি রে মুখটা অমন করে আছিস কেন? অম্বল হয়েছে তাই না? নিশ্চয়ই খুব জল খেয়েছিস?’ এ সব শুনে রেগে গিয়ে খুব মুখ খারাপ করতো। সেই বন্ধুটির বিয়ে। অম্বলের রুগী বলে বিয়ে করবে না করবে না করেও এ নিয়ে মায়ের প্রায় রোজই কান্নাকাটির দরুন বিয়েতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু মাথায় সেই একই চিন্তা- অম্বল। যাই হোক্, বিয়েটা ভালভাবেই উত্‍রে গেল। অন্যান্য নানা রকম টেনশনের জন্যে অম্বলের ব্যাপারটা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে নি। এবার বিয়েবাড়ির শেষ ব্যাচে মেয়ে-জামাইকে নিয়ে শ্বশুর-শ্বাশুড়ী, অন্যান্যরা এবং আমরা কজন বন্ধু খেতে বসেছি। নো ক্যাটারার, বাড়িতেই ভিয়েন বসিয়ে রান্না-বান্না হয়েছে। পাড়ার ছেলেরাই কোমরে গামছা বেঁধে পরিবেশনের দায়িত্বে রয়েছে। তা প্রথমে বন্ধুটির পাতে লুচি দিতে যেতেই সে বারণ করলো। জামাই-এর জন্যে এল সাদা ভাত, তারপর ডাল, কড়াইশুঁটি দিয়ে মুগের ডাল-বন্ধুটির খুবই প্রিয় এবং চলবে। সঙ্গে পাতজোড়া বেগুন ভাজা। ওটাও চলবে। ক্ষিদেও পেয়েছিল ওর। তাই পাত খালি হতেই ওর শ্বাশুড়ী আবার ভাত-ডাল দিতে বলে। বন্ধুটিও বেগুন ভাজা চেয়ে নেয়। অন্যান্য পরিবেশনকারীরা তখন নতুন জামাইকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সবারই একহাত বালতির হ্যান্ডেলে অন্য হাতে চেপে ধরা খাবার ভর্তি হাতা। শুধু পাত খালি হবার অপেক্ষায়। কিন্তু হায়! বন্ধুটি তৃতীয় বারও একটু ভাত ও ডাল চেয়ে নিল। এদিকে সবাই অস্থির হয়ে উঠেছে। তাদের সবাইকে সুস্থির করে নতুন জামাই-এর ঘোষণা,‘আমার পেট একদম ভরে গেছে। খুব তৃপ্তি করে খেলাম। আমি এই পদ টাই বেশি পছন্দ করি কারণ আমার পেটে ওটাই সহৃ হয়। সবাই যখন অবাক বিস্ময়ে নতুন জামাই-এর কথা শুনতে ব্যস্ত তখন ওর শ্বাশুড়ী ঠাকরুন জামাইকে অনুরোধের সুরে বলেন, ‘ঠিক আছে বাবা, তোমাকে আর কিছু খেতে হবে না। তুমি বাড়িতে  তৈরী গরম গরম দুটো রসগোল্লা খাও। পেটের পক্ষে খুবই ভালো। প্রচণ্ড বাধ্য ছেলের মতন জামাই ঘাড় নাড়তেই পটাপট চার চারটি রসগোল্লা ওর পাতে পড়ে গেল। সেও সুবোধ বালকের মতন সেগুলো সাবাড় করেই হাত ধোবার আয়োজন করার আগে আমার দিকে মুচকি হেসে কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিস ফিস করে বলে, ‘একেই বলে বিয়ের পাতে গুরুপাক বধ, তুই চালিয়ে যা।’ 

পরে শুনেছি পরবর্তীতে ওর পছন্দ মতন খাবারেরই ব্যবস্থা থাকত-নো চাপাচাপি। চোরা অম্বলের চোরা গোপ্তা আক্রমণ থেকে এই ভাবেই মেলে মুক্তি!

কালো টাকা

বাজার চলতি টাকার রঙ যখন ক্রমে ক্রমে কালো হতে শুরু  হয়েছিল তখন কারুর হুঁশ হয়নি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তার শ্রীবৃদ্ধি তো ঠেকানো যায়-ই নি, পরন্তু এর পাহাড় প্রমাণ অস্তিত্ব অনুভূত হয়েছে, বেশ আন্দাজ করা গেছে, তবুও কোন কেন্দ্রীয় সরকারই সেই কালো টাকা উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অপারগ এটা প্রমানিত হয়েছে। খোলাখুলি বলতে গেলে তারা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এ ব্যাপারে সময়ে সময়ে কোন কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, কালো টাকার মালিকদের নাম প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আবার কারুর কারুর মত হ’ল অপরাধী দের অবশ্যই কঠোর শাস্তি পাওয়া উচিত।বিদেশের ব্যাংকে জমে থাকা কালো টাকা দেশে ফেরানো এবং দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা  ও দ্রুত বিচারও দাবী করা হয়েছে।

বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার নাকি কিছু কালো টাকার মালিককে চিহ্নিত করতে পেরেছে। কিন্তু কই তাদের নামের তালিকা, কই? দু-চারজন চিহ্নিত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা কালো টাকা উদ্ধার প্রচেষ্টার সহায়ক, এই কথাটা গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া অবশ্যই উচিত এবং তা এক্ষুনি। কারণ, দেশের আর্থিক বিকাশের হার ১০-১১ শতাংশ। টাকা বাইরে নিয়ে গিয়ে জমিয়ে রাখা মানেই দরিদ্র তা মানুষের থেকেই  চুরি করা। প্রতিদিনই প্রতিটি খাদ্যদ্রব্যেরই যে হারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে আর অন্যদিকে কতিপয় ভারতীয়ের কর ফাঁকির যে পরিমাণ টাকা বিদেশের ব্যাংকে গচ্ছিত আছে এই ফারাকের মধ্যে ভালোরকম মিল পাওয়া যায়। ভারতীয়দের টাকা থাকবে বিদেশে এবং তার হিসেব রাখা নির্ভর করবে চুক্তির ভিত্তিতে এবং সেই চুক্তি অনুযায়ী নাকি তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করা নাকি সম্ভব নয়! অথচ হিসাব বহির্ভূত টাকা রাখাও যেমন অপরাধ তেমনি অপরাধমূলক কাজকর্ম করে কালো টাকার পাহাড় তৈরী করাও অপরাধ। এ ব্যাপারে সুপ্রীম কোর্টও সমালোচনা করে বলেছেন, এ দেশকে লুঠ করা টাকা।

এই সব বিতর্কের মাঝেই সুইস ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলেছেন। তাদের যুক্তি হল, সুইত্জাররল্যান্ড কর ফাঁকির সহায়ক দেশ নয়। তারা ভারতকে কর সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য জানাতে প্রস্তুত এবং এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই নাকি পারস্পরিক চুক্তিও সম্পাদিত হয়েছে। তবে আর অযথা দেরী কেন?

বড়দিন

মাঝে আর কয়েকটা দিন। তারপরেই বড়দিন। ২৫শে ডিসেম্বর মহাধুমধামে যিশুর জন্মদিন পালিত হয়। অথচ যিশুর কবে জন্ম হয়েছিল তার সঠিক প্রমাণ কিন্তু আমাদের হাতে নেই। ‘বাইবেল’-এ এ নিয়ে কোন উল্লেখ নেই। তবুও এই দিন সান্তাক্লজ, কেক, কমলালেবু, কুকিজ, রঙ বেরঙের পোশাকের উত্‍সব। বিশেষতঃ বড়দিন মানেই কেক। নামী দামি দোকান বা অলি গলি, সব জায়গাতেই সাজানো থাকে নানা ধরনের কেকের সম্ভার। স্বাদে ও গন্ধে যা অতুলনীয়। একটা সময় ছিল যখন বাঙালি ক্যালেণ্ডারের পাতা ওল্টাত, কবে ডিসেম্বর আসবে। নলেন গুড়ের পাশাপাশি কেক-প্রেসট্রির আস্বাদ নিতে। আর এখন তো প্রায় সারাবছরই মেলে ওই দুই মনভরানো খাবার। তবে ভরা শীতেই এর আমেজ বেশি করে অনুভূত এবং উপভোগ্য হয়।

তথ্য অনুযায়ী আনুমানিক ৪০০ খৃষ্টাব্দে পোপ সেন্ট জুলিয়াস-১ নামে একজন রোমান ধর্মযাজক ২৫শে ডিসেম্বর দিনটিকে যিশুর জন্মদিন হিসাবে পালন করার কথা ঘোষণা করেন। এটা সত্য যে বাইবেলে নির্দিষ্ট করে বলা নেই যে যীশু কবে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন। তবুও নানা ধারণা, নানা মুনির নানা মত, নানা ব্যাখ্যা, রটনাকে কেন্দ্র করে আজ তিনি সারা বিশ্বের কাছে এক কিংবদন্তি নায়ক, খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক প্রভু যিশু। এই যে ক্রিসমাসকে ঘিরে এত কল্পনা, আবেগ, নানান ব্যাখ্যা, রটনা, সব কিছুর পাশাপাশি যীশুকে নিয়ে অনেক কৌতুহলী ঘটনাও একে একে উঠে এসেছে। এরকমও কথিত আছে যে মেরি ম্যাগদলিন নামে যিশুর এক শিষ্যা ছিলেন। তিনি নাকি যিশুর ক্রুশবিদ্ধের সময় তাঁর পায়ের কাছে ছিলেন। যিশুর পুনুরুত্থানের পর সুগন্ধি তেল দিয়ে তাঁর পাও ধুয়ে দেন। আর এও শোনা যায় যে সেই মেরিম্যাগদলিন যিশুর বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন, যেটা চার্চ অস্বীকার করে। এই ব্যাপারে ড্যান ব্রাউনের ‘Da Vinci Code’ বইটি আরও মারাত্মক কথা বলেছে। তাতে লেখা হয়েছে মেরি ম্যাগদলিন যিশুর বিবাহিতা স্ত্রী ছিলেন এবং যিশু ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার সময় তিনি নাকি অন্তঃস্বত্বা ছিলেন। যিশুর পুনরুত্থানের পর ফরাসি দেশে ওই মহিলাকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানে তিনি এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। আবার যিশুর ভারত ভ্রমণের উল্লেখ পাওয়া যায় ‘The unknown life of jesus’ বইটিতে। তিনি সিন্ধু প্রদেশ থেকে ওড়িশায় আসেন, যান পুরীতেও। রাজগৃহ, বারাণসীতেও যিশুর পদধূলি পড়েছে। খ্রিস্ট ধর্মের ওপর বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের প্রভাব লক্ষণীয়। যেমন চার্চের প্রার্থনায় জোড়হাতের ভঙ্গী ভারতীয় সংস্কৃতির অংশ। আবার খ্রিস্টধর্মে যোগ দিতে গেলে জর্ডন নদীতে দাঁড় করিয়ে তার মাথায় জল ঢেলে তাকে নবজন্ম দেওয়া হত। এই ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের আচার-অনুষ্ঠানের সাযুস্যও লক্ষণীয়।

যাই হোক, আমাদের শহরের সবচেয়ে মনোহর ঋতু হ’ল শীত। বাকি সময়টা তো রোদ, গরম, আর বৃষ্টি-কাদার সম্রাজ্য। তারই মধ্যে কয়েকটা দিন স্বস্তি এনে দেয় শীতকাল। আর এই শীতের কলকাতায় হরেক রকম মজা ও উত্‍সবের মেজাজকে এক অন্যমাত্রায় এনে দেয় বড়দিনের উত্‍সব। আর তার পিছু পিছু আসা ইংরাজী নতুন বছরের উদযাপন।

সঞ্চয়ীর রক্ত

বাংলা ভাষার অভিধান ‘চলন্তিকা’ মোতাবেক ‘লোভ’ শব্দের অন্তর্গত অর্থ হ’ল লিপ্সা, কোন বস্তু লাভের অত্যন্ত বা অন্যায় আকাঙ্ক্ষা, পরের দ্রব্যে লালসা, লোভ দেখানো, প্রলোভন, লোভনীয়, প্রলোভিত ইত্যাদি। আর এই দুই অক্ষর যুক্ত শব্দের বিস্তৃতির মধ্যেই পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ‘চিট্ ফান্ড’ নামক আত্মঘাতী, মারাত্মক বে-আইনি অর্থ জোগান দেওয়ার ভাণ্ডার। প্রতারক এবং প্রতারিত দু-পক্ষই যার অংশীদার।

প্রথমেই প্রতারকের প্রসঙ্গে আসি। চিট ফান্ডের মালিক পক্ষের লিপ্সা, কাম্য বস্তু লাভের বা অন্যায় আকাঙ্ক্ষা, পরের দ্রব্যে লালসা, প্রলোভন দেখানো এই সবের সমষ্টিই প্রতারনা করে চলেছে আপামর সাধারণ জনগণকে। তাদের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রলোভনের লম্বা ফিরিস্তি। প্রলোভনকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। চলতি নামজাদা সব দৈনিকে ঢালাও বিজ্ঞাপনে স্তুতি, বানানো মিথ্যা কথার প্রচার যেমন স্থান পেয়েছে তেমনি বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সমাজের নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্বের সরাসরি প্রচার এদের বে-আইনি ব্যবসাকে রমরমা করে তুলেছে। এই সর্বগ্রাসী প্রতারকদের শুধুমাত্র গরাদের ওপারে স্থান পাওয়াটাই উপযুক্ত শাস্তি নয়। বিচারান্তে চরমদণ্ডে দন্ডিত করাই একমাত্র কাম্য। তাহলেই চিরদিনের জন্য বন্ধ হবে এদের এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড।

বর্তমান অতীতে, কিছু কিছু ঘটনা যেমন, সোনার গয়না বা টাকাকড়ি দ্বিগুন করা, এই সব ভাঁওতাবাজী ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারনা করা  হয়েছে বা হচ্ছে। কিন্তু এই ভয়াবহ চিট্ ফান্ডের দৌরাত্ম সমাজের ভিত্‍ একদম আলগা করে দিয়েছে। ৭০ দশকের সেই দগদগে ঘা এখনো অনেকেরই শুকায় নি। ‘সঞ্চয়ীতা’! এই চিট ফান্ডের আবার প্রচার প্রক্রিয়ায় বৈচিত্র ছিল। যেমন, বড় বড় সরকারী আধা-সরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্য পর্যায়ের আধিকারিকগন তাদের অধস্তন সহযোগী, কর্মচারীদের প্রায় বাধ্য করতেন ‘সঞ্চয়ীতা’য় টাকা খাটানোর জন্যে। নিতান্তই বাধ্য হয়ে এবং প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে তারা প্রলোভিত হয়ে পড়তেন মোটা কিস্তির লোভে। আজকের ‘সাহারা’ বা ‘সারদা’র মতন নয়। ‘সাহারা’ তো আবার বিমান পরিবহন, জাতীয়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ক্ষেত্রেও দাপিয়ে বেরিয়েছে-অবশ্যই প্রচার মাধ্যম এবং নিজস্ব প্রচার প্রক্রিয়ার কৌশলে। আজ সেই চিট ফান্ডের কর্তা সুব্রত রায় কারান্তরালে। বিচার চলছে। আর  ‘সঞ্চয়ীতা’র মালিক শম্ভু মুখার্জির রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয়। সেইখানেই সব তদন্ত, বিচার থেমে যায়।

এবার আসি ‘সারদা’ ইত্যাদি চিট ফান্ডের ইতিবৃত্তে। এই সব বে-আইনি সংস্থা সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে। দিন আনি, দিন খাই থেকে নিম্নবিত্ত এবং কিছু মধ্যবিত্ত(এর তত উচ্বকিত নন) এদের জালে ধরাশায়ী হলেন, আত্মঘাতী হলেন। ওই সব সংস্থার এজেন্টরা (অবশ্যই নিম্নবিত্ত সংগঠক) পালিয়ে, পালিয়ে, আত্মঘাতী হয়ে নিজেরাও শেষ হয়েছেন। বাংলা অভিধান অনুযায়ী এরা লোভী হলেও বস্তুত প্রলোভিত ও প্রতারিত। সুদূর গ্রামাঞ্চলের সেই সব হাতভাগ্য মানুষেরা (অনেকেই অল্পশিক্ষিত অথবা অর্ধশিক্ষিত) অনেকে প্রলোভিত হয়ে তো বটেই আবার নিরুপায় হয়ে এদের কব্জায় চলে গেছে। গ্রামাঞ্চলে অপ্রতুল ব্যাঙ্ক, পোস্টঅফিস-এর পরিষেবা, জটিল প্রক্রিয়া তো আছেই তার ওপর কমহারে সুদ, ক্রমহাসমান সুদের হার এদের বিভ্রান্ত করে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিয়েছে।

এই সব ঠগবাজ, প্রতারকদের নিরস্ত্র এবং কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করবার জন্যে যে সমস্ত সরকারী দপ্তর আছে তারা থেকেছেন চোখ বন্ধ করে। কান বন্ধ করে রেখেছেন পাছে কিছু শুনতে হয়। তাই যথাযোগ্য ব্যবস্থা তো নেওয়া হয়ই নি, উল্টে এদের কেউ কেউ আবার প্রভাবিতও হয়েছেন প্রতারক এই চিট ফান্ড কারবারিদের দ্বারা। রক্ষকই হয়েছেন ভক্ষক। তাই সুপ্রীম কোর্ট পুরো ব্যাপারটাকেই বৃহত্তর ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়েছেন। সঞ্চয়ীর রক্তে গ্রাম বাংলা আজ সিক্ত। সিক্ত প্রতিবেদকের লেখনীও:

প্রবঞ্চনায় ভেসে যায় স্বপ্নের সঞ্চয়

কালো পর্দা নেমে আসে ভবিষ্য জীবনে,

রক্তাক্ত হৃদয় খোঁজে অলীক আশ্রয়,

কেউ বা হারিয়ে যায় মরণের বাঁকে।

প্রতারকেরা ঠোঁট রেখে রঙিন পানীয়ে

গড়ে তোলে বিলাসের সুদৃশ্য প্রাসাদ,

শত শত তাসের ঘর ভেঙে যায় কংক্রিটের চাপে,

সঞ্চয়ীর ঠোঁটে কাঁপে মৃত্যুর শীতল আস্বাদ।


জীবন থেকে হারিয়ে যায় শুধুই জীবন

হাহাকার জমা থাকে সঞ্চয়ের ঘরে,

প্রতিশ্রুতির জীর্ণ কফিন থেকে যেন কে দেয় হাততালি,

নৈরাশ্যের প্রেতাত্মারা রাত্রিদিন দাপাদাপি করে।


তখন বিলাসের সেই সব প্রাসাদ থেকে

কনসার্টে শোনা যায় উত্সাবীও রঙিন উছ্বাস,

মুখোশ খুলতে থাকে একে একে প্রতিটি ঘাতক,

সঞ্চয়ীর রক্ত দিয়ে এঁকে চলে এক এক ক্যানভাস।।

স্বাভিমান 

পূর্ববঙ্গ থেকে আগত বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন হয়েছে এ বঙ্গের অনেক স্থানে তো বটেই আবার ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানেও। সে পুনর্বাসন নিয়েও আছে ক্ষোভ, বিক্ষোভ, অবিচার, আন্দোলন। এবারকার সম্পাদকীয়র উপজীব্য বিষয় তা নয়। একটি ব্যতিক্রমী মানসিকতার স্বাভিমান চমকে দেবার মতন। তারই প্রতিবেদন আজকের সম্পাদকীয়।

সুদূর আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুরা তাদের ওই নামে অভিহিত করলে অপমানিত বোধ করে। তারা নিজেদের উদ্বাস্তু বলে আর পরিচয়ও দেয় না। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের এক একটি পৃথক পৃথক দ্বীপে গড়ে উঠেছে সেই সব বাঙালি পরিবারের সচ্ছল ও পরিচ্ছন্ন গ্রাম। এখন কোনো ব্যাপারেই তারা সরকারের মুখাপেক্ষী নন। সংখ্যায় এরা নজর কাড়ার মতন। এখানকার প্রতিটি দ্বীপপুঞ্জেই এদের উপস্থিতি লক্ষনীয়। তাদের চাষের ক্ষেত সুজলা, সুফলা। অন্যান্য ব্যবহারিক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর ও সৌখিন দ্রব্যাদি ক্রয়ের জন্য তারা কখনো কখনো ফেরিতে চেপে পোর্ট ব্লেয়ারে আসেন। বিভিন্ন দ্বীপে এদের ঝকঝকে কাঠের বাড়ির তকতকে আঙিনায় আছে তুলসী মঞ্চ। ঘরের মেয়েরা শাঁখ বাজিয়ে সন্ধ্যারতি দেয় তারপর সাংসারিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফেলে আসা মাতৃভূমির জন্যে নেই কোনো হা হুতাশ বা দীর্ঘশ্বাস! এখনকার বাসস্থানই তাদের মাতৃভূমি। এ দৃশ্য অবলোকন করা বড়ই সৌভাগ্যের ব্যাপার। মন ভরে যায়। এই যথার্থ সার্থকতায় বাঙালি হিসাবে গর্ববোধ হয়।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত বাঙালি উদ্বাস্তুদের এখনকার পরিচয় সেটলার্স বা উপনিবেশকারী।

দাও ফিরে সে অরণ্য

আদিমকালে মানুষ অরণ্যচারী প্রাণী ছিল। অরণ্যের গাছ-গাছালি, ফলমূল, পশু পক্ষী সবই ছিল তার জীবন নির্বাহী উপাদান। জীবনধারনের প্রতিযোগিতায় অরণ্যের অন্যান্য প্রাণীদের সঙ্গে প্রতি পদে পদে সংঘাত ছিল অনিবার্য। কখনও এপক্ষ জিতত আবার কখনও ওপক্ষ। কখনও বা দুপক্ষ কেই যুদ্ধকালীন মৃত্যু বরণ করতে হত। যেহেতু এখনকার মতন এত মারনাস্ত্র আবিস্কৃত হয় নি তাই প্রায়শই মানুষকে পরাজয় স্বীকার বা পশ্চাদপসরণ করতে হত। এইভাবে ক্রমশঃ পিছু হঠতে হঠতে মানুষজাতি একদিন অরণ্য থেকে বেরিয়ে আসে। আবাসভূমি, রাস্তাঘাট, কলকারখানা স্থাপন করে অরণ্য ঘেঁষে অথবা অরণ্য থেকে নিরাপদ দূরত্বে নিষ্ঠুর ভাবে অরণ্য নিধনের মাধমে। সেই সঙ্গে চলতে থাকে চোরাগোপ্তা প্রাণী শিকার, সভ্যতার অস্ত্রবিষ প্রয়োগে।

সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই মানুষের মনই কেঁদে ওঠে সেই অরণ্যের জন্যেই। প্রাণিজগতের একজন যে অন্যজনের পরিপূরক তা মানুষ বুঝেছে।তাই মানুষজাতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সে পিছন ফিরে তাকিয়েছে। বোধগম্য হয়েছে যে অরণ্যহীন পৃথিবী কখনও মানুষের বাসযোগ্য হতে পারে না। প্রকৃতির প্রতিটি পরিবর্তন হয় ব্যাহত, নষ্ট হয় তার ভারসাম্য। প্রকৃতির রোষ আছড়ে পড়ে মানবজাতির দৈনন্দিন জীবনে। তাই সারা পৃথিবী জুড়ে অরণ্য সংরক্ষণ ও তার প্রসার বৃদ্ধি ঘটানোর উদ্যোগ শুরু হয়।

আমাদের বাংলা বর্ষপঞ্জীতে জামাইষষ্ঠী বলে যে তিথিটি নির্দিষ্ট সেই তিথিটি আবার অরণ্যষষ্ঠী ব্রতেরও দিন। আজও বাংলার অনেক গ্রামের কোন জঙ্গলে, বাগানে, খোলা পরিবেশে বট, বাঁশের কোঁড় ইত্যাদি রোপণ করে এই ব্রতের অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এই ব্রতের মধ্যেই কেমন সুন্দর ও সহজভাবে মিশে গেছে বৃক্ষরোপণ কৃত্যটি।

অরণ্য সম্বন্ধে এত ব্যাপক ও গভীরতার পরিচয় হিন্দু ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্মে পাওয়া যায় না। রামায়ণ মহাভারত, বেদ উপনিষদ প্রভৃতি সমস্ত ধর্ম গ্রন্থেই অরণ্যানীর বিস্তৃতি আছে। আর্য মুনি ঋষিরা আরণ্যকেই তাঁদের সাধনার পীঠস্থান হিসাবে বেছে নিতেন। বেদের সামগান, উপনিষদের গভীর বাণী অরণ্যের নিরিবিলি পরিবেশে উদ্ভূত হয়েছিল, জনারণ্যের হট্টগোলের মধ্যে নয়।

সম্রাট অশোক তার পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে সিংহলে পাঠিয়েছিলেন বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্যে আর তাদের সংগে পাঠিয়েছিলেন বোধিবৃক্ষের অর্থাত্‍ অশ্বত্থ গাছের চারা, সেখানে রোপণের জন্যে। এই তো সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের ঢুলিখেল রিসর্টে ও বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনীতে বটের  চারা রোপণ করেন।

অধিকাংশ ভারতবাসীই যখন বন কেটে বসত, বিশাল প্রাসাদ গড়তে পারলেই সভ্যতার বিকাশ সাধন হবে বলে মনে করেন তখন রবীন্দ্রনাথ কিন্ত বুঝেছিলেন এ পথ ভারতের নয়, তাই তো তাঁর লেখনী গেয়ে ওঠে: ‘দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর/লও যত লৌহ লোস্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর/হে নব সভ্যতা হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী/দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়া রাশি।’

এ শুধু তাঁর লেখনীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বাস্তবে তার রূপায়ন: ‘শান্তিনিকেতন’।

শীতকাহন

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই গলাটা ব্যাথা ব্যাথা করতে লাগল। গার্গল করব তাই গরম জলের কথা বলতেই কাজরীর কাছে মুখ ঝামটা খেলাম। ‘আরও  খোলা জানলার দিকে মাথা করে ঘুমাও, দেখ্ছ ভোর রাতে এখন কেমন শীত শীত করে।’ সত্যিই তো এখন অফিসে এসি বাহুল্য বলেই মনে হচ্ছে। রাতে কখন যে তোষকের ওপর থেকে বিছানার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছি কে জানে! জানলা দিয়ে সামনের রোহিণী ভিলার বড় বড় গাছগুলো নিষ্পত্র হয়ে গুঁড়িতে ভিড় জমিয়েছে। বিকেল  গড়াতে না গড়াতেই সন্ধ্যে নেমে আসছে। মালুম তো হছেই শীত আসছে।

শীত আসছে। জানলার পাশে এসে শুয়ে আছে শীতের দুপুর। পিঠে রোদ লাগিয়ে জম্পেশ করে এক কাপ চা সহযোগে নতুন কোন উপন্যাসে অবগাহন! শীত আসছে কমলা লেবুর রঙে রাঙিয়ে! কুয়াশার ক্যানভাসে মানুষের জীবনে ক্রমশঃ শীত নেমে আসবে, নদী-নালা যাবে শুকিয়ে। শীতের খেজুর বনে কখন আর যাব? জিরেনকাঠের রস যে আমার অতি প্রিয়!

শীত আসছে। রঙবাহারি মরশুমি ফুলের মেলা বসেছে এখানে-ওখানে, পরিচিত অপরিচিত সব বাগানে। মাথার উপরে অনন্ত নীলাভ আকাশ। রোদ্দুরের নিজস্ব সোহাগ আছে, যে সোহাগে শীতের দুপুর তার ভালোবাসা পায়। ধানের শীষ থেকে ঝরে দুধভরা কাঁচা ধান। আর আলের ধারে নুয়ে পড়া উচ্ছলতা ও ঝিঙের লতা উড়ে যায় সোনালী ফড়িং। বাদামী গমের দানা সবুজের সাথে দুলে ওঠে।

শীত আসছে। প্রায় প্রতিটি ছুটির দিনেই পিকনিক লেগে থাকবে। নানা রকম অনুষ্ঠান নিয়ে মাতবে গ্রাম-গ্রামাঞ্চল। তার মধ্যে থাকবে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বাস্তব অবাস্তব মনকাড়া যাত্রাপালা। 

আর পিকনিক? এখনকার পিকনিকের ম্যানেজমেন্টটাই অন্যরকম। সব কিছুই ‘ওয়েল প্ল্যাণ্ড’। প্রায়শই ক্যাটারারকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া হয়। আর আমাদের ছোটবেলায় পিকনিকের স্বাদই ছিল আলাদা। একটা নির্দিষ্ট(কখনও কখনও তাও নয়) জায়গা ঠিক করে বেড়িয়ে পড়া হতো। তবে অবশ্যই তা হতো ঝোপ-ঝাড়, উঁচু উপত্যকা, টিলা, বা নদীর ধারে। তারপর সবাই হৈ হৈ করে নেমে পড়তাম। সকালে কখনও কখনও পাঁউরুটি, ডিমসেদ্ধ, কলা। পরের দিকে চালু হয়েছিল লুচি, পুরি, পরটা-তরকারি, মিষ্টি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার এদিক সেদিক পিকনিক করলে অবশ্যই সকলের পাতে থাকবে জয়নগরের মোয়া। তারপর অল্প কিছু প্রতিযোগিতামূলক খেলাধূলা। এখন আবার সেসবের জন্যে পুরস্কার প্রদান ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এতে একদল ব্যস্ত থাকতে থাকতেই অন্যদল নেমে পড়েছে দুপুরের রান্না-বান্নার আয়োজনে। ওদিকে আবার একদল  গানের আসরে ব্যস্ত। কি সব, গানের শেষ অক্ষর মিলিয়ে গানের প্রতিযোগিতা। তারপর দুপুরে আধপোড়া, আধাসেদ্ধ মাছ ভাত মুরগির ঝোল খেয়ে বাড়ি ফেরার পালা।  নেই কোন রকম অসন্তুষ্টি, বিরুপতা। উদাত্ত কন্ঠে, সুরে-বেসুরে, গলা মিলিয়ে হৈ হৈ করতে করতে ঘরে ফেরা। অবশ্যই সেই পিকনিকে যোগদানকারী কিছুসংখকের তরল পানীয়র নেশাকে কেন্দ্র করে মজা করা-এ প্রায় সব পিকনিকের অবশ্য করনীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যেই পড়ে-কি সেকাল কি একাল....

পরিশেষে সেই রবীন্দ্রনাথ! ‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন/লাগল নাচন/ আমলকির ওই ডালে ডালে..........।’

ক্যাক্টাসের ফুল

গতকাল রাত থেকেই মনটা বেশ ভারাক্রান্ত ছিল। ভেবেছিলাম অশান্তির ঘুমটা একটু গাঢ় হলেই বোধ হয় মনটা হাল্কা হবে। কিন্তু কই হাল্কা হলাম না তো? আমার এই মনটাই করে যত গোলমাল। দুনিয়াশুদ্ধ্ব লোককে জ্ঞান দিয়ে চলেছি ‘সুখ তোমার জানলায় উঁকি দেবে না। ঘরের দরজা হাট করে খুলে ওকে জোর জবরদস্তি পাকড়াও করতে হবে। ওর তো অসম্ভব অহমিকা....।’ কিন্তু নিজের বেলা সেই প্রয়াস কোথায়? মুখের হাসি দেখে ভিতরের মানুষটকে কিন্তু বোঝবার জো নেই! এ ব্যাপারে তার জুড়ি মেলাব ভার। শুধু রোমন্থন আর রোমন্থন! আর তার রেশ চলেও বেশ কয়েক দিন.....।

যাই হোক, এই রকম এক মনের কারবারি চলেছে চেতলার রাস্তা ধরে দক্ষিণে-বাড়ির উদ্দেশ্যে। চেতলা ব্রীজে ওঠার মুখে বাঁ দিকে দৃষ্টি গেল। সাহিত্যিক বিমল মিত্রের সেই লাল রঙের সাবেকী বাড়ি। এখন সেটি একটি প্রতিষ্ঠান। ট্রাফিক জ্যামের কারণে সেই মূহুর্তে গাড়ি দাঁড়িয়ে। বাঁ দিকের কাঁচ খুলে বেশ খানিকটা গলা বাড়িয়ে বাঁ দিকের কোনাকুনি ঘরটা নজর করলাম। জানলা বন্ধ। কিন্তু আমার দৃষ্টি  অর্গল ভেদ করে সেই ঘরে প্রবেশ করে ফেলেছে। ঘষ্টা ওঠা কাঁচের ভারী চশমা। গায়ে গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি। সামনে উপবিষ্ট আমি আর সেই দুই বন্ধুর একজন যাদের ব্যাখ্যান ‘লাইব্রেরী’ প্রসঙ্গে উল্লিখিত হয়েছে। ওর সঙ্গে সাহিত্যিকের অল্প আলাপের সূত্রেই আমার প্রবেশাধিকার এবং ওনার মতন সাহিত্যিকের সংগে বাচালপনা করবার দুঃসাহস হয়েছিল। আমরা দুজনেই তখন দুজনের কথা বলায় ব্যস্ত আর তিনি তখন আমাদের দুজনের আনীত পাণ্ডুলিপির পাতা ওলটাতে মগ্ন। তারপর একসময় আমার দিকে দৃষ্টি মেলতেই আমার ভিতরটা উথালপাতাল করতে শুরু করে দিল। বুকের একটু কাছে কানটা নিয়ে গেলে নির্ঘাত সেই আওয়াজ মালুম হত। ওই অবস্থাতেই সেই মেঘমেদুর স্বর, ‘এমনিতে তো সব ঠিকই আছে তবে শেষটা নিয়ে একটু ভাব।’ আবার আমার বাচালপনা, ‘কেন ঠিক হয়নি, কি ভাবে ভাল করা যায়?’ ভুরু কুঁচকে উত্তর দিলেন, ‘এটা তো তোমার লেখা গল্প, আমি তার শেষ করি কিভাবে? তুমিই ভাব। লেখা হয়ে গেলে দিয়ে যেও।’ অত্যন্ত ভগ্ন মনোরথে আমি উঠে দাঁড়িযে ছিলাম। সেই দেখে আমার সেই বন্ধুটিও ওর লেখার বিষয়ে কোন মন্তব্য না শুনেই বলে ওঠে, ‘আমরা তাহলে আসি?’ উনিও ঘাড় নেড়ে সায় দিয়েছিলেন।

ওনার  ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমি বেশ রুস্ট হয়েই বলে উঠি, ‘কোন রকম সাহায্য করার নাম নেই শুধু উপদেশ। যাক আমি শেষটুকু নিয়ে ভাবব। যদি কোন পরিবর্তন মাথায় আসে তাহলে সেটা করে তোর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব। তখন তুই তোরটার চান্স নিস।

সেদিন সাহিত্যিকের বাড়ি থেকে আসা ইস্তক দুদিন শুধু ভেবেছি, কেন উনি শেষটুকু ভাবতে বললেন? কি ভাবে গল্পটার ইতি টানবো? আর যতবার ভেবেছি ততবারই বিভিন্ন ভাবে গল্পটার শেষটা আমার মাথায় এসে এসে চলে যাচ্ছিল। যাই হোক, গল্পের শেষটুকু আমি আমার মতন করে পরিবর্তন করে অল্প বয়সের জোসে, অত্যন্ত অভদ্রভাবে বন্ধুর হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে সেই গল্পটি ‘কালি ও কলম’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল কিনা তার খোঁজও করিনি। অথচ তখন পরম শ্রদ্ধেও বিমল মিত্রের সম্পাদনায় ‘কালি ও কলম’ ছিল গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, আলোচনায় সমৃদ্ধ এক উঁচু মানের সংকলন। কিন্তু তখন ওই বয়সে... বললাম না?

কর্মজীবনের মধ্য পর্যায়ে, এক মধ্য রাতে অফিসের এক সহকর্মী বন্ধুর মোবাইলের কণ্ঠস্বর আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, ‘ওফ্ বস্ বাবার লাইব্রেরীর প্রকোষ্ঠে সযত্নে রক্ষিত বাঁধানো ‘কালি ও কলম’ সমগ্রের মধ্যে তোমার লেখা গল্প ‘ফেরারী মন’ পড়লাম। আমি অভিভূত? গুরু, বিমল মিত্র সম্পাদিত পত্রিকাতেও ওই বয়সে তোমার লেখা স্থান পেয়েছে!’ আমি যেন তরিতাহত হয়ে ছিলাম। মোবাইলের ওপার থেকে সুদীপের ‘ বস্ কি হ’ল, কি হ’ল’ আমাকে সম্বিত ফিরিয়ে দিল।’ আমি আমার মোবাইল মুখের সামনে এনে চিত্কাার করে বলে উঠেছিলাম, ‘ প্লিজ সুদীপ কাল অফিসে এনে দেখাও, প্লিজ।’

পরদিন সুদীপ শুধু সেটি অফিসে আনেই নি, ‘কালি ও কলম’ সমগ্রটি আমাকে উপহারও দেয়।

সাহেব চাষা

ঐতিহাসিক উন্নয়ন সংস্থা  ‘শ্রীনিকেতন ‘প্রতিষ্ঠা এবং তাকে কেন্দ্র করেই রবীন্দ্রনাথ সুচারু এবংসুশৃঙ্খল ভাবে শুরু  করেছিলেন পল্লী সংগঠনের কাজ। আর এটা প্রায় কারুরই  অজানা নয় এই শ্রী নিকেতন প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্ন এবং পরবর্তী  বিবর্তিত পর্যায়ের সংগে মহান ইংরেজ ভারতবন্ধু ‘লেনার্ড এলমহার্স্ট’ এর নাম জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। আর তিনিই হচ্ছেন প্রতিবেদকের ‘সাহেব চাষা’।

শান্তিনিকেতনকে কেন্দ্র করে যে কয়েকজন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গোটা ভারতবর্ষে নানান সেবামূলক কাজ করে গেছেন তাদের মধ্যে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য হলেন ‘চার্লস ফিয়ার এন্ড্রুরুজ' এবং 'উইলিয়াম পিটার্সন'। সেই সময় আরও একজন বিদেশী ভারতবর্ষে পল্লী পূর্ণগঠন এবং গ্রামের জন্যে আত্মনিয়োগ করেছিলেন তিনি হলেন এলমহার্স্ট।

ইংল্যাণ্ডের ধার্মিক ও বনেদি জমিদার পরিবারে এলমহার্স্ট বড় হয়েছেন। মূলত বাবার প্রভাবেই চাষবাস ও গ্রামীণ সংস্কৃতি সম্পর্কীয় বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ও উত্সলর্গ বোধ জাগ্রত হয়েছিল। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় এদেশে এসেও ভারতবর্ষের ইতিহাস, বিশেষ করে তার গ্রামীণ সভ্যতা, সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছিল। এই সময়ে তিনি তাঁর স্বদেশীয় বন্ধুদের নিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্রত্যক্ষ করেছিলেন সেগুলির দারিদ্র্য দুরবস্থা। এমন গভীর ভাবে গ্রামগুলির দুঃখ, দৈন্য তাঁর মনে দাগ কেটেছিল যে তিনি নিজ অন্তরে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন, পরবর্তী পর্যায়ে ভারতে আসবার সুযোগ পেলেই তিনি গ্রামোন্নয়ন ও পল্লী পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করবেন।

ভারতবর্ষে থাকাকালীন ইলাহাবাদের নৈনিতে ‘কৃষি মহাবিদ্যাল’য়ের অধ্যক্ষ ‘সাম হিগিন বোথাম’য়ের সংগে পরিচিত হন আর তাঁরই প্রেরণায় কৃষিবিজ্ঞান অর্থনীতি বিষয়ে পড়বার জন্যে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। হিগিন বোথামের কাছেই তিনি শুনেছিলেন কবির পল্লীউন্নয়ন গ্রামপুনর্গঠনের কর্মশালার কথা। যদিও ইতিমধ্যে ‘গীতাঞ্জলি’ পড়ে রবীন্দ্রনাথকে তিনি তাঁর অন্তরের অন্দরে একটা বিশেষ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। আবার আমেরিকা ভ্রমণের শেষপর্বে(১৯২১ সালের মার্চ মাসে)রবীন্দ্রনাথ যখন শ্রীমতি উইলিয়াম ডি মুডির বাড়িতে অতিথি হয়েছিলেন তখনই শ্রীমতি মুডির কাছেও কবি শুনেছিলেন ইউরোপীয় এই মননশীল এবং আদর্শবান যুবকের কথা।কবিও নিউইয়র্ক থেকে সরাসরি তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন সেই আদর্শবাদী যুবককে ‘এস আমায় দেখা দাও।’ পরদিন, নিউইয়র্কে প্রথম দর্শনেই কবির প্রতি মুগ্ধ আবেশে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এলমহার্স্ট। রবীন্দ্রনাথকে তাঁর মনে হয় ভারতবর্ষের সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক ও বাহক। কবি লেনার্ডকে শান্তিনিকেতনে আসবার জন্যে আমন্ত্রণ জানালে তিনি সম্মত হন। বলেন, কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে তাঁর পড়াশুনা শেষ হলেই তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে পল্লীসংগঠনের কাজে যোগ দেবেন। কিন্তু বিধি বাম। তিনি যখন পঠন-পাঠন্তে শান্তিনিকেতনে আসবার জন্যে উদ্যোগ নিচ্ছেন তখন এন্ড্রুরুজ তাকে নিরস্ত্র করেন। লেখেন, ‘এখানে টাকা পয়সার অভাব চলছে-এখন এসো না।’ আর তাতেই বিচলিত এলমহার্স্ট পিয়ার্সনের কাছে চলে যান। তিনি তখন ম্যাঞ্চেস্টারে এবং তিনি লেনার্ডকে শান্তিনিকেতনে যাবার জন্যে উদ্বুদ্ধ করেন। সেই ম্যানচেস্টর থেকেই এলমহার্স্ট তাঁর বার্তায় জানিয়ে দেন যে ‘টাকা আছে, আমি কি যেতে পারি?’এর ঠিক পরেই কবির কাছ থেকে তিনি আমন্ত্রন পান, ‘আমি উচ্ছ্বসিত, চলে এস।’ এটা বলা একান্তই জরুরী যে এই অর্থ যুগিয়েছিলেন তাঁরই জীবনসঙ্গিনী, ডরোথি হুইটনি স্ট্রেইট। পরবর্তীকালে, শ্রীনিকেতন প্রতিষ্ঠার গোড়ার পর্বে তিনি নিয়মিতভাবে অর্থ সাহায্য করে গেছেন নিজেকে সম্পুর্ন প্রচ্ছন্ন রেখে।

আর্থিক সাহায্য এবং গ্রামোন্নয়নের কাজ শুরু করবার মতন কিছু যন্ত্রপাতি সংগে করে ১৯২১ সালের ২৮শে নভেম্বর এলমহার্স্ট শ্রীনিকেতনের সুরুলে আসেন। সুরুলে পৌঁছানোর প্রায় সংগে সংগেই পল্লীপুনর্গঠন বিষয়ে আলাপ আলোচনা শুরু করে দেন। তৈরি হয় ‘মাস্টার প্ল্যান’। এ ব্যাপারে সহযোগী হন, কালিমোহন ঘোষ ও গৌরগোপাল ঘোষ। সুরুল কুঠিবাড়িকে কেন্দ্র করে পল্লীপুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে এলমহার্স্ট হেমলতা দেবীর(বড়মা) কাছে বাংলা শিখতে শুরু করে দিয়েছিলেন।

সুরুলে শুরু হল গ্রামোন্নয়নের কাজ। প্রথম এই উদ্যোগের নামকরণ হয়েছিল, ‘ডিপার্টমেন্ট অফ এগ্রিকালচার শান্তিনিকেতন।’ ‘শ্রীনিকেতন’ নামের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় ১৯২৩ সালের প্রথম দিকে(‘শ্রীনিকেতনে’র প্রথম পরিচালক-প্রতিষ্ঠাতা হলেন এলমহার্স্ট)। গ্রামবাসীদের সংগে নিবিড় যোগাযোগ হেতু তিনি কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ, সন্তোষ মিত্র, কালীমোহন ঘোষ, সন্তোষ চন্দ্র মজুমদার, উপেন বসু, মনি বসু প্রমুখদের নিয়ে গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়িয়েছিলেন। উদ্দেশ্য পল্লীসমাজের প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে অবগত হওয়া। গ্রামোন্নয়নের প্রতিটি কাজে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। সেটা লাঙল দিয়ে চাষ করাই হোক বা কোদাল দিয়ে মাটি কোপানো, এমনকি ট্রাক্টর চালাতেও তিনি ক্ষান্ত দেন নি। এইভাবেই একে একে হ’ল ধানের গোলা, ডেয়ারী পত্তন, সমবায় স্থাপন। এলমহার্স্টের পরিচিতি ততদিনে ‘সাহেব চাষা’-য় পরিণত হয়েছে। এই ‘সাহেব চাষা’কেই গ্রামবাসীরা তাদের সুখ-দুঃখের, অভাব-অভিযোগের ভাগীদার করে নিয়েছেন। সেই সময় তিনি বিজ্ঞানসম্মত ভাবে চাষ, কুটির শিল্প, পশুপালনের উন্নতর বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তারই উদ্যোগ এবং রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে ১৯২২সালে গঠিত হয় ‘ম্যালেরিয়া নিবারণী সমবায় সমিতি।’ তারপর গঠিত হয় ‘শ্রীনিকেতন ডিসপেনসারি।’ এলমহার্স্টের সমসাময়িক ঘনিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী এলমহার্স্ট মনে করতেন কৃষিপ্রধান বীরভূম জেলার জীবনের তিনটি শত্রু হ’ল 3 M’s- ম্যালেরিয়া, মাঙ্কি(হনুমান) ও মিউচুয়াল মিসট্রাস্ট(পরস্পরিক অবিশ্বাস)। আবার এ কথাও তিনি নাকি বলতেন যে জীবলোকের জ্ঞানরক্ষা এবং সমৃদ্ধির জন্যে দরকারি চারটি মূল উপাদান হ’ল 4 F’s- ফুড(মনুষ্য খাদ্য), ফডার(পশু খাদ্য), ফুয়েল(জ্বালানি) ও ফার্টিলাইজার(সার)। আর এ সমস্তটাই বনজগত্‍ থেকে পাওয়া যায়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। সুতরাং বনভূমি রক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর গত্যন্তর নাই।

১৯২৫ সালে এলমহার্স্ট ইংল্যাণ্ডে ফিরে যান। আর সেই বছরেই তিনি ডরোথি হুইটনি স্ট্রেইট এর সংগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। যতদিন তিনি শান্তিনিকেতনে ছিলেন, নিয়মিতভাবে মন্দিরে উপাসনায় যোগ দিতেন। প্রকৃত্পহক্ষেই তাঁর সহধর্মিনী হয়ে ডরোথি প্রায় ১৯৪৭ সাল অবধি বিশ্বভারতীকে অর্থসাহায্য করে গেছেন। শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতনের আশপাশের সরুল, মাহিদাপুর, বল্লবপুর, আদিত্যপুর, বাঁধগোড়া, আলবাঁধা, প্রভৃতি গ্রামে পরনে হাফপ্যান্ট আর গায়ে গেঞ্জি এই নিয়ে তিনি সাইকেলে চেপে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়িয়ে বীরভুমের সাহেব গ্রামসেবক হিসাবেও পরিচিতি পেয়েছেন।

১৬ই এপ্রিল ১৯৭৪ এলমহার্স্ট কালিফোর্নিয়াতে পরলোক গমন করেন। আমৃত্যু বিশ্বভারতীর সংগে তাঁর আত্মিক যোগ ছিল। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য বইগুলোর অন্যতম হ’ল ‘পোয়েট এন্ড প্লাওম্যান রবীন্দ্রনাথ টেগর: পাওনিয়র ইন এডুকেশন।’

গ্রাম পুনর্গঠন স্বপ্নে, গ্রামের স্বাস্থ সমবায় এবং স্বদেশী সমাজ ও সমবায় গঠনের কাজে রবীন্দ্রনাথ ও এলমহার্স্ট-র নাম বিযুক্ত হয়ে আছে। শ্রীনিকেতন তথা বিশ্বভারতীর ইতিহাসে তাঁর স্মৃতি এখনও সমুজ্বল।

কালীপুজো/দীপাবলি

পুরাণ অনুসারে, অসুরকুলের অত্যাচার থেকে দেবকুলকে উদ্ধ্বার করবার নিমিত্ত মা আদ্যাশক্তি ভয়ঙ্করী কালীরূপ ধারন করে রনরঙ্গিনীর ন্যায় অসুর নিধন শুরু করেন। মাযের সেই প্রলয়ঙ্করী কর্মকাণ্ডের ফলে ধরাধাম থর থর করে কেঁপে ওঠে, ধ্বংসের মুখে যাবার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় দেবতারা শিবের দ্বারস্থ হন। দেবতাদের অনুরোধে শিব তখন মাযের পদতলে পড়ে তাঁকে শান্ত করেন।

বাংলায় কালীপুজো আর দীপাবলি একই উত্স বে পরিণত হয়েছে। দীপাবলি অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যাবার উত্সাব। আবার পরলোক তত্বে হিন্দুদের বিশ্বাসের ফলে তারা এটাও বিশ্বাস করে যে আত্মার মৃত্যু নেই। দীপাবলীর উত্সাবে আকাশবাতি বা আলোকোজ্বল বাড়ি দিক্ নির্দেশক হয়ে পরলোকগত পিতৃপুরুষের আশীর্বাদে পুষ্ট হন।

কালীপুজোর আগমনীতেই মন চলে যায় প্রদীপ, মোমবাতি, তুবড়ি(উড়ন, বসন) হাওয়াই, রংমশাল, ফুলঝুরি আর আলোর রোশনাই এ। তমোস মা জ্যোতির্গময় অর্থাত্‍, আমাকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যাও। সেই কবে থেকে কালীপুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত হয়ে আছেন রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, সাধক বামাক্ষ্যাপা, রামকৃষ্ণ পরমহংস.....আর পান্নালাল ভট্টাচার্যের শ্যামাসঙ্গীত!

সরকারের দূষণ নিয়ন্ত্রণ পরিষদের আদেশকে মূল্যহীন করে তোলে এক অংশের বাজি প্রস্তুতকারক এবং কিছু নাগরিক। কালীপুজোর পরও তিন দিন ধরে শব্দবাজির দৌরাত্ম কোন অংশেই কম থাকে না। দূষণ নিয়ন্ত্রণপরিষদ ৪০ ডেসিবেল থেকে ৯০ ডেসিবেলে শব্দ সীমা ধার্য করায় শব্দ পৌঁছায় সীমাহীন ডেসিবেলে। প্রায় মধ্য রাত পর্যন্ত শব্দবাজির দাপাদাপিতে জীবন অতিষ্ঠ হয় শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষজনদের। এ ব্যপারে বিশেষ নজরদারীর প্রয়োজন।

কালীপুজোর পর পরই এসে পড়ে আর এক উত্সিব-ভাতৃদ্বিতীয়া। ভাইয়ের কল্যাণ কামনায় বোনের ফোঁটা প্রদান। যাকে বিভিন্ন বয়সের ভাই-বোনেদের মিলনোত্সব আখ্যা দেওয়া যায়।

ভাইফোঁটায় যেমন ঠাকুমা-দিদিমারা নাতিদের ফোঁটা দেন, তেমনি নাতনীরা ঠাকুরদা-দাদুকে ফোঁটা দেয়। এই অনুষ্ঠানে প্রীতিউপহার ও ভূরিভোজের ব্যাপার-স্যাপার থাকে। উপহার প্রাপক বোনেরা আর ভাইয়েরা ভূরিভোজে অংশ নেয়। অনেক ক্ষেত্রে আবার ভাইয়েরা দুটিরই প্রাপক হয়। বোনেরা তো ভাইয়েদের ব্যাপারে সবসময়েই উদার আর দিলখোলা....। আর এই অনুষ্ঠানে নিজের মাযের পেটের ভাই-ই শুধু বিবেচিত হয় না। পাড়াতুতো ভাইয়েরাও স্থান পায়।

বাঙালীর বারোমাসে তের পার্বণ। এটাই তাদের স্বকীয়তা। এটাই তাদের বাঁচার রসদ।

সাহিত্য চিন্তা

সেই কবে থেকে দেখে আসছি কিছু তরুণ অনেক অসুবিধা সত্বেও গল্প কবিতার কাগজ নিয়ে মেতে রয়েছে। কলকাতার বাইরে, দূর মফস্বলেও চলেছে উচ্ব মানের অনলস সাহিত্যচর্চা। এটা ভাবায়, আনন্দ দেয়। যদিও এই বয়সে   অন্য  অনেক কিছু প্রলোভনের হাতছানির মধ্যেও এরা কেন কবিতা লেখে বা লিটল ম্যাগাজিনের জন্যে সময়, উত্সাহ আর হাত খরচের অনেকখানি ব্যয় করে তা হিসেবী লোকেরা বোঝে না। এ নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতেও ছাড়ে না। তবু এরা দমে না। কারণ এ যে মনের আনন্দ, প্রাণের শান্তি।

সেই ষাটের দশকের শুরুতে যেসব পত্রপত্রিকাগুলোর চল হয়েছিল সেগুলো প্রখ্যাত কবিদের লেখনীতে সমৃদ্ধ না হলেও যুবা-তরুণদের লেখা নিয়ে প্রাণপ্রাচুর্যে সমৃদ্ধ ছিল। অর্থের সংকুলান করা, পত্রিকা ছাপানো, তারপর সেগুলো বিক্রি করতে লোকের হাতেপায়ে ধরতে হত। সেই কবেকার কথা...আজও মনে পড়লে শরীর রোমাঞ্চিত হয়। সদ্য স্কুল ছেড়ে কলেজে ঢুকেছি। একটু-আধটু লিখি। যা মনে আসে তাই লিখি। কবিতা-গল্প মোহে বেশ আচ্ছন্নের মধ্যেই কাটছিল দিনগুলো। নিজের স্কুল-কলেজ ও পাড়ার হাতে লেখা দেওয়াল পত্রিকায় দু-চারটে লেখা স্থানও পেয়েছে। এরই মধ্যে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করার ভূত মাথায় চাপে। সঙ্গী ছেলেবেলার নিত্যসঙ্গী পাশের বাড়ির বাচ্বু। শুরু হয়ে গেল চেনা-অচেনা সবার কাছে হাত পাতা। অত্যন্ত পরিচিত কিছু লোকও তখন দূর থেকে আমাদের দেখলেই ফুটপাথ পরিবর্তন করত যথেষ্ট দ্রুততার সাথে। তাও আমরা লজ্জিত বা হতোদ্যম হইনি। বাড়ির কাছেই সদ্য প্রতিষ্ঠিত শ্রীগুরু আশ্রমের নিজস্ব ছাপাখানার ম্যানেজার দাদুকে অনেক বলে কয়ে আমাদের ম্যাগাজিন ছাপতে রাজি করিয়েছিলাম বেশ কম খরচে। শুরু হয়ে গেল পত্রিকা ছাপানোর তোড়জোড়। পত্রিকার নামকরণ হ'ল 'অভিযান'। কিছু অল্পখ্যাত সাহিত্যসেবীর সাহচর্যও জুটে গেল।

হঠাত্‍-ই মাথায় এল, কিছু খ্যাতনামা ব্যক্তির আশীর্বাণী নিয়ে এই সাহিত্যযাত্রা শুরু করলে কেমন হয়? চিন্তার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু। কার কার কাছে যাব তাঁদের তালিকাও প্রস্তুত। সেই অনুযায়ী প্রথমেই গেলাম বসুমতীর দপ্তরে-পরমশ্রদ্ধেয় বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের কাছে আশীর্বাণী আনতে।

বসুমতী পত্রিকার সদর দপ্তরে ঢুকতেই বরাবরের মতন বাচ্বু আমাকে এগিয়ে দিল। দপ্তরের অনুমতি নিয়ে দুরু দুরু বক্ষে সম্পাদকের ঘরে ঢুকতেই দু-চোখ আটকে গেল। অমন ছোটোখাটো মানুষের এত গাম্ভীর্য! এত ব্যক্তিত্ব! চোখে চোখ রেখে কথাই শুরু করতে পারছিলাম না। কিন্তু পিছন থেকে কোমরে বাচ্বুর খোঁচা খেতেই পাখি পড়ানোর মতো বলে উঠেছিলাম, ‘আমরা-না একটা লিটল ম্যাগাজিন বের করছি, একটা আশীর্বাণী দেবেন? ছাপব।’ তীক্ষ্ণ এবং স্পষ্ট কন্ঠের উত্তর,‘সেটা কি কলের জল নাকি, যে ট্যাপ খুললেই ঝর ঝর করে পড়বে?’ সঙ্গে সঙ্গে আমার উত্তর, ‘ও’। ‘ও কী?, লেখ। একটু থেমে, ‘না থাক, বানান ভুল করবে। আমিই লিখে দিচ্ছি।’ তারপর খসখস করে পত্রিকার প্যাডে যা লিখে দিয়েছিলেন তা কালের গতিতে বিবর্ণ হলেও মনের মণিকোঠায় এখনও জাজ্বল্যমান :

‘নতুন যুগ গড়ে তোলার জন্যে এবং জীবনের বিকাশের জন্যে তরুণ সাহিত্যিক ও শিল্পকর্মীদের অভিযান সার্থক হোক। নতুন মানুষের মুক্তির বার্তাকে বহন করে এনেছে। সেই মুক্তির অভিযান তরুণদের সংগ্রামের দ্বারা সফল হোক এই প্রার্থনা করি।’

বেরিয়ে এসেছিলাম। তারপর লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে একেবারে রাস্তায়। তখন উড়ছি। আর উড়তে উড়তে সিদ্ধান্ত, ‘চল এবার যুগান্তর পত্রিকার দপ্তরে। সত্যি, সৌভাগ্য সেদিনটায় আমাদের পিছু ছাড়েনি। ঝরঝরে হস্তাক্ষরে অনুগৃহীত হয়েছিলাম যুগান্তর পত্রিকার বার্তা সম্পাদক শ্রদ্ধেয় দক্ষিণারঞ্জন বসুর আশীর্বাণীতে :

‘তরুণের অভিযান তো চিরকালের। গতিই হলো প্রাণ। যেখানে এই গতি নেই, প্রাণের স্পন্দন সেখানে স্তব্ধ। ত্রিমাসিক ‘অভিযান’ এই প্রাণধর্মে উদ্বুদ্ধ হোক-এটাই কামনা। আমাদের চারপাশে বড় ক্লেদ, বড় জঞ্জাল। প্রাণধর্মে দীক্ষিত দেশের তরুণরা সেই ক্লেদ ও জঞ্জালের উপর ধাক্কা দিক। নীচতা-হীনতার বেড়া তা হলেই ভেঙে পড়বে। আমাদের শ্লথ সমাজজীবনে গতির আবেগ লাগবে। অভিযানের কর্মীদের কাছে আমাদের সেই প্রত্যাশা রইলো।‘

পরবর্তি পর্যায়ে এরকম অনেক অভিযান ই হয়েছে, সময়-সুযোগে সে সব ব্যক্ত হবে। তবে এখনও শুধু ‘কবিতা’র জন্যেই অনেক কবিকে বাড়ি বাড়ি ‘মোমবাতি’ ‘ধূপকাঠি’ ইত্যাদি বেচে বেড়াতে হয়। অবশ্য সুনীল টুইশনি করে ‘কৃত্তিবাস’ চালিয়েছিলেন। 

প্রতিবেদন

আকাশে যখন ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা মেঘের সঙ্গে মাটিতে ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু, ডালে ডালে শিউলি, বৃক্ষমূলে শিউলির গালিচা, নীলচে সাদা কাশ ফুলেরা, অন্তরে তখন শারদীয়ার উত্তাল সুর। মন আনচান করে।

আবার সেই মনই বিদ্রোহী হয় যখন প্রতি বর্ষায় নানান প্রাকৃতিক, অপ্রাকৃতিক রাক্ষুসে যন্ত্রনার মূর্তিগুলো রুদ্ধ আক্রোশে ফেটে পড়ে। এবারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলমুক্ত হলেও অশান্তির বাতাবরণ রয়েছে সারা প্রাকপূজো সময়কাল ধরে। একেবারে শেষ মূহুর্তে তা আছড়ে পড়েছে সুনামি হয়ে ঘরের কাছের বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের কর্মসূচী, দাবীদাওয়া, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, সমস্তটাই হওয়া উচিত ছাত্র ও শিক্ষক উভয়েরই অনুভবী মতাদর্শের ভিত্তিতে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে চোরাগোপ্তা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ (উভয় পক্ষেরই)| হারিয়ে গেল মূল কর্মসূচী, মরমী ছাত্র আন্দোলন মিথ্যা বদনামের ছাপ্পাতে।

এই ধরনের আন্দোলনের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদাধারিককেই নিতে হয় গুরুদায়িত্ব। এখানে ব্যাক্তিগত ইগো সামগ্রিক ভোগান্তির কারণ হয় এবং তা হয়েওছে।

মনে হচ্ছে সুশাসনের মন্ত্র হারিয়ে গেছে। নাহলে প্রশাসনের সর্বচ্ব নেতৃত্ব অন্যান্য সাম্প্রতিক রোমহর্ষক ঘটনাগুলোর মতন এ ব্যাপার টাকেও লঘু করে দেখলেন। যেন, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় মত প্রকাশের অধিকার শুধু সর্বচ্ব নেতৃত্বেরই আছে। তা সে বিশ্বাসযোগ্য হোক বা অপব্যাখ্যা হোক, তার তো কোন শাস্তি হয় না।

 মানুষের পতন কাহিনীর সবচেয়ে করুন দিক এই যে, একসময় সে অন্যায় কে অন্যায়, ভুল কে ভুল বলে চিনতে পেরেও মেনে নেয়। তার সমস্ত প্রশ্ন তখন মিশে যায় ওই মেনে নেওয়ার মধ্যে। যখন কোন নেতৃত্ব অন্যায়কে অন্যায় বলে চিনিয়ে দেন, বক্তব্য রাখেন, প্রতিকারের যথাবিহিত ব্যবস্থা নেন, তখন অন্যান্যরাও ভিতরের অন্যায়টাকে চিনতে পেরে বাইরে নিয়ে আস্তে পারে। ভুল স্বীকার করার তাগিদ অনুভব করে। বোঝে এ ব্যাপারে পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। সেইটুকু অবধি রেয়াত করা যায়। নচেত আইনানুগ ব্যবস্থা তত্ক্ষণাত প্রয়োগ করা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। সরকারের ভূমিকা হবে নিরপেক্ষ, দলমত নির্বিশেষে তার ভূমিকা হবে সম্পুর্ন আলাদা।

আগামীতে সর্বস্তরে শুভ বুদ্ধির উন্মেষ ঘটুক এই আর্তি রইল।

শুভ বিজয়ার শ্রদ্ধা, প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই ‘বাংলা সাহিত্যে’র অগণিত পাঠককুল কে এবং লেখক-লেখিকাদের।সামনের দিনগুলো আপনাদের আর ভালো কাটুক, এই কামনা রইল।

দুর্গাপূজো : সর্বজীবে প্রেমের প্রতীক 

দুর্গাপূজো অতি প্রাচীন পূজো। প্রাচীনকালে রাজা সুরথ, সমাধি-বৈশ্য, শ্রীরামচন্দ্রের মাতৃ আরাধনার কাহিনী সুবিদিত। অধুনা বাংলাদেশের তাহির পুরের তত্কারলীন রাজা কংসনারায়ণ রাজকীয় ব্যয়ে (শোনা যায় ৯ লক্ষ টাকা) দুর্গাপূজো করেছিলেন। কথিত আছে, যে দুর্গাপ্রতিমা খানি আমরা বর্তমানে পূজো করে থাকি এর আসল প্রবর্তকও এই রাজা কংসনারায়ণ।

আগে রাজারাজড়া, জমিদার ও বনেদি বড় বাড়িতে কেবল দুর্গোত্সদব হতো। কিন্তু আজকাল তা সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। এখন যেমন বিভিন্ন সর্বজনীন দুর্গাপূজোর মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা প্রকট ভাবে জানান দেয়, তখনও অলিখিত প্রতিযোগিতা ছিল রাজা, মহারাজা, বিত্তবান মহাজন ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তবে দুর্গাপূজো যে কেবল ধর্মীয় উত্সব নয় এবং এর সঙ্গে যে আমাদের সমাজ এবং অর্থনীতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত সেটা অতীতে যেমন সত্যি ছিল বর্তমানেও তাই।

বাংলায় দুর্গোত্সবের প্রাদুর্ভাব বাড়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমলে। সপরিবারে কোন দেবতা বা দেবীর পূজো ভূভারতে আর কোথাও নেই। এ শুধুই এক ধর্মীয় উত্সব নয়। এর মধ্যে নিহিত রয়েছে এক সর্বজনীন সংহতি ও ভালোবাসার বীজ। দুর্গাপূজোয় যেমন দেবদেবীরা আছেন, চালচিত্রে আছে মুনি, ঋষিরূপে মানুষও। আবার পাশাপাশি আছে পশু, পাখি এবং সরীসৃপ। দেবীর সঙ্গে পূজিত নব পত্রিকায় (কলা বউ) আছে লতা-শস্য-ঔষধী-বৃক্ষ। ব্রহ্মা থেকে তৃণ পর্যন্ত বিদ্যমান। বিপুলা এই পৃথিবীর বুকে আমাদের অন্ন, জল ও আরোগ্যের ভাণ্ডার। এই সসাগরা পৃথিবীর দিকে সবিস্ময়ে তাকিয়ে আমাদের আদিম পূর্বপুরুষগণ সাক্ষাত দেবী ও মাতৃজ্ঞানে তাঁকে স্মরণ ও বরণ করেছিল। তাই হয়তো বহু মানুষেরই ধারণা এই যে পৃথিবীর পূজোকে কেন্দ্র করে মানুষের দেবী ভাবনার, ঈশ্বর উপাসনার উন্মেষ ঘটেছিল। দেবী মূর্তির মধ্যেও তিনি আবার লতা, শস্য, বৃক্ষ, মানুষ, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ, সরীসৃপ-সকলের মধ্যেও তিনি।

এই জগত্কেন দেবী, ঈশ্বর রূপে দেখার ঐতিহৃ শুধু যে ভারতেই সীমাবদ্ধ তা নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাচীন ধর্ম ও জাতিগুলিরও লোক বিশ্বাসের গোড়ায় রয়েছে এই ঐতিহৃ। পৃথিবীর এই মাতৃরূপ ও দেবীরুপের সমন্বয়ের প্রকাশ হিন্দুর দুর্গাপূজোয়। দুর্গাপূজো শুধু বাঝ্যিক ও আড়ম্বরের পূজা নয়। এ পূজা শুভচিন্তা, শুভকাজ এবং অশুভ শক্তির বিনাশে শক্তি যোগায়। আর সেই শক্তির আঁধার হবে অন্তর। শারীরিক শক্তিকে চালনা করে মানসিক শক্তি। শারদোত্সবের আনন্দে শুধু অবগাহন করলেই হবে না। সমাজের সর্বস্তরের জীবের সঙ্গে সুদৃঢ় করতে হবে মেলবন্ধন। চাই আত্মসংযম, নিষ্ঠা, শ্রদ্ধা ও নিস্বার্থপরতা। এই উত্সবের আনন্দ যেন কারুর পক্ষেই নিরানন্দের কারণ না হয়ে ওঠে।

দুর্গাপূজোর মূল অস্ত্র হোক, ‘সর্ব জীবে সুখ’…

মহালয়া

মহালয়া শারদীয়া দুর্গাপুজোর পূর্ব অমাবস্যা। পিতৃপক্ষের শেষ, দেবিপক্ষের শুরু। কৈলাস থেকে যাত্রা শুরু করলেন মা দুর্গতিনাশিনী। মর্তালোকে শুরু হ’ল তাঁর আবাহনী, আকাশ বাতাস কল্লোলিত-মা আসছেন, মা আসছেন! আনন্দময়ীর আগমনবার্তা: ঘাসের ডগায় শিশির বিন্দু, ডালে-ডালে শিউলি, বৃক্ষমূলে শিউলির গালিচা, একটু ঠান্ডা বাতাস-সব আয়োজন প্রস্তুত- তুমি এসো মা সপরিবারে।

মহালয়ার পুণ্যপ্রভাতে শুরু হয় চণ্ডিপাঠ। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই উদাত্ত শিহরণ জাগানো কণ্ঠস্বর- জাগো দুর্গা! মা দুর্গার সেই অচিন্ত রূপের বর্ণনা, মহিষাসুর বধে দেবীর সেই প্রতিমুর্তি যার বর্ণনা আজও উদ্বেলিত করে মন, রোমে রোমে যা শিহরিত হয় ভোরের প্রথম আলোতে। কত মহালয়া এ জীবনে জড়িয়ে আছে সেই শিশুকাল থেকে। প্রথমত, প্রতিবারই একই প্রশ্ন, ‘ বাবা, আজকে ঘুমলে কালকের সকালেই মহালয়া তো? ক্যালেণ্ডারে তো....’ বাবা হাত তুলে আশ্বস্ত করলেই আবার হৈ হৈ করে শুতে গেলাম। কিন্তু ঘুম কোথায়? সারারাত শুধুই আধো ঘুমে এপাশ আর ওপাশ, যদিও জানি রেডিওতে মঙ্গলশঙ্খ বাজবার আগেই বাবা ডেকে দেবেন। তারপর? তার আর পর নেই। একটু পাখা গজানোর আগে অবধি বাবা-মাযের মাঝখানেই তাঁদের প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়তাম। তারপর ঘুম ভেঙে সব চুপচাপ দেখে মাকে জ্বালিয়ে মারতাম। পাশের বাড়ির কাকু তাঁর টেপরেকর্ডারে ধরে রাখা বাসি অনুষ্ঠান দেখিয়ে আমাকে ঠান্ডা করতেন। সেই কাকুও খুব ঘুমকাতুরে ছিলেন তাই তাঁর এই বন্দোবস্ত ছিল। পরবর্তি পর্যায়ে, শাসন একটু শিথিল হতেই পাড়ার সমবয়সীদের সাথে বেড়িয়ে পরতাম। ওই ভোর ভোর রাতে প্রকৃতির কোল ঘেঁষে কোথায় না কোথায় চলে যেতাম! উফ্ সেই সব সুখস্মৃতি সারাজীবনের সঞ্চয় হয়ে আছে।

এই পুণ্যদিনে এক বিশেষ অনুষ্ঠান হ’ল ‘তর্পণ’। পিতৃলোকের পৃত্যর্থে জলদান। গঙ্গার ঘাটে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পন তারপর গঙ্গায় ডুব দিয়ে পুণ্যস্নান। সে কী ভীড়! গঙ্গার জল কম পরে যাবার যোগাড়! সারা ভারতের একই চিত্র। এই প্রসঙ্গে প্র্তিবেদকের একটা অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করি। বাবার চলে যাবার বছর। চলেছি তর্পণে সেই প্রথমবার। যতক্ষণ তর্পন শেষ না হবে বাড়ির উনুন ধরবেনা। আমাকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তর্পণ শেষে বাড়িতে ফোনে জানাতে আর নিজেও যেন কিছু মুখে দেই। যাই হোক্ সে তো তর্পণের পরের ব্যাপার। এখন তর্পণের কথায় আসি। আকাশবাণীর গা ধরে একটু এগোতেই পেয়ে গেলাম প্রার্থিত মানুষটিকে যে আমাকে দেবদুয়ারে পৌঁছে দেবে। গঙ্গার হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে তর্পণ কার্যক্রম চলাকালীনই বেশ বুঝতে পারছিলাম যে দুপায়ে কি যেন জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে। হাতে পুষ্পাঞ্জলি এবং নানা উপাচার মুখে মন্ত্র। এরই মধ্যে গঙ্গায় জোয়ার এসে পড়ল। সবাই বেশ ত্রস্ত। আমিও স্থির থাকতে পারছি না। ক্রমাগত ঢেউ এর দোলানির সঙ্গে সংযোজিত দু-পায়ের বন্ধন এবং সামনের দিকে প্রবল টান। ইতিমধ্যে তর্পণ শেষ। আমি বেশ ভীত হয়ে আমার বর্তমান অবস্থার কথা বলতেই পুরুতমশাই পুজোর থালাটা আমার হাতে দিয়েই দিলেন এক ডুব। আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। আমার বাঁ পাশে এক ডাকাবুকো লোক আমাকে জাপটে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলেন আর তক্ষুনি পুরুত মশাই ভেসে উঠলেন, হাতে একরাশ জবাফুলের মালা শক্ত দড়িতে বাঁধা। বেশ রাগত স্বরে বলে ওঠেন, ‘তুমি আমাকে আগে বলবে তো, দেখতো কি কান্ডটাই না হতে যাচ্ছিল! ‘তখন তো মন্ত্র পড়ছিলাম’ আমি একটু আমতা আমতা করে একথা বলতেই আবার বকা, ‘আমি হাজার বার মন্ত্র পড়তাম, যত্ত সব...’ এর পর তিনি আর আমার হাত ছাড়েন নি। হাত মাথা দুই ধরে তিন ডুব দিইয়েছেন। তারপর ঘাটে তুলে ভেজা ধুতি ছাড়িয়ে, শুকনো পোশাক পরিয়ে পিঠে হাত দিয়ে রাস্তা পার করে দিয়েছিলেন। ভাগ্যিস ওনাকে বলিনি যে আমি সাঁতার জানিনা-তাহলে কপালে অশেষ দুঃখ ছিল।

বাড়ি ফিরে বৌদিকে কথাটা বলেছিলাম। বাধ্য বৌমার মতো তা চলে গেল মাযের কানে। ব্যাস, মাযের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গেল-ভবিষ্যতে গঙ্গার ঘটে আমার তর্পণ বন্ধ। পরবর্তি বছর থেকে আজও গঙ্গার ঘাট হ’ল আমার বাড়ির ছাদ-সূর্যমুখী হয়ে ‘তর্পণ’ করি।

শরত আবাহনী

ঋতুচক্র অনুসারে আমাদের ছয়টি ঋতু বিরাজ করে। এই ছয়টি ঋতু নিয়ে ভাবতে বসলে, কিছু লিখতে গেলে অবধারিত ভাবে এসে পড়বেন রবীন্দ্রনাথ। শুধু উঁকি দিয়ে নয়, হুড়মুড় করে। কবিতায়, গানে প্রতিটি ঋতুকেই তিনি ভাস্বর করে রেখেছেন। আমার মতন কাঁচা প্রতিবেদকের ওঁকে আশ্রয় ব্যতিরেকে আসন্ন শরত্‍ কে নিয়ে কিছু ব্যক্ত করা অসম্ভব।

শরতের প্র্তিদ্বন্দী দুই বড় ঋতু- বর্ষা ও গ্রীষ্ম। কারণ, শরতে যেমন হঠাত্‍ হঠাত্‍ বৃষ্টি এসে তার আমেজ নষ্ট করে দেয় আবার বৃষ্টির অনুপস্থিতিতে গ্রীষ্মের প্রভাব অল্পমাত্রায় হলেও অনুভূত হয়। শরতের আসল সৌন্দয্য সকালের আলোয় জলভরা মেঘমুক্ত সুনীল আকাশ। অনুভবের মধ্য দিয়ে শরত্কে বুঝে নিতে হয়। শরতের ভোরের আকাশের দিকে চোখ মেলেই সেই অনুভবের শুরু। তাই শরত পর্যায়ের প্রথম গানটিতেই কবিগুরুর ভাবাবেগ, 'আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে কি জানি পরাণ কি যে চায়...।' সূচনাতেই কবিগুরুর কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। তাই তাঁর প্রভাব শরতের বর্ণনায় অবশ্যম্ভাবী। তাঁর সঙ্গীতে শরতকে আমরা পাই, 'মেঘের কোলে রোদ.... ,' 'ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়... ,' 'কাশের গুচ্ছ', 'শিশির ভেজা ঘাস', ' শেফালীমালার' মধ্য দিয়ে। শরত আনে আনন্দের জোয়ার। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে দিনগুলোয় মানুষ হয়ে যায় অকেজো আর গৃহবন্দী। ঝড়, বৃষ্টি বন্যা, রোগ-ব্যাধির সমস্যায় মানুষ ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। তখনই শরত বলে, 'যাক্ না সময় ভয় কি বা তার/কাটবে বেলা আকাশ-মাঝে বিনা কাজে অসময়ের খেলা খেলে.../কালো মেঘের আর কি আছে দিন, ও যে সাথীহীন।' সেই ই রবীন্দ্রনাথ। 

শরতের প্রভাতী আলোয় সেই সমস্যামুক্ত হয়। শরতের সোনা রোদ সঙ্গে আনে ভাসা ভাসা স্মৃতি-প্রতিশ্রুতি, চাওয়া-পাওয়া। প্রাণে বয়ে যায় হিল্লোল। শুরু হয়ে যায় নানা পার্বণ। শস্যক্ষেত্রে সোনালী আলোর ঝলমলানি, অনতিদুরেই যে নবান্ন! তার বার্তা এবং ঘ্রাণ অনুভূত হয়। শরত আনন্দের, শরত উত্সিবের। শরতের আমেজ সর্বাঙ্গে মেখে নিতে হলে প্রত্যুষে শয্যাত্যাগ অবশ্যই জরুরী। মাথার ওপর 'অমল ধবল', পদতলে তৃণশীষ শিশির, টুপটাপ শিউলি পতনে গাছের নীচে শ্বেতশুভ্র আর গৈরিক মখমলের গালিচা।

পরিশেষে, সেই আমাদের সকল কথা, সকল আনন্দের ধ্বনি, ব্যথা-বেদনা যাঁর কবিতায়, গানে যথাযথ হয়ে পরিষ্ফুট হয় সেই রবিঠাকুরের লেখনী নির্ভর হয়েই শরতের আবাহন:

‘...বাদল শেষের পাখি/পথে পথে উঠবে ডাকি/শিউলি বনের মধুর স্তবে/জাগবে শরত লক্ষ্মী যবে/শুভ্র আলোর শঙ্খরবে পড়বে ভালে মঙ্গলচন্দন।’

অদূরদর্শন

তখন সন্ধ্যে সাড়ে ছটা হবে। দূরদর্শনের কোনও এক চ্যানেলে চলছে চতুর্থ মানের এক সিরিয়াল। স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে বিছানায় আধশোওয়া অবস্থায় মাঝে মাঝেই আমাকে তা দেখতে হচ্ছে কারণ বাইরে বেরুবার উপায় নেই। শরীর বেজুত। আবার ড্রইং-কাম-ডাইনিং বলতে যা একচিলতে আছে, তাতে ছেলে টুবাই ওর দিদিমনির কাছে পড়ছে। এই সিরিয়াল পর্ব সিরিয়ালি ই চলতে থাকবে। সবগুলোই নাকি ক্লাইম্যাক্স পর্যায়ে আছে। অথচ মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে দু-চার মিনিট যা দেখি মনে হয় ঘুরে ফিরে সেই একই জায়গায় সেগুলো আছে বরঞ্চ আমদানি হচ্ছে কিছু কিছু অনাবশ্যক চরিত্রের। ভিন্ন ভিন্ন সিরিয়ালের কাহিনীবিন্যাস কোন একটি ঘটনা প্রসঙ্গে প্রায় একই না একই। বোঝাই যায়, চিত্রনাট্যকা র একই ব্যাক্তি এবং নিশ্চিন্তে মেলে ধরে চলেছেন সেই একই উপজীব্য বিষয়বস্তু- বোকাবাক্সের দর্শক(?) কুলকে। এটা ভাবতে ভাবতেই ডোর বেল বেজে উঠল। এঘরে উপস্থিত বাকি দুজনের মুখ বেজার। উঠতেও চাইছে না কেউই। অগত্যা আমি উঠতেই নিতান্ত অনিচ্ছাসত্বে আমার কন্যা গাত্রোত্থান করল। সদর দরজা খুলে দিয়েই বিরস বদনে মাকে এসে জানায় ‘ মা, হয়ে গেল টিভি দেখা কারা সব এসেছেন দেখো।’ আমি উঠতে উঠতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কারা মানে?’ ওর মা ঝাঁজিয়ে উঠল, ‘তুমিই দেখ না কে আবার এল এই অসময়ে।’ আমি সদর দরজার কাছে গিয়েই চিত্কাকর করে উঠলাম, ‘সুনন্দা দেখ কে এসেছেন-পিসিমা?’ সুনন্দাও এল তক্ষুনি, ‘আসুন আসুন পিসিমা ভিতরে আসুন। কবে এলেন ঢাকা থেকে?’ পিসিমার উত্তরে ও গালে হাত রেখে চোখ গোল গোল করে প্রায় কেঁদে ফেলে বলে ওঠে, ‘ওমা এতদিন হ’ল এসেছেন আর আজ বুঝি আমাদের কথা মনে পড়ল না? ঢাকা ফেরবার আগে বাকি কদিন আমাদের এখানেই কাটাতে হবে কিন্তু?’

এ সবই তো হ’ল। কিন্তু আমি তো জানি এখন শ্রীমতীর মনের অবস্থাটা! অমন জমাটি সব সিরিয়ালগুলো সব মাটি হয়ে গেল। এখন পিসিমা-ভাইপোর কথার মধ্যে নিতান্তই অনিচ্ছাসত্বে ওকে যোগ দিতে হবে। হোক্ না পিসিমা সুদূর বাংলাদেশবাসী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের ধরে এই ভর সন্ধ্যেবেলায় সেই বনগাঁ থেকে এসেছেন ভাইপো, ভাইপোবৌ ও ছেলে-মেয়েদের দেখতে। দূরদর্শনের বিভিন্ন চ্যানেলে সিনেমা, সিরিয়াল(অধিকাংশই নিম্নমানের) ঘন্টার পর ঘণ্টা দেখব অথচ দূরে যে নিকট আত্মীয়রা আছেন তাঁদের দর্শনে আনন্দ পেতে আজ আমাদের এতই অনীহা? এই আজ আমাদের সমাজদর্শন? ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ রুখতে হবে’ এই স্লোগান যখন চারিদিকে, তখন এই বোকাবাক্সের কল্যাণে আমরা কী রকম পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক একটা দ্বীপে বাস করছি! ভাবলেই মনটা কেমন দুলে ওঠে। সপ্তাহান্তের ছুটিতে কেউ বাড়িতে আসলে(অবশ্যই সেই সব অনুষ্ঠান চলাকালীন) আমার বাড়ির লোকজন খুশি হয় না, আবার অন্য কারুর বাড়ি যাওয়ার ভরসাও পাই না। কারণ ওদিকেও প্রায় এক চিত্র। সমানে চলছে সচল চিত্র এবং সবার চোখও সেই দিকেই। কে কর কথা অনুধাবন করবে? চুড়ান্ত অস্বস্তিকর।

বিজ্ঞানের এই বিশেষ দানের অপপ্রয়োগের কথা ভাবতে ভাবতেই পিসির একটা হাত খপ্ করে ধরে বললাম, ’চলো পিসি ছাদে গিয়ে বসি, নিচে বড় গরম। 

র‌্যাগিং

Rag কথাটার উত্পত্তি হয়েছে Bullyrag শব্দ থেকে-যার অর্থ হলো practical jokes॰ র‌্যাগিং অত্যন্ত প্রাচীন ভয়ংকর মজা এবং এর পথিকৃত ব্রিটেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলি।

মানুষের আদিমতম সংস্কার অনুযায়ী মানুষ পরিবর্তন পছন্দ করে না। যে কোন ক্ষেত্রে নতুন মানুষের প্রবেশ মানুষ স্বাভাবিক ভাবে নেয়নি। তাই স্বাভাবিক ভাবেই নবাগত কে সন্মুখীন হতে হয় অনেক বাধা, প্রশ্ন, সন্দেহজনক চাউনির সামনে।

Ragging এর আভিধানিক বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে: নির্মম ভাবে মজা করা, মজা করে পীড়ন। এই নির্মম ভাবে মজা করার ক্ষেত্রগুলো বিশেষ ভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে আছে আবাসিক স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল কলেজগুলিতে এবং মজা করার ভয়াবহতার মাত্রারও রকমভেদ আছে সেইভাবেই। কিছু জেনে গা শিউরে উঠেছে। না জানা বাদবাকি অনেকাংশ শুনতে আর মন চায় না। শুধু মনে হয়, এই নিষ্ঠুর মজা করার প্রক্রিয়াগুলোর উদ্ভাবক যে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীরা, তাদের কি সুকোমল বৃত্তিতে  একটুও রেখাপাত করে না! না, এটা বিশ্বায়নের কুফল, না ইঁদুর দৌড়ের প্রভাব না একাকীত্বের ক্রোধ নবাগতদের ওপর চাপিয়ে তাকেও একাকীত্বের শিকার বানিয়ে দেওয়া? প্রশ্নটা রইল। এই অদ্ভুত মজা করার প্রতিক্রিয়ায় কত ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষায় ইতি, ব্যাঘাত, শারিরীক ও মানসিক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর!!

এই অত্যাচারের সংস্কৃতিতে শিক্ষকরাও কম যান না। কখনও ছোট বাথরূম পেলে যেতে দেন না। কখনও বা তা চটিয়েও থাকেন ছাত্রীকে। ক্লাসরূম এ জোর করে পোশাক খোলানো ইত্যাদি, ইত্যাদি। তিরস্কার করা, পীড়ন করা, ইতর কটুক্তি...এই সব কর্পোরাল পানিশমেন্ট নিয়ে সবাই সরব হচ্ছেন কিন্তু শুধু শারিরীক নির্যাতনই নয়, মানসিক নির্যাতনও এর মধ্যে পড়ে। কিভাবে মানসিক নির্যাতন হয় আজকাল তা সবাই জানতে পারে সংবাদ মাধ্যম, মিডিয়ার দৌলতে। প্রতিবেদকের একটি ছোট্ট উধাহরন: বাবা আলুর চপ, বেগুনি ইত্যাদির তেলেভাজার দোকান। একমাত্র ছেলেটাকে পড়ানোর খুব সাধ। সঞ্চয়ের প্রায় সবটা ঢেলে ছেলেকে স্থানীয স্কুলে রীতিমত কঠিন অ্যাডমিশন টেস্ট দিয়ে ভর্তি করেছে। পড়াশুনাও চলছে ঠিকঠাক। কিন্তু বিধি বাম। হেডমাষ্টার মশাই সেদিন ক্লাস নিতে নিতেই ছেলেটিকে আক্রমণ করে বসলেন, ‘কি বাপধন, তোমার বাবার তেলেভাজার দোকানের তো খুব সুনাম শুনি, বিক্রিবাট্টাও কম নয়, তবে আমার স্কুল কি দোষ করলো? বাবাকে বোলো স্কুলের বাকি মাইনেটা মিটিয়ে দিতে, নইলে অসুবিধায় পড়তে হবে।’ টিফিন পিরিয়ড এ ছেলেটি  ছেলেটি বাড়ি ফিরে আজ নিয়ে দুদিন ওমুখো হয়নি। ওর মাযের মুখে এখবর পেয়ে বাবা তাকে চেপে ধরে ব্যাপারটা জানতে পারে। তারপর সাতসকালে আমার কাছে এসে ভেঙে পড়ে সবিস্তারে সব জানায়। আমি উত্তেজিত হয়ে স্কুলে যাবার উদ্যোগ নিতে যেতেই ছেলের বাবা আমাকে আটকায়। বুঝি, ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভয় পেয়েছে। আমি প্রয়োজনীয় কর্তব্যটুকু করি, ও সাশ্রুনয়নে বিদায় নেয়।

প্রচ্ছন্ন র‌্যাগিংও আছে। অটো, ট্যাক্সি, যে যখন অপরিহার্য, সেই সময় না হলেই নয়। হতে পারে তাত্ক্ষনিক প্রতিক্রিয়া কিন্তু তার রেস থাকে বহুক্ষণ। অফিসের বস। কোন ভুল না করেও অধীনস্ত কর্মচারীটির কপালে জোটে ভর্ত্সনা দিনের পর দিন। প্রতিবাদ? রাজা কখনো ভুল করতে পারে?

৬৮তম স্বাধীনতা দিবস

স্বাধীনতার ৬৮ বছরে ভারতের রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশ্যে তাঁর ভাষণে বলেন যে, শান্তি ভারতের সুমহান ঐতিহৃ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। শান্তি ছাড়া যে উন্নয়ন হয় না তার সম্যক উপলব্ধি তাদের আছে। গণতন্ত্রে আইনের শাসন ঠিকঠাক লাগু না হলে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ভোগ সুনিশ্চিত হয় না। এ ব্যাপারে প্ররোচনা মূলক বিবৃতি, উত্তেজনা ছড়ানোর মতন প্রচারের নিন্দাও করেন তিনি।এর ফলে সামাজিক ঐক্য অটুট থাকেনা। সন্ত্রাসের অঙ্কুরেই আছে সম্প্রদায়িকতা। তবে তিন দশক পর দেশবাসী একটি একদলীয় স্থায়ী সরকার গঠনে মত দেওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। আর্থিক উন্নয়নের সুফল যাতে দেশের দরিদ্রতম মানুষটিও ভোগ করতে পারে সে বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবার কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি..আমার মতন অগণিত ভারতবাসীরও ওটাই আর্তি।

যাই হক, বিগত দিনে একবুক স্বপ্ন নিয়ে ভারতবাসী বিশ্বাস করেছে এক দলের পরিবর্তে আর এক দলকে। তবুও সাধারণ মানুষের দুর্গতির এতটুকু সুরাহা হয় নি। প্রত্যক্ষ কর চাপিয়ে ডিজেল, পেট্রোল, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি হয়েছে। ক্ষমতার হাত ধরেই দুর্নীতি আসে। কিছু মধ্যবিত্ত এবং উচ্ববিত্ত তৈরী হওয়া ভারতবর্ষের মতন কোটির দেশে ব্যবসাদারদের লাভের অংকে কোন সমস্যা থাকে না। সমস্যা অন্যখানে। গরীব মানুষের অনাহারে থাকা, না খেতে পেয়ে মৃত্যু। কোটি কোটি মানুষের তিনশো পয়ষট্টি দিনের মধ্যে পঞ্চাশ দিনও কাজ না পাওয়া। পণের জন্য নারী হত্যা, অবাধ নারী ধর্ষণ। নানা ধরনের চুক্তির মাধ্যমে দেশকে ঋনভারে জর্জরিত করা। পর্বতপ্রমাণ দুর্নীতি।

মানুষের কাছে আজ স্বাধীনতা দিবস উদযাপন এক যান্ত্রিকতায় এসে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন জেগেছে, আকাশে পত পত করে উড়ছে সেটাই কি স্বাধীনতা? না,এই দিনটি স্বাধীনতা সংগ্রামে অমর শহীদদের স্মরণের, শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের দিন।

...স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে, কে বাঁচিতে চায়...

রাখীবন্ধন 

এখন তো সারা বছরই কোনো না কোনো দিন অমুক ডে, তমুক ডে তে নির্দিষ্ট হয়ে আছে। যেমন ফাদার্স ডে, মাদার্স ডে, বিশ্ব সঙ্গীত দিবস, ধরা দিবস ও আরো অনেক। কিন্তু ব্রাদার্স ডে বলে কিছু চিহ্নিত না থাকলেও সারা বছরে দুটি দিন ব্রাদার্স ডেই। এক রাখীবন্ধন দুই ভাইফোঁটা। দুটি অনুষ্ঠানই মূলতঃ ভাই-বোনেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আবার দুটি অনুষ্ঠানেই ঠাকুর্দা-ঠাকুমা, দাদু-দিদিমারাও এসে পরেন। ভাইফোঁটায় যেমন ঠাকুমা-দিদিমারা নাতিকে ফোঁটা দেন, তেমনি নাতনীরা ঠাকুর্দা-দাদুকে ফোঁটা দেন। রাখীবন্ধনের ক্ষেত্রেও নাতনীরা ঠাকুর্দা-দাদুকে রাখী পরায় আবার ঠাকুমা-দিদারা তাঁদের নাতিদের রাখী পরান। আর এই দুই অনুষ্ঠানেই প্রীতিউপহারের একটা ব্যাপার থাকবেই। যার পরিধি ম্যাগনাম সাইজের চকোলেট, শাড়ি, জামাকাপড়, শো-পিস, জাঙ্ক জুয়েলারী ইত্যাদি ইত্যাদি। এ এক সম্প্রীতির মেলবন্ধন। সাময়িক দূরত্বকে দূর করে ভাই-বোনের বন্ধন-বন্ধুত্বকে সুদৃঢ় করে। ভাইফোঁটার মতনই এক্ষেত্রেও নিজের মাযের পেটের ভাই-ই শুধু বিবেচিত হয় না। পাড়াতুতো ভাইরাও এই উত্সবে স্থান পায় এই বন্ধনে। দোকানে, দোকানে বিভিন্ন দামের, বিভিন্ন ডিজাইনের রাখীর সুদৃশ্য প্রদর্শন নির্দিষ্ট দিনটির অনেক আগেই মনটা আনচান করে দেয়। দুপক্ষের মনেই চলে এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে অনুরণন আর অনুরণন। বোনেরা এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যে দোকানে, দোকানে ভীড় করে তাদের পছন্দের রাখীটা বেছে বেছে কেনেন।অনেক বোনেরা নিজেরাই রাখী তৈরী করে হৃদয়ের সবটুকু আন্তরিকতা উজাড় করে। অনেক বোনেরা আবার কৃষ্ণকে ভাই মেনে রাখী পরায়।

রাখীবন্ধন এক প্রাচীন উত্সয়ব। শ্রাবণী পূর্ণিমার উত্সেব।এই উত্সেবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরাকালের অনেক পবিত্র কাহিনী। যেমন আলেকজান্ডারের স্ত্রী ও পুরু, চিতরের রানী কর্ণবতী-সম্রাট হুমায়ুন, মহাবলী-দেবী লক্ষী, যম-যমুনা প্রভৃতি।

১৯০৫ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে জাতিগত বিভেদ ভুলে, একজোট হয়ে ব্রিটিশ সম্রাজ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসাবে পরস্পরের মধ্যে রাখীবন্ধন উত্সমবের আয়োজন করেন। প্রাচীন ভারতে যুদ্ধে যাবার প্রাক্কালে মহিলারা পুরুষদের হাতে রক্ষাবন্ধনী পরিয়ে দিতেন সব অমঙ্গল থেকে কাছের মানুষটাকে রক্ষা করার জন্যে। এই রক্ষাবন্ধন্ শুধুমাত্র ভাই-বোনেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

আপোষহীন নবারুণ

মানুষের পতন কাহিনীর সবচেয়ে করুন দিক এই যে, একসময় সে অন্যায়কে অন্যায় বলে চিনতে পেরেও মেনে নেয়। তার সমস্ত প্রশ্ন তখন মিশে যায় ওই মেনে নেওয়ার মধ্যে। আমরাও যেমন অনেক কিছু এই ভাবেই মেনে নিচ্ছি। একটা ঠান্ডা উদাসীন ভাব। নিরুত্তর ভাবে সবই মেনে নেওয়া হচ্ছে। যখন কোন নেতৃত্ব অন্যায়কে অন্যায় বলে চিনিয়ে দেন, বক্তব্য রাখেন, প্রতিকারের যথাবিহিত ব্যবস্থা নেন, তখন অন্যান্যরাও ভিতরের অন্যায়টাকে চিনতে পেরে বাইরে নিয়ে আসতে পারে। ভুল স্বীকার করার তাগিদ অনুভব করে। বোঝে, এ ব্যাপারে পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। সেইটুকু অবধি রেয়াত করা যায়, নচেত্‍ আইনানুগ ব্যবস্থা তত্ক্ষণাত প্রয়োগ করা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়।

ঠিক এই সময়েই চলে গেলেন নবারুণ ভট্টাচার্য। চলে গেলেন স্ফটিকসম, শ্লেষ আর কৌতুক ভরা দুই চোখের মালিক সেই মানুষটা যিনি ছিলেন একাধারে কবি, গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক। আবার নাটকও করেছেন কলকাতার মঞ্চে।তাঁর লেখা অবলম্বনে মঞ্চসফল নাটকও করেছেন সুমন মুখোপাধ্যায়, দেবেশ চট্টোপাধ্যায় রা। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন ‘সোভিয়েত দেশ’ পত্রিকায়। ১৯৯৩ সালে ‘হারবার্ট’ উপন্যাসের জন্য তিনি ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কার পান।

নকশাল আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রাবস্থায়। তাঁর এই অতিবামপন্থী পরিচিতি থাকলেও তিনি নিজেকে মানবতাবাদী বলেই দাবী করতেন। নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য ও সাহিত্যিক-সমাজসেবী মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র সন্তান নবারুণ ছিলেন সেই প্রজাতির সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক যিনি কোনদিন কোনভাবেই কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আপোষ করেন নি। অনন্য রচনাশৈলী, তির্যক রাজনৈতিক ঘাত-প্র্তিঘাত এর চিরভাস্বর একক প্র্তিনিধিত্ব করে গেছেন। তিনি এক প্রতিরোধের প্রতীক। নিরপরাধ সাধারণ মানুষের ওপরে অন্যায় নির্মম আক্রমণ ঘটলে তাঁর কলম কখনও থেমে থাকেনি। নন্দীগ্রামে গুলি চালানোর প্রতিবাদে তিনি তত্কাথলীন রাজ্য সরকার প্রদত্ত  ‘বঙ্কিম পুরস্কার’ ফেরত্‍ দেন। তাঁর কলম প্রতিবাদের ক্ষেত্রে সদা শাণিত। বার বার ঝলসে উঠেছে প্রতিটি অন্যায়, অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে। তিনি যেন বিশ্বমানবতার প্রতীক। তাই লিখে গেছেন ‘কঙ্কাল মালসাট’, ‘ফ্যাতাড়ুর কুম্ভীপাক’ ‘লুব্ধক’, রাতের সার্কাস’, ‘মহাজনের আয়না’, হালাল ঝাণ্ডা ও অন্যান্য’, ‘আনাড়ির নারিজ্ঞান’ ইত্যাদি। 

না, উচিত হয়নি। তোমার চলে যাওয়া উচিত হয় নি। একদমই না।

নায়ক

নায়ক বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উত্তমকুমারের মুখ, হ্যাঁ এত বছর পরেও! উত্তমকুমার, ব্যক্তিগত পর্যায়ে রূপোলি পর্দার একচ্ছত্র নায়ক হলেও তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর অবর্তমানে টলিউডের দৈন্যদশা চোখে পড়ার মতন। পরিবর্ত কোথায়? কোথায় সেই ব্যক্তিত্ব? প্রশ্ন জেগেছে সিনেমা হলগুলো কি সবই শপিং মল হয়ে যাবে?

প্রথম নায়ক ‘কামনা’ ছবিতে ১৯৪৯ সালে। নায়িকা ছিলেন ছবি রায়। সিনেমায় নাম ছিল অরুণকুমার। আবার নামবদল ‘মর্যাদা’ ছবিতে ১৯৫০ সালে। অভিনয় করেন ‘অরূপকুমার’ নামে। ওই একটি ছবিই অরূপকুমার নামে করেছেন। ১৯৫১ সালে ‘সহযাত্রী’, ‘ওরে যাত্রী’, এবং ‘নষ্টনীর’-তিনটে ছবিই ফ্লপ-নাম হয়ে যায় ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’। ‘সঞ্জীবনী’ ছবিতে প্রথম ‘উত্তমকুমার’ নামে অভিনয় করেন। সেটা হ’ল ১৯৫২ সাল। প্রথম হিট ছবি ‘বসুপরিবার’| পরিচালক নির্মল দে। এই ছবিতেই প্রথম সুপ্রিয়ার সঙ্গে অভিনয়। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে প্রথম অভিনয় ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে। আবার উত্তমকুমার প্রযোজিত প্রথম ছবি, ‘হারানো সুর’ ছবিটি ভারত সরকারের ‘সার্টিফিকেট অব মেরিট’ পায়, ১৯৫৭ সালে। ১৯৫৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হ্রদ’ ছবিতে অভিনয়ের জন্যে উত্তমকুমার সাংবাদিকদের বিচারে শ্রেষ্ঠ নায়কের পুরস্কার পান। নায়িকা ছিলেন সন্ধ্যারানী। ১৯৬৭ তে ভারত সরকার প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ অভিনেতার ‘ভরত’ পুরস্কার পান ‘চিড়িয়াখানা’ ও ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবির জন্য। ইতিহাসের পর ইতিহাস। পূর্ণ ব্যাখ্যান নিষ্প্রয়োজন। তাও না বল্লেই নয় সেই সব ছবির কথা! সপ্তপদী, কাল তুমি আলেয়া, চৌরঙ্গী, নগর দর্পণ, অগ্নিশ্বর, জতুগৃহ, নিশিপদ্ম, অমানুষ, স্ত্রী, জয়জয়ন্তী, সব্যসাচী, শঙ্খবেলা, সন্ন্যাসীরাজা, দুই পৃথিবী, বনপলাশীর পদাবলী, ঝিন্দের বন্দী, অগ্নিপরীক্ষা, শাপমোচন, সাগরিকা, সবার উপরে, অপরিচিত ইত্যাদি।  শেষ ছবি ওগো বধূ সুন্দরী। আরো কতনা ছবি বাদ পড়ে গেল। আর নায়ক ছবির কথা আমি আর কি বলবো, ছবির সৃষ্টিকর্তা এ প্রসঙ্গে অনেক বলেছেন। বলেছেন, নামভূমিকার যথাযথ প্রয়োগ এবং এখানেই সার্থকতা, সাফল্য, সুবিচার। আর তাঁরই সুপুত্রের কথা, ‘উত্তমকুমারই ছিলেন রিয়েল লাইফের সেই মানুষটা যে কারণে অন্য কাউকে নিয়ে কেন ‘নায়ক’ করা হল না এটা কোনও প্রশ্নই নয়.....’নায়ক’ একজনই-উত্তমকুমার।’ 

স্টার থেকে সুপারস্টার হতে লেগেছে সুদীর্ঘ সময়। তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন অক্লান্ত পরিশ্রম, একাগ্র অধ্যবসায় আর একনিষ্ঠন সাধনার বিনিময়ে। এই জন্যই উত্তম সর্বোত্তম এবং নায়ক থেকে মহানায়ক। সব থেকে বড় বিস্ময় মহানায়কের তিরোধানের ৩৫ বছর পরেও তাঁর উচ্চতায় পৌঁছতে দেখতে পেলাম না কাউকেই। উত্তমকুমার প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়। আমাদের ইন্টেলেক্চুয়াল পরিমণ্ডল সদাই তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সন্মান দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন।তিনি নাকি আর্ট ফিল্মের যোগ্যই নন। তাঁর নেই কোন উচ্বশিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। এক কথায় আঁতেলগোষ্ঠীর মধ্যেই তিনি পড়েন না। সাধারণের মানুষের সঙ্গে তাঁর নাকি কোনও যোগ ছিল না। কিন্তু টলিপাড়ার অসংখ্য কলাকুশলী তার দ্বারা উপকৃত হয়েছেন বহুবার বহুক্ষেত্রে। আর সাধারণের কথা ভাবা? একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। সাল ১৯৬২| পশ্চিমবঙ্গের দুটি জেলা বন্যাবিধ্বস্ত। চারিদিকে বন্যাপীড়িত অসহায় মানুষের হাহাকার। বন্যাত্রানে বাংলার চলচ্বিত্রের শিল্পীদের পথপরিক্রমার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তমকুমার তখন অসুস্থ। তাই তাঁকে নেওয়া হবে না বলে স্থির হয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা ওঁর কানে যেতেই বেঁকে বসেন। উনি পদযাত্রায় যোগ দেবেনই। অগত্যা তাঁর জেদের কাছে সবাইকে হার মানতে হয়েছিল। তবে পায়ে হেঁটে নয়, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় গাড়িতে করে। এই ছিলেন উত্তমকুমার। ঢাকঢোল পিটিয়ে সঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে প্রচারের আলোয় আসা ছিল তাঁর নাপসন্দ।

ইদানিং উত্তমকুমারকে স্বীকৃতি-শ্রদ্ধা জানানোর উদ্যোগ প্রসংশনীয়। তবে মহানায়কের নামে পুরস্কার প্রাপক নির্বাচনের বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আর্জি রইলো। মনে রাখতে হবে এটা মহানায়কের নামাঙ্কিত পুরস্কার। তাকে যেন অসন্মান করে না ফেলি।

চার্লি চ্যাপলিন

চার্লি অথবা চার্লি চ্যাপলিন নামটা যেই মাত্র উচ্চারিত হয় তখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা অদ্ভুত সচল ব্যক্তিত্ব-মাথায় এক বেঢপ টুপি, হাতে নিতান্তই মামুলী একটা ছড়ি, একজোড়া থুপ করা গোঁফ, পায়ে পালিশ বিহীন আদ্যিকালের বেঢপ সাইজের জুতো, ঢিলেঢালা প্যাণ্টুলুনের সঙ্গে অদ্ভুতদর্শন আঁটোসাঁটো কোট। এর সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে পাদুটোকে অদ্ভুত এঙ্গেলে নিয়ে থপথপিয়ে হাঁদা-ভোঁদা কার্তিকের মতন চলন বলন। 

ভালো নামে(চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন)কেউই চিনতে পারবে না। আর তিনি সেভাবে নিজেকে ধরা দিতেই চান না। থেকে যেতে চান অধরা, কি নামে কি প্রকৃত চেহারায়। অথচ তিনি প্রকৃতই একজন সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব হিসাবে স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন। 

চার্লির যখন মাত্র একবছর বয়স সেই সময় তাঁর বাবা তাদের মা সমেত তাড়িয়ে দিয়ে অন্যত্র বিবাহ করে। শুরু হয়ে যায় জীবন সংগ্রাম। অতি শৈশবেই নিষ্ঠুর বাস্তবের অভিজ্ঞতা থেকে পরিচিতি হয়েছে অবর্ণনীয় নিপীড়ন, শোষণ, অন্যায়, অবিচারকে। এইসব অভিজ্ঞতাপুষ প্রতিটি ঘটনাবলী স্থান পেয়েছে তার বিভন্ন চলচ্বিত্র এবং নাটকে। মার মৃত্যুর পর অনাথ আশ্রমে বাস করার সময়েই তিনি যখন নাটকের দলে যোগ দেন তখন তাঁর বয়স মাত্র পাঁচ বছর। কী না করেছেন তিনি শৈশবকালে। ভিক্ষা করা, খবরের কাগজ ফেরি করা, ঝাড়ুদারগিরি, কারখানার ফাইফরমাস খাটা, জাগলারি, গান গাওয়া, নাচের দলে নাচা আরও কত কী! শৈশবের মাধুর্য নিষ্পেষিত হয়েছিল নিষ্ঠুর বাস্তবের কশাঘাতে। অথচ চার্লির একটাই পরিচিতি-তিনি হাসির রাজা যা একটা অন্য মাত্রা এনে দেয় নিছকই ভাঁড়ামি নয়। ওই টুপি মাথায় লোকটির মুখ ভেসে উঠলেই শত কষ্টের মধ্যেও আনন্দের একটা মিষ্টি বাতাস বয়ে আনে।

চার্লির ২৫ বছর বয়সের প্রথম পরিচালিত ছবি, ‘কট ইন দ্য রেইন’। সমসাময়িক বছরে ‘মেকিং দ্য লিভিং’ ছবিতে অভিনেতা হিসাবে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। ১৯২১ সালে ‘দি কিড্’(৬ রিলে সমাপ্তি) পরিচালনা করেন। সারা বিশ্ব চমকে ওঠে। ১৯৩৬ সালে প্রথম পূর্ণাঙ্গ নির্বাক ছবি ‘মডার্ন টাইমস’ আর তার চার বছর পরেই তাঁর সেই বিখ্যাত ছবি ‘দি গ্রেট ডিকটেটর’। রয়েছে ‘লাইম লাইট’, দ্য বন্ড সোলজার্স আর্মস’ এর মতন অসংখ্য ছবি এবং নাটকের অতুলনীয় ভিন্ন ভিন্ন রসাত্মক সৃষ্টি। যেখানে রয়েছে নুন মাখিয়ে গোলাপ ফুল ভক্ষণ, অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে বুট জুতো তারিয়ে তারিয়ে খাওয়া। জুতোর মরচে ধরা পেরেক এত সুস্বাদু কে জানত! তিনিই পারেন অপূর্ব শৈলীতে শিশুদের ভোলাতে। তিনি কি নিপুণ দক্ষতায় শিশুকে দুধ খাওয়াতে পারেন, বিচক্ষনতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা আর আত্মনিয়োগের সংমিশ্রণে। অবহেলিত, নিপীড়িত সব মানুষদের ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির দুর্দশার ইতিবৃত্ত তাঁর করায়ত্ব। প্রতিটি চরিত্রই মূর্ত হয়েছে তাঁর মর্মস্পর্শী অভিনয়ে।

তাঁর এই মানবদরদী প্রতিবেদন সমালোচিত হয়েছে স্বার্থান্বেষী কিছু ব্যক্তির কাছে। চক্রান্ত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে দেশছাড়া করে এক অদ্ভুত আশংকায়। ও দেশে চার্লি থাকলে মার্কিনীরা সাম্যবাদী হয়ে যাবে। চার্লি হাসতে হাসতে আমেরিকা ত্যাগ করেন। এ প্রসঙ্গে চার্লির মন্তব্য : ‘যদি মানুষকে ভালোবাসার জন্যে আমাকে কম্যুনিস্ট বলা হয়, তাহলে আমি কম্যুনিস্ট।’

ভাষা

বহু, বহু বছর আগে লিখিত ভাষা ছিল না। ছিল কিছু ধ্বনি এবং মানুষ সেই ধ্বনিগুলো দিয়ে তার ভাব প্রকাশ করত। আর এই ধ্ব্নিগুলোই ছিল তখনকার মানুষের ভাষা। তারপর আসে কথ্য ভাষা….লিপি। ক্রমশঃ মানুষের জীবনযাত্রায় বহুর্মুখী বৈচিত্র প্রকাশ পেতে লাগলো। আর নির্দিষ্ট কিছু ধ্বনি মানুষের এই বহুমুখী এবং বৈচিত্রময় জীবনের ভাবনা প্রকাশে উপযুক্ত হল না। স্বাভাবিক কারণেই ধ্বনিও বৈচিত্র উপলব্ধ হল। ভাবপ্রকাশের জন্যে নতুন নতুন ধ্বনির জন্ম হল। সেই থেকে আজ পর্যন্ত নতুন নতুন ধ্বনির জন্ম ঘটেই চলেছে। আর ধ্বনি থেকে জন্ম শব্দের আর শব্দ থেকে ভাষা। ভাষা হচ্ছে অর্থযুক্ত শব্দ।

যে ভাষায় শব্দ সম্ভার যত বেশি, সে ভাষা তত সমৃদ্ধ। আর ভাষার সেই সমৃদ্ধি আসে চর্চার মধ্য দিয়ে। মানুষ যেমন সমৃদ্ধ করে ভাষাকে তেমনি মানুষকেও মার্জিত করে ভাষা। ব্যবহারিক জীবনে তা বারবার প্রকাশ পায় শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত লোকের মুখের ভাষার পার্থক্যের মধ্য দিয়ে। অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার ব্যবহারও বাড়ে এবং হয় উন্নত। অপর দিকে অনুন্নত বা অর্ধন্নত জাতির ভাষাও হয় অনুন্নত।

যত দিন যাচ্ছে, বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে যত মেলামেশা, ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে ততই শব্দকৌলিন্য নষ্ট হচ্ছে। বাংলা ভাষায় বাংলা শব্দ কটি আছে? বাংলা ভাষায় ভরে আছে তত্স ম, তদ্ভব আর বিদেশী শব্দ। পৃথিবীর এমন একটি ভাষাও নেই যার শব্দকৌলিন্য বজায় আছে! বাংলা ভাষার কৌলিন্য এমন একটা পর্যায়ে এসেছে যে অহরহ অপ-অর্থের শব্দ প্রয়োগ মন বিষাদগ্রস্থ করে। সাহিত্যে, রাজনৈতিক বক্তৃতায়, সভাসমিতিতে এই অপশব্দের প্রয়োগ বাংলা ভাষাকে প্র্তিনিয়ত দীন, হীন করে চলেছে। সেখানে স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনা বোধও লোপ পেয়ে যায়। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীর কলমে, ভাষণে সেই সব শব্দের স্বীকৃতি মিলেছে।

বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বটাই এখন ছোট হয়ে গেছে। দূরকে করেছে নিকট বন্ধু...। বেড়েছে মেলামেশা, ঘনিষ্ঠতা, ভাব বিনিময়। এর ফলে ভাষার ব্যবধান কমেছে। সব ভাষাতেই বিদেশী শব্দ থাকে। যে ভাষা যত বেশি বিদেশী শব্দ আপন করে নিতে পেড়েছে সে ভাষা তত বেশি সমৃদ্ধ হোয়েছে। বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মেলামেশার মধ্য দিয়ে মিশ্র ভাষার জন্ম হয়। ইউরোপের ডঃ জামেনহফ একটি কৃত্রিম ভাষার জন্ম দেন-গোটা ইউরোপের সকলের বোধগম্য করে। কিন্তু সে ভাষা গ্রহণযোগ্য হয় নি। কারণ তাতে মানুষের যোগ নেই। কিন্তু মিশ্র  ভাষার জন্ম স্বতষ্ফুর্তভাবে, প্রানের আবেগে।

রাজনীতি, জাতীয়তাবাদের, বিছিনতাবাদের মধ্যেও সর্বজনগ্রাহৃ না হলেও বহুজনগ্রাহৃ এমন একটি মিশ্রভাষার গঠন শুরু করা যায় না কী? নীরবে কাজ কি চলছে? 

ব্যতিক্রমী রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের নিজের রচনায়, কবিতায়, গানে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে বা গল্পে নিজের অন্তর থেকে যা কিছু উদ্ভাসিত হয়েছে তাই প্রকাশ করেছেন বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে।তাঁর নিজেরই রচনায় নিজেরই উল্লেখ দেখা যায় শৈশবের স্মৃতি, পাঠ্যজীবন, পিতৃদেব এবং পারিবারিক পরিজনের সংগলভ ও বিশিষ্ট কোন ক্ষেত্রে বা ব্যক্তির উল্লেখে। কিন্তু নিজেরই রচনায় নিজেরই নামোল্লেখ-এ বিরল। সাধারণত চিঠিপত্রের ক্ষেত্রেই লেখক নিজের নামোল্লেখ করেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার বিভিন্ন রচনায় নিজের নামই উল্লেখ করে গেছেন। যেমন নিজের বিয়ের বিয়ের চিঠি শ্রী প্রিয়নাথ সেনকে উদ্দেশ্য করে লেখা...

‘প্রিয়বরেষু,

আগামী রবিবার ২৪ শে অগ্রহায়ণ তারিখে শুভদিনে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভবিবাহ হইবেক।‘(প্রিয়নাথ সেনকে ‘লিখিত পত্র-ডিসেম্বের ১৮৮৩’)।

এই চিঠি থেকে আমরা চট্ জলদি একটাই সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে এটা নিছকই রসিকতা মাত্র। কিন্তু গভীরে গেলে? রবীন্দ্রনাথ কি নিজের সত্ত্বাকে আলাদা করে দেখেছিলেন তখন? বিবাহ যার সে অন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার সত্ত্বাও আলাদা, তাকে পৃথক করে দেখান হ'ল। অথবা ভিতরের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিবাহে সায় নেই, অথচ বিবাহ করতে হবে। তাই সন্ন্যাসী রবীন্দ্রনাথ গৃহী রবীন্দ্রনাথকে দার পরিগ্রহ করাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সন্ন্যাসী রবীন্দ্রনাথ গৃহী রবীন্দ্রনাথকে মোটেই পরিত্যাগ করেন নি। সস্নেহে আত্মীয় এবং শ্রীমান বলেছেন। আবার ‘শেষের কবিতায়’ এক জায়গায় লিখেছেন-‘রবিঠাকুরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় নালিশ এই যে, বুড়ো ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর নকল করে ভদ্রলোক অতি অন্যায় রকম ভাবে বেঁচে আছে। যম বাতি নিভিয়ে দেবার জন্যে থেকে থেকে ফরমান পাঠায় তবু লোকটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও চৌকির হাতা আঁকড়িয়ে থাকে। ও যদি মানে মানে নিজেই সরে না পড়ে, আমাদের কর্তব্য ওর সভা ছেড়ে দল বেঁধে উঠে আসা।’

আবার, ‘রবিঠাকুর সম্বদ্ধে আমার দ্বিতীয় বক্তব্য এই যে তার রচনা, রেখা তারই হাতের অক্ষরের মতো-গোল বা তরঙ্গরেখা, গোলাপ বা নারীর মুখ বা চাঁদের ধরনে’(শেষের কবিতা)।

রবীন্দ্রনাথ যে বহু আলোচিত, বিচিত্র ভঙ্গিতে সমালোচিত সে সম্বন্ধে তিনি যে সম্যক জ্ঞাত ছিলেন তা বলাই বাহুল্য। জবাব দিয়েছেন বিভিন্নভাবে তাঁর লেখনীতে এবং তা অত্যন্ত রুচিসংগত ভাবে। শেষের কবিতার এক জায়গায় যেমন স্থান পেয়েছে ‘একদিন ওদের বালীগঞ্জের এক সাহিত্য সভায় রবিঠাকুরের কবিতা ছিল আলোচনার বিষয়... রবিঠাকুরের কবিতা যে কবিতাই এইটে প্রমাণ করাই তাঁর উদ্দেশ্য’। ইন্দিরা দেবীকে লিখিত পত্রে(১৭ই বৈশাখ, ১৩৩৪) এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রপরিচয় পদার্থটি কি এবং কোথা থেকে তার উদ্ভব সে রহস্য আমার অগোচর...।’

স্বল্প পরিসর হেতু, ‘ছিন্নপত্রে’ নিজেকে স্বনামে বিলিয়ে দেবার প্রয়াসের চিত্রায়ণ দিয়েই ব্যতিক্রমী রবীন্দ্রচর্চার ইতি টানলাম...

‘কলকাতার সেই জনতা সমুদ্রের মধ্যে আমার সেই বিরহান্ধকার ঘরটিই কেবল বিজন। তার সেই রুদ্ধদ্বারের ভিতর থেকে কাতর স্বর উঠছে, ‘রবিবাবু-উ-উ-উ। রবিবাবু আজ এখান থেকে সাড়া দিয়েছেন, এই যা-আ-আ-ই।’ 

(ছিন্নপত্র, সোলাপুর, অক্টোবর ১৮৮৫)

ঋতুরাজ

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আজ স্মরণ করি ঋতুপর্ণকে-শ্রী ঋতুপর্ণ ঘোষকে। না, ঋতুপর্ণর নামের আগে কোনো চন্দ্রবিন্দু যোগ করতে প্রতিবেদক অক্ষম ও অনিচ্ছুক। ঋতুপর্ণ চিরকাল ‘শ্রী’ হয়েই বেঁচে থাক আমাদের হৃদয়ে সাংস্কৃতিক-চলচিত্র আন্দোলনের ইতিহাসে।

আমরা ঋতুপর্ণকে দেখছি, ওর সঙ্গে চলচিত্র, সাহিত্য সংস্কৃতির ঘরকন্না করছি বেশ কিছু বছর ধরে। এ সম্পর্ক চিরজাগরুক থাকবে। তাকে আমরা চিরঞ্জীবী করে আমাদের সঙ্গে বেঁধে রাখলাম।

বাবা-মা’র নামঙ্করন ‘সৌরনীল’কে সরিয়ে নিজেই নিজের নাম রেখেছিল ‘ঋতুপর্ণ’, মহাভারতের অক্ষবিশারদের নামে। তাই নিজের ইচ্ছেমতন পাশার দান চেলেছিল জীবনের প্রতিটি বিচরণ ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থেই। সকলের মধ্যে থেকেও ও আলাদা ছিল। ঋতুপর্ণের ছবি, লেখার বিষয়ে কথা বলার যোগ্যতা আমার নেই। তবে এটুকু বেশ অনুভব করতে পারি যে ওর সৃষ্টির পশ্চাদপটে থাকতো নিরন্তর প্রস্তুতি, ‘হোমওয়ার্ক’। আর ছিল সবার থেকে ভালো জিনিসটা বার করে আনা। আর এসব সম্ভব হয়েছে ওর মেধা, কল্পনাশক্তি, কর্মদক্ষতা, শৃংখলা আর আত্মবিশ্বাসের অফুরান পুঁজির কারণে। ছবি তৈরীতে তাঁর নিষ্ঠা চরিত্রকে জীবন্ত করেছে। আর বিজ্ঞাপনকে করেছেন সৃজনশীল।

বিশ্বের সংস্কৃতি জগত্‍ ওর অবর্তমানে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। বাংলা গদ্য কে সে দিয়েছে এক অন্য মাত্রা। আমি তাঁর মুগ্ধ পাঠক। তাই নিরন্তর থাকে এক ‘অব্যক্ত যন্ত্রনা’ :

এমন নির্দয়ভাবে তোমার বিলয় হবে ভাবিনি

এমন নির্মমভাবে সর্বনাশ ঘটে যাবে সে কথা

স্বপ্নেও গোচর হয়নি কারো,

অচিরেই থেমে গেল প্রত্যয়ী এক মানুষের স্পন্দন!

হায়! ভাগ্য আমাদের

এখন সে যে স্পর্শাতীত

দূরে!

হাসি ছিল মৃত্যুহীন অধরে তোমার-

যেন মরণের বড়ো কাছাকাছি আমরা সবাই

তবু কেন আজ এত দুঃখ, এত অশ্রুপাত!

মনে হয় তুমি বন্দী করেছ মৃত্যুহীন দেবতাকে।


আমার হৃদয় গভীরে তোমার নিঃশ্বাস

যেন শূন্যতার পরম আশ্রয়।

কে জানত            

কিছু শোক এত দীর্ঘ হয়!!

রসিক রবীন্দ্রনাথ

সাধারন ভাবে কিছুটা অন্তর্মুখীন হওয়া সত্বেও রবীন্দ্রনাথের কৌতুক প্রবণতা ও রসবোধের বিভিন্ন কাহিনী ছড়িয়ে আছে তাঁর সাহচর্য সৌভাগ্যবানদের স্মৃতি কথায়। তাঁর কৌতুক পরিবেশনে কথা প্রয়োগের বিশেষ বৈশিষ্ট্য একটা অন্যমাত্রা এনে দেয়। তারই একটি মনোজ্ঞ, সাবলীল এবং স্বতঃষ্ফুর্ত উদাহরণ :

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে সমকালীন কিছু তরুণ লেখকদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। কবি নিজেই তাঁদের আপ্যায়িত করছেন। সুকুমার রায়ও ছিলেন সেদিনকার নিমন্ত্রিতদের মধ্যে একজন। সকলেই প্রায় ফল-মিষ্টি নিলেও সুকুমার রায় কোন ফল নিচ্ছেন না দেখে কবি সুকুমার রায়কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি যে এত গভীর ভক্তির সঙ্গে গীতা পাঠ করেছো, তাতো জানা ছিল না!’ হতচকিত সুকুমার রায় কবির এই বক্তব্যের কারণ বুঝতে পারছেন না দেখে কবি নিজেই বললেন, ‘তুমি একেবারেই ফল খাচ্ছো না দেখেই বুঝেছি গীতার ‘মা ফলেষু কদাচন’ উপদেশ টুকু তুমি যথার্থই জীবনে গ্রহণ করেছো’।

রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত

রবীন্দ্র রচিত অসংখ্য গানের বিভাগ কবি নিজেই করেছেন। যেমন, পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, অনুষ্ঠানিক ইত্যাদি। কিন্তু ব্রহ্মসঙ্গীত বলে কোন বিভাগ নেই।  ‘গীতবিতানে’র ‘পূজা’ পর্যায় অংশেই আছে তাঁর রচিত ব্রহ্মসঙ্গীত গুলি।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, বিপিন চন্দ্র পাল, কামিনী রায় এবং আরও বিশিষ্ট ব্যক্তি ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াত করতেন। রবীন্দ্রনাথও পিতা দেবেন্দ্রনাথের হাত ধরেই ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াত শুরু করেন। বাড়িতে ব্রহ্মভাবের অনুকূল পরিবেশ এবং ব্রাহ্মসমাজের প্রভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুবক রবীন্দ্রনাথ রচনা করলেন প্রথম ব্রহ্মসংগীত:-

 “নয়ন তোমায় পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে

হৃদয় তোমায় পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছে গোপনে।’’

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে পরমাত্মামহিত এই সঙ্গীত এমন আবিষ্ট এবং মুগ্ধ করেছিল যে তিনি পুত্রকে উত্সা হ প্রদান করতে পাঁচশ টাকা পুরস্কৃত করেছিলেন। আদি ব্রাহ্মসমাজের প্রখ্যাত গায়ক বিষ্ণু চক্রবর্তী মহাশয় ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত জীবনের প্রথম গুরু। পরবর্তী পর্যায়ে তালিম নিয়েছিলেন যদুনাথ ভট্টাচার্যের(যদুভট্ট) কাছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত সঙ্গীত গুরু ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর(জ্যোতিদাদা)।

কীর্তনের সুরেও রবীন্দ্রনাথ ব্রহ্মসাধনার গান রচনা করেছেন। যেমন :

     “ওই আসন তলে মাটির’ পরে লুটিয়ে রব,

     তোমার চরণ-ধূলায় ধূলায় ধূসর হব।...”

আবার বাউল সুরে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন আধ্যাত্মভাবের এই গানটি :

     ‘’আমি যখন ছিলেম অন্ধ

     সুখের খেলায় বেলা গেছে পাইনি তো আনন্দ।

     খেলাঘরের দেয়াল গেঁথে খেয়াল নিয়ে ছিলাম মেতে,

     ভিত ভেঙে যেই এল ঘরে ঘুচল আমার বন্ধ।

     সুখের খেলা আর রোচেনা, পেয়েছি আনন্দ।...’’

রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্তরের অন্তঃস্থলে এটাই অনুভব করতেন যে তিনি এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের স্মৃষ্টিকর্তারই অংশ। তাই পরমেশ্বর যেভাবে চাইবেন তিনি সেইভাবেই তাঁর নামগান করবেন, করলেনও :

 “প্রতিদিন তব গাথা গান আমি সুমধুর

তুমি দেহ মোরে কথা, তুমি দেহ মোরে সুর-

তুমি যদি থাক মনে বিকচ কমলাসনে,

তুমি যদি কর প্রাণ তব প্রেমে পরিপূর

প্রতিদিন তব গাথা গাব আমি সুমধুর।...”

ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি সূর্য, চন্দ্র ও অন্যান্য গ্রহের অবস্থান রবীন্দ্রনাথকে বিস্মিত, মুগ্ধ করেছে। তাই লিখেছেন :

“সারা জীবন দিল আলো সূর্য গ্রহ চাঁদ

তোমার আশীর্বাদ, হে প্রভু তোমার আশীর্বাদ...”

অন্য একটি গানেও দেখি তার প্রকাশ:-

 “তব নাম লয়ে চন্দ্র তারা অসীম শূন্যে ধাইছে

রবি হতে গ্রহে ঝরিছে প্রেম, গ্রহ হতে গ্রহে ছাইছে...”

ব্রহ্মসংগীতের মধ্যে কাঠিন্য, নীরসতা বর্জন করে রবীন্দ্রনাথ তাতে রসসঞ্চার করেন। রামমোহন প্রবর্তিত জ্ঞানপ্রধান ব্রহ্মধর্ম দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র সেনের আমলে ক্রমশঃ ভক্তি প্রধান রূপ পরিগ্রহ করে। এই তাত্বিক রুপান্তর উত্তর কালে ব্রহ্মসংগীতের প্রকৃতিকেও পরিবর্তণ করে। রবীন্দ্রনাথ এই পরিবর্তনের শুধু সাক্ষীই নন, সৃষ্টিও বটে। রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত ব্রাহ্মদের মধ্যে “রবিবাবুর গান” নামে পরিচিত ছিল। 

Click to edit table header
পুরনো সংখ্যার লেখা
Click to edit table header
সাহিত্য সংবাদ

ভাষানগর সম্মান

২৫শে জানুয়ারী ২০১৬ সন্ধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি সভাগৃহে ভাষানগর সাহিত্য পত্রিকার উদ্যোগে দেওয়া হয়েছে ভাষানগর সম্মান ২০১৬।

এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি শ্রী সুবোধ সরকার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শ্রী সুগত মারজিত্‍, প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাহিত্য সম্পাদক শ্রী হর্ষ দত্ত, বিশিষ্ট কবি শ্রী বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মান হিসেবে ভাষানগর সম্মান ২০১৬ দেওয়া হয় চারজন সাহিত্যককে। ছোট গল্পের জন্যে সম্মানিত হয়েছেন শ্রী সুপ্রভাত লাহিড়ী।

বাংলা সাহিত্য ওয়েব ম্যাগাজিনে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, আলোচনা ও মতামত পাঠাতে পারেন । পাঠাবেন অভ্র-তে টাইপ করে ওয়ার্ড ফাইল । মেইল করবেন [email protected] আইডি-তে

Copyright © 2013 Creative Media All Rights Reserved | Designed & Developed by Graphic World (9143382591)